• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • নেভানো দেশলাই : সম্বিত বসু

    অফসাইড; — কিশোর ঘোষ; প্রকাশক— ইতিকথা পাবলিকেশন; প্রচ্ছদ- তন্ময় দাশগুপ্ত; প্রথম প্রকাশ— জানুয়ারি ২০১৮; পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় মুদ্রণ- অক্টোবর ২০২৫; ISBN: 978-93-93680-75-4

    এই বই ছায়ার পুত্তুর, এই বই ভেন্ডর কামরা। উড়ো ধুলোয় ফিরে শুল শতাব্দীর ভাঁজ। ওরা কারা, যারা হেঁটে যাচ্ছে এখনও, মফস্‌সলে? ‘কচিপাতা, পাতা হে, এ এলাকার ছাতা হে’– এমন কথা এক ভ্রমজাগানো, সম্ভ্রমজাগানো পাগল বলে চলত, সেই ছেলেবেলায়। ‘অফসাইড’ পড়তে পড়তে তা-ই মনে পড়ছে। এইবেলা পরিষ্কার করে বলে দেওয়া উচিত, হে পাঠক, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ যেমন ঢোঁড়াই সাপকে নিয়ে লেখা নয়, তেমনই ‘অফসাইড’ কোনও ফুটবল শিক্ষার বই নয়। তবে কী নিয়ে এই বই? উসকোখুসকো রাতবন্ধু কবির হাতের লেখা গদ্যের হোঁচট। কেন হোঁচট? কারণ পাঠক হোঁচট খেয়ে এসে পড়তে পারেন কবিতায়।

    কারও কারও প্রয়াণে মন টনটন করে। কিন্তু প্রয়াণ কি শুধুই জীবের? জড়ের? তাও না। জীব ও জড়ের যৌথতায় যে জীবন– সেও তো ক্রমপ্রয়াত হতে থাকে। এই বইয়ের দ্বিতীয় লেখা: ‘প্রয়াত মফস্‌সল’। মফস্‌সল ফসলের মতোই। জীবনানন্দ লিখেছিলেন: ‘মুছে গেছে কতোবার—কতোবার ফসল-কাটার/সময় আসিয়া গেছে, চ’লে গেছে কবে!/ শস্য ফলিয়া গেছে– তুমি কেন তবে/রয়েছো দাঁড়ায়ে/ একা-একা!’ প্রয়াত মফস্‌সলে আসলে এই বইয়ের লেখক একা দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু একেবারে কি একা? যে কোনও প্রয়াণে যেমন জড়ো হয় উলুখড় মানুষের দল, সেরকমই, এবারেও, এখানেও হয়েছে। তারা অনেকেই চেনে না এই প্রয়াণ, শুধু জব্দ উৎসাহে তাকিয়ে। কখনও সখনও একটা দুটো প্রশ্ন, এটা যে ছিল, এখন নেই? ছিল নেই, মাত্র এই? একটা আস্ত মফস্‌সল আসলে জেগে থাকে যতরকম কথার উদবৃত্তে। যে কথা, কথার কথা। যার সেরকম কোনও লক্ষ্য নেই। আবার কখনও সখনও সে কথা থেকেই তৈরি হয়ে যায় হাজার বছরের পথ হাঁটা কিংবা নিতান্তই হাঁস চলার পথ। অর্থাৎ কথার কোনও ঠিকঠিকানা নেই, কিন্তু মাঝে মাঝে কথার পিওন এসে, মনে, শরীরে, ফেলে দিয়ে যায়। বেলা দশটা, সাড়ে দশটার পর কী হচ্ছে সেখানে? আসুন দেখি–

    ‘ঠিক তখনই পল্টুর চায়ের দোকানে বেকার আর হাফ-বেকারদের জমজমাট ভিড়। তিন গ্রুপ থাকলে তিরিশ রকম আলোচনা। আলোচনা সিরিয়াস। ইয়ারকি না, এ হচ্ছে আপনার যাবতীয় মহান কাজের লঞ্চপ্যাড বলতে পারেন। মফস্‌সল সংস্কৃতির ধাত্রীভূমি ছিল এই চায়ের দোকানগুলো। এবার সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা হবে নাকি ডে-নাইট ফুটবল টুর্নামেন্ট? হতে পারে বাৎসরিক রক্তদান শিবির ইত্যাদি ইত্যাদি।’

    ভিড় দেখতে পাচ্ছেন? টিমটিমে আলোর পোকার মতোই ভিড়। এক-আধ কাপ চা। বিড়ি-সিগারেটের উদ্ধত ধোঁয়া। কণ্ঠস্বর। এক-দু’জন কোমল কিশোরও আছে সেখানে। সে দেখছে। ভাবছে এই যে দেশলাই ঠুকে, হাতের মধ্যে আগুনকে মুঠো করে ফেলা, কী করে সম্ভব! এমনই দেওয়াল, যে পাশ দিয়ে হুস করে ট্রেন বেরলেও আগুন নিভছে না। এই একজন, দু’জন, তিনজন ধরাল। দেশলাই অবশ্য ওদের না, দোকানদারের। দেখুন, আপনিও এক হত মফস্‌সলের কাছে এসে পড়েছেন। যেখানে দীর্ঘকালের পুরনো এক স্টেশনের গাছ ছাড়া, পুরনো মুখ হাত পা সবই বদলে গিয়েছে।

    এ লেখার প্রথমে লিখেছিলাম, এই বই গদ্যে হোঁচট খেয়ে মাঝে মাঝে কবিতায় এসে পড়েছে। বলেছিলাম, কারণ ‘বড়োদের সান্তা ক্লজ’– এই লেখাটির প্রথম লাইন: ‘রবীন্দ্রনাথ এক ধরনের চাঁদ’। সেই প্যারায় আর কোনও লাইন নেই। রবীন্দ্রনাথকে, চাঁদকে এক বিস্তারিত আকাশের মতো উদার জায়গা দেওয়া হল। এই লেখা, এক ধরনের স্বগতোক্তিই– রবীন্দ্রনাথ পড়া এক পাঠক কতদূর রবীন্দ্রনাথে বুঁদ হতে পারেন, তার চমকপ্রদ উদাহরণ। অনেকটা গান্ধীজির বইপত্র পড়ে মুন্নাভাইয়ের যে স্বগতকথন বা দ্বিরালাপ, যা-ই বলুন না কেন, সেই আঙ্গিকের এক লিখিত উদ্বোধন পাওয়া যায়।

    ‘বইমেলার পৌনে ১৩ নম্বর গেট’। পৌনে ১৩! ১৩, কুসংস্কারের অভিধান ‘আনলাকি’ বাংলায় ‘অপয়া’। পৌনে ১৩ নির্ঘাত ততটা অপয়া নয়। অপয়ার ছন্দে পা না দিয়ে, বলা যায় পয়াও তো হতে পারে। কী ঘটে যায় এই নামপাটার গদ্যে? ‘কবি’কে বাইরে থেকে, মানে পরনে ও গড়নে ঠিক কীরকম দেখতে-শুনতে হবে– এই পুরনো অগামারা বিষয়টিকে এখানে ক্রমাগত ল্যাং মারা হচ্ছে। বইমেলায় এই কবির পরিচয় ‘কালো মেঘ’। আলোর থান কেটে বানানো তাঁর জামাকাপড়। কারা তাঁকে চিনতে পারছে না? লেখক জানাচ্ছেন একে একে সেই না-চিনতে পারা, না-চিনতে চাওয়া লোকজনকে, নাম ও অভিব্যক্তি দিয়ে–

    ‘তারপরেও অখ্যাত কুকুর, বিখ্যাত কবি, সানাইবাদক, ময়লা ঝোলাব্যাগ, অ-আ-ক-খ শাড়ি, ব্রা, প্যান্টি, তরুণ কবি রামচালক খান, সেকুলার ইন্দ্রজিৎ, আন্তর্জাতিক বিছুটিপাতা কমিটিতে যথাক্রমে গত দশ ও সাত বছর ধরে ঘষটানো পুরস্কার দিদি ও দাদা, জেলায় জেলায় কবিতা উৎসবের কান্ডারি ইটভাটার মালিক... মায় কেউ চিনতে পারছে না আমাদের কবিকে!’

    কেন পারেন না? যে যে কারণের কথা লেখা হয়েছে এরপর, সেগুলি খেলাচ্ছলে হলেও, তাতে লৌহচূর্ণ মেশানো।

    লেখক বলছেন, হয় কবি পদবিতে ব্রাহ্মণ নন। কিংবা, রুল টানা খাতায় লেখেন। হয়তো দেখতে বদখত, কিংবা বেঁটে। গ্রাম থেকে ট্রেন ধরে আসতে সর্বস্তরে লেটলতিফ হয়তো। ডট পেনে লেখেন, কালি পেনে নয়। অধ্যাপক, এমনকী, স্কুলশিক্ষকও নন। তায় ডাহা সংসারী! মিশুকেও না। আর কী আশ্চর্য– দাড়ি নেই! ৩০ বছরের কাব্যজীবনে লাল-নীল-কাক-চিল-শিঙাড়া-আব্বুলিশ-চিংড়ি-ইলিশ– এসব লেখেননি মোটেই!

    পাঠকেরা ভালো করেই বুঝতে পারছেন, এ লেখা আসলে অফসাইড। এখান থেকে গোল করা যাবে না, শোরগোল করাও না। মেনে নিতে হবে এই বলা। বাংলা বাজারের নানা অনুচ্চারিত রীতিনীতিকে প্রশ্ন করে এই পৌনে ১৩ নম্বর গেট।

    এ এমন এক গদ্যবই, যার কোনও হাইওয়ে নেই। সোজা রাস্তা নেই। এই বই খানাখন্দময়। বৈচিত্রে ভরা। চায়ের দোকান, মাছের বাজার, মনের অন্দর-বাহির, ভিলেন-চশমা, সব মিলেমিশে আছে। মফস্‌সলের বিবিধ গলি যেমন। মাঝে মাঝেই অন্ধগলি। তা-ই অফসাইড। কিশোর ঘোষের।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments