



“সিমিকে আরো কিছুদিন স্পেশাল ক্লাস নিতে হবে। ওর ইংরেজি এখনও অন্য বাচ্চাদের স্তরের হয়নি,” প্রিন্সিপাল মিসেস কুপার গোমড়া মুখ করে সিমির মাকে বললেন। সিমি মানে স্মৃতিকণা মার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল কাঁদো কাঁদো মুখে। ঠাকুমা আদর করে নাম দিয়েছিলেন স্মৃতিকণা, তা সে নাম এদেশে মানে মার্কিন দেশে কেউ উচ্চারণই করতে পারে না তাই সে স্মৃতিকণা থেকে সিমি হয়ে গেছে। তা হোক তাতে আপত্তি নেই কিন্তু সে ইংরেজি তেমন ভালো বলতে পারে না বলে মিসেস কুপারের মাকে ওই ভাবে বলা শুনে কান্না পেয়ে যাচ্ছিল তার। বাবাকে কাজের জন্যে এদেশে আসতে হয়েছে তাই সিমিকেও এখানকার স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছে, নাহলে তার মোটেই ইচ্ছে ছিল না দাদু, ঠাম্মা, দিদা, মামা, মাসি, কাকু সবাইকে ছেড়ে এখানে এই মার্কিন মুলুকে আসার।
মিসেস কুপার মাকে বলেই চলেছেন, “মিসেস সেন, সিমির যা অবস্থা তাতে আমার মনে হয় আপনাদের উচিত ওর সঙ্গে বাড়িতে ইংরেজিতে কথা বলা। তাহলে ও অনেক তাড়াতাড়ি শিখবে। এখন টিচারদের ওর সঙ্গে কথা বলতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে।”
মা এতক্ষণ মন দিয়ে মিসেস কুপারের সব কথা শুনছিলেন আর হেসে হেসেই উত্তর দিচ্ছিলেন এবার কিন্তু মার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। সিমির হাতটা শক্ত করে নিজের হাতে ধরে মা বললেন, “সিমির বয়স মোটে সাত। আজ না হোক কাল ও ইংরেজি শিখে যাবে। এখানে চারপাশে সবাই সব সময় ইংরেজিতেই কথা বলছে, সেই ভাষা না শিখে উপায় নেই। আমি দুঃখিত কিন্তু আপনার ওই উপদেশ আমি মানতে পারলাম না। আমার বাড়িতে আমি আমার মেয়ের সঙ্গে তার মাতৃভাষাতেই কথা বলব। তার মাতৃভাষা বাংলা। বাড়িতে যদি আমরা ওর সঙ্গে বাংলাতে না কথা বলি তাহলে সে নিজের মাতৃভাষা ভুলে যাবে। সেটা আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না! আপনারা দরকার হলে ওই ইংলিশের স্পেশাল ক্লাস আরও কিছুদিন চালিয়ে যান।”
মার কথা শুনে মিসেস কুপার মোটেই খুশি হলেন না সেটা ওঁর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল কিন্তু মার মুখের ওপর কিছু বলতেও পারলেন না। টেনে টেনে শেষে বললেন, “ঠিক আছে, আমরা আরও তিন মাস সিমিকে স্পেশাল ক্লাসে রাখব তারপর ওর একটা পরীক্ষা নেওয়া হবে। ও যদি সেই পরীক্ষায় পাশ না করতে পারে তাহলে ওকে পরের ক্লাসে যেতে দেওয়া যাবে না।”
মা এবার হাল্কা হেসে বললেন, “ঠিক আছে। এই বয়সে একটা ক্লাসে দুবার পড়লে ওর কোন ক্ষতি হবে না। ও যদি পরীক্ষায় পাশ না করতে পারে তাহলে না হয় তাই হবে।”
বাড়ি ফিরে বাবাকে সব বলতে বাবা একটু রেগেই গেলেন, বললেন, “কী দরকার ছিল মিসেস কুপারকে ওই সব বলার? যে দেশে বাস করছে সেই দেশের ভাষা তো শিখতেই হবে। ওদেরই বা দোষটা কোথায়? সিমি টিচারদের কথা বুঝতে পারছে না সেটা কত বড়ো সমস্যা বুঝতে পারছ? আমারও মনে হয় আমাদের বাড়িতে ওর সঙ্গে ইংরেজি বলা উচিত তাহলে ও আরো তাড়াতাড়ি শিখতে পারবে। ফেল করে একই ক্লাসে থেকে গেলে ওর নিজেরই খারাপ লাগবে।”
মা কিন্তু কোন কথা শুনলেন না, বললেন, “বাড়িতে সিমির সঙ্গে আমরা বাংলাতেই কথা বলব। তাতে যদি ওর ইংরেজি শিখতে আরো ছ মাস লাগে তো লাগুক!”
বাড়িতে বাংলাই চলল। মা বলে দিয়েছেন তিন মাসের ক্লাসের পর পরীক্ষার রেজাল্ট জানতে তিনি স্কুলে যাবেন তার আগে নয়। এদিকে সিমি যে ইংলিশ বুঝতে পারে না তা নয়, সে সবই বুঝতে পারে কিন্তু ইংলিশে কথা বলতে তার ভারি লজ্জা লাগে। যদি সে ভুল কিছু বলে ফেলে তাহলে ক্লাসের অন্যরা তার ওপর হাসবে যে সেই ভয়ে। মাঝে মাঝে সিমির ডাক পড়ে মিসেস কুপারের অফিসে। তিনি সিমিকে এটা সেটা জিগ্যেস করেন, সিমি সব বোঝে কিন্তু কোন উত্তর দেয় না। প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে মিসেস কুপার অসন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়েন।
এইভাবেই চলছিল। সিমির মনে বিশ্বাস ঢুকে গিয়েছিল যে সে কোনদিন ইংরেজি বলতে পারবে না আর পরীক্ষায় ফেল করবে। এমন সময় ওদের ক্লাসে দুজন নতুন ছেলেমেয়ে এল, যমজ ভাইবোন আকাশ আর আলো। মিসেস কুপার ওদের ক্লাসে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “এই হল আকাশ আর আলো। এরা তোমাদের ক্লাসে পড়বে। এরা সুদুর বাংলাদেশ থেকে এসেছে এখানে।”
হাসি হাসি মুখ করে আকাশ আর আলো এসে তাদের বেঞ্চে বসল। অঙ্কের ক্লাসে আকাশ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার বাংলায় বলল, “আলোর শরীর খারাপ লাগছে। ও বাড়ি যেতে চাইছে।”
সিমি তাকিয়ে দেখল আলো ফ্যাকাসে মুখ করে বসে রয়েছে।
অঙ্কের টিচার হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বললেন, “তুমি উঠে দাঁড়িয়েছো কেন? বসে পড়ো। অঙ্কগুলো করা শেষ করো।”
আকাশ কিছুই বুঝল না, সে আবার পরিষ্কার বাংলায় বলল, “আলোর শরীর খারাপ, ওকে বাড়ি যেতে দিন!”
সিমি বুঝতে পারল এবার তাকে আকাশ আর টিচার দুজনকেই সাহায্য করতে হবে নাহলে ব্যাপারটা ক্রমশ আরো গোলমেলে হয়ে যাবে। সে উঠে দাঁড়িয়ে টিচারকে ইংরেজিতে বলল, “ও বলতে চাইছে যে ওর বোনের শরীর খারাপ লাগছে। সে বাড়ি যেতে চায়!” আর আকাশকে বলল, “আমি টিচারকে বুঝিয়ে বলেছি। বাংলা উনি বোঝেন না তাই বাংলায় বলে লাভ নেই।”
আকাশ হতাশভাবে বলল, “কিন্তু আমি তো বাংলা ছাড়া কিছুই জানি না!”
সেদিন টিচার আলোর মা-বাবাকে ফোন করে ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। তারপর থেকে সিমি আকাশ আর আলোর দোভাষী হয়ে গেল একরকম। ওদের কথা টিচারদের বুঝিয়ে বলে দিতে হত আর টিচারদের কথা ওদের। ওরা সিমির সঙ্গে ইংরেজির স্পেশাল ক্লাসে এল বটে কিন্তু তারা কিছুই বুঝতে পারে না। সেখনেও দোভাষী সিমিই ওদের ভরসা। এদিকে ওদের কথা অন্যদের বোঝানোর সময় সিমির আর লজ্জা করে না। সে দিব্যি সব কথা গড়গড় করে বলে দিতে পারে। ক্রমে তিন মাস প্রায় শেষ হতে চলল। পরীক্ষা তখনও হয়নি এমন সময় একদিন সিমি বাড়িতে ফিরে মাকে বলল, “মা আগামীকাল তোমাকে আমাদের স্কুলে যেতে হবে টিচার বলে দিয়েছেন। বাবা গেলেও ভাল হয় কিন্তু আমি টিচারকে বলেছি যে বাবার খুব কাজের চাপ এখন ছুটি হয়তো নিতে পারবেন না মোটেই। তখন টিচার বলেছেন তাহলে মাকে অবশ্যই আসতে বোলো।”
মা বললেন, “এখন আবার কেন ডাকছে কিছু বলেছেন? পরীক্ষা তো এখনও হয়নি। আমি তো মিসেস কুপারকে বলে এসেছি যে পরীক্ষা হলে রেজাল্ট জানতে যাব। এখন তো যাওয়ার কোন মানেই হয় না। আবার ওই একই কথা নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর করবেন! আর পারি না।”
সিমি বলল, “কি জানি, বার বার করে বললেন তো তোমাকে যেতে বলতে। দুপুর দুটো নাগাদ বলেছেন। তুমি ওই সময়ই যেও, কেমন?”
পরদিন মা ভয়ে ভয়ে দুটো নাগাদ সিমিদের স্কুলে গিয়ে হাজির হলেন। কী করবেন ভাবছেন এমন সময় মিসেস কুপার কোথা থেকে ছুটে এলেন তাঁকে দেখতে পেয়ে, “এই তো এসে গেছেন দেখছি। তাড়াতাড়ি চলুন। এখুনি অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে! ভাগ্যিস আমি আপনাকে দেখতে পেলাম নাহলে আপনি তো মনে হয় এখানেই দাঁড়িয়ে থেকে যেতেন! চলুন চলুন।”
মা হতভম্ব হয়ে বললেন, “অনুষ্ঠান? কিসের অনুষ্ঠান? সিমি তো অনুষ্ঠানের কথা কিছু বলেনি আমাকে।”
“আরে চলুনই না, ওই কি জানত নাকি যে বলবে,” বলে মিসেস কুপার এক রকম হিড়হিড় করেই মাকে টেনে স্কুলের অডিটোরিয়ামে নিয়ে গেলেন। মা সেখানে গিয়ে দেখলেন হলে বেশ কিছু টিচার আর লোকের জমায়েত। পুলিশ আর দমকলের লোকজন মনে হচ্ছে। স্টেজে একটা বড়ো ব্যানার টাঙ্গানো যাতে লেখা রয়েছে ‘ডু দা রাইট থিং’।
কিছু জিজ্ঞেস করতে পারার আগে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। পুলিশের একজন প্রথমে দুটো কথা বললেন। তাঁর কথাতেই মা বুঝতে পারলেন পুলিশ ডিপার্টমেন্ট আর দমকল বাহিনীর তরফ থেকে স্কুলের যে সব বাচ্চারা অন্যদের সাহায্য করে বা কোন ভালো কাজ করে তাদের ‘ডুইং দা রাইট থিং’ পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথমে ক্লাস এইটের একটা ছেলেকে স্কুলের খেলার মাঠে পড়ে থাকা পঞ্চাশ ডলারের নোট কুড়িয়ে টিচারের কাছে জমা দেওয়ার জন্যে ‘ডুইং দা রাইট থিং’ পুরস্কার দেওয়া হল। এর পরেই ডাকা হল ক্লাস টুর সিমি সেনের নাম (স্মৃতিকণা এরাও বলে উঠতে পারেনি মনে হয়!)! সিমি কী ভাবে ওদের ক্লাসের বাংলাদেশ থেকে আসা দুটো ছেলেমেয়েকে অক্লান্তভাবে সাহায্য করে গেছে সেই কথাই বললেন ওদের টিচার। সিমি পুরস্কার নিতে স্টেজে যখন উঠল তখন মার বুকটা গর্বে ভরে উঠল।
পুলিশের অফিসার যখন সিমির হাতে প্রাইজ দিয়ে ওকে বললেন, “তুমি খুব ভালো কাজ কাজ করেছো তাই এই পুরস্কার তোমার প্রাপ্য!”
সিমি কী বুঝল কে জানে, তবে স্টেজে সবার সামনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলল, “আমি তো পুরস্কার পাওয়ার জন্যে ওদের সাহায্য করিনি, বাংলা আর ইংলিশ দুটো ভাষাই আমার জানা ছিল তাই ওদের সাহায্য করতে পেরেছি। তবে খুব বেশিদিন আর ওদের সাহায্য করতে হবে না। আকাশ আর আলোও খুব তাড়াতাড়ি ইংলিশ শিখে ফেলছে,” বলে সে ফিক করে হেসে ফেলল।
স্টেজ থেকে নেমে সে মাকে দেখতে পেয়ে ছুটে মার কাছে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। মিসেস কুপার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনি মাকে বললেন, “আপনি সেদিন ঠিকই বলেছিলেন। সিমিকে আর কোন পরীক্ষা দিতে হবে না, আমরা দেখেছি ও এখন গড়গড় করেই ইংরেজিতে সব বলতে পারে। তবে ও বাংলাটা জানত বলে আমাদের যে কত সুবিধা হয়েছে সেটা বলে বোঝাতে পারব না। আকাশ আর আলোর মা-বাবা ওর সাহায্যের জন্যে আপনাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে বলেছেন।”
মা হেসে বললেন, “আমি এটা জেনেই খুশি যে সিমি সঠিক কাজটাই করেছে।”