


|| আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে ||
বাঙালির মন--আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা-৭৩; ২০২৬; ISBN: 978-93-88965-56-9
তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও— আমি এই বাংলার পারে
র'য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে
ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে...।
বাঙালির মন!
কোথায় লুকিয়ে থাকে বাঙালির মন, ছড়িয়েই বা থাকে কোথায়?
ছড়িয়ে থাকে এই হেথায় ঐ হোথায়—যেখানে যা ভালোবাসি, যা চাই।
‘মন’ মানেই অন্তর, অন্দর, ভিতর। কিন্তু সেই মনের কার্যধারা প্রকাশিত হয়ে পড়ে বাইরে। আর, তা দিয়েই যায় মনকে চেনা। সেই মনের বহিরাঙ্গের রূপটির রকম হয় নানা। হবেই, হওয়া স্বাভাবিক। শহুরে ধনী মানুষের মনের ধারা আর গ্রামের এক দরিদ্র কৃষকের মন তো একই খাতে বইতে পারে না, যেমন, এক শিক্ষকের মন আর এক বণিকের বা, এক বনেদী উচ্চবিত্তের মন ও এক উদ্বাস্তু মানুষের মন একই খাতে বইতে পারে না।
বেশ। কিন্তু এমনটা তো সকল দেশে/রাজ্যেই ঘটবে। এতে বাঙালির বিশেষত্ব কী?
আছে।
কারণ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিক থেকে এই বঙ্গদেশেই শুরু হয়েছিল নবজাগরণের হাওয়া—তার চরিত্র আসলে যা-ই হয়ে থাকুক না কেন। তার ফলেই এক নব্য-শিক্ষিত শ্রেণীর জন্ম, ‘বাবু’ বা ‘ভদ্রলোক’-এর জন্ম। এখানেই নব্য-রাজনীতির হাওয়া, সে থেকে চরমপন্থা!
তাই এই গ্রন্থে ‘বাঙালির মন’ খুঁজতে লেখক উঁকি দেন যেমন ‘ভদ্রলোকের মন’-এ, তেমনি ‘দলিতের মনে’ বা ‘উদ্বাস্তুর মনে’। এঁদের এঁদের মন একই আলপথ ধরে চলে না ।
মনের এত বিচিত্রধারা গতি ভারতের অন্য আর কোন্ রাজ্যবাসীর মধ্যে পাওয়া যাবে?
‘কালচারাল অ্যান্থ্রপোলজি’-র জনক এডওয়ার্ড টেলর সাহেব এদিকে আবার
‘সংস্কৃতি’-র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প ও নীতির এক জটিল সমষ্টি হল কালচার’!
বোঝ!
‘মন’ এর বাহিরে তো নয়।
বাঙালির মন! বিশেষত, বছর দশেক আগে আলাপন যখন তাঁর পূর্ববর্তী গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘…বঙ্গভূমির উচ্চবর্গীয় হিন্দু পুরুষ ভদ্রলোকের ক্রমিক সংকটবোধ এবং…ক্রমবর্ধমান হীনতা-অনুভূতি…’ (‘আমলার মন’, দে’জ, ২০১৬ )—বর্তমান গ্রন্থটির গাওনাটা যেন তখনই গাওয়া হয়ে গিয়েছিল, যার প্রতিধ্বনি পাই বর্তমান গ্রন্থের দীর্ঘতম বা শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধটির মধ্যে (‘ভদ্রলোকের সংকট’)।
***
এ’গ্রন্থের ভাঁজে ভাঁজে ‘বাঙালির মন’-এর ইতিউতি আনাগোনার নানান পরত খুলে যায়।
যেমন ধরুন, আইকনিক বাঙালি প্রেমিক দেবদাস, বা ঘরের পাশের অপরাজিত অপু, বা বাঙালির নিজের রামকৃষ্ণ মিশন বা প্রেসিডেন্সির প্রবাদপ্রতিম অধ্যক্ষ অমলকুমার মুখোপাধ্যায়!
গ্রন্থের উনিশখানি প্রবন্ধের এক-এক করে আলোচনার তো সুযোগ নেই এখানে, মুগ্ধতাটা আছে। তাই প্রণব বর্ধনের আত্মচরিত ‘চরৈবেতি’-র আলোচনা-শেষে আলাপন যখন লেখেন, ‘অমূল্য সব স্মৃতি, কিন্তু বিষাদের বার্তাবহ’—তখন ফের তাকিয়ে দেখি বইটির শীর্ষনামেঃ ‘বাঙালির মন’—আজকের বাঙলি-মনের অব্যক্ত বেদনার কথাই যেন বলে গেছেন লেখক সারাটা বই জুড়ে। যদিও তারই মাঝে আশার আলো দেখেন দলিত-সাহিত্যোৎসবের আলোচনায়—যেখানে পান এক বৈপ্লবিক দিশা।
আচ্ছা, একবার প্রচ্ছদের ঐ চিত্রটি দেখুন তো (শিল্পীঃ রঞ্জন দত্ত)।
বাঙালিবাবু এমন ধুতির উপরে কালো কোট গত একশ’ বছরের মধ্যে পরেনি (কাঁধে সাদা চাদর আবার)। আর মুখের ঐ গোবেচারা ভাব—যেন কিপলিঙের ‘কিম্’ উপন্যাসের হরিবাবু! ছবিটি বড়ই ব্যঞ্জনাময় হয়েছে, কারণ এ’গ্রন্থের মূল সুরে একটা হাহাকার একটা না-প্রাপ্তি একটা ‘গেল-গেল’ ভাব যেন জড়িয়ে আছে, যেটা আজকের বাঙালির ছবি। ‘মন’ তো তাই খারাপ হবেই।
প্রচ্ছদচিত্রখানি তাই গ্রন্থের সঠিক প্রতিচ্ছবি।
কিছুদিন আগে কলকাতার এক ডিবেটিং সোসাইটিতে বিতর্ক হয়ে গেলঃ ‘Bengal lives in its past!’ শেষে ধ্বনিভোটে মোশনটিই জয়ী হয়েছিল। আর আমরা বিশেষ উৎসাহে বইটির শেষ প্রবন্ধটি পড়তে বসলাম—‘ভাষার মন’!
নায়কের মন, উদ্বাস্তুর মন, নারীর মন তো বুঝলাম, তা বলে ‘ভাষার মন’?
অতি উপাদেয় লেখা এটি। কয়েক বছর আগে প্রবাদপ্রতিম ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি কলকাতায় এলে গঙ্গাবক্ষে তাঁকে নিয়ে নৌ-বিচরণ করেছিলেন লেখক, যখন শুধান, ‘বাংলাভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে ইতিহাস থেকে কী শিক্ষা নেওয়া যায়?’
উত্তরটা?
পড়ে নেবেন। বলে দিয়ে স্পয়লার করব না।
***
গ্রন্থপাঠ শেষে তবে কী নিয়ে ঘরে ফিরব?
কবিতা-উপন্যাস-দর্শন ইতিহাসের পাতায় পাতায় অনায়াস বিচরণ লেখকের, বিন্দুতে তাই সিন্ধুদর্শন হয়ে যায় দুই মলাটের মধ্যে। রবীন্দ্রকুমার-অশীন-অশোকমিত্রের যা ধারা বাংলা-প্রবন্ধ রচনার তার বর্তমান ধারক আলাপন। ওঁকে পড়া তাই কালে ভ্রমণ—টাইম-ট্রাভেল।
শেষাবধি বাঙালির মনের হদিশ খুঁজে খুঁজে তাই ফিরে যাই অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্নদামঙ্গল কাব্যে, যেখানে দেবী অন্নপূর্ণার নিকট দরিদ্র ঈশ্বরী পাটনীর সেই অজর প্রার্থনা, …. ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।’
বাঙালির মনে এর চাইতে পরম আকাঙ্ক্ষা আর কী থাকতে পারে?
‘আবহমান’ এই বাংলার ধারাটি বেয়ে আজকের বাঙালি কবি নীরেন্দ্রর কলম তাই সচল…
কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে,
এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালবাসে।
ফুরয় না তার কিছুই ফুরয় না,
নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না!
|| বাঙালি মনীষার সার্থক দলিল ||
বারোমাস—নির্বাচিত সংকলন (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড); সম্পাদনাঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও রুশতী সেন; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা ৭৩; ২০১৯ ও ২০২৩; ISBN 978-93-89377-81-1, 978-81-19033-02-7
আমাদের কলেজীকালে এক রেফারেন্স-বুক হিসেবে যখন অধ্যা. অশোক সেনের ‘Vidyasagar & his elusive milestones’ পড়তে বলা হয়েছিল, মুগ্ধপাঠ শেষেও জানতামই না যে উনি আসলে একজন অর্থশাস্ত্রী, ইতিহাসবিদ্ নন।
আর, কলেজ থেকে বেরোতে-না-বেরোতে পাতিরামের স্টলে এক রঙচঙে পত্রিকার শারদসংখ্যায় দেখি পদ্মফুল আর স্বস্তিকা আঁকা, শিল্পী গণেশ পাইন। জানা গেল, সেটি একটি বামপন্থী পত্রিকা, নাম ‘বারোমাস’ ! সম্পাদকঃ অশোক সেন!
বামপন্থী পত্রিকা, কিন্তু ফেস্টুন-তোলা বাম নয়।
বস্তুতঃ, গোড়া থেকেই তাঁর ‘বারোমাস’ পত্রিকার এই না-বাম-না-ডান চরিত্রটিকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন অধ্যা. সেন, যাঁকে অনেকে সমর সেনের পরেই শ্রেষ্ঠ বামপন্থী-সম্পাদক বলেছেন। ‘বারোমাস’-এর লেখক-তালিকায় যদিও বামপন্থীদেরই রমরমা থাকত, যেমন সুশোভন সরকার, বিপ্লব দাশগুপ্ত, মণিকুন্তলা সেন, রণবীর সমাদ্দার। আবার, ভবতোষ দত্ত, দীপেশ চক্রবর্তী, স্বপন বসুর মতো পরিচিত অ-বামও ছিলেন। এখানেই এক পত্রিকা হিসেবে ছিল ‘বারোমাস’-এর জয়।
পত্রিকাটির পথচলা যদিও আরও আগে থেকে।
১৯৭৮-৮৩—প্রথম এই পাঁচ বছরে একটি মাসিক পত্রিকা হিসেবে চলে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায় ‘বারোমাস’। মনে রাখতে হবে তখনই কিন্তু সমগোত্রীয় পত্রিকা হিসেবে ‘এক্ষণ’, ‘অনীক’ বা ‘অনুষ্টুপ’ পড়ছে বাঙালি। তবু বারোমাসের একটা নিজস্ব জায়গা ছিল। ১৯৮৪-র ঐ শারদীয় সংখ্যাটি থেকে ১৯৯৮—এই পনেরো বছর এক ষাণ্মাসিক পত্রিকা হিসেবে চলে বারোমাস, তারপর ২০১৫-তে অশোকবাবুর প্রয়াণ পর্যন্ত সতেরো বছর বাৎসরিক হিসেবে।
এই সকল সংখ্যাগুলির এক নির্যাস হিসেবে ‘বারোমাস—নির্বাচিত সংকলন’ বেরোয় ২০১৯-এর ডিসেম্বরে, তারই দ্বিতীয় খণ্ড জানুয়ারি ২০২৩-এ—যে দুটি খণ্ড নিয়েই এখন লিখতে বসেছি।
সাড়ে পাঁচশ’--সাড়ে পাঁচশ’ পৃষ্ঠার দুটি পৃথুলা খণ্ড ব্যেপে পাঠকের ধৈর্যকে ধরে রাখা সোজা কাজ নয়। তার জন্যে প্রবন্ধগুলির গুণ যেমন একটা বিষয়, চয়ন ও বিন্যাসও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ’সম্বন্ধে একটি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন অধ্যাপিকা রুশতী সেন ( সংকলনটির অন্যতম সম্পাদক)—‘যত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধই হোক্ না কেন তা যদি প্রাবন্ধিকের নিজস্ব বইতে ইতোমধ্যে গ্রন্থিত হয়ে থাকে তবে তা বর্তমান সংকলনটিতে স্থান পাবে না।’ এতে সম্পাদকদ্বয়ের কাজটা কঠিন হয়ে পড়লেও পাঠককে বঞ্চিত করা হবে না—তিনি আগে-পড়া কোনো লেখার সম্মুখীন হবেন না পুনরায় এখানে।
***
একটা ছড়া শুনুনঃ
“ভোট দাঁতে কি চোট লেগেছে / চোখে ছানির পর্দা? / এক মাত্রায় সেবন করুন কং-কেসরী জর্দা।…” (নববর্ষ সংখ্যা, ১৯৯৭ )
বা, আরেকটাঃ
“দে মা আমায় প্রমোটারি। / লুটে তামাম জনে, পরের ধনে চুটিয়ে করব বাবুগিরি…” (শারদীয়, ১৯৯৫ )
না না পাঠক, এটা হুতোমের নক্সা নয়, প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়-কৃত ‘সম্পাদকীয়-ছড়া’, যেটি ছিল বারোমাস পত্রিকার বিশেষত্ব। বিশেষত্ব বৈ কি? নৈলে একটি গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ-পত্রিকার শুরু কি এমন ‘চটুল’ ছড়া দিয়ে হতে পারে?
আরও ছিল। খেলাধুলা বিষয়ে সুচিন্তিত প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে—জানা গেল পার্থ-কৃত দীর্ঘ মুখবন্ধটিতে, কিন্তু ফুটবলার সুকুমার সমাজপতির সেই লেখাটা এই সংকলনে নেই।
সঙ্গীত-নাটক-চলচ্চিত্রের উপরে লিখেছিলেন সন্জীদা খাতুন, রাজ্যেশ্বর মিত্র, ডিবি স্যর দীপক বন্দ্যোপাধ্যায় (তাঁর প্রিয় আমীর খানকে নিয়ে)। সেগুলি এখানে ফিরে পড়তে পাওয়া যথেষ্ট উপভোগ্য।
রঙীন প্রচ্ছদ ও ভিতরের অলংকরণ ছিল ‘বারোমাস’-এর একটা বড় আকর্ষণ। সত্যজিৎ রায়, রামকিঙ্কর, সোমনাথ হোড়, পরিতোষ সেন, গণেশ পাইনের মতো শিল্পী এঁকেছেন এখানে। তেমন বেশ কিছু রঙীন প্রচ্ছদ দেখতে পাই এই সংকলনে।
মূলতঃ প্রবন্ধ-পত্রিকা হলেও প্রথমদিকে কবিতা ও উপন্যাসও ছাপা হয়েছে বারোমাসে। বিষ্ণু-নীরেন-শঙ্খ-শক্তি—কে না লিখেছেন এখানে? অসীম রায়, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসও বেরিয়েছিল। যদিও সেগুলি নেই এই সংকলন দুটিতে।
‘বারোমাস’-সংকলনের তৃতীয় খণ্ডও শীঘ্রই আসতে চলেছে, জানা গেল। সেখানকার বিশেষ আকর্ষণ হবে প্রথম কুড়ি বছরের প্রতিটি সংখ্যার সূচিপত্র।
স্বাগতম্।
|| ‘…ঐখানেতে হৃদয় আমার গেছে চুরি’ ||
সাকিন বিষ্ণুপুর—কৌশিক বাজারী; বিদুর প্রকাশনা, বাদকুল্লা, নদিয়া ৭৪১১২১; ২০২৫; ISBN: 978-93-95072-91-5
যারা ছিল অক্ষরহীন আর অক্ষরহীনা/ যারা হাঁড়িয়ার ঘোর-চোখে স্বরচিত তুষু গাইতো কোমর দুলিয়ে— এ’ কাব্যসংগ্রহ তাঁদের তরে উৎসর্গ করা।
তারা কারা আর কে করল এ’ উৎসর্গ?
তাদের খুঁজি ‘অন্য পথে—হারিয়েছে যা পায়ের তলায়/ সেখেনেও হেঁটে ফিরছে অন্য কেউ, অন্য কুনু জন/ অন্য অন্য স্বপ্নের ভিতরে…’
হ্যাঁ, ‘এ’ জন্মের শেষ পথে একদিন ফিরে পাবে বলে তার ঘর….’
সে ঘর তারা ফিরে পেয়েছিল নাকি পথে পথেই ঘোরা সার?
সেটা জানতে খুঁজে খুঁজে ফিরি এই তন্বী মায়া-কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায়। কখনও ‘এই পথে বহুবার ফিরে পাওয়া ঘর—তবু পুরানঅ সংশয় লিয়ে খানিকটা হেঁটে এসে দেখি—এবারেও রাস্তা শেষ!’ কখনও বা ‘একটি জীবন তেবু আরেক জীবন থেকে আলাদা রকম। গাছে গাছে ধুলা জমে, ঝরে পড়ে, উড়ে যায়/ অন্য এক জীবনের শীতকালে…’
***
অজানা-উদাস-অনামা কবি কৌশিক বাজারী থাকেন জিলা বাঁকুড়া। কাব্যগ্রন্থটির নামেই তার স্বীকারোক্তিঃ ‘সাকিন বিষ্ণুপুর’! আর লেখেন বাঁকুড়ার মাটির ভাষায়। শহর কলিকাতার বাবুকুল আমরা ওঁকে চিনিনি-জানিনি-পড়িনি যতক্ষণ না বইমেলায় অদ্ভুত এক প্রচ্ছদচিত্র দেখে হাতে তুলে নেওয়া বইখানি। গুগুল-ম্যাপ থেকে তোলা এ’ প্রচ্ছদচিত্রে রয়েছে বাংলায় হস্তলিখন: ‘জল কম, বালি ভরা নদ’, বা ‘দক্ষিণে যমের দুয়ার’, বা শুধুই ‘অবন্তিকা’!
টেরাকোটা মন্দিরের এই দেশেই বঙ্গদেশের একমাত্র ধ্রুপদী-সঙ্গীতের ঘর—বিষ্ণুপুর!
তবু মেইনস্ট্রিম বঙ্গীয় কবিকুলে কল্কে পায় না ‘আদিবাসী’ বাঁকড়ো।
***
চল্লিশ বছর আগে আমাদের ছাত্রাবস্থায় মানভূমির বর্ষীয়ান কবি অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের (১৯৩০-২০১২) ‘আমি বাঘজুড়ি গায়ের ভুজুং মাঝি, বাবু…’ পড়ে মথিত হয়েছিলাম (কবিতাঃ ‘পনেরই আগস্টের গল্প’) ।
আবার ঐ ‘স্বাধীনতা’-র কবিতাই লেখেন বাঁকুড়ার আজকের কবি দেবব্রত সিংহঃ
কথাটা ত মিছা লয়
লালগড়ের জঙ্গলমহলের সবাই জানে…
দিনের বেলা পুলিশ
রাতের বেলা উয়ারা,
পুলিশ বলে
স্বাধীনতা!
রক্ত গরম হয়ে ওঠে। বুঝি, সেই কলোনিকালের থেকে এখানকার ভূমিনিবাসীদের উপরে যে অত্যাচার আজকেও চলেছে তার বহিঃপ্রকাশ এখানকার কবিতায়।
পাশাপাশি এখানে পড়ি কৌশিকের কলমে অমন হাহাকার!
ছ্যেলাটার লাশ কোলে জিতেনের ই’পক্ষের বৌ
শাপশাপান্ত শেষে মুখখারাপ করে,
তার রাগী চোখে চোখ পড়তেই
অসহায় চক্ষু দুটি মুজে ফ্যালে গাঁইয়া মহাকাল!
সূর্য নিভে যায়!!
***
নেই কোনো শিরোনাম কোনো কবিতার। নেই কোনো সূচিপত্র। শুরুতে স্বপরিচিতির ছলে না-পদ্য-না-গদ্য ঢঙে লেখেন,
“যে ডিহির উলটাবাগে সূর্যাস্ত নেমেছে/ দেখতে দেখতে সইন্ধ্যা নেমে আসে/ তার নাম সুদূর বাগান!”
আর তারই শেষদিকপানে—
যে ব্যথায় পরিচয় লেখি সেঅ বাঁকড়িপরিচয়
শ্রীহীন কৌশিক বাজারী আমি…
যেন সপ্তদশ শতাব্দীর এক ধর্মমঙ্গলকাব্যকারের ভনিতা পড়ছি। তিনিও ছিলেন এ’তল্লাটেরই। নাম তাঁর খেলারাম। খেলারাম চক্রবর্তী।
জানি না আরও কত ‘কৌশিক বাজারী’ না লুকিয়ে আছেন কোন্ গ্রাম-বাংলায় বা আরও দূরে অন্য প্রদেশে। তবু তো বুকের কাছাকাছি।
বুড়ো বয়সে এসে ভাগ্যিস পড়লাম এ’ কাব্যগ্রন্থ!
প্রিয় এক দীর্ঘকবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করিঃ
আশ্চর্য তেজের ভাব জ্বলে ওঠে চোখে,
এই আদিবাসী গাঁয়ে স্তব্ধ ছায়ালোকে।
দুঃসহ বেদনা নিয়ে জীবন ধারণ,
টাঙ্গি আর ধনুঃশর সে কি অকারণ?‘জঙ্গলমহল’ । কবি শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়
|| চণ্ডীমঙ্গল ও ফুটবল যেথায় একসাথে মিশে গেছে ||
চণ্ডীতলার ইতিবৃত্ত (১ম খণ্ড); তপন কুমার দাস; রাজতিলক পাবলিকেশন, হুগলি- ৭১২৩০৪; ২০২৩; ISBN নেই
জগৎ জননী তুমি চণ্ডী মহামায়া।
ভক্তের দুঃখ ঘুচাও, দাও অভয় দায়া॥
সেই ষোড়শ শতাব্দী থেকে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’-কাব্যে মজে আছে বাঙালি। সারাভারতে ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর চণ্ডীদেবী চণ্ড ও মুণ্ড নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার জন্যে পূজ্য হয়ে থাকলেও বঙ্গদেশে উনি মা অভয়া! প্রাণের বড় কাছের! তাই পাঞ্জাবের রাজধানী মায়ের নামে নামাঙ্কিত হলেও আমাদের ঘরের কাছের ‘চণ্ডীতলা’ গ্রামে ‘বাঁশবাগানের পাশটি দিয়ে পাড়ার পথটি বাঁকা’!
বর্তমান বইটি সেখানকারই লোকাল-হিস্ট্রি।
***
ইতিহাস কার নেই?
সে তো এই হাতের কলমটির আছে, আছে পড়ার টেবিলটার বা ঐ যে দূরে দেখা যায় শিরীষগাছটির।
৭৬-তম সংখ্যায় আমরা ব্যারাকপুরের একটি বটগাছের ইতিহাসের উপরে লেখা অসামান্য পিকটোরিয়াল-বুকটির কথা পড়েছিলাম (https://www.parabaas.com/article.php?id=2908)। আর, গত সংখ্যায় সরস্বতী নদীতীরের ‘সাতগাঁ’-র উপরে গেম-চেঞ্জিং উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে পড়েছিল ঐ নদীতীরের আরেক প্রাচীন বন্দরগ্রামের কথাঃ ‘বাকসা’, যা এসেছে পর্তুগীজ ‘বয়া’ (Buxa) শব্দটি থেকে। ‘বাকসা’ এই চণ্ডীতলা-অঞ্চলের এক প্রধান গ্রাম, যা ফুটবলের জন্যে বিখ্যাত।
আরেক বিখ্যাতি আছে, সেটা ‘জনাই’-এর নিকুতি ও মনোহরা নামক জিভে-জল-আনা মিষ্টান্নের জন্য। জনাই হল বাকসার পাশের গ্রাম, ঐ বিলুপ্তপ্রায় সরস্বতী নদীতীরেই। তার ও’পাশেই পান ও তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত বেগমপুর গ্রাম, যেখানে ছিল ‘ভারতবর্ষ’-খ্যাত এস. ওয়াজেদ আলি সাহেবের আদিনিবাস (‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে!!’)।
এ’তিন অঞ্চল নিয়ে এই বই।
এ’অঞলের আর তিন প্রখ্যাতজনের কথা গোড়াতেই বলে দিইঃ বাকসা হলো হুতোমপ্যাঁচা কালীপ্রসন্ন সিংগীর আদিবাস; বেগমপুরে আশাপূর্ণাদেবীর পিত্রালয় ও কাছেই কলাছড়ায় শম্ভু মিত্রের।
যদিও শুধু বিখ্যাত মানুষজন নিয়েই তো আর লোকাল-হিস্ট্রি লেখা যায় না।
***
ইতিহাস কিন্তু কেবলই রাজাগজার কাহানী নয়, না কেবল সঙ্ঘবদ্ধ মুষ্টি আস্ফালনের। ১৯২০-র দশক থেকে অস্ট্রিয়াতে স্থান-ইতিহাসের (local history) চর্চা শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়, নাৎসি জার্মানীতে যদিও সেটা আর্যরক্ত খোঁজার ফ্যামিলি-হিস্ট্রিতে বদলে যায়।
বর্তমান গ্রন্থের লেখক, অবশ্য, তেমন সব দেশবিদেশের বড়সড় কাজকারবারের মধ্যে ঢোকেননি। অতি তন্নিষ্ঠভাবে এবং বহুক্ষেত্রে পদব্রজে ও গ্রামে গ্রামে সাইকেল চড়ে তিনি মাটির ইতিহাস লিখে গেছেন। সেখানে তিনি এই চণ্ডীতলা অঞ্চলের ইতিহাস, ভূগোল, জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও খেলাধুলা, মন্দির-মসজিদ, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা… ইত্যাদি ইত্যাদি কোন্ কোন্ দিক না ছুঁয়েছেন? চারশত পৃষ্ঠাব্যাপী এত খুঁটিয়ে কাজ—বড়ই সম্ভ্রম জাগায়—বর্ষীয়ান মানুষটির নিবেদিতপ্রাণতা দেখে। জানা গেল, পেশায় স্কুলশিক্ষক ছিলেন তপনবাবু, এখন সেবানিবৃত। সমান পৃথুলা বইটির দ্বিতীয় খণ্ডটিও প্রকাশিত, আমি যদিও পড়িনি এখনও।
হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি এ’অঞ্চলের এক অহংকার। প্রখ্যাত ফুরফুরা শরীফ এ’অঞ্চলেই অবস্থিত, যার প্রতিষ্ঠা চতুর্দশ শতকে। ঐ সময়েই বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ্ তাঁর এক পত্নীর উদ্দেশে বেগমপুর গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন।
অনেক অনেক এনিকডোট ও অজানা তথ্যে ভরা এ’ বই। যেমন, বিপ্লবী কানাইলাল দত্তের আদিনিবাস ছিল এই বেগমপুরের কাছে খরসরাই গ্রামে। জনাই ট্রেনিং হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েরও পূর্বে, সন ১৮৫২ খৃ., এবং জনাই লাইব্রেরির (প্র. ১৮৯৫) প্রতিষ্ঠায় মস্ত দান ছিল পাশের বেগমপুর গ্রামের এস. ওয়াজেদ আলি সাহেবের, প্রখ্যাতা সাঁতারু ও ভারতসুন্দরী নাফিসা আলি যাঁর পৌত্রী। এঁরা নামী শিয়া পরিবার—ইসনা আশারিয়া (টুয়েলভার)। ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনে একটাই চাকুরি করেছিলেনঃ বেগমপুরের কাছেই ‘বড়া’ গ্রামের মধুসূদন উচ্চবিদ্যালয়ের গণিতশিক্ষক। কয়েক বছর মাত্র। বাংলা হরফের জনক পঞ্চানন কর্মকার এ’গ্রামেরই।
স্বাধীনভারতের প্রথম বাঙালি অর্থমন্ত্রী ব্যারিস্টার শচীন চৌধুরী ছিলেন বাকসা গ্রামের সন্তান। এমন কত কত গল্প।
কিছু গল্প আবার লেখা থাকে না। গোপন।
পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পরে সিরাজউদ্দৌল্লার সেনাপতি কাশ্মীরি মোহনলাল নবাবের শিশুপুত্রের প্রাণ বাঁচাতে তাকে নিয়ে গোপনে কোথাও পালিয়ে যান। সেটি, পরে জানা যায়, উত্তরবঙ্গের গৌরীপুরের জমিদার রায়চৌধুরীদের বাড়ি। তাকে সেখানে গচ্ছিত রেখে মোহনলাল আবার উধাও হন। এ’অঞ্চলের ওরাল-হিস্ট্রি বলে, এক শিখাধারী ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে কায়স্থ-মোহনলাল জনাইএর জমিদারদের আশ্রয়ে লুকিয়ে ছিলেন বেশ কিছু দিন। পরে ফের কালনা বা গুপ্তিপাড়ার দিকে পালিয়ে যান। জনাই-বাজারের সন্নিকটে ‘সুবেদার মোড়’ নাকি সেই স্মৃতিই ধারণ করে চলেছে।
***
এ’হেন স্থানিক-ইতিহাসের চর্চাকে সাধুবাদ ও স্বাগত জানাই।