• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • বিদা মরেনি بدا نہیں مری : জ়কিয়া মশহদি
    translated from Urdu to Bengali by শুভময় রায়

    [মূল উর্দু গল্পের শিরোনাম ‘বিদা নহিঁ মরি’ (بدا نہیں مری)। পড়তে পেলাম নতুন দিল্লির অঞ্জুমন তরক্কি উর্দু হিন্দ কর্তৃক প্রকাশিত জ়কিয়া মশহদির গল্প সংকলন ‘তারিক রাহোঁ কে মুসাফির’ (تاریک راہوں کے مسافر) [পৃ ৭৩–৮৪] -এ। এ গল্পের অনুবাদ প্রকাশের অনুমতি দেওয়ার জন্য আমি লেখিকার কাছে কৃতজ্ঞ। তাঁর স্নেহের উপহার হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল বইটি। - অনুবাদক]

    ‘ইমলি কে পত্তা, নওয়া নওয়া পত্তা, খাড়া রহো বেটা, দল্লে ছু, দল্লে ছু, দল্লে ছু...’

    কমবখতগুলোকে গুনে দেখলে কয়েক ডজন হবে, কবাডি খেলার আওয়াজ যা জুড়েছে কেয়ামতের দিন যেন আসন্ন। বিপক্ষের কোনও এক খেলোয়াড় পাকড়াও হলে শোরগোল আরও বেড়ে যায় – হো...হো...হো!

    নভেম্বরের হিমেল হাওয়া যেন এই শোরগোলকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকে এল। তাওয়ার ওপর পাতলা করে বেলা চাপাটি বেলুনের মত ফুলে উঠতেই চিমটে দিয়ে সেটা নামাতে নামাতে আম্মা বিড়বিড় করে উঠলেন, ‘এরা বাঘের চর্বি খেয়ে এই ঠাণ্ডার মধ্যে কবাডি খেলছে নাকি? আর দেখো, এদের বাপ মায়েরও কোনও চিন্তা নেই।’

    সুফিয়া হি-হি করে হেসে উঠল, সকলের জন্য দুশ্চিন্তায় আম্মাই পাগল হয়। নিজের ছেলেমেয়েদের তো খাঁচার মুরগির মত ঘরে বন্ধ করে রেখেছেন। অন্যদেরও কি তাঁর দর্শন মানতে হবে?

    ‘কী হি-হি করে হাসছিস?’ আম্মা এবার সত্যিই রেগে গেলেন। এক ঝুড়ি শাক পড়ে আছে ধোওয়ার জন্য, আজ রান্নার দেরি হয়ে গেল। সুফিয়া শাকের ডালাটা কাছে টেনে নিল। উনুনের তাপটা মন্দ লাগছে না।

    হঠাৎই যেন ভূমিকম্প শুরু হল, সিঁড়ি দিয়ে বিদা ধপ ধপ আওয়াজ করে উঠতে উঠতে চেঁচাচ্ছে – ‘আরে সপ্‌হো, সপ্‌হো রানি হো...’

    সুফিয়ার এই ‘সপ্‌হো’ শুনলেই রাগ হয়। কতবার যে সে বিদার উচ্চারণ শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কমবখতটার মুখ থেকে কখনও কি ‘ফ’ এর ঠিক আওয়াজটা বেরিয়েছে? আর তাতেই বা কী? মেয়েটার নিজের নামটাও যে আসলে ‘বিদ্যা’ সেটাও মহল্লার দু-চার জনই জানে। ওর ঘরের লোকেরাও তো ওকে ‘বিদা’ বলেই ডাকে। ওই দু-চারজনের মধ্যে অবশ্য সেই পণ্ডিতজিও আছেন যিনি ওর নাম রেখেছিলেন। আর সকলের কাছে সে শুধুই ‘বিদা’।

    এই ‘সপ্‌হো...সপ্‌হো’ শুনলেই সুফিয়ার রক্ত রাগে টগবগ করে ফোটে। বিদা ততক্ষণে উপরে উঠে এসেছে। গোলগাল ধবধবে ফর্সা, হাতভর্তি চুড়ি, সিঁথিতে চওড়া করে দেওয়া সিঁদুর। বয়েস মাত্র চোদ্দ, সুফিয়ার চেয়ে বছর খানেকেরই বড়। বিয়ে হয়েছে তাও বছর পূর্ণ হয়ে গেল। এবারে লগ্ন দেখে তার ‘গোনাও’ (*) হয়ে যাবে, স্বামীর সঙ্গে ঘর করতে চলে যাবে সে।

    ‘কীরে, এবারে পুতুলের ঘর সাজাবি না?’ হাঁপাতে হাঁপাতে ঘুঙুরের ছমছম আওয়াজ তুলে বিদা শুধোয় – ‘কাল ধনতেরস, পরশু দেওয়ালি...’

    ‘আরে সে কাল সাজাব,’ সুফিয়া উচ্ছ্বাস আর আনন্দ চেপে রেখে আড়চোখে মায়ের দিকে চায়, আর তাড়াহুড়োয় হড়বড় করতে করতে বেছে রাখা শাকের মধ্যে কিছু ডাঁটার টুকরোও মিশিয়ে ফেলে।

    বিদার মধ্যে বেশ একটা বয়েসে বড় আর বিয়ে-হওয়া মেয়ের ভাব থাকায় সে সুফিয়ার সব কাজে ভুল ধরার চেষ্টা করে, উপদেশও দেয়। সে ধপ করে রান্নাঘরের মেঝেতে বসেই সুফিয়ার বেছে রাখা শাক থেকে দু-একটা ডাঁটা তুলে ফেলে দিল।

    ‘আরে সব ঘেঁটে ঘুঁটে নরম হয়ে যাবে, দু-একটা যদি থেকেই যায় তা হলেও কী এমন মহাপাপ হবে?’ সুফিয়া বিরক্ত।

    ‘হ্যাঁ, তা তো ঠিক! বকরির হাত-পাও রান্না করলে নরম হয়ে যাওয়ার পরেই তো তুই সেগুলো খাস। শাক এমন ভাবে বাছে না, এটাও শিখতে হয়!’

    বিদ্যা প্রায়ই সুফিয়াকে ছাগলের হাত-পা খাওয়ার জন্য খোঁটা দেয়। সে জানে বকরির ঠ্যাঙের ঝোল সুফিয়ার ভারি পছন্দ।

    আম্মা হাসতে লাগলেন। ‘সুফিয়াটা বড়ই অগোছালো। আলু কাটতে বসলে খোসা মোটা মোটা করে কেটে অর্ধেক আলুই ফেলে দেয়। ওকে একটু কিছু শিখিয়ে দে বিদা, তুই তো ভারি কাজের মেয়ে।’

    বিদার কাজল লেপা চোখদুটিতে দুষ্টুমির আভাস। সে সুফিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে মিনিটের মধ্যে এক ঝুড়ি শাক বেছে আম্মার দিকে এগিয়ে দিল। তারপর খাড়া হয়ে উঠে দাঁড়াতেই আম্মা বললেন, ‘জিতি রহো! সুফিয়া হলে তো এখন ঘণ্টাভর এই শাক বাছত।’ শুনে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সুফিয়া ঠিক করেছিল যে পুতুলের ঘর সাজাতে সে হারগিস যাবে না। তা সত্ত্বেও পরদিনই দরজায় বিদার ‘সপ্‌হো’ ডাক শুনতে পেয়েই তীরের বেগে উঠে সখীর ডাকে সাড়া দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

    চুনকাম করা লেপাপোঁছা দোতলা পুতুলের ঘরটা বিদাদের বাড়ির রাস্তার ধারের বারান্দায় সাজানো ছিল। অতি যত্নে সুফিয়া আলাদা আলাদা রঙের বাটিতে রং গুলে নিল। বিদা মাটির খেলনাগুলোর মধ্য থেকে মাটির থালা বার করে থালা ভর্তি পেঁড়া নিয়ে এল। পেঁড়া সুফিয়ার ভারি পছন্দের জিনিস হলেও পুতুলঘর সাজানোর জন্য তাকে কোনও ঘুষ দেওয়ার দরকারই ছিল না। ড্রইংয়ে তার খোদা-প্রদত্ত ক্ষমতা আর দক্ষতা। মিনিটের মধ্যে দেব-দেবী, পদ্মফুল, রাজহাঁস, উদীয়মান সূর্য, লতাপাতা আর পাখির ছবিতে পুতুলের ঘরটা সেজে উঠল -- এবারও বিদার ঘরই মহল্লার সবচেয়ে জমকালো সুন্দর পুতুলের ঘর বলে সবাই মেনে নিল।

    ‘জিও মেরি সপ্‌হো,’ বিদা সুফিয়াকে জড়িয়ে ধরে চোখ মারল। ‘দেওয়ালি হয়ে গেলে চিঠি লেখাতে তোর কাছে আসব কিন্তু।’ ‘সপ্‌হো’ বলে ডাকা ছাড়াও বিদার তার দিকে চোখ মারাটা সুফিয়ার ভালো লাগল না। সে রেগেমেগে বলল, ‘কালুকে দিয়ে লেখাস না কেন? এখন তো সে ক্লাস সেভেনে পড়ে। আরামসে লিখে দেবে।’

    ‘আরি এ বেশরম, ভাইকে দিয়ে নতুন বউয়ের চিঠি লেখানো যায়?’

    এই চিঠি লেখার ব্যাপারটা নিয়ে বড় একটা গণ্ডগোল ছিল। ক্লাস ফাইভের পরে বিদাকে স্কুল ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপরে ঘরে যেটুকু পড়াশোনা তাও তো সব ভুলে মেরে দিয়েছে। ছেলে ম্যাট্রিক পাস, উপরন্তু শৌখিন রোম্যান্টিক মেজাজের। বিবিকে বেশ রংদার চিঠি লিখত যেমন, তেমনই জবাবও আশা করত। বিদার চিঠি লিখতে শুধু যে সময় লাগত তাই নয়, ভুলও হত গাদা গাদা। তাই সে আঁচলের গিঁটে চিঠির কাগজটা বেঁধে নিয়ে সুফিয়ার কাছে চলে আসত। সুফিয়া ক্লাস এইটে পড়ে, মুক্তোর মত তার হাতের লেখা।

    হ্যাঁ এটা তো একটা কথা বটে। সুফিয়ার নিজেকে আহাম্মক মনে হচ্ছিল। কালুকে দিয়ে কীভাবেই বা চিঠি লেখানো যায়? ছোট ভাই। তবে হ্যাঁ তার পেছনে লাগা যায়। কাল্লু....ভাল্লু....খাল্লু বলে ডাকা যায়।

    দেওয়ালির ছুটির শেষেই কাল্লু-ভাল্লুর হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা শুরু হবে। তাই সে বসে বসে নামতা মুখস্থ করছিল, আর মনে মনে সব মাস্টারদের মৃত্যু কামনা করছিল। পুতুলের ঘর সাজানোর সময় সুফিয়ার লোকশিল্পের স্টাইলে ছবি আঁকার কোনও সমালোচনা সে করেনি। কাল্লু....ভাল্লু,,,,খাল্লু ডাককেও সে অগ্রাহ্য করল। কালুকে ভাবলেশহীন দেখে সুফিয়া অন্য পথ নিল।

    ‘কাল্লু মটলুর দুটো ছাগল

    হেঁচে কেশে গেল মরে।’

    কালুর সাত পুরুষেও কেউ কখনও ছাগল পোষেনি যদিও!

    এমন অবাঞ্ছিত কথাবার্তা মহল্লার বদমাইশ ছেলেছোকরার মুখে মানালেও সুফিয়ার মুখে মানায় না। কালুর আঠারোর নামতাটাও আঠারোর ঘরে এসেই আটকে গেছে। সে সেখানেই বসে বসে অংকের বইটা তুলে সোজা সুফিয়ার মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। বইটা সুফিয়ার মাথায় এসে লাগল। আর ঠিক সেই সময় শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে কাকী উদয় হলেন।

    ‘এই বজ্জাতটা, বই ছুঁড়ছিস? পড়াশুনা তোর হবেটা কী করে শুনি?’ কাকী চিৎকার করে উঠলেন। ‘তাও যদি দিদির পুতুলের ঘরটা সাজিয়ে দিতে পারতিস! সপ্‌হো বেচারি সাজিয়ে দিচ্ছে, আর তুই ওকে জ্বালিয়ে মারছিস?’ কাকী বিড়বিড় করতে করতে ভেতরে চলে গেলে কালু এবার সুফিয়ার খোঁপা ধরে এত জোরে টান মারল যে সে বারান্দা থেকে প্রায় পড়ে যায় আর কী। এবারে বিদা কালুকে দুটো থাপ্পড় মারতেই কুরুক্ষেত্র বেধে গেল।

    যেখানে কালু আছে সেখানে কুরুক্ষেত্র তো বাধবেই। ওর মুখটা দেখলেই সুফিয়ার গা জ্বলে যায়। কিন্তু বিদার গোনার দিন সে সুফিয়ার হৃদয় জিতে নিয়েছিল। বিদার সঙ্গে যে সারাক্ষণ পাগলা ষাঁড়ের মত শিং চালাত, সেই কালুর সেদিন হেঁচকি তুলতে তুলতে সে কী কান্না! সেই প্রথম বার সুফিয়ার মনে হয়েছিল যে তার চেয়ে দুবছরের ছোট তামাটে রং আর বড় বড় চোখের এই ছেলেটাকেও কি সে কখনও ভালোবেসে ফেলেছিল? সে এগিয়ে গিয়ে কালুর মাথায় হাত রেখেছিল। কালুর রেশমের মত নরম চুলের স্পর্শ অনেকদিন তার হাতে লেগে ছিল। কয়েক বছর পরে কালুর হাতেও একই রকম তাজা আর নবীন পরশ লেগেছিল যখন সুফিয়া শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় কালু তার মাথায় হাত রেখেছিল। কালুর চোখ জলে ভিজেছিল নিজের একমাত্র বোনটার কথা ভেবে। শ্বশুরবাড়ির ঘর-গেরস্থালির কাজে এখন সে এতই ব্যস্ত যে বছরভর বাপের বাড়ি আসার সুযোগ তার হয়নি। দেওয়ালির সময় সেই পুতুলের ঘর সাজানো যেন সুদূর অতীতের কোনও স্বপ্ন! এখন ঝগড়া করার যেমন কেউ নেই, তেমনই ভালোবাসারও আর কেউ নেই। কালু বেশ জোরেই কেঁদে উঠেছিল।

    ইমলি কে পত্তা...নওয়া নওয়া পত্তা /i>-- এয়ার ইন্ডিয়ার জাম্বো জেটটা যখন নতুন দিল্লির বিমানবন্দরে নামছে তখন এয়ার হোস্টেসের নিখুঁত উচ্চারণের ইংরেজির সঙ্গে যেন কোত্থেকে এসে গ্রামের বাচ্চাদের কবাডি খেলার আওয়াজ মিশে গেল। এ আওয়াজ পঁচিশ-তিরিশ বছরের পুরোনো। সে গলিতে নিশ্চয়ই আজও এই আওয়াজ ভেসে বেড়ায়। ছেলেমেয়েরা সেখানে নিশ্চয়ই তেমনই শব্দ করতে করতে খেলে। সাত সকালে শীতের কনকনে বাতাসের মত বুড়ো ফিরিওয়ালার তীক্ষ্ণ স্বরে বাচ্চারা নিশ্চয়ই এখনও বিছানায় উঠে বসে – ‘তাজা হালুয়া, ঘি জবজবে হালুয়া!’ আর মহল্লার কোনও বুড়ো তা শুনে নিশ্চয়ই বলছেন – ‘চোরচোট্টা কোথাকার! ডালডায় হালুয়া রান্না করে ওপর থেকে দু-এক ফোঁটা ঘি ফেলে গন্ধ করে দেয়!’ তা সত্ত্বেও জেদি ছেলে কালু উঠতে চায় না, আর কাকী তাকে ঠেলে তুলতে তুলতে নিশ্চয়ই এখনও বলে ... ‘যা, শুয়োরের খোঁয়াড়ে যা!’ আর বিদাও নিশ্চয়ই এখনও দেওয়ালির জন্য পুতুল ঘর সাজায়। শুধু সুফিয়া আর তার পাশে থাকে না।

    ইমলি কে পত্তা...নওয়া নওয়া পত্তা /i>-- দিল্লি থেকে নিজের শহরে ফেরার রেলগাড়ির কু-ঝিকঝিকের মধ্যেও যেন কেউ কবাডি খেলতে থাকে। জানলার পাশ দিয়ে দ্রুত সরতে থাকা দৃশ্যের মধ্যে সুফিয়া সেই বাচ্চাদের দেখতে পায় -- যারা বছরের পর বছর তার চারদিকে ঘুরে বেড়িয়েছে। রেলগাড়িটা দেশের বাড়ির মাটি ছুঁতেই সে তাড়াতাড়ি ঘাড় উঁচিয়ে প্ল্যাটফর্মের লাগোয়া গুলমোহর গাছটাকে দেখার চেষ্টা করে। গাছটা এখনও সেখানেই আছে। শুধু ডালপালা ছড়িয়ে যেন আরও বড় হয়েছে। যে বছরগুলো এর মধ্যে চলে গেছে তাতে যেন গাছটার ভালোই হয়েছে। উপর দিকে মুখ তুলে সুফিয়া বাতাসে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করল। দেওয়ালির খুশবু, শহরের রাস্তার ধারে হাওয়ার মত হালকা বাতাসা আর মাটির সুগন্ধ ভরা দীপ -- চুন আর অভ্র দিয়ে তৈরি হাতি আর পুতুল! এখনই বোধহয় বিদা কোত্থেকে থালা-ভর্তি খই-বাতাসা আর মিঠাই নিয়ে হাজির হবে, পেঁড়ার ঠোঙাটা সুফিয়ার হাতে গুঁজে দেবে, ফুলঝুরির রোশনিতে দুজনের মুখই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

    সুফিয়ার দশ বছরের ছেলেটা জন্মের প্রথম বছরের পরে আর কখনও তার দাদুর বাড়ি আসেনি। সে সব কিছু আশ্চর্য হয়ে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন জাদুঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। ইষ্টিশনে তাদের নিতে আশা মামু-মামীদের সে চিনতে পারেনি। বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তার মাম্মি কেন বিনা কারণে অঝোরে কাঁদছে তাও তার মাথায় ঢুকছে না। এমন বেকুবের মত কাজ তার মাম্মি তো কখনও করেনি!

    ‘এতদিন পরে আপা যদিও বা এল তাও এই সময়!’ ছোট ভাইয়ের বউ বলেই ফেলল। ‘তাও ভালো যে মেয়েটাকে সঙ্গে আনেনি।’ ভাইবৌয়ের কথা বলার ধরনটা সুফিয়ার ভালো লাগল না। সে তো ইচ্ছে করেই উৎসবের সময় এসেছে। আবার হোলি-দেওয়ালি দেখার জন্য তার মনটা যে কী চঞ্চলই না হয়েছিল! মাটির খেলনা, রঙের পিচকিরি, গ্রাম্য রীতিতে সাজানো অথচ কী সুন্দর তাদের পুতুলের ঘর! আর ভালোবাসার মিষ্টিতে ভরপুর তার সেই সহেলি এমনই ভোলাভালা যে স্বামীকে চিঠিটা পর্যন্ত লিখতে পারে না। এসবই এতদিন সে স্বপ্নে দেখেছে। সহেলি তো আজকাল আর আসেও না। দেওয়ালি তো প্রেমের উৎসব -- আলোয় উজ্জ্বল আর মিষ্টি! সুফিয়া বারান্দায় এসে চিক সরিয়ে বাইরে উঁকি দিল। মহল্লার সব বাচ্চাই যেন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। সত্যিই তাই! নুর মোহাম্মদ মিয়াঁর ছাগলটা জাবর কেটেই চলেছে, ঘরের চালার নিচে তাহির মিয়াঁর সেলাই মেশিন তেমনই চালু আছে, আর ছোটেলাল কচুরি-তরকারি দিয়ে নাস্তা সেরে নাদা পেটটায় হাত বোলাতে বোলাতে ঢেকুর তুলছে। দোকানদারেরা সন্ধেয় ধনতেরসের কেনাকাটায় অনেক খদ্দের আসবে এই আশায় দোকান সাজাতে ব্যস্ত। হঠাৎই রাস্তা থেকে খুব শোরগোলের আওয়াজ পাওয়া গেল। ভীষণ হইচই, তার সঙ্গে গালিগালাজ। গলির মধ্যে ভিড় জমে গেল। ছোট ভাইয়ের বউ ভেতর থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল।

    ‘কী হল দিদি, কী হয়েছে?’ তার মুখটা উদ্বেগে ফ্যাকাশে।

    ‘কে জানে কিছু তো বুঝতেই পারছি না। হতে পারে হঠাৎই কোনও ঝগড়া লেগে গেছে।’

    ‘খোদা রক্ষে করুন! এ তো এখনও ঘরে এল না -- এখনও বাইরেই ...’

    ‘আলতাফ নিশ্চই চলে আসবে, তুই এত চিন্তা করছিস কেন? গলি মহল্লার মানুষ প্রায়ই এমন ঝগড়াঝাঁটি করে। ও কিছু না...’

    ‘তুমি বোধহয় জানো না যে আজকাল পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন হয়ে গেছে।’ বউ তার গলার স্বরে বিরক্তিটা চেপে রাখার চেষ্টা করছে যেন। আর ঠিক সেই সময় কোনও বাচ্চা বাইরে চকোলেট বোমা ছুঁড়তেই ভাইয়ের বউ লাফ দিয়ে উঠল। তার পনেরো বছরের ছেলে আমির ব্যালকনি যেতে চাইছে আর সে তাকে পেছন দিকে টেনে রাখছে।

    ‘মাম্মি দেখতে দাও না! সিচুয়েশনটা তো বুঝতে পারব!’ সুফিয়ার মনে হল আমির এক লহমায় অনেক বড় হয়ে গেছে। বড় আর গম্ভীর।

    কয়েক মিনিটের মধ্যেই অবশ্য আশপাশের সকলেই স্বস্তির শ্বাস নিল। আসলে ও ধারের গলির স্বর্ণকারের বড় ছেলেটা মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। ঘরের মেয়েছেলেরাও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়েছিল বেদম। সুফিয়া হেসে ফেলল। আগে এমন হলে নুর মোহাম্মদ চাচা দাড়ি কাঁপাতে কাঁপাতে বাইরে এসে কখনও বকাঝকা আর কখনও বা বুঝিয়ে-সুজিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করে দিতেন।

    ‘এখন তো চাচা ঘরের এক কোণে মাথা ঝুঁকিয়ে পড়ে থাকেন।’ ভাইবৌয়ের গলার স্বরে তিক্ততা, কিছুটা হয়ত বিরক্তিও। ‘এখন কে শোনে ওই পুরোনো রাজা-বাদশাদের কথা! যারা শান্তি-সমঝোতার কথা বলত, আর লড়াকুদের মধ্যে শান্তিচুক্তির ব্যবস্থা করে আসত? ওসব এখন আউটডেটেড হয়ে গেছে।’

    ‘আর কাকী কেমন আছেন রে?’

    ‘কাকী মারা যাবার তো তিন বছর হয়ে গেল।’

    সুফিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘরগেরস্তি সামলে তারা ছেলেমেয়েদের পেটে ধরে কোলে পিঠে করে মানুষ করতেন, তাদের বিয়ে-শাদির ব্যবস্থা করতেন। পরিবারের সীমিত আয়কে রবারের মত টেনে বাড়াতেন। এইভাবে নিজেদের স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ অবহেলা আর অগ্রাহ্য করে কাকী আর আম্মা দুজনেই তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। শেষ যেবার সুফিয়া বাপের বাড়ি আসে তখনও তাঁরা বেঁচে ছিলেন। সুফিয়ার ছেলেটার তখন বছর খানেক বয়েস। সেবার সে বিদার শ্বশুরবাড়ির গ্রামে খবরও পাঠিয়েছিল। পরদিনই বিদা তার সঙ্গে দেখা করতে চলেও এসেছিল। এমব্রয়ডারি করা শাল গায়ে দেওয়া বিদার ফর্সা ভরপুর জোয়ান শরীরটা যেন পূর্ণিমার চাঁদের মত ঝকমক করছিল! কাজল লেপা চোখ দুটো ঘোরাতে ঘোরাতে সে সুফিয়ার ছেলেকে বলেছিল, ‘আমাদের চিনে রাখো! আমি তোমার মাসি হই।’ তারপরে শালের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা রুপোর বালা বার করে ছেলের হাতে পরিয়ে দিয়েছিল। হাঁটুতে হাত রেখে খোঁড়াতে খোঁড়াতে কাকীও এসেছিল। তাঁর চোখে তখন ছানি পড়েছে, হাঁটুতেও বাত। ময়লা থানের আঁচল খুলে দলামোচা করে রাখা একটা পাঁচ টাকার নোট সুফিয়ার ছেলের হাতে দিয়েছিলেন কাকী। তারা চলে যাওয়ার পরে আম্মা বলেছিল, ‘বড়ে লালা তো গুজ়র গয়ে। বড়ে লালাইনকে তার বড় ছেলে তো টাকাপয়সা বিশেষ কিছুই দেয় না। বলে বুড়ি নাকি অকারণে খরচ করে! ওর দেওয়া এই পাঁচটা টাকাকেই তাই মহাপ্রসাদ বলে মনে কোরো।’

    বলে আম্মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। তোমার আব্বা চলে যাওয়ার পরে কখনও আমার কাছেও কি আর তেমন টাকাপয়সা থাকে? দুটো রুটি খাইয়েই ছেলে মনে করে যে মায়ের তো আর কিছুর প্রয়োজনই নেই। এখন এই যে তুমি বাচ্চাদের নিয়ে এসেছ, আমি কি তোমাকে খালি হাতে ফেরত পাঠাতে পারি?’ আম্মা আর লালাইন একই দুঃখের ভাগীদার যেন!

    সুফিয়ার স্বামী তখন দুবাই যাওয়ার কথা ভাবছিল। এমনিতে তো খুব ভালই একটা চাকরি করত, কোথাও কোনও অভাব ছিল না। কিন্তু সুফিয়া সে কথা বলে আম্মাকে দুঃখ দিতে চায়নি। সেই বরং আম্মাকে পাঁচশোটা টাকা দিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কাছে থাকলে সময়ে অসময়ে কাজে লাগবে। কিন্তু আম্মা কাঁদতে শুরু করে দিলেন। ‘বেটির কাছে হাত পাতব? এই অপমানটাই তা হলে বাকি ছিল? তোর সহেলি বিদাও তো একবার লালাইনকে এই ভাবেই অপমান করেছিল! সে তো এটা ভেবে দেখেনি যে তার বিয়ে হয়ে গেছে, বাচ্চাকাচ্চা হয়েছে। চটি বার করে দুঘা মেয়েকে দিয়েছিল তখন লালাইন। বেটা, আমার মাথাটা এখনও উঁচু আছে। দু-চার দশ টাকা দিয়েই না হয় রওনা করে দেব তোকে? হ্যাঁ পাঁচ শো টাকা তো আর দিতে পারব না।’ আম্মা আর লালাইনের মূল্যবোধও তা হলে এক রকম!

    সুফিয়ার চোখ ভিজে উঠল, বিদা তো তার চেয়ে সামান্যই বড় ছিল। কিন্তু ওর বিয়েটা হয়ে গেল এতই কম বয়সে যে সুফিয়ার বিয়ে হতে হতে সে বেশ কয়েকটা বাচ্চার মা হয়ে গেছে। এখন তো সে ঠাকুমা দিদিমা হয়ে উঠেছে। কে জানে শ্বশুরবাড়িটা সেখানেই আছে নাকি তারা অন্য কোথাও চলে গেছে। খবর দিলে এখনও কি সে তেমনই দৌড়ে আসবে? ভাইবৌকে জিজ্ঞেস করায় সে সুফিয়ার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ‘কে বিদা?... রাজারামের বোন?...’

    ‘হ্যাঁ সেই, আবার কে?’

    ‘আরে সেও তো মরে গেছে! আজকের কথা নাকি? কাকী বেঁচে থাকতেই তো চলে গেল!’

    কেউ যেন এক ফুঁয়ে শহরের সব আলো নিভিয়ে দিল।

    ‘রাজারামের পরিবার তো এ মহল্লাতেই আছে নাকি?’ বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সুফিয়া বিষণ্ণ স্বরে বলল।

    ‘আছে তো,’ ভাইবৌ যেন আবেগহীন।

    ‘কাউকে ওদের বলার জন্য পাঠাতে পারিস যে আমি এসেছি?’ কালুটা নিশ্চয়ই দৌড়ে আসবে। আর যদি আসতে না পারে তা হলে আমিই যাব।’ ভাইবৌ কোনও জবাব না দিয়ে রাতের খাবার তৈরিতে লেগে গেল। সন্ধের আঁধার গাঢ় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধনতেরসের মেলা জমে উঠেছে। কিন্তু সুফিয়ার মনের ভেতরটা থমথমে। এ কী মরার বয়েস? পঞ্চাশও তো হয়নি। আম্মা নেই, কাকী নেই, বিদাও নেই। ভেতরের থমথমে ভাবটাতে ভয় পেয়ে সুফিয়া আমির আর রেশমাকে ডেকে নিল।

    ‘তোরা বাজি পটকা আনিসনি?’

    ‘পটকাকে খুব ভয় পাই যে ফুফি!’ রেশমা অস্ফুটে বলে।

    ‘কখনও হঠাৎ ফেটে লেগেছিল নাকি তোর?’

    ‘সারা শহরটাই তো জ্বলে গিয়েছিল, ফুফি!’ রেশমার গলায় তিক্ততা, মুখে কেমন ভয়ের ছাপ।

    সেই থমথমে ভাবটা সুফিয়ার মনে যেন আরও চেপে বসল। সে আবার ব্যালকনিতে গেল। মহল্লায় ছোট দেওয়ালির দীপগুলো জোনাকির মত জ্বলছে। একটা ছোট্ট মেয়ে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে -- তার হাতে কুরুশকাঠিতে বোনা খানপোশ দিয়ে ঢাকা পেতলের বড় থালা। মেয়েটাকে ভীষণ চেনা চেনা লাগল।

    ‘এই আপনার কালু, মানে রাজারামের বেটি।’ রেশমা সুফিয়ার পেছন থেকে বলে উঠল।

    ‘ডাক...ডাক... ওই ডাক ওকে, রেশমা! কী নাম ওর?’ সুফিয়া অধৈর্য হয়ে উঠল।

    ‘আসে কিনা দেখো,’ বলে রেশমা মেয়েটার নাম ধরে ডাকল। ‘মঞ্জু... এই মঞ্জু...’ মঞ্জু তাদের বাড়ির রকের কাছে এসে থেমে গেল। সুফিয়া দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচতলায় চলে এল। তারপরে চিকটা সরিয়ে সে বাচ্চা মেয়েটাকে ডাকল, ‘ওপরে চলে আয় বেটি। ঘরের ভেতরে আয়।’

    মেয়েটা পরম সংকোচে যেন ওপরে এল, সুফিয়া এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটা অবাক হয়ে এই অচেনা মহিলার দিকে চেয়ে রইল -- দামি জামা কাপড় পরা পূর্ণবয়স্ক এক সুন্দরী মহিলা তার সামনে দাঁড়িয়ে।

    ‘তোর বাবুজিকে বলবি...’ মঞ্জুকে বলতে যেতেই মেয়েটা তাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘আমি তো তাকে পাপা বলি!’

    সুফিয়া হেসে ফেলল। ‘আচ্ছা ভাই, তোমার পাপাকেই বোলো আলতাফ চাচার বড় দিদি এসেছে। তো তুমি ওর সঙ্গে দেখা করতে কেন যাওনি? আর এটাও বলবে যে ওর নাম তো কালু ছিল, ও রাজারাম আবার কবে থেকে হয়ে গেল? আর জানো কি...’, এবার সুফিয়া মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে তার কানে কানে বলল, ‘শুধু কালুই নয় ...কালু...ভালু...খালু...’

    এবারে আশ্চর্য হওয়ার বদলে বাচ্চা মেয়েটার মুখে হাসির রেশ ফুটে উঠল। তারপরে সত্যিই সে হো হো করে হেসে ফেলল!

    ‘আর আপনি কে?’ মেয়েটা শেষ পর্যন্ত সুফিয়াকে জিজ্ঞেস করেই বসল।

    ‘আমি তোর ফুয়া, তোর বাবার বোন!’ সুফিয়া ভালোবেসে মেয়েটার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ভাবল যে বিদার ঋণ বোধ হয় সে একটু শোধ করতে পারল। তার চোখ ভিজে এল।

    মঞ্জু হাসতে হাসতেই সুফিয়ার কথা শুনে আবার আশ্চর্য হল। তার ফুয়া এ বাড়িতে কেমন করে আসবে? তবে ভালোবাসার মিষ্টি স্বাদ যে মেয়েটার মন ছুঁয়ে গেল না তা নয়। কেই বা তা না বুঝে পারে? মঞ্জু ফিরে যেতে যেতে সুফিয়ার দিকে চেয়ে হাসল।

    আলতাফ মানা করা সত্ত্বেও সুফিয়া কালুর ওখানে যাওয়ার সংকল্পে অনড় রইল। ‘রাজারাম এখন আর এ বাড়িতে আসে না,’ আলতাফ বলেছিল। ‘তবে কোথাও দেখা হয়ে গেলে দোয়া-সেলাম বিনিময় হয়। কখনও তো এমনও মনে হয়েছে যে আমরা দুজনেই এটুকু সৌজন্য দেখানোও এড়িয়ে যেতে চাইছি।’

    ‘কারণ...?’

    ‘আপা তুই তো এতটা ভোলাভোলা নোস, তবু খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করছিস! সে এখন রাজনীতি করে, একটা দলে নামও লিখিয়েছে। গোলমালের সময় শুনেছি যে শহরের দেওয়ালে উস্কানিমূলক স্লোগান লেখায় তারও হাত ছিল। ওর ওখানে যাবার দরকারটা কী তোর?’

    ‘আলতাফ! তুই আর রাজারাম স্কুলে একসঙ্গে পড়তিস, বোধহয় এক ক্লাস আগে আর পরে,’ সুফিয়ার স্বরে দুঃখ।

    ‘হ্যাঁ, নুর মোহাম্মদ চাচার বাগান থেকে দুজনে মিলে পেয়ারাও তো কত চুরি করতাম। তারপরে একবার যখন চাচার বাড়ির ছাদে চোর লাফিয়ে পড়েছিল তখন আমরা দুজনেই একসঙ্গে চোর ধরতে দৌড়েছিলাম।’

    ‘আর যখন মহল্লার দুর্গন্ধময় পচা নালাগুলো পরিষ্কারের জন্য তোদের স্কুল শ্রমদানের স্কিম চালু করেছিল তখন তোরা দুজনেই সাফাইয়ের কাজে লেগে পড়েছিলি মনে আছে?’ সুফিয়ার মনটা দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে রইলেও মুখে হাসির রেখা দেখা দিল। সে ঘটনার পরে কতদিন যে সে ‘মেথর’ বলে ডেকে কালুর পেছনে লাগত! হাত-পা ছুঁড়ে দিদির সঙ্গে মারপিট করতে যাওয়া সেদিনের সেই বাচ্চা ছেলেটা আজ বড়সড় ব্যবসার মালিক। সে বিয়ে করেছে, বেশ কয়েকটা ছেলেমেয়ের বাপও হয়েছে। তবু সুফিয়ার মনে সেদিনের সেই ছবিগুলোই চলে ফিরে বেড়ায়। সুফিয়ার প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য বিদায় নেওয়ার দিন যার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়েছিল আজ তার সেই নিষ্পাপ মনটা কে কেড়ে নিল? এসব তাকে কে শেখাল?

    পরদিন তার সঙ্গে দেখা করতে যেতে সামনের রোয়াকেই কালুকে পাওয়া গেল। সে একটা ঝামা দিয়ে রগড়ে রগড়ে পায়ের ময়লা পরিষ্কার করছিল। রোয়াকটা ঠিক আগের মতই আছে। রকের এক কোণে কালুর মেয়েদের তৈরি পুতুলঘর চোখে পড়ছে। সন্ধেবেলা তার চারধারে রাখা দীপগুলো মানুষের মনের আশার মত ঝকমক করে উঠবে। সুফিয়াকে দেখে কালু হড়বড়িয়ে গেল, কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল -- মাঝখানে কতগুলো বছর যে চলে গেছে!

    ‘চিনহত্‌ হো কে নাহেঁ?’ সুফিয়ার গলা থেকে সেই মিষ্টি আওয়াজ ঝরে পড়ছে যা বহু বছর আগে শোনা যেত। স্থানীয় সেই মিঠি বুলি যা রাজারাম বুঝবে। শ্বশুরবাড়ি দুবাইতে এ গ্রাম্য ভাষা কেউ বুঝবে না।

    ‘চিনতে পারছি। সুফিয়া দিদি তো? কবে এলে?’

    কিন্তু কালুর কণ্ঠস্বরে কোনও আবেগ বা আনন্দ যেন টের পাওয়া গেল না। সুফিয়া একটু দমে গেলেও বলে ফেলল, ‘জেনেছ তো আমি এসেছি, তাও আমাদের বাড়ি যাওনি কেন?’

    কালু মাথা চুলকোল। ‘ব্যবসা অনেক বড় করে ফেলেছি। দশ রকমের ঝামেলায় থাকতে হয়, কাজেই ফুরসৎ মেলে না।’

    সে বিবিকে চেঁচিয়ে ডাকল, ‘মঞ্জুর মা...’

    ‘শুনেছি এমনিতে তো আসা-যাওয়া বন্ধ করেছিস! আমার ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি কিছু হয়েছিল নাকি? সেও তো তোর কথা বললে মুখ বেজার করে।’

    কালু সুফিয়ার কথার কোনও জবাব দিল না। সে আবার পায়ে ঝামা ঘষার কাজে মন দিল। বিবিকে আবারও ডাকল, ‘জলদি দুগ্লাস চা নিয়ে এসো।’

    ‘চা-টা ছাড়ো তো এখন! ছেলেমেয়ে কটা? কত বড় হল তারা? সব মেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছো কিনা? শেষবার এসেছিলাম সেবার তো তোমার সঙ্গে দেখাই হয়নি। বাইরে কোথাও গিয়েছিলে, তোমার বউও তখন বাপের বাড়ি গিয়েছিল। কিন্তু বিদা আর কাকী এসেছিল দেখা করতে। বিদার কী হয়েছিল কালু? ও মরে গেল কী করে?’

    এই সময় রাজারামের স্ত্রী হাতে দুটো স্টিলের গ্লাস নিয়ে বাইরে এল। শাড়ির আঁচলটা দিয়ে মাথা ঢাকা। সে গ্লাস পিঁড়ির ওপর রেখে সুফিয়াকে প্রণাম করল।

    ‘ওকে জিজ্ঞেস করো, ওই তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে।’ বলে কালু তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল, ‘এখানে বোসো, ইনি বিদাদিদির ছোটবেলার সখী।’

    কালু চা না খেয়েই উঠে পড়ল। ‘দোকানে যেতে হবে আমায়, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

    সুফিয়া কালুর বউয়ের দিকে চাইল। ঘোমটার আড়ালে থাকা তার চোখ দুটোতেও যেন কোনও আবেগ নেই। সুফিয়া যেন অচেনা কোনও দূরের মানুষ।

    ‘চা খাব না আমি,’ সুফিয়ার স্বরে দুঃখ আর রাগ। ‘কালু, আমি তোমার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছিলাম।’

    সুফিয়া উঠে দাঁড়াল। এমন সময় হঠাৎই দৌড়োতে দৌড়োতে দরজা দিয়ে ঢুকল মঞ্জু। তার ঠিক পেছনেই একটু বড় একটা ছেলে, ওর দাদা হবে হয়ত। সুফিয়াকে দেখে মঞ্জু তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল -- এক মুহূর্তের জন্য মুখটা দেখে বোঝা গেল সে আশ্চর্য হয়েছে। কিন্তু পর মুহূর্তেই মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিতে থাকা সূর্যকিরণের মত লাজুক হাসিতে তার গোটা মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে গেল। গোলগাল মুখটায় ভরাট দুটো গালে টোল পড়ল আর কালো-কাজল চোখ দুটির চাউনিতে সে তখন বিদার প্রতিচ্ছবি!

    ‘পাপা...পাপা হো... ই হমার ফুয়া লাগেঁ!’ সুফিয়ার খুব কাছে চলে এসে ছোট্ট মেয়েটা তাকে জড়িয়ে ধরেছে। সুফিয়া অবাক। মঞ্জুর পরীর মত মুখটাতে তার ছোট্টবেলার সখী যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে!

    ***********************

    * বউ ঘরে তোলার অনুষ্ঠান



    অলংকরণ (Artwork) : শুভময় রায়
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments
  • কীভাবে লেখা পাঠাবেন তা জানতে এখানে ক্লিক করুন | "পরবাস"-এ প্রকাশিত রচনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রচনাকারের/রচনাকারদের। "পরবাস"-এ বেরোনো কোনো লেখার মধ্যে দিয়ে যে মত প্রকাশ করা হয়েছে তা লেখকের/লেখকদের নিজস্ব। তজ্জনিত কোন ক্ষয়ক্ষতির জন্য "পরবাস"-এর প্রকাশক ও সম্পাদকরা দায়ী নন। | Email: parabaas@parabaas.com | Sign up for Parabaas updates | © 1997-2025 Parabaas Inc. All rights reserved. | About Us