



কোনো হিন্দু মারা গেলে সাধারণত সেইদিনই দেহ পোড়ানো হয়। আমি তো তাই জানতাম। কিন্তু পশ্চিমে কোনো খ্রিশ্চান মারা গেলে তার মৃতদেহ যে এমবাম করে রেখে, বেশ কিছুদিন পরেও কবর দেওয়া যেতে পারে, তা জানতাম না। এমবাম-এর কোনো বাংলা আমার জানা নেই। মনে করতে পারেন – নানা রকম স্পেশাল মলম লাগিয়ে শরীরের স্বাভাবিক পচনের প্রক্রিয়া একটু মন্দগতি করে দেওয়া।
হিন্দুদের মত খ্রীশ্চানদেরও ভূত হয় শুনেছি। শরীর যখন ছাই হয়ে যায়, তখন অশরীরী ভূত বিনা দ্বিধায় ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু শরীর যখন মলম মেখে কবরের অপেক্ষায় থাকে, তখন সেই টানা-পোড়েনের মধ্যবর্তী সময়ে ভূত কি করে আমার জানা নেই। অদ্ভুত সব ব্যাপার!
যাই হোক। আমি তখন সবে নেদারল্যান্ডসে প্রথম গাড়ি কিনেছি। শখের দামী গাড়ি। ওলন্দাজদের দেশে বসবাস করছি দু-এক বছর হল। ছোট বাড়িও কিনেছি সদ্য। একটা ছোট শহরে – অ্যামস্টারডাম থেকে অল্প দূরে। স্ত্রীর সাথে সেই বাড়িতেই সংসার পেতেছি।
একদিন সকালবেলা। অফিস যাবো। তৈরী হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পার্ক-করা গাড়িতে উঠেছি। সামনেই আরেকটা গাড়ি গায়-গায় দাঁড়িয়ে আছে। আগে পেছন দিকে যেতে হবে। ব্যাক গিয়ার দিয়েছি, কিন্তু গাড়ি নড়ছে না। তাই অ্যাক্সিলেরেটরে পা’টা একটু জোরে দাবিয়েছি। গাড়ি নড়ল, প্রয়োজনের চেয়ে বেশী।
দুম্ করে একটা শব্দ।
এত জোরে শব্দ হল যে বাড়ির দরজা খুলে স্ত্রী বেরিয়ে এলেন।
আমি গাড়ি থেকে নেমে পেছনে দিকে গিয়ে দেখি কেলেঙ্কারি কাণ্ড। সেখানে যে গাড়িটা পার্ক করা ছিল, সেটা ছিল উলটো দিকে মুখ করে। আমার গাড়ি পেছন দিকটা ধাক্কা মেরেছে সেই গাড়ির পেছনে। সেই গাড়ির সব কিছু ভেঙে গেছে। গাড়ির বডি সম্পূর্ণ তোবড়ানো, কাঁচ সব ভাঙা, কিছুই যেন অবশিষ্ট নেই। মনে হচ্ছে যেন গাড়ির হাড়গোড় ভেঙে গেছে, জামা কাপড়ও সব খুলে গেছে।
আমার গাড়ির প্রায় কিছুই হয়নি। দু-একটা আঁচড় পড়েছে শুধু। সারা রাস্তা জুড়ে কাঁচের টুকরো পড়ে আছে।
আমার বাড়িটা যে রাস্তায় সেখানে গায় গায় এক সারি বাড়ি। সবকটাই এক রকম দেখতে। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে খানিকটা খালি জায়গা, পেছন দিকে ছোট বাগান। বাড়িগুলো কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে পর পর দাঁড়িয়ে আছে।
আমার বাড়ির দু-তিনটে পরের বাড়ি থেকে এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। যে গাড়িটাকে আমি ভেঙেচুরে দিয়েছি, উনি বললেন যে সেটা ওনারই। বুঝলাম এবার আমার সামনে কঠিন সময় আসছে। মারধোর করবে না পুলিশ ডাকবে কে জানে!
আমি কপালে হাত দিয়ে ফুটপাতে বসে পড়লাম।
ভদ্রমহিলা ভালো করে ওনার গাড়ির ভগ্নাবশেষের চারপাশ ঘুরে সব কিছু দেখলেন। আমায় বললেন, “একটু জলটল খাও। অত ভেঙে পড়লে চলবে?”
আমি চুপ করে বসে রইলাম। বক্সিং রিঙে মার খাওয়া মুষ্টিযোদ্ধার মত। এইবার নতুন রাউন্ড খেলা শুরু হবে। মার খেতে হবে প্রচুর।
ভদ্রমহিলা বললেন, “তাড়াতাড়ি করতে হবে সবকিছু। যদি বৃষ্টি শুরু হয়, আমার গাড়িটা পুরো নষ্ট হয়ে যাবে। তার আগেই বন্দোবস্ত করতে হবে।”
নেদারল্যান্ডসের আবহাওয়াই ও রকম। বলা নেই কওয়া নেই যখন তখন বৃষ্টি পড়তে পারে।
ইতিমধ্যে আমার স্ত্রী আমাদের পাশের বাড়িতে বেল বাজিয়েছে। সেখানে যে পরিবারটা থাকে, তাদের আমরা চিনি। টম্ দরজা খুলেছে। আমার স্ত্রী তাকে জানিয়েছে তার স্বামীর সদ্যকৃত কীর্তির কথা।
টম ফুটপাতে এসে আমার সাথে ও বয়স্কা ভদ্রমহিলার সাথে কথাবার্তা বলল। অ্যাক্সিডেন্ট রিপোর্ট করার ফর্ম জোগাড় করল। তারপর মহিলাকে সাহায্য করল ফর্মটা ভরতে।
ভদ্রমহিলার বয়স পঁয়ষট্টির কম নয়। হয়তো খানিকটা অসুস্থও। যদি উনি একজন কমবয়সী লোক হতেন, আমার হয়তো এতটা খারাপ লাগত না।
উনি আমাকে বললেন, “তুমি চাপ নিও না। আমি এখন যাচ্ছি। গাড়িটাকে মেরামত করার দোকানে দিয়ে আসছি।”
গাড়িটা দেখে যদিও নগ্ন এবং ভগ্ন মনে হচ্ছিল, তবু চালানো যাচ্ছিল।
আমি বললাম, “আমি খুব সরি। সরি। সরি।”
বিচ্ছিরি একটা কর্কশ শব্দ করতে করতে ভাঙা গাড়িটা চালিয়ে উনি চলে গেলেন।
সেই রাতে আমি ফুল আর ওয়াইন নিয়ে ওনার বাড়ি গেলাম। আমার দেহরক্ষী হিসেবে স্ত্রীও গেলেন সঙ্গে। আমি ভদ্রমহিলাকে আবার বললাম, “সরি, সরি, সরি।”
সেই রাত কাটল কোনো ভাবে। পরের দিনটাও কাটল।
সন্ধ্যাবেলা আমি দোতলায় কাজ করছিলাম। একতলায় বেল বাজল। সামনের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম যে সেই ভদ্রমহিলার মেয়ে এসেছে। আমারই বয়সী হবে। গতকাল ভদ্রমহিলার বাড়িতে দেখেছিলাম। সেই বাড়িতে থাকে না, কিন্তু এ পাড়াতেই থাকে।
ভয়ে আমার বুক ধড়ফড় করছে। আবার কি বলবে কে জানে! অনেক গালাগাল দেবে হয়তো। দু-একটা চড়-চাপড়ও খেতে পারি। আমি আলো-টালো বন্ধ করে দোতলাতেই রইলাম। স্ত্রী নেমে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে।
মনে হল স্ত্রীর মুখে যেন সামান্য একটা হাসি দেখলাম। আমার নাজেহাল অবস্থা দেখে নিশ্চয়ই খুব আনন্দ পাচ্ছেন।
ওপর থেকে শুনলাম, স্ত্রী দরজা খুললেন। মেয়েটি ভেতরে এলো। ওরা একতলায় বসার ঘরে গিয়ে বসল।
দোতলায় আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে, আলো নিবিয়ে, একজন দায়িত্বপূর্ণ পুরুষের মত চুপটি করে বসে থাকলাম ।
এক মিনিট গেল। দু মিনিট গেল। অনেক মিনিট গেল। আমি বিশেষ কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে বহুদূর থেকে ভেসে আসা মানুষের কথোপকথন। তারপর আবার নিঃশব্দ।
এইভাবে কতক্ষণ গেল জানি না। এক সময়ে অনেক চেষ্টা করে, সাহস সঞ্চয় করে, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম। নিঃশব্দে।
বসার ঘরে গিয়ে দেখি দুই মহিলা হাসছেন ও হাসি হাসি মুখ করে কথা বলছেন। যেন কতকালের পুরোনো দুই বন্ধু। আমি যতক্ষণ ভয়ে শিঁটিয়ে, ওপরের রুদ্ধনিঃশ্বাস শব্দহীন অন্ধকারে বসে ছিলাম, এই দুই মহিলা ততক্ষণ আমোদ করছিলেন।
আমাকে দেখে এক গাল হেসে স্ত্রী বললেন, “উনি এই স্ট্রোপফেল এনেছেন!”
স্ট্রোপফেল একটা ওলন্দাজ খাবার, বিস্কুটের মত, গোল গোল, পাতলা, মিষ্টি। সাধারণত কফির সঙ্গে খায়। ওলন্দাজদের প্রিয় খাবার। ওদের গর্ব।
আমি বললাম, “সরি, সরি। আমি তোমার মা’র গাড়ি ভেঙে দিয়েছি। আমি বুঝতে পারিনি। আমি ইচ্ছে করে ভাঙিনি।”
মেয়েটা বলল, “না, না। তুমি চাপ নিও না। মা খুব খুশি।”
“মা খুব খুশি?”
“হ্যাঁ! আজ সকালে মাকে একটা নতুন মিনি কূপার গাড়ি দিয়েছে রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে। মানে যতদিন না মা’র গাড়িটা পুরো মেরামত হয়, ততদিন মা এই মিনি কূপার গাড়িটা চালাবে। মা আমার কাছে অনেকবার মিনি কূপার চেয়েছিল। মা’র অনেকদিনের শখ। আমি কিনে দিইনি। আমি ওই বাজে গাড়িটা কিনে দিয়েছিলাম। আজ সকাল থেকে মা মিনি কূপার চালাচ্ছে। বেজায় খুশি। ভাগ্যিস তুমি মা’র গাড়িটা ভাঙলে! তাইজন্যই তো তোমার জন্য স্ট্রোপফেল এনেছি।”
তারপর আবার বলল, “আমি ওলন্দাজ। ওলন্দাজ হয়ে আমি তোমার জন্য স্ট্রোপফেল এনেছি। তাহলেই বোঝো আমি কত খুশি।”
আমি আর কি বলব।
তারপর কয়েকটা দিন কেটে গেল। একদিন সেই বয়স্ক ভদ্রমহিলার বাড়ি গেলাম। বাড়িতে স্বামী ও মেয়েও ছিল।
বললাম, “সরি, আপনার গাড়িটা ভেঙে দিয়েছি। শুনলাম আপনি মিনি কূপার চালাচ্ছেন। আপনার গাড়িটা মেরামত করে ফেরেনি এখনো?”
উনি বললেন, “না, এখনো আসেনি। আমি চাইও না আসুক। যতদিন না আসছে, ততদিন আমি মিনি কূপারটা চালাতে পারব।”
“আপনি এত খুশি?”
“আমার ক্যানসার আছে। কতদিন বাঁচব জানি না। অন্তত কিছুদিন মিনি কূপারটা চালিয়ে নিই। খুব চালানোর ইচ্ছা ছিল, জানো?”
আরো এদিক ওদিক কিছু কথাবার্তা হল। তারপর আমি বাড়ি ফিরে এলাম।
দিন চলে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ওনার সাথে রাস্তায় দেখা হত। একবার ওনার স্বামীর কাছে শুনলাম যে ওনার খুব শরীর খারাপ। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে একটা জিনিসকে দুটো দেখেন। যে কোনো দিন মারা যেতে পারেন।
আরো অনেকগুলো দিন চলে গেল। একদিন মনে হল ভদ্রমহিলার স্বামীকে দেখলাম আমার বাড়ির সামনে। সেদিন সন্ধ্যায় লেটারবক্সে একটা খাম পেলাম। আন্দাজ করলাম যে খারাপ খবর আছে। তারপর নানান ব্যস্ততায় খামটা খুলতে ভুলে গেলাম।
দু’দিন পর খাম খুলে দেখি ভদ্রলোকের হাতে লেখা চিঠি। যেদিন খাম দিয়ে গেছেন, তার পাঁচদিন আগে ভদ্রমহিলা মারা গেছেন।
সেদিন এক বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার ছিল। বাড়ি ফেরার পথে কিছু ফুল কিনলাম। বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে স্ত্রীকে বললাম, “তোমার যাবার দরকার নেই। আমি গিয়ে ভদ্রলোকের সাথে দেখা করে ফুল দিয়ে আসছি।”
গেলাম। বাইরে থেকে জানলা দিয়ে দেখলাম ভেতরটা অন্ধকার। বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত। বাড়ির ভেতরে টিমটিম করে একটা দুটো আলো জ্বলছে মনে হল। কলিং বেল টিপে দরজার সামনে অপেক্ষা করলাম।
একটু পর ভদ্রলোক দরজা খুললেন। বললেন, “হ্যালো।”
আমিও “হ্যালো” বলে ভদ্রলোককে ফুলগুলো দিলাম। বললাম যে ওনার চিঠি মারফত মৃত্যুসংবাদ পেয়েছি।
উনি বললেন, “এসো, এসো, ভেতরে এসো।”
আমি বললাম, “না, না ঠিক আছে।”
“না, প্লীজ। ভেতরে এসো। ওনার সাথে দেখা করে যাও।”
আমি ওনার কথার কোনো মানে পেলাম না। বুকের ভেতরটা দুরদুর করতে শুরু করল।
উনি হাত বাড়িয়ে আমার ডান হাতটা শক্ত করে ধরলেন। তারপর টানতে থাকলেন নিজের দিকে।
খুব শক্ত হাত ওনার। দৃঢ় মুষ্টি। আমি হাত ছাড়াতে পারছি না।
উনি বললেন, “এসো, এসো, ভেতরে এসো।”
আমি তোতলালাম, “না, না, থাক্।”
আমার আত্মারাম খাঁচা-ছাড়া হয়ে গেছে। মাথার ভেতর দিয়ে তড়িৎ গতিতে কতগুলো অসম্পূর্ণ চিন্তা যাচ্ছে। বুকের ভেতর ভয়, আতঙ্ক, ত্রাস। এই ওলন্দাজদের ভূতুড়ে কি কারবার আমি জানি না, জানতেও চাই না।
উনি বললেন, “এসো, এসো। উনি এখানেই আছেন।”
ওনার পেছনে ঘরের মধ্যে ঘোর অন্ধকার। কিছুই দেখতে পেলাম না। আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। মুখে কথা আসছে না। ডানহাতটা ভদ্রলোকের মুষ্টির মধ্যে বন্দী।
কোনোমতে কয়েকটা শব্দ খুঁজে খুঁজে কথা বললাম, “না মানে, আমি তো ওনাকে ভালো অবস্থায় দেখেছিলাম। এখন আবার দেখে সেই সুখস্মৃতি নষ্ট করতে চাই না। সরি।”
কোনোমতে হাত ছাড়ালাম।
উনি হতাশ স্বরে বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু তুমি একটু ভেতরে ঢুকলেই ওনার সাথে দেখা হয়ে যেত। সারা শরীরটাও দেখার দরকার নেই। শুধু মুখটা দেখলেই হত।”
আমার বুকের মধ্যে তখন দামামা বাজছে।
এক দৌড়ে বাড়ি ফিরলাম। বেল টিপলাম। স্ত্রী দরজা খুললে বললাম, “গঙ্গাজল ছেটাও আগে।”
স্ত্রী বললেন, “কি হয়েছে?”
“পরে বলব। আগে গঙ্গাজল দাও।”
“গঙ্গাজল নেই, শেষ হয়ে গেছে।”
“দুত্তোর্!” বলে আমি গাড়ি নিয়ে তাড়াতাড়ি ভারতীয় দোকানে গেলাম। ওদেরও গঙ্গাজল শেষ হয়ে গেছে।
অগত্যা বাড়ি ফিরলাম। ফুটপাতে দাঁড়িয়েই সব জামাকাপড় খুলে ফেললাম। তারপর বাড়িতে ঢুকে পৈতে খুলে, গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করে, স্নান করে, পরিষ্কার জামা পরলাম।
স্ত্রীকে বললাম, “একটু গরম ভূত দাও প্লীজ।”
তক্ষুনি সংশোধন করে বললাম, “ভাত, ভাত! গরম ভাত দাও।”