• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • বিষাদসঙ্গী : রূপসা দাশগুপ্ত


    অতি বড় চাটুকারও আমাকে লেখক উপাধি দিতে লজ্জা পাবে, তবু মাঝে মাঝে মনে বড় ইচ্ছে জাগে ভাগ করে নিতে কিছু কথা, কিছু অনুভূতি। মধ্য ত্রিশে পৌঁছানোর আগেই অভিজ্ঞতার ঝুলি নেহাত কম ভরে ওঠেনি আমার। একুশ শতাব্দীর টেকনোলজির উড়ানে আমার মত অনেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করছেন, অনেকে আদর করে আমাদের গ্লোবাল বাঙালি নাম দিয়েছেন। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের মানুষজনের সাথে মেলামেশার কারণে অনেকেরই হয়তো অভিজ্ঞতার ঝুলি আমার মতই চমকপ্রদ গল্পে ভরপুর।

    এ গল্পকে ঠিক চমকপ্রদ বলা যায় কিনা বলতে পারব না। রহস্য-রোমাঞ্চ, ভূতপ্রেত, তন্ত্র-মন্ত্র বা নিছক প্রেম যা বেশ মন কাড়া, এ তার ধারে-কাছে যাবে না। সম্পর্কের গল্প বটে, কিন্তু সে সম্পর্কে যে ঠিক কীরকম তাও বলতে পারি না। কোথায় যেন একটা আত্মিকতা, টান অনুভব করেছিলাম। আমি দুঃখ-কষ্ট বড় একটা পাইনি জীবনে। অন্তত তার মত তো নয় জানি। তবে তার দুঃখ যে ঠিক কী ছিল তা আর জানা হয়নি। একটি মাত্র দিন একটা মাত্র প্রশ্ন শুনেছিলাম। যে প্রশ্ন আমিই তাকে বহুদিন জিজ্ঞাসা করব ভেবেছি, সহজ মানবিক একটা প্রশ্ন। সে অনায়াসে জানতে চাইল, আর আমি সংকোচে মরলাম।

    উত্তর ইউরোপের এক দেশে কাজের সূত্রে গিয়েছিলাম। বছরখানেকের কন্ট্রাক্ট, কোম্পানির আশা কাজের বরাত বেড়ে দু-তিন বছর হবেই, আর তাদেরও আমার মত টেক শ্রমিক পাঠিয়ে বেশ পকেট ভারী হবে। এ ধরনের কাজে বেশ কিছু বছর ধরেই বিভিন্ন ছোট-বড়, অজানা অচেনা শহরে ঘুরে বেড়াই। বাড়িতে টাকার দরকার রয়েছে। দাদা বেসরকারি অফিসে সামান্য চাকরি করে, আর বাবা কেরানিগিরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত। ব্যাংক লোন নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি। অতএব যেখানে দু’-পয়সা বেশি পাই যেতে আপত্তি করতাম না। মায়ের হাতের শাক-ভাত খেয়ে দুপুরের ঘুম, সেই পরম নিশ্চিন্ত মধ্যবিত্ত জীবন ফেলে আসার ব্যথা মাটি চাপা দিতে শিখে নিয়েছিলাম।

    যে শহরে থাকতে এলাম, বলাবাহুল্য তা বড়ই শীতল। শীতল শুধু পারদের সূচকে নয়, সাদা কালো ধূসর ও বড়জোর বিবর্ণ মরচে রঙের বাড়িঘর। মানুষের পোশাকেও ওই চারটি রংয়ের প্রাদুর্ভাবে শীতলতা যেন আরোই বেড়ে যেত। শহর থেকে একটু বেরোলে ঐতিহাসিক সব কালো কালো ক্যাসেল, আর তাদের হাড় হিম করা ইতিহাস, আমাকে মধ্যযুগের অন্ধকারে এনে ফেলেছে বলে মনে হতো। বছরের একটা দীর্ঘ সময় সাদা বরফের স্তূপে পাতাঝরা কালো লিকলিকে ডালপালার গাছে গাছে শহরটা সাদা কালো ছবি হয়ে যেত।

    এর মাঝে এক টুকরো সিটি সেন্টার। যেখানে একটুখানি প্রাণের ছোঁয়া ছিল। অফিসে দক্ষিণ ভারতীয় একটি ছেলে ছিল ভেঙ্কট, তার সাথেই একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা। এক বাড়ির দুটো ঘর। বাড়িওয়ালা দোতলায় থাকেন। সামনে অতি ভদ্র, আড়ালে ভয়ানক অপছন্দ আমাদের মত রঙিন চামড়াদের, এটা বুঝে নিতে দেরি হয়নি।

    ভেঙ্কটই আমার মনের বিষণ্ণ অবস্থা বুঝে নিয়ে গিয়েছিল শহরের মাঝখানে বাজার এলাকায়। একটা প্রকাণ্ড ইনডোর মার্কেট, কপার সবুজ বিরাট ডোম তার। এই একটা জিনিসই রঙিন, তবে বিবর্ণ। আশপাশে আরও সব প্রকাণ্ড থামওলা প্রাচীন বাড়িঘর, যার কোনটা মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, কোনটা শুধুই শোরুম।

    এসবের মাঝে এক টুকরো স্লেট-রঙা টাইলে বাঁধানো চৌকো চত্বর। সেখানে কেউ গান গেয়ে, কেউ ম্যাজিক দেখিয়ে, কেউ ভায়োলিন বাজিয়ে রোজগার করে। একটি সুন্দরী অল্পবয়সী মেয়ে স্বচ্ছ একটা ভায়োলিন বাজাচ্ছিল, অপূর্ব তার সুর ছড়িয়ে পড়ছিল প্রাচীন বিবর্ণ শহরের অলিগলিতে। এমন ভায়োলিন আমি আগে কখনো দেখিনি। হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে ভেঙ্কট বলল- “জেনিকে দেখে যে আর চোখ ফেরাতে পারছ না ভাই।”

    আমি খুব লজ্জিত হয়ে বললাম, “না, না আমি ভায়োলিনটা দেখছি।”

    তার আরো কিছু রসালো মন্তব্য শুনতে হল, তারপর বলল, “চলো তোমাকে আমার চেনা একমাত্র বাঙালির কাছে নিয়ে যাই, তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।”

    মনসুরদা ভারতীয় আর তার স্ত্রী বাংলাদেশি, একটা মুদিখানার দোকান চালায়। সেখানে সাউথ এশিয়ান সবরকম খাদ্যাখাদ্য পাওয়া যায়। শুধু বাংলা শুনতে পেয়ে যে আনন্দ হতো, কলকাতায় বসে কেউ তা কল্পনাও করতে পারবে না। প্রতি শুক্রবারের বিকেলে ওই চত্বরে আড্ডা মারতে যেতাম আমরা। আর আমি মনসুরদা ও আয়েষা বৌদির পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গীয় বাংলায় ঝগড়া শুনে কান জুড়াতাম, ভেঙ্কটের ভাষাজনিত অসুবিধা হতো, সে যতই হিন্দি ইংলিশ বলে চেঁচিয়ে যেত, আমরা চেষ্টা করেও দু’-তিন মিনিট পর পর বাংলাতেই ফিরে যেতাম।

    সপ্তাহ শেষে ছুটির দুটো দিনের আনন্দে শহরবাসী আত্মহারা হয়ে শুক্রবারের সন্ধ্যাটা উপভোগ করত। সেদ্ধ বাদাম ও জ্যাকেটেট পটাটো নিয়ে ফেরিওয়ালাদের চিৎকার, বিয়ার ভর্তি বিশাল মাগ ছলকে উঠত সবার হাতে হাতে, আর নাচ-গান চলত সমান তালে। যে বিবর্ণ প্রাচীন শহর দেখে প্রথম দিন মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল তা এই দিনে একদম বদলে যেত।

    এমনই একদিন হঠাৎ বাড়ি ফেরার পথে একটা পুরনো বিল্ডিং এর পাশ দিয়ে যাচ্ছি, বিশাল একটা থামের আড়াল থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। কৌতূহলী হয়ে একটু উঁকি দিয়ে দেখি একজন মহিলা। ঘাবড়ে গিয়ে ভেঙ্কটকে দেখালাম। খুব অবাক হয়ে সে জানালো আগে কখনো খেয়াল করেনি।

    দোকানে পৌঁছে ঘটনাটা বলতে মনসুরদা ও বৌদি একযোগে জানালো যে তারা লক্ষ্য করেছে যে একজন ভদ্রমহিলা প্রায়ই ওই জায়গায় বসে কান্নাকাটি করে। আমি বললাম, “তোমরা জানতে চাওনি, কেন কান্নাকাটি করছে?”

    ওরা বলল, “ওই আর কি, সাহায্য চাইবে, ভিক্ষা করছে মনে হয়।”

    “একদম ভিখারি টাইপের নন মহিলা।”

    “তুমি এই জায়গায় নতুন; তাই জানো না প্রতিদিন ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে যেসব রিফিউজিরা ঢোকে তারা খানদানি ভিখারি নয়। তাদের দেখলে ভদ্রলোকই মনে হবে।” জানালো মনসুর।

    মনে মনে ভাবলাম তোমরা তো বেশ! একজন কেন কাঁদছে তা জানার চেষ্টাও করো না, সাহায্য করা তো ভুলেই যাও।

    রাতে ঘুমের আগে ফোলা ফোলা গোলাপি সেই আবছা অচেনা মুখ চেতনে অচেতনে ফিরে ফিরে এল। পরের শুক্রবার ওই চত্বরে যাব, কী জানি তখনো বসে বসে কাঁদবে কিনা।

    শুক্রবার অফিসফেরত ওই চত্বরে আবার গেলাম, মনসুরদের দোকানে কিছু মাছ কিনব, ভেঙ্কটও গেল সঙ্গে। আমরা একসাথে সর্বত্র যাই, লোকজন মোটেই চিনি না। ভাষার সূত্রে এই মুদির দোকানি দম্পতি অচিরেই পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছে আমার। ভেঙ্কটের দুই একজন চেনা আছে, এছাড়া আমরা একদম একা এ শহরে। অফিসে বেশিরভাগ মানুষ স্থানীয়, ডিসিপ্লিন্ড, অতিরিক্ত এটিকেট, মাপা কথা চাপা হাসি, আলাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি এখনো।

    দোকান থেকে ফেরত আসার সময় থামের আড়ালে আমার উদগ্রীব চোখ, হ্যাঁ আজও আছে--তবে কাঁদছে না, একটা রুটি খাচ্ছে। মুখ-চোখ একটু বোঝা যাচ্ছে আজ, অল্পবয়সী, দেখাচ্ছে বেশ। কালচে বাদামি চুল, হলদে ফর্সা রঙ, কোনো মহিলার মুখের দিকে বেশি তাকানো অভদ্রতা, চেহারা এক ঝলক দেখে দেশ বোঝা সম্ভব নয়। এদেশীয় যে নয় তা একরকম নিশ্চিত।

    ভেঙ্কটকে বললাম, “ওই দেখ সেই মহিলা আজও আছে। এখানে বসে ভিক্ষে করে বলেই মনে হচ্ছে। কিছু সাহায্য করতে পারি না আমরা।”

    “খেপেছ! চাইলে তো এগোবো, কিছু না বললে যেচে সাহায্য কীভাবে করব?” ভেঙ্কট বলে ওঠে।

    এর মধ্যে একদিন মনসুরদাকে জিজ্ঞাসা করলে সে বললো যে ভাসা ভাসা শুনেছে নানা কথা--ওই মেয়েটি পরিবারের সাথে খুব সম্ভব সিরিয়া থেকে পালাচ্ছিল, পথে বাকি সকলে মারা গেছে।

    কদিন পরে দোকানে আসা আরেকজন ভদ্রলোক বলল অন্য এক গল্প-- “ইলোপ কেস মশাই, প্রেমিকের সাথে পালাচ্ছিল। ছেলেটিকে ধরে জেলে পুরেছে ওর দেশের সরকার, কী নাকি টেররিস্ট না রেবেলদের সাথে জড়িয়ে।”

    আরো জানলাম ও থাকে ওই ক্যানালের ধারে। কাঁচা বাজারের পরে একটা নালা মত আছে সেটা পেরিয়ে একটা বড় বস্তি, ওদিকে খুব গরীব লোকজন ছাড়া থাকে না কেউ। বেশিরভাগই রিফিউজি।

    আড়ালে বসে কাঁদতে দেখলেও ভিক্ষা চাইতে কোনদিন দেখি না। মনে মনে কল্পনা করি, একদিন ঠিক সাহায্য চাইবে, আর আমিও কিছু দিতে পারব। কোনরকম সাহায্য করতে না পেরে মনটা ভার হয়ে যায়। অথচ এগোনোর উপায় পাই না। হলদে ফর্সা মুখটা কাঁদলে গোলাপি হয়ে ওঠে। তখন তাকে অন্যরকম দেখায়। কোন দেশের লোক? কোথা থেকে পালিয়ে এসেছে? মনে ভাবি আমার ওর দেশ জেনে কী হবে? কষ্টের কারণ জেনেই বা কী হবে? আমি তো কোন কাজে আসব না। কিন্তু আমার তাকে জানার ইচ্ছে বেড়েই চলে। না দেখেও থাকতে পারি না।

    শীতের সময় ছুটির দিনের দুপুরে চত্বরে যাই। ভেঙ্কট ঠান্ডার আলস্যে আজকাল বেশ কাবু হয়ে পালকের বিরাট মোটা লেপ ছেড়ে বের হয় না। এই সুযোগে একাই যাই। দু’-তিন সপ্তাহ মেয়েটির দেখা পেলাম না। ঠান্ডা এত বেশি যে রোদ থাকতে থাকতে ফেরত আসতে হয় ঘরে। একটা ব্যাখ্যার অতীত টান, রহস্য, মায়া ওই মেয়েটিকে ঘিরে থাকে আমার মনে। অবশ্যই ইনফ্যাচুয়েশন বলবে সকলেই, কিন্তু প্রেমজাত কোন ব্যথা অনুভব করি না, আমার সে অনুভূতি জানা আছে।

    আমার প্রেমিকা আছে দেশে, চন্দ্রা একজন উচ্চস্তরের মানুষ আমার চোখে, স্বাধীনচেতা, জবরদস্ত ফেমিনিস্ট মেয়ে। আমার পরিবারের সাথে তার খুব যোগাযোগ আছে। দাদা যা কিছু সামলাতে পারে না তার বেসরকারি কেরানি জীবনের এক্সপ্লয়টেশনের কারণে, চন্দ্রা সেসব অবলীলায় সামলায়। নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, খাটে খুব, একটা এনজিও-তে কাজ করে। বঞ্চিত মহিলাদের স্বনির্ভর করার কাজ করে তারা। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল-- চন্দ্রার ওই হাজার মেয়ের হাজার সমস্যার কথা শুনতে শুনতেই তবে কী আমি এই মেয়েটির জন্য উতলা হয়ে উঠছি, চন্দ্রার প্রভাবে?

    এর মধ্যে একদিন বিকেল নাগাদ তখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, চত্বরে যেতে দেরি করে ফেলেছি, মনে হল মেয়েটিকে এক ঝলক দেখতে পেলাম ক্যানালের দিকে চলেছে। খানিকটা আনমনেই ক্যানালের দিকের রাস্তা ধরলাম। হাঁটতে হাঁটতে বাজার পার করে ক্যানাল-এর জলে বাঁধা বোটের সারির কাছে পৌঁছে গেলাম। বোটগুলোতে মানুষ যে সংসার করে তা আগে বুঝিনি, ক্যানালটি বেশ সংকীর্ণ, কিছু দূরে গিয়ে খাঁড়িতে মিশেছে। জল তত পরিষ্কার নয়, শহরের নালানর্দমা বোধ হয় এতে মেশে। এই সচ্ছল দেশের মধ্যে এভাবে মানুষ থাকে দেখে অবাক হলাম।

    মেয়েটি একটা বাঁক নিয়ে নীচু ঘিঞ্জি কাঠের ঘরবাড়ির মধ্যে হারিয়ে গেল। এদিকে শীত তীব্র হচ্ছে, অন্ধকার নামছে। হঠাৎ ৪-৫টা লোক মাটি ফুঁড়ে উঠে এসে আমাকে ঘিরে ধরল। একটু বোঝার আগেই পকেট থেকে টাকার ব্যাগ, আর গলায় একচিলতে যে সোনার হার পরে থাকি সেটা কেড়ে নিল। তারপর মাথায় জোরে আঘাত, জ্ঞান হারানোর আগে শুনতে পেলাম ওরা শাসাচ্ছে-- “আমাদের মেয়ের পিছু নিয়েছ কী প্রাণ নিয়ে ফিরবে না।”

    কীভাবে চত্বরে ফিরলাম জানি না, আমাকে নাকি চত্বরের কাছে পড়ে থাকতে দেখে পুলিশ ডাকা হয়, ঠান্ডায় প্রাণটা চলেই যেত কেউ না দেখলে। যাহোক, আমি চুরির ব্যাপারটা বললেও অন্ধকারে কাউকে দেখিনি বলে তাদের জানালাম। বস্তির দিকে যে গিয়েছিলাম সেকথাও এড়িয়ে গেলাম, পুলিশ বেশি খোঁজখবর করলে মেয়েটি বিপদে পড়তে পারে ভেবে।

    এই আহত হওয়ার ঘটনার ফল হল এই যে আয়েষা বউদির কাছে আমি ধরা পড়ে গেলাম। সুস্থ হয়ে কদিন পরে মনসুরদার দোকানে এসেছি, দোকানে আয়েষা বউদি একা ছিল। আপ্যায়ন করে রোজকার ভালোমন্দ প্রশ্ন শেষে জানালো, “ভাইজান, আপনাকে কটা কথা বলি, কিছু মনে করবে না তো?”

    আমি প্রমাদ গনলাম, মুখে বললাম, “নিশ্চয়ই বলবেন।”

    “ওই মেয়েটাকে ভুলে জান, ওর বস্তির লোকগুলা ভয়ানক, এখানে খুব বদনাম।”

    আমি চমকে তাকালাম, কিছু বলতে পারলাম না তখনই।

    “আপনি অনেকবার মেয়েটার কথা জানতে চেয়েছেন, আমরা তিন বছর মাত্র এখানে আছি, অরে খেয়ালও করিনি, কাজেকম্মে ব্যস্ত থাকি। এক বুড়া সাহেব আসেন আমার দোকানে তাকে শুধালাম সেদিন, আপনার কথা ভেবেই।”

    বউদি যা বললেন অধোবদনে শুনলাম, এই প্রবাসে শুভাকাঙ্ক্ষী যে আছে এই তো পরম প্রাপ্তি।

    এ শহরের পুরনো বাসিন্দা এক বৃদ্ধ, বউদিদের দোকানের খদ্দের, এশিয়ান মশলা ও চাল নাকি তার খুব প্রিয়, তিনি অনেক খবর রাখেন। সে নাকি মেয়েটি ও তার বস্তির লোকজনকে “স্লেভ” বলে উল্লেখ করছিল, বউদি তার অর্থ বোঝেনি।

    কেন বা এযুগে মানুষকে স্লেভ বলা হবে অবাক হয়ে জানতে চাই, বউদি বলে যে - এ সে স্লেভ নয় কোনো একটা জায়গার মানুষ বোঝাতে চেয়েছে বৃদ্ধ।

    “মোদ্দা কথা তাড়া-খাওয়া ঘরছাড়া লোকজন, যত্ত রকম বাজে ধান্দায় ঘুরে, তাই আপনাকে সাবধান করাটা দরকার মনে করি।”

    আমি মাথা নীচু করে শুনছি, তাকাচ্ছি না বউদির দিকে, বললাম, “মেয়েটি প্রায়ই ওইখানে বসে কাঁদে, তাই বড় খারাপ লাগে, মনে হয় যদি জানতে পারতাম কী সমস্যা, তাহলে হয়তো কোন সাহায্য করতেও পারতাম।”

    ‘“দ্যাখেন, কোনো একটা ঘটনা আছে ওই জায়গায়, সাহেব সঠিক জানে না, খুব সম্ভব একখান বাচ্চা নিয়ে আসছিল মেয়েটা এ শহরে, তারে আর দেখা যায় না, হয়ত বাচ্চাটা আর নেই, তাই কান্দে। কত মানষের কত দুঃখ ভাইজান, আমরাও তো গরীব দ্যাশের মানুষ, প্যাটের জন্য এখানে পড়ে আছি, আমাদের কতটুকু ক্ষমতা যে অন্যের দুখ দূর করব।”

    ঘরে ফিরে এলাম এই সব ভাসা ভাসা তথ্য থেকে ডিটেক্টিভের মত রহস্য ভেদ করতে হবে এই উৎকণ্ঠায়। এযুগে আঙ্গুলের ডগাই জ্ঞান অর্জনের হাতিয়ার, ইউরোপের রিফিউজিদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হয়ে গেল সেই বিনিদ্র রাতে, বুঝলাম ওই বস্তির অধিকাংশ মানুষই যুদ্ধবিধ্বস্ত বালকান অঞ্চল-এর পালিয়ে আসা মানুষ, বৃদ্ধ ‘স্লাভ’ বলেছিলেন। এইসব ঘটনার ইতিহাস সম্পর্কে আমার জ্ঞান কম স্বাভাবিকভাবেই, ইতিহাসে বরাবরই পাতিহাঁস জুটেছে। তাছাড়া এ বহু বছর আগের ঘটনা, বর্তমানেও দেখলাম প্রায়শই অশান্তি লেগে আছে ওসব দেশে।

    এখানে একটু আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, কিছু মানুষ থাকে মানবিক সূক্ষ্মবোধসম্পন্ন, মানুষের দুঃখকষ্টের সঙ্গে তারা একাত্মতা অনুভব করতে পারে সহজেই, যেমন আমার বাগদত্তাটি। নিজে যে তার থেকে অতি নিকৃষ্ট তা নিয়ে আমার সন্দেহের অবকাশ ছিল না। পৃথিবীর মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস সম্পর্কে অমনোযোগী থেকে, নিজের স্বার্থপরতার গণ্ডিতেই খুশি ছিলাম। কিন্তু এবারে এই মেয়েটিকে জানার আগ্রহে, এক অসহ্য যুদ্ধঅপরাধের কিছু কিছু ঘটনা সম্পর্কে জানা হয়ে গেল, সে রাত্রে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম, ঘুমোতে পারলাম না।

    এতদিনে মেয়েটি আমাকে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছে, অন্তত আমার তাই ধারণা। তবু একদিনও তার কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করতে পেরে উঠলাম না ‘তোমার কী কষ্ট? কেন তুমি কাঁদো এখানে বসে বসে দিনের পর দিন?’

    মাঝে মাঝে ভয় হয় হঠাৎ একদিন আমার কাজ ফুরিয়ে যাবে আর হঠাৎই আমি চলে যাব এই শহর ছেড়ে, কোনদিন আর দেখা হবে না। অজানাই থেকে যাবে ওই মানুষটির কষ্টের, যন্ত্রণার কারণ। কেন যে ভয় হয় তা নিজের কাছেই এক রহস্য, এ আমার দেশ নয় ছেড়ে যাব একদিন তা তো জানা কথা।

    এর মাঝে পৃথিবীর মানুষের দিকে গুটি গুটি এগিয়ে আসছিল এক কালো ছায়া। তা কেউ টের পাইনি। হঠাৎই মহামারির আতঙ্ক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সারা দুনিয়াই মুখ-নাক ঢেকে ফেলল ও নিজেদের গর্তে সেঁধিয়ে থাকতে শুরু করল। এ শহর ছোট ও অখ্যাত, বিধিনিষেধ খুব কড়া নয়। ফাঁকা জায়গায় দূরত্ব মেপে লোকজন বেড়াচ্ছে। মুশকিল হলো অন্য দেশে যাওয়া-আসা বন্ধ হতে বসেছে। দেশে যেতে হলে এক্ষুনি ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পড়া দরকার, চাকরি একরকম ছেড়ে দিয়ে। ভয়ানক ছাঁটাই শুরু হয়েছে সর্বত্র ইতিমধ্যেই। অর্থাৎ দেশে ফিরলে কিছুকাল অনিশ্চিত রোজগার।

    ভেঙ্কট ঠিক করল ও ফিরে যাবে। কোম্পানি জানিয়ে দিয়েছে একবার গেলে কতদিনে এ দেশে ঢোকা যাবে তার কোন নিশ্চয়তা না থাকায় চাকরি যাবেই। নতুন প্রজেক্ট পোস্টিং এখন অসম্ভব। ভেঙ্কট তবু যাবে, তার পরিবারে কেউ তার ওপর নির্ভর করে না, উচ্চবিত্ত বাড়ির ছেলে সে।

    আমি বাড়ির সবার সাথে আলোচনা করতে বসি, মা বাবা বলেন এখানেই থেকে যেতে।

    ‘কদিন পর সব সুস্থ হলে আসবি, কতদিনই বা এইরকম চলবে? আমরা ঘরেই আছি, আমাদের আর কী হবে?’ এই বক্তব্য তাদের।

    দাদা জানায় তার স্বল্প আয়ের বেসরকারি কাজ এই মহামারির ধাক্কা সামলাতে পারবে কিনা সন্দেহ, “তুই ওখানেই বেশ ভালো আছিস, প্যান্ডেমিক তেমন বেশি ছড়ানোর চান্স কম, তাই না? অল্প মানুষের বাস, তাছাড়া পয়সাওয়ালা লোকজন বেশি।” মনে ভাবি কীসব আজব ধারণা এদের, রোগ কি পয়সা দেখবে?

    চন্দ্রা কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে অন্য কথা বলল, “তুমি ফিরে এসো। এইসব কতদিন চলবে জানা নেই। যাতায়াতের রেসট্রিকশন চালু হচ্ছে সব দেশে। তোমার বাবার অনেকটা বয়স, অসুস্থ। এখানে কারো অসুখ হলে আসবে কীভাবে?”

    তবু অন্নচিন্তারই জয় হলো, আমি থেকে গেলাম একা ঘরে। অফিস বন্ধ, ঘর থেকেই কাজ, সময় কাটে রোগের খবর দেখে। বাড়িওয়ালা আমার থেকে যাওয়ায় পয়সাকড়ির নিশ্চিন্ততায় বেশ খুশি হলেও, তার হাবভাব দেখে মনে হলো আমার চামড়ার ময়লা রঙের কারণে আমি এক্ষুনি রোগ ছড়িয়ে বেড়াব।

    যাতায়াতের পথে দেখা হয়ে গেলে মনে হতো, আঁতকে উঠে ছ’ ফুটের বদলে দু’ মাইল দূরে সরে যাবে। আমাকে পরামর্শ দিলেন ঘরেই বন্দি থাকার, জিনিস অর্ডার দিলে তো ডোরস্টেপেই দিয়ে যাবে দোকানিরা।

    আমি জানাই সিটির তরফে সেরকম কার্ফু জারি হলে অবশ্যই আমি মেনে চলব, এখনো তো সে পরিস্থিতি আসেনি এখানে। সে বড় বিরক্ত মুখে সরে গেল, ওনার সাথে শুধু ফোনে কথা হবে জানালেন, জ্বরটর হলে ওনাকে না বিরক্ত করে যেন হেল্পলাইনেই ফোন করি। এই পরিবেশে আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করলাম।

    সিটি সেন্টারেও লোকজন অনেক কম। গান-বাজনা করত যারা, তাদের রোজগারও খুবই কমে গিয়েছে, বিমর্ষ হয়ে বসে থাকে তারা। শিল্পীদের দু’-এক পয়সা সাহায্য করি সাধ্যমত, এখনো আমার রোজগার আছে, যা অতি সৌভাগ্যের।

    কাছাকাছি হলেই সবাই মুখ মাস্কে ঢাকে, রোগ বাড়ছে পৃথিবী জুড়ে। আমি সেই মেয়েটিকে আর দেখতে পাই না। রোজ সিটি সেন্টারে যেতে পারি না। অফিসের ওয়ার্কিং আওয়ারস বেশ শিথিল হয়ে যাচ্ছে, যেকোনো সময় কাজ ওঠাও, শুধু মিটিং অফিস টাইমে সেট করা হয়।

    মনসুরদের দোকান থেকে অল্প জিনিস কিনে চত্বরে হাঁটি মাঝে মাঝে, ওদের দোকান ধুঁকছে, তবু ওরাই একমাত্র কথা বলার লোক আমার।

    অনেক দিন এভাবে কাটানোর পর আমার খুব চিন্তা হয় মেয়েটির জন্য। মনে হয় বস্তির দিকে যাওয়ার যদি কোনো রকম উপায় থাকত। বস্তিতে কি রোগ খুব ছড়িয়েছে? ওরাই এ শহরের মধ্যে সবচেয়ে ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকে। লোকাল নিউজ শুনেও তাই মনে হল, মনটা খুব খারাপ থাকে আজকাল, মেলাঙ্কলিয়ায় ধরেছে।

    বাড়ি থেকে এই সময়ই দুঃসংবাদ পেলাম। মা-বাবা দুজনেই কোভিড পজিটিভ, হাসপাতালে ভর্তি। ভয়ানক অবস্থা কলকাতার হাসপাতালের সে সময়, কে কার সেবা করে তার ঠিক নেই, যথেষ্ট ওষুধ, অক্সিজেন সবকিছুর অভাব, ডাক্তার নার্সরা জীবন বিপন্ন করে মানুষের সেবা করছে, তাও পেরে উঠছে না সব সময়।

    চন্দ্রা ছোটাছুটি করছে দাদার সাথে। উৎকন্ঠা নিয়ে দিবারাত্র ঘরে বসে থাকতে থাকতে আমার সিভিয়র ডিপ্রেশন শুরু হল, এবারে চাকরি ছেড়েই চলে যাব ভাবলাম। কিন্তু দেশে আর ঢোকা যাবে না। ততদিনে বিদেশের বিমান ঢোকা পুরো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

    দশ দিনের মাথায় বাবা চলে গেল। চন্দ্রার সাথে এই অবস্থাতেও ঝগড়া হলো ভয়ানক, সে আমাকে হিপোক্রিট অমানুষ বলে যাচ্ছেতাই কথা শোনালো। সত্যিই, সে বার বার বলা সত্ত্বেও আমি দেশে যাইনি। বাবার কাজ কোনমতে সম্পন্ন করল দাদা। পাঁচজন অতি নিকট মানুষের সাহায্যে, সরকারের নিয়ম মেনে। চন্দ্রাও করল প্রাণপণ, কিন্তু কাজের পরপরই সে জানিয়ে দিল, সে আমাকে বিয়ে করতে পারবে না, সম্পর্ক ভেঙে দিতে চায় সে।

    সহ্য-ক্ষমতা সেদিন তলানিতে ঠেকেছে, প্রায় ফাঁকা সিটি সেন্টারের চত্বরে গিয়ে দাঁড়ালাম ভূতগ্রস্ত মানুষের মত। সেই থামের আড়ালে বসে কেউ আজ কাঁদছে না, অনেক দিন থেকেই তাকে আর দেখি না। আজ সেই প্রাচীন দৈত্যাকৃতি পিলারটি চুম্বকের মত আমাকে টেনে নিয়ে গেল। সেই মৃতদেহের মত শীতল ও নির্জন দুপুরে আমার হৃদপিণ্ডে বড় ঠান্ডা সরীসৃপ রক্ত বইছে মনে হলো। অসহ্য কষ্ট গলা চিরে উঠে এল। দুহাতে মুখ ঢেকে হু-হু করে কেঁদে উঠলাম।

    সময়ের জ্ঞান ছিল না, বেশ কিছুক্ষণ পরে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। মুখ তুলে সামনে তাকাতে দেখি বিপজ্জনক হাত চারেকের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোভিডকালীন দূরত্ব নিষেধ অমান্য করেই। আমি শুনতে পেলাম এক রকম ফিসফিস করে সে বলছে “কী হয়েছে আপনার? আপনি কাঁদছেন কেন?”

    আমি হতবাক হয়ে উত্তর না দিয়ে চুপচাপ চেয়ে আছি, মিনিট খানেক কেটে গেল বোধহয়। শোক যদি অপূর্ব নারীর মূর্তি ধারণ করতে পারত, তা বোধহয় এমনি হতো! সংকোচে কোনোদিন ভালো করে তাকিয়ে দেখিনি।

    উত্তর না পেয়ে সে বলল, “এই জায়গাটা আমার খুব প্রিয়। আমি এখানে কিছু সময় কাটাতে চাই বলেই এসেছি।”

    নীরবে উঠে দাঁড়ালাম, যতটা সম্ভব নিঃশব্দে সরে যেতে যেতে ঝাপসা চোখে আর দুটো ছলছলে চোখ শেষবারের মত দেখেছিলাম। জানা হয়নি, অজস্র গল্পের মধ্যে তার সত্যকার ব্যথার কাহিনী কোনটি।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments