• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • নদীর সঙ্গে দেখা : তানিয়া দত্ত ঘোষ

    --তারপর যেতে যেতে যেতে এক নদীর সঙ্গে দেখা।

    --এক নদী মানে? কেমন নদী?

    --সে এক পাহাড়ি নদী।

    --পাহাড়ি নদী ঠিক কেমন হয়? ওই যে এরোপ্লেনে যেতে যেতে গঙ্গাকে দেখেছিলাম, কেমন গা এলিয়ে শুয়ে যেন রোদ পোহাচ্ছে, ওই রকম?

    -- না না, পাহাড়ি নদী হল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চলতে থাকা এক ছটফটে মেয়ে যেন। গা এলাবার সময় কোথায় তার!

    -- তারপর?

    -- তারপর আমি তাকে ছুঁয়ে-থাকা পাথরে পা রাখলাম, হালকা ছাই-রঙা পাথর, তার কিছুটা গেঁথে আছে জলের তলার চিকচিকে বালু মাটিতে, কিছুটা অনবরত স্নান করে চলেছে নদীর খলবলে জলে, আর বাকিটা জেগে বসে বিকেলের পড়ন্ত আলোর সঙ্গে প্রেমালাপে ব্যস্ত। একটা দুটো করে পাথর পেরিয়ে গিয়ে পা রাখলাম জলে। হিম ঠাণ্ডা জল, ছুটে চলেছে দুরন্ত গতিতে।

    -- আরে আরে, তিতাস এবার বাধা দেয়, আমি তো এমন একটা নদীই চেয়েছিলাম তোর কাছে। বলেছিলাম, আমাকে একটা নদী কিনে দিবি? তুই কিন্তু দিবি বলেছিলি। ভুলে গেলি কী করে!

    -- তুই তো কত কিছুই চাস যার কোন মাথামুন্ডু থাকে না। অথচ তুই চেয়েছিস বলে আমি অন্য সব কিছু ফেলে তাকেই খুঁজে মরি।

    দীপ্যমান তিতাসকে খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়তে দেখে। তিতাস হাসে, তার সঙ্গে হাসে তার চোখের তারা, তার দাঁতের সারি আর তার বেগুনি খয়েরি এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। আবাসনের দশ তলার বারান্দায় বসে কথা বলে দীপ্যমান তিতাসের সঙ্গে। পশ্চিমের বারান্দা, দীপ্যমানের ঘরের লাগোয়া। শহর কলকাতার পশ্চিম আকাশে এখন পড়ন্ত বিকেলের রঙের ছটা, সেই রঙের ছোঁয়া তিতাসের গালে, কপালে। দীপ্যমান মুগ্ধ হয়ে দেখে।

    -- এইরকম হাসলে না তোকেও সেই নদীটার মত দেখতে লাগে, জানিস?

    তিতাস কি একটু লজ্জা পায় দীপ্যর কথায়?

    -- কার সঙ্গে কথা বলছিস রে? বলতে বলতে পৃথা এগিয়ে আসে ছেলের ঘরের দিকে, কেউ কি এল ছেলের কাছে? তিনি তো কিচেনেই ছিলেন, লক্ষ্য করেননি তো! ছেলের ঘর পেরিয়ে বারান্দায় চলে এলো পৃথা, কই! কেউ তো নেই!

    --কী রে? কী বক বক করছিলি? তুই কি আজকাল কবিতার সঙ্গে নাটকের ডায়ালগও বলছিস?

    ছেলে উত্তর দেয় না, একটু যেন বিরক্ত,

    -- আঃ! যাও না তুমি, একটু বসতেও দেবে না শান্তিতে, সারাক্ষণ নজরদারি।

    পৃথা হেসে ফেলে, ছেলের মাথায় হাত বোলায় একটু, ছেলে ছিটকে সরে যায়,

    -- যাও না তুমি।

    -- যাচ্ছি যাচ্ছি, খেতে আয়, লুচি হচ্ছে।

    পৃথা সরে যায়, কপালে চিন্তার ভাঁজ। দীপ্যমানের মুখ ভার, তিতাস চলে গেছে। বাবা মা কেউ কাছে আসছে টের পেলেই ও যে কোথায় পালিয়ে যায়, দীপ্যমান আর ডাকলেও আসে না। মন খারাপ হয়ে যায় দীপ্যর। তিতাসকে বলাই হলো না নদীটার নামটা। আসলে দীপ্যমান নদীটা নিজেই এখনো দেখেনি, কিন্তু দেখবে এই কিছুদিনের মধ্যেই। সামনের সপ্তাহেই বাবা মায়ের সঙ্গে তার উত্তরবঙ্গ যাওয়ার কথা। বাবা যাচ্ছে কাজে, দুদিনের জন্য, সেখান থেকে তারা যাবে ঝলং। ঝলং তার বাবার খুব প্রিয় জায়গা। পাহাড়ি নদী ঝলং-এর পার বরাবর ধাপে ধাপে ছোট ছোট কটেজ আছে, সেখানেই থাকবে তারা। বাবার মুখে এই জায়গাটার বর্ণনা শুনে শুনে নদীটাকে সে দেখতে পায়। তারই বর্ণনা দিচ্ছিল সে তিতাসকে। তার মনে মনে ভীষণ ইচ্ছে, তিতাসও যায় তাদের সঙ্গে। কিন্তু সমস্যা হল তিতাসকে পৃথা বা দেবেশ কেউই চেনে না। তিতাস কিছুতেই তাদের সামনে আসে না। আর দীপ্যমানও বাবা-মাকে দু’-একবার বলে দেখেছে তিতাসের কথা, তারা যেন ভারি অবাক হয়ে যায়।

    -- তোর আবার তিতাস নামে বন্ধু কে আছে? তোর কলেজে পড়ত? নাম শুনিনি তো আগে।

    দীপ্যমান আর কিছু বলে না, সব কথা বলতে তার ইচ্ছে করে না। তিতাস তার নিজের, একান্ত নিজের, সবাইকে তার তিতাসের কথা বলতে ইচ্ছেই করে না।

    তিতাস হাত বাড়ায়,

    --চল যাই।

    --কোথায়?

    --জাহান্নামে।

    -- আয় বলছি, জুতোটা থাক, খালি পায়ে চল। নদীটা কিনবি বলছিস, তার আগে নদীর জলে পা রাখবি না? পাথরের শ্যাওলা, নদীর বুকের বালি ছুঁয়ে দেখবি না?

    আপাতত জলে পা ডুবিয়ে একটা ঘন ছাই-রঙা পাথরের ওপর বসে আছে দীপ্যমান, সামনের দুটো পাথরে পা রেখে দাঁড়িয়ে তিতাস। পা ছুঁয়ে খলবল করে বয়ে চলেছে ঝলং নদী, পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে, ছিটকে উঠছে জল, সকালের নরম রোদ ঝিলিক দিয়ে উঠছে তাতে। সাদা কালো ডোরাকাটা একটা অচেনা পাখি বকের মত পা টিপে টিপে পাথরের খাঁজে খাঁজে খাবার খুঁজে চলেছে। দূরের কটেজটার বারান্দায় বসা তার বাবা আর মা, দেবেশ আর পৃথা। দীপ্যমান যেখানে বসে আছে, সেখান থেকে একটা সরু সিমেন্টে বাঁধানো পথ চলে গেছে ঐ দূরের কটেজটার দিকে। অসুখটা ধরা পড়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায়, দীপ্যমান অনেকটা স্বাভাবিক হবার পর তারা তিনজন বেড়াতে এসেছে ঝলং নদীর পারে।

    নদীর উলটো পারেই পাহাড়ের গায়ে ঘন জঙ্গল। তিতাসের থেকে চোখ সরিয়ে নদীটা যেদিক থেকে আসছে, সেই দিকে তাকায় দীপ্যমান, মেঘ জমে আছে পাহাড়ের গায়ে। পাহাড়ের পরতে পরতে সবুজের ভিন্ন ভিন্ন রং। তার নীচের দিকে দাঁড়িয়ে আছে, বড় বড় বিভিন্ন আকারের পাথর আর তারই মাঝখান দিয়ে এঁকে বেঁকে নেমে এসেছে নদীটা।

    -- আমি সেই সূর্য ওঠার আগে থেকে অপেক্ষা করছি তোর জন্য, তোর এতক্ষণে সময় হল!

    তিতাসের গলায় অভিমান।

    -- জানিস তো আমি ঘুম কাতুরে। তবু আমি আজ সকালে উঠতে হবে বলে ওষুধও খাইনি কাল রাতে শোবার আগে। ওষুধগুলো খেলেই তো আমার বড় ঘুম পায়, আমি ঘুমিয়ে পড়ি জানিসই তো!

    -- বেশ করেছিস। ওইসব ওষুধ খেলে তুই আমাকেও ভুলে যাবি যে।

    -- তাই তো আমি আজকাল ওষুধ খাই না, মা দিলেও আমি লুকিয়ে ফেলে দিই। কিন্তু তুই কি জানিস তিতাস আমাকে কেন এই ওষুধগুলো খেতে হয়?

    --কেন?

    --দেড় বছর আগে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে নাকি আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমি কিন্তু হারাইনি জানিস। আমার অফিসের ওই উঁচু থেকে দূরের দিকে তাকালে শুধু জল আর জল দেখা যায়, যেগুলো নাকি মাছের ভেড়ি, আমার মনে হয়েছিল যে কবি সুনীল গাঙ্গুলীর কবিতায় যে তিন প্রহরের বিলের কথা পড়েছি, যা নাকি তেত্রিশ বছরেও কবি দেখতে পাননি, সেই বিল বুঝি ওইখানেই কোথাও আছে। আমি সেই বিল খুঁজতে অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম, ফোনটাও ফেলে গিয়েছিলাম অফিসে সেদিন। কিন্তু আমি সেদিন একা যাইনি। নাদের আলী ছিল সঙ্গে। নাদের আলী আমাকে বলেছিল, যে একজনকে কথা দিয়ে ওই বিল দেখাতে পারেনি, আমাকে সে নিশ্চয়ই দেখাবে।

    --দেখতে পেলি সেই বিল?

    --না রে, অনেক খুঁজলাম। খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে শেষে রাত হয়ে গেল। নাদের আলী বলল, “দাদাবাবু এত রাতে তো বিল খুঁজে পাব না, তুমি ঘুমাও আমি বরং ভোরের আলো ফুটলেই তোমাকে ঠিক নিয়ে যাব সেই বিলের ধারে।” একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে শুয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরবেলা ঘুম ভাঙল যখন, তখন দেখি আমাকে ঘিরে অনেক মানুষ, কিন্তু তার মধ্যে নাদের আলী নেই। আমি অনেক ডাকলাম, জিজ্ঞেস করলাম সবাইকে, “তোমরা নাদের আলীকে দেখেছ?” কেউ বলতে পারল না।

    --তারপর?

    --তারপর পুলিশ, বাবা মা, বাড়ি, ডাক্তার, রিহ্যাব। ডাক্তার বলল, আমি নাকি বাইপোলার! কেউ বিশ্বাস করল না জানিস নাদের আলীর কথা। নাদের আলীও আর এল না। বিশ্বাস না করলে কি কেউ আসে কখনো? এই যে তোর কথা বাবা-মা বিশ্বাস করে না বলেই তো তুই ওদের সামনে আসিস না। তাই না?

    -- দী ই ই ই প্য ও… পৃথা ডাকে ছেলেকে।

    দূর থেকে ভেসে আসা পৃথার সে ডাক শোনা যায় না নদীর জলের শব্দে।

    পৃথা আর দেবেশ বসে দূরের কটেজের বারান্দায়।

    -- দীপ্য কার সাথে কথা বলছে মনে হচ্ছে না? ওর কাছাকাছি কাউকে দেখতে পাচ্ছ?

    পৃথা দেবেশের দিকে ফেরে।

    -- কিছুদিন ধরে দীপ্যকে কিন্তু আমার ঠিক লাগছে না।

    -- ওষুধ খাচ্ছে তো ঠিকমত?

    -- আমি তো নিজেই হাতে দিচ্ছি রোজ। আচ্ছা, ও কি আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না আগের মত! এখনো তো তিরিশও ছোঁয়নি,

    বলতে বলতে চুপ করে যায় পৃথা।

    দেবেশ উত্তর দেয় না, একটা দীর্ঘ শ্বাস পড়ে তার। হঠাৎ পৃথার দিকে ফেরে সে,

    -- আচ্ছা পৃথা, তুমি তিতাস বলে দীপ্যর কোন বন্ধুকে চেন? গতকাল ও অনেকবার ওর কথা বললো, ওর নাকি ছোটবেলার বন্ধু। আমি তো চিনি না সবাইকে। তুমি চেন কাউকে ওই নামে?

    -- না। ওর ছোটবেলার সব বন্ধুদের চিনি, এই নামের কারো কথা তো মনে পড়ছে না

    -- তবে কি আবার আগের মতো!

    দেবেশের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে,

    --পৃথা, দীপ্যর সাইক্রিয়াটিস্টের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট যেন কবে?

    -- কী রে চল, আর দেরি করিস না। ওই দেখ আঙ্কেল, আন্টি উঠে পড়ছে, এদিকেই আসবে এবার। আমি কিন্তু চললাম ঝলংকে চিনতে রে।

    দীপ্যমান চটপট উঠে পড়ে ওর হাতটা ধরে। ও জানে মা ওকে কিছুতেই তিতাসের

    সঙ্গে যেতে দেবে না, বাবাও দেবে না। তিন প্রহরের বিল সে দেখতে পায়নি সেবার, কিন্তু ঝলংকে তার চিনতেই হবে।

    এগিয়ে যায় দীপ্যমান এবার ওই সবুজে মোড়া পাহাড়ের দিকে নদীর পাথরে পা ফেলে ফেলে, তিতাসের সঙ্গে। ক্রমশ মিলিয়ে যায় পাহাড়ের সবুজে, বড় পাথরগুলোর আড়ালে।

    ঝলং নদীর জলের ঝাপটা ছুঁয়ে যায় ছাই-রঙা পাথরটার ওপর পড়ে থাকা দীপ্যমানের জুতো জোড়াকে।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments