



তুমি ঋষি বিশ্বামিত্রর সেই গল্পটা জানো তো? বিশ্বামিত্র ছিলেন ক্ষত্রিয় রাজা যিনি ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করে ব্রাহ্মণ হতে চেয়েছিলেন। পারেননি। ওই ঋষিত্ব অবধি পৌঁছতে পেরেছিলেন।
সেই যুগে বশিষ্ঠ ছিলেন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ ঋষি।
ত্রিশঙ্কু নামে এক রাজা চাইলেন সশরীরে স্বর্গে যাবেন। নিজের শরীরের প্রতি মানুষের এই বোকা-বোকা মোহটা এখনো আছে। বশিষ্ঠ বললেন, সেটা অসম্ভব। নিজের শরীর নিয়ে স্বর্গে যাওয়া যায় না। (অবশ্য মহাভারতের শেষে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে গিয়ে ছিলেন।)
ঠিক তার পরে কী হয়েছিল জানি না, কিন্তু এখনকার রাজনৈতিক নেতার ছেলেদের মত, বশিষ্ঠর ছেলেরাও মেজাজ গরম করে ত্রিশঙ্কুকে শাপ দিল। বলল, যে ত্রিশঙ্কু চণ্ডাল হয়ে যাবেন – মানে সবচেয়ে নীচু যে শ্রেণী, যাদের এখনো অনেকে নিকৃষ্ট জীব মনে করে, কিন্তু যাদের ছাড়া আমাদের বাথরুম পরিষ্কার হয় না। শুধু চণ্ডাল না, কালো ও কুৎসিত হয়ে যাবেন, কালো লোহার গয়না-পরা চেহারা হবে, না-আঁচড়ানো চুল, গায়ে শ্মশান থেকে কুড়োনো জামা।
হিন্দুদের গল্পের পেছনে আরেকটা গল্প থাকে, তার পেছনে আরেকটা গল্প। আরব্যরজনীকে সহজেই হার মানিয়ে দেয়। সেই একটা ব্যাকস্টোরির জন্য বশিষ্ঠর রাগ ছিল ত্রিশঙ্কুর ওপর। খিদের চোটে নাকি বশিষ্ঠর গরু মেরে খেয়েছিলেন ত্রিশঙ্কু। গল্পের এই ভার্শানে ত্রিশঙ্কুর চরিত্রটা একটু অন্যরকম। কিন্তু আমরা তো সামান্য মানুষ। একটা সহজ সরল গল্পের লাইন রাখাই ভালো।
ত্রিশঙ্কু এই রকম ভয়ানক শাপ পেয়েছেন দেখে, তাঁর সব প্রজা ছুটে পালাল, অনেকটা যেন সৎসাহসী বাঙালি মধ্যবিত্তর মত। ভদ্রলোক তখন বিশ্বামিত্রর কাছে গেলেন। বিশ্বামিত্র বললেন, নিশ্চয়ই হবে সশরীরে স্বর্গারোহণ। আলবাত হবে।
ভেবে দেখো – ব্রাহ্মণ বলেছে না, ক্ষত্রিয় বলেছে হ্যাঁ। কত সাহস!
বিশ্বামিত্র বললেন, যজ্ঞ করতে হবে।
যজ্ঞ সার্থক হতে হলে বৈদিক পণ্ডিতদের উপস্থিতি দরকার। কিন্তু তাঁরা সবাই নেমন্তন্ন প্রত্যাখ্যান করল। একজন না, দুজন না, সব্বাই! আমাদের সমাজের আধ্যাত্মিকতার সব মহীরুহ তাঁরা। সবাই বললেন, না ভাই, তুমি ক্ষত্রিয় হয়ে এক চণ্ডালের জন্য যজ্ঞ করবে – কী করে আশা করলে যে আমাদের মত সব কেউকেটারা সেখানে আসব?
শোনা গেছে যে এর পেছনে বশিষ্ঠর হাত ছিল।
ব্যাস, হয়ে গেল। বিশ্বামিত্র রগচটা মানুষ। তিনি পণ্ডিতদের শাপ দিলেন যে তাঁরা নিকৃষ্টতম নিষাদ আর উৎকট শরীরের মুষ্টিকা হয়ে শ্মশানে শ্মশানে কুকুরের মাংস খেয়ে বেড়াবে। নিষাদ মানে যাদের আমরা এখন আদিবাসী বলি। কেন জানি না, আধুনিক ভারতের সংবিধান যেটা – যে বস্তুটা অধুনা অচিলত – সেখানে আদিবাসী শব্দটা নেই। তার বদলে আছে তফসিলি উপজাতি। এই লোকগুলোর প্রাথমিক মনুষ্যত্ব যেমন আমরা অস্বীকার করেছি দু’ হাজার বছর আগে, এখনো জঙ্গলে জঙ্গলে উন্নয়নের নামে সরকারের গুণ্ডা লাগিয়ে তাদের মেরেধরে খুন করে অস্বীকার করছি। অনেকটা সাহেবরা যেমন আমাদের নেটিভ মনুষ্যত্ব অস্বীকার করেছিল। আর ওই মুষ্টিকা শব্দটা শুধু বোধহয় বাল্মীকির রামায়ণেই আছে, এই বিশ্বামিত্রর অভিশাপ প্রসঙ্গে। কংসের দরবারে একজন মুষ্টিকা নামে বক্সার ছিল, সে বোধহয় অন্য জাতের।
বিশ্বামিত্রর যজ্ঞে আধ্যাত্মিক নেতারা আসতে ইনকার করলেন বলে, দেবতারাও বললেন, চলবে না। তবু যজ্ঞ করলেন ধুরন্ধর বিশ্বামিত্র। তাঁর অসামান্য ক্ষমতায় ত্রিশঙ্কু ঊর্ধ্বে উঠলেন। ওপর দিকে স্বর্গ। ত্রিশঙ্কু সশরীরে স্বর্গে পৌঁছলেন।
স্বর্গের রাজা মাননীয় ইন্দ্র। তিনি বললন, না, না না! ক্যাঁৎ করে একটা লাথি মারলেন ত্রিশঙ্কুকে। ওপর থেকে ইন্দ্র ঠেললেন। নিচের থেকে বিশ্বামিত্র বাধা দিলেন। মাঝপথে রাজা ত্রিশঙ্কু রইলেন আটকে। চিরকালের তরে। দেখো রাজা, কাঁদে রাজা, আহা রাজা, বেচারা রাজার ভারি দুখ।
গল্প শেষ। (অন্যত্র এই গল্পটার অন্য একটা সমাপ্তি আছে। সেটা বোরিং।)
এক ব্রাহ্মণ আর এক ব্রাহ্মণ-হতে-চাওয়া ক্ষত্রিয়র বিবাদের শেষ মীমাংসা হল এমন যে কারুরই হার হল না, কারুরই জিত হল না। মাঝখান থেকে ত্রিশঙ্কু ঝুলে রইলেন মহাশূন্যে। আজও ঝুলে আছেন। গল্পের লেখককে বলি – কেয়া বাত!
বাংলা ভাষায় আমরা যে বলি, “লোকটা ঝুলিয়ে দিল” বা “আমাকে ঝুলিয়ে রেখেছে”, সেটা হয়তো ওই ত্রিশঙ্কুর গল্পের রেফারেন্স।
আমার জীবনে আমি তো অনেকবার ত্রিশঙ্কু হয়েছি। এদিক যাবো না ওদিক যাবো ভেবে ভেবে কোথাও যাইনি। না ঘর-কা, না ঘাট-কা। অনেকটা নীরেন চক্কোত্তির সেই লোকটার মত –
দরজার বাইরেত্রিশঙ্কুর গল্প খুব ভালো লেগেছিল মার্কিন কবি হেনরি ওয়াড্সয়র্থ লংফেলো’র। বিশ্বামিত্রকে জাদুকর বানিয়ে (বা বুঝে), লিখেছিলেন –
ওই যে মানুষটা সেই সকাল থেকে
দাঁড়িয়ে আছে,
একটু নজর করলেই
বুঝতে পারবে যে
ওর বড় অস্বস্তি।
Viswamitra the Magicianযার আমি একটা তর্জমা করেছি –
By his spells and incantations,
Up to Indra's realms elysian
Raised Trisanku, king of nations.
Indra and the gods offended
Hurled him downward, and descending
In the air he hung suspended,
With these equal powers contending.
Thus by aspirations lifted,
By misgivings downward driven,
Human hearts are tossed and drifted
Midway between earth and heaven.
বিশ্বামিত্র জাদু-আচার্যগোপন কথাটা বলব? প্রফেসর শঙ্কুর মত আসলে ত্রিশঙ্কুও একজন অধ্যাপক। বিজ্ঞানের নন। মানুষের হৃদয়ের। মাঝে মাঝে অনাহূত হাজির হন — এক ঘন্টা বা এক দিন বা এক সপ্তাহ থেকে চলে যান।
মন্ত্রবলে ভেলকি খেলে,
স্বর্গভূমি ইন্দ্ররাজ্যে
ত্রিশঙ্কুকে তুলল ঠেলে।
স্পর্শকাতর ইন্দ্র রোষে
ত্রিশঙ্কুকে ফেলল ছুঁড়ে।
মাঝ আকাশে আটকালো সে
টানা-পোড়েন দ্বন্দ্ব-জুড়ে।
এমনি করেই আশা ওঠায়,
নিচে নামায় সংশয়ভার।
কোথায় স্বর্গ? মর্ত্যে কোথায়?
উথালপাথাল হৃদয় আমার।
পরের বার যখন উনি তোমার জীবনে আসবেন, তখন ঝগড়াঝাঁটি চেঁচামেচি না করে কথা বলে দেখতে পারো। চমৎকার কথা বলেন উনি। কিন্তু আর সবার মত নয়। আদ্ধেক কথা শেষ করেন না। প্রশ্ন তোলেন, উত্তর দেন না। হঠাৎ হঠাৎ চুপ করে গিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভারী মজার লোক। চুলগুলো সব এলোমেলো। এবড়ো খেবড়ো দাড়ি গোঁফ। জামাকাপড়ে কোনো ইস্তিরি নেই। যদি ধৈর্য হারাও, কোনো লাভ হবে না। যদি কথা একটু কম বলো, যদি শোনো একটু বেশি, তাহলে লাভ হলেও হতে পারে।
উনি আর আসবেন না বলছ? নিশ্চই আসবেন। আলবাত আসবেন।
যখন বাড়ির লোক বা বন্ধুরা বলবে, “কি রে! একটা সামান্য ডিসিশন নিতে পারছিস না?”
বোলো, “না, সরি। একটু ব্যস্ত আছি। অধ্যাপক ত্রিশঙ্কুর সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।”
কিন্তু নকল হইতে সাবধান! চিনতে ভুল কোরো না।
আমার বঙ্কু মামা সকালবেলা বাথরুমে থাকত এক ঘন্টা। সেখানে কী করত কেউ জানে না। তারপর অফিস যাবার আগে চান করে আলমারি থেকে তিনটে সাদা জামা বার করে খাটের ওপর রাখত। প্রত্যেক দিন। পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে পায়চারি করত কোন জামাটা পরবে ঠিক করার জন্য। আজীবন।
আর আমার বন্ধু প্রিয়ঙ্কর গোলপার্কের মোড়ে রাস্তা পার হবার সময়ে মাঝরাস্তায় ধেয়ে-আসা তেত্রিশ নম্বর বাস দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেছিল। না যাচ্ছিল সামনে, না যাচ্ছিল পেছনে। নতিজা ভালো হয়নি।
এই দুজন যাদের খপ্পরে পড়েছিল — বলা যাক শ্রীবঙ্কু ও প্রিয়ঙ্কু — তাদের থেকে সাবধান! ওরা সময়ের ন্যায্য দাম দেয় না। হয় বিনামূল্যে ছেড়ে দেয়, নয়তো বহুমূল্যে কেড়ে নেয়। তোমার দরজায় যদি কখনো ওরা টোকা দেয়, দরজা খুলো না। আর যদি খুলেই ফ্যালো, পত্রপাঠ বিদেয় দিয়ো।