• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • চারটি অণুগল্প : জয়ন্ত দেবনাথ

    ডালিয়া

    শীতের মরশুম। বাহারি ফুলগাছে ব্যালকনি সাজায় অর্ণা। সব গাছ সাড়া দিয়েছে তাঁকে। হলুদ গাঁদা, কমলা ক্যালেন্ডুলা, নীল-সাদা পিটুনিয়া। কিন্তু বাধ সাধলো দু'টি ডালিয়ার গাছ। মালির দেওয়া কথা ছিল একটিতে লাল আর অন্যটিতে বেগুনি ডালিয়া ফুটবে। সেই থেকে অপেক্ষা। তাই বলে গাছ দু'টির বেড়ে ওঠা চঞ্চলতায় খামতি নেই। প্রতিদিনই মনে হয় এই বুঝি কুঁড়ি এল। গাছের পাতায় হাত বুলিয়ে অর্ণবকে আফসোস করে, দেখলে কেমন ঠকিয়েছে মালি!

    অর্ণব মুচকি হাসে। ক্ষণিক অন্যমনস্ক হয়ে বলে, তাহলে আর এদের রেখে কী হবে! ফুল গাছে যদি ফুলই না ফুটল।

    অর্ণবের কথায় মুহূর্তে বুক ছলাৎ করে ওঠে অর্ণার। নিঃসন্তান দম্পতির ব্যালকনিতে হঠাৎ যেন চাপা নিস্তব্ধতা।

    পাকা চুল

    চুল, দাড়ি কাটার পর আফটার সেইভ গালে আলতো ছুঁয়ে ছেলেটি বলল, আর কিছু? ফেসিয়াল কিংবা বডি ম্যাসাজ?

    আমি হেসে বললাম, না না ওসব লাগবে না।

    এরপর চুলে আঙুল বুলিয়ে জানাল, আপনার চুলে কিন্তু পাক ধরেছে। রঙ করে নিতে পারতেন। ভালো লাগবে দেখতে।

    আমি ভালো করে আয়নায় নিজেকে দেখে মনেমনে মুচকি হাসলাম - ছেলেটি কি জানে এই পাকা চুলে মিশে আছে আমার কত গোপন অহংকার...

    এরপর গম্ভীর মুখে বললাম, একদম না, কখনোই না।

    আর টাকাটা মিটিয়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে এলাম সেলুন থেকে।

    দুই মেয়ের গল্প

    গতকাল তমালিকার মেয়ের অন্নপ্রাশনে গিয়ে জানলাম, সামনের মাসে তমালিকা আমেরিকা যাচ্ছে। এখন একা যাচ্ছে। ভিসা যখন এসেই গেছে, আর দেরি নয়। পরে মেয়ে ও বরের ভিসা হলে ওরা যাবে।

    আমি ভাবছিলাম, এইটুকু বাচ্চাটার কী হবে!

    তমালিকা আমার মনের কথা বুঝতে পেরে নিজেই বলল, ডে-কেয়ার আছে কেন তবে? সন্ধেয় অফিস থেকে ফেরার পথে সুমন বাড়ি নিয়ে আসবে, আর না হলে ২৪ ঘন্টার আয়া তো আছেই।

    আমি তমালিকার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারিনি। আমি জানি, আমেরিকায় সেটেল্‌ড হওয়া তমালিকার অনেক দিনের স্বপ্ন। চাকরি পাওয়ার ক'বছর পর থেকেই ভিসার জন্য চেষ্টা করে আসছে। ভেবেছিল আমেরিকা গিয়েই ওরা বাচ্চা নেবে, এদিকে বয়সের কথা ভেবে ডাক্তার আর রিস্ক নিতে বারণ করল। এখন বাচ্চা আর ভিসা দুটোই হল।

    সকালে চা খেতে খেতে যখন এসব মনে পড়ছে, তখন আমার বাড়িতে কাজ করতে আসা আসমা বলল, ভাবছি দেশে ফিরে যাব দাদা। মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ে...

    আমি আসমার মুখের দিকে তাকাতেই মেয়েটা শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে দ্রুত আমার সামনে থেকে সরে গেল।

    বছর খানেক হল আসমা এদেশে আছে। চার বছরের ছেলেকে নিয়ে বরের সাথে এসেছিল। বছর দেড়েকের মেয়েটা এখনো বাংলাদেশে, ফুপুর কাছে। বর রিকশা চালায় আর আসমা কিছু ফ্ল্যাটবাড়িতে কাজ করে। এখন এদেশের কাগজপত্র পাওয়া মুশকিল। ভেবেছিল সব ঠিক হলে মেয়েটাকে এবছর ঈদের পরপরই নিয়ে আসবে। সামনের মাসেই তো ঈদ।

    বিদায়

    বিদায়ের একদম অন্তিম মুহূর্ত। সাদা কাপড়ে মোড়ানো বিপাশার শরীর। সামনে ইলেকট্রিক চুল্লির দরজা খুলছে। ভেতর থেকে ছিটকে আসছে লাল আভা। অভিজিৎ শেষ মুহূর্তে একবার বিপাশার হাতটা ধরতে গেলে, ডোম বডি ঠেলে ঢুকানোর লিভারটা ওপরে তুলে বলল, এবার ছেড়ে দিন। দেখছেন না পেছনে আরো বডির লাইন আছে।

    অভিজিৎ দাঁড়িয়ে শেষ বারের মতো হাত নাড়ল - বিদায়…

    বডি না বিপাশা? কে যেন ঢুকে গেল চুল্লির ভেতর।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments