



জিনি যতবার ডাকছে ততবার মীরামাসি ভেতর থেকে বকবক্ করছে। একবার বলল যত খুশি চেঁচা তুই আমি দরজা খুলুম না। বদমাইশের স্যাঙাত হইয়া আবার চিৎকার হইতাছে। যতই তোরা পাড়া মাথায় কর দরজা আমি খুলুম না। তগোর দাদা আহুক মা আহুক বিচার চামু। আজ তগোর একদিন কি আমার একদিন।
কথাটা শুনে জিনি এমন করে চেঁচাতে লাগল যেন ধমক দিচ্ছে। আর ঘুন্টি মুখটা আরো উদাসীন করে বসে রইল। যেন যত দায় জিনির! ও কিচ্ছু জানে না।
এতক্ষণ ধরে সব দেখে শুনে বাবাইয়ের মনে হোল, জিনিটা কী ইনোসেন্ট! আর ঘুন্টি টা কী ভীষণ দুষ্টু! সাথে এও বুঝতে পারল নিশ্চয়ই আজ আবার ঘুন্টি কোনও গোল পাকিয়েছে। বেচারা জিনি কিচ্ছু না করে শাস্তি পাচ্ছে। কিন্তু ঘুন্টির ভাবলেশহীন মুখটা দেখলে কে বলবে যে ওই হোল পালের গোদা। জিনি শুধু ঘুন্টিকে ভালবেসে সাপোর্ট করে যায় আর যত বকা ওই খায়। বেচারা !
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাবাই কলিং বেলটা টিপল। ভারী বইয়ের ব্যাগ পিঠে নিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে ওর কষ্ট হয়। তার উপর এরাও কতক্ষণ ধরে বাইরে আছে কে জানে? ক্ষিদে, জল তেষ্টা, পটি বা পি হয়ত পেয়েছে। মীরামাসি র তো এসব কিছুই খেয়াল থাকে না।
দরজা খুলে বাবাই কে দেখেই মীরামাসি একশ্বাসে বলতে শুরু করল, তুমার মা ঘরে আইলে আইজ তুমার বিল্লির একটা হেইস্ত নেইস্ত করতে হইব। হয় ও থাকব নয় আমি থাকুম।
বাবাই মীরামাসির রণংদেহি মূর্তি দেখে সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। আর ভাবল মীরামাসিকে তো মা কিছুতেই কাজ থেকে ছাড়াবে না। তবে কি ঘুন্টিকে মা রাস্তায় ছেড়ে দেবে? এই সব ভাবতে ভাবতে বাবাইয়ের পেটের ভেতরটা গুড় গুড় করতে লাগল। চোখ জলে ভর্তি হয়ে গেল। ও অশান্ত মনে মায়ের বাড়িতে ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। স্কুলের ড্রেস পাল্টে বাড়ির জামাকাপড় পরার সময় বাবাইয়ের আজ একবারও মীরামাসির সাহায্য নিতে ইচ্ছে হোল না।
বাবাইয়ের মনে পড়ে একবছর আগে বাড়িতে না জানিয়ে হঠাৎ করে যখন ঘুন্টিকে ও এক বন্ধুর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল তখন মা রাগ করলেও সবচাইতে বেশি আপত্তি করেছিল এই মীরামাসি। বলেছিল, কুত্তা আমি সইহ্য কইরা নিমু বৌদি কিন্তু বিল্লি আমি দুই চক্ষে দেখতে পারি না।
বাবাই ভাবে ঘুন্টি কি মীরামাসির কথার অর্থ সেদিন বুঝতে পেরেছিল নাহলে ও মীরামাসিকেই কেন প্রথম থেকে টার্গেট করেছে ? মীরামাসি বলে, বিল্লি নিত্তির গৃহস্থর খারাপ চায়। বিল্লি চায় গৃহস্থ অন্ধ হোক তইলে হে বেশি বেশি কইরা চুরি করতে পারে।
বাবাই জানে এ সব বাজে কথা। ঘুন্টি মাকে এত ভালবাসে যে মা অন্ধ হোক তা ও কিছুতেই চাইতে পারে না। মা বাড়িতে যতক্ষণ থাকে ঘুন্টি ততক্ষণ মায়ের সাথে সাথে থাকে। রাতে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকে। একেক দিন বাবাইয়ের খুব হিংসে হয়। তারপর ভাবে ঘুন্টির তো মা নেই। এইটুকু আদর তো ও পেতেই পারে। ঘুন্টি বাড়ির সবাইকে হাসি-স্ফূর্তিতে মাতিয়ে রাখে। ওর কাণ্ডকারখানা দেখে সবাই যখন হাসে, মীরামাসি তখন বলে, ঈশ্ আবার বল খেলা হইতাছে। তোরা থাকস তো নালায় খালায় আর লুকের বাড়ি চুরি কইরা খাস। তোর আবার বল খেলা! গত জনমে কী যে পুণ্য করছিলি তাই এমন জীবন পাইছস। এই কথাগুলো শুনলে বাবাইয়ের খুব খারাপ লাগে। বলে, মাসি, তুমি ঘুন্টিকে একদম এসব বলবে না। ও খুব ভাল। কত কিউট।
বাবাইয়ের মনে পড়ে, ঘুন্টি প্রথম আসার পর মায়ের ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল। চাকরি, সংসার ও জিনিকে সামলে কী করে বেড়ালের দেখভাল করবেন। তাই মা তখন ওকে কোন ভাল ঘরে এডপশনে দেবার চেষ্টা করেছিলেন। যখন কেউ নিতে আগ্রহী হয়নি তখন মীরামাসি বলেছিল, বৌদি ওরে মাছ বাজারে ছাইড়া দিয়া আস। এই শুনে মা বলেছিল, না না এইটুকু বাচ্চা লড়াই করে কি খেতে শিখেছে? না খেতে পেয়েই মারা যাবে। বাবাই মনে মনে মাকে থ্যাংকস জানায়। ভাগ্যিস মা মীরামাসির কথা শোনেনি!
তারপর ঘুন্টি যখন একটু বড় হোল তখন থেকেই ও মীরামাসির পেছনে হাত ধুয়ে পড়ে গেল। যেন এতদিন ধরে ওর বিরুদ্ধে বলে আসা সব কথার ও এখন প্রতিশোধ নেবে। প্রথম যে কাণ্ডটা ঘুন্টি করেছিল সেটা হোল মীরামাসির বিছানায় হিসি করা। এমনিতে ও লিটার বক্সে হিসি পটি সব করে। কিন্তু মাঝে মাঝেই কেন যে মীরামাসির বিছানায় ও এই অপকর্মটি করে তা কারুর মাথায় আসে না। তা ছাড়াও মীরামাসির বিছানার চাদর দাঁত দিয়ে টেনে টেনে ছিঁড়বে। যত কাণ্ড ঘুন্টির মীরামাসির ঘরে। এবং তা একদম চুপিসাড়ে।
এদিকে যখন বাবাই এইসব ভাবছে তখন ওর মা অফিস থেকে ফিরে এলেন। মাকে দেখেই মীরামাসি একেবারে যেন রাগে ফেটে পড়ল। বৌদি, আইজ এক্ষুনি ঠিক করবা তোমাগো বাড়ি আমি থাকুম, না তোমার বিল্লি থাকব।
কেন কী হয়েছে মীরাদি?
আইজ তোমাগো বিল্লি আমার চুল টাইন্যা ছিঁড়ছে।
কী করে? ও কি তোমার মাথায় লাফ দিয়ে উঠেছিল?
আরে না না। আমি শুইয়া ছিলাম আমার ভিজা চুল মেলাইয়া। হে কী করছে। একেবারে আমার চুল ধইরা ঝুইল্যা পড়ছে। গুছা গুছা চুল ছিঁড়ছে আমার। আমার চিরশত্রু। আর সঙ্গে জিনিও তাল দেয়। আমি বিল্লিরে বকলে আমার দিকে তাকাইয়া ঘেউ ঘেউ করে।
মীরামাসির কথা শুনে বাবাই আর ওর মায়ের হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার জোগাড় ! বাবাইয়ের তো অনেকক্ষণ থেকে হাসি পাচ্ছিল কিন্তু ভয়ে হাসতে পারছিল না। এবার মাকে হাসতে দেখে ও যেন সাহস পেল। মীরামাসি বলছে, হাস হাস আরো হাস। তোমাগো কী? এই বিল্লির বাচ্চা জীবন তো আমার অতিষ্ঠ কইরা তুলছে।
জিনি ও ঘুন্টি ঘরের মাঝখানে বসেছিল। জিনি, যে যখন কথা বলছিল তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা শুনছিল আর ঘুন্টির কান দুটো কথা যেদিক থেকে আসছিল সেদিকে রাডারের মত ঘুরে যাচ্ছিল। বাবাই নিশ্চিত যে ওরা দুজনেই বুঝতে পারছিল যে ওদের নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছে।
মীরামাসি আবার বলল, বৌদি এর একটা বিহিত তুমার করতেই হইব। মা বললেন, তোমার কাছে ওদের ক্ষমা চাইলে হবে তো? তারপর জিনি ও ঘুন্টিকে বললেন, তোমরা অনেক দুষ্টুমি করেছ তাই মীরামাসির কাছে ক্ষমা চাও। এই কথা শুনে জিনি বাধ্য মেয়ের মত মীরামাসির কাছে গিয়ে সামনের পা দুটো ভেঙে মাটিতে ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর ঘুন্টি মুহূর্তের মধ্যে এক লাফে আলমারির মাথায় উঠল ও সেখান থেকে মীরামাসির ঘাড়ে ঝপাৎ করে পড়ল।
আচমকা এই আক্রমণে মীরামাসি হতভম্ব। তারপর অবস্থা সামলে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ঘুন্টিকে ধরতে যেতেই ও এক দৌড়ে ঢুকে গেল খাটের তলায়। সবাই জানে যতক্ষণ ঘরের আবহাওয়া গরম থাকবে ও ওখান থেকে কিছুতেই বেরোবে না।