



দেবাদিদেবের মর্ত্যে যাওয়ার শখ হল। শুধু মন্দিরেই উনি বিরাজমান। পথে ঘাটে, অলিতে গলিতে কী ঘটে দেখার ইচ্ছে জাগল। কিন্তু এমন ইচ্ছের পিছনে আরো কিছু গল্প লুকিয়ে আছে সেটাই আগে বলে নিই।
শিবরাত্রির পরের দিন— মাথাময় কাঁচা দুধের গন্ধ, এক রাশ মাছি তায় ভনভন করছে। কত যে আকন্দ মালা গলায় জড়ানো। যে শিব নেশাভাঙ্গে এত চোস্ত, বিষের ঝাঁঝে তাঁরও মাথা ঘুরছে। প্রাণ যায় যায়।
ব্যোমভোলা তিনি, কিছুতেই তাঁর কিছু যায় আসে না। সেই তিনিই সাঙ্গোপাঙ্গদের বললে, “বেদির এক কোণে পড়ে আছে রাশি করা ধুতরো মালা, কাঁচা বেল কলা নারকেল, দুধে মাখামাখি ধূপ-ধুনোর গুঁড়ো; এক্ষুনি সব সরিয়ে বেদি সাফ সুতরো করে ফেল! (মহেশ্বর হালেই জেনেছেন এসব পচে বায়ু প্রদূষণ হয় যে। এ ব্যাপারে জ্ঞানদাত্রী ওঁর ছোট মেয়ে সরো।) আর তারপর নির্দেশ দিলেন, “যা তো মা ঠাকরুণ কী দিয়ে মাথা ঘষেন খানিক চেয়ে আনগে, গা মাজার খার-খৈলও আনবি।” নন্দী ভৃঙ্গী এর আগে গুরুর এমন অস্থির ভাব দেখেনি, খানিক থতমত খেয়ে মুখের পানে চেয়ে দৌড়ল মা দুর্গার কাছে।
মা অন্তর্যামী। খানিক হেসে সব বাটিতে বাটিতে আলাদা করে বুঝিয়ে দিলেন। তারপর আর কি, ধুনুচির জন্য কেটে রাখা কাঠ জ্বেলে বরফ গলানো জলে শিবের চান শুরু হল। প্রথমে আমলকী বাটা রিঠের কাথ দিয়ে মাথা ঘষা, তারপর খার খইল বেসনে সারা গা ডলা। চানের পর মহাদেবের অমন ধবধবে সাদা রূপ—চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। আড়াল থেকে দুগ্গা ঠাকরুণ অপলক চেয়ে রইলেন।
স্নানের পর খানিক স্বস্তি পেলেন শিব। কিন্তু মন? সে তো খিঁচড়িয়েই রইল। আর মেজাজ খিঁচড়োলে যা হয়, নিজের মনেই প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকলেন অজানা কারুর উদ্দেশ্যে।— ভগবান তো কী হয়েছে? ধুতরো, আকন্দ আর কাঁচা দুধ ছাড়া আর কিছুই কি নেই? আর নিজেদের বেলা উপোসের নামে গণ্ডা গণ্ডা লুচি পায়েস সাবড়ানো! সেও কি তাদের নিজেদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো? তিনি কি বিধান দিয়েছেন উপোস করে লুচি মণ্ডা মেঠাই খাওয়ার পরই জেলুসিল, র্যানট্যাক? আর তাতেও বমি পেটখারাপ না রুখলে হাসপাতালে কম করে তিন দিন স্যালাইন?—মনে হতে পারে মর্ত্যবাসীর রোগের এতসব নিদান ঠাকুর জানলেন কেমন করে? এ আর এমন কি! উনি যে সর্বজ্ঞ।
এত সব ভাবতে ভাবতেই মর্ত্যে যাওয়ার প্ল্যানও তৈরি হল। তাছাড়া নন্দী ভৃঙ্গীর সাথে ভাঙ্গ আর ডমরুর তালে নৃত্য বড় এক ঘেয়ে লাগছিল মাঝে মাঝে। কেমন যেন মনে হচ্ছিল এর বাইরেও এ্কটা জ্ঞানের জগৎ আছে। সরো আর কেতোও বলাবলি করছিল এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে। একদিন যখন ওরা ঘরে ছিল না ওদের ল্যাপটপটার বোতাম টিপেটাপে বেশ কিছুটা রপ্ত করে নিয়েছিলেন ভগবান। ছেলেমেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে মৃদু হাসি হাসলেন ঠাকুর—মাঝে মধ্যেই ওরা কোথায় যেন উধাও হয়, হয়তো মর্ত্যে ফুচকা মারতেও যেতে পারে, দুর্গার কাছেই শোনা। তার স্বাদ নাকি ভোলা যায় না, সেও ওরাই বলেছে। মা তো পিত্রালয়ে চাল কলার পুজো নিতে নিতেই বিশ্রাম পান না।
আজকাল বাঘছালও আর ভাল লাগে না। হিমালয়ের শীত কি তাতে কাটে? অনলাইন ট্র্যাক স্যুট জিন্সগুলো দেখেই আশ মেটান। আরো ইচ্ছে মর্ত্যে যে যাবেন বাঘছাল পরে নয় কিন্তু। চোস্ত জিন্স টি-শার্ট পছন্দ ছিল, কিন্তু অত বড় মধ্যস্থল —সাইজই মিলল না। তাছাড়া যার দেহ ধারণ করবেন সে কী পরে তাও জানতে হবে তো!
কোথায় যাবেন সেও এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। স্থির করলেন মর্ত্যবাসীর ভুল জীবনযাপন তারা নিজেরাই শোধরাবে। নিজে যখন জাগবে তখনি তো ভোর হয়। উনি যাবেন পৃথিবীতে নিজের মনের পালে হাওয়া লাগাতে। হঠাৎই টুনির মায়ের কথা মনে পড়ল। বেশ মেয়ে! সে মানে ঈশ্বর অনুভূতি হওয়া মানেই ঈশ্বরকে পাওয়া। অত নিয়মকানুনের ধার ধারে না সে। ওর কাছেই যাবেন। তা যেমন ভাবা তেমন কাজ। শিব টুনির বাবার আপিসের পিয়ন তেওয়ারীর রূপ ধারণ করবেন স্থির করলেন। নামটাও পছন্দ হল — শিউশরণ তেওয়ারী। আর পোশাকও মানানসই— ও পরত ঢোলা গেরুয়া পাঞ্জাবি আর মোটা ধুতি যা বেশ আরামদায়কই হল।
দুই অনুচর নন্দী ভৃঙ্গীর মধ্যে নন্দীকেই বেশি পছন্দ শিবের। তাই ভগবান মর্ত্যে অবতরণ করলেন নন্দীকে নিয়েই। নেমেই গাঁইগুঁই করলেও তাকে একটি লড়ঝড়ে সাইকেল বানিয়ে চেপে বসে রওনা দিলেন টুনির বাড়ি। বুড়ো তেওয়ারীকে ভালোই মানাল পুরনো সাইকেলে। তখন টুনিরা থাকে সল্ট লেকে। বাড়ির নম্বর ভারি এলোমেলো সেখানে। তবু একে তাকে জিগিয়ে ঠিক পৌঁছে গিয়ে বেল দিলেন।
টুনির বাবা ফ্ল্যাটের দরজা খুলে অবাক তো হলেনই, খুশি হলেন তারও বেশি। “আরে তেওয়ারী যে! এসো এসো, বসো,” বলেই হাঁক দিলেন “দীপা, ও দীপা, দেখো কে এসেছে!” তারপর তেওয়ারীকে বললেন, “তুমি তো প্রেম বাজারেই বাড়ি করেছ, বল ওখানকার খবর কী?”
তেওয়ারী উর্ফ শিব ভাসা ভাসা উত্তর দিলেন যাতে গরমিল না থাকে, “দত্তবাবু, সবই ঠিক আছে, তবে আপনি নেই, কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।”
যাইহোক, এটা-সেটা কথার মাঝে জানা গেল সেদিন টুনির জন্মদিন। এদিক-ওদিক বেলুন, ঝিকিমিকি আলোও লাগানো ছিল। দীপা দেখল তেওয়ারী পেটে একটু হাতও বুলিয়ে নিল। ও জানে শিউশরণ খেতে বড় ভালোবাসে। তাড়াতাড়ি দুটো বড় ফ্রাই সদ্য ভেজে এনে বললে “তেওয়ারীদা খেতে শুরু করো, কষা মাংস, ফ্রাইড রাইস, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি সব আছে।“—আহা মহাদেবের মনে হল কটা দিন থেকে গেলে মন্দ হোত না। টুনি গা ঘেঁষে দাঁড়াল ওঁর। মুখ দেখে মনে হল উপহার টুপহার কিছু পাওয়া যায় কিনা সেটাই ভাবছে। কিন্তু কিছু তো আনা হয়নি। আসলে জন্ম-মৃত্যুর হিসেবনিকেশ তো চিত্রগুপ্তই রাখে। সে ডিপার্টমেন্টই তো আলাদা। যাইহোক স্থির করলেন ভগবান, অনলাইন একটা বেশ ইয়া বড় টেডি পাঠিয়ে দেবেন।
খাওয়দাওয়া, গল্পগাছায় দুপুর গড়িয়ে গেল। এ সময় দেবাদিদেব এক ছিলিম তাম্বাকু সেবন করে একটু ঝিমিয়ে নেন। কিন্তু সেতো এখানে সম্ভব নয়। তাই টুনির বাবাকে “আসি বাবু,” বলে মনে মনে মৃদু হেসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে পড়লেন। দত্তবাবু জানলেনও না সেদিন উনি ভগবানের প্রণাম পেলেন। ভক্তের প্রিয় তিনি, তা আর একবার সত্যি হল।
সন্ধ্যের ছায়া চারদিক ঘিরে ফেলছিল। খানিক গিয়ে নন্দীকে স্বরূপে ফিরিয়ে আনলেন শিব আর দুজনে হিমালয়ের দিকে উড়ে গেলেন।
মহাদেবের তো মর্ত্যে একদিন ভারি ভালো কেটেছিল, কিন্তু নন্দী একটু মুখ গোঁজ করেই রইল। সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি। একটু তামাকও না। মনে মনে সে ভেঁজে রাখলে হিমালয়ে পা রেখেই রাতের খাবার অন্নপূর্ণার কাছেই সারবে। মা যাই রাঁধুন সবই যে অমৃত!