• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • রাজপথে একটা মোটর-সাইকেল : অচিন্ত্য দাস

    অভির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল সম্বন্ধ করে। শ্বশুরবাড়িতে একসঙ্গে থাকতাম আমরা। বছর দুয়েকের মাথায় সংসারে নতুন অতিথি এল। শানু। আমাদের ছেলে। এখন ওর আট চলছে।

    ছোট ছোট ঘর, বাথরুমের সমস্যা, শাশুড়ির সঙ্গে খটাখটি, শ্বশুরের অসুখ, ছোট্ট ছেলের দুষ্টুমি – এসব নিয়ে দিন কাটতো। আমার বর অভি সাধারণ চাকরিই করত, তবু টের পেতাম ওর ভেতরে আকাশ-ছোঁয়া উচ্চাশা রয়েছে। তাই আপিসের কাজ করত খুব। বাড়ি ফিরতে দেরি হতো রোজই। আপিস ফেরতা ক্লান্ত অভিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতেই ও আমাকে ধরার ছুতো খুঁজতো, “ওঃ, দারুণ চা করেছ! চুমুকের সঙ্গে চুমু পাবো না!”

    বছর তিনেক পরে সংসারে কন্যা সন্তানের আগমন। তার নাম দিলাম রিম্পা।

    রিম্পা জন্মাবার কয়েক সপ্তাহের ভেতরেই অভির একটা উন্নতি হলো চাকরিতে। সকলে বলল, “রিম্পু আমাদের সাক্ষাৎ মা-লক্ষ্মী।”

    আমি কিন্তু জানতাম অভির পরিশ্রম আর ওপরে ওঠার অদম্য ইচ্ছেই ওর উন্নতির আসল কারণ। বছর না ঘুরতেই অভির আরও উন্নতি – জিএম। ডিরেক্টরও হয়ে যেতে পারে এবার।

    অভি এখন বড় অফিসার–বারো তলায় চার বেডরুমের ফ্ল্যাট দিল কোম্পানি। আমরা সেখানে চলে এলাম। ঘর, বারান্দা সব ছবির মতো। অঢেল সুবিধে। তবু বড় ফ্ল্যাটে এসে রোজই মনে হতো ও বাড়িতে কী যেন ফেলে এসেছি।

    অভির কাজ বেড়েছে। আজ মুম্বাই কাল চেন্নাই পরশু হংকং। ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে, তার পরেও অন-লাইন মিটিং। কথাই হয় না। অভিকে যেন অন্য মানুষ মনে হয়। ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে চলে গেলেই একলা ঘরে নানান ভাবনা ঘিরে ফেলে আমাকে। মোটা মাইনে, কাজের দায়িত্ব, আরও উন্নতির আশা – এসব নিয়ে অভি কি দূরে সরে যাচ্ছে? ও কি আমাকে আর চায় না? ঘর-সংসারের দিকে অভির টান কেন এমন কমে যাচ্ছে!

    ভালো লাগে না। ভয় হয়। অভি যেন আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। বড় হলে ছেলেমেয়েরাও কি এরকম থাকবে? এ বয়সেই শানু সারাক্ষণ ফোন আর বন্ধুদের নিয়ে মজে আছে। আমি কী নিয়ে থাকব!

    সেদিন একটা পত্রিকায় দেখলাম এরকম পারিবারিক অবস্থায় পড়লে সকলে মিলে ছুটি কাটিয়ে আসা একটা ভালো উপায়।

    অভিকে বললাম, “অনেকদিন কোথাও যাইনি, চলো কটা দিনের জন্য ঘুরে আসি।” অভি কাজের দোহাই দিল। আমি জেদ করলাম, “শনি-রবিবারের সঙ্গে একটা দিন ছুটি নিয়ে কাছেপিঠে কোথাও গেলে কাজের কী এমন ক্ষতি হবে!”

    অভির অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

    প্রশস্ত হাইওয়ে। অভি চালাচ্ছে, পাশে আমি। পেছনের সীটে রিম্পা আর শানু। কথা বলতে গিয়ে দেখলাম অভি হুঁ-হাঁ ছাড়া কিছু বলছেই না। শানু ফোনে গেম খেলছে আর রিম্পা ঘুমিয়ে পড়েছে। মনে হলো এ তো আমদের বারো তলার ফ্ল্যাটটাই, শুধু চাকা লাগানো আছে।

    বেশ খানিকটা যাওয়ার পর এক জায়গায় দেখলাম হাইওয়ে আটকে পুলিস চেকিং করছে। গাড়ির গতি কমে এল। রিম্পা ঘুম ভেঙে চোখ খুলেই বাইরে কী যেন দেখে হেসে উঠল, “মা দেখ দেখ ওই মোটর-সাইকেলটায় কত জন চড়েছে… হি হি …”

    দেখলাম একটা মোটর-সাইকেলে চার-চারজন বসেছে। বাবার কোমর শক্ত করে ধরে আছে বছর পাঁচেকের মেয়েটি। তারপরে ন-দশ বছরের ছেলে। একদিকে দু-পা রেখে মা। ওইটুকু গাড়িতে কী করে যে চারজন বসেছে! চার-চারজন চড়েছে বলে পুলিস বোধ হয় সাবধান করে দিল।

    আমাদের গাড়িও চেকিং পার হলো। রিম্পা বলল, “দেখ, ওরা যাচ্ছে…”

    দেখলাম লোকটি কিছু বলছে আর সকলে খুব হাসছে। লোকটা নিজেও এত হাসছে মোটর-সাইকেলের হ্যাণ্ডেল নড়ে যাচ্ছে! ওদের মা বসেছে একদিকে পা রেখে। কোলে একটা চটের থলি। সেটা সামলে ছেলের কাঁধ ধরে রয়েছে মা।

    দু-এক পলক পাশাপাশি চলছিল ওরা, তারপর আমাদের গাড়ি ওদের পেরিয়ে গেল। আমাদের গাড়ির গতি বেড়েছে, পেছনে সরে সরে যাচ্ছে পিচের রাস্তা, মাঠঘাট, গাছপালা।

    অভি একটা বাজনা চালিয়েছে, সুরটা আমার অচেনা। শানু ফোনের ভেতর। রিম্পার আবার ঘুম আসছে। আমাদের এই নতুন গাড়িটা দারুণ আরামের। পা ছড়িয়ে বসা যায়, একটুও ঝাঁকানি নেই আর এসিটায় কী সুন্দর ঠাণ্ডা হয়ে থাকে ভেতরটা।

    তবু কোথা থেকে একটা কান্নার বাষ্প আমার গলায় এসে জমছে।

    বারো তলার বিরাট ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি – কিচ্ছু চাই না আমার, কিচ্ছু না। ওই রকম দু-চাকা একটা মোটর-সাইকেল যদি থাকতো আমাদের। অভি চালাতো আর ওকে শক্ত করে দুহাতে জড়িয়ে ধরত রিম্পা। পেছনের সীটে আমি। শানুর মাথা ছুঁয়ে আমার ডান হাত অভির কাঁধটা ধরে থাকত। ঘেঁষাঘেঁষি চাপাচাপি করে আমরা চারজন একসঙ্গে কোথাও যেতাম। আর সবাই মিলে ওদের মতো হাসতাম, খুব হাসতাম…



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments