• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • অগ্রহায়ণ : অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

    ঘাটে কোনো লোক নেই। কেবল বিশ-ত্রিশটা পায়রা ঘুরে বেড়াচ্ছে পোয়াতি বউয়ের মতন। তারা উদাসী হয় না, যেমত কাক; পায়রারা সর্বক্ষণ কেবল খাবার খুঁজে ফেরে। অঘ্রাণের এই তীব্র শীতেও, প্রবল নদীর বাতাসের মধ্যেও একটি কুকুর ঘাটের একপাশে কুন্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। এই সময় ঘাটের মাথায় একটি লোক এসে দাঁড়াল। নবদ্বীপ প্রথমে ভেবেছিল, জল নেবে, পুজোর জন্যে। অঘ্রাণে অনেকের বাড়িতে নানারকম পুজো থাকে, সেজন্য। কিন্তু লোকটা কিছুই করল না। লম্বা ঠ্যাং দুটি জড়ো করে ঘাটের মাথায় দাঁড়িয়ে রইল, নদীর দিকে চোখ। তার চোখে উদাস দৃষ্টি, আহা, যেমত কাক; ওই যে, বসে আছে।

    নবদ্বীপ লোকটিকে দেখছিল।

    নদী এখন শীতল। তৎসহ নীরব। ফলত মনে হয়, নদী এখানে ঘুমন্ত। অনেক মানুষ তো দুপুরের আহার সেরে এই সময় কম্বলমুড়ি দিয়ে একটি গড়িয়ে নেয়। যেমত নদী। এই সময়ে গরমের দিনে লোকে স্নান করলেও এখন, অঘ্রাণের এই বিকেলে সংসার-ছুট লোকের স্নানে উৎসাহী নেই। নদীতে একটিও নৌকা নেই, কোনো মৃতদেহ ভেসেও যাচ্ছে না। ফলত, নদী এখানে একাকী। ঘাটে একমাত্র মানুষ হিসেবে নবদ্বীপ বসেছিল, তা সে এমনি রোজই বসে থাকে; তাতে কী এসে গেল? নদী তাকে কি হিসেবের মধ্যে রাখে?

    এখন এই লোকটি এসে জমা হল। মানে এই শীতের দিনে সে একজন সঙ্গী পেল বটে, কিন্তু নদীর কী হল? লোকটি কে? পাগল না ভবঘুরে? আর যাই হোক, লোকটাকে ঠিক সংসারী লোকের মতন দেখায় না।

    সে কিন্তু বসল না, ঠিক তেমনি ঘাড় সোজা রেখে সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। এই বেলা তিনটেতে, রোদ নেই; গঙ্গার উপর এখন কুয়াশা জমছে। নবদ্বীপ নদীকে দেখার পাশাপাশি লোকটিকে দেখতে লাগল।

    বছর চল্লিশ মত বয়স হবে লোকটার। লম্বা, রোগা চেহেরা, টাক মাথা। গায়ে একটি হাফ সোয়েটার, হাফহাতা জামা। অযত্নে দুটি রোগা হাত খড়ি ফুটে সাদা হয়ে আছে। খাড়া নাক নিয়ে লোকটা হাঁ করে তাকিয়ে আছে নদীর প্রবাহের দিকে। দু চোখে কেমন এক দিশেহারা দৃষ্টি। ঠিক কী কথা সে বলতে চাইছে নদীকে? নবদ্বীপ তার দৃষ্টি মাপতে চেষ্টা করল।

    এইভাবে অনেকক্ষণ চলে গেল। লোকটির দিকে মাঝে মাঝে দৃষ্টি চালাতে চালাতে, তার মুখের ভাষাপড়ার চেষ্টা করতে করতে গতকালের বিধবা বুড়িটির কথা মনে পড়ছিল নবদ্বীপের।

    কাল এই সময়ে ঘাটে বুড়িটি এসেছিল। বসেছিল নবদ্বীপের পাশেই। বসে থাকতে থাকতে বুড়িটি নিজের দুঃখের ঝাঁপি উজাড় করছিল। সে কথা বলছিল। নিজের জীবনের কথা। হয়ত তাকে (??kaake? nodike?) বলছিল, অথবা নবদ্বীপকে শোনাচ্ছিল। তার এক আইবুড়ো মেয়ে ছিল। বয়স মেয়েটির ষোলো হলেও কুড়ির মতন দেখায়। পাড়ার লোকেরা তাকে ধরে বেচে দিল। সে বাধা দিলে লোকজন তাকে ধরে মারে। মেয়েকে নিয়ে লোকজন সুন্দরবন চলে গেছে। বলছে বিয়ে হয়ে গেছে। অথচ আমার মেয়ের বিয়ে আমি দিইনি।

    ইত্যাদি আরও অনেক কথাই বলছিল। তার মৃত স্বামীর কথা, লরির খালাসি ছেলের কথা।

    মেয়েটির কী হল শেষ অবদি?

    বুড়িটি জানে না।

    গঙ্গার জল নেমে যাচ্ছে। ঘাট ছেড়ে যাচ্ছে জল। তবুও নদীতে যা জল আছে, ভালো করে স্নান করা যায়, কাদামাটিতে নামতে হয় না।

    আর আছে বাতাস। হিম দিয়ে পালিশ করা বাতাসের প্রবাহ। যা মাঝে মাঝে আসছে আর ছুঁয়ে যাচ্ছে পাড়। পাড়ের দুই মানুষকে।

    অবশেষে লোকটি নবদ্বীপের পাশে বসল। নবদ্বীপ জানে, সে বসবে। তাকে বসতেই হবে। কারণ এতদিনের অভিজ্ঞতায় নবদ্বীপ দেখেছে, অঘ্রাণ এমন একটি মাস, যা নদীকে টানে। আর নদী টানে মানুষকে। নদী কুয়াশা বুকে নেয় চাদরের মতন। নদীও শীতে জড়োসড়ো করে যায়। তাই এই লোকটিও সেই টান উপেক্ষা করবে কী করে?

    নবদ্বীপ চনমন করে উঠল। নদীর ধারে মানুষ আসে তার দুখের ভার উজাড় করতে। আর নবদ্বীপের কাজ সেসব শুনে মানুষ কত বিচিত্র প্রাণী—সেটা উপলব্ধি করা।

    বসেই লোকটা নবদ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি অনেকক্ষণ থেকে বসে আছেন?

    হ্যাঁ।

    বাতাস খুব না?

    হ্যাঁ, বাতাস আছে।

    রোজই বসেন?

    একরকম তাই।

    তাই নদী আপনার এত চেনা।

    নবদ্বীপ লোকটার কথায় অবাক হল। লোকটা কি কবি? সেকথা নবদ্বীপের জানা নেই। তবে তার হাব-ভাব, কথাবার্তা বলায় কায়দা, হাঁটা-চলা ইত্যাদি দেখে মনে হল না, সে খুব বেশি লেখাপড়া করেছে। তবে তার কথার ছাঁদ আলাদা।

    নবদ্বীপ বলল, আপনি কি নদীকে চিনতে এসেছেন?

    হ্যাঁ। ভাবলাম একটু বসে যাই।

    সে তো খুব ভালো জিনিস।

    ভালো কেন?

    নদী মনের পলি টেনে নেয়। মন পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

    আপনি তাই করেন?

    রোজ।

    বুঝলাম আপনার মনে দুঃখ আছে।

    দুঃখহীন মানুষ মেলা ভার।

    ঠিক।

    আপনার দুঃখ কী?

    লোকটি জানাল, তার বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার বিবাহিত জীবন ছিল দশ বছরের। পাড়ার মেয়েকেই ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়ের দশ বছর পরে সে চলে গেল অন্য লোকের হাত ধরে। সে চলে যাবার দু বছর পরে লোকটি আবার বিয়ে করে। এখন যাকে সে বিয়ে করেছে সে স্বামী পরিত্যক্তা, বারো বছরের একটি ছেলেও আছে। ছেলেটি থাকে মামাবাড়িতে।

    তাহলে সমস্যা কী?

    আছে।

    বলে লোকটা চুপ করে থাকে। গঙ্গার জলে কিছু একটা ভাসছে। অমনি দশটা কাক সেটি লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। উড়ন্ত অবস্থায় সেটি তুলে নেবার চেষ্টা করছে, কিন্তু বস্তুটি অত্যধিক ভারী হওয়ায় তারা ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু জিনিসটি কী, সেটা ঘাটে বসে বোঝা যাচ্ছে না।

    লোকটা বলে, আমি যে পারি না!

    মানে!

    ছেলে-মেয়ে দিতে পারি না।

    প্রথম পক্ষের?

    নেই।

    হয়নি?

    না।

    সে তো অনেকেরই হয় না।

    আমার ব্যাপারটা তেমন নয়।

    তবে?

    আমার বীর্য নেই।

    মানে!

    কিছুই বেরোয় না।

    ডাক্তার দেখাওনি?

    কত্ত! সব ফেল।

    বদ্যি?

    তাও…সব ফেল। আগেও যা এখনও তাই। এই কারণে আগের বউ চলে গেল, নতুন বউও বলে বাচ্চা চাই। আমি যেন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি!

    সব জেনেশুনে তাহলে আবার বিয়েটা করলেন কেন?

    উপায় ছিল না। বাড়িতে বলছিল বারবার। বলছিল, মেয়েরা ছেড়ে চলে গেলে পুরুষ একা হয়ে পড়ে। তার একজন সঙ্গী দরকার। নইলে সে অনাথ হয়ে পড়ে, খারাপ হয়ে যায়, খারাপ পাড়ায় যায়। তাকে দেখার কেউ থাকে না।

    তার পরে?

    তাছাড়া এই মেয়েটি আমার চেনাজানার মধ্যে, আমার পিসতুতো বোনের ননদ। তাই বিয়েটা হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলুম, ওর যখন একটা বাচ্চা আছে, তাই বাচ্চা চেয়ে আমাকে ঝামেলায় ফেলবে না। কিন্তু—। সব মেয়েরই সেই একই সমস্যা! মেয়েরা এত বাচ্চা-বাচ্চা করে কেন, বলতে পারেন?

    আপনি জানেন না?

    জানি। কিন্তু মনকে বোঝাতে পারি না! বলে লোকটা ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

    লোকটা হকার। মাধ্যমিক পাশ। আগে ট্রেনে কাজ করত। এখন পাড়ায় ঘুরে ঘুরে সিজিন অনুযায়ী নানান সামগ্রী বিক্রি করে। গরমের সময় আমের সরবত, বর্ষায় ভুট্টা। আবার কখনও পেয়ারা মাখা, বিলিতি আমড়া মাখা বেচে। আর এই অঘ্রাণে সে বেচছে কমলালেবু। ডাক্তার ওর রিপোর্ট দেখে বলে দিয়েছে, কিছু করার নেই। এদিকে নতুন বউকে কিছু বলবে, সে মুরোদও নেই। বিয়েটা করেছে নিজের সমস্যা লুকিয়ে। এখন সে আতান্তরে পড়েছে।

    গঙ্গা থেকে জল ক্রমে নেমে যাচ্ছে। সঙ্গে নামছে দল দল কচুরিপানা। একজন জ্যারিকেন ভরে গঙ্গাজল তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তখন ওপারে ফট-ফট-ফট করে অনবরত ফায়ারিং শুরু হল। বিকেলের দিকে দিকে এমন হয়। গ্রম-গ্রম, গুরুম-গুরুম। এখন আধঘণ্টা এমনি চলবে। ওপার ব্যারাকপুর। এপার শ্রীরামপুর।

    একটা বিড়ি ধরিয়ে লোকটা বলল, আপনি রোজ আসেন?

    হ্যাঁ।

    বাড়ি কি এখানেই?

    না।

    এখানে চাকরি করেন?

    না।

    তাহলে রোজ রোজ গঙ্গার ধারে এসে বসে থাকেন যে!

    এমনি।

    ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছিল। তারা যদিও শিবমন্দিরের আড়ালে বসে আছে, কিন্তু ঘুরন্ত বাতাসের প্রবাহ কি আটকায় তাতে? এমনি বাতাস দিল যে বুকের ভেতরটা কেঁপে গেল নবদ্বীপের। অঘ্রাণের বিকেল খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসে।

    এমনি?

    হ্যাঁ।

    এমনিই!

    বললাম তো।

    শুকনো পাতারা খসে খসে পড়ছিল স্মৃতির মতন, দুঃখের মতন। একজন প্রৌঢ় মানুষ কি জানি কোন আবেশে যেন ছুটে এসে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুটি শালিক ঘাটে চাল খুঁজছিল। তারা সভয়ে উড়াল দিল।

    সত্যি এমনি?

    হ্যাঁ। এমনি এমনিই তো পৃথিবী ঘুরে যাচ্ছে।

    লোকটা আপনি থেকে তুমিতে নেবে এল। বলল, তোমার তাহলে কোন দুঃখ নেই?

    না।

    আর সুখ?

    তাও নেই।

    সে নিদারুণ অবাক হয়ে বলে, এমনি হয়?

    হয়।

    এমনি করে মানুষ বাঁচতে পারে?

    পারে।

    যা, তুমি মিথ্যে বলছ!

    তুমি যেমনভাবে নেবে।

    সে অবাক হয়ে বলল, তাহলে তুমি বেঁচে আছ কী নিয়ে?

    ফুল ফেলার বাঁধানো জায়গার ঘেরাটোপের উপর একটি কাক উদাস হয়ে বসে আছে। সেও নদীর নেমে যাওয়া দেখছে। গোলাগুলি চলার শব্দ সমানে আসছে।

    নবদ্বীপ উঠে পড়ল। আজ অবদি কেউ তাকে বেঁচে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করেনি। এই লোকটা করল। ওদিকে কয়টি পায়রা ঘাটের ভিজে ধাপে নেমে শ্রাদ্ধের চাল খুঁটে খাচ্ছে।

    বলল, বেঁচে আছি মৃত্যুবোধ নিয়ে।

    চলে যাচ্ছ?

    হ্যাঁ।

    লোকটাও উঠে পড়ল। ফুল ফেলার জায়গায় একটি গরু ঢুকে পড়ল ফুল, পাতা খেতে। কাকটা উড়ে গেল।

    লোকটা বলল, এই সময়ে এমন হয়, না?

    ঘাড় কাত করে নবদ্বীপ উত্তর করে, খুব হয়।

    আমি কী করব বলো দেখি।

    তারে সব খুলে বোলো।

    তারপরে?

    বাকিটা…

    বলো…

    এই সময়ে চটকলে ভোঁ বাজল। পাঁচটা বেজে গেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। তবুও নদীর আলোয় আলোকিত ঘাট। এখানে এখনও একে-অপরকে চিনে নিতে পারে।

    ভোঁ মানেই একদল বেরোবে অপরদল ঢুকবে। নবদ্বীপ সেদিকে দৌড়ল। লোকটা চিৎকার করল, উত্তরটা বলে যাও!

    ছুটতে ছুটতে নবদ্বীপ সাহা কী উত্তর করল, দূরত্বের কারণে সেটা আর লোকটার কানে এসে পৌঁছল না। তারপরে অঘ্রাণের অন্ধকার নেমে এল।

    ফায়ারিং থেমে গেছে কখন!



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments