



পাক দেওয়া শুরু হবার আগে খেয়াল ছিল না, তাহলে পকেটের খুচরোগুলো বের করে প্যান্টের পকেটে, ওয়ালেটেই রাখত বিজু। কেবল বিজু না, বিজুর মত আরো অনেকেরই একই দশা এখন। নাগরদোলার এক একটা বাক্স থেকে সম্মিলিত মহিলা কন্ঠের চিৎকার ভেসে আসছে, যার খানিকটা ভীতু আমোদের। কিন্তু সত্যিকারের ঝুঁকিও আছে – এই নাগরদোলাটার একটু বেশিই কেতা। সেফটি বেল্ট। খাঁচা। বাক্সগুলো আবার উল্লম্ব কক্ষপথে ঘোরার মুখে এক অবস্থায় হেঁটমুণ্ড হয়। আর তখনই কারো না কারো পকেট থেকে সশব্দে খুচরো পয়সা সোজা নিচে গিয়ে পড়ছে।
ছেলেরা তত আওয়াজ না করলেও পাংশুমুখে রেলিং ধরে অথবা সঙ্গিনীকে সামলে-সুমলে বসে থাকার চেষ্টা করছে। বিজুর পকেটে দশ টাকার কয়েন ছিল ক'টা। কোনদিন শহরে গেলে এদিক ওদিক টোটোর ভাড়াটা হয়ে যেত। আসার সময় ঘুরপথে, হাইওয়ে ধরে ব্রিজ পার হয়ে এসেছে। বাবা বাণেশ্বরের চড়কের মেলা। পাশের জেলা। নদীটাই সীমানা। তখনই দেখেছে চাকায় হাওয়া কম, ফেরত যাবার আগে হাওয়া ভরতে হতে পারে। নদীর খাত পেরিয়ে গ্রামের রাস্তায় গেলে তো কথাই নেই। মোটকথা, থাকলে, খুচরোগুলো কাজে আসত।
যাই হোক, আফশোষ করতে গিয়ে বিজুর মনে পড়ল পকেটে তো সেই পেনটাও ছিল, ডট পেন, তবু বেশ দামি। তাছাড়া টাকা-পয়সার নিরিখে তাকে মাপা যায় না। আজকাল সবসময় ইস্কুলের স্যারের মুখোশ এঁটে থাকা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে...তবু মেলায় আসবে জানলে পেনটা ড্রয়্যারে রেখে আসত! নাগরদোলায় উঠতে হবে জানলে তো বটেই।
আসলে স্কুল ফেরত হাইওয়ের দিকে যাচ্ছিল সে, শহরে গিয়ে তাদের মামলাটার খোঁজখবর করতে হবে। নানারকম কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে। কিন্তু পথে কণার সঙ্গে দেখা, কণা স্কুলে আসছিল, তার কাছেই। দেখা হতে, বিজুকে ওর সঙ্গে মেলায় যাবার জন্য বলল, কণার মা'র মানসিকের পুজো দেবার কথা।
—আজকে তো হবে নাই রে। কালকে চ' কেনে।
—নীলের ব্রত কি তোমার জন্য বসে থাকবে? পুজো দিয়ে এলে তবে মা জল খাব্যে।
এরপর আর কথা চলে না। বাইকের মুখ ঘুরিয়ে বিজু বলল, চ' তবে। ভাপাই গে'।
কণা হেসে উঠল। ভাপানো শব্দটা ওদের পুরনো লড়াইয়ের দিনগুলির সঙ্গে জুড়ে আছে, যার ব্যবহার এখন রঙ্গ-রসিকতার অংশ...চৈত-বৈশাখের হলকা হাওয়ার মধ্যে ভিজে গামছায় মাথা-মুখ মুড়ে সাইকেলে করে কোচিঙে যাওয়া-আসার পথে চলতে চলতে এ সাইকেল ও সাইকেলকে শুধোবে, কেমন ভাপাইছু? তারপর হেসে উঠবে দুজনেই। আর পুরো দলটা থাকলে তো কথাই নেই। ভাপানো...মানে কষ্ট সহ্য করা।
অবশ্য এখন এতকিছু ভাববার সময় নেই, দোলা উপরের দিকে যেতে শুরু করেছে, টান পড়েছে মা বসুমতীর। কণার দিকে তাকিয়ে অবাক হল না বিজু, যথারীতি সে মুখে ভয়ডর নেই, বরং এই হুল্লোড়ের মধ্যেও সে যেন কোন অন্য চিন্তায় ডুবে আছে।
দোলা একসময় থেমে গেল। ছেলেরা কেউ কেউ দোলার কর্মচারীদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিল, তাদের পড়ে যাওয়া রেজগী কুড়িয়ে নিতে দিতে হবে, আগে কেন সাবধান করে দেওয়া হয়নি, ইত্যাদি। তাদের সঙ্গের মেয়েরা একপাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। নীরব সমর্থন, আর কি।
কিন্তু যেখানটায় পয়সা-টয়সা পড়েছে সেটা দোলার ভিত। এখন ধান্দার টাইমে রাইড বন্ধ করে সেসব করতে দিতে কর্মচারীরা নারাজ। মালিকটা চুপিসাড়ে ভিড় এড়িয়ে বন্দুকবাজির স্টলের সামনে গিয়ে বিড়ি ফুঁকছে। যেন সে এখানকার কেউ না।
বিজুও হাতা গুটিয়ে ঝগড়ায় যোগ দিতে যাচ্ছিল, কণা তাকে টানলো, চলে এসো, ছেড়ে দাও। মন্দিরে ভূতের নাচ শুরু হয়ে যাবে। বিজু বলতে যাচ্ছিল, তার পেনটার কথা, দেখল কণার নাক আর ঠোঁটের মাঝখানে বিন্দু বিন্দু স্বেদ। হালকা লিপস্টিক। পুরো শহরের বিটিছেল্যাদের মতনই লাগছে। একটা ব্যক্তিত্ব ফুটে বেরুচ্ছে যেন।
হাল ছেড়ে দিল বিজু। ক্যাচকম্যাচর ছেড়ে বেরিয়ে এল। একটা সময়ে লোকের চোখ এড়িয়ে কণার সঙ্গে এদিক ওদিক যাওয়ার ছোট ছোট স্মৃতির মতই খুচরোগুলি পড়ে রইল। হঠাৎ লক্ষ্য করল, ওড়না পরেনি কণা, নাকি পরেছিল, এখন ব্যাগে রেখে দিয়েছে। সত্যি বড্ড গরম আজ।
—কী রে! ভয় করলনি? বিজু জিজ্ঞেস করল।
—একটু। কণা আলতো হাসে। কি দুটা খুচরার জন্য বাখান শুনছিলে!
বাখান, মানে গালি-গালাজ।
বিজু একটু আশ্বস্ত বোধ করে, শহরের মানুষীর মধ্যে চেনা মেয়েটা এখনও আছে ঠিকই...খুচরোগুলোর জন্য তত মায়া হয় না, তবু মুখে বলে, আরে আমার সেই পেনটা...
কণা ভুরু কুঁচকালো, তারপর তার মনে পড়ল, একটু হাসল সে। তারপর বলল, চলো, বাণেশ্বরের ভক্ত্যার দল বেরিয়েছে।
আই আই টির ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতে যখন এই বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছিল কণা, তখন কৃতজ্ঞতায় উপরের দিকে তাকিয়েছিল একবার। মায়ের রাখা মানসিক, বাণেশ্বরের মন্দিরে পুজো দেবার কথা মনে পড়েছিল। একবার ব্যাঙালোরে গিয়ে জয়েন করলে, সোজা যদি ওভার সী'জ় সাইটে যেতে হয়, যেমন সিনিয়ররা বলছে, তাহলে কবে আবার সময় পাবে তার ঠিক নেই কিছু। একবার চট করে তাই গ্রামে ঘুরে যেতে চাইছিল কণা।
অজ গ্রামের মেয়ে হয়েও অত বড় কলেজে পড়বার সুযোগ পাওয়া, এটাই কণার কাছে এক অলৌকিক, প্রায় দৈবী হস্তক্ষেপ। অথচ বরাবর এরকম ছিল না। এখানে, প্রচলিত বিশ্বাসে মেয়েরা অঙ্কে কাঁচাই হয়, লজিক বোঝে না, কাজেই ক্লাস টেনে টেনেটুনে পাশ দিলেই চট করে বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়। এমনিতেই মিড-ডে মিল বন্ধ হলে নিতান্ত সম্পন্ন গৃহস্থ না হলে ইসকুলে পাঠাতে দুবার ভাবে বাপ-মা।
কিন্তু নতুন স্যার, বিজু মাহাতো তখন সদ্য সরকারি পরীক্ষায় পাশ দিয়ে গ্রামের একমাত্র হায়ার সেকেন্ডারি ইসকুলে জয়েন করেছে। কণা ক্লাস নাইন। বিজু স্যার সামান্য উপকরণ দিয়ে, তামার তার, পেনসিল ব্যাটারি, ছোট চুম্বক দিয়ে বিজ্ঞানের পরীক্ষাগুলো হাতে কলমে করে দেখান, ক্লাসে কেবল সিলেবাস পড়ানোর চাইতে প্রশ্নগুলো উস্কে দেন। নতুন স্যারের উৎসাহে ভাল ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন দেখার সেই শুরু।
কণারা চার-পাঁচজন ইস্কুল থেকে মাধ্যমিকে জেলায় বেশ ভাল ফল করল, একজন তো রাজ্যস্তরেও। মেয়েদের মধ্যে কণা আর শিউলি। কণা অঙ্কে একশোয় একশো। জেলার টিভি-চ্যানেলের রিপোর্টার ক্লাসের ফার্স্টবয়ের বাইটস নিল। তার সঙ্গে অঙ্কের জন্য কণারও বাইটস নিল। হেডস্যারেরও। এই কৃতিত্বে নতুন স্যারের যেন কোনও ভূমিকা নেই, কেউ তার কথা বলল না, টিভির ক্যামেরাও তাঁর দিকে ঘুরলো না। কণার বেশ খারাপ লেগেছিল।
কিন্তু তার দু'বছর পরে ব্যপারটা সম্পূর্ণ অন্যরকম দাঁড়াল। দশ ক্লাস পাশ-করা ভাল ভাল ছেলেরা প্রায় সবাই শহরের বড় ইস্কুল-কলেজে চলে গেছে। ক্লাসে মেয়েদের মধ্যে কেবল কণা আর শিউলি। আর গুটিকয় ছেলে। যারা রইল তাদের সবার জন্য ওই দুটো বছর বিজু স্যার লেগেই রইলেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বই, ধার করে আনা মেটেরিয়ালস, বিনামূল্যের অনলাইন ক্লাস...কি না করেছেন একলার উদ্যোগে। এরই মধ্যে কখন যেন বিজু স্যার থেকে সবার বিজুদা হয়ে গেছে।
পুরুলিয়া থেকে আসা ছোকরা মাস্টার বিজু মাহাতো আর গ্রামের মেয়ে কণা দত্তর এই যোগাযোগ সহজ ছিল না। এগারো ক্লাসের শেষদিকে শিউলির বিয়ে হয়ে গেল দুম করে। প্রথম সরব আপত্তি এল শিউলির বিয়ের পরপর। কণা ক্লাসের পর ইসকুলে বসে থাকে, বিজ্ঞানের জটিল, না-বোঝা বিষয় বুঝে নেয় স্যারের মোবাইলে ফ্রি ক্লাস দেখে। হেডমাস্টারমশাই বিজুকে ডেকে বললেন, দ্যাখো, ইটা গাঁ-ঘর, শহর নয় বটে। বদনাম হবেক। বিজু বলল-আইজ্ঞা। আসলে যেমন চলছিল, তেমন চলতে লাগল।
কণা ইসকুল থেকে দেরি করে ফেরে..কণার বাবা বাড়ি মাথায় করে। কণার মা বলে —ইটা কি মগের মুল্লুক পাইচু? কণা ঠান্ডা গলায় বলল, বিটিছেল্যারা পড়ালিখ্যা করবে ইটো মগের মুল্লুক, লয়?
তার মূর্তি দেখে বাবা মুখে কুলুপ দিল। মার নিষ্ফল তর্জন-গর্জন চলতেই লাগল। কণা বিজুকে জানতে দিল না। জানলেও, বিজুও সদাশিব এইসব ব্যাপারে।
কাজেই কণা যখন বারো ক্লাসের সঙ্গে সঙ্গে জে-ইতেও ভাল ফল করল তখন এটা স্পষ্ট যে তাতে তার ইস্কুলের ভূমিকা গৌণ। যে ভাল ছেলেরা শহরে গিয়েছিল, তারাও মোটামুটি ফল করেছে, বলার মত কিছু না।
ইসকুলে বিজু জনপ্রিয় মাস্টার, কণার রেজ়াল্ট অভূতপূর্ব ভাল... অতএব জেলা শহর থেকে দৈনিক জনকণ্ঠের চ্যানেলের ছেলেটা এসে আবার কণার ইনটারভিউ নিল, সঙ্গে এবার মাস্টারেরও... স্টোরিটা ভাইরাল হয়ে গেছিল। তখন সদ্য আই আই টির মেধা তালিকায় নাম উঠেছে তার। স্বপ্নপূরণ একেবারে। বিজু স্যারের সঙ্গে যোগাযোগটাই যে তাকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গেছে, পদে পদে চোখ খুলে দিয়েছে...সেটা কেউ আর তখন অস্বীকার করতে পারে না। হেড মাস্টার পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলেন, হঁ, ছোকরার এলেম আছে বটে।
তাছাড়া সীমাবদ্ধতা কি একটা? পড়ার খরচ...জলপানি পাওয়া সত্ত্বেও কুলোনোর পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। ক্রাউড ফান্ডিং-এর আইডিয়াটাও বিজুদার। বাকিটা টিউশন।
—আমিও কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি। হার মানতে শিখিনি, বুঝেছিস। বিজুদা বলেছিল।
আশ্চর্য, তখন কিন্তু মা-বাবা আর আপত্তি করেনি, অথচ পরে, ছুটি-ছাটায় যখনই এসেছে, বিজুদার খোঁজ করেছে ইসকুলে গিয়ে, মা'র যেন মুখে একগাল মাছি। ঘুরিয়ে বলে,
—আর ইসকুলে গিয়ে কী কইরবি। লিজের লিখাপড়্যা করগা'।
কিন্তু ততদিনে কণার মতামত আরো দৃঢ় হয়েছে। কলেজে গিয়ে যেন একটা অজানা জগৎ খুলে গেছে। প্রথম প্রথম ঝাঁ-চকচকে শহুরে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে থাকলেও আস্তে আস্তে বন্ধুত্বও হয়েছে কারো কারো সঙ্গে। বেস্ট ফ্রেন্ড নীরজা শর্মা, সুবোধ দহিয়া, উপল জর্জ...নীরজার বাবা ঝাড়খন্ড ক্যাডারের আই পি এস...উপলদের গোয়ায় এয়ার বি এন বি। একমাত্র সুবোধ, হরিয়ানার জাঠ ছেলেটাই কণার মত গ্রাম থেকে উঠে আসা। তাও সুবোধদের জমিজমা বিস্তর, কণার বাবার মত ভাগচাষে দেওয়া সামান্য জমির মালিক নয়।
সেইসব বন্ধুরা কেউ আই এ এস হবার স্বপ্ন দেখছে, কেউ জ়ুগল, কিনোসফ্টের মত বড় কোম্পানিতে কাজের। কাজেই কণাও বড় বড় স্বপ্ন দেখা শিখে গেছে। সে সোজাসাপটা বলে,
—তাতে তুমার কী বটে?
মা চেপে যায়, তবু দেখিয়ে দেখিয়ে চোখে কাপড় দিয়ে কাঁদে। বাবা গোয়ালে শব্দ করে খড় কাটে, ধপ করে খোলের বস্তা ফেলে। ধুপধাপ পা ফেলে গোয়াল পরিষ্কার করে। কণা অবিচল, পুরনো সাইকেল ঝেড়েঝুড়ে নিয়ে বের হয়। কেবল বিজুর সঙ্গে দেখা হলে তার অভিমানের মেঘটি ফেটে যায়...কেমনধারা মানুষটা, যে কথাটা বলা সবচেয়ে দরকারি, কখনোই বইলতে পারে না কেনে!
—ছাড়, কাঁদাকাটা করিস না। বিজু কিন্তু আর কিছুই বলে না।
ফাইনাল সেমেস্টারের আগে মা যখন এক পাত্রের ছবি উজিয়ে প্রশ্ন করল, পছন্দ হয়? তখন কণা আবার বোমা ফাটাল। মাও ছাড়বার পাত্রী না , বলেছিল, তা হবে কেনে! শেষে ডোম বাগদিঘরে লয় নিচু জাতে বিহা বসতে হবেক তো!
এবারও বিজু জানতে পেরে শুধু বলেছিল, যাত্যে দে। তোর রেজ়ুমে কিনোসফ্টে সাবমিট করলি? আর কবে করবি!
সেটাও হয়ে গেল একসময়। অনেক প্রস্থ ইনটারভিউর পরে একদিন সত্যিই কিনোসফ্টের জব অফার এল। বাৎসরিক প্যাকেজের টাকার অঙ্কটা জেনে মা'কে বলাতে একটু নরম সুর শোনা গেল, হঁ ভাল, মাস্টারকে একদিন ঘরকে খাত্যে বইলব তবে। খাইয়েছিলও।
কণাও একটা পেন আর একটা টি শার্ট নিয়ে এসেছিল। সেই পেন।
কিন্তু আজকে মানতের পূজাটা দিয়ে আসবার কথা যখন উঠল, মা'র আবার অন্য সুর।
নিজের পায়ে বাতের ব্যথা, এদিকে মেয়ে বিজুর সঙ্গে গেলেও আপত্তি।
—কী দরকার। শুনছি উয়ার চাকরি আর থাকবেক নাই।
—তুমি তো দেখি হাওয়া-মুরগার মত, খালি ঘুরে যাও। চাকরির সাথে মেলার কী!
—তা যা কেলা। কপালে বাগদি ঘর লিখ্যা থাইকলে আমি কী কইরব! তবে দিনে দিনে আসবি। পুজো দিয়ে এলে তবে জল খেতে পাব।
মা কি তবে হাল ছেড়ে দিয়েছে? নাকি বাবা কুটুমঘর গিয়েছে বলে আপাতত চুপ। এলে ঝগড়া করবে?
তা, দেখা হতে বিজু দোনোমনা করে রাজি হল। রাজি হল নাগরদোলাতেও। বিজুর আসলে ভয় লাগে, কিন্তু যদি কণা ভীতু বলে প্যাঁক দেয়! সে আরো খারাপ লাগবে।
মা'র সঙ্গে না এসে কণার ভালই হল। বিজুর আবার পড়াশুনা, চাকরি... এর বাইরে জাগতিক ব্যপারে বিশেষ মতামত নেই। কণার ধারণা নাগরদোলাতেও বিজুর না নেই যদিও সত্যিটা অন্যরকম।
আর মুখে প্রকাশ না করলেও কণার নাগরদোলায় একা একা চড়তে কেমন জানি লাগে। পেট-গোলানো চক্করে মানুষ নির্ভরতা খোঁজে। আগে যখন ঠাকুমার সঙ্গে আসত, সে বুড়ি তো সটান কাটিয়ে দিত, তুই যা দিদি। লাগর খুঁজ্যে লে, আমি যাতে লাইরব।
সে আর কী করে! তক্কেতক্কে থাকত, যদি ইস্কুলের, গ্রামের মেয়েদের কাউকে দেখতে পাওয়া যায়। একসঙ্গে দোলায় চড়বে। সবসময় চড়া হত না তাই।
সারাটা পথ নীলঠাকুরের গল্প শোনাতে শোনাতে যেত ঠাকুমা। নীলঠাকুর মানে শিবের প্রথম বিয়ে হয়েছিল দক্ষরাজার মেয়ে সতীর সঙ্গে। দক্ষ প্রজাপতি, স্বয়ং ব্রহ্মার ছেলে, এদিকে শিব শ্মশান-মশানে ভূতপ্রেত নিয়ে ঘোরা অনার্য। কাজেই দক্ষরাজা ক্ষিপ্ত হয়ে শিবের নামে আকথা-কুকথা বলতে লাগলেন। সতী স্বামীনিন্দা শুনে শরীর ত্যাগ করলে শিবঠাকুর পাগলের মত হয়ে গেছিল। দেবী তাই আবার ফিরে এলেন নীলধ্বজ রাজার কন্যারূপে। শিবঠাকুরের সঙ্গে বিয়েও হল, কিন্তু সেবারেও রাজকন্যা নীলাবতী কি জানি কী ভুলে মক্ষিকারূপ ধারণ করতেই জলে ডুবে মারা গেলেন...শেষটায় পার্বতী হয়ে ফিরে এসে অনেক তপস্যা করে তবে শিবানী হলেন।
ঠাকুমার বলা গল্পটা এতদিন পরেও মনে আছে দেখা যাচ্ছে।
আচ্ছা, দুবার বিয়ে করলে দোজবরে বলে, তিনবার বিয়ে করলে কি তিজবরে হয়? প্রশ্নটা আদতে স্বগতোক্তি হলেও সশব্দ হয়েছিল মনে হয়।
—অ্যাঁ?! আমাকে বলছেন?
কণা চমকে দেখে তুষার, তুষার কাঞ্জিলাল। সেই জনকণ্ঠের রিপোর্টার, যে একসময় তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। এখন তারই পাশে দাঁড়িয়ে পেল্লাই সাইজের জিলিপি ভাজার ছবি তুলছে। মন্দিরের রাস্তায়, দু'ধারে দোকানের সারি। সেখানেই, কণার অভিমুখের উল্টোদিকে।
—না, না, ও কিছু না। কণা সামলানোর চেষ্টা করে। আজকাল তুষার দেখা হলেই বড্ড খেজুর করে বলে কণা গোপনে তার নাম রেখেছে পচা শামুক।
—বিজুবাবুকে দেখলাম।
—আচ্ছা। কোথায়?
—ওই তো, বাবার মন্দিরের সামনে। আমিও যাব আবার, একটু স্টলের ছবি-টবি তুলে নিই। আবার গাজনের ছবি তুলব। আসছেন তো।
আসলে তুষার সবটা বলল না। শিক্ষক-নিয়োগের প্যানেল নিয়ে বেশ কিছুদিন মামলা চলছিল সে তো সবাই জানে। শেষমেশ কোর্ট দুর্নীতির অভিযোগে পুরো প্যানেলই বাতিল করে দিয়েছে, চাল আর কাঁকর আলাদা করতে না পেরে। আজ দুপুরেই জেলা সদর থেকে খবর এসেছে, সেটা বিজুকে বলে, প্রতিক্রিয়া ক্যামেরায় ধরে তবে শান্তি। আজকাল সবসময় মাথায় রাখতে হয় কিরকম বাইটস হলে কতজনে হিট করবে। ভাল মন্দ, সত্যি মিথ্যে ব্যপার না, সেনসেশন জরুরি। যাক, কাজটা উতরে গেছে।
কিন্তু তুষার কণার কাছে সেসবের কোন উল্লেখ করল না, ফোঁস করে ওঠে যদি। কানাঘুষোয় তাদের সব খবরই সে রাখে।
কণা পা চালাল। মন্দিরের দিকে। আচ্ছা মানুষ তো! না হয় সে এতদিন পরে মেলায় এসে একটু বেশিই হাঁ-করা ছা-এর মত এদিক ওদিক দেখে দাঁড়িয়ে পড়ছে, তা বলে না ডেকে এভাবে চলে যেতে আছে? সন্ধে হয়ে গেল, ফিরতেও তো হবে এতটা পথ।
তুষার পিছন থেকে বলল, আমার কিন্তু আজ অফিসের গাড়ি আছে, আপনাদের ছেড়ে দিতে পারি।
কণা শুনেও শুনল না।
যতক্ষণে বিজুর খেয়াল হয়েছে পাশে কণা নাই, ঠিক তক্ষুনি তাকে তুষার ধরেছে।
—বিজুবাবু মামলার রায় শুনেছেন তো?
মামলা চলছিল, এরকম একটা কিছু ঘটতে চলেছে বলাবলিও চলছিল। সে নিজেই তো সদরে যাবার প্ল্যান করছিল আজ। তবু এক হাট লোকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই রায় শুনলে একটু বে-এক্তার তো হবেই মানুষ। তা ছাড়া সে নিজে তো দুর্নীতি করে চাকরি পায়নি, টাকা দেওয়ার সাধ্যই নেই তার, মুখে চোখে কোনো ক্রুদ্ধ বিপন্নতা ফুটে উঠে থাকবে, যা আমোদ-গেঁড়ে বাইরের মানুষের উপভোগ্য। যা মুখে বলল তাতে তুষার আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া পেয়ে গেল। সেটা বুঝতে পেরে বিজুর মেজাজটা গেল খিঁচড়ে, সে মন্দির চাতাল থেকে বেরিয়ে এসে আতস বাজির মাঠের দিকে গেল। একটু চিন্তাও হচ্ছিল তার, মেয়েটা গেল কোথায়! মনে করার চেষ্টা করল শেষ কোন স্টলে তারা একসঙ্গে ছিল। কী কথা হচ্ছিল তখন।
ওদিকে শ্মশানবাসী দেবতার উপযুক্ত আনন্দ উৎসবে মেতেছে মন্দির প্রাঙ্গণ। ঢাক-ঢোল-কাঁসর বাজছে। বীভৎস সাজে ভূতের দল নৃত্য করছে! সিঁদুর, ঘাম, ধুলোয় মানুষগুলোকে আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। কেউ কেউ লাঠির আগায় সিঁদুরমাখা নরকরোটি বসিয়ে ঘোরাচ্ছে। শবাকৃতির একটি খড়ের পুতুল নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া করছে কয়েকটি ভূত-সাজা সন্ন্যাসী। তন্নতন্ন করে খুঁজেও বিজুকে দেখতে পেল না কণা। সে কি আদৌ মন্দিরে এসেছিল?
ততক্ষণে নীল ঠাকুরের পাটা নামিয়ে বসানো হয়েছে। সকালে নববরের অধিবাস সম্পন্ন হয়েছে। চৈত্রসন্ধ্যায় দেবী নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ। প্রস্তুতি চলছে, সন্তানবতী মায়েরা ভিজে কাপড়ে এসে শিবের মাথায় জল ঢালছেন, বাতি জ্বালছেন সন্তানের সমসংখ্যার।
কণার মন্দিরের কোলাহল ভাল লাগছিল না আর। সে পুজো দেবার আবেষ্টনীর মধ্যে ঢুকল। জল, কাদা আর দুধে চিটচিটে মেঝেয় সন্তর্পণে পা রেখে। সামনের তরুণী মা'টি একটি বছর দেড়েকের বিচ্ছু আর পূজার ডালি নিয়ে নাজেহাল দেখাই যাচ্ছে। সঙ্গে মনে হয় শাশুড়ি, ননদ। দুপাশে রেলিং ধরা লাইন আর এগোয় না। বাচ্চাটা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, হাত পা ছুঁড়ছে। ছেলেটাকে একটু ধরলে কী ক্ষতি হয়, অথচ শাশুড়ি, ননদ নির্বিকার, নিজেদের মধ্যে গল্পই করে যাচ্ছে। বাচ্চাটা একবার এমন হাত ঝটকাল, পুজোর ডালার মধ্যে রাখা ছোট্ট জলের ঘটটি উল্টে গেল। মেয়েটি আর থাকতে না পেরে একটা চড় কষিয়ে দিল, বাচ্চাটা ফের চিল-চিৎকার করে ওঠাতে, মেয়েটা ধমকে ওঠে, ফের গ্যাঙাচ্ছু!
কণা অমনি চিনতে পারে, আরে, শিউলি না?
কেমিস্ট্রি ক্লাসে ছেলেরা লেকচার না শুনে গোলমাল করলে মনোযোগী ছাত্রী শিউলি চেঁচিয়ে উঠত, গ্যাঙাচ্ছু কেনে? বাখান শুনবি?
বিজুর মনটা বিক্ষিপ্ত ছিল, তা না হলে মনে করতে পারত কণা একটা চুড়ির স্টল দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
—রেশমি চুড়ি!
বিজু অবাক হল, সিটা কী বটে?
—হেই মা, রেশমি চুড়ি দেখ নাই!
বিজু হাসে, না দেখি নাই তো! তু রেশমি চুড়ি লিবি? মন্দিরকে যাবি নাই?
কণা হঠাৎ রেগে গেল, হঁ, লিব। তুমার কী!
বিজু আর ঘাঁটাল না তাকে। আজ একদম মিলিটারি মেজাজ ম্যাডামের।
কারণটা তার অজানা নয়। কিন্তু বিজু নিরুপায়...চোখ বুজলেই একটা দুঃস্বপ্ন ফিরে ফিরে এসে তাকে এলোমেলো করে দেয়। চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখতে পায় পাথরের মত বসে আছে শিউনাথ, তার বড়ভাই। মা পাগলের মত তার কালশিটে পড়া শরীরে হাত বুলাচ্ছিল আর ঠাকুরকে ডেকে ডেকে বলছিল, আমার বেটাকে ফিরে দাও। শিবভক্ত বাবা বড় সাধ করে দু'ভাইয়ের নাম রেখেছিল শিবনাথ, বৈজনাথ। আরো বেশ কিছু নাম ভেবে রাখা ছিল, কিন্তু শিবনাথের পরে বেশ কয়েকটি সন্তান অকালে চলে যায়।
পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে শিবনাথ ছবি আঁকত, বাঁশি বাজাত...একটা শিল্পীমন ছিল। আরো ভাল করে ছবি আঁকা শিখতে গেছিল কলকাতায়...একেবারে নিজের চেষ্টায়। সামান্য চাষবাস করে, ছাগল চরিয়ে বিজুদের বাবার কোন সামর্থ্যই ছিল না ছেলেকে কলকাতায় পাঠানোর।
বিজুর তখন ক্লাস টু।
আর্ট কলেজ পাস করে দাদা একটা ছোট কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল, ছবি আঁকারই, তাকে নাকি কমার্শিয়াল আর্ট বলে। সে জিনিস খায় না মাথায় দেয় বিজু জানত না। কিন্তু দাদা মাঝে মাঝে তাকে কলকাতায় নিয়ে যেত, নিজের মেসে রেখে শহর দেখাত।
ঝাঁ-চকচকে শহর বড় ভাল লাগত ক্লাস ফাইভের বিজুর, ভাল লাগত ফুচকার তেঁতুল জল, বেশি ঝাল হলে দাদা বলত ফেলিস না, আমাকে দে। আরো ভাল লাগত সেই আইসক্রীমের শরবত, গোলাপি শাদা, কীসের বীজ দেওয়া...তাকে নাকি ফালুদা বলে।
সবচেয়ে ভাল লাগত সোমাদির সঙ্গে দেখা হলে। সুন্দর করে সাজা ছোটখাটো সোমাদি মাঝে-মাঝেই ব্যাগ থেকে দামি চকোলেট বের করে দিত বিজুকে। দাদা মানা করলেও শুনত না। সোমাদির আসা-যাওয়ার সময় একটা মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ভাসত। ফেরত আসার সময় পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ছাড়ার আগে অব্দি গাড়িতে বসে গল্প করত, দাদা তাড়া দিলে বলত, টেনশন কোরো না। আমি সময়মত নেমে যাবো।
ক্লাস এইটের বিজু এক শীতের শেষ বিকেলে গ্রামের সীমানার টিলাটা থেকে ছাগলগুলোকে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির দিকে, দেখে এক বিধ্বস্ত পাগল খোঁড়াতে খোঁড়াতে তার দিকেই আসছে, আঁ আঁ করে কিছু বলবার চেষ্টা করছে।
প্রথমে ভয় পেলেও, পরক্ষণেই বিজু চিনতে পারল, এ তো দাদা! কিন্তু এ কী হাল হয়েছে তার!
অনেক পরে জেনেছিল সোমাদের পরিবার কলকাতার খুব প্রভাবশালী বনেদী পরিবার। মেয়ের জন্য সেই বংশগৌরব হাতছাড়া করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। যে কোন মূল্যে।
শিউনাথ শুধু বিড়বিড় করে বলেছিল, সোমা নেই, সোমা নেই।
তার পর থেকে সে জীবন্মৃত।
পুজোটা দিয়ে কোনোমতে বেরিয়ে এল কণা। একটাই জায়গা বাকি থাকে। বাজির মাঠ। নইলে অ্যানাউন্স করাতে হবে কমিটি আপিসে গিয়ে। মোবাইল কখন ডিসচার্জ হয়ে গিয়েছে। বিজুদার নাম্বারটাও আর মুখস্থ নেই আগের মত।
আসলে অনেক কিছুই আর আগের মত নেই। এ'কথাটা মা বলেছিল সবচেয়ে সোজা সাপটা।
—তু আর হামাদের বিটিছেল্যাট' নাই।
সত্যিই তার মত গ্রামের মেয়েকে যে বাইরের দুনিয়া একদিন এভাবে গ্রাস করে নেবে, তা কি কোনোদিন ভেবেছিল? তখন তো তার উচ্চাশা বলতে ছিল, স্কুল সার্ভিস পাস করে সাইকেলে চড়ে বিজুদা, মঞ্জুদিদের মত ক্লাস নিতে যাবে। ভাবত শহরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসে গ্রামের ইসকুলেই পড়াবে। আরো অনেক অনেক কণা, শিউলি তৈরি করবে।
বিজুদাই বরং বলত অন্যান্য সরকারী পরীক্ষার কথা, যেসব পদের ক্ষমতা দিয়ে অনেক অসহায় মানুষকে সাহায্য করা যায়।
অথচ আজ সেই কণাই স্বপ্ন দেখছে ওভারসীজ় প্রজেক্টে আমেরিকা, ইউরোপ যাবে, একদিন প্রথম বিশ্বের কোথাও নিজের কোম্পানি, নিজের অফিস খুলবে, বিশ্বনাগরিক হবে। দুনিয়া পাল্টে দেওয়ার মত টেকনোলজি নিয়ে কাজ করবে।
তার পাশে কোথায় অগৌরবে পড়ে থাকে অতীতের ছোট-ছোট স্বপ্নগুলো!
তখন, আদর্শর কথা বলত, বিজুদার দৃষ্টান্তে উদ্দীপ্ত হত। কীভাবে করবে, তার কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না, কিন্তু সত্যি ভাবত।
কিন্তু এখন? কানাঘুষা চলছে, উয়ার চাকরি থাকবেক নাই। বিজুর মত শিক্ষকেরই যদি চাকরি না হয়, তবে কীসের ভরসা!
আর শিউলি! এক সময়ের মেধাবী ছাত্রী, সম্পন্ন গৃহস্থের মেয়ে, এখনও সম্পন্ন ঘরের বৌ। অথচ এক দামাল শিশুকে নিয়ে নাজেহাল বৌমাকে দেখেও নির্লিপ্ত শাশুড়ির চাহনি বুঝিয়ে দিল, ওইটুকুই। সোনার, কিন্তু পায়ে যেটা আছে সেটা বেড়িই।
পুরনো বন্ধুকে চিনতে পেরে কণার এত উচ্ছ্বাস, অথচ তাকে দেখে শিউলি ক্লান্ত স্তিমিত গলায় শুধু বলল, ও তুই, কণা। কেমন আছিস?
—ভাল রে।। তোর ব্যাটা?
—হ্যাঁ। সামনের শ্রাবণে দেড় বছর পুরবে। তা, তু বিয়া কবে বসচু? কণার হাসি পায়...বিয়ে! এই শিউলিই নাকি চাইত কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়তে, পি এইচ ডি করতে...পড়া শেষ করার বদলে কী নির্মম ভাবে নিজের স্বপ্নের ডানা ছেঁটে ফেলেছে সে। না, আসলে ছেঁটে ফেলেছে অন্য কেউ। নাঃ, যেটা নিজের জায়গা বলে মনে হত, সেই জায়গাটা আসলে একটা ছোট্ট খাঁচা। শিউলি বলে যাচ্ছে...
—আমার ইস্কুলের বন্ধু। আমাদের গর্ব বটে। কাগজে উয়ার ছবি ছাপা হয়।
এভাবেই শাশুড়ির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছে। শাশুড়ি শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, বাবার নাম কী? ঘর কোথা?
সব শুনে তেমনই নিস্পৃহ, অ, কায়েত, পাশের গাঁ।
আর বিজুদা?
মা বলেছে, উয়ার চাকরি আর থাকবেক নাই। আচ্ছা, না-ই থাকল, বিজুদাকে যদি সে বোঝায়, চল, আমরা বেরিয়ে পড়ি...যদি ব্যাঙালোর চলে যায় তারা?...কিন্তু ছাত্র তৈরি করা যার প্যাশন সে ওইটা ছাড়া আর কী কাজ করবে? ব্যাঙালোরের কল সেন্টার? গাঁয়ের ইসকুল, গরিবঘরের আগ্রহী পড়ুয়াদের এই দুনিয়া ছাড়া বিজুদা...ভাবা যায় না।
তা ছাড়া কে জানে কেন মুখে বাইরের দুনিয়ার কথা বললেও, বিজুদার বড় শহরের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা আছে। কলকাতা যাওয়ার কথা উঠলেও কেমন কুঁকড়ে যায়।
নাঃ হচ্ছে না, হচ্ছে না কিছু। দেখাই যাচ্ছে এই দুনিয়ায় অনেক সময় চাইলেই অন্যরকম কিছু করে উঠতে পারা যায় না।
মানুষ ছার, দেবতারাও তো পারেনি। একজন পারেনি তাঁর গর্বিত পিতাকে বোঝাতে, মূল্য চুকিয়েছে নিজের জীবন দিয়ে, ভূতের দল ছারখার করে দিয়েছে যজ্ঞস্থল। আরেকজনের মা-বাপ তো রাজিই ছিল, কিন্তু তাঁদেরও করুণ পরিণতি হল আত্মবিসর্জন। পার্বতীর ভীষণ তপস্যা তো শুধু নিজের জন্য ছিল না। হয়তো তাই পার্বতী পেরেছিল অভিশাপ জয় করতে।
শ্বাস পড়ল কণার। ঠাকুমা বুড়ির গল্পকথা মনে পড়ল।
—সতী, নীলাবতী, পার্বতী।
হয়ত এভাবেই একটু একটু করে এগিয়ে যেতে হবে। এক এক জন্মে। তার জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে।
অন্ধকার হয়ে এসেছে, কণা আর দেরি না করে মাঠের দিকে রওনা হল। বাজির মাঠ থেকে রকেটগুলি তখন সাঁ-সাঁ করে আকাশের দিকে ছুটে যাচ্ছে।