• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share
  • অঁক্‌তিল দুপেরোঁর ‘উপনেখত’ -
    পাশ্চাত্যে উপনিষদের প্রথম অনুবাদ
    : শুভময় রায়

    অষ্টাদশ শতাব্দের মধ্যভাগের কোনও এক সময় গুজরাতের সুরাতের জরথুস্ত্রপন্থী এক ধর্মযাজকের কাছ থেকে কোনও ফরাসি সাহেব ‘আবেস্তা’র (জোরোআস্তর অথবা জরথুস্ত্র-প্রবর্তিত ধর্মের পবিত্র রচনাবলি) একটি মূল্যবান পুঁথি ধার নেন। সেই যাজক দরাব কুমামা আসলে ছিলেন সাহেবের শিক্ষক। তিনি সাহেবকে সে বইয়ের অর্থোদ্ধার করতে শেখাচ্ছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল যে পুঁথিটা কিছুতেই মাস্টার মশায়ের কাছে আর ফেরত আসে না। সপ্তাহ কেটে মাস যায়। অবশেষে দরাব একদিন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন কবে তাঁর মূল্যবান গ্রন্থটি ফেরত পাবেন। ছাত্র তখন তার পিস্তলটি দেখিয়ে শিক্ষককে বলল, ‘পুঁথিটি ফেরত দেওয়া যাবে না, বেশি ত্যাঁদড়ামি করলে প্রাণ সংশয় হতে পারে!’

    এই ছাত্র প্রাচ্যবিদ্যার পণ্ডিত আব্রাম ইয়াসাঁৎ অঁক্‌তিল দুপেরোঁ (Abraham-Hyacinthe Anquetil Duperron) এশিয়ার প্রাচীন ধর্মগুলির শিকড়ের অনুসন্ধানে ভারতে এসেছিলেন। নিজের স্মৃতিকথায় সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের বর্ণনা তিনি লিখে গেছেন। তিনিই প্রথম ইয়োরোপীয় যিনি ইসলাম-পূর্ব ইরানের জরথুস্ত্রপন্থীদের ধর্মগ্রন্থ ‘আবেস্তা’র অনুবাদ করেন। দু হাজার বছরের পুরোনো ‘আবেস্তান’ ভাষায় রচিত সে গ্রন্থ পড়তে শেখার জন্য ১৭৫৫ থেকে ছ’বছর অঁক্‌তিল ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। এর মধ্যে বেশ অনেকটা সময় সুরাট বন্দরে তার কয়েক শতাব্দী আগে পারস্য থেকে ভারতে আসা পারশি সম্প্রদায়ের সাহচর্যে অতিবাহিত করেন। ১৭৭১-এ আবেস্তা’র অনুবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরে ইয়োরোপে সাড়া পড়ে গেল। বলাই বাহুল্য সে অনুবাদ খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস আর অনন্যতার ধারণাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বিচলিত করে তুলল। বলা যায় ধর্ম সম্পর্কে ইয়োরোপীয়দের ধারণায় ঘটে গেল বিপ্লব।

    তবে এই ফরাসি প্রাচ্যবিদ শুধু আবেস্তা অনুবাদ করেই ক্ষান্ত হননি। অষ্টাদশ শতাব্দের শেষ কয়েক দশকে তিনি ইয়োরোপীয়দের উপনিষদ অধ্যয়নের প্রথম পথিকৃৎ হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৭৩১-এ অঁক্‌তিল দুপেরোঁ-র জন্ম। চব্বিশ বছর বয়সে ফ্রেঞ্চ রয়্যাল লাইব্রেরির এজেন্ট হিসেবে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ এবং সেই সব পাণ্ডুলিপি পাঠের লক্ষ্য নিয়ে তিনি ভারতে আসেন। স্বপ্ন ছিল বারাণসীতে গিয়ে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের কাছে সংস্কৃত শেখা। তখন পর্যন্ত এ কাজ কোনও ইয়োরোপীয় সমাধা করতে পারেনি।

    দুর্ভাগ্যবশত ইংরেজ আর ফরাসিদের মধ্যে সংঘটিত ‘সাত বছরের যুদ্ধে’র প্রাক্কালে অঁক্‌তিল ভারতে পৌঁছেছিলেন। পণ্ডিচেরিতে কিছুদিন অতিবাহিত করার পরে বাংলার চন্দননগরের ফরাসি বাণিজ্যকেন্দ্রে আসেন। উদ্দেশ্য গঙ্গার উজান বেয়ে শেষমেশ বারাণসীতে পৌঁছোবেন। কিন্তু বিধি বাম। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা আর তার ফরাসি মিত্রপক্ষের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত লর্ড ক্লাইভের ব্রিটিশ সৈন্যদের খপ্পরে যাতে না পড়েন তার জন্য তাঁকে পালাতে হল। অনেক ঘুরপথে আবার পণ্ডিচেরি ফিরে গিয়ে এবারে অঁক্‌তিল দুপেরোঁ ভিন্ন পথ ধরলেন। গুজরাতের সুরাতের পারশি সম্প্রদায়ের সাহায্য নিয়ে প্রাচীন ইরানের ভাষাসমূহ শেখার উদ্দেশ্যে সুরাতের পথে পা বাড়ালেন। কিন্তু যুদ্ধ আর তাঁর পিছু ছাড়ে না। ১৭৬১-তে ইংরেজ নৌবাহিনী সুরাত দখল করে নিল।

    পরের বছর শেষমেশ হতোদ্যম হয়ে এই ফরাসি পণ্ডিত ব্রিটিশদের একটি জাহাজে উঠে ভারত ত্যাগ করলেন। কিন্তু তাঁর দুর্গতির সেখানেই শেষ নয়। ইংল্যান্ডে জাহাজ নোঙর করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যে কোনও ব্যক্তি এমন কষ্ট ভোগ করলে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কঠোর সমালোচক হয়ে উঠবেন তাতে আর আশ্চর্য কী! পেশাগত জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অঁক্‌তিল দুপেরোঁ ব্রিটিশদের প্রতি বিদ্বেষ মনে পুষে রেখেছিলেন।

    তাঁর ‘ওরিয়েন্টাল লেজিসলেশন’ (১৭৭৮) কেতাবে অঁক্‌তিল প্রাচ্যের স্বৈরাচারী শাসকদের নিয়ে ব্রিটিশরা যে তত্ত্ব খাড়া করেছিল তাকে আক্রমণ করেন। ব্রিটিশদের মত ছিল মুঘল শাসিত উপমহাদেশের মত এশিয় রাষ্ট্রগুলিতে আইনের শাসন নেই। ১৭৭২ থেকে ১৭৮৫ পর্যন্ত সুবা বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস এর মত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক পদাধিকারী নিজেদের স্বৈরাচারী শাসন আর অর্থলিপ্সাকে ন্যায্য প্রতিপন্ন করতে ওই তত্ত্বটি খাড়া করেছিল। তাদের প্রচার ছিল ভারতীয়রা স্বৈরাচারী শাসন ব্যতীত অন্য কোনও ধরনের প্রশাসন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত নয়।

    এই তত্ত্বের বিপক্ষে কলম ধরে এবং মুঘল সম্রাট আকবরের প্রধান সভাসদ আবুল ফজ়ল রচিত ‘আকবরনামা’র মত সূত্রের উল্লেখ করে অঁক্‌তিল প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন যে মুঘল সাম্রাজ্যে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার ছিল। বরং ব্রিটিশরাই ভারতবর্ষে স্বৈরাচারী প্রশাসন আমদানী করেছে। এমনকী অঁক্‌তিল রচিত উপরোক্ত গ্রন্থের বর্ণানুক্রমিক বিষয়সূচি দেখলেও ফরাসি পণ্ডিতের ব্রিটিশ-বিদ্বেষ সম্পর্কে সন্দেহ থাকে না। সেখানে ‘ইংরেজ’ শব্দের ব্যাখ্যায় ‘মারাঠাদের প্রতি বর্বরোচিত আচরণ’, ‘ফরাসিদের প্রতি অন্যায়’ অথবা’ জাতীয় ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে হিন্দুস্থান জয়’ ইত্যাদি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

    তবে ব্রিটিশদের প্রতি অঁক্‌তিল-এর প্রতিশোধের কাহিনীর ওস্তাদের মারটি ছিল উপনিষদের ফরাসি অনুবাদ। ইয়োরোপ মহাদেশ তখন পর্যন্ত ‘উপনিষদ্‌’ নামক গ্রন্থসমষ্টি সম্পর্কে অবহিত ছিল না। বাংলায় ব্রিটিশ আক্রমণের কারণে বারাণসী পৌঁছোতে না পারলেও শত্রুপক্ষকে এড়িয়ে অঁক্‌তিল এক ফরাসি এজেন্টের সঙ্গে চিঠিপত্রের আদান-প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। জ়ঁ বাপ্তিস্ত জ়ঁতি (Jean-Baptiste Gentil) নামের এই ফরাসি সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীর পক্ষ নিয়ে বাংলায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরে ১৭৬৩-তে অবধে পালিয়ে যান। সেখানে নবাব শুজাউদ্দৌলার সঙ্গে জোট বেঁধে ফরাসি ভাড়াটে সৈনিকদের নিয়ে তিনি বাহিনী তৈরি করেন। অবধ থেকে অঁক্‌তিলকে যে সব পাণ্ডুলিপি তিনি পাঠিয়েছিলেন তার একটি ছিল শাহজ়়াদা দারা শুকোর উদ্যোগে প্রকাশিত ‘সির-এ-আকবর’ (سرّ اکبر), অর্থাৎ ‘নিগূঢ় বা মহান রহস্য’ -- পঞ্চাশটি উপনিষদের ফারসি অনুবাদ। ১৭৭৫ থেকে ১৮০২ প্যারিসে কঠোর অধ্যবসায়ে নিয়োজিত থেকে অঁক্‌তিল লাতিন ভাষায় গ্রন্থটির অনুবাদ করেন।

    ১৮০১-০২ ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর্গ থেকে দুই খণ্ডে বেরোল ‘উপনেখত’, লাতিন নাম Oupnek'hat, id est, Secretum tegendum -- যে গ্রন্থটিকে অঁক্‌তিলের জীবনের অন্তিম অবদান হিসেবে গণ্য করা যায়। অঁক্‌তিল এই ধারণার উপর জোর দিয়েছিলেন যে উপনিষদ শুধু যে প্লেটো এবং ইমানুয়েল কান্টের দর্শনের সমমানের তাই নয়, ওই ইয়োরোপীয় দার্শনিকরা উপনিষদকেই মূলসূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না যে ইয়োরোপীয় সংস্কৃতির চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রে। প্রাচীন গ্রিক ও আধুনিক ইয়োরোপীয় চিন্তার সঙ্গে উপনিষদের অনেক সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। নিজ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে এই যুক্তি খাড়া করেছিলেন যে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম দশকে ভারতীয় ব্রাহ্মণেরা নাকি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ভ্রমণ করে গিয়েছিলেন এবং গ্রিকদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁর আরও বক্তব্য খ্রিস্টের জন্মের পরের শতকগুলিতে পশ্চিমে ব্রাহ্মণ্য দর্শনের প্রভাব অন্তর্হিত হলেও কান্টের মত চিন্তাবিদরা ইয়োরোপীয় ঐতিহ্যের মধ্যে নিজেদের অজ্ঞাতসারেই ভারতীয় প্রজ্ঞার পুনরাবিষ্কার করেন।

    অঁক্‌তিলের ধ্যানধারণাগুলো যে সব সময় মৌলিক অথবা ত্রুটিমুক্ত ছিল তা নয়। যেমন গ্রিক দর্শনের উপর উপনিষদের প্রভাবের বিষয়টি সঠিক নয়, যদিও গ্রিক দর্শনকে ভারত কিছু মাত্রায় প্রভাবিত করেছিল। উপনিষদের অনুবাদের ক্ষেত্রে কিন্তু এই ফরাসি পণ্ডিত শাহজ়াদা দারা শুকোর উদ্যোগে মুঘল যুগের আলিম-ফাজিলরা উপনিষদের যে ফারসি অনুবাদ করেছিলেন, মূলত তারই সাহায্য নিয়ে কাজ করেছিলেন। সংস্কৃতে তাঁর বুৎপত্তি সামান্যই ছিল। দারা শুকোর অনুগামী পণ্ডিতরা উপনিষদের সঙ্গে ইসলামি ধর্মগ্রন্থের যে তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন অঁক্‌তিল সম্ভবত তারই প্রভাবে উপনিষদের দর্শনের সঙ্গে পশ্চিমের দার্শনিক ঐতিহ্যের তুলনামূলক আলোচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ইয়োরোপীয়দের প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার ক্ষেত্রে অঁক্‌তিলের উদ্যোগ দিকদর্শী ভূমিকা পালন করেছিল ।

    পাশ্চাত্যের ধর্মতত্ত্ব ও বৌদ্ধিক ইতিহাসে উপনিষদের এই অনুবাদ এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এই প্রথম ইয়োরোপীয় পণ্ডিতেরা ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হলেন। নিজেকে ব্রাহ্মণ্য প্রজ্ঞায় পূর্ণ এক বিনয়ী ঋষি হিসেবে দেখতে শুরু করা এই ফরাসি পণ্ডিত অবশ্য বড়াই করার লোভ সামলাতে পারেননি। ভারতে থাকাকালীন প্রতি পদে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে যিনি হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন, ব্রিটিশ পণ্ডিতদের তিনি হারিয়ে দিলেন। অঁক্‌তিল লিখেছিলেন যে ব্রিটিশরা ‘গঙ্গা থেকে সিন্ধু পর্যন্ত সমগ্র ভারতে প্রভুত্ব করলেও -- ব্রাহ্মণ, পণ্ডিত, প্রশাসক, ধনসম্পদ সবই তাদের দখলে রইলেও -- সংস্কৃত ভাষার একটিও ব্যাকরণ অথবা অভিধান তারা প্রণয়ন করতে পারেনি’। উইলিয়াম জোনস অথবা ১৭৮৭-তে নাথানিয়েল হ্যালহেডের অসম্পূর্ণ এবং অপ্রকাশিত উপনিষদের অনুবাদের কথা স্মরণ করলে অঁক্‌তিলের এই বক্তব্যকে অন্যায্য মনে হতেই পারে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনও না কোনও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা এই বিদ্বানরা প্রশাসকের দায়িত্ব সামলানোর পরে উদ্বৃত্ত সময়ে প্রাচীন পুঁথির অনুবাদ, অভিধান ও ব্যাকরণ প্রণয়ন করে গেছেন। তবে ব্রিটিশদের প্রতি অঁক্‌তিলের অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্যের কারণ সহজেই অনুমেয়।

    উপনিষদের সেই অনুবাদ সম্পর্কে ইয়োরোপের মোটামুটি সমসাময়িক দার্শনিক বা প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতদের অভিমত কী ছিল? ধর্মতত্ত্ব বা ধর্মীয় ইতিহাসের বাইরেও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে যে অঁক্‌তিলের তর্জমাটি প্রভাবিত করেছিল তা বোঝা যায় যখন আর্থার শোপেনহাওয়ারের মত দার্শনিক ওই গ্রন্থকে ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ এবং সেই দর্শনের ব্যাখ্যায় কাজে লাগান। তবে ভাষাতাত্ত্বিকদের বিচারে অঁক্‌তিলের ‘উপনেখত’ উচ্চমানের অনুবাদ নয়, বরং সে গ্রন্থের লাতিন টেক্সট অনেকাংশে দুর্বোধ্য বলে সমালোচিত হয়েছে। এর কারণ হয়ত এই যে অঁক্‌তিল ফারসি থেকে শব্দ ধরে ধরে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন। বই বেরোনোর পরে যে সব সমালোচনা বেরিয়েছিল তার একটিতে রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবেত্তা জঁ দনি লঁজুইনে (Jean Denis Lanjuinais, 1753 – 1827) তাঁর ‘La Religion des Indoux, selon les Vedah ou Analyse de l’Oupnek’hat’, অর্থাৎ ‘বেদের নিরিখে হিন্দু ধর্ম অথবা উপনেখত এর বিশ্লেষণ’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন: তাঁর (অঁক্‌তিলের) অনুবাদকর্মটি বর্বরোচিত এবং অবোধগম্য’ (Son travail était babare et inintelligible)। ১৮৭৯-এ নিজের উপনিষদের অনুবাদের (Sacred Books of the East এর প্রথম খণ্ড) ভূমিকায় ম্যাক্সমুলার বিনয়ের সঙ্গে নিবেদন করেছিলেন যে অঁক্‌তিলের ‘গ্রন্থটির লিখনশৈলী এতই দুর্বোধ্য যে শোপেনহাওয়ারের মত কোনও নির্ভীক, বনবিড়ালের ন্যায় সূক্ষ্মদর্শী ও বিচক্ষণ দার্শনিক ব্যতীত আর কারও পক্ষে এই সর্পিল গোলকধাঁধার মধ্য থেকে পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব নয়।’

    অঁক্‌তিল আশা করেছিলেন যে প্রাচ্যবিদ্যায় তাঁর অধিকার হয়ত ভারতে ফরাসি আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে। ‘সাত বছরের যুদ্ধে’র পরে ফ্রান্স ভারতে ব্রিটিশদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মহীশূর রাজ্যের সঙ্গে মিলে মহীশূর, মারাঠা আর হায়দরাদের নিজামের বিদ্রোহী জোট তৈরির আশা করেছিল। ফরাসিরা মহীশূরের শাসক হায়দার আলি আর টিপু সুলতানকে সাহায্য করার চেষ্টা করলেও তৃতীয় ও চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে মহীশূরের পরাজয়ের পরে ব্রিটিশদের শক্তি আরও বেড়ে যায়। এই সময় অঁক্‌তিল ভারতে ফরাসি কর্মকর্তাদের অসংখ্য চিঠি লিখে এই মর্মে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন যে মহীশূরের শাসকদের অনেক ভারতীয়ই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে না, অনেকেরই ধারণা তাঁরা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন। এই কারণেই মারাঠারা বা নিজাম কখনও তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে রাজি হবে না। বলাই বাহুল্য সেই সময় ভারত সম্পর্কে অভিজ্ঞতায় আর কোনও ফরাসি এই পণ্ডিতের সমকক্ষ ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তাঁর সতর্কবার্তায় কান দেওয়া হয়নি।

    বেশ কয়েক বছর তিক্ততা আর একাকিত্বে ভুগে ১৮০৫-এ অঁক্‌তিলের মৃত্যু হয়। উপনিষদের অনুবাদ সমাপ্ত করার কাজে নিয়োজিত থাকাকালীন তিনি প্রায় নির্জনবাসী তপস্বীর জীবন যাপন করেছিলেন, তাঁর দ্বারা প্রভাবিত পরবর্তী প্রজন্মের প্রাচ্যবিদদের সঙ্গেও তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দের উষালগ্নে ইয়োরোপে সংস্কৃত অধ্যয়নের কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্যারিস যে প্রতিষ্ঠা পায়, তা অংশত তাঁরই কৃতিত্ব। অঁক্‌তিলের উত্তরসূরিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেই সব সংস্কৃত পুঁথির পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে গেছেন যা তিনি এবং অন্যান্যরা ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে জমা করেছিলেন। এঁদের মধ্যে নিজে নিজেই সংস্কৃত শিখে নেওয়া অঁতোয়ান দ্য শেজ়ি (Antoine de Chézy), যিনি পরবর্তী প্রজন্মের পণ্ডিতদের তৈরি করতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং আধুনিক প্রাচ্যবিদ্যার ভিত গড়ার কাজে নিয়োজিত ল্যুই লংলে’র (Louis Langlès) নাম উল্লেখযোগ্য।

    প্যারিসের পণ্ডিতদের ভারততত্ত্ব বিষয়ক জ্ঞান ভারতবর্ষে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ প্রসারে কোনও অবদান রাখেনি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই যে অঁক্‌তিলের অনুবাদে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন আর্থার শো্পেনহাওয়ারের মত দার্শনিক। আর প্রাচ্যবিদ ম্যাক্সমুলার-এর মত ঊনবিংশ শতাব্দের জার্মান বিদ্বানরা শতাব্দের প্রথম দশকে প্যারিসে গিয়ে সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছিলেন। অঁক্‌তিল মনে করতেন প্রাচীন পারস্য পুঁথিপত্রে ‘আরিয়া, আরিয়ান, আরিয়ানি, আরিন’ (آریا، آریان، آریانی، آرین) ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত আর্য (आर्य) শব্দের সম্পর্ক থাকতে পারে। অঁক্‌তিলের উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীনকালে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে পারস্য উপত্যকার ভাষা ও সংস্কৃতিগত যোগাযোগের দিকনির্দেশ করা। তাঁর জার্মান উত্তরসূরিদের ব্যাখ্যায় (সম্ভবত দূরভিসন্ধিমুলক) বিষয়টি দাঁড়াল এইরকম যে এই সংযোগের অর্থ একটি পৃথক এবং উন্নততর আর্য প্রজাতির অস্তিত্ব ছিল!

    ঊনবিংশ শতাব্দের মধ্যভাগে ইন্দো-ইয়োরোপীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে এই অস্পষ্ট ধারণার বশবর্তী হয়ে জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গড়ে উঠল বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যার পরিণামে প্রাচ্যবিদ্যা বিষয়ক জ্ঞানচর্চার একটি সম্মানীয় পীঠস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেল জার্মানি। ক্রমশ এই ইন্দো-ইয়োরোপীয় ঐতিহ্যের ভ্রান্ত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণায় রাজনৈতিক রং লাগার পরিণাম আমাদের সকলেরই জানা। মোদ্দা কথা এর ফলে সাম্রাজ্যবাদের মত প্রাচ্যবিদ্যার ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের প্রভাব হ্রাস পেল। ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্রিটিশ আর প্রাচ্যবিদ্যা চর্চায় জার্মানি ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে অগ্রণী ভূমিকা নিল।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments