• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share
  • উলটা বুঝিলি রাম : উদয় চট্টোপাধ্যায়

    শ্যামবাবুর বাড়িতে রামবাবু এসেছেন। কিছু কাজের কথা কিছু গল্পসল্পের পর রামবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এবার তাহলে আসি।’ শ্যামবাবু দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আসুন ।’ রামবাবু এসেছিলেন, কিন্তু যাবার সময় ‘যাই’ না-বলে বললেন ‘আসি’, আর শ্যামবাবুও ‘যান’ না-বলে বললেন ‘আসুন’। যা বলা উচিত তা না বলে ঠিক উলটো বলা হল। তাতে বোঝার কিছু গোলমাল হল না – যিনি যাচ্ছেন এবং যিনি বিদায় জানাচ্ছেন—কোন তরফেই।

    ঘরের কাজকর্ম করতে গিয়ে অনবধানতায় হাতের শাঁখার একটা ভেঙে গেল পূত্রবধূর। কাঁচুমাচু হয়ে শাশুড়িকে জানাল, ‘মা, শাঁখাটা বেড়ে গেল।’ বেড়ে গেল অবশ্যই—সেটা সংখ্যায়—একটা গোটা থেকে দু-টুকরো অথবা ততোধিক। কিন্তু পুত্রবধূর বক্তব্যের সেটা উদ্দিষ্ট ছিল না। খেলতে গিয়ে জামা ছিঁড়ে গেল তপনের। সে বন্ধুদের মশকরা করে বলল, ‘দিলি তো জামাটা নতুন করে!’

    বউ স্বামীকে বলল, ‘অফিস থেকে ফেরার পথে দু কিলো চাল নিয়ে এসো, ঘরে চাল বাড়ন্ত।’ স্বামী রসিকতা করে বলল, ‘এমন ভাঁড়ে মা ভবানী হয়ে জানালে, কালই তো বলতে পারতে।’ বাড়ন্ত মানে যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু চালের ভাণ্ডার তলানিতে ঠেকেছে সেটা জানাতে বলা হল ‘বাড়ন্ত’। ভাঁড়ে ভবানী বিরাজমানা হলে সেটা তো পূর্ণ থাকারই কথা, অথচ বাগধারাটি প্রয়োগ করা হল শূন্যতা বোঝাতে।

    ছেলের মুখেভাত। সুখেন্দু বাবু আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করতে গিয়ে বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে দুটো ডালভাত খেয়ে আসবেন।’ অভ্যাগতেরা কথাটা আক্ষরিকভাবে নেন নি, আর অনুষ্ঠানে গিয়ে ভূরিভোজেই তৃপ্ত হয়েছিলেন। ‘জলযোগে জল খাওয়া শুধু জল নয় তা’ এ কথা তো সুকুমার রায় কবেই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার স্কুলের এক সহপাঠীর মিষ্টির দোকান ছিল। গ্রামে গিয়ে তার দোকানে মিষ্টি কিনতে গেলেই সে জোর করত ‘একটু জল খেয়ে’ যেতে। বলা বাহুল্য, মিষ্টি খেয়ে যাবার কথা অনুক্ত থাকলেও সেটা বুঝতে অসুবিধা ছিল না।

    এই সব উদাহরণগুলোয় এই যে সোজাসুজি না-বলে ঘুরিয়ে বা উলটো করে বলা হল তার পিছনে রয়েছে কিছু মনস্তাত্বিক আর সামাজিক কারণ। কিছুটা সংস্কার বা কুসংস্কারও। অগস্ত্য মুনি নাকি বিন্ধ্য পর্বতকে সংযত করতে যাবার সময় ‘যাই’ বলে বেরিয়েছিলেন, আর ফেরেন নি। তাই ‘যাই’ বলে বিদায় নেওয়াতে নিষেধ আরোপ। আবার, ‘যান’ বলে বিদায় জানালে সেটা রূঢ় বা অসৌজন্যপূর্ণ শোনায়। এই সৌজন্যের খাতিরেই পোলাও কালিয়া না বলে ডালভাত খাবার নিমন্ত্রণ জানানো হয়। একটু জল খেয়ে যাবার প্রস্তাবও সেই সৌজন্যমূলক। শাঁখা ভেঙে যাওয়া বা ঘরে চাল না থাকা বা জামা ছিঁড়ে যাওয়া অমঙ্গলের প্রতীক, তাই সেগুলো সরাসরি না-বলে ঘুরিয়ে বলা। আমরা এই ধরণের ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তাই কোনটাই বিসদৃশ শোনায় না।

    আমাদের নিত্য ব্যবহারের আরও বেশ কিছু শব্দ এই উলটো হাওয়ার পন্থী। যখন বলা হয় ‘অপরের কথায় কান দিয়ো না’, তখন অবশ্যই বলতে চাওয়া হয় ‘পরের কথায় কান দিয়ো না’। কেন না, অপর মানে যে পর বা ভিন্ন নয়, একান্তই নিজের কেউ। ঠিক উলটোটাই বলা হয়েছে। সেই রকম, যখন বলা হয় ‘খাওয়াদাওয়ার অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল’ কিংবা ‘লোকটা অপর্যাপ্ত ধনসম্পত্তির মালিক’, তখন অপর্যাপ্তের আসল অর্থটাই উলটে যায়। কেন না, অপর্যাপ্তের অর্থ হল ‘যা পর্যাপ্ত নয়’।তেমনই আর একটি শব্দ ‘অনুত্তম’, যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যে উত্তম নয়, অর্থাৎ অধম। অনুত্তম বলতে আমরা কিন্তু বোঝাতে চাই ‘যার থেকে শ্রেয়তর আর কেউ নেই’।

    সুর-অসুরের দ্বন্দ্বের কথা সর্বজনবিদিত। অসুর বলতে বোঝায় যে সুর বা দেবতা নয়। ঋকবেদের প্রথম মণ্ডলে কিন্তু প্রাণপ্রদ শ্রেষ্ঠ দেবতা সূর্যকে অসুর নামে অভিহিত করা হয়েছে। পারস্যীয় জেন্দ অবেস্তায় অসুরকে (<অহুর) বলা হয়েছে ‘জীবনের অধিষ্ঠাতা দেবতা’। ঋকবেদের দশম মণ্ডলেই আবার অসুর ‘দেবদ্বেষী’ বলে আখ্যাত হয়েছে, এবং অ-কারের নঞর্থ ধরে অসুর হয়ে দাঁড়িয়েছে দেবশত্রু। ্বাংলায় এই অর্থই চলে।

    গণ্ডগ্রাম বলতে আমরা কী বুঝি? শহরাঞ্চল থেকে দূরবর্তী কোন অকিঞ্চিৎকর জনপদ। কিন্তু ‘গণ্ড’ শব্দের এক অর্থ হল বৃহৎ বা প্রধান, তাই নিরেট মূর্খকে বলা হয় গণ্ডমূর্খ। সেই হিসাবে গণ্ডগ্রাম শব্দের মূল অর্থ বৃহৎ বা সমৃদ্ধ গ্রাম। উলটো অর্থটাই এখন সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    ভীষণ ভালো, ভীষণ সুন্দর, ভীষণ আনন্দ আমরা অহরহই ব্যবহার করে থাকি দারুণ কিংবা খুব এই অর্থ বোঝাতে। কিন্তু ভীষণ শব্দের মূল অর্থ হল ভয়ংকর বা ভীতিজনক। রামায়ণের বিভীষণ এই অর্থই বহন করছে। রবীন্দ্রনাথের গানে পাচ্ছি ‘ভীষণ আমার, রুদ্র আমার’। তাঁর ‘বর্ষশেষ’ কবিতায় ‘যে পথে অনন্ত লোকে চলিয়াছে ভীষণ নীরবে’ও এই ভয়ংকর ভাবের দ্যোতনা আছে। নতুন প্রজন্মের মুখে শোনা যাচ্ছে ‘বীভৎস সুন্দর’। সেখানেও বীভৎস তার নিজস্ব অর্থ হারিয়েছে। তেমনই, অপরূপ শব্দটি ব্যবহার করা হয় সুন্দর বোঝাতে। কিন্তু এর মূল অর্থ হল অপকৃষ্ট রূপ, অর্থাৎ কুরূপ বা কুৎসিত চেহারা। এই সব ক্ষেত্রে অর্থের উন্নতি হয়েছে। আবার, অর্থের অবনতিও ঘটেছে বহুক্ষেত্রে, যার এক উজ্জ্বল উদাহরণ ‘মহাজন’। মহাজন শব্দের বাচ্যার্থ মহৎ ব্যক্তি, কিন্তু যখন নজ্রুল লেখেন ‘জনগণে যারা জোঁকসম শোষে তারে মহাজন কয়’ তখন মহাজনের অর্থ দাঁড়ায় সুদখোর ব্যাপারী।

    কিছু অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করে গোপাল ভাঁড় তাঁর ছেলেকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে গিয়ে বলতে বলেছিলেন যে তার বাবার কৃষ্ণপ্রাপ্তি হয়েছে। তাতে ফল হয়েছিল। কৃষ্ণপ্রাপ্তি বলতে বোঝায় কৃষ্ণে বিলীন হওয়া অর্থাৎ মারা যাওয়া, যদিও আপাত অর্থ কৃষ্ণ হস্তগত হওয়া। সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে তাঁর উক্তির যাথার্থ্য সপ্রমাণ করতে রাজসভায় গিয়ে গোপাল চাদরের ভিতর থেকে কৃষ্ণের একটি মূর্তি বার করে রাজসমক্ষে প্রদর্শন করেছিলেন। এখানে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণচন্দ্র সোজাসুজিই বুঝেছিলেন, গোপালের প্রচেষ্টা ছিল উলটো বোঝাতে।

    এরকম উলটো বোঝা বা বোঝানোর নিদর্শন রয়েছে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে। দেবী অন্নদা ঈশ্বর পাটনিকে আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে নিজের স্বামী সম্বন্ধে বলছেনঃ

      কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ
      কেবল আমার সাথে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।
      ভূত নাচাইয়া পতি ফেরে ঘরে ঘরে
      না মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন বরে।

    ‘কু’-য়ের এক অর্থ পৃথিবী। অন্নদা বলতে চেয়েছিলেন তাঁর স্বামী মহাদেব পঞ্চমুখে কুকথা অর্থাৎপৃথিবী বিষয়ে অথবা তত্ত্বকথা বলেন। তিনি বিষবচন বর্ষণকারী নন, স্বয়ং বিষপানে নীলকণ্ঠ। ভূতপ্রেত তাঁর সহচর। এ হেন বরের হাতে যে পিতা তাঁকে সমর্পণ করেছেন তিনি পাষাণ হিমালয়, এবং তিনি অমর। সহজসরল ঈশ্বর পাটনি সোজা অর্থটাই ধরেছিলেন।

    বাংলায় বহুল প্রচলিত বহু বহিরাগত শব্দের ক্ষেত্রে – বিশেষত আরবি ফারসি শব্দে – এই উলটো বোঝানোর উদাহরণ রয়েছে। যখন বলা হয় ‘লোকটা খুব জাঁহাবাজ’, তখন বোঝানো হয় লোকটি ধড়িবাজ বা ফন্দিবাজ। এই ফারসি শব্দের মূল অর্থ হল জহান (বিশ্ব)+বাজ (জ্ঞানী), অর্থাৎ বিশ্বজ্ঞানী বা মহাপণ্ডিত। তেমনই, বুজরুক শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ ‘বুজুর্গ’ থেকে, যার অর্থ সম্মানীয় ব্যক্তি। বাংলায় অর্থ উলটে হয়েছে ধূর্ত, ফন্দিবাজ বা প্রতারক। আরবি ‘ফাজ্বিল’ শব্দে্র অর্থ বিদ্বান বা পণ্ডিত।মাদ্রাসা পাঠক্রমে এই নামে একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। বাংলায় ফাজিল বলতে বঝায় বাচাল বা বখাটে। ফারসি গুলজার শব্দের অর্থ হল ফুলের বাগান, কিন্তু ‘নরক গুলজার’ বলতে বোঝায় একদল অভব্য লোকের কোলাহলপূর্ণ আচরণ। মূল আরবি শব্দ ‘বাদিয়াহ’, যার অর্থ মরুভূমি –তার থেকে বাংলায় এসেছে ‘বাদা’, যার অর্থ জলাভূমি—ঠিক উলটো।

    এরকম উলটো বোঝা বা উলটো বোঝানোর আরও অনেক শব্দ বা শব্দবন্ধ তুলে আনা যায় বাংলা শব্দভাণ্ডার থেকে। এরা বাংলা ভাষাকে নিজস্ব রূপ দিয়েছে, সমৃদ্ধ করেছে। এই স্বল্পপরিসর তাদের সকলের উপস্থাপনা সম্ভবপর নয়। তাই উপসংহার টানতে হচ্ছে পরশুরামের শরণ নিয়ে। ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পে প্রেমে-পড়া সত্য তার বন্ধু নিবারণকে জানায় বিয়ের প্রস্তাব দিলেই বুঁচকী উত্তর দেয় ‘যাঃ’। নিবারণ বলে, ‘দূর গাধা, যাঃ মানেই হ্যাঁ’।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments