



মূলত আটের দশক থেকে লেখালিখি শুরু করলেও নব্বইয়ের দশকে এসে জনপ্রিয়তা লাভ করেন পিনাকী ঠাকুর। ‘অঙ্কে যত শূন্য পেলে’, ‘হ্যাঁ রে শাশ্বত’, ‘সাত মিনিট ঝড়’, ‘বিপজ্জনক’, ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে’, ‘চুম্বনের ক্ষত’, ‘আমরা রইলাম’, ‘শরীরে কাচের টুকরো’-র মতো কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ লিখে ভূয়সী প্রশংসা কুড়োলেও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একদিন অশরীরী’ প্রকাশের পর থেকেই পাঠকের নজরে চলে আসেন পিনাকী। এই কাব্যগ্রন্থের কারণে প্রশংসা আদায় করে নিয়েছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মণীন্দ্র গুপ্ত, শঙ্খ ঘোষের মতো কবির কাছ থেকেও।
২০১২ সালে ‘চুম্বনের ক্ষত’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি পেয়েছিলেন আনন্দ পুরস্কার। এ ছাড়াও কৃত্তিবাস পুরস্কার ও বাংলা আকাদেমি পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছিলেন। প্রায় চল্লিশ বছরের কবিতাচর্চায় পেয়েছেন আরও অজস্র স্বীকৃতি। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের উপদেষ্টা কমিটিতেও নিজের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। অকৃতদার পিনাকী ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখে বরাবর পাশে পেয়েছিলেন কবিতাজগতের নানা সুহৃদকে। ১৯৫৯-এর ২১ এপ্রিল জন্ম হয় কবি পিনাকীর। ২০১৮-র ২১ ডিসেম্বর থেকেই সেলিব্রাল ম্যালেরিয়ার মতো বিরল অসুখে ভুগছিলেন তিনি; মারা যান ৩রা জানুয়ারি ২০১৯। জন্মভিটে বাঁশবেড়িয়ার কাছে ত্রিবেণী শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সমাপন হয়।
তাঁর কবিতায় প্রত্যক্ষত যে খুব তীব্র প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে এমন নয়। কিন্তু সমাজের, রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অসংগতি, অন্যায়, ব্যাভিচার তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। তাই কখনও সমালোচনার ভঙ্গিতে, কখনও বাচ্যের তির্যকতায়, কখনও আত্মসমীক্ষণে তা বিধৃত হয়েছে। যেমন, ‘আগামীকাল’ কবিতায় নিম্নবিত্ত সমাজব্যবস্থার করুণ চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি পঙক্তি গ্রাম্যজীবনের রুক্ষ বাস্তবতাকে উপস্থাপন করে, সরকার বাহাদুর যা-ই বলুক না কেন।
“পড়শির খেত থেকে আজ আমাদের ছেলেদুটো
আখ চুরি করে খায় শীতের দুপুরে ন্যাংটাপুটো!” (কবিতা সমগ্র, পৃ.১১)
তবে নিম্নবিত্ত জীবনে দুঃখযন্ত্রণার আড়ালেও যে অফুরন্ত জীবনের স্বাদ রয়েছে, রয়েছে বাঁচার অগণ্য নিশানা তার উল্লেখ করতেও ভোলেন নি কবি। যেমন, ‘বসন্তের দু-টুকরো’ কবিতায় এক চমকপ্রদ উচ্চারণ –
“হেমন্ত মণ্ডল যত খিস্তি দিক, মাইনে কেটে দিক
পুকুরে চাঁদের থালা ভেঙে তোকে আবার হাসাব” (ঐ, পৃ.১৮)
আধুনিক কবিতার অন্যতম সুর রবীন্দ্র-বিরোধিতা। কিন্তু একজন কবি খুব সহজেই কি পারেন রবীন্দ্রকাব্যধারার বাইরে গিয়ে অন্যতর পরিসরে প্রবেশ করতে? সে এক জটিল দুরূহ যাত্রা। সেই দ্বন্দ্বমথিত মানসিক অবস্থার বর্ণনা দেন কবি খুবই সাবলীল ভঙ্গিতে।
“কাব্য না হোক লেখা ছেঁড়া লেখা খেলা
দুপুর গড়ায় রবীন্দ্র বিদ্রোহে!” (ঐ, পৃ.২০)
তবু তো নতুন পথের সন্ধান করতেই হয়। সমাজ, জীবন এবং তার যাপন পরিবর্তিত সময়ে কবির মননে জারিত হয়ে আলাদা এক আত্মপ্রত্যয়ী সুর সৃজন করে।
“সুরের জোচ্চোর এসে
প্রতীকের ঠগ এসে
হেমন্তের বনে বনে তোমারই দিন-যায় বালিকাবয়স
সময়ের বক্রতল একবার, একবারই ভেদ করেছিল –
প্রতীক বাতিল করে আমি আজ আস্ত কাঁটাগাছ
দেখি তো না-কাঁদলেও তুমি
প্রান্তরের তৃষ্ণা বোঝো কি না!” (ঐ, পৃ.৩১)
জনসেবার মহান দায়িত্ব প্রশাসনের। কিন্তু কার্যত আমরা দেখি অপদার্থ সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতাদের অঙ্গুলিহেলনে প্রশাসনের কাজ হয়ে পড়ে কালিমালিপ্ত। পদে পদে ঘুষ, উপঢৌকনের চাপে কাজের চেয়ে অকাজ বাড়ে, পরিষেবা হয় ক্ষতিগ্রস্ত। ধ্বস্ত এই ব্যবস্থার চিত্র বাধ্যত উঠে এসেছে তাঁর কবিতায় -
“জেলাশাসকের সায়া থেকে
সবটুকু কালো যেন ছাপার কালির হ্রদ ফুসলে নিয়ে যায়।” (ঐ, পৃ.২৪)
সাধারণ মানুষ বুঝে পায়না গণতন্ত্রের কী সুফল। তারা কেন যে ভোট দেয়, কেন যে বছর বছর উত্তেজনায় মাতে কী এক নেশার ঘোরে যেন বুঝতে পারে না। রাজা আসে, রাজা যায় – তবু তাদের দিনযাপনের তেমন কোনও পরিবর্তন হয় না।
“শেষ পর্যন্ত মাছ-বিক্রির কড়ি দিয়ে কী কিনলাম?
কার গান মাঝপথে থামিয়ে
তার মেহেদি-রাঙানো হাতে তুলে দিলাম
বাদশাহের দস্তখত করা দলিল?” (ঐ, পৃ.২৬)
আমরা আদিমতার বহু স্তর পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর বিকশিত সভ্যতার মানুষ। কিন্তু তবুও কোথাও কোথাও থেকে যাচ্ছে পশুত্বের চোরাস্রোত। পুরুষতন্ত্রের নির্লজ্জ দাপটে নারীদের আমরা স্তম্ভিত করে রাখছি ক্ষেত্রবিশেষে। সেই জায়গাতে দাঁড়িয়ে পুরুষের জবানিতে যেন আত্মবিশ্লেষণ এবং আত্মধিক্কার অভিব্যক্ত হয় –
“ভাগ্যিস জন্ম চেয়েছিলাম ভাগ্যিস যন্ত্রের সামনে প্রথমবার
ভ্রূণ-পরীক্ষায় আমার নাম ঠিক হয়েছিল পুরুষ” (ঐ, পৃ.৩৭)
কিন্তু এই আত্মবিশ্লেষণ যাদের নেই, যারা নারীকে শুধু ভোগের সামগ্রী বলেই মনে করে – সেইসব ধর্ষক পুরুষের পাপচক্রে পড়ে শেষ হয়ে যায় ফুলের মতো নিষ্পাপ বালিকা বা নারী। সেই জ্বলন্ত বাস্তবতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে ‘একদিন, অশরীরী’ কাব্যের নাম-কবিতায়। যাদেরকে নারী ‘জীবনদেবতা’ ভেবে জীবনের সবকিছুই সমর্পণ করে দিতে প্রস্তুত থাকে সেই হয়তো নারীর জীবন বাঁচাকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
“আধবুড়ো জোচ্চরকে জীবনদেবতা ভেবে কত প্রেমে কত কৌতূহলে
আলুর চপের ঝাল চোখে হাসি আমি কী মিষ্টি লাল শরবত –
ট্রামগাড়ি হাওয়াগাড়ি গড়ের অফলা মাঠে পিরেতের রাত্রি প্রদক্ষিণ
ভেবেছি বাঁচার গল্প তোমাদের দেশ-কালে, আমারও শরীর ছিল যেন...”
(ঐ, পৃ.৩৯)
সামগ্রিকভাবে আমরা দেখি, তাঁর কবিতায় এক বিষাদময় অথচ রোম্যান্টিক মফঃস্বলের জীবন বারে বারে উঠে এসেছে। আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার করালগ্রাসে বিপর্যস্ত সমাজব্যবস্থার খুঁটিনাটি দিকও উপস্থাপিত হয়েছে কাব্যকথায়। স্পষ্ট ধরা পড়েছে মিলেনিয়াল প্রজন্মের বাঙালির দোলাচল। বাংলার আবহমানকে সাম্প্রতিকের সঙ্গে পরিবেশনে তিনি যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।