



বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে শমীক একটু ঘাড় চুলকে নিল। তারপর শার্টের পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করল। নাঃ, এটাই ঠিকানা। ওই তো, শেওলা ধরা দেওয়ালের গায়ে পরিষ্কার লেখা আছে। কি জঘন্য একটা বাড়ি! গেটের সামনে থেকেই ধুলো পড়া নোংরা মেঝে দেখা যাচ্ছে। এক পাশে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার, আর তিন সারি লেটার বক্স। ডিপ্রেসিং! এরকম একটা বাড়িতে কেন কেউ অফিস বানাবে?
যাক গে! করেছে তো করেছে। শমীকের কি? লোকটা যেন কি বলেছিল? গেট দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে লিফট। পাঁচ তলায় পৌঁছে ডান দিকের করিডোর ধরে শেষের দরজা। ওটাই পাসওয়ার্ড অফিস। সকাল দশটায় চলে আসবেন। এখন দশটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। শমীক 'জয় মা' বলে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল।
যত্ত হ্যাপা!
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাইশ বছর বয়স হলে সকলের বাড়িতে পাসওয়ার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়। শমীকের বন্ধুদের বাড়িতে কবে চিঠি এসে গেছে। কিন্তু শমীকের বাড়িতে আজ অবধি পাসওয়ার্ড এল না। এদিকে বাবা উসখুস করতে শুরু করেছে।
পাসওয়ার্ড ছাড়া তুই জীবনে এগোবি কি করে? জানিস, তোর সেজদাদুর কি হয়েছিল?
শমীক জানে, ওর সেজদাদুর কি হয়েছিল। সেজদাদু ইচ্ছে করে পাসওয়ার্ড নেয়নি। সেই জন্য সেজদাদুর চাকরি-বাকরি, বিয়ে, বন্ধুবান্ধব কিচ্ছু হয়নি। একা একা পাহাড়ে ঘুরে বেড়াত বেচারা। শমীক সেরকম জীবন চায় না। এর মধ্যেই ও ওর বন্ধুবান্ধবদের কথার মানে বুঝতে পারছে না, অধিকাংশ গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পাসওয়ার্ড না পেলে ও পুরোই ব্রাত্য হয়ে যাবে।
তাই যখন আগের রবিবার কাগজে বিজ্ঞাপনটা দেখল – আপনি কি জীবনে পিছিয়ে পড়ছেন? অর্শ বা নিরাশায় ভুগছেন? সমাজের লাথি খেয়ে ক্রমশঃ বেরিয়ে যাচ্ছেন? তাহলে অবিলম্বে পাসওয়ার্ড নেওয়ার জন্য এই নম্বরে যোগাযোগ করুন – ও আর অপেক্ষা করেনি। পাসওয়ার্ড অফিস অবশ্য ওকে অপেক্ষা করিয়েছে। একটা যান্ত্রিক আওয়াজ টোকেন নম্বর দিয়ে (৬৯৪৫৩) বলেছিল ওদের কর্মচারী ওর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। চার দিন বাদে ফোন এল। আজ সকালে পাসওয়ার্ডের জন্য ডাক পড়েছে।
লিফট থেকে বেরিয়ে শমীক এদিক-ওদিক তাকাল। বাঁ দিকের করিডোরটা বেশ ঝাঁ চকচকে। কিন্তু লোকটা বলে দিয়েছে ডান হাতের করিডোর ধরে যেতে। দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে শমীককে ধুলো পড়া মেঝের দিকে ঘুরল। তিনটে ছোট ছোট দরজা পেরিয়ে একদম শেষের দরজাটার সামনে দাঁড়াল শমীক। সাদা রঙ করা কাঠের দরজা, তার ওপর কালো কালি দিয়ে লেখা “পাসওয়ার্ড অফিস”। শমীক দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরের মানচিত্রটা বুঝে উঠতে ওর এক মুহূর্ত সময় লাগল। একটা দেশলাই বাক্সের সাইজের ঘর, তার মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত ফাইলের গাদা। মাঝখানে একটা টেবিল, তার দু'ধারে দুটো চেয়ার। টেবিলের ওপর একটা ল্যাপটপ আর কোনায় একটা প্লাস্টিকের টুল। এ ছাড়া ঘরের মধ্যে জনমনিষ্যি নেই।
“আমি পাসওয়ার্ডের জন্য এসেছি।”
শমীক হাওয়ায় ঘোষণা করল।
“এক সেকেন্ড।”
কোথাও থেকে অশরীরী কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তারপর ভেল্কিবাজির মতো সিলিংএর একটা অংশ খুলে গিয়ে এক জোড়া পা নেমে এল। কিছুক্ষণ হাওয়ায় দুলে পা দুটো টুলটার ওপর অবতরণ করল, এবং সঙ্গে করে বাকি শরীরটাও টেনে নামাল।
“উফ…বাবারে…ওপর-নীচ করে করে প্রাণ গেল,” বলতে বলতে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক টুল থেকে নেমে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল।
“টোকেন নম্বর?”
“৬৯৪৫৩”
“নাম?”
“শমীক ঘোষ।”
“বাবার নাম?”
“পরিশ্রমী ঘোষ।”
“ঠিকানা?”
শমীক বলল। লোকটা ল্যাপটপে টাইপ করতে লাগল। লাগল তো লাগলই। প্রায় দশ মিনিট ধরে। যেন দস্তয়েভস্কি’র উপন্যাস লিখছে। শেষটায় চশমার ওপর দিয়ে শমীকের দিকে তাকাল।
“পাসওয়ার্ড মুখস্থ করে নাও -কাকের বাসা।”
কাকের বাসা? এ আবার কেমন পাসওয়ার্ড? শমীকের নাক কুঁচকে গেল।
“এ ছাড়া অন্য কোন পাসওয়ার্ড নেই?”
লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে আবার টাইপ করতে লাগল। অনেকক্ষণ বাদে চোখ তুলে বলল,
“ময়লার বালতি।”
আরে ছোঃ! এতো আরো জঘন্য হয়ে গেল! “না না, এটা না! কাকের বাসাই থাক।”
লোকটা মুখ বিকৃত করল।
“উফ, এতবার চেঞ্জ করলে হয় নাকি? ঠিক করে বল কোনটা চাই!”
“ওই তো, কাকের বাসা।”
“ফাইনাল তো?”
“হ্যাঁ, ফাইনাল।”
লোকটা গজর গজর করতে করতে টাইপ করতে লাগল। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে টাইপ করার পর সে শমীককে জানাল পাসওয়ার্ড নথিভুক্ত করা হয়েছে। সে এখন আসতে পারে।
শমীকের বাবার কথা নেহাৎ মিথ্যে নয়। পাসওয়ার্ড নিয়ে আসার এক মাসের মধ্যেই শমীক চাকরির অফার পেয়ে গেল। প্রথম মাসে দু'টাকা মাইনে। ভালো করে কাজ শিখতে পারলে পরের মাস থেকে আড়াই টাকা পাবে। শমীকের বাবা আনন্দে নাচতে লাগল। “এ তো দারুণ অফার! আমাদের সময় প্রথম মাসে টাকা পাওয়া তো দূরের কথা, বাড়ি বন্ধক রেখে কোম্পানিকে টাকা দিতে হত!”
এত বড় রেকমেন্ডেশন পাওয়ার পর বলাই বাহুল্য শমীক চাকরিতে জয়েন করে গেল।
এই অফিস পাসওয়ার্ড অফিসের মতো নোংরা নয়। সবকিছু ঝকঝক তকতক করছে। ঝকঝকে কাঁচ, ঝকঝকে টেবিল, ঝকঝকে মেঝে – চাইলে মেঝেতে নিজের মুখও দেখা যায়, যাতে নাক রগড়ানোর সময় কর্মচারীরা দেখে নিতে পারে অভিব্যক্তি ঠিকঠাক আছে কি না।
বিরস বদনে একজন সিনিয়র শমীককে তার চেয়ার আর ল্যাপটপ দেখিয়ে দিল, আর একটা কাগজ ধরিয়ে দিল।
“এই কাগজে যা লেখা আছে সেটা সারাদিন ধরে টাইপ করতে থাক।”
শমীকের ভুরু কুঁচকে গেল।
“এসব কি লেখা আছে? এর মানে কি?”
সিনিয়র চোখ পাকিয়ে বলল, “মানে বুঝে তুমি কি করবে? মানে বোঝা রাজা মশাইয়ের কাজ। তুমি তোমার নিজের কাজ করো!”
“মানে চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, আমি শুধু যন্ত্রের মতো ছাতামাথা টাইপ করে যাব?”
সিনিয়র চেয়ারের তলা দিয়ে ক্যাঁৎ করে শমীকের পায়ে একটা লাথি কষাল।
“এতো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে এসব কথা বলবে না, বুঝেছ?” সে শমীকের কানে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “ওপরে তাকিয়ে দ্যাখ, রাজামশাইয়ের পায়রা বসে আছে। এক্ষুনি সব কথা রাজামশাইকে বলে দেবে। ব্যাস, তখনই তোমাকে জ্যান্ত পুঁতে দেবে!”
শমীক ভয়ে ভয়ে আর কথা বাড়াল না। কাগজে যা লেখা আছে তা-ই টাইপ করতে শুরু করল। যেই না ও প্রথম অক্ষরটা লিখেছে, অমনি ওর মাথার ভেতর ঠক করে একটা আওয়াজ হল। শমীক দেখতে পেল (কেমন করে জানি না) ফাঁকা কাকের বাসার মধ্যে একটা ফাটা প্লাস্টিকের কাপ এসে পড়েছে।
দিন কাটতে লাগল। শমীক রোজ অফিসে যায়, সারাদিন হিজিবিজি টাইপ করে, আর সন্ধে হলে বাড়ি ফেরে। রাজামশাই কথার খেলাপ করেন না। ভালো করে হিজিবিজি লিখতে পারার জন্য শমীকের মাইনে বেড়ে আড়াই টাকা, তারপর দু টাকা বারো আনা হল। কাকের বাসায় একটা চামচ, একটু সুতো, আর আধ খাওয়া পাঁউরুটি জমা পড়ল। শমীক বন্ধুদের কাছে সেই নিয়ে খুব ফাটিয়েও এল। ওদের কথা এখন আর ওর দুর্বোধ্য লাগে না। সব কটা গ্রুপে ওর অবাধ গতিবিধি।
একদিন অফিসে ঢুকে শমীকের মনে হল, ওর শিরদাঁড়ার গোড়াটা কেমন সুড়সুড় করছে। যেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল ওর থেকে দুটো চেয়ার দূরে একটা মেয়ে – ওর বয়সী বা ওর থেকেও ছোট হবে – বসে আছে। দেখতে তেমন সুন্দরী নাহলেও বেশ টিপটপ চেহারা। হাতে একটা কাগজ নিয়ে ভুরু কুঁচকে বসে আছে – মনে হয় নতুন জয়েন করেছে।
হাতের টিফিন কৌটোটা নিজের টেবিলে রেখে শমীক অমায়িক হেসে এগিয়ে গেল।
“কিছু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে নাকি?”
সম্মানজনক দূরত্ব রেখে ও মেয়েটার পিঠের ওপর সামান্য ঝুঁকল।
“হ্যাঁ, দেখুন না, কি লেখা আছে কিছুই বুঝতে পারছি না।”
এক দার্শনিক বলেছেন, শব্দের কোন সহজাত অর্থ নেই। মানুষই শব্দের মধ্যে অর্থ আরোপ করে। শমীক সেদিন একথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিল। প্রথমদিন যে শব্দগুলো নিতান্ত হিজিবিজি লেগেছিল, সেদিন সে গড়গড় করে তার মানে বলে গেল।
“এই দেখ, এটা যে লেখা আছে এর মানে 'রাজামশাই'। তারপর এটার মানে 'টাকা'। এটা হল 'দিয়ে'। এইটার মানে হল 'আমার'। তারপর এটা দ্যাখ, এটাকে বলে 'মাথা'। আর এটার মানে 'কিনেছেন'। তাহলে টোটাল কি দাঁড়াল?”
মেয়েটা মন দিয়ে পড়তে থাকল।
“রাজামশাই টাকা দিয়ে আমার মাথা কিনেছেন।”
“ভেরি গুড! এবার সারাদিন এটা টাইপ করতে থাকো। হাত থামাবে না কিন্তু! নাহলে ওই যে পায়রাটা দেখছ?” শমীক দাঁড়ের ওপর বসা পায়রাটা দেখাল, “ওটা রাজামশাইকে গিয়ে লাগিয়ে দেবে। তোমাকে মাটিতে জ্যান্ত পুঁতে দেবে!”
শমীক আশ্চর্য হয়ে দেখল, মেয়েটা ওর কথা শুনে একটুও ভয় পেল না। মিষ্টি হেসে বলল, “আমি এখানে হাত থামানোর জন্য আসিনি।”
“মাই নেম ইজ শমীক,” শমীক হাত বাড়িয়ে দিল।
“রাকা,” মেয়েটা করমর্দন করে বলল।
সেদিন প্রথমবার ঝকঝকে অফিসে শমীকের কাকের বাসায় একটা ঝকঝকে সোনার মোহর পড়ল। তারপর যা হয় আর কি! দ্বিগুণ উৎসাহে হিজিবিজি লেখা চলতে লাগল, আর তার ফাঁকে ফাঁকে চোরা চাউনি। শেষে শমীক একদিন বহু সাহস জুটিয়ে রাকাকে বাইরে খেতে নিয়ে যেতে চাইল। রাকা আপত্তি করল না। শমীক অনেক গবেষণা করে একটা দামি রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করল।
এটা-ওটা গল্পের মাঝে খাওয়াদাওয়া চলতে লাগল। মা-বাবা, ছোটবেলা, স্কুল কলেজ এইসব টপিক শেষ হয়ে গিয়ে এক সময়ে অস্বস্তিকর নৈঃশব্দ্য নেমে এল। শমীক আকাশ পাতাল ভাবছে কোন দিকে কথা নিয়ে যাবে, এমন সময়ে রাকা টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল।
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব? যদি কিছু মনে না করো…”
এরকম ধরনের কথা শুনলেই মানুষের ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। শমীক প্রাণপণে ঠোঁট চাটার চেষ্টা করল।
“করো না, কি জিজ্ঞেস করবে করো।”
রাকার গলা খাদে নেমে এল।
“তোমার পাসওয়ার্ড কি গো?”
“ওঃ!”
প্রশ্নটা তেমন কঠিন নয়, কিন্তু শমীক মহা ফ্যাসাদে পড়ল। উত্তর দিতে গেলে বলতে হয় 'কাকের বাসা'। সেটা বলতে কেমন লজ্জা লজ্জা করে। আবার মিথ্যের ভিত্তিতে রাকার সঙ্গে সম্পর্ক শুরু করাটাও কেমন একটা অনৈতিক বলে মনে হচ্ছে।
“ইচ্ছে না হলে বলার দরকার নেই,” শমীককে কিন্তু কিন্তু করতে দেখে রাকা বলে উঠল। “প্রশ্নটা বেশি পার্সোনাল ছিল।”
আরে পার্সোনালই তো করতে চাইছি রে বাবা!
মনে মনে মা বিপত্তারিণীকে স্মরণ করে শমীক ওর পাসওয়ার্ডটা বলেই দিল। রাকার ভুরু হাল্কা উঠে গেল।
“কাকের বাসা? ইন্টারেসটিং…”
ইন্টারেসটিংস? কি অদ্ভুত উত্তর। এর মানেটা ইতিবাচক, না নেতিবাচক? বোঝার একটাই রাস্তা আছে। শমীকও গলা খাদে নামিয়ে আনল।
“আর তোমার?”
“সোনার পাথরবাটি,” রাকা প্রায় ফিসফিস করে উত্তর দিল।
“সেটা কেমন জিনিস?”
“এমনি পাথরের বাটি, কিন্তু হলুদ রঙের। আলো ফেললে ভেতর দিয়ে চলে যায়…আচ্ছা তোমাকে একটা সিক্রেট বলছি। চাকরি পাওয়ার পর প্রথম আমার বাটিতে কি পড়েছিল জানো?”
শমীক মাথা নেড়ে 'না' বলল। রাকার চোখ উত্তেজনায় চকচক করছে। প্রায় নিজের অজান্তেই ও শমীকের দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিল।
“ঘোড়ার ডিম!”
***
এরকম অন্তরঙ্গ স্বীকারোক্তির পর রাকার হাত না ধরে শমীক থাকে কেমন করে? রাকার তুলোর মতো আঙুলগুলো ও নিজের হাত দিয়ে ঢেকে নিল।
“আর কখনো আমার হাত ছেড়ো না, কেমন?” রাকা মিষ্টি করে হাসল।
শমীক একবার ভাবল, সারা জীবন এভাবে ওর বাঁ-হাতটা রাকার হাতে সেঁটে বেঁচে থাকাটা একটু অসুবিধাজনক হতে পারে। বিশেষ করে, বাঁ-হাতের যখন কিছু গুহ্য ব্যবহারও আছে। কিন্তু রাকার উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে সেইসব চিন্তা ওর মাথা থেকে বেরিয়ে গেল।
তারপর আর কি? শমীকের মা রাকাকে হাতের বালা দিয়ে আশীর্বাদ করল। রাকার বাবা শমীককে হুইস্কির বোতল খুলে আপন করে নিল। শুভ দিন দেখে চার (বা ওই ধরনের কিছু সংখ্যক) হাত এক হয়ে গেল। তারপর বিদেশে হানিমুন, যথাকালে পুত্রকন্যা (আরো দুটো সোনার মোহর), প্রমোশন, বাড়ি, গাড়ি – একদম পাঁচালির স্টাইলে শমীকের জীবন এগোতে থাকল। কাকের বাসাও রাংতা, কাগজের ঠোঙা, কাঁচের টুকরো, ওষুধের ফাঁকা বোতল, ইত্যাদি অমূল্য জিনিস দিয়ে ভরে উঠতে লাগল। এক এক সময় কৃতিত্বের বোঝা এত ভারী হয় যে বয়ে নিয়ে যাওয়াই দায় হয়ে যায়। একটু আইসিংএর সমস্যাও যে নেই তা নয়। শমীক কদিন খেয়াল না করলেই বাসাটায় বরফ জমতে চায়। সারাক্ষণ এই নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়।
রাকাও টপাটপ বাটি ভরে চলেছে। ওর বাটিতেও তিনটে মোহর জমেছে। তার সঙ্গে চাকরিতে প্রমোশন, বিদেশযাত্রা বা তিতলি আর ঘোনুর পরীক্ষার ভালো রেজাল্ট বেরোলেই আরো জমা পড়ে। সবগুলো শমীক জানে না, কিন্তু রাকা বলেছে মরীচিকা আর ফানুস পেয়ে ও খুব খুশি হয়েছে। এবার ওর ইচ্ছে একটা আকাশকুসুম জোগাড় করা।
এইভাবে ভালোয় মন্দয় মিশিয়ে একরকম চলছিল, শমীকের একটা বড় প্রমোশন আসছে, তিতলির স্কুল ফাইনালের বছর, এমন সময় একদিন একটা শয়তান কাক এসে বাসাটায় এক চাঁই বরফ ফেলে পালিয়ে গেল।
শমীকের জীবনে হিমেল হাওয়া লাগল। বলতে গেলে কিছু যে পাল্টে গেল তা নয়। যেমন অফিসে যেত তেমনই যায়, ছুটি পেলে ফ্যামিলিকে নিয়ে বেড়াতে যায়, তিতলি-ঘোনুকে পড়াতে বসে, রাকার সঙ্গে গল্প করে…কিন্তু সব সময় চোখের সামনে অমাবস্যার রাতে মাঝসমুদ্রে ভাসতে থাকা বরফের চাঁইটা জেগে থাকে। শমীকের মাথার অবশিষ্ট চারটে চুল থেকে পায়ের নখ অবধি কনকন করে। বিগত জীবনের কোন একটা স্মৃতি মনে পড়তে চায়। শমীক যত বর্তমানের দিকে আসতে চায়, বরফটা ওকে আরো আরো জমাট বাঁধা অতীতে টেনে নিয়ে যায়। কোন কাজে ওর আর মন বসে না।
রাকাকে ও কয়েকবার সমস্যাটার কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রত্যেকবার হাঙ্গামা লেগে গেল। তুমি আর আমাকে ভালোই বাস না। নির্ঘাত তোমার অতীতে কোন গার্লফ্রেন্ড ছিল, তুমি তার কথাই ভাবছ। ভুলে গেছ মানে? অ্যামনেসিয়া হয়েছে নাকি? আমার এসব ন্যাকামো শোনার সময় নেই--এসব আলতু ফালতু কথায় আসল কথাটাই চাপা পড়ে গেল।
রাকাই যখন বুঝল না, তখন অন্যরা আর কি বুঝবে? অথচ শমীকের মনের অবস্থা ক্রমশ এমন হতে লাগল যে কারুর সঙ্গে আলোচনা না করলেই নয়। বরফের চাঁইটার একটা হেস্তনেস্ত না করা অবধি ওর জীবনে প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, বা আত্মার শান্তি, কোনটাই নেই। অনেক ভেবে শেষটায় শমীক ঠিক করল সেজদাদুর সঙ্গে দেখা করবে। যে মানুষটা সারা জীবনের মতো পাসওয়ার্ড ছুঁড়ে ফেলার সাহস করেছে, বললে সে-ই একমাত্র বলতে পারবে এই বেয়াড়া বরফের চাঁইটার কি ব্যবস্থা করা যায়।
বাবাকে ফোন করে শমীক জানতে পারল সেজদাদু কয়েক বছর আগেই ছবি হয়ে গেছে, কিন্তু সোমবার আর শুক্রবার ছবির মাধ্যমেই চেম্বার করে। শমীক আর দেরি করল না। সোমবার একটা হাফ-ডে নিয়ে গাঁদাফুল আর ধূপকাঠি হাতে সেজদাদুর ছবির সামনে চলে গেল।
“কি সমস্যা?” সেজদাদু অর্ধনিমীলিত চক্ষে জিজ্ঞেস করলেন।
শমীক সব বৃত্তান্ত খুলে বলল। সেজদাদু সবটা মন দিয়ে শুনল, আর মাঝেমাঝে হাতে জড়ানো জুঁইফুলের মালাটা শুঁকতে লাগল। সবটা শোনা হলে দাদু “হুঁ” বলে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
“এবার আমার কি হবে, দাদু?” শমীক প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“হবে কিছুই না,” দাদু আশ্বাস দিয়ে বলল, “তোর পাসওয়ার্ডটা খারাপ হয়ে গেছে। ওটা ফেলে দিতে হবে।”
“খা-খারাপ হয়ে গেছে!” শমীক আঁতকে উঠল, “কি করে খারাপ হল?”
“ওই এজেন্সি টেজেন্সি থেকে নেওয়া পাসওয়ার্ড অত টেঁকসই হয় না। তাও তো তোরটা বহুদিন চলল।”
শমীকের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা বরফ নেমে গেল। সত্যিই তো! পাসওয়ার্ড আসতে দেরি হচ্ছিল বলে ও সাত তাড়াতাড়ি এজেন্সি থেকে পাসওয়ার্ড নিয়ে এসেছিল! এখন উপায়?
“এবার আমি কি করব?”
“কেন, একটা পাসওয়ার্ড তৈরি করে নে!”
“তৈরি করব? পাসওয়ার্ড তৈরি করা যায় নাকি? ও তো সরকার থেকে দিয়ে দেয়!”
সেজদাদু একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করল।
“আরে ধুর বাবা! ওরা তোকে যেমন বানাতে চায় তেমন পাসওয়ার্ড দেয়। তোর না পোষালে তুই নিজের মতো পাসওয়ার্ড তৈরি করে নিবি! তাতে অবশ্য তুই সব জায়গায় ঢুকতে পারবি না, শুধু তোর মতো যারা নিজেদের পাসওয়ার্ড নিজেরা তৈরি করেছে, তাদের গ্রুপে ঢুকতে পারবি। যেমন আমি, নিজের পাসওয়ার্ড নিজে বানিয়েছি।”
শমীকের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
“তোমার আবার পাসওয়ার্ড আছে নাকি?”
“অবশ্যই আছে।”
এটা একটা নতুন খবর। নিজের পাসওয়ার্ড নিজে বানানো? শমীক ঘাড় চুলকাতে লাগল।
“কিন্তু আমি পাসওয়ার্ড বানাব কেমন করে?”
“চিন্তা করে। আমি তো বলব ওই বরফের চাঁইটার দিকে ভালো করে দ্যাখ। ওটা তোকে কি দেখাচ্ছে? কেন তোর পাসওয়ার্ডটা কোরাপ্ট করে দিল? দ্যাখ দ্যাখ!”
এতদিন ধরে শমীক বরফের চাঁইটার থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছে। এখনও যে ওটার দিকে তাকানোর কোন ইচ্ছে ওর আছে তা নয়। কিন্তু দাদু যখন বলছে…
শমীক বরফটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল। আগে মনে হচ্ছিল শুধুই খানিকটা জমাট বাঁধা জল। কিন্তু এখন দেখল, তার মধ্যে কিসব যেন আঁকিবুঁকি কাটা আছে। যেন বরফের ভেতরে কোথাও থেকে একটা ছবি ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে। শমীক চাঁইটার খুব কাছে গিয়ে একটু চোখ ট্যারা করে তাকাল।
সবুজ পাহাড়। একরকম নয়, তিন চার রকম সবুজ। ঘন পাইনের বন। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সামনে একটা বাড়ি। একতলা, পাথরের তৈরি। সবুজ কাঠের দরজা। ভেতরে নিশ্চয়ই ফায়ারপ্লেস জ্বলছে, কারণ চিমনি দিয়ে হাল্কা ধোঁয়া উঠছে।
শমীকের মুখ থেকে ওর নতুন পাসওয়ার্ড আপনা থেকে বেরিয়ে এল – আমার বাড়ি।
“সাবাশ শমীক!” দাদু হুইস্কির গ্লাসে চুমুক লাগাল, “এবার আমার মতো পাহাড়ে পাহাড়ে আমার বাড়ি খুঁজতে বেরিয়ে পড়!”
শমীক ঢোঁক গিলল।
“কি যা-তা বলছ দাদু! তুমি নয় সিঙ্গল ছিলে, যা খুশি করেছে। আমার তো একটা দায়-দায়িত্ব আছে? এই নিজের তৈরি পাসওয়ার্ড দিয়ে আমার চলবে কি করে?”
কাকের বাসার মধ্যে তিনটে মোহর পড়ে আছে। রাকার সঙ্গে দেখা হওয়া। তিতলি আর ঘোনু হওয়া। অসংখ্য আবর্জনার মধ্যে পড়ে থাকা সেই তিনটে মোহর…ওই মোহর তিনটের কি হবে? “আমার বাড়ি” তো রাজামশাইয়ের অফিসে ঢোকার অনুমতি জোগাড় করে দেবে না! রাজামশাইয়ের অনুগ্রহ ছাড়া তিতলি আর ঘোনুকে ও কি করে দেখবে? আর রাকা তো সোনার পাথরবাটি নিয়ে দিব্যি সুখে আছে। ও-ই বা কেন সব ছেড়ে শমীকের সঙ্গে ভিখিরির জীবন কাটাবে?
বরফের চাঁইটা আকারে একটু বড় হয়ে গেল। মানে, চোখের সামনেই হল। অবিশ্বাস্য লাগলেও ঘটনাটা ঘটল।
“ওই পাসওয়ার্ডটায় এখন ভাইরাস ঢুকে গেছে,” সেজদাদু সাবধান করল। “ওটা চেঞ্জ না করলে পুরো সিস্টেম খারাপ করে দেবে!”
শমীক রোবোটের মতো মাথা নাড়তে লাগল।
“পারব না…আমি পারব না…”
ওর কানে এল পাব না, 'আমার বাড়ি' কোনদিন পাব না…
সেজদাদুর ছবি ফেলে শমীক ছুটতে ছুটতে রাস্তায় নেমে এল।
প্রথম যেদিন রাকার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তখনই যদি ও নিজের সত্যিকারের পাসওয়ার্ডটা জানত…কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। যেদিন পাসওয়ার্ড অফিসে গেছিল সেদিন থেকেই দাবার বড়ে নড়তে শুরু করে দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত উলটে ফেলে ফ্যাক্টরি সেটিংএ ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কিছুতেই সম্ভব নয়। এভাবেই, কোরাপ্ট সিস্টেম নিয়েই এখন থেকে ওকে বেঁচে থাকতে হবে।
বরফের ওপর বরফ। চারিদিকে ধু-ধু করছে কনকনে হাওয়া। উলটে যাওয়া কাকের বাসা থেকে সাবধান বাণী আসছে –
ইউজার নেম অ্যান্ড পাসওয়ার্ড ডু নট ম্যাচ…