• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • সাইকেল : অংশুমান গুহ


    ছুটির দিন সকালে ছোটকা বলল, “সাইকেল কিনতে যাবি?”

    আমি প্রশ্নটা ঠিক বুঝলাম না। কার সাইকেল? ছোটকা হঠাৎ আমাকে বলছে কেন? আজ ছোটকার মেজাজটা ভালো আছে হয়তো। রোজকার মত খিটখিটে মনে হচ্ছে না।

    না বুঝেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটা বদ অভ্যাস আছে আমার। কিম্বা বুঝে, কিন্তু ঠিক উত্তর না জেনে। স্কুলে দু-একবার সেই জন্য বকুনিও খেয়েছি। কিন্তু আমি এত কিছুতে বকুনি খাই, যে কিছুই আর গায় লাগে না।

    বললাম, “হ্যাঁ।”

    আমার বয়স বারো। ক্লাস সেভেনে পড়ি। খুব ভালো স্কুল আমার, বাড়ির কাছেই। স্কুলে মারধোর নই। দুষ্টুমি করলে বকুনি। খুব বদমাইশি করলে বাড়িতে বাবা-মা’র কাছে নোটিশ। স্কুলে সব ভদ্র ঘরের ছেলে মেয়েরা আমার বন্ধু। কিন্তু আরো বেশি বন্ধু পাড়ার পাশের বস্তির ছেলেরা। ওরা ভদ্রলোক নয়। ওদের সাথেই আমি খেলি। ফুটবল, ক্রিকেট, মারামারি, ব্যাডমিন্টন। ডানপিটে বলে আমার নামডাক আছে। পাড়ার অনেক ছেলেই আমাকে ভয় পায়।

    ছোটকার কাছ থেকে স্নেহটেহ আমি পাই না। স্নেহ কাকে বলে আমি কিন্তু জানি। যেমন মা যখন খেতে দেয় বা পড়তে বসতে বলে বা কথা না শুনলে বকে — মা যাই করুক না কেন, তার মধ্যে স্নেহ থাকে, আমি ঠিক জানি।

    ‘সাইকেল কিনতে যাবি’ শুনে, তার মানে না বুঝেও, ছোটকার সাথে বেরোলাম। কাকিও বেরোল আমাদের সঙ্গে। ট্যাক্সিতে উঠলাম। ছোটকা আর কাকিমা বসেছে পেছনের সীটে। আমি সামনে, ড্রাইভারের পাশে।

    গাড়িটা পাড়া ছেড়ে বড় রাস্তায় পড়তেই, জানলা দিয়ে দারুণ হাওয়া দিল। ড্রাইভার আর আমার মাঝখানে একটা লাঠি মত। ওটাকে হ্যান্ডব্রেক বলে আমি জানি। তার স্মুদ হাতলটার ওপর হাত বোলালাম। ড্রাইভার বকল। বলল, “ওখানে হাত দিও না খোকা!”

    পায়ের কাছে গরম হাওয়া আসছে একটু একটু। শম্ভুদা বলেছিল ওটা ইঞ্জিন থেকে আসে। হ্যান্ডব্রেকের ওপরে ঝুঁকে, ড্রাইভারের গায়ে পড়ে, স্পীড দেখার চেষ্টা করলাম। ড্রাইভার আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিল।

    “সোজা হয়ে বোসো খোকা, এদিকে এসো না।”

    পেছন থেকে ছোটকা বলল, “ঠিক করে বোস্। নইলে এক চাঁটি মারব।”

    জানলায় মুখ দিয়ে হাওয়া খেলাম। পাশ দিয়ে গাঁক গাঁক করে হর্ন বাজিয়ে একটা বাস গেল। তারপর একটা মিনিবাস। আমি বাঁ-হাতটা বার করে হুহু-করা হাওয়াটা ভালো করে ফীল করার চেষ্টা করলাম।

    ড্রাইভার বলল, “হাত ভেতরে ঢোকাও!”

    ছোটকা বলল, “কি হচ্ছেটা কি? চুপ করে বোস্, হতভাগা।”

    খানিকক্ষণ পর একটা মোড়ে এসে ট্যাক্সিটা থেমে গেল। রাস্তায় জ্যাম। একজন হকার টক-ঝাল-মিষ্টি লজেন্স বিক্রি করছে। খুব লোভ হল। মুখে জল এল। কিন্তু ছোটকার কাছে চেয়ে কোনো লাভ নেই। তাই চুপ করে থুতু গিললাম। একটা ভিখিরি মেয়ে হাত বাড়াল পেছনের জানলার দিকে। ছোটকা বলল, “কিছু হবে না। যাঃ।” গাড়িটা আবার চলতে শুরু করল।

    ভিখিরি মেয়েটার হাতটা বাঁ দিকের আয়নায় অল্প ঘষা লাগল। আমি পেছন ফিরে দেখলাম, ও কব্জিতে একবার হাত বুলিয়েই হেঁটে এগিয়ে গেল। ব্যথা লাগেনি।

    আমি আবার সামনের দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসলাম। পায়ের কাছে গরম হাওয়া। কানের কাছে জানলা দিয়ে আরাম-করা হাওয়া। ভিখিরি মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির মেনি বেড়ালটার কথা মনে পড়ল। কেন কে জানে। আজ সকালে আদর করা হয়নি। বাড়ি ফিরে খুব করে আদর করব। আমাকে দেখে ও মিঁউ মিঁউ করবে। তখন আমি ওকে কোলে তুলে সারা গায় হাত বুলিয়ে দেব। আরামে ও চোখ বন্ধ করবে।

    ট্যাক্সিটা এবার একটা বড়, চওড়া রাস্তায় হু-হু করে যাচ্ছে। দারুণ লাগছে। এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত, তুমি বলো তো? মনে মনে গাইছিলাম। গাইতে গাইতে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে গেছে, “যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়”। পেছন থেকে ছোটকা বলল, “বড্ড বেশি পেকে গেছিস্। মুখ বন্ধ কর্। চুপ করে বসে থাক্।” ময়দানের পাশ দিয়ে চলেছি ঝড়ের বেগে। কত গাছ এখানে! সবুজের ওই দোল দোল হাসিতে মন আমার মিশে গেলে বেশ হয়।

    খানিক পর আবার একটা রাস্তার মোড়ে এসে গাড়িটা থামল। দেখি দেয়ালে একটা স্লোগান লেখা আছে। লাল রঙের কালি দিয়ে। “বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস”।

    বাবা! তার মানে কি?

    পেছন দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে জিগ্যেস করলাম, “বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস মানে কি? নল, মানে বন্দুকের নল…”

    ছোটকা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই কাকিমা বলল, “ওসব ছোটদের জন্য নয়। বড় হলে বুঝতে পারবি।”

    এই কথাটা বড়রা প্রায়ই বলে থাকে। বন্দুক দিয়ে তো গুলি মারে। সেই জন্য ক্ষমতা? ক্ষমতা মানে কি জোর? সে তো গায়ের জোরও হয়। যেমন পাড়ার বন্ধুদের মধ্যে আমার গায়ের জোরই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আমার বাবার গায়ের জোর আরো বেশি। কাল রাতে কয়েক ঘা খেয়েছি। আর কান-মলা। কানে খুব লেগেছিল। এখন আবার বাঁ-কানে হাত বুলালাম। বাবা বলে যে ব্যথা নাকি মনের ব্যাপার। মনের জোর থাকলে অনেক ব্যথাই সহ্য করা যায়। আমি তাই মাঝে মাঝে মনের জোর প্র্যাকটিস করি। অবশ্য খুব বেশি পিটুনি খেলে পারি না। শেষবার ও রকম হয়েছিল গত মাসে। বাপ্ রে, বাপ্। সে কি ধোলাই! সেদিন আমার চোখে জল এসে গেছিল। সাধারণত আমি কাঁদি না। কিন্তু সেইবার আর চেপে থাকতে পারিনি। মনে হচ্ছিল মরেই যাব হয়তো। বাবার হাতের জোর আমার মনের জোরের থেকে অনেক বেশি। বাবা তো পুরুষমানুষ। আমি তো বাচ্চা। আমি পুরুষমানুষ হতে চাই। পুরুষমানুষ হয়ে আমি সবাইকে দেখিয়ে দেব আমার কত জোর।

    একটা ট্রামরাস্তা ধরে গাড়িটা চলছিল। সামনে ট্রাম যাচ্ছে ঢিমে তালে। তাই গাড়িটা আর জোরে যেতে পারছে না। ফুটপাত ধরে সারি সারি দোকান – জামাকাপড়, ইলেকট্রনিক্স, আরো কত কি। অনেক লোক। কেউ জিনিস কিনছে। কেউ হেঁটে চলে যাচ্ছে। এখানেই কোথাও হয়তো সাইকেলের দোকান হবে!

    ছোটকা বলল, “এইখানে রেখে দিন।”

    বুঝলাম ড্রাইভারকে বলল। কিন্তু ঠিক কি রাখতে বলল বুঝলাম না। আমি ড্রাইভারের দিকে তাকালাম। লোকটা কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না।

    সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম গাড়িটা আস্তে আস্তে বাঁদিকের ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা কি পৌঁছে গেছি?

    পেছনের দরজা খুলল। তাই দেখে আমি সামনের দরজা খুলে নেমে গেলাম। কাকিমাও নামল। আমরা দু’জন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ছোটকা গাড়ির মধ্যে বসে বসেই ট্যাক্সির ভাড়া দিল। তারপর ছোটকাও নামল। গাড়িটা চলে গেল।

    আমি চারপাশে তাকিয়ে কোথাও সাইকেলের দোকান দেখলাম না।

    বললাম, “সাইকেলের দোকান কোথায়?”

    আমার মাথায় একটা আস্তে করে চাঁটি মেরে ছোটকা বলল, “আবার ডেঁপোমি করছিস?”

    আমি বুঝলাম না।

    কাকিমা বলল, “এখানে আমাদের অন্য কেনাকাটি আছে। তারপর সাইকেলের দোকানে যাব।”

    ফুটপাত দিয়ে হাঁটলাম আমরা। ভাগ্যিস কেউ আমার হাত ধরেনি। আমার হাত না ধরে হাঁটতে ভালো লাগে। আমি তো আর কচি খোকা নই!

    জামাকাপড়ের দোকান, পেরেক-বল্টুর দোকান, সবজির দোকান, কত রকমের দোকান। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা আইসক্রীমের দোকান পড়ল। জিবে জল এল আবার। এক সেকেন্ডের জন্য আশা হল যদি ছোটকা আইসক্রীম কিনে দেয়! বা ছোটকা না দিক, যদি কাকিমা কিনে দেয়!

    কিন্তু না। আমরা হেঁটে পার হয়ে গেলাম।

    আমি মুখে জমা থুতুটা ফুটপাত আর রাস্তার বর্ডারে থুঃ করে ফেললাম। ওমনি কাকিমা বলল, “ছিঃ ছিঃ। এত নোংরা কেন তুই?”

    ছোটকা আবার একটা চাঁটি মারতে চাইল। কিন্তু আমি সময়মত মাথাটা সরিয়ে নিলাম।

    একটা বাসনকোসনের দোকানে এসে ছোটকা আর কাকিমা দোকানে ঢুকল। আমি পেছন পেছন ঢুকতে যেতেই ছোটকা বলল, “না! তুই বাইরে দাঁড়িয়ে থাক্!”

    আমি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওরা ঢুকে গেল।

    রাস্তা দিয়ে ক্রমাগত গাড়ি যাচ্ছে, বাস যাচ্ছে। মিনিবাস, ট্রাম, মাঝে মাঝে মোটর সাইকেল, স্কুটার। কয়েকটা সাইকেলও দেখলাম। তারই মধ্যে দিয়ে অগুন্তি মানুষ। ফুটপাতে তো মানুষ আছেই।

    দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে আছি। অনেকক্ষণ পর হঠাৎ দেখি দূর থেকে ফুটপাতের ওপর দিয়ে একটা ছেলে সাইকেল টেনে হেঁটে হেঁটে আসছে। সতীশ না? হ্যাঁ, সতীশই মনে হচ্ছে। অবাক ব্যাপার। এইখানে কি করছে? সাইকেলটা কি ওর?

    সতীশ আমার স্কুলের। আমার ক্লাসের ফার্স্ট বয়। হেবি বুদ্ধি। অংক করে টক্ টক্ করে। ওকে কিছুই পড়াশুনো করতে হয় না। কোনো খাটনি নেই। এত বুদ্ধি, যে খাতা নিয়ে বসলেই সব অংক-টংক হুড়হুড় করে হয়ে যায়।

    কাছাকাছি এলে আমি বললাম, “সতীশ! তুই এখানে কি করছিস?”

    সতীশ বলল, “আমি তো এখানেই থাকি। মানে এই পাড়ায়। তুই এখানে কি করছিস?”

    “কাকার সাথে বাজার করতে এসেছি। আজ আমাকে সাইকেল কিনে দেবে।”

    “ওঃ। তুই সাইকেল চালাতে জানিস?”

    “জানি না মানে? আলবাত জানি। মোটর সাইকেলও চালাতে জানি।”

    সতীশ বোধহয় বিশ্বাস করল না। একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।

    কথা ঘোরানোর জন্য তাড়াতাড়ি বললাম, “এই সাইকেলটা তোর বুঝি?”

    “হ্যাঁ।”

    “টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিস কেন? চালাচ্ছিস না কেন?”

    “এখানে অনেক গাড়িঘোড়া তো! এখানে আমার চালানো বারণ। চাকায় হাওয়া দিতে নিয়ে গেছিলাম। এখন বাড়ি ফিরছি।”

    আমার খুব হাসি পেল।

    বললাম, “গাড়িঘোড়া তো কি হয়েছে? আমি তোর জায়গায় হলে এই রাস্তাতেই চালাতাম। চালিয়ে বাড়ি ফিরতাম।”

    সতীশ একটা সম্ভ্রমের চোখে তাকাল।

    উৎসাহ পেয়ে আমি বললাম, “আমার সাইকেলটা কেনা হয়ে গেলে আমি একদিন বাড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে তোর সঙ্গে দেখা করতে আসব।”

    “সে কি রে! সে তো অনেক দূর!”

    “তাতে কি হয়েছে? ধুর ধুর! আমি ইজিলি চলে আসব। তোর ঠিকানাটা দিস শুধু।”

    সতীশ চুপ করে তাকিয়ে থাকল। বলল, “এখন যাই রে। নাহলে মা চিন্তা করবে।”

    ঠিক সেই সময়ে দোকানের দরজা দিয়ে ছোটকা উঁকি মারল।

    সতীশ চলে গেল।

    ছোটকা বলল, “ভেতরে আয়। দুটো ব্যাগ হয়েছে বাসনকোসনের। তুলে নে।”

    আমি দোকানে ঢুকে দেখলাম কাকিমা অনেক বাসন কিনেছে। দুটো বড় চটের ব্যাগ। বেজায় ভারী। অবশ্য আমার কাছে কিছুই নয়। দু’ হাতে দুটো ব্যাগ নিয়ে ছোটকা আর কাকিমার পেছন পেছন আমি দোকান থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে নামলাম।

    ছোটকা বলল, “চল্। এবার সাইকেলের দোকানে যাব।”

    আমার মনের মধ্যে বেজে উঠল হিন্দি গানের সুর, কিশোর কুমারের গলায়। ভেসে উঠল গুরু অমিতাভ বচ্চনের মুখ। গুরুদেব মোটর সাইকেল চালাচ্ছে। আমিও ওরকম সাইকেল চালাব। রোতে হুয়ে আতে হ্যায় সব্, হাসতা হুয়া যো যায়গা, উয়ো মুকদ্দর কা সিকন্দর জানেমন কহলায়েগা। উয়ো মুকদ্দর কা সিকান্দর লা লা লা লা লা। মানে – সবাই কাঁদতে কাঁদতে আসে। কিন্তু যে হাসতে হাসতে হাসতে যায়, সেই মুকদ্দরের সিকন্দরকে সবাই জানেমন বলে। লা লা লা। মানে সেই ওস্তাদকে সবাই ভালোবাসে ।

    ছোটকা আর কাকিমা আগে আগে হাঁটছে। আমি পেছন পেছন যাচ্ছি দুটো পেল্লায় ব্যাগ নিয়ে। হাত ব্যথা করছে। খানিকক্ষণ পর পর যখন ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে, হাত বদল করছি। এমন ভাবে করছি যাতে ছোটকারা টের না পায়। টের পাবে কি করে? ওরা তো আমার সামনে।

    আমি আর কিছুই দেখছি না। লোক, দোকান, রাস্তা, গাড়ি। কিছুই আমার চোখে পড়ছে না। মাথার মধ্যে গান চলছে আর গুরুদেবের মোটরসাইকেল ছুটছে। নানা রকম ভবিষ্যতের ঘটনা ভাবছি। বিভিন্ন ভাবে আমি সাইকেল চালিয়ে বন্ধুদের তাক লাগিয়ে দেব। মাঝরাতে মেনির শরীর খারাপ করলে, সাঁই করে সাইকেল চালিয়ে ওষুধ কিনে আনব। বাবা যখন মারছে, হঠাৎ পালিয়ে গিয়ে সাইকেল চেপে উধাও হয়ে যাব। বাবা ছুটে ছুটে নাগাল পাবে না, হাঁপিয়ে গিয়ে থেমে যাবে। হয়তো স্কুলের বাৎসরিক স্পোর্টসে স্পেশাল প্রাইজ পাব। সবাই তখন বুঝবে আমার কদর। পাড়ার মেয়েগুলো বলবে - এই না হলে পুরুষমানুষ! এইসব নানা চিন্তায় মশগুল হয়ে হেঁটে চলেছি।

    মাঝে মাঝে হাত ব্যথা করছে। দু’ সেকেন্ড থেমে হাত বদল করছি। আর মনে মনে বলছি – ব্যথা কিছুই নয়। তার থেকে অনেক বেশি আমার মনের জোর। মনের জোরই ক্ষমতার উৎস। নাকি শরীরের জোর?

    অনেকক্ষণ হাঁটার পর ছোটকাকে জিগ্যেস করলাম, “আর কদ্দূর ছোটকা?”

    ছোটকা মিষ্টি করে বলল, “এই তো। আর একটুখানি। ব্যাগগুলো ভারী লাগছে?”

    “না না! হালকা। একদম হালকা।”

    এইভাবে চলতে চলতে কতক্ষণ লাগল ভগবান জানে। শেষে পৌঁছলাম সাইকেলের দোকানে।

    দোকানে ঢুকে দেখি শ’য়ে শ’য়ে সাইকেল রাখা। ছোট বড়। নানান রঙ। সব চকচক করছে। কোনো কোনোটাতে বেল লাগানো। কোনো কোনোটাতে সামনে লাইট লাগানো।

    ছোটকা বলল, “ব্যাগদুটো এখানে নামিয়ে রাখ্।”

    দোকানের একজন কর্মচারী বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, এখানে নামিয়ে রাখো, খোকা। কিচ্ছু হবে না।”

    ভার নামিয়ে আমি সাইকেল দেখতে লাগলাম। ছোটকা তাড়াতাড়ি কয়েকটা সাইকেল পছন্দ করে আমাকে বলল, “এগুলোর মধ্যে দ্যাখ্! কোনটা ভালো লাগছে।”

    মনে হল ছোটকাকে এতদিন বুঝতে পারিনি। হ্যাঁ, হয়তো একটি খিটখিটে। কিন্তু কি দরাজ মন! আর আমায় কি ভালোবাসে!

    এক মিনিটের মধ্যে একটা নীল সাইকেল আমার খুব পছন্দ হল। বেলটার দারুণ শব্দ। হাতল থেকে যে লোহার বার’টা নিচে চাকার দিকে নেমে গেছে, সেটা এত পরিষ্কার যে নিজের মুখ দেখা যায়। আয়নার মত। পাড়ায় নিয়ে গেলে সবার তাক লেগে যাবে। সতীশের সাইকেলের থেকে অনেক ভালো।

    ছোটকা বলল, “এটাই তো? ঠিক তো?”

    আমি বত্রিশ পাটি বার করে বললাম, “হ্যাঁ। একদম।”

    “তুই তবে কাকিমার সাথে বাইরে গিয়ে দাঁড়া। আমি আসছি। ব্যাগদুটো নিয়ে যা।”

    কাকিমা আর আমি দোকান থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে দাঁড়ালাম। আমার বুক ধড়ফড় করছে। এক্ষুনি ছোটকা আমার সাইকেল নিয়ে দোকান থেকে বেরোবে। আমার দু’ হাতে দুই চটের ব্যাগ। সেগুলোর কোনো ওজনই নেই।

    খানিক পরে দোকান থেকে ছোটকা বেরিয়ে এল। খালি হাত। সঙ্গে সাইকেল নেই।

    বলল, “ওরা তৈরি করে রাখছে। একটা নতুন ব্রেক লাগাবে আর একটা লাইট। ততক্ষণে আমরা আরেকটু বাজার করি। তারপর এসে সাইকেল নিয়ে যাব।”

    আমি মনে মনে বললাম, বাঃ বাঃ, বেশ বেশ।

    আবার ফুটপাত ধরে হাঁটা। আমার দু’ হাতে দুই ব্যাগ। আর ভারী লাগছে না। খুব ভালো ছেলের মত হাঁটছি, ভদ্র ভাবে। মনে মনে গুনগুন করছি। বুক ভরতি থ্যাঙ্কিউ।

    হাঁটছি তো হাঁটছিই। আবার হাত ব্যথা শুরু হল। দু’ সেকেন্ড থেমে জিরিয়ে নিয়ে, হাত বদল করলাম। ছোটকা আর কাকিমা এগিয়ে গেছে। আমি জোরে হেঁটে ওদের ধরে ফেললাম। আবার হাঁটা।

    কতক্ষণ হেঁটেছি জানি না। কতবার থেমে ব্যাগগুলো হাত বদল করেছি জানি না। শেষ পর্যন্ত একটা শাড়ির দোকান, একটা রেডিওর দোকান আর একটা কসমেটিক্সের দোকানে ছোটকারা থামল। এক ব্যাগ শাড়ি আর এক ব্যাগ রেডিও-রেকর্ড আমার হাতে যোগ হল। কসমেটিক্সের একটা ছোট প্যাকেট কাকিমা নিজের কাঁধ-ব্যাগে পুরল।

    সব শেষ হলে ছোটকা একটা রাস্তার মোড়ে পানের দোকানের সামনে দাঁড়াল। দুটো পান অর্ডার করল। পানওয়ালা পান বানাচ্ছে, ছোটকা দেখছে। কাকিমা অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমি চারখানা ব্যাগ ধরে অপেক্ষা করছি।

    একটা ট্যাক্সি রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ছোটকা হাত তুলে “ট্যাক্সি” বলে ডাকল। ট্যাক্সিটা থেমে গেল। ছোটকা গিয়ে ড্রাইভারের সাথে কথা বলল। তারপর গাড়ির ডিকিটা খুলে আমায় ডাকল।

    “এখানে ব্যাগগুলো সাজিয়ে রাখ্। সাবধানে রাখ্, ঠিক করে।”

    রাখলাম। হাতদুটোয় আরাম হল। ছোটকা বলল, “এবার ঢুকে বোস্।”

    কাকিমা পেছনের সীটে বসল। ছোটকা পানওয়ালার কাছে ফিরে গেল। আমি গাড়ির সামনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম।

    একটু পর ছোটকা পান চিবোতে চিবোতে ফিরে এল।

    বলল, “কি রে! এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বাড়ি যাবি না? ঢুকে বোস্।”

    ছোটকা পেছনের জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে কাকিমাকে একটা পান দিল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল।

    আমি বললাম, “সাইকেল নেব না?”

    ছোটকা বলল, “তোর সাইকেল চাই?”

    ছোটকার গলাটা অদ্ভুত শোনালো। কেন জানি না আমার হঠাৎ হাল্লার রাজার কথা মনে পড়ল। জাদুকর বরফীর দেওয়া বড়ি খাবার আগে এক রকম, পরে এক রকম। আগে সুন্দর, নরম, লম্বা দাড়ি। বড়ি খেয়েই সেটা হঠাৎ গুটিয়ে ছোট, শক্ত, উগ্র হয়ে গেছিল।

    আমি কিছু বলার আগেই, ছোটকা দাড়িটা গুটিয়ে আবার জিগ্যেস করল, “তোর সাইকেল চাই?”

    আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, “হ্যাঁ।”

    ছোটকা তখন আচমকা একটা কষিয়ে চড় মারল। আমি পড়ে গেলাম।

    ***

    সেই সাইকেল না-কেনা দিনের পর প্রায় পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে। ছোটকা মরে ভূত হয়ে গেছে কবে! আমি এখন পুরুষমানুষ। ছোটবেলায় সাইকেল আমার হয়নি। এখন আমি মোটর সাইকেল চালাই। পুরুষমানুষের মত। আমার ছেলেকেও শিখিয়েছি কি করে পুরুষমানুষ হতে হয়।

    সেদিন চড়টা কেন খেয়েছিলাম আজো বুঝতে পারিনি।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments