• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • হন্তারক : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

    এক

    গণপতি বাপ্পার বিসর্জনের দিন সন্ধেবেলা সাধারণত রিমঝিম বৃষ্টি হয়, দেবতার আশীর্বাদের মতো, মাথা ভেজে, গা ভেজে না। বাপ্পার লরির অনুগামী মেয়ে-মদ্দ ঢোল-তাসার সঙ্গে দলবেঁধে দু’হাত তুলে নাচে। জয়ধ্বনি দেয়—গণপতি বাপ্পা মোরয়া… এবছর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল, আগাপাছতলা ভিজিয়ে দিল। ললিতা বৃষ্টির মধ্যেই খানিকক্ষণ নাচন-কোঁদন করে ঘরে ফিরে এল। নাচুনে ভক্তদের ভিড়ে তারক আর কৃষ্ণও ছিল। ওরা এল না। ওরা শেষ অবধি যাবে। বাপ্পার নিমজ্জনের পরে ঘরমুখো হবে।

    ঘর মানে এক কামরার খুপরি। লাগোয়া কল-পায়খানা, চানের জায়গা। উলটো দিকের জানলার নিচে এক ফালি রান্নার প্ল্যাটফর্ম, খসখসে কাড়াপ্পা পাথরের। মাথা মুছে, ভিজে সালোয়ার-কুর্তা চানের ঘরের রডে মেলে রেখে এসে গ্যাসে চায়ের জল চাপাল ললিতা। নাক টানল। নাক থেকে কাঁচাজল ঝরতে শুরু করেছে, মাথাটা ভার ভার। চায়ে একটু আদা থেঁতো করে দিতে পারলে ভাল হত। জ্বরজারি হলে মুশকিল, কে দেখবে? তিন বাড়ি রান্নার কাজ, তার মধ্যে এক বাড়িতে দু’জনেই সিনিয়র সিটিজেন, মাসে দু’দিনের বেশি কামাই হলে মাইনে কাটা যাবে।

    হামানদিস্তেয় আদা ছেঁচছিল ললিতা। মোবাইলটা বেজে উঠল। ভুলে চানের ঘরে ছেড়ে রেখে এসেছিল। তাতে অসুবিধে নেই। ডাব্বা ফোন, উৎকট শব্দ করে জানান দেয়। গলির মোড় থেকেও শোনা যায়। গিয়ে ধরতে ধরতে কেটে গেল। তুলে দেখল একটা অচেনা নম্বর। সাড়ে দশটা বাজে। এত রাতে কে ফোন করছে? কৌতূহল হল। নম্বরটাতে ফিরে ফোন করল। উলটো দিক থেকে কেউ জড়ানো গলায় বলল—হ্যালো।

    তারকেরই গলা মনে হল। অন্য কারও ফোন থেকে ফোন করছে বোধহয়। নিজের ফোনটা হারিয়েছে নাকি? হয়তো বৃষ্টির জলে ভিজে ‘ভোগে’ গেছে। কতদিন বলেছে—সারাদিন বাইরে বাইরে ঘোরো, ফোনটাকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে পকেটে রাখতে পারো তো! কে কার কথা শোনে! তারক স্খলিত গলায় কথা বলছে। নিশ্চয়ই মদ গিলে নেশা করেছে। পকেটে ক্যাশকড়ি থাকলে তার মেজাজ রাজা-রাজড়াদের মতো হয়ে যায়।

    বিসর্জনের বাজনার আওয়াজে অর্ধেক কথা চাপা পড়ে যাচ্ছে। দু’-একবার ‘কৃষ্ণর’ নামটা শুনতে পেল। আচমকা কেটে গেল ফোনটা। মরুক গে যাক! দরকার হলে তারক আবার ফোন করবে। কৃষ্ণকে নিয়ে কী যেন বলছিল তারক? ফোনে কথা বলার সময় কিছু মনে হয়নি, এখন হঠাৎ ললিতার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। তারক কি কিছু আন্দাজ করে বসল নাকি?

    অথবা নেশার ঘোরে কৃষ্ণই কিছু বেফাঁস বলে বসেছে। তারক মদ গিললে কৃষ্ণ কি আর বসে বসে দেখবে? এমনিতে তো দু’জনে এক গেলাসের ইয়ার, হলায় গলায় বন্ধুত্ব। অন্তত ক’দিন আগে পর্যন্ত তাই ছিল। তারকের দিক থেকে এখনও তার ব্যত্যয় হয়নি। গোপনে দেখাসাক্ষাৎ হত যখন, কৃষ্ণই বরং উস্কানি দিত ললিতাকে—ঘাড় গুঁজে পড়ে আছো কেন? মর্কটটাকে ছেড়ে চলে এসো। কেন কে জানে, ললিতার সাহস হয়নি।

    কিন্তু আজ তো দেশি দারুর ঠেকগুলো তো বন্ধ থাকার কথা। এমন নয় যে চোরাগোপ্তা বিক্রি হয় না। ফরমান জারি করে কি আর নেশাখোর লোকেদের আটকানো যায়? গা গরম না হলে তারা বৃষ্টির মধ্যে নাচানাচি করে কেমন করে? ললিতা তারকের নম্বরে ফোন করল। স্যুইচ অফ। যে অচেনা নম্বরটা থেকে ফোন এসেছিল সেটায় করল। নেটওয়ার্কের বাইরে। দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। লোকটাকে নিয়ে আর পারা যায় না। বেহুঁশ হয়ে নর্দমা-টর্দমায় উলটে পড়ে নেই তো? দু’-পাত্তর চড়াতে না চড়াতেই টাল খায়। সঙ্গে দু’-চার জন আরও বন্ধুবান্ধব আছে যদিও, সামলাবার জন্য।

    লরির পিছনে বাপ্পার পায়ের কাছে বসে কে একজন লুচি-সুজি বিতরণ করছিল—বাপ্পার প্রসাদ। তারক আর ললিতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে নিয়েছিল। নাচতে নাচতে সেসব কখন হজম হয়ে গেছে। কৌটোয় দুটো বাসি রুটি পড়ে ছিল। ললিতা চায়ে ডুবিয়ে খেল। তারক কখন ফিরবে, কে জানে! ঘরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া করবে বলে মনে হয় না। আজ রাতে আর রান্না চাপাবে না ললিতা।

    চোখ টানছে। ললিতা ডিভানের উপর চিত হল। গায়ের ওপর একটা হালকা চাদর টেনে নিল। একটাই জানলা ঘরে। জানলার কার্নিশে একটানা বৃষ্টি পড়ার শব্দ হচ্ছে। কখন যে থামবে! কাচের শার্শি ভেদ করে আলো আসছে। চোখের উপর আড়াআড়ি হাত রাখল। তারক বেরিয়ে গেলেই কৃষ্ণ এসে ওই জানলার শার্শিতে ঠকঠক করত। সামনের বিল্ডিঙেই থাকে, নজর রাখত বোধহয়। তারকের স্যাঙাৎ বলে ললিতা দরজা খুলে দিত। প্রথম প্রথম সম্পর্কটা রঙ্গ-রসিকতাতেই আটকে ছিল। তারপর কোথা দিয়ে যে কী হয়ে গেল!

    কৃষ্ণ এক পা বাড়িয়েই রেখেছিল। পিরিতির জল-কাদায় ললিতারও পা হড়কাল। কে কাকে বাঁচায়! দু’জনেই ধপাস করে পড়ল, পেছন ঠুকে। বলতে বাধা নেই, তখন মন্দ লাগেনি ব্যাপারটা। অনেকটা সেই ছোটবেলায় বৃষ্টির দিনে ইচ্ছা করে কাদা-মাটি ঘাঁটার মতো… অহেতুক উল্লাস। আদর-সোহাগের কেরামতিতে কাঠখোট্টা তারকের চেয়ে কৃষ্ণ হাজার গুণ দড়। সাত বছর তারকের সঙ্গে নিষ্ফলা সংসার করে ললিতার মুখে যেন অরুচি হয়েছিল। সেটা চট করে ছেড়ে গেল। কিন্তু নেশা হয়ে গেল। সময় নেই, অসময় নেই, শরীর আনচান করে।

    কৃষ্ণকে ফোন করলেই মোটরবাইক দাবড়িয়ে চলে আসত। তারক রং-মিস্তিরি। সকালে একবার বেরিয়ে গেলে সারাদিনের জন্য নিশ্চিন্ত। একেবারে সন্ধে পার করে ফেরে। হাতে গালে রং মেখে। তখন তাকে দেখে মনে হয় সার্কাসের জোকার। কৃষ্ণ ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে খাবার তুলে লোকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়। অবশ্য দিনের অর্ধেক সময় খালিই বসে থাকে। গাছের ছায়ায় মোটরবাইক হেলিয়ে আরাম করে। একবার ডাক দিলেই হল। হুড়তে-পুড়তে এসে হাজির।

    দরজায় শব্দ হল। ললিতা মোবাইল তুলে সময় দেখল—পৌনে দুটো। ঘুমিয়ে পড়েছিল। আলো নেভানো হয়নি। ঘাড় তুলে দেখল তারক ঘরে ঢুকছে। ডুপ্লিকেট চাবি থাকে তারকের কাছে। জামাকাপড় সপসপে ভিজে। তারকের চুল থেকে জল গড়াচ্ছে। ললিতা কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। বৃষ্টিটা মনে হয় একটু ধরেছে। এত ভিজল কী করে? মেঝেয় জল ছড়াতে ছড়াতে চানের ঘরে ঢুকল তারক। ললিতা উঠল। ন্যাতা দিয়ে মেঝের জল মুছল। চানের ঘরের বন্ধ দরজায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, তারক চা খাবে কি না। তারক জবাব দিল না।

    জানলার পাশে একটা হাতল ভাঙা চেয়ার রাখা থাকে। ললিতা সেটায় বসল গিয়ে। জানলা দিয়ে উলটো দিকের বিল্ডিঙে কৃষ্ণর ঘরটা দেখা যায়। ললিতাদের বাসাটা দোতলায়। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে সিডকো বানিয়েছিল নিচু ছাতের তিনতলা খুপরি খুপরি বিল্ডিঙগুলো, নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের বসবাসের জন্য। এখন ভগ্নদশা, আরও নিচুতলার মানুষেরা থাকে। এই সেক্টরের সব বিল্ডিঙগুলোই রিডেভেলপমেন্টে যাবে, উঁচু উঁচু টাওয়ার উঠবে। মালিকদের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। তার আগে যে ক’দিন পারা যায় মালিকরা ভাড়া উসুল করছে। ভাংচুর শুরু হলে ললিতাদের শহরতলির জনতা কলোনিতে উঠে যেতে হবে। কৃষ্ণর জানলায় আলো জ্বলছে না। কৃষ্ণ ফেরেনি এখনও?

    চানের ঘর থেকে বেরোল তারক। ললিতা দেখল তার চোখ করমচার মতো লাল। কোনওদিকে না তাকিয়ে সটান গিয়ে ডিভানে শুয়ে পড়ল। পায়ের কাছে পড়ে থাকা চাদরটা টেনে নিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “আলোটা নিভিয়ে দে।ইলেকট্রিকের বিল কি তোর বাপ ভরবে?”

    দুই

    দুপুরে খাওয়ার জন্য রুটি-তরকারি সকালেই বানিয়ে আনে ললিতা। মিত্তির বাড়ির কাজ সেরে, একটা দেড়টা নাগাদ পারুল আর ফতিমার সঙ্গে পার্কের বেঞ্চে বসে ভাগাভাগি করে খায়। সকালে বেরোবার সময় দেখেছিল তারক অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ডাকেনি আর। দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। পারুল রুটি চিবোতে চিবোতে বলল, “ললিতাদি, শুনেছ? কেষ্টদা ফেরেনি।”

    “ফেরেনি মানে?” ললিতা খাওয়া থামিয়ে ভুরু তুলল।

    “বিসর্জনের সময় জলে নেমেছিল। তারপর থেকে তাকে নাকি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না,” পারুলের গলা বিমর্ষ শোনাল। যদিও কোনওদিন মুখে বলেনি, ললিতার ধারণা পারুল ওর আর কৃষ্ণর ব্যাপারটা জানে। কত আর লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম করা যায়! তারকের অনুপস্থিতিতে কৃষ্ণ প্রায়ই ঘরে আসে। লোকজন তো অন্ধ নয়। মুখরোচক বিষয়, আড়ালে আবডালে আলোচনা হবেই। না-হলে হঠাৎ কৃষ্ণর ঘরে না ফেরার খবরটা পারুল আগ বাড়িয়ে দেবে কেন তাকে? লেক, চৌপাট্টিতে গণপতি বিসর্জনের সময় অসাবধানে কাঠামোর নিচে পড়ে গিয়ে প্রতি বছরই দু’-চারটে লোক ডুবে মরে। কারও বডি খুঁজে পাওয়া যায়, কারও যায় না। নতুন কিছু নয়। ফতিমা মুখ ভেটকাল, বলল, “কুনো মাইয়া মান্ষের কুলে মুখ গুইজ্যা পড়ি আছে দেখ গিয়া। বেলা বাড়লি ফিইর্যা আসবেনে।”

    কথাটা ললিতার পছন্দ হল না। অবশ্য কৃষ্ণর সঙ্গে ললিতার আশনাইয়ের ইতিবৃত্তান্ত ফতিমার জানার কথা নয়। ফতিমা বছর তিনেক আগে বর্ডার পার হয়ে বসিরহাটে একটা খারাপ পাড়ায় বাসা নিয়েছিল। আলম মুম্বাইতে সোনার কাজ করত। দেশে মানে বসিরহাটে যেত যখন ফতিমার ঘরে ঢুঁ মারত। সে-ই পার্টির ছেলেপুলে ধরে ফতিমার কাগজপত্র তৈরি করিয়ে দেয়। তারপর তাকে নিয়ে দু’দিনের জন্য বকখালিতে হাওয়া খেতে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে বেমালুম লা-পতা হয়ে যায়। পানাগড় থেকে মুম্বাই মেল ধরে ফতিমাকে জনতা কলোনিতে এনে তোলে। মাস তিনেক হল এখানে এসেছে ফতিমা। মাথায় দোপাট্টা জড়িয়ে বদলির ঠিকে কাজ করে, বাসন মাজা, ঘর পোঁছা… বলল—কেষ্টছোঁড়া কোন এক মাগির সঙ্গে নাকি ইল্লুতি করে বেড়াত, আলম বলছিল। তোরা জানিস কিছু?

    আকাশে মেঘ জমে আছে। বৃষ্টি হচ্ছে না যদিও। পারুল বা ললিতা কেউই ফতিমার কথার উত্তর দিল না। ললিতা মুখ ফিরিয়ে পারুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই কোথা থেকে খবর পেলি কৃষ্ণ ফেরেনি?”

    ব্যাগের থেকে প্লাস্টিকের বোতল বার করে পারুল এক ঢোঁক জল খেল। শুকনো রুটি গলা দিয়ে নামতে চায় না। বলল, “পলাশের সঙ্গে দেখা হল, ও-ই বলল… কেন, তারকদার মুখে কিছু শোনোনি?”

    বাজারে ঢোকার মুখে একটা বার কাম রেস্তোরাঁ আছে, পলাশ তার সামনে বসে ডাব বেচে। পার্টটাইমে পুলিশের খব্রির কাজ করে। জনতা কলোনিতেই থাকে। জনতা কলোনিতে ফতিমার মতো অনেকেই পুবের পড়শি দেশ থেকে এসে নকল নাম, ফর্জি পরিচয়পত্র নিয়ে বসবাস করে। প্রায়ই পুলিশ রেইড, ধরপাকড় হয়। পলাশ অনেক সময় আগাম খবর এনে দেয়। লোকজন সাবধান হয়ে যায়। এদিক ওদিক গা-ঢাকা দেয়। ললিতা ঘাড় নাড়ল। গলায় রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বলল, “না রে। বলবে কখন? ফেরা ইস্তক তো পোঁদ উলটে ঘুমোচ্ছে।”

    “সবাই নাকি বলাবলি করছে বাপ্পার মূর্তির নিচে চাপা পড়ে…” চোখ বন্ধ করে এঁটো ডান হাতের তর্জনী ভেঙে কপালে ঠেকাল পারুল।

    দুপুরের খাওয়ার পর ললিতা আর কাজে গেল না। পার্ক থেকে বেরিয়েই বড় রাস্তা। একটা অটোরিকশা থামিয়ে উঠে বসল। বাড়ি ফিরে যাবে। কৃষ্ণর হারিয়ে যাওয়ার খবরটা শুনে অবধি মনটা ভার হয়ে আছে। গলার কাছে এক দলা ব্যথা, ঢোঁক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। ললিতার এই আড়ে বহরে অতি সাধারণ শরীরটাকে নিয়ে কী যে পাগলামি করত ছেলেটা! কৃষ্ণর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হত নিতান্ত খেঁদিপেঁচি নয়, ললিতা বিশ্বসুন্দরী। কী হয়েছে কৃষ্ণর? সে কি সত্যি সত্যিই আর ফিরবে না? জানলার শার্শিতে আর কৃষ্ণর ছায়া পড়বে না। তার মুগ্ধ দৃষ্টি ঝরবে না খোলা গা-য়। ভাবলেই বুকের ভিতরটা খালি খালি লাগছে।

    বাড়িতে এসে দেখল তারক তখনও ডিভান ছেড়ে ওঠেনি। এপাশ-ওপাশ করছে, কাতরাচ্ছে। কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ললিতা জিজ্ঞেস করল, “ওষুধ খেয়েছ?”

    তারক চোখ খুলল না। ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলল। কৃষ্ণর চিন্তা ছেড়ে আপাতত ললিতা তারকের শুশ্রূষায় মন দিল। তাকে প্যারাসিটামল খাইয়ে কপালে জলপট্টি দিতে বসল। নাক-মুখ দিয়ে গরম ভাপ বেরোচ্ছে। জ্বরের তাড়সে তারক ছটফট করছে। বিড়বিড় করে কথা বলছে। ললিতা ঠোঁটের কাছে কান নিয়ে গিয়ে শুনল, তারক বলছে, “শুয়োরের বাচ্চা, ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি। গলায় পা দিয়ে মেরে ফেলব। আজ তোর রেহাই নেই…”

    ললিতার ভয় লাগল। জিজ্ঞেস করল, “কী বলছ? কাকে মেরে ফেলবে?”

    তারক চোখ খুলে তাকাল, গলা চড়িয়ে বলল, “তুই এখানে কী করছিস?”

    ললিতা সরে বসল। তারক এমনিতে রোগাভোগা মানুষ। কিন্তু রেগে গেলে চণ্ডাল। দেহে অসুরের বল। একবার তারকের হাতে চড় খেয়ে মেঝের উপর মাথা ঘুরে পড়েছিল ললিতা। দু’মিনিট জ্ঞান ফেরেনি। অবশ্য মেরে ফেলার কথাটা সম্ভবত তার উদ্দেশে বলা নয়। বরং শুনে মনে হল, ললিতা কী করে ঝুট-ঝামেলার মাঝখানে এসে পড়ল এই নিয়ে তারক সংশয়ে পড়ে গেছে।

    ঘোরের মধ্যে বলা কথা। তবু ললিতার শঙ্কা হল। কার উপর এত রাগ? কাকে মেরে ফেলার কথা বলছে তারক? কৃষ্ণ নয় তো? গত রাতে ফোনেও কৃষ্ণর নাম করছিল। মাথার বালিশের পাশে তারকের ফোনটা রাখা রয়েছে। হাতে তুলে দেখল চার্জ শেষ। ওই ফোন নয়, অন্য ফোন থেকে কল করেছিল। কার ফোন কে জানে! কপালের থেকে জলপট্টির ভিজে রুমাল হাত দিয়ে সরিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল তারক। ললিতা বলল, “ও গো শুনছ, একটু শান্ত হও। এখন উঠলে টলে পড়ে যাবে।”

    ঘাড় ফিরিয়ে চারদিক জরিপ করে তারক বোধহয় বুঝতে পারল সে নিজের ঘরের বিছানাতেই শুয়ে আছে। নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়ল আবার। চোখ বুজল। ললিতা জলে রুমাল ভিজিয়ে নিংড়োচ্ছিল। দরজায় শব্দ হল। কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে। উঠে গিয়ে দরজা খুলল ললিতা। দেখল একজন পুলিশের হাবিলদার দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা মরাঠিতে জিজ্ঞেস করল, তারক আছে কিনা বাড়িতে।

    ললিতা উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করল—কেন? কী দরকার তারককে?

    লোকটা জুতো পরেই মসমস করে ভিতরে ঢুকে এল। ডিভানের উপর পড়ে থাকা মানুষটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এত গোলমালেও তারক চোখ খোলেনি। লোকটা তার গায়ে নাড়া দিয়ে ডাকতে যাচ্ছিল। ললিতা আটকাল। কাতর গলায় বলল, তারকের শরীর ভাল নেই। কাল রাত থেকেই জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। লোকটা থেমে গেল। ভাল করে নিরীক্ষণ করে বোঝার চেষ্টা করল তারক ভান করছে কিনা। পাশের তেপায়া টুলে ওষুধের পাতা, জলের মগ আর ভিজে রুমালের দিকে তাকাল। যখন নিশ্চিন্ত হল, তারক সত্যিই অসুস্থ, নাটক করছে না, ললিতার দিকে ফিরে বলল, শোন, ওকে বলবি তবিয়ত ঠিক হলেই যেন সোজা থানায় এসে দেখা করে।

    ললিতা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে জিজ্ঞেস করল—কিন্তু কী করেছে তারক সেটা তো বললে না।

    লোকটা জবাব না দিয়েই ফিরে যাচ্ছিল। কী মনে করে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, কাল রাত থেকে কৃষ্ণ বলে একটা ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে লেক-এ জাল ফেলেও ছেলেটার বডি পাওয়া যায়নি। পুলিশের সন্দেহ ছেলেটা জলে ডুবে মরেনি। খুন হয়েছে। কৃষ্ণকে নাকি শেষ দেখা গিয়েছিল তারকের সঙ্গে। তাই তারককে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।

    লোকটা চলে গেল। যাওয়ার আগে সতর্ক করে দিয়ে গেল, তারক যেন পালাবার চেষ্টা না করে। ললিতা দরজা বন্ধ করে পিছন ফিরতেই তারক চোখ মেলল, জিজ্ঞেস করল, “চলে গেছে?”

    পুলিশ সন্দেহের বশে খোঁজ করতে এসেছিল। সুস্থ থাকলে হয়তো তারককে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে দু’-চারটে চড়-থাপ্পড়, রুলের গুঁতো মেরে পেটের কথা বার করার চেষ্টা করত। নেহাত জ্বরে পড়ে আছে বলে ব্যাপারটা পিছিয়ে গেল। তবে তারক থানায় গিয়ে হাজিরা না দিলে তারা আবার আসবে। সহজে ছাড়বে না।

    এতক্ষণ শয়তানি করে ঘাপটি মেরে পড়ে ছিল নাকি? ললিতা বলল, “তোমায় থানায় গিয়ে দেখা করতে বলে গেল।”

    তারক ললিতার কথাটাকে পাত্তা দিল না। হাতের ভঙ্গিতে তাকে নাকচ করে পাশ ফিরে শুল। তারকের ভাব-গতিক দেখে ললিতার দৃঢ় প্রত্যয় হল কৃষ্ণ জলে ডুবে মরেনি। খুন হয়েছে। এবং তারকই হন্তারক।

    তিন

    “তুমি জানতে পেরে গিয়েছিলে, তাই না?” ললিতা জিজ্ঞেস করল। তিন দিন জ্বরে ভুগে সবে উঠে বসেছে তারক। শরীর দুর্বল। সকালে ঘুম ভেঙে, দেওয়াল আর পিঠের মধ্যে একটা বালিশ গুঁজে, ডিভানের ওপর বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। তারক যেন আশ্চর্য হল, “কী জানতে পেরেছিলাম?”

    যে গেছে সে তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু কাউকে না কাউকে তার চলে যাওয়ার দায় নিতে হয়। ললিতা ভাবল, লুকিয়ে রেখে কী লাভ? তারক জানে না এমন নয়। কী যায় আসে! বলল, “কৃষ্ণ আর আমার সম্পর্কের কথাটা?”

    বলার ধরণে অজান্তেই বোধহয় দরকারের থেকে বেশি নিষ্ঠুরতা মিশে গিয়েছিল। তারক ললিতার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল। পোষা কুকুরের পাছায় লাঠির ঘা পড়লে যেমন করুণ চোখে তাকায়। তাকিয়েই রইল। কোনও জবাব দিল না। ললিতার মনে হল তারক ভণিতা করছে। আবেগশূন্য গলায় বলল, “তোমাকে থানায় গিয়ে দেখা করতে বলেছিল। ভুলে যেও না যেন।”

    তারক অসহায় গলায় বলল, “কী বলব গিয়ে?”

    “যা করেছ, তাই বলবে,” ললিতা রুক্ষ গলায় জবাব দিল। তিন দিনের জ্বরে তারকের স্মৃতিভ্রংশ হল নাকি! সে যেন কোনও কিছুই হদিশ করতে পারছে না। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, “কী করেছি আমি?”

    “কী করেছ জানো না? ন্যাকা...” ললিতা উঠে গেল। গত দু’দিন কাজে যেতে পারেনি। পারুলকে বলেছিল মিত্তির বাড়ির বুড়ো-বুড়ির রান্নাটা সামলে দিতে। আজ পারুল নেই। ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে। পারুলের ছেলেটার রক্তের রোগ, প্রতি মাসে রক্ত দিতে হয়। আজ বেরোতেই হবে ললিতাকে। ভাবল যাওয়ার সময় একবার বাজার ঘুরে যাবে। পলাশের সঙ্গে দেখা করে খোঁজ নেবে জনতা কলোনিতে যদি একটা ঘর পাওয়া যায়। তারকের সঙ্গে থাকা আর পোষাবে না।

    কাল রাত্তির থেকে একটা ভয় মাথার মধ্যে শিকড় নামাচ্ছে। যে লোক বৌয়ের সঙ্গে লটঘট আছে জানতে পেরে বন্ধুকে খুন করতে পারে সে নষ্ট হয়ে যাওয়া বৌকে ছেড়ে কথা কইবে তার গ্যারান্টি কী? রাত্তিরে ঘুমের মধ্যে যদি গলা টিপে দেয়! পিঠে তারকের চোখ বিঁধে আছে। রান্নার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে টিফিন কৌটোয় খাবার ভরতে ভরতে চোখের কোণ দিয়ে দেখল তারক এখনও ছলছলে চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ললিতা এমন অসৈরন করতে পারে। ঢং করার একটা সীমা আছে! ললিতার গা জ্বালা করছিল।

    ললিতা ঘরদোর গুছিয়ে বেরোবার আগেই তারক পায়খানা-চান করে বেরিয়ে গেল। বলে গেল, “যাই, থানা থেকে বলে গিয়েছিল, একবার দেখা করে আসি।”

    মিনিট কুড়ি পরে ললিতাও বেরোল। বাজার পর্যন্ত যেতে হল না। গলির মোড়েই পলাশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। পান-সিগারেটের গুমটির সামনে দাঁড়িয়ে মৌজ করে ধোঁয়া ছাড়ছিল। ললিতাকে দেখে এক গাল হাসল, হাত নাড়ল। ললিতা বলল, “কলোনিতে আমায় একটা ঘর দেখে দে না ভাই।”

    পলাশ একটু অবাক হল, জিজ্ঞেস করল, “কেন? যে ঘরে আছ সেটার কী হল? বাড়িওয়ালা ছাড়তে বলেছে?”

    ললিতা চোখ নামিয়ে বলল, “আলাদা থাকব…”

    পলাশ ফাজলামি করে হেসে বলল, “তারকদার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে? ও কিছু নয়। সেরে গেলে ভাল হয়ে যাবে।”

    ললিতা হাসল না। বলল, “না রে। ঝামেলার মধ্যে আছি। তুই প্লিজ একটা ব্যবস্থা করে দে।”

    পলাশ কী বুঝল কে জানে! একটু থেমে বলল, “আলম আর ফতিমা যে ঘরটায় থাকত সেটা আপাতত ফাঁকা পড়ে আছে। ঢুকে পড়ো। বেশি ভাড়া নয়। অন্তত কিছুদিনের জন্য…”

    ললিতা বলল, “ফতিমারা কোথায় গেল? দেশে ফিরে গেছে নাকি?”

    পলাশ বলল, “কাল রাতে কলোনিতে পুলিশ এসেছিল। সাতজনকে তুলে নিয়ে গেছে। তার মধ্যে আলম আর ফতিমাও আছে। শুনছি একেবারে ঘেঁটি ধরে বর্ডার পার করে দিয়ে আসবে।”

    ললিতা অবাক হয়ে বলল, “আলম তো এদিকের…”

    পলাশ হাত ওলটাল।

    যতই ক্যাঁটক্যাঁট করে কথা শোনাক ফতিমার মনটা সাদা ছিল। এমনিতেই তারককে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে আছে। তার ওপর এই সব উপদ্রব। ললিতার বিষণ্ণ লাগছিল। রান্নার কাজে মন দিতে পারল না। কোনও তরকারিতে নুন বেশি পড়ে গেল তো কোনও তরকারিতে কম। পাবদা মাছের সর্ষে-ঝালে লঙ্কা দিতে ভুলে গেল, ফুলকপির ঝোলে আদা। সাহা বাড়ির বৌদি খেয়েদেয়ে বেরোবে। ডাল দিয়ে ভাত মেখে এক গাল মুখে তুলে বলল, “এ হে হে! মুসুর ডালে জিরে ফোড়ন দিয়েছিস! তোর কি মাথা খারাপ হল নাকি?”

    ফেরার পথে পারুলের বাড়ি হয়ে এল। একটা ক্রিম বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে গিয়েছিল ছেলেটার জন্য। সারাদিন হাসপাতালে কাটিয়ে শুকনো মুখ করে বসে ছিল বেচারা। প্যাকেটটা হাতে দিতে খুশি হল। বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গেল। ঘরে ঢুকে দেখল তখনও তারক ফেরেনি। সারাদিন মনে মনে তারককে অনেক গালাগালি দিয়েছে, এখন দুশ্চিন্তা হল। কী হল লোকটার? ফোন করল। ঘরের মধ্যেই ফোন বাজল। ফোন ভুলে ঘরেই ফেলে গেছে তারক। পুলিশ কি তাকে আটকে রাখল? কিছু খেতে-টেতে দিয়েছে কিনা কে জানে? সবে জ্বর থেকে উঠেছে। বেশি হুজ্জুত করলে মাথা ঘুরে উলটে পড়বে।

    রুটি আর কুমড়ো-আলুর শুকনো তরকারি রাঁধল ললিতা। তারক নিশ্চয়ই এক পেট খিদে নিয়ে ফিরবে। রাত বাড়ছিল। পাল্লা দিয়ে ললিতার উদ্বেগও। কৃষ্ণকে খুনের অপরাধে তারককে কি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে? কী ভাবে খুন করেছে, কেন খুন করেছে সব জানতে পেরে গেছে? নাকি তারক নিজেই সব স্বীকার করে নিয়েছে? একবার ভাবল পলাশকে ফোন করে একটা খোঁজ নেয়। সাহস হল না। কী শুনবে! ঘড়ি দেখল রাত সাড়ে এগারো। জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচের রাস্তা শুনশান। একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। ভিজে হাওয়া দিচ্ছে। সামনে একটা অনিশ্চিত সময়। ঠাণ্ডায় নাকি আশঙ্কায় একবার কেঁপে উঠল ললিতা।

    ফিরে এসে ডিভানে বসল। ভয়ানক অস্থির লাগছে। কী করবে এখন? থানায় যাবে? এত রাতে? সিঁড়ি ভেঙে একটা পায়ের শব্দ উঠে আসছে না? ললিতা কান পাতল। তারক এল? উঠে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলল ললিতা। দরজার সামনে অন্ধকার চাতাল। আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। ললিতা দরজা খুলতেই লোকটা ভিতরে ঢুকে এল। কিছু ঠাহর করার আগেই ললিতাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ডোবাল। লোকটা গলা অবধি মদ গিলে এসেছে, লালায় টক টক বাসি গন্ধ পেল ললিতা। পা দিয়ে দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে মাথা থেকে চাদর সারল লোকটা। ললিতা সরে এসে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে চোখ তুলে দেখল—কৃষ্ণ!

    চার

    কৃষ্ণ বলল, “তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। তোমায় নিয়ে যেতে এসেছি।”

    কৃষ্ণ বেঁচে আছে! ললিতার চোখে জল এল। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল কৃষ্ণকে। কাঁধে মাথা রাখল। জিজ্ঞেস করল, “কোথায় ছিলে এত দিন?”

    কৃষ্ণ বলল, “পরে বলবখন সব। এখন চলো।”

    ললিতা চটপট ডিভানের নিচে থেকে একটা স্যুটকেস বার করে জামাকাপড় গুছিয়ে নিচ্ছিল। কী মনে করে হাত থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় নিয়ে যাবে? ক’দিনের জন্য?”

    কৃষ্ণ হেসে বলল, “বরাবরের মতো। সব ব্যবস্থা করে এসেছি। কেউ খুঁজে পাবে না আমাদের।”

    ললিতা চিন্তিত মুখে বলল, “তারকের কী হবে? তোমায় খুঁজে না পেলে পুলিশ ওকে ছাড়বে?”

    কৃষ্ণ সামান্য বিরক্ত হল। বলল, “ওর কথা ছাড়ো।”

    “আচ্ছা,” স্যুটকেস বন্ধ করে ললিতা বলল, “চলো।”

    দরজা টেনে দিয়ে কৃষ্ণর হাত ধরে ললিতা রাস্তায় নেমে এল। দু’পা এগিয়েই থমকে দাঁড়াল। জিভ কেটে বলল, “এই যাহ, ভুলেই গেছি। তরকারিটা তো খোলা পড়ে রইল।”

    কৃষ্ণ ললিতার হাতে টান দিল, “থাক পড়ে…”

    ললিতা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “না না, জানলাটা খোলা আছে। ইঁদুর-বেড়ালে মুখ দেবে। তুমি দু’মিনিট দাঁড়াও। আমি আসছি।”

    ললিতা রাস্তার মাঝখানে কৃষ্ণকে দাঁড় করিয়ে রেখে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল। দু’মিনিট, তিন মিনিট, চার মিনিট… আধ ঘণ্টা পার হয়ে গেল… দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কৃষ্ণর পা ব্যথা হয়ে গেল। তিনটে কুকুর কৃষ্ণকে আপাদমস্তক জরিপ করতে করতে চলে গেল। রাস্তার আলোগুলো একবার নিভে গিয়ে আবার দপ করে জ্বলে উঠল। কৃষ্ণকে চমকে দিয়ে বড়রাস্তা দিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স চলে গেল হুটার বাজাতে বাজাতে। ফিসফিস করে বৃষ্টি শুরু হল।

    কৃষ্ণ বুঝতে পারল ললিতা আর আসবে না।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments