• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | গল্প
    Share
  • অপরাধী : শিবানী ভট্টাচার্য দে

    সারণের তাকানোর মধ্যে একটা তীব্রতা আছে, মুখের রেখা একটুও না কাঁপিয়ে সে দিতে আদেশ করে, কেড়েকুড়ে মেরেধরে টাকা নেয় না। তার চোখের দিকে তাকিয়ে ‘দেব না’ বলা আমার পক্ষে অসম্ভব। মাইনে কত পেলে, দেখি, -- বলে সে হাত বাড়াত। তখন নগদ টাকায় মাইনে হত। মাঝেমাঝে পাথুরে মুখে বলত, অমুক ব্যাঙ্কে একটা অমুক স্কিম আছে, সেখানে রাখব। আর আমি টাকা কোথায় রাখলে বেশি সুদ পাওয়া যায় সেসব স্কিমের খোঁজ রাখতাম না। স্কুলের চাকরি, ও ঘরকন্না--- তখন শাশুড়ি ছিলেন--- আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, সব সামলে প্রথম দুবছর রোজগার করলেও ইনভেস্ট করার ভার তার হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। পাসবুকের কথা জিগ্যেস করেছিলাম একবার। এমন করে তাকাল যেন খুব অন্যায় করে ফেলেছি। বলল, পাসবুক আছে। তুমি কী করবে? আমি কথা বাড়াইনি, আসলে বাড়ানোর সাহস পাইনি। আমার মা-বাবা দুজনেই মারা গেছে, ভাই দুজনের কেউই এই শহরে নেই, ওরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। সারণের উপরই আমাকে নির্ভর করতে হবে, মেনে নিয়েছিলাম। তা ছাড়া আমি নিশ্চিত যে আমি গুছিয়ে কিছু করে উঠতে পারব না, আমি জন্মভিতু। সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল, বিয়ে যখন ঠিক হল হবু বরের সি-ভি শুনে আমার মা-বাবা খুব খুশি হয়েছিল; ভেবেছিল একই শহরে শ্বশুরবাড়িও যখন, ভিতু মেয়েটার একটা ভাল সংস্থান হয়েছে। আমি নিজেও স্বপ্নের সপ্তম স্বর্গে উড়ছিলাম।

    বিয়ের দুবছর পর প্রথম সন্তান আসতে সন্তান পালন ও ভাল করে ঘরকন্না করার জন্য আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম— বর ও শাশুড়ি আয়ার হাতে বাচ্চা ছেড়ে যেতে কট্টর অরাজি, আর আমার মা, যে তখনো বেঁচে, আমায় মানিয়ে নিতে বলছিল। দুবছর পর আরেকটা সন্তান এল, ছেলে। সন্তানের কচিমুখ দেখে অনেক দুঃখ ভুললাম বটে, তবুও মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যেত বিয়ের পর থেকেই সারণের ব্যবহার-- কেমন পাশবিক। রাতের পর রাত বিছানায় আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে আমার উপরে যা করত, তাতে আমার দুটো সন্তানকে আমি রেপ চাইল্ড বলতেও পারি। একটা মানুষ তার সমস্ত জান্তব প্রবৃত্তি নিয়ে আমার শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে দিত, আমার সপ্তম স্বর্গ ভাঙতে একমাসও লাগেনি।

    বাচ্চারা আসবার পর সারণ আমার উপর তার শরীরের অত্যাচারের মাত্রা কমাল বটে, তবে জানা গেল সে অন্য নারীতে আসক্ত। অফিসের কোনো এক মহিলা সহকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা কানে এসেছে, ফোনের আলাপ, রাতে দেরি করে ফেরা, ঘনঘন শর্ট ট্যুরে বাইরে যাওয়া ইত্যাদি। কিছু সাক্ষাৎপ্রমাণও পেয়েছি --- একবার ফাইভে পড়া শ্রয়ন স্কুল থেকে এক্সকারশনে একদিন বোটানিক্যাল গার্ডেন গিয়েছিল, ফিরে এসে আমাকে বলেছে তার বাবাকে বাইকে দেখেছে— পেছনে একজন আন্টি বাবাকে জাপটে বসেছিল। সেদিন শ্রয়নের কথাটা শুনে --- ও বাচ্চা, কীই বা বলতাম! বিকেলে শ্রবণা কোচিং-এ পড়তে গেছে, শ্রয়ন খেলতে গেছে-- আমি একা কাঁদছিলাম, ছেলেটা কী বুঝে সময়ের আগেই ফিরে এলো। আমার চোখের জল গড়াতে দেখে ঘেঁষে দাঁড়াল খানিকটা। কতটুক বুঝেছে ছেলেটা? কী বুঝেছে? আমি তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ওর জন্য জলখাবার আনতে গেলাম। শ্রয়ন আমার কাছেই বেশি থাকত, এখন যেন আরো বেশি কেয়ারিং হয়ে গেল। আমি উদ্বিগ্ন-- যদি আমি ঝগড়া করি, আর সারণ আমাকে ছেড়ে যায়, বা আমাকেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, তাহলে বাচ্চা দুটো নিয়ে একা আমি কী করব! কেউ জিগ্যেস করলে কী বলব! ভবিষ্যত কী হবে?

    শ্রবণা প্রথম সন্তান বলে সারণ তার প্রতি স্নেহশীল ছিল, মেয়েকে সে আদরের প্রশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতা দেয়নি। মেয়ের উপর প্রভুত্ব এক তিলও আলগা না করে লেখাপড়ায় গতানুগতিক বিষয়ের বাইরে যেতে দেয়নি। শ্রবণাও মাঝারি মানের, তায় পরিশ্রম করতে অনিচ্ছুক, ইংরেজি নিয়ে সাধারণ গোছের ডিগ্রি নিয়েছে। তার জন্য ভাল ভাল সম্বন্ধ আসছে, ভাল মাইনে পাওয়া বরের সঙ্গে বিয়ে হলে সে আরামে দিন কাটাতে পারবে, মাথায় এটাই ঢুকেছে, তার অনেক সহপাঠী মেয়ে যেমন চাকরি করে প্রেম করে বিয়ে করছে, সে ওরকম করতে চায়নি। আমি যখন বলতাম, চাকরি কর, আমার মত দশটাকা চাইতে গেলেও মুখঝামটা খাবার জীবন যেন তোর না হয়, সে আমাকে বলেছে, মা, তুমি ছিলে লোয়ার মিড্ল ক্লাসের মেয়ে, ভিতু, লুজার, তাই তুমি বকুনি খাও। আমার ক্ষেত্রে তেমন সিচুয়েশন আসবে না। সে তার বাবার গর্ব করে, বাবা বলেছে তাকে যথেষ্ট দিয়ে থুয়ে বিয়ে দেবে।

    আমি মা হয়ে তাকে বিকল্প কিছু দিতে পারিনি।

    আমি শুধু মনেমনে গরজাই, কিন্তু এই প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও এতটুকু বিদ্রোহ করতে ভয় পাই। যদি আমাকে সব ছেড়ে চলে যেতে বলে, ভাবতেই নিজের পা দুটোকে অবশ মনে হয়। কখনো ভাবি, সম্পূর্ণ একা হলে বোধ হয় আমি আবার, এখনো আরম্ভ করতে পারব। একা হলে কী কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে সেসব নিয়েও ভাবি, কিন্তু আসল ব্যাপারটা, একা থাকা, নিজের টাকা নিজে জমানো, খরচ বা ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে যেটুকু সচেতনতার সঙ্গে সাহসের প্রয়োজন, সেটাই আসে না। সম্পূর্ণ একশ আশি ডিগ্রির পরস্পর বিরোধিতায় আমার মন ঘোরাফেরা করতে থাকে।

    ছেলেমেয়ে মোটামুটি থিতু হলে আমার কাজ কমল, এক বান্ধবীর সহায়তায় একটা কোচিং-সেণ্টারে যোগ দিলাম। পঞ্চাশ পেরোলেও শরীরস্বাস্থ্য আমার খারাপ না, এককালে পড়াতাম, বিয়ের আগে চারবছর ও পরে দু’বছর শিক্ষকতা করেছিলাম, তাই পড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে। ছেলেমেয়ের স্কুলের পড়া দেখানো ছাড়াও আশেপাশের দুএকটা ছেলেমেয়েকে মাঝেমাঝে পড়িয়েছি, ঠিক ট্যুইশন করব বলে নয়, পড়শি পরিবার, তাই কিছু মেলামেশা ছিল, তাদের মা-বাবা আমাকে পড়াতে বলত। যাহোক, সেই কারণে পড়ানোর অভ্যাসে কিছুটা ধারাবাহিকতাও আছে। ওরা যা ফিজ দিত সেই সামান্য টাকাটাই আমার হাতে থাকত, কারণ তখন বিকেলের দিকে, যে সময়টা আমি ছাত্র পড়াতাম, সারণ অফিসে থাকত, তাই সেটা তার নজরে আসেনি। নইলে সে যদি বলত, টাকাটা আমার হাতে দাও, আমি রাখতে পারতাম না। কোচিং সেণ্টারে ধীরে ধীরে পড়ুয়া বেড়েছে, ইদানীং আটহাজার টাকার মত আসে। এখন সারণ রিটায়ার করেছে, বাড়িতে থাকে, আমার টাকা আসছে দেখে আগের মতই আমার টাকাটা নিয়ে নেয়।

    শ্রয়ন চাকরি করছে, কিন্তু চাকরিতে খুশি নয়। যত মাইনের জব পাবে ভেবেছিল তার অর্ধেকেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। বারো ক্লাসের পর পড়বার জন্য বাইরে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু দুবার চেষ্টায়ও স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা পাশ করতে পারেনি, দেশেও সরকারি কলেজ পায়নি, শেষপর্যন্ত একটা বেসরকারি কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছে। ক্যাম্পাসিং-এ দ্বিতীয় শ্রেণির কোম্পানি ক’টা এসেছিল, তারই একটায় চাকরি পেয়েছে। ছেলে স্কুলের উঁচু ক্লাসে যখন পড়ত, তখন সারণকে বলেছিলাম ভাল কোচিং-এ ওকে দিতে, সারণ কান দেয়নি। এখন যা পেয়েছে, আমাদের বলার কিছু নেই।

    সারণ শ্রবণাকে মোটামুটি ভালই দিয়েথুয়ে বিয়ে দিয়েছিল। আমি শুধুই পার্শ্বচরিত্র, সামাজিক আচার নিয়ম করবার জন্য মা হয়েও মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করলাম। বর সীমন্ত ইঞ্জিনিয়ার, ভালই চাকরি, মাইনেও খারাপ না, কিন্তু এখন তার ইচ্ছে চাকরি ছেড়ে নিজের ফার্ম খোলা। নতুন কাজ শুরু করার সময়ে কিছুটা আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারে, তাই সে শ্রবণাকে চাকরির জন্য চেষ্টা করতে বলেছে। শ্রবণার মাথায় যেন বাজ পড়ল। তার চাকরির জন্য পড়াশুনো করার, বাইরে বেরিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিলই না কোনোদিন। সে সীমন্তকে বলল, আমি চাকরি করব? সেটা কী কথা! আমি চাকরি করলে আগেই চেষ্টা করতে পারতাম। চাকরি করে ঘরকন্না করতে পারব না। দুটোর একটা হবে। বরং তুমি আমার বাবার কাছে টাকা চাও। বাবাও চায় না আমি জব করি।

    শ্রয়নও আরো বেশি মাইনের নতুন জব খুঁজছিল। সীমন্ত শ্রয়নকে তার ফার্মের পরিকল্পনা বলল-- আমার স্টার্ট-আপে এসো, দুজনে মিলে ফিফটি-ফিফটি শেয়ারে হবে। শ্বশুরবাবার কাছে কিছু ক্যাপিটাল চাইতে হবে। আমাদের ফার্ম চালু হয়ে গেলে, তার টাকা ফেরত দেব।

    শ্রয়ন বলল, ভাল আইডিয়া। কিন্তু বাবার কাছে টাকা চাইবে কে? আমি না, সীমন্তদা; তুমিই প্রপোজ করো। বাবা জামাইকে নাও ফেরাতে পারে। আমাকে দেবে বলে সন্দেহ আছে। বাবা কাউকে টাকা দেয় না। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দিনগুলোতে যা অবস্থা গেছে আমার। এক টাকাও বাড়তি দিতে চাইত না।

    আমাকে বলতে হবে? ঠিক আছে, তবে দুজনে যাই। আমার যদি কিছু বলার বাকি থাকে তুমি ধরতাই দিও। সে শ্বশুরের কাছে গেল শ্রয়নকে নিয়ে।

    বাবা, আমি ও শ্রয়ন একটা স্টার্ট-আপ খুলতে চাই। দশ-এগারো ঘণ্টার চাকরি করে যা স্যালারি পাই, আমি বা শ্রয়ন, তাতে অনেকবছর লেগে যাবে একটা ভাল ভদ্রস্থ লাইফ স্টাইলে যেতে! তার উপরে আছে ছাঁটাই। এম-এন-সিগুলো বছর বছর মাঝারি অফিসারদের ছেঁটে দিচ্ছে আজকাল। সেসবের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের ফার্ম করে নিজেরা খাটব। তাই আপনি যদি পঁচিশ লাখ টাকা দেন তাহলে আমরা এগোতে পারি সাহস করে। বাকি আর আর যা লাগে আমরা ব্যাঙ্কলোন নিয়ে মেটাব। আপনার টাকা আমরা ধার হিসেবে নেব, ধীরে ধীরে রিটার্ন করব। যদি রাজি হন, আপনাকে আমরা আমাদের কম্পানির শেয়ারহোল্ডার হিসেবেও নিতে পারি।

    শ্রয়ন বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, বলবার সাহস পাচ্ছিল না। বাবার চোখের দৃষ্টিকে তার ভয় লাগে। এখন বাধ্য হয়ে সীমন্তকে সেকেণ্ড করতে হবে, তাই বলল, হ্যাঁ বাবা। ত্তোমার টাকাটা আআমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শোধ করব। ভয়ে তুতলে যাচ্ছিল তার কথা।

    সারণ বলল, তোমরা নিজেরা ভাল চাকরিই করছ, সেটা ছেড়ে দেবে, তারপর আমাকে তোমাদের বোগাস কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার করে আমার টাকা নয়ছয় করবে, কোম্পানি ফেল করলে আমার ঘাড়ে ঋণ চাপাবে, এসব প্ল্যানে রাজি হব ভাবলে কী করে? আমার টাকা বেআক্কেলেদের জন্য নয়। আর কথা বাড়াবে না। কাজেই, নো ফারদার ডিস্কাসশন আবউট দিজ কাইণ্ড অব নন্সেন্স আইডিয়াজ।

    শ্রয়ন ও সীমন্ত উঠে গেল। বাড়ির ভেতরে আমার কাছে এল। শ্রয়ন বলল, শ্রবণা তোমাকে নিশ্চয় বলেছে আমরা একটা স্টার্ট-আপ কোম্পানি খুলতে চাইছিলাম। বাবার কাছে কয়েকলাখ টাকা চাইছিলাম, কোম্পানি চালু হলে ধীরে ধীরে টাকাটা মিটিয়ে দেব বলেছিলাম। বাবা দিলই না, উলটে সীমন্তদাকে উল্টোপাল্টা কিছু বলে দিল।

    আমি বললাম, তোদের বাবার কাছে টাকা চাইতে যাচ্ছিস জানলে আমি মানা করতাম। তোর বাবা কী জিনিস আমি বত্রিশ বছর ধরে হাড়ে হাড়ে চিনি। তোরা যখন হলি, তখন আমাকে চাপ দিয়ে চাকরি ছাড়িয়ে ছাড়ল। অথচ চাকরি যখন করেছি টাকাগুলো নিয়ে নিত। আমি দেখলাম তোদের অসুবিধে হবে, তাই বাধ্য হলাম চাকরি ছাড়তে, তোদের বাবা আমাকে একটু সাহায্য তো দূরের কথা, আয়া রাখতে পর্যন্ত মানা করেছিল। চাকরি ছেড়ে দেবার পর আমাকে কোনোদিন একটাকাও দেয়নি। একটা ঠিকে-ঝির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। এখন কোচিং সেণ্টারে পড়িয়ে কিছু টাকা পাচ্ছি, সেটাও রাখতে পারি না। ও চিরটাকালই অর্থপিশাচ। আমার তো মনে হয় ওর কাছে আড়াই-তিন কোটি টাকার কম হবে না। কিন্তু কাউকে একটা পয়সা দেবে না। মধ্যে মধ্যে মনে হয়, কবে এর হাত থেকে মুক্তি পাব!

    একটানা এতগুলো কথা বলে হাঁপাচ্ছিলাম। ওরা আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমি আগে কোনোদিন এমন করে বলিনি।

    শ্রবণা বলল, তুমি যদি আগে থেকে নিজের ব্যাপার নিজে সামলাতে পারতে তাহলে হয়তো এমন হত না। তোমার সাহস নেই, এসব বলে কী হবে। তুমি তো লুজার।

    ওই শব্দটা শুনে আমি অভ্যস্ত, আমি সত্যি লুজার, জানি। চুপ করে রইলাম।

    শ্রয়ন বলল, বাবা সীমন্তদাকে এমনভাবে বলল, যে ও খুব অপমানিত বোধ করেছে। লোনই তো চাইছিলাম, পরে রিটার্ন করতাম। এদিকে বলে, আমি মরলে তোমরাই সব পাবে। আরে বাবা, যখন দরকার তখন না পেলে পরে টাকা দিয়ে কী হবে!

    সীমন্ত বলল, ব্যাপারটা হল, আমাদের নির্বোধ ভাবা। আরে, নো রিস্ক, নো গেন। আজকাল লোন নিয়ে লোকে সব কিছু করে— পড়াশোনা করে, বাড়ি বানায়, বিজনেস করে। নিজের না থাকলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নেয়। বিজনেস করতে হলে চাকরিটা ছাড়তে হবেই, প্রতিদিন দশ-এগারো ঘণ্টা চাকরি করে নিজের বিজনেস স্টার্ট করা যায় না। শুধু সিকিয়োর থাকব এই চিন্তা করলে সারা জীবনই গোলামি করতে হবে, নিজের কিছু থাকবে না--- এই কথাটা এসব ওল্ড আইডিয়ার মানুষদের মাথায় ঢোকে না। এই কারণে বাঙালি পেছনে পড়ে থাকে। আরে বাবা, এত চিন্তা কিসের? যদি একান্তই বিজনেস ফেল করে, উ’ল বি ব্যাক টু জবস, কোয়ালিফিকেশন তো আছেই, এক্সপিরিয়েন্সও আছে বেশ। কিছু না কিছু জুটে যাবেই।

    যদিও সবার অসন্তোষ সারণের উপর পড়েছে দেখে খারাপ লাগছিল, কিন্তু ওর পক্ষে কিছু বলার যুক্তি আমার ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল এই বিরূপতা ওর প্রাপ্য।

    জীবন একই রকম চলতে লাগল, ছেলে ও জামাই তাদের পুরোনো চাকরিতেই আছে, মেয়ে তার ঘরকন্না, বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে ও সাক্ষাতে আড্ডা, সিনেমা শপিং-মলে ঘোরা নিয়ে আছে। ব্যবসার ভুত বোধহয় নেমেছে ওদের মাথা থেকে। সত্যি কথা বলতে, আমার নিজেরও খুব একটা ইচ্ছে ছিল না ওরা চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করুক। সীমন্ত লাখের কিছু বেশি মাইনে পায়, তা দেখেই মেয়ের জন্য তাকে পছন্দ করা হয়েছিল। শ্রয়ন আশি হাজারের কাছাকাছি পাচ্ছে, ওর তুলনামূলক নতুন চাকরি, ভবিষ্যতে নিশ্চয় আরো বেশি পাবে, এখনি এত অস্থির হবার কিছু নেই। আমাদের দুই পরিবারে আগে কেউ ব্যবসা করেনি। সারণ টাকা দেবে না, আমি জানি। আমার না আছে পুঁজি, না আছে তেমন গয়না বা অন্য সম্পত্তি, আমি কিছুই করতে পারব না। তার চাইতে এইভাবেই চলুক।

    ওরা তিনজন মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে কী আলোচনা করে, আমি অত খবর রাখি না। সেদিনের অসন্তোষের পরও সীমন্ত আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে নিরালা রেস্তোরাঁতে ডিনারের জন্য টেবিল বুক করেছিল। সেদিন সবাই মিলে খুব আনন্দ হল। আবার দুটো সুন্দর খাঁটি চীনা পোর্সেলিনের কফি কাপ উপহার দিয়েছে— বেশ দামি। ওরা করল বলেই বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হল—এই প্রথম। আমি তো সারণকে কোনোদিনই বলিনি অনুষ্ঠান তো দূরের কথা; নিজেদের নিভৃত নিয়ে, সামান্য কিছু উপহার পরস্পরকে দিয়ে নিজেদের যাপন— সেটুকুও না। শুধু প্রতিবছর পাড়ার মন্দিরে গিয়ে একটা মিনিমাম টাকার পুজো দিয়ে আসি, প্রসাদ নিয়ে ওকে দিই, ছেলে মেয়ে বা আর কেউ কাছে থাকলে তাদেরকেও দিয়ে নিজে খাই, তাই তারিখটা সবাই জানে। এখন সেটা করতেও ইচ্ছে করে না। ‘কী হবে এই লোকদেখানো অনুষ্ঠান করে? এই দেঁতো হাসির দেখানো সম্বন্ধ শেষ হলেই ভাল’--- এই ভাবনা সেদিন মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল স্বগতোক্তি হয়ে--- এই কথাটা শুনে ফেলেছিল আমার ছেলে মেয়ে জামাই। ওরা আমার দিকে তাকিয়েছিল। জামাই বলছিল, মায়ের কথাটা বুঝতে পারছি। সত্যি, যা হাড়কিপ্টে লোকের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন!

    মেয়েদের কাটাতে হয়, সন্তানের জন্য, সমাজের জন্য। আমাদের তো আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। আমি বলেছিলাম।

    চাইলে না কাটাতেও পারেন, এখনো সময় আছে।

    শ্রয়ন বলেছিল, আমার বাবা, সত্যি বলতে কী, একটা জানোয়ার।

    আমার কানে লেগেছিল শ্রয়নের মন্তব্য। বাপের সম্পর্কে এরকম মনোভাব ওর!

    শ্রমণা বোধ হয় একটু দোদুল্যমান ছিল। জিগ্যেস করল, তুমি কি ডিভোর্স চাও?

    কিছু চাই না, যেমন আছে তেমনি চলবে, বলে ওদের কাছ থেকে উঠে পড়লাম। আমার অবস্থার জটিলতা ওরা বুঝবে না। তবে এখন সারণের জন্য শুভ বা অশুভ কিছুই কামনা করতে আর ইচ্ছে করে না, কেমন যেন উদাসীন হয়ে যাচ্ছি। বছর কেটে যায় এই ঔদাসীন্যে, একই ভাবে।

    এর মধ্যে একবার শ্রবণাও চেষ্টা করেছিল ওর বাবার কাছে টাকা পাওয়া যায় কি না। শ্রবণা বাবাকে বলেছিল, বাবা, আমাকে তো চাকরি করার মত সাবজেক্ট পড়াওনি, পড়ালে আমি হয়তো চাকরি পেতাম। তাহলে সংসারে সাহায্য করতে পারতাম।

    সারণ বলল, কেন, ইংরেজিতে এমএ করেছ, এই কোয়ালিফিকেশনে চাকরি পাওয়া যায় না? তোমার চাকরি করার দরকারই বা কেন? সীমন্ত ভাল মাইনেই তো পায়।

    আজকাল ইংরাজিতে এমএ-রা প্রাইমারি স্কুলেও চাকরি পায় না। সরকারি চাকরি করতে গেলে দশ-পনেরো লাখ ঘুষ দিতে হয়--- তুমি নিশ্চয় খবর দেখ। সে যাক, সীমন্ত আগে তোমাকে বলেছিল সে ও শ্রয়ন মিলে একটা স্টার্ট-আপ করতে চায়। সেজন্য ওরা তোমার কাছে টাকা চেয়েছিল। স্টার্ট-আপ চালু হয়ে গেলে তোমার টাকা মিটিয়ে দিয়েও লাভ থাকত।

    ওরা তোমাকে বলেছে। আর যদি লাভ না হয়, ফেল করে?

    তুমি কেন এত নেগেটিভ ভাব? চিরকাল আমাদের সম্পর্কে নেগেটিভ ভেবে এসেছ, মার কোয়ালিফিকেশন থাকা সত্ত্বেও কাজ করতে দাওনি, ভাইকে কোচিংএর খরচা দাওনি, যাতে সে ভাল একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়তে পারে। এখন তোমার টাকা আছে, তবুও তুমি ওদের মানা করে দিলে। আমার খুব খারাপ লেগেছে!

    বড্ড বেশি বোল বেরোচ্ছে দেখছি! যদ্দিন বেঁচে আছি আমি ওইরকমই থাকব। আমি কাউকে এমনি এমনি টাকা দিই না, দেব না। বুঝেছ? এই কথা নিয়ে আমার কাছে আর আসবে না।

    বছর ঘুরেছে, আবার আমাদের বিয়ের বার্ষিকী। সীমন্ত নিরালা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার অর্ডার করেছে আমাদের বাড়িতে। আমাদের মধ্যেই আয়োজন। সারণ কিছুদিন আগে একটা দুর্ঘটনায় পড়েছিল, একেবারে রাস্তার উপর। তার বাইক স্কিড করেছিল বালির উপর, সে রাস্তার মাঝখানে পড়েছিল, বেলা দশটার ব্যস্ত রাস্তা, ভাগ্যিস স্পীডে আসা কোনো বাস বা কার চাপা দিয়ে যায়নি— কিন্তু, আমার মনে হচ্ছিল, চাপা দিলে বোধ হয় ভাল হত— যে মুক্তি আমি চাইছিলাম তার সমাধান হয়ে যেত। আবার নিজেই নিজের গালে চড় মারি, এরকম ভাবনার জন্য। সামান্য চিড় ধরেছিল ওর কোমরের হাড়ে, হাসপাতালে ও বাড়িতে মাস তিনেক শুয়ে কেটেছে। আয়া ছিল একজন দিনরাতের জন্য। চিকিৎসার খরচ ছেলের ইন্স্যুরেন্স থেকে হয়েছিল, আয়ার খরচ সারণ নিজে দিয়েছিল। মাঝে মাঝে আমি দেখেছি সারণের হাত বেচাল হতে, আয়ার বুকের উপর। ছেলেও দেখেছে কী না কে জানে। এসব অবশ্য আমাকে আর আশ্চর্য করে না। ফিজিওথেরাপিস্ট আসছে এখনো, বোধ হয় আর মাসখানেকের মধ্যেই লাঠি ছাড়াই হাঁটতে পারবে। সে বেশ কিছুদিন ভারি খাবার খায়নি, তাই বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে বিরিয়ানি মাটন চাঁপ অর্ডার করা হয়েছে, স্টার্টারে লিভার ফ্রাই, কাটলেট, সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি, সোডা ও লিমকা।

    আজকে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বাড়িতে। ওদের হাবভাব মনে হচ্ছে হাসিমুখ নেই জোর করে রাখা। আমাকে ওরা বলেছে কাজ না করতে—ওরাই সব করবে। হোটেলের প্যাক থেকে সার্ভিং বোলের মধ্যে খাবার ঢালা হচ্ছে, বেশ নিপুণ হাতে ওরা টেবিল সাজিয়েছে, প্লেট কোয়ার্টার প্লেট, কাঁটাচামচ চামচ গ্লাস ন্যাপকিন সব সাজিয়েছে, একটা বড় রজনীগন্ধার গুচ্ছ ফুলদানিতে--- আচ্ছা, ওরা রজনীগন্ধা আনল কেন? শুধুই সাদা রজনী গন্ধা--- সীমন্তের হাতে একটা ছোট প্যাকেট দেখলাম যেন--- নিশ্চিত হতে পারলাম না ঠিক কী--- আমার যত মতিভ্রম, ধ্যেত।

    সারণ চেয়ারে বসেছিল, ওয়াকিং স্টিক নিয়ে। তাকে আস্তে আস্তে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে নিয়ে আসা হল, তারপর আমাকে ডাকল ওরা। ড্রিঙ্কস এর গ্লাস ভরা হল, চিয়ার্স—চারজনে গ্লাসে গ্লাস ঠেকালাম। আমি সাধারণত ড্রিঙ্ক করি না, আমার ভাল লাগে না। তাই আমারটাতে লিমকা বেশি, সামান্য একটু হুইস্কি ঢেলেছে। নামে মাত্র দিলাম, আজকে খাও, সীমন্ত বলল। শ্রবণাও বলল, কোনোদিন ছুঁয়ে দেখবে না এটা কি হয়? ওরা নিজেদের গ্লাস ভরল, সবার বেশ নেশা নেশা—আমার ও সামান্য। তারপর শ্রবণা লিভার ফ্রাইএর প্লেট সামনে রাখল, কাঠি দিয়ে সবাই তুলে তুলে মুখে দিতে থাকল। সেসব শেষ হতে ঘণ্টাখানেক গেল, তারপর প্লেটে প্লেটে ঢালা হল বিরিয়ানি ও মাটন চাপ। সারণ বলল, বাঃ, বেশ করেছ তো। অনেকদিন ঝোলভাত খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেছে। সারণ ভোগী পুরুষ, আগে নিজে ভাল মাংস রান্না করত, কিলোটাক মাংস খে্তে পারত একেবারে। শ্রয়ন বলল, খাও, যেমন ভাল লাগে। শ্রবণা আরো দু পিস মাংস তার পাতে দিল।

    সবাই শুরু করল। ওদের চোখ সারণের দিকে। সারণ খাচ্ছে, খেতে খেতে যেন ঢুলছে। একটু পরেই এলিয়ে পড়ে গেল। কী হল? কী হল? বলতে বলতে আমি ঊঠলাম। কিছু খাইয়ে দিয়েছিস নাকি তোরা, চীৎকার করে আমি বললাম। চীৎকার করছ কেন? শ্রয়ন বলল। যা তুমি খেয়েছ, তাই বাবাও খেয়েছে। সীমন্ত উঠল, শ্রয়ন উঠল, শ্রমণা উঠল। ওরা সারণকে ধরে ধরে নিয়ে বিছানাতে শুইয়ে দিল। সারণ অজ্ঞানের মত একদিকে মাথা হেলে শুয়ে আছে। শ্বাস পড়ছে, লম্বা লম্বা। ডাক্তার ডাক, আমি বললাম। শ্রয়ন উঠল, পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করল-- ডাক্তারবাবু একটু আসবেন? বাবা ভাত খাবার সময় অজ্ঞান হয়ে গেছে।

    ডাক্তার আসছে, সীমন্ত ও শ্রয়নের পরিচিত উনি, তাই ওঁকেই ডাকা হয়েছে। তিনি এসে দেখলেন, বললেন তাঁর নার্সিং হোমে পাঠিয়ে দিতে, শ্রয়ন ও সীমন্ত ধরাধরি করে নিজেদের গাড়িতে সেখানে নিয়ে পৌছে দিল। শ্রমণা আমাকে বলল, তোমাকে যেতে হবে না। তুমি অস্থির হয়ে পড়েছ, এখন শোও। আমি বললাম না, আমাকে যেতে দে। সীমন্ত ওকে কী খাইয়েছে? তোরা সারণকে মেরে ফেলছিস?

    কী বলছ মা? তুমি একটু জল খাও তো। বলে আমাকে একটা গ্লাসে বোতল থেকে অল্প জল ঢেলে দিল। সেই জল একটু খেলাম। আমি আর টের কিছু পেলাম না, ঘুমিয়ে পড়ছি। কিছুক্ষণ পর জাগলাম। আমি একা বাড়িতে। কেউ নেই। শ্রবণাও নেই। চিৎকার করলাম, কেউ নেই, আমার মোবাইলটাও নেই। কী ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়েছি আমি! মনে পড়ল আমার একটা পুরোনো সিম পুরোনো বাটন-ফোনে লাগানো আছে, আণ্ড্রয়েড ফোন কেনার পর এখন বিশেষ ব্যবহার হয় না। আমি ওটায় তিন চার মাসে সামান্য টাকা দিয়ে টপ আপ করে চালু রাখি, কল করি না। সেটা থেকে থানায় ফোন করলাম। ওদিক থেকে সাড়া এল, আমি ঠিকানা দিলাম, বললাম, আমি আমার স্বামীকে বিষ দিয়েছি। ওকে নিয়ে গেছে অমুক নার্সিং হোমে। আপনারা আসুন। পুলিস এল। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। ওরা কল করল। আমি ভেতর থেকে ডুপ্লিকেট চাবি জানালা দিয়ে ফেললাম, তাদের আসতে বললাম। ওরা আবার সব কথা জিগ্যেস করল। আমি ওরা যে নার্সিং হোমে গেছে, সেই নার্সিং হোমের, ডাক্তারের, আমার স্বামী, ছেলে জামাই, মেয়ে, সবার নাম বললাম, ওরা সঙ্গে আছে বললাম।

    আমাকে নিয়ে ওরা সেখানে গিয়ে সবাইকে পেল। ওরা সারণের বডি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দিল।

    আমাদের নিয়ে এসে বাড়িতে এক ঘরে রেখে ওরা বাড়ি সার্চ করল, প্রমাণ খুঁজতে খাবারের অবশিষ্ট ও অন্য আরো এটাসেটা তুলে নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য পাঠাল। আমাকে সহ শ্রয়ন, শ্রবণা ও সীমন্তকে আর ডাক্তারকে থানায় নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ডাক্তারকে সামান্য কিছু জিগ্যেস করে ছেড়ে দিল তখনকার মত, বলে দিল পরে আবার জিগ্যেস করতে পারে। শ্রয়ণ, শ্রবণা ও সীমন্ত জিজ্ঞাসাবাদে বলল, ওরা কিছুই জানে না। আমি অফিসারকে বললাম, আমি বিষ দিয়েছি সারণের খাবারে। আমাকে অ্যারেস্ট করুন।

    আপনি বিষ কোথায় পেলেন?

    পেয়েছি, বলব না।

    আমাকে লকআপে রেখে ওদের বাড়ি পাঠাল, কোথাও না যাবার শর্তে।

    আমি কেন নিজের উপরে খুনের দায়ভার নিলাম? আমি জানি পুলিশ চাইলেই এই খুনের সত্য উদ্ঘাটন হবে। সীমন্ত ও শ্রয়ণ দুজনে অপরাধী, শ্রবণাও নিশ্চিত সঙ্গে ছিল। তারা সবাই হয়তো শাস্তি পাবে। আমি ছিলাম না এই ষড়যন্ত্রে তাদের সঙ্গে। কিন্তু আমি কি অপরাধী নই? হ্যাঁ, আমিই প্রথম অপরাধী। আমিই সারণের উপর বহুবছর ধরে অসন্তুষ্ট ছিলাম, ভাবতাম কবে ওর হাত থেকে ছাড়া পাব, কবে ও মরবে, মুখেও উচ্চারণ করে কি ওদের মনে খুনের বীজ ঢুকিয়ে দিইনি? এমন কী ওর অ্যাক্সিডেণ্ট হবার পর মনে মনে ভেবেছিলাম কেন ও বাসে চাকার নিচে পড়ল না। খুন করতে পারার সাহস ও উপায় থাকলে আমি কি করতাম না?

    আমি যদি কথাগুলো না বলতাম, তাহলে কী ওরা সারণকে মারত না? মনে মনে হয়তো ভাবত, কিন্তু এতটা সাহস পেত না। তারা খুন করেছে, তারা যদি শাস্তি পায় আর আমি বাইরে থাকি, আমাকে সেই একা থাকতে হবে, যে আমি একা থাকতে ভয় করতাম। কারো অপরাধ প্রমাণ না হলে আমাকে আমার খুনি সন্তানদের সঙ্গে থাকতে হবে— আমি তো কখনো চাইনি আমার সন্তানেরা খুনি হোক। আমি খুনিদের সংস্রবে থাকতে রাজি নই। তার চাইতে বরং আমার সাজা হোক। অপরাধ তো আমারই, সেই কথাটিই আমি বারে বারে বলব।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments