



আজ আমার বিয়ে। কোমর বেঁধে গায়ে হলুদের তোড়জোড় করছে মা মাসিমা কাকিমার দল। ভিড়ে, আওয়াজে ফ্ল্যাটের ভিতর টেকা দায়। ছাদটা তার চেয়ে অনেক ভালো। বারোটা ফ্লোর এই আবাসনে। বহু বছর আগে যখন তৈরি হয়, তখন শহর জুড়ে এত হাই রাইজের রমরমা ছিল না। বারো তলার উপরে এই ছাদ থেকেই বাকি জগৎ একেবারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনে হতো। এখানে জন্ম, এ ছাদে চুকিৎকিত, কুমিরডাঙা, কাবাডি। প্রথম ক্রাশ, প্রথম প্রেমের সাক্ষীও এই ছাদ। আজকে আমার বিয়েটা কিন্ত লাভ ম্যারেজ নয়। পাত্রকে চোখে দেখেছি মোটে দুবার। একবার ভিডিও কল, একবার সামনাসামনি। সামান্য কটা কেজো কথা। আপত্তিকর কিছু নয়, মোহিত হওয়ার মতও নয়। চলনসই গোছের। এই সাকুল্যে দু ঘণ্টারও কম দেখাসাক্ষাতের ভিত্তিতে তার বাবা-মা আর আমার বাবা-মা সবাই মিলে সোৎসাহে ব্যাপারটা পাকা করে ফেললো। পাকা দেখার এক মাসের মাথায় বিয়ে।
ছাদ নিশ্চুপ। সেলফোনে কটা সেলফি তুললাম। হলুদে কালচে লাল জরিপাড় কটন নারায়নপেট শাড়িটা আমার এক তুতো বৌদির বুটিক থেকে নেওয়া। কানে বিশাল বড় রাজস্থানী ঝুমকো। গলার হারছড়া টা অবশ্য সোনার। কপালে ছোট্ট লাল টিপ। মন্দ নয় সাজটা। এত তাড়াহুড়োর মধ্যে বিয়ে বলে সেভাবে শপিং করা হয় নি, মা'র এই আক্ষেপ শুনে শুনে এ কদিনেই কান পচে গেছে। ইস, চুল টা আঁচড়ে নিলে হতো! এই বাড়ির ছাদে এটাই শেষ ছবি বলে কথা! অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি করে আমার প্রায় বর জীমূতবাহন। বৌভাতের আট দিনের মাথায় দুজনের সিডনি যাওয়ার কথা। ভিসা পাসপোর্ট এয়ার টিকিট সব তৈরি, ভি আই পি র দুটো ঢাউস সুটকেসও কেনা হয়ে গেছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীচে তাকাই আমি। রাস্তায় বেশি লোকের চলাচল নেই এখন। বয়স্ক জ্যাঠাকাকাদের একটা দল ফিরছে মর্নিং ওয়াক সেরে। সাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা করে খবরের কাগজওয়ালা, ভ্যানগাড়ি চালিয়ে যায় এক সবজিওয়ালি। রুটিন মেনে গড়িয়ে চলে দিন।
বারো তলার ওপর একটু শীত শীত লাগে আমার। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্তের একদম সামনে দাড়িয়ে আমি! অথচ সব কিছু কি ভীষন শান্ত, নিস্তরঙ্গ! এগারো তলায় ফ্ল্যাটের জানালার ধারে বসে একাগ্রচিত্তে টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়তে পড়তে চা খাচ্ছেন বিচারপতি ললাট লিখন ভট্টাচার্য। সংক্ষেপে এল এল বি। নাম রেখেছিলেন বটে ওঁর মা বাবা! পেশাগত কারণে আসামিদের ললাটলিখন ওঁর হাতে! এক কালে দুঁদে উকিল ছিলেন, তখনও নিশ্চয়ই এল এল বি নাম টা নিয়ে লোকে অল্পবিস্তর আওয়াজ দিয়েছে! নিজের চায়ের কাপপ্লেট হাতে ঘরে ঢোকেন ললাট জেঠুর স্ত্রী বীণাজেঠিমা; রুচিসম্মত সাজগোজের ক্ষেত্রে জেঠিমার জুড়ি মেলা ভার, এখনও তাঁর সুচিন্তিত শাড়িগয়না দেখতেই পাড়াপড়শিরা তাঁকে সব উৎসব অনুষ্ঠানে নেমন্তন্ন করে। তাঁর ঘরে পরার কলমকারি কাফতানটা পর্যন্ত কি অপূর্ব সুন্দর! ধন্যি জেঠিমা! জানালার দিকে পিঠ করে রোদ পোয়াতে পোয়াতে এখনও একসাথে রোজ সকালে চা খান জেঠু জেঠিমা। এক সুন্দর দাম্পত্যের পূর্ণ প্রতিকৃতি। এই প্রজন্মের অজস্র ঠুনকো সম্পর্কের যুগে এই দুজন মানুষকে দেখে প্রেমের উপর আস্থা রাখতে ইচ্ছে করে। এঁদের ভালো রেখো, ঠাকুর!
দশতলার মণিকাকু অবশ্য একদম একা। পঞ্চাশের কোঠায় বয়স, কোনো এক বীমা কোম্পানিতে কাজ করেন আর সেতার বাজান। আজও বসেছেন সেতার নিয়ে। প্রভাতী রেওয়াজ। আমার দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠেন ভুত দেখার মত! সেতার নামিয়ে মোবাইল ফোন তুলে নেন।
ন তলার ফ্ল্যাটটা খালি। চুনকাম, রঙ চলছে। মিস্ত্রীদের আসবার কথা দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ। আগে শান্তনু রা থাকত এ ফ্ল্যাটে। শান্তনুদা র ভাই শান্তশীল আমার সহপাঠী, তবে শান্তনু দা আমার ফার্স্ট ক্রাশ। পাঁচ বছরের বড়। আমি যখন ক্লাশ টেনে, শান্তনু দা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের থার্ড ইয়ারে। তার চোখে ইস্কুলে পড়া সব মেয়েরাই বোধহয় দুধের শিশু। আর আমি তখন রবীন্দ্রসঙ্গীতের মনোযোগী ছাত্রী। ইস্কুলে বাৎসরিক উৎসবের নৃত্যনাট্যে চিত্রাঙ্গদার ভূমিকায় আমার গলা। শান্তনুদা কে মনে মনে ভেবে গাই "অর্জুন! তুমি অর্জুন!" শান্তনু দা র কোনো ধারণাই নেই এ বিষয়ে, অথচ আমি কল্পিত প্রেমের কল্পিত বিরহে শহুরে কোকিলের একটা কুহু কানে এলেই গলা খুলে "রোদন ভরা এ বসন্ত" গাই! ফ্ল্যাটে ওদের লেটার বক্সে লুকিয়ে গোলাপি কাগজে লেখা বেনামী চিঠি ফেলি। হলমার্ক এর থেকে ভ্যালেন্টাইনস ডে র কার্ড কিনে লাল ডট পেনে লিখি, "আমার অর্জুন কে দিলাম" । উইথ লাভ লিখে অতঃপর নিজের নাম লিখি, চিত্রাঙ্গদা। শান্তনুদার হাতে তা পৌঁছয় কিনা জানি না। তবে পত্র প্রেরকের পরিচয় যে সে কোনোদিন জানতে পারে নি সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শান্তনুদা পাকাপাকি ভাবে নিউ ইয়র্কে থাকে এখন। বিয়েও করেছে এক অবাঙালি কলিগকে। ওর মাবাবা ক মাস আগে দিল্লি চলে গেছে ওর ছোট ভাই শান্তশীলের কাছে। এই ফ্ল্যাট বিক্রীর চেষ্টা চলছে। নতুন ওয়াল পেইন্টের গন্ধে ম ম করছে জানালা টা। আমার সঙ্গে প্রেমটা দু তরফা হলে কি শান্তনুদা এখনও এখানে থাকত? "ঠাকুর, ভালো রেখো শান্তনুদা কে।" মনে মনে একটা ছোট্ট প্রার্থনা ঠুকে দিই আমি।
আট তলার ফ্ল্যাট টা আমার সবচেয়ে প্রিয়। মধুবনী আমার ইস্কুলের বন্ধু, কলেজেরও। ছোট বেলা থেকেই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। কৈশোরে একাধারে অনসূয়া প্রিয়ম্বদা। পার্সে পয়সা না থাকলে একটা এগ রোল, একটা পেপসি দুজনে ভাগ করে খেতাম। এই ঘরে কত সময় কাটিয়েছি একসাথে, কত গোপন কথা বলেছি এককালে! গড়পড়তা মেয়েদের তুলনায় লম্বা বলে ওই চিত্রাঙ্গদা নাটকে অর্জুনের ভূমিকায় নাচটা ওর ছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজ বাসন্তী রঙা লেহেঙ্গা পরে চুলে বিনুনি বাঁধছে মধুবনী; আমার গায়েহলুদে ওরও অংশ নেওয়ার কথা, তাই এমন পিতাম্বরী সাজ! ওর মা আমার মা দুজনেই মেয়েদের বিয়ের চিন্তায় মশগুল ছিল। এ যাত্রা আমি জিতে গেলাম ভেবে কি একটু দুঃখ পেয়েছে মধুবনী? ওরও তো দু একটা সম্বন্ধ এসেছে শুনেছি, গুরগাঁও এর এক ডাক্তার ভদ্রলোকের সঙ্গে অনেক দূর এগিয়েছে কথাবার্তা। ওকে খুব সুখী কোরো, ঠাকুর। ওর মত ভালো মেয়েকে ভালো ঘর বর দিও, দু হাত ভরে সুখ দিও!
সাততলাটা থেমে দেখতে মন চায় না। এ বাড়ির লোকগুলো বড় অমিশুকে, লিফটে দেখা হলেও কেউ বড় একটা কথা বলে না। মা বাবা ভাই বোন আর এক শয্যাশায়ী ঠাকুমা কে নিয়ে পরিবার। এরা দক্ষিণ ভারতীয়, শুনেছি আদি নিবাস তামিলনাড়ুর ত্রিচি । বোধহয় ভাষাগত কারণেই এরা ফ্ল্যাটশুদ্ধু লোককে এড়িয়ে চলে। লিফটে দেখা হলেও কেউ চোখাচোখি তে আগ্রহী নয়। বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য টি সাত আট বছরের হবে, সেও পর্যন্ত মূর্তিমান রামগরুড়ের ছানা!
ছ তলার ফ্ল্যাটটা একবছর হলো সিল হয়ে আছে। অসিত ঘোষাল নামে এক ভদ্রলোক থাকতেন ক বছর, একবার ছুটিতে গেছিলেন কুলু মানালি, অন্তত উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীরা তাই জানত, সে সময়ে পুলিশ এসে এ বাড়িতে নাকি ড্রাগস খুঁজে পায়। সেই থেকে ফ্ল্যাট সিল হয়ে আছে। অসিত ঘোষালও ফিরে আসেন নি। কে জানে কোথায় আছেন, দিব্যি টাকমাথা চশমা পরা সৌম্যদর্শন মানুষ, কারুর সাতে পাঁচে থাকতেন না, আবাসনী তে কোনো নেমন্তন্ন বাড়ি না গেলেও চোখে চোখ পড়লে সৌজন্যের হাসি হাসতেন, তাঁকে দেখে ভুলেও ড্রাগ ডিলার মনে হয় নি কারুর। কিসে যে মানুষের দুর্মতি হয়!
এইবার পাঁচতলা। আমার প্রাণপিঞ্জর। এর কথা কি বলি, কত ভাবে বলি! জানালার ধারে সন্দীপনের মেহগনি কাঠের স্টাডি টেবিল, ওপাশে দামী খাট। এলোমেলো চাদর বালিশ গুছিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে ওদের বাড়ির পুরোনো কাজের লোক দীপামাসী। তবে সন্দীপনকে দেখতে পাই না। গত তিন বছর যাকে আপ্রাণ ভালোবেসেছি, তাকে বোধহয় শেষবারের মত না দেখেই চলে যেতে হবে। আমার মা বাবার একটুও পছন্দ হয় নি সন্দীপনকে। কাজেই ওদের পরিবারও আমার বিয়েতে নিমন্ত্রিত নয়। অবশ্য শেষের দিকে যা কুৎসিত স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল পরিস্থিতি, তাতে নেমন্তন্ন করলেও বোধহয় কেউ আসত না। কত অভিযোগ মায়ের! সন্দীপন শুধু লককা পায়রার মত সুন্দর ফুলবাবু সেজে ঘুরে বেড়ায়! ওর মা বাবা ভালো ভালো প্রাইভেট ফার্মে কাজ করেন, নিষ্কর্মা সন্দীপন দু হাতে সেই পয়সা ওড়ায়! তাও যদি নিজের চাকরি বাকরি থাকত! পরনে সর্বদা দামী ফরমাল শার্ট প্যান্ট, কিংবা দামী কুর্তা জিন্স। মনিবন্ধে ব্র্যান্ডেড ঘড়ি, পায়ে নাইকের কাস্টোমাইজ করা স্নিকার্স, তাকে ঘিরে বিদেশি কোলনের সৌরভ। ওর মা বিদেশ থেকে এনে দেন। বেকার মানুষের এত দামী দামী শখ কিসের? এদিকে নিজের হাতখরচের অঢেল পয়সা,অথচ আমরা রেস্টুরেন্ট গেলে তার বিল গুলো পর্যন্ত আমাকে দিতে হয়, গানের টিউশন এর মাস মাইনে থেকে! ছ ফুট লম্বা সন্দীপনের মা বাবা যতই ভালো চাকরি করুক, পঁচিশ বছর বয়সের কাঠবেকার খরুচে ছেলেকে কন্যা সম্প্রদান করা নাকি মেয়েকে হাত পা বেঁধে জলে ফেলার সামিল! এমন নয় যে চাকরি খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ হয়েছে। কলেজে পাস কোর্সে বি কম পড়তে পড়তে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া, সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে টিভি তে স্পোর্টস্ চ্যানেল দেখে দিন কাটানো একটা অলস উদ্যোগহীন যুবক। রূপ সর্বস্ব, এক ছিটেও গুণ দেখতে পায় না মা ওর মধ্যে। বলা বাহুল্য, আমার দেখা, মায়ের দেখা এক নয়। আমি দেখি মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ডেভিডের মত সুঠাম, সুদর্শন এক পুরুষকে। সেই গ্রীক দেবতার মত হ্যান্ডসাম মানুষের বাহুবন্ধনের চেয়ে বেশি কিছু চাই না বিবাহিত জীবনে। আমি এম এ পাশ, লেখাপড়ায় মন্দ নই, একটা ভদ্রগোছের চাকরি জুটিয়ে নেওয়ার যোগ্যতা আমার আছে। দরকার হলে গানের পাশাপাশি ইংরেজির টিউশন খুলতে পারি। কত চাকরিওয়ালা বরই তো চাকুরিহীন হোমমেকার বউ বিয়ে করে, আমি না হয় হোমমেকার বরের চাকরিওয়ালা বউ হতাম! সন্দীপনের গাঢ় নীল চোখের, ফর্সা ক্লিনশেভেন গালের, গোলাপী ঠোটের আবেদনে ডুবে থাকতাম আজীবন! হলো না, কিছুই হলো না! সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলই ফুরায়ে যায় মা! মা র মতে, অনেক ভালো ভাবে পাত্রস্থ করা হচ্ছে আমায়! পছন্দের কি ছিরি! জিমূতবাহনের রং বেশ চাপা। ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ি, দেখেই মনে হয়, থুতনির কোনো খুঁত ঢাকতে দাড়ি রাখা। চোখে বিশ্রী একটা নীলফ্রেমের চশমা, ডানচোখের পাশে দু একটা পক্সের দাগ। সাধারণ, বড় বিরক্তিকর রকমের সাধারণ দেখতে জিমূতবাহন। কথা বলতে বলতে ঘন ঘন সেলফোন দেখে। এক দিন মাত্র সামনাসামনি দেখা, সেজেগুজে আসার প্রয়োজনও মনে করে নি! কমলারঙের ফুলছাপ হাওয়াই শার্ট আর স্যান্ডেল! ভাবী বউএর সঙ্গে প্রথম বার দেখা করার সময়ে কেউ এমন জামা পরে আসে? হবি নাকি ইংরেজি থ্রিলার পড়া, প্রাইম নেটফ্লিক্স হুলু তে ক্রাইম সিরিজ দেখা। অনাগত ভবিষ্যতে ক্রিমিনালে পরিণত হওয়ার সমস্ত উপাদান মজুত! অস্ট্রেলিয়ার মত অদ্ভুত একটা জায়গায় থাকে। ক্যাঙ্গারু কোয়ালা এমু পাখির মত অদ্ভুতুড়ে প্রাণীর দেশ! সন্দীপনের সঙ্গে সংসার পাতার স্বপ্ন দেখার পর এমন একটা উৎকট একটা মানুষকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করে কখনো? সন্দীপন, সন্দীপন....তেইশ বছরের জীবনে এত প্রবল ভাবে কোনো কিছুই চাই নি, যে ভাবে চেয়েছি সন্দীপনকে! অথচ মা বাবা সে সম্পর্ক ভেঙে দিল। সন্দীপনের মা সোনিয়া আন্টির সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল আমার মা, অবশ্য সেটা সম্পর্ক জুড়তে না ভাঙতে, সেটা নিয়ে মা মুখ খুলতে চায় নি। আমায় বলেছিল, সোনিয়া আন্টি নাকি বলেছিলেন, সন্দীপন আমার সঙ্গে নেহাত ভদ্রতাবশত গল্পগুজব করে, বিয়ে জাতীয় কোনো উদ্দেশ্য তার নেই, এসব নাকি আমার মনের ভুল! আমি জানি, এগুলো মা বানিয়ে বানিয়ে বলেছে, সোনিয়া আন্টি আমায় যথেষ্ট স্নেহ করেন, গেলে সর্বদা ভালো ফ্রুট জুস , কেক পেস্ট্রি, বিদেশী কুকি খাওয়ান, আমার মধ্যে সম্ভাব্য পুত্রবধূ কে না দেখলে কখনো এভাবে আদরযত্ন করতেন? আর গল্পগুজব? আমাদের সম্পর্ক তো গল্পগুজবের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই, এই বেডরুমেই তো বেশ ক বার... তা যাক গিয়ে! গতকাল অনেকক্ষণ সময় নিয়ে চিঠি লিখেছি সন্দীপনকে। বিয়েতে আসার কোনো উদ্দেশ্য না থাকলেও টেক্সট করে একটা শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিল আমায় কাল রাতে। এটাও কি নিছক ভদ্রতা বশত পাঠানো টেক্সট, সন্দীপন? হৃদয়ে পাথর রেখে কোনক্রমে অচেনা একটা লোক কে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, নিরাবেগ ভাবেই পছন্দ করছিলাম বিয়ের কার্ড, মেহেন্দি র ডিজাইন, ফুলশয্যার শাড়ি! বেশ সামলে উঠেছিলাম তোমায় না পাওয়ার ধাক্কাটা, কেন পাঠালে ওই কেজো শুভেচ্ছাটুকু? তোমার নামটা নিজের ফোনে ভেসে না ওঠা পর্যন্ত দিব্যি স্বাভাবিক বিয়ের কনের মতোই মনে হচ্ছিল নিজেকে! নাহ, আজ সকালে আর এতটুকুও রাগ বা অভিমান হচ্ছে না আমার। শত যন্ত্রণায় ওর অমঙ্গল চাই নি, আজও তা চাইবো না। ঠাকুর আমার সন্দীপনের মঙ্গল করুন। কিন্তু ঠাকুর, একদিন না একদিন যেন সন্দীপনের বোধোদয় হয়! যেন বুঝতে পারে, আমার মত করে ভালোবাসতে, আমার মত ত্যাগ স্বীকার করতে কম মেয়েই পারে!
চারতলার ফ্ল্যাটটা পার হই এবার। দেবারতিদের ফ্ল্যাট। পাঁচ মাস আগে চন্ডিগড় থেকে সপরিবারে বদলি হয়ে এসেছে এরা। আমার সঙ্গে সন্দীপনের সম্পর্কে শেষ পেরেকটা দেবারতিই ঠুকে দেয়! আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট ই হবে মেয়েটা, অ্যাস্পায়ারিং মডেল, ফিগার, ত্বক, চুল সব সেভাবেই তৈরি করেছে দেবারতি। এতদিন বাংলার বাইরে থাকার ফলে জঘন্য বাংলা বলে, তবে ইংরেজিতে বেশ চৌকস! শর্টস, ট্যাঙ্ক টপ মিনিস্কার্ট অক্লেশে ক্যারি করতে পারে। মুনিঋষিদেরও তো মতিভ্রম হয়, আমার সন্দীপনও তো দোষে গুণে মানুষ! দেবারতিকে দেখার পর কেমন করে যেন আস্তে আস্তে আমায় কাটিয়ে দিলো! বলল, আন্টি নাকি সত্যি কথাই বলেছেন আমার মা কে। আমার সঙ্গে এটা নাকি সাময়িক " ফ্লিং", কোনো দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের সূচনা নয়। এসব কি শুধু দেবারতির নেশায় মজে আমায় বলেছিলে, সন্দীপন? শোয়ার ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে একমনে ফোনে খুটখাট করছে দেবারতি, একবারও মুখ তুলে তাকালো না আমার দিকে। দেবারতি মেয়েটা অসম্ভব আত্মকেন্দ্রিক। দেবারতি জাত ছেলেধরা! দেবারতি ডাইনী! দেবারতির যেন সর্বনাশ হয়! এইটুকু মুখ রেখো, ঠাকুর, দেবারতিকে কোনোদিন সুখী করো না! ওকে যেন ভুলেও কেউ কোনোদিন ভালো না বাসে। যে আমায় এমন কষ্ট দিয়েছে, তার যেন সবরকমের সর্বনাশ হয়!
তিনতলায় পরের ফ্ল্যাটখানা আমাদের। আমার বিবাহ উৎসবের সব আয়োজন সম্পূর্ণ। আমার খাট জুড়ে শাড়ি গয়না কসমেটিকস। বিয়ের মুকুট। রঙীন সেলোফেন মোড়া থালায় তত্ত্বের শাড়ি। শাশুড়ির কাঞ্চিভরম, ননদের বালুচরী, আমার জন্য থরে থরে বেনারসি, সম্বলপুরী, ওয়ালকলম! অশেষ আনন্দের আয়োজন, সব আমায় ঘিরে! গোলাপ রজনীগন্ধা মিশিয়ে স্পেশাল মালা বদল এর মালা অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ভোজ ক্যাটারারের স্পেশাল মেনু, আমার ফেভারিট গলদা চিংড়িও আছে। মা আনন্দে আটখানা হয়ে দধিমঙ্গলের থালা সাজাচ্ছে, মেজমাসী ব্রেকফাস্টে সবার জন্য নিজের সিগনেচার রাধাবল্লভী বানাচ্ছে, কি দারুন তার গন্ধ! ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব সবাই আজ আসবে সেজেগুজে আমার এই বিবাহ উৎসবে, জমিয়ে আড্ডা হবে, পেশাদার ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলবে! অস্ট্রেলিয়া কি সত্যি খারাপ জায়গা? জীমূতবাহন কি সত্যি পাতে দেওয়ার অযোগ্য? হঠাৎ করে কেন আবার এই তেমন পছন্দ না হওয়া মানুষটার হাত ধরে মন হাঁটতে চাইছে প্রশান্ত মহাসাগরের সৈকতে? দেখতে চাইছে বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল দ্বীপ? সিডনি অপেরা হাউস দেখতে নিয়ে যাবে বলেছিল জীমূতবাহন…
ঠাকুর…একবার..মাত্র আর একবারের মত ফিরে যাওয়া যায় না আমাদের উৎসবমুখর ফ্ল্যাটে? সিদ্ধান্ত বদলানো যায় না এখনও? আটকানো যায় না মাধ্যাকর্ষণকে? ঠাকুর, বিয়েবাড়িটা ফিরিয়ে দিতে পারো না? আর কোনোদিন কারুর খারাপ চাইবো না ঠাকুর, ছাদের আলসেতে ফেলে রেখে আসা ফোন থেকে মা,বাবা, সন্দীপন আর মধুবনী কে পাঠানো সুইসাইড টেক্সটগুলো ডিলিট করে দেবো ঠাকুর, শুধু সময়কে থামিয়ে দাও! সন্দীপনের চোখে প্রেয়সী-শ্রেষ্ঠা হওয়ার জন্য মরতে চাওয়ার সাধ ফুরিয়ে গেছে ঠাকুর, আমি এবার অচেনা ওই জীমূতবাহনের হাত ধরার জন্য বাঁচতে চাই! আমার নিজের অজানা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতটুকুর জন্য বাঁচতে চাই!
দোতলার ফ্ল্যাটে যেন কারা থাকে? মনে পড়ছে না, গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু! শুধু অদম্য একটা বাঁচবার ইচ্ছা ছাড়া কোনো বোধ কাজ করছে না আমার!
একতলার সার্ভেন্ট কোয়ার্টার থেকে চিৎকার করতে করতে ছুটে বেরিয়ে আসে ওয়াচম্যান পদ্মনাভ। একটা অসহায় শেষ চিৎকার বেরিয়ে আসে আমার গলা দিয়েও! গেটের মুখে ছন্দবাণী অ্যাপার্টমেন্ট এর সদ্য রঙ করা সাইনবোর্ডটা দেখতে দেখতে সিমেন্ট এর শক্ত পেভমেন্টটার ওপর আছড়ে পড়ি আমি। সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। শরীর হাড়গোড় করোটি ; পাওয়া না পাওয়া সমস্ত স্বপ্নসম্ভার! পেভমেন্টের ওপর ফিনকি দিয়ে ছোটে আমার রক্তস্রোত। তারপর সব গাঢ় অন্ধকার।