• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share
  • কিশোর মনস্তত্ত্বে দেশভাগের দলিল: শঙ্খ ঘোষের ট্রিলজি : সম্প্রীতি মিত্র

    ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ স্বাধীনতার পাশে বিরাজমান একটি স্থায়ী প্রশ্নচিহ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলো ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২রা সেপ্টেম্বর। এসময় যুদ্ধ বিধ্বস্ত ব্রিটেন ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে। লর্ড পেথিক লরেন, স্যার স্টাফোর্ড ক্রীপস, ও মি: এ. ডি আলেকজান্ডার — এই তিনজন সদস্যকে নিয়ে একটি ক্যাবিনেট গঠন করে ভারতে পাঠানো হয়। ১৬ই মে ১৯৪৬ -এ জানানো হয় দাবী অনুযায়ী ‘পাকিস্তান’ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাচ্ছে না ক্যাবিনেট, তাঁরা চান অখন্ড ভারতের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে। এই ক্ষমতা অর্পণের সিদ্ধান্তই ইতিহাসে ‘ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান’ নামে খ্যাত। এই মিশন অনুসারে ভারতীয় প্রদেশগুলিকে ‘এ’, “বি”, “সি” এই তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। অমুসলিম প্রধান প্রদেশগুলিকে রাখা হয় ‘এ’ অংশে, ‘বি’ অংশের অন্তর্ভুক্ত করা হয় মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলি এবং ‘সি’ অংশে বাংলা ও আসামকে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ‘সি’ অংশে বাংলা ও আসামকে একত্রিত করে রাখলে মুসলিম ধর্মের মানুষের সংখ্যা সামান্য বেশি হয়ে যেতে পারে, তাই হিন্দুগরিষ্ঠ আসামের জাতীয় কংগ্রেস এ গ্রুপিং মানতে রাজি হল না। জাতীয় কংগ্রেস প্রস্তাব দিল প্রদেশগুলির নিজেদের ইচ্ছে অনুসারে গ্রুপিং থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সংস্থান রাখা হোক। কিন্তু মুসলিম লিগ এ-ব্যাপারে একেবারেই সহমত পোষণ করল না। দুর্ভাগ্যবশত ব্রিটিশ সরকারের অভিমত মুসলিম লিগের পক্ষে যায়। ফলে ‘কাবিনেট মিশন প্ল্যান’ বাতিল হল। ‘ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান’ বাতিল হলে ব্রিটিশ সরকার নিশ্চিত হয়ে যায় যে ভারতের বিভাজন কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না। এই ঘটনার পরে গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় নিযুক্ত হন লর্ড লুই মাউন্টব্যান্টন। ভারতে আসার আগেই ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেন ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। ১৯৪৭-এর মার্চ মাসে মাউন্টব্যাটন ভারতে এসে পৌঁছন। মাউন্টব্যাটন ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ‘প্ল্যান বলকান’ নামে একটি প্রস্তাব রাখেন। ইউরোপের বলকান প্রদেশগুলির মতোই এখানে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মাউন্টব্যাটেনের আগে লর্ড ওয়াভেলও এমন একটি পরিকল্পনা করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘অপারেশন ব্রেকডাউন’। ভারত বিভাজনকে ব্রিটিশ সরকার সমর্থন করে না — এমন একটা ধারণা তৈরী করার উদ্দেশ্যেই এই দুটি প্রস্তাবের উত্থাপন করা হয়। জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়ই এই প্রস্তাব দুটি বাতিল করে দেয়। এরপরের ইতিহাস ক্ষিপ্র গতিতে এক অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলে। ধূর্ত মাউন্টব্যাটেন বোঝেন, ভারতভাগকে নিয়ে জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় দলের নেতৃত্বদের মধ্যে এক দীর্ঘ টানাপোড়েন চলছে, ফলে উভয়েরই ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটছে। মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেসকে কমনওয়েলথে থাকার প্রস্তাব দেন এবং এর ফলশ্রুতি হিসাবেই ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনাকে ১০ মাস এগিয়ে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগষ্ট করা হয়। সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ডোমেনিয়নের।

    (২)

    এত রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, ঐতিহাসিক জটিলতার প্রেক্ষাপটে শিশু মনের গতিবিধির দলিল বাংলা সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়। শঙ্খ ঘোষের ট্রিলজি “সকালবেলার আলো” (১৯৭২ খ্রিঃ), “সুপুরিবনের সারি” (১৯৯০ খ্রিঃ) ও “শহরপথের ধুলো” (২০১০ খ্রিঃ) এই তিনটি উপন্যাসে আমরা কেন্দ্রিয় চরিত্র নীলু তথা নীলমাধবকে দেখতে পাই। “সকালবেলার আলো”–তে যখন নীলুর সঙ্গে পাঠকের সাক্ষাৎ হয় তখন নীলু সবে স্কুল পড়ুয়া, দেশভাগের মাত্র ২৫ বছর পরে প্রকাশিত হচ্ছে এই উপন্যাস কিন্তু লক্ষণীয় লেখক উপন্যাসের মূলখন্ডের পূর্বকথনে বলেছেন — ‘অনেকদিন আগে, দুই বাংলা যখন এক ছিল, এ হল সেই সময়কার গল্প’। যেন ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমির তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে খুঁজে আনা কোনো রূপকথার গল্পের নামান্তর। নীলমাধবের মধ্যে যেন লেখক সচেতন ভাবে এঁকে দিচ্ছেন এক সরল, স্বচ্ছ ছেলেবেলার ইঙ্গিত। প্রথম উপন্যাসটিতে নীলুর জীবনের উপাদানে কোথাও যেন উঁকি দিয়ে যায় লেখকের নিজস্ব নস্টালজিয়া।

    “আমার ছিল পদ্মায় ভোর, বৈঁচিবনের বিকেল।
    তুমি কি আর সেসব কিছু পাও!
    …..
    আমার ছিল বর্ষা অঝোর বৃষ্টি পড়ার দিনে
    মাঠের মধ্যে ভিজে যাওয়ার সুখ
    আমার ছিল নৌকা থেকে জোড়া ইলিশ কিনে
    মায়ের মুখে জোগানো কৌতুক।”
                                                    [‘সংঘাত’/ ‘বড়ো হওয়া খুব ভুল’/ শঙ্খ ঘোষ]
    পদ্মানদীর তীরে একটা ছোট কলোনিতে নীলুর বাড়ি। তার শৈশব, কৈশোর, রোমাঞ্চ, অ্যাডভেঞ্চার, হতাশা, একাকিত্ব সমস্তই পদ্মাকে ঘিরে আবর্তিত। শঙ্খ ঘোষের জীবন ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বরিশালের বানারীপাড়ায় (বর্তমান বাংলাদেশে) তাঁর পৈতৃক বাড়ি। এই বানারীপাড়া ছুঁয়ে বয়ে গেছে ‘সন্ধ্যানদী’। বিচ্ছেদের কাঁটাতার মনে নিয়েই ভারতে এসেছিলেন কবি। ১৯৯৭ খ্রিঃ আবার ফিরে যান বরিশাল দর্শনে — “পঞ্চাশ, ঠিক পঞ্চাশ বছর পর চলেছি নিজের গ্রামে।... থামল গাড়ি নদীর ঠিক সামনে... সঙ্গীদের পিছনে রেখে ছুটে যাই জলের একেবারে সামনে। সকালবেলার আলোয় ঝলমল করছে সন্ধ্যা নদীর জল।” [“সন্ধ্যা নদীর জলে” : শঙ্খ ঘোষ ]

    এই আলোর আভাই অতি যত্নে লেখক ছড়িয়ে দিয়েছেন নীলমাধবের পদ্মা তীরের জীবনের ক্যানভাসে। দেশভাগের আসন্ন সংকেতের ম্রিয়মান সুর বা খানিকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস থাকলেও সরাসরিভাবে রাজনৈতিক বা সামাজিক সাম্প্রদায়িকতার জটিলতা এখানে চোখে পড়ে না। বরং পরবর্তী দুটি উপন্যাসের ভিত্তিভূমি হিসেবে কাজ করে এই উপন্যাসটি। পাঠক চিনে নিতে পারেন নীলুর চারিত্রিক গঠন, হদিশ পান তার ভাবুক ও সংবেদনশীল মনের।

    (৩)

    প্রথম উপন্যাসটির ১৮ বছর পরে লেখা “সুপুরিবনের সারি” উপন্যাসে প্রথম থেকেই দেশভাগের আসন্ন আতঙ্ক প্রকট। শুরুতেই দেখা যায় স্টিমারে একা বড়োদের সঙ্গে মামা বাড়ির দুর্গাপুজোয় যাচ্ছে নীলু। লেখক জানান —

    “যাবে না কেউ এবার, কেন না দেশ নাকি এবার ভাগ হয়ে গেছে। নীলুদের গ্রামটা না কি এখন অন্য একটা দেশ।.... বড়োমামাদের কথা শুনে বুঝে নিয়েছে নীলু, এবার তারা দেশে যাচ্ছে, আর কোনোদিন দেশে না যাবার জন্য।” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/ পৃঃ ৪]

    তাই শুরু থেকেই নীলুর মনে এক বিষাদের সুর বাজতে থাকে। নীলুর মধ্যে আলাদা করে কেউ রাজনৈতিক আদর্শ বপন করে দেয় না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ কিশোর সে, তবে সংবেদনশীল বলেই তার কিছু আত্মকথন আছে। নীলু বোঝে না এতদিন যে জায়গাটা ওদের গ্রাম ছিল, কীভাবে সেটা হঠাৎ করে অন্য একটা দেশ হয়ে যাবে। নীলুর মনে পড়ে যায় অনেকদিন আগে মামাবাড়ির পথে এমনই এক স্টিমার যাত্রার কথা, সেদিন একটা লোক মাঝরাতে তাদের স্টিমারে উঠে আসে, তাকে ধাওয়া করে আসে একদল কালো চামড়ার পুলিশ। স্টিমারে ডাকাত পড়েছে ভেবে নীলু ও বাকি ছোটরা ভারী উত্তেজিত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষ রাজনীতি নীলুর সত্তার অংশ না হলেও মায়ের শান্ত, গম্ভীর স্বর তাকে শিখিয়ে দেয় — “ওরা ডাকাত না, … ওরা দেশের কাজ করে। স্বাধীনতা সংগ্রামী ওঁরা, ইংরেজদের সাথে ওঁদের লড়াই, সে তো আমাদেরই জন্য, ওঁরা ভালো লোক।” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ ৭]

    এ কথার পরেই এক জটিল প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি হয় নীলুর শিশুমন — “ওরা তো মা ইংরেজ নয়। ওই যারা তাড়া করছিল, তারা তো সবাই কালো – কালো” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ৭]

    বিস্ময় নেমে আসে তার মনে, সরল হিসেবে মেলে না উত্তর, যাদের জন্য লড়াই, প্রাণপাত, সেই দেশের লোকই তো ওদের মারছে, বোঝা যায় সাধারণ বাল্যকালকেও ঘিরে ধরছে, সময়ের ক্রূঢ়তা। এবারে স্টিমারে যেতে যেতে তাই নীলুর কিশোর মন অনুভব করে, কারোরই মন ভালো নেই, সকলেরই মনে কেমন যেন একটা “ভয় ভয় ভাব”।

    লেখকের বাংলাদেশে ছেলেবেলা-যাপনের এক বিরাট অংশের স্মৃতির নির্যাস দিয়ে সাজানো এই ট্রিলজিটি, তাই হুলার হাট থেকে নদী পথে নৌকায় করে মামাবাড়ি যাওয়ার পথে নীলুকে পেরিয়ে যেতে হয় একটি খাল, নীলুর মনে হয় — “এ খাল যেন একেবারে তাদেরই খাল, এক্কেবারে তাদের নিজেদের। খালটুকু দিয়ে যেতে যেতে মাটিতে পা দেওয়ার আগেই, গোটা গ্রামের ঘর-গেরস্তালিকে যেন ছুতে পায় ওরা, শাপলা-শালুক জলকাদা আর বুনো আগাছার গন্ধে।” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ১৭]

    কবির বরিশাল নিয়ে স্মৃতিকথাতেও উঠে আসে বাণারিপাড়ার সন্ধ্যানদীর কথা, কবি লেখেন — “এই নদী অনেক আত্মীয় নদী, এর কোনো উল্লাস নেই, পঞ্চাশবছর জুড়ে একই জায়গায় স্থির থাকতে পারে এর তীর” [“সন্ধ্যানদীর জলে”- শঙ্খ ঘোষ]

    নীলুর দাদুর খুব আদরের আব্দুল ঘরামি। তার ছেলে হারুন নীলুর প্রিয় বন্ধু। সেই হারুনের সঙ্গেই পুজোর মন্ডপে খেলতে দেখে খুব রেগে যায় মেজমামী, বলে — “ছি! ছি! ছি! জাতধম্মো আর রইল না কিছু। নাম্, নাম্ শিগ্গির, নেমে আয় বলছি।” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ১৩] সরল শিশু মন জাতিভেদ বোঝে না, বিব্রত হয়ে সোনাদিকে প্রশ্ন করে — “হারুনকে ও-রকম বকলো কেন রে মেজমামী?” উত্তর আসে — “ও তো বাঙালি না, ও মুসলমান তো সেইজন্য!” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ১৩]

    এর পরবর্তী কথোপকথন চলে নীলুর মনে সেখানে উঠে আসে তিনটি অত্যন্ত গভীর প্রশ্ন —

    ১) মন্ডপের চালা মেরামত করে যে আব্দুল তারই সন্তান কেন মন্ডপের বারান্দায় বসার অধিকার পেল না?

    ২) ঈদের দাওয়াত খেতে তো নীলুও গিয়েছিল হারুনদের বাড়ি, কই আব্দুল তো বকেনি তাকে, নেমে বসতে বলেনি!

    ৩) হারুন মুসলমান বলে সে বাঙালি নয়? তাহলে বাংলায় কথা বলে কেমন করে?

    স্পৃশ্য অস্পৃশ্যের ভেদাভেদ থেকে আংশিক মুক্তি পেলেও আজও বহুক্ষেত্রে আমরা সহজেই ‘বাঙালি’ শব্দের বিপরীত হিসেবে ব্যবহার করি ‘মুসলমান’ শব্দটিকে, যেন বাংলা ভাষা একচেটিয়া হিন্দু ধর্মের সম্পত্তি। উপন্যাস জুড়ে নীলুর চেতনা প্রবাহের এই প্রশ্নগুলি তীর্যক দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িকতার সামনে এসে দাঁড়ায় মানুষের অচেতন বিবেকের রূপ ধরে এবং প্রশ্ন করে — ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ [‘উলঙ্গ রাজা’- নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী]

    ভাঙনের সুর নীলু স্পষ্ট করে সামগ্রিকভাবে বোঝে না, জীবনের সূচনাপর্বে দাঁড়িয়ে এখন সে স্মৃতির সঞ্চয়ে ব্যস্ত। তবে তার বৃদ্ধ দাদু, যাঁর জীবনের যাবতীয় শিকড় প্রোথিত রয়েছে অধুনা পুব বাংলার এই গ্রামে, তিনি অনাগত বিচ্ছেদকে একেবারে জ্ঞানত উপেক্ষা করে যান। বাজারের পথে মাধব ঘোষের সঙ্গে দেখা হলে কলকাতায় যাওয়া সংক্রান্ত সংকল্পের খবর জানতে চায় সে, দাদু উত্তর দেন—

    - “কেন? দরকার কেন?” -

    - “দরকার না? থাকপে কে আর এহানে?”

                                                     [“সুপুরিববনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/ পৃঃ ৩২]

    এত দিনের যত্নের যাপন ক্রমাগত নিঃস্ব হতে থাকে বৃদ্ধের মনের প্রতিধ্বনি শোনা যায় কবিরই আরেকটি কবিতায়—

    “মুহূর্তের তুড়ি লেগে উড়ে যায় সমূহ সংসার
    কেন না দেশের মূর্তি
    কেন না দেশে মূর্তি দেশের ভিতরে নেই আর।”
                                                     [“আরুণি ও উদ্দালক”/ ‘তুমি তো তেমন গৌরী নও’/শঙ্খ ঘোষ]

    ‘দেশ’ শব্দটা সাধারণ জনজীবনে কখনোই একটি রঙিন মানচিত্রের প্রতিরূপ ধরে আসে না। দেশ মানে একটা সমাজ এবং তার সামাজিক যাপন। ভারত ও পাকিস্তান নামে দুই মানচিত্রের জন্ম সার্বিকভাবে সেই যাপনকে আঘাত করে, তাই অষ্টমীর দিন ঠাকুর দেখতে বেরোলে দিদিমাকে শুনতে হয়, ‘যাচ্ছ যে, আটখানা প্রতিমা খুঁজে পাবে তো এবার?’ প্রতিবার ঠাকুর দেখার সঙ্গী যে ফতেমা, আব্দুলের বউ, এবার তার দেখা মেলে না। এমনকী হারুণও এবছর নীলুর সঙ্গে দেখা করতে আসেনি একবারও। নীলুর মনে পড়ে যায় একবছর আগে হারুণের সঙ্গে কথোপকথনের এক মুহূর্ত। শিউলি আর পদ্মের মিশে যাওয়া সুবাসের মাঝে, ‘কবুতর’-এর ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে হারুণ তাকে বলেছিল –

    “এইসব একদিন আমাগো হইয়া যাইবে।

    মানে?

    কায়েদ আজম কইছে, এই সব আমরাই পামু।

    তোরা? তোরা মানে? কারা তোরা?

    আমরা মানে মোছলমানেরা।

    বলল কে তোকে?

    আমার এক চাচায় থাকে বইশ্শালে, হেই চাচায় কইছে, কইছে যে এইসব আমাগো, সব, সব—”

                                                     [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ৫০]

    আশঙ্কা ঘনিয়ে আসে নীলুর মনে,— “আচ্ছা, হারুণ যে তবে এল না এবার, একবারও। সে কি এইজন্যে? সব কিছুতেই এবার ‘আমরা’ আর ‘ওরা’ হয়ে গেছে বলে?” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ পৃঃ ৫১]

    উপন্যাসের পরবর্তী পর্যায়ে দেখা যায় এ আশঙ্কা অমূলক নয়। নীলু দেখা করতে গেলে হারুণ তাকে সাফ জানিয়ে দেয় — “অ্যা তো আর তোগো দ্যাশ না, তোরা তো অ্যাহোন অইন্য দ্যাশের লোক।” [“সুপুরিবনের সারি”/ অরুণা প্রকাশনী/পৃঃ ৫৯]

    নীলু চমকে যায়, বড়োদের মতো করে কথা বলছে হারুণও। শৈশবের সহজ সম্পর্কে এসে থাবা বসায় কূটনীতির কাঁটাতার। সাম্প্রদায়িকতার কবলে পড়ে মাথা নত করে শৈশব। মানচিত্র নয়, মাটি নয়, নদী নয়, এ সবের তলে তলে ভাঙন চলছে আরও বড়, আরও গভীর কোনো কিছুর। বন্ধু নয়, হারুণরা নীলুদের চিনে নিচ্ছে, জাতি, গোত্র, ধর্মের পরিচয়ে। আর বিপরীতে, শৈবালের মতন স্রোতে ছিন্ন হয়ে ভেসে যেতে যেতে কী বা উত্তর দিতে পারে নীলু ....নীলমাধব?

    “কেন চাও আত্মপরিচয়?
    কোথায় আমার দেশ কোন স্থিতি মৃত্তিকার কুল
    কোন চোখে চোখ রেখে বুকের আকাশ ভরে মেঘে
    দেশ দেশান্তর কাল কালান্তর কোথায় আমার ঘর
    তুমি চাও গোত্র পরিচয়!”
                                                     (‘জাবাল সত্যকাম’ / ‘তুমি তো তেমন গৌরী নও’/ শঙ্খ ঘোষ)

    দেশভাগের সত্যটাকে আত্মস্থ করতে পারে না দাদু। সন্তানরা বাসস্থান বদলের প্রস্তাব দিলে বলেন, “অদ্ভুত কথা। নিজের দেশটা কি রাতারাতি অন্যের দেশ হয়ে যায় না কি? হতে পারে কখনো?” [“সুপুরিবনের সারি” / অরুণা প্রকাশনী/ পৃঃ ৬৮]

    সমগ্রজীবনের স্মৃতির বোঝা ঘন হয়ে নামে তাঁর মনে। কাছারির পিছনের সুপুরিগাছের সারি, একটা একটা করে তাঁর নিজের হাতে লাগানো। আম কাঁঠালগুলি তো পরম আত্মীয়। দিনান্তে তাদের স্পর্শ না করলে দিনটাই তো সম্পূর্ণ হয় না। পাঁজরের সঙ্গে মিশে থাকা এ গ্রামের অস্তিত্ব, এ সব ছেড়ে কোন অনিশ্চিতের পথে পাড়ি দিতে পারেন তিনি! —

    “পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, রক্তে জল ছলছল করে
    নৌকোর গলুই ভেঙে উঠে আসে কৃষ্ণা প্রতিপদ
    জলজ গুল্মের ভারে ভরে আছে সমস্ত শরীর
    আমার অতীত নেই, ভবিষ্যতও নেই কোনোখানে।
                                                     [“পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ” / শঙ্খ ঘোষ]
    অতীত ও ভবিষ্যতের অস্তিত্বের সংকটে দাঁড়িয়ে একটা গোটা জাতি। উপন্যাসে যার প্রতিনিধি নীলু ও তার পরিবার। তাই এ বারের বিজয়া দশমীর বিদায়ের সুর যেন কেবলমাত্র আর ধর্মীয় বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকে না, ব্যক্তি, ধর্মকে ছাপিয়ে তা শুনিয়ে যায় আরও বৃহৎ কোনো আসন্ন বিচ্ছেদের বিষণ্ণ ধ্বনি। দশমীর বরণের সময় নীলু যেন দেখতে পায়, ভগবতীর চোখের ঢাল বেয়ে একটা চকচকে ভাব। দ্বাদশীর দিনে চলে যাবে নীলুরা। ‘যাত্রা’-র সময় হয়ে আসে, মাঝের ঘরে আসন বিছানো আছে, সেখানেই সম্পন্ন হবে এসব আচার। বড়োদের সকলকে একে একে প্রণাম সেরে নিয়ে প্রতিবারের মতোই আমের পল্লব বসানো সিঁদুর মাখানো ঘটের সামনে মাথা নোয়ায় নীলু। এখন টলটলে জলে নিজেরই মুখের প্রতিচ্ছবি দেখে মনে মনে বলার পালা “আবার আসব”। তবে নীলুর সমস্ত সত্তা জানে এ মিথ্যাভাষণ, তাই – “আবার আসব” – মনে মনে বলতে গিয়েও কথাটা আটকে যায় নীলুর। সত্যি তো নয় সেটা। ঠিক হবে কি বলা?” [“সুপুরিবনের সারি” / অরুণা প্রকাশনী/ পৃঃ ৮৫]

    এখানেই দেশভাগের সবচেয়ে বিধ্বংসী দিক। অসচেতন সরল প্রবাহের শৈশবকেও তা টেনে এনে দাঁড় করায় নগ্ন বাস্তবের দোরগোড়ায়। চিরবিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে দিদিমা, কোঁচার খুঁট সামলে পিছন পিছন এগিয়ে আসে দাদু। লক্ষণীয় এ বিদায় যাত্রায় নীলুদের নৌকার মাঝি ‘রহমত’। নৌকো যেখানে খাল থেকে বাঁক নিয়ে নদীতে পড়বে সেখানে দেখা যায় হারুণকে। সবুজ রুমাল উড়িয়ে নীলুকে ডাকে — “এই যে আমি, নীলাই, এই যে রে! আসিস কিন্তু আবার, সামনের বার। আসবি তো? কী রে, আসবি তো? আসিস আবার। আসবি?”...... [“সুপুরিবনের সারি” / অরুণা প্রকাশনী/ পৃঃ ৮৭]

    লেখক এভাবেই পাঠকের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরেন বৈপরীত্য, এভাবেই মিলিয়ে দেন সম্প্রীতির হদিশ। হারুণের প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না নীলু, দিতে পারে না, শুধু নীরবে হারুণের চোখে চোখ রাখে। বড়োমামা বলে ওঠে – “ওই দেখ, শুরু হলো বড়ো সুপুরিবনটা। জানিস তো ওই পর্যন্তই হলো আমাদের গ্রামের সীমা। ব্যাস তারপর শেষ ...” [“সুপুরিবনের সারি” / অরুণা প্রকাশনী/ পৃঃ ৮৭]

    নীলু অনুভব করে শুধু গ্রাম নয়, তার শৈশবের স্মৃতির সীমানা এতদূর এসে “শেষ” হলো এবার। এই চিরবিদায়ের, বিচ্ছেদের সামনে নত হয় তার হৃদয়। প্রণাম জানিয়ে যায় সে এ গ্রামের সমস্ত সত্তাকে —

    “তবে যাই
    যাই মন্ডপের পাশে ফুলতোলা ভোরবেলা যাই
    খাল ছেড়ে পায়ে পায়ে উঠে আসা আলো
    যাই উদাসীন দেহে গুরু গুরু বোধনের ধ্বনি
    যাই সনাতন বলিদান
    কপালে দীঘল ভালো পূজার প্রণাম
    যাই মুখঢাকা জবা চত্বর অঙ্গন বনময়
    যাই ছায়াময় ভিড়ে মহানিশি আরতির ধোঁয়া
    দোলে স্মৃতি দোলে দেশ দোলে ধুনুচির অন্ধকার
    মঠের কিনার ঘিরে কেঁপে ওঠা বনবাসী হাওয়া
    যাই্ পিতৃপুরুষের প্রদীপ-বসানো দুঃখ, আর
    ঠাকুমা যেমন ঠিক দশমীর চোখে দেখে জল
    যাই পাকা সুপুরির রঙে-ধরা গোধূলির দেশ
    আমি যাই।”
                                                     [দশমী / “তুমি তো তেমন গৌরী নও”/ শঙ্খ ঘোষ]
    (৪)
    “কে একা নিঃসঙ্গ বসে জল ঝরায় চোখে?
    মানুষ মানুষ তবু মানুষেরই কাছে এসে যায়
    কলকাতা-ঢাকায়
    নিত্যসেতু পথ বেয়ে
    এপার-ওপার”
                                                     (“কথা হবে”/ “এও এক ব্যাথা উপশম”/ শঙ্খ ঘোষ)
    “শহর পথের ধুলো” উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় এ সেতু বেয়েই ‘রিফিউজি’ শব্দের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে বাবা-মা, ভাই-বোনের সঙ্গে কলকাতা শহরে এসেছে নীলু। তবে কলকাতায় একেবারে পরিজনহীন নয় তারা। শিয়ালদা স্টেশানে চিমনি কাকু তাদের নিতে আসে। ঘোড়ার গাড়িতে শহরের রাস্তায় যেতে যেতে নীলুর মনের অস্থিরতার চিত্র প্রকট হয়ে ওঠে। ঘোড়ার পায়ের ‘টগবগ’ শব্দটা তার মনে যেন ‘খটখট’ করে বাজে। বোঝা যায় কোথাও একটা ছন্দপতন ঘটেছে। নীলুও স্বীকার করে — ‘তাদের মনটাই তো ভালো লাগছে না এখন।’ [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৯]

    এই উপন্যাসটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র, চিমনি কাকু। টিঙটিঙে রোগা মিশকালো লোকটি সবসময় বাঙাল ভাষাতেই কথা বলেন, অন্যেরা এই ভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ করলে তেড়ে ওঠেন তিনি, দৃঢ়ভাবে বলেন – “ক্যান? লজ্জা করব ক্যান? নিজের মায়ের ভাষায় কথা কই তার লাইগ্যা লজ্জা করব ক্যান?” [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ৯]

    কেতাবী বাংলা নয়, নিজের মায়ের মুখে শোনা বাঙাল ভাষাই গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করেন চিমনি কাকু ওরফে চিন্ময়। এহেন মানুষটি কলকাতার জীবনে হয়ে ওঠেন নীলুর আদর্শ চেতনার কান্ডারী। এ শহরের পথ থেকে তার কঙ্কালের রূপ, সব কিছু হাতে ধরে নীলুকে চিনতে শেখায় চিন্ময় –

    “কলকাতা এই রকম?

    হ এইরকমই কইলকাতা। আবার কইলকাতা অনেকরকম, একদিনেই কি বুঝবার পারবি কইলকাতা?”

                                                     [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৯]

    পদ্মাতীরের কলোনী সুপুরিবনের মায়াঘেরা গ্রাম — এসবের থেকে অনেক বিপরীতে কলকাতার চিত্র, স্বভাবতই নীলমাধবের জীবনযাপনের সরল প্রবাহও ব্যহত হয় এখানে। নানা ক্ষেত্রে নীলুর মনে মাঝে মাঝেই উঁকি দিয়ে যায় শৈশবের গ্রামজীবনের স্মৃতি। কবির লেখা “পানসুপুরি” কবিতাটির কয়েকটি পংক্তি যেন ‘নীলু’র আত্মকথনের মতো শোনায়

    “আমরা যখন ছোটো ছিলাম কতই বয়স হবে –
    কেউ বা ছিলাম কৈশোরে কেউ নিতান্ত শৈশবে
    পুজোর ছুটির শেষে যখন দেশের বাড়ির থেকে
    খাল পেরিয়ে নৌকো যেত নদীর দিকে বেঁকে
    আমরা কেউ বা ছইয়ের ওপর কেউ বা পাটাতনে
    বসে বসে ভেবে যেতাম, কোন্ খানে, কোন কোণে
    রইল পড়ে টান আমাদের, রইল পড়ে প্রাণ...”
                                                     [“পানসুপুরি”/ “বড়ো হওয়া খুব ভুল”/ শঙ্খ ঘোষ]
    কলকাতায় নীলুর জীবনে ক্রমাগত প্রভাব ফেলতে থাকে প্রত্যক্ষ রাজনীতি। হোমের নতুন বন্ধু যোগেন, নিয়ম ভাঙার নেশা তার রক্তে। নতুন পাওয়া স্বাধীনতাকে নীলুর মতো স্তিমিত চিত্তে মেনে নিতে পারে না সে, যেমন মানতে চায় না হোমের দৈনন্দিন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নিয়মনীতি। নীলুকে সে বাধ্য করে দুপুরবেলা সিনেমা দেখতে যেতে। নীলু বোঝে, যোগেন কেমন একটা আঁকড়ে ধরে ভালোবাসতে চায় তাকে। শুধু নিয়ম নয় রবীন্দ্রনাথ ও কৃত্তিবাসের জগত থেকে যোগেন তাকে সটান এনে ফেলে সুকান্ত ভট্টাচার্য ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিবাদী ঘোষণার জগতে। অবাক হয়ে সে প্রশ্ন করে, —

    ‘সে কী রে! এসব কবিতাও পড়িস নি?’

                                                     [‘শহর পথের ধুলো’ / অরুণা প্রকাশনী /পৃঃ ৫৬]

    রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ করে নাটুকে ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে ওঠে যোগেন— ‘বিপ্লবস্পন্দিত এ বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।’ [ শহর পথের .... / অরুণা / পৃঃ ৫৬]

    চিমনি কাকু নীলুকে একদিন নিয়ে যায় ‘এক্কেরে আসল জায়গায়’ — ৪৬ নম্বর, ধর্মতলা স্ট্রিট। এই জায়গায় যারা আসে, গান গায়, কথা বলে তাঁর ভাষায় — ‘তাঁরাই হইল গিয়ে আমাগো দ্যাশের আশা ভরসা।’ [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৫০]

    এখানে নীলুর সঙ্গে লেখক সাক্ষাত করিয়ে দেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, দেবব্রত বিশ্বাসের মতো ঐতিহাসিক চরিত্রদের। নীলু শোনে, “জর্জদা” গাইছেন —

    “জালিয়ানবাগের জালালাবাদের এসেছে আদেশ
    স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়নি তো আজও শেষ —”
                                                     [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ পৃঃ ৫২]
    নীলু ধীরে ধীরে চিনতে শেখে নথিগত স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সত্যিকার স্বাধীনতার লড়াইকে। দেশ ছেড়ে চলে আসার সময় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল নীলু। কলকাতার টালমাটাল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সে লালন করতে চায় তার বহুকাঙ্খিত সেই স্বপ্নটাকেই – “সুন্দর একটা দেশ হবে তাদের। কারো কোনো কষ্ট থাকবে না সেখানে। সবাই সবাইকে ভালোবাসবে এমন সেই দেশ। আর দেশের ওই ভেঙে-যাওয়াটা? না- না, সে ভাঙা তো থাকতেই পারে না চিরদিন, তা কি কখনো হয় না কি? দেখবে সবাই কদিন পরে ঠিক ঠিক আবার জুড়ে যাবে সব, ম্যাপটা আবার পুরোনো মতন হবে। ভুগোলের ক্লাসে বসে দেয়ালে টাঙানো গোটা দেশের মস্ত ম্যাপটা দেখতে কী ভালোই – না লাগত নীলুর।” [“শহরপথের ধুলো” / অরণা প্রকাশনী / পৃঃ ৭৮]

    এ ভাবনার বুনন ছিঁড়ে যায় যখন নীলুর পাশ দিয়ে হেঁটে যায় ছোট একটা মিছিল, স্লোগান দেয় –‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, ভুলো মাত, ভুলো মাত।’ নীলুর মনে পড়ে এ স্লোগান চিমনি কাকুর মুখেও বহুবার শুনেছে সে। রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও ক্রুর হয়ে ওঠে যখন হোমে ফিরে নীলু শোনে গান্ধিজি খুন হয়েছেন। রেডিও থেকে ভেসে আসে নেহেরুর কান্নাভেজা, গাঢ়, মন্থর স্বর— ‘The Light has gone out of our lives!’ [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৮২]

    নীলুর মনের দ্বিধাকে এ ঘটনা যেন আরও দৃঢ় রূপ দেয় — “এই কটা মাস আগেও যে সব স্বপ্ন তারা দেখত, ফলছে কি তা জীবনে? অনেক সময় তো দেখি উল্টোকান্ড! তা নইলে, স্বাধীন দেশের পুলিশ স্বাধীন দেশের মানুষের বুকে নির্বিচারে গুলি চালায় কেন?”

                                                     [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৭৭]

    ‘স্বাধীনতা’র কৃত্রিম অবয়বের আড়ালে তার আসল রূপটি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শেখে নীলু। এসব প্রেক্ষাপটে চিন্ময় নীলুর কিশোর মনের মধ্যে বপন করে দিতে চান প্রতিবাদের প্রকৃত স্বরূপ, এবং একাত্মতার বীজ — “এই যে, দ্যাশজোড়া একখান সব্বোনাশ হইল, এইটার একটা বিহিত করণ লাগব, বুঝলি না? একলা একলা তো বিহিত করা যাইব না, একলগে মিলতে হইব সব্বাইর। প্রতিবাদ – বুঝলি না? প্রতিবাদ করন লাগব।”

                                                     [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৮৪]

    দেশভাগ কিন্তু নীলুর আপাত আরামকে ব্যাহত করেনি। হোমের পরিচর্যায় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান শিক্ষা কোনো কিছুরই অভাব ঘটেনি তার। ফেলে আসা জীবনের বেদনা বুকে নিয়েই সে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে চেয়েছিল তার দৈনন্দিন যাপন। সেই যাপনের অংশ ছিল চিমনিকাকু, যোগেন, পমি, রামকৃষ্ণ মিশনের হোম। তবে উপন্যাসের শেষে দেখা যায়, নতুন বন্ধনের সমস্ত উপাদানই একে একে হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। চিমনি কাকু গ্রেপ্তার হয়, পমিও কোনো অজ্ঞাত কারণে আর দেখা করতে চায় না। এমনকী কলেজের কাছে যে শরণার্থী বাপ-মেয়ে কাগজ ফেরি করতো তারাও আর নেই। কিছুদিন আগেই লোকটির মৃত্যু হয়েছে। কলেজ যেতে গিয়ে নীলু দেখে মেয়েটির নিথর দেহ ফুটপাতে পড়ে রয়েছে। এতদিন এরা ছিল সাধারণ খাতা-পেন-কাগজ-এর পসার নিয়ে বসা ফুটপাতের বিক্রেতা, আজ মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে নীলু চিনে নেয় তারই আত্মীয় হিসেবে। ব্যক্তিসত্তা থেকে এই প্রথম নীলুর স্খলন ঘটে এবং তার উত্তরণ হয় সার্বিক জাতীয় সত্তায়। ভয় পায় সে— “মরে গেল? কী বলছে এরা? তার মানে ফুটপাথে শুয়ে শুয়েই মরে গেল মেয়েটা? ওইভাবে? হঠাৎ কেমন ভয় করে উঠল নীলুর। মনে পড়ে গেল মেয়েটির বাবার মুখখানা। মনে পড়ল তার নিজেরও সুন্দরমামার মুখ। সবাই তারা কলকাতায় চলে আসার পর – শুনেছে সে – সুন্দরমামাও না কি পথে পথে বই ফেরি করে বেড়াচ্ছে তার ক্ষয়াটে শরীর নিয়ে, দেখা দেয় না কাউকে। এমনও তো হতে পারত যে সেই মামাই এসে বসে আছেন ওইখানে, তার ফেরি নিয়ে! হতেও তো পারতো?”

                                                     [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৯২]

    অন্ধকারে অবসন্ন পায়ে হোমের দিকে ফিরে আসে নীলু। তার অতীত ও বর্তমান উভয় থেকেই বিচ্ছিন্ন সে। এক অনতিক্রম্য একাকিত্ব মনখারাপ ঘিরে ধরে তাকে। এ অবসন্নতার মাঝেই একমুহূর্তের জন্য ফেলে আসা ‘দেশে’ ফিরে যেতে চায় নীলু। তবে মুহূর্তের মধ্যেই সচেতন হয়ে ওঠে তার মন — ‘না না, পিছন দিকে যাওয়া কি আর সম্ভব?’

    নীলু বোঝে তার সমস্ত সচেতনতা দিয়ে বোঝে এই শহরেই বেঁচে থাকতে হবে তাকে — একা। এই বিচ্ছিন্নতা, এই একাকিত্ব, এই নিজের অস্তিত্বের প্রতি প্রতিদিন প্রশ্নচিহ্ন নিক্ষেপ, এটাই তার ভবিতব্য। তাই লেখক দেখান উপন্যাসের শেষে নীলু লেখে তার জীবনের সেই অমোঘ সত্যেরই কাব্যিক রূপ —

    “সন্ধ্যেবেলার অন্ধকারে একলা বুকে তুলো
    শহর পথের ধুলো”
                                                     [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ৯৬]
    দেশভাগের প্রক্ষাপটে এক সহজ সরল কিশোর মনের এ পরিণতি দেখে চিন্ময়ের সেই চিৎকার, হাহাকার প্রতিবাদ যেন ভেসে আসে পাঠকের কানে—“এইটা কোন্ পদের স্বাধীনতা? দ্যাশটারে দুই টুকরো কইরা ফালাইয়া, তোগো – আমাগো মতো হাজার হাজার মাইনষের কপালে রিফিউজি লেবেল লাগাইয়া দিয়া, এইটা কোন ছাতার স্বাধীনতা রে? গরিব লোকগুলা কি আইজও দুই মুঠা খাতে পায়? না কি তাগো পরনের কাপড় আছে? না থাকনের জায়গা আছে? কেমনতরো স্বাধীনতা এইটা?”

                                                     [“শহরপথের ধুলো” / অরুণা প্রকাশনী / পৃঃ ৫১]

    স্বাধীনতার ৭৭ বছর পরেও দেশবাসী জানে না ‘এইটা কোন ছাতার স্বাধীনতা!’ ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতেও তাই লক্ষ লক্ষ মানুষ এই প্রশ্ন বুকে নিয়ে বিনিদ্র রাত কাটায়। আর আরও একবার আমরা ‘ভারতবাসী’-রা হাজার হাজার নীলমাধবের আত্মিক মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে থাকি, তাদের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনকে ধীরে ধীরে মিশে যেতে দেখি “শহর পথের ধুলোয়”।

    গ্রন্থপঞ্জী

    ১) ঘোষ শঙ্খ. সকালবেলার আলো. পঞ্চম মুদ্রণ. কলকাতা, অরুণা প্রকাশনী. Accessed ৪ জুন. ২০২৪

    ২) ঘোষ শঙ্খ. সুপুরিবনের সারি. কলকাতা, অরুণা প্রকাশনী. Accessed ৬ জুন. ২০২৪

    ৩) ঘোষ শঙ্খ. শহরপথের ধুলো. কলকাতা, অরুণা প্রকাশনী. Accessed ৭ জুন. ২০২৪

    ৪) গঙ্গোপাধ্যায় ড. অভিজিৎ. “দেশভাগ”-এর পটভূমি: বাংলা কবিতা ও কথাসাহিত্যে. ২০১৬. Accessed ১০ আগস্ট. ২০২৪.

    ৫) সেন সিদ্ধার্থ. ভাঙ্গা দেশের স্মৃতি ও শঙ্খ ঘোষের কবিতা. Accessed ১৬ আগস্ট. ২০২৪

    ৬) ঘোষ শঙ্খ. শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতা, একবিংশ সংস্করণ. কলকাতা, দে’জ পাবলিশিং. ২০১৭. Accessed ২০ আগস্ট. ২০২৪

    ৭) ঘোষ শঙ্খ. সন্ধ্যানদীর জলে বাংলাদেশ, ঢাকা, প্রথমা প্রকাশন. Accessed ১ সেপ্টেম্বর. ২০২৪

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments