


স্মৃতি ভারে পড়ে আছি; — সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্ত; প্রকাশক— সুপ্রকাশ; প্রচ্ছদ- সৌজন্য চক্রবর্তী; প্রথম প্রকাশ— জানুয়ারি ২০২৫; ISBN: 978-81-982687-3-0
স্মৃতিকথা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট জীবনকাহিনি নয়, তার প্রতিটি পাতায় ভিড় করে থাকে সময়, মানচিত্র অথবা হাজারো মুখের অবয়ব। স্মৃতিকথা লেখার কয়েকটি আঙ্গিকের মধ্যে একটি বিশেষ আঙ্গিক হল পত্র-স্মৃতিকথা। ‘স্মৃতিভারে পড়ে আছি’ বইটি তেমনি প্রিয়জনকে উদ্দেশ্য করে লেখা এক দীর্ঘ খোলা চিঠি।
“কে যেন আমাকে বলেছিলেন, দুটি জিনিসের সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, কেউ তা কেড়ে নিতে পারে না—অনুভূতি ও স্মৃতি। মিহির আমার স্কুলজীবনের সহপাঠী। তখন আমাদের সম্পর্কটা ছিল কিছুটা রেষারেষির, কিছুটা বন্ধুত্বের। কলেজজীবনে এই রেষারেষিটা আর ছিল না, তখন কেবলই বন্ধুত্ব। তারপর একসময় মিহির পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল চিঠি। এই চিঠির মাধ্যমেই আমাদের বন্ধুত্ব পরিণত হয় প্রেমে। পরবর্তীকালে আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিই।
মিহির ও আমার মধ্যে অসংখ্য চিঠির আদানপ্রদান হয়েছে। সেইসব চিঠির একটিও আজ আমাদের কারও কাছে নেই। কেউ কোনোদিন পড়েওনি হয়তো।
তাই মিহিরকে লেখা আমার এই শেষ চিঠি আমার ইচ্ছুক পাঠকদের জন্য রেখে গেলাম।” (সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্ত, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫) (মুখবন্ধ, স্মৃতিভারে পড়ে আছি)
একদা একাত্তর; — সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্ত; প্রকাশক— লিরিক্যাল; প্রচ্ছদ- সোমা সুরভী জান্নাত; প্রথম প্রকাশ— জানুয়ারি ২০১৯; ISBN: 978-93-87577-03-9
সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্তের জীবনের নানান দিক সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই যে বইটির নাম উঠে আসে তা হল ‘একদা একাত্তর দুঃখ সুখের ঝাঁপি’। এটিই তাঁর স্মৃতি বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ। শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের এক বড় অধ্যায় তিনি এই বইটিতেই লিপিবদ্ধ করেছেন। ‘একদা একাত্তর’ শুধুমাত্র একটি স্মৃতিকথা নয়, এক উপদ্রুত সময়ের দলিল। এক কথায় বলা যায় এ উপমহাদেশের দীর্ঘকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সংরক্ষিত ইতিহাস। ‘স্মৃতিভারে পড়ে আছি’ বইটিকে ‘একদা একাত্তরের’ বর্ধিত সংস্করণ বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। দুটি বইতেই বহুলাংশের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। সহজ বাক্যবিন্যাস যেমন বইদুটির পাঠস্বাচ্ছন্দ বাড়িয়ে তুলেছে তেমনি মাঝে মাঝে গ্রামীণ বরিশালী কথ্যভাষার প্রয়োগ সহজিয়া কথন ভঙ্গিকে অলংকৃত করেছে।
সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্তের জন্ম ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তানের বরিশালের রুনশি গ্রামে। সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে তিনি ছিলেন না, কিন্তু দারিদ্রের কাছে কখনও মাথা নোয়াননি। যে সময় মেয়ে হয়ে জন্মানোই পরিবারের কাছে অমঙ্গল সূচক সেই সময় দাদু-ঠাকুমার সাহচর্যে এবং নিজের অদম্য জেদকে সঙ্গী করে তিনি পড়াশোনা শেখেন এবং উচ্চশিক্ষিত হন। বেড়ে ওঠার মুহূর্তে শিক্ষার যে চরম দুরবস্থা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন সে প্রসঙ্গে শুরুতেই তিনি লিখেছেন, “আমাদের গ্রামে কোনও বিদ্যালয়ই ছিল না। ন্যাশনাল স্কুল নামে একটি স্কুলবাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখেছি। বড় হয়ে জেনেছি যে, কেউ একজন জ্ঞানদা দাশ ওই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আমেরিকায় গিয়েছিলেন পড়াশোনা করতে। সেখান থেকে ফিরে আসার পর তাঁকে সমাজচ্যুত হতে হয়েছিল।” (একদা একাত্তর, পৃ-১০)
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এক উত্তাল সময়ের মধ্যে দিয়ে সন্ধা রায় সেনগুপ্তের বড় হয়ে ওঠা। বরিশাল উইমেন্স কলেজে অধ্যাপনা করা কালীন তিনি পরোক্ষ ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। তাঁর প্রাঞ্জল বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধের এক ভিন্ন চিত্র ধরা দিয়েছে ‘একদা একাত্তর’ বইটিতে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালিদের মধ্যে যে বিরাট রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। ইতিহাস মনে রাখলো মুক্তিযোদ্ধাদের, হাজার হাজার মেয়ের নিঃশব্দ আত্মবলিদান আড়ালে রয়ে গেল। ‘একদা একাত্তর’-এ মূলত লেখিকা সেই অন্ধকার দিকটিতেই আলোকপাত করেছেন। “পাকবাহিনী তাদের দোসর মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামীর নেতা কর্মী নিয়ে গঠিত শান্তি কমিটির সদস্যরা প্রতিদিন ঝালকাঠির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শত শত নরনারীকে ধরে নিয়ে আসত। এদের ভেতর থেকে বাছাই করা যুবতী ও তরুণীদের বিবস্ত্র করে রাখা হত সি. ও. অফিসের বন্দিশালায়। এর মূল কারণ ছিল এ সব বন্দি যুবতী এবং নারীরা যাতে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা না করতে পারে। এখানে তাদের উপর চালানো হত পাশবিক অত্যাচার। তাদের উপর পাক হানাদারদের পালাক্রমিক নির্যাতন আর অনাহারে তারা যখন অচেতন হয়ে পড়ত, ফুরিয়ে যেত তাদের জীবনী শক্তি, তখন তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হত সোজা বধ্যভূমিতে।” (একদা একাত্তর, পৃ-৯০)
১৯৭১ সালেই বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের ফলে গোটা দেশ জুড়ে তৈরি হয় এক সন্দেহের বাতাবরণ, যা ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলে একটি জাতির হৃদয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, চরম দারিদ্র সামাজিক অবক্ষয়ের পথ প্রশস্ত করে। যুদ্ধ পূর্ববর্তী অস্থিরতা এবং যুদ্ধ পরবর্তী অসহায়তা এই দুই কারণেই মানুষ সীমানা পেরোতে বাধ্য হয়।
১৯৭২-এ প্রথিতযশা সাহিত্যিক মিহির সেনগুপ্তের সঙ্গে সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্তের বিয়ে হয়। মিহির ছিলেন একাধারে তাঁর ছোটবলার সহপাঠী এবং বন্ধু। যদিও মিহির সেনগুপ্তের পরিবার অনেক আগেই পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন। বিয়ের পর তিনিও পাকাপাকিভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি দেন। শুরু হয় জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। মিহির ও সন্ধ্যার একত্র যাপনের প্রায় সবটাই ধরা আছে ‘স্মৃতিভারে পড়ে আছি’ এই বইটিতে। যা তিনি লিখেছেন মিহির সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর।
আর পাঁচটা সাদামাটা দাম্পত্যের মতোই মিহির সন্ধ্যার দাম্পত্যের শুরু। ভদ্রেশ্বরের একান্নবর্তী পরিবারে যতটা একাত্ম বোধ করেছেন ততটাই শাশুড়ি, দেওর, ননদদের সঙ্গে আমোদে মেতেছেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য চাকরি খুঁজেছেন, পেয়েওছেন। দীর্ঘদিন তিনি শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর চরিত্রের এই দৃঢ়চেতা মনোভাব তাঁকে গড়পড়তা গৃহিণীদের চাইতে অনেকাংশে আলাদা করেছে। ব্যাঙ্কের বদলির চাকরির কারণে মিহিরকে প্রায়শই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকতে হয়েছে। সেই সময় সন্ধ্যাও মিহিরের সঙ্গে বহু জায়গা ঘুরেছেন, আবার একা হাতে সংসার, সন্তান সামলেছেন। জীবনের পথ সর্বদা মসৃণ হয় না। সন্ধ্যাও জীবনে বহু উচু-নিচু এবড়ো-খেবড়ো পথ পেরিয়েছেন। কিছু পেয়েছেন, কিছু হারিয়েছেন। কঠিন বাস্তবের সঙ্গে অনেকাংশেই তিনি স্বপ্নকে মেলাতে পারেননি, তাই আফসোসও রয়ে গেছে অনেক।
নারীর সম্পূর্ণতা তার মাতৃত্বে। সন্ধ্যা সেখানেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দিদির অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর তাঁর কয়েকমাসের শিশু সন্তান তানিয়াকে তিনি মাতৃস্নেহে মানুষ করেন। নিজের মেয়ে তিতিরের জন্মের পর দুই মেয়েকেই সমান ভালোবাসা দিয়েছেন সন্ধ্যা। গর্ভজাত এবং পালিত সন্তানের মধ্যে কখনও কোনো প্রভেদ করেননি। সন্তান স্নেহে মিহিরও যে কিছু কম যান না তা তিনি স্বীকার করেছেন অকপটে।
স্বামীর সাহিত্য সৃষ্টিতেও তাঁর প্রচ্ছন্ন সাহচর্য অনস্বীকার্য। স্বামী নয় লেখক মিহির সেনগুপ্তকে হতাশার অভিমুখ থেকে বারবার মূলস্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন সন্ধ্যা। মিহির সেনগুপ্তের লেখা বই ‘বিষাদবৃক্ষ’ থেকে শুরু করে সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম, ধানসিদ্ধির পরণকথা, বিদুর নিষ্পাদপ অরণ্যের মতো আরও অনেক সৃষ্টিতে রয়েছে সন্ধ্যার ভালোবাসার স্পর্শ। বহুমুখী কর্মদক্ষতার কারণে শুধু নিজের জীবনেই নয় তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটি মানুষের আঁধার পথে তিনি জ্বালিয়ে ছিলেন নিরবচ্ছিন্ন আশার আলো। আজ অশীতিপর বয়সে নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এসে সেই হার না মানা লড়াকু মেয়েটি অদৃষ্টের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। হারালেন মিহিরকে। ভেঙেও পড়লেন। জীবনের এই শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর ব্যাক্তিত্বের সমস্ত সত্ত্বাকে পর্যুদস্ত করে প্রতিষ্ঠা দিলেন এক নতুন সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্তকে, যিনি শুধুমাত্র মিহির সেনগুপ্তের স্ত্রী। “দেখতে দেখতে প্রায় তিন মাস আছি। কেমন আছি বুঝতে পারি না। তবুও তো আছি। তোমাকে অনেকবারই বলেছিলাম, তুমি আমার আগে যেও না, সেই তো চলে গেলে। এবার আমি কী করবো। কোথাও আমার শিকড় খুঁজে পাই না, না ভুল বল্লাম, মাটি পাই না যেখানে শিকড় আঁকড়ে ধরে থাকে। আসলে মূলটাই আর শক্ত নেই।” (স্মৃতিভারে পড়ে আছি, পৃ-১৬৬)
সময় ও সীমানা যে বন্ধুত্ব মুছে দিতে পারেনি, যৌথযাপনে সেই বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা ক্রমশই নিবিড় হয়েছে। মিহির মারা যাবার পর এক প্রগাঢ় একাকিত্বের নীরবতা ভাঙতেই মিহিরের গোচরে এবং অগোচরে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার স্মৃতিচারণায় মগ্ন থেকেছেন সন্ধ্যা। দুটি দেশ এবং দুটি মানুষের মাঝখানে সেতু বেঁধেছিল যে চিঠি, সেই চিঠির মাধ্যমেই সন্ধ্যা ফিরে পেতে চাইলেন মিহিরকে। হয়তো নক্ষত্রলোকে।
দুটি বইয়েরই সুন্দর এবং মানানসই প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন যথাক্রমে সোমা সুরভী জান্নাত (একদা একাত্তর) এবং সৌজন্য চক্রবর্তী (স্মৃতিভারে পড়ে আছি)।