



স্কুল থেকে ফিরে জিনিসটা পেলাম। ঘরের একমাত্র আসবাব অর্থাৎ ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা, যাতে সবার অলক্ষ্যে তুলে নিতে পারি। এতটা সুবিবেচনা এ বাড়িতে মামিমা ছাড়া আর কার?
চণ্ডীগড় থেকে পোস্ট করা হলুদ লেফাফা। অর্থহীন আশঙ্কায় ছোট সাইজের চারটে পাতা বার করি। ছাই রঙের লাইন দেখে চেনা যায় এগুলো পম্পার পুরোনো খাতা থেকে ছেঁড়া, যাতে তার কালোয়াত গুরুজীর হাতের লেখা ছিল। বর্ষার দিনে বান্ধবীকে খাতাটা খুলে বসে থাকতে দেখতাম। মাঝে মাঝে গলা সেধে নিলেও বেশির ভাগ সময়ে সে চুপ করে থাকত, যেন গানের ইস্কুলের ধ্বনিগুলো কোনো অতীত থেকে ভেসে আসবে।
গুড গড!
পাতার ভাঁজে একটা গাঢ় বাদামী রঙের আড়াই ফুট লম্বা চুল বিকেলের আলোয় তামার মতো চিকচিক করছে। সেটাকে সাবধানে আবার খামের ভিতর ভরে ফেলা যাক।
তোর চিঠি পাবার পর তাড়াতাড়ি ক্লাস থেকে ফিরে এলাম। ঝাল লজেন্স গালে নিয়ে চিঠি পড়তে পড়তে মনে হল চণ্ডীগড়ে আমার হাতে অফুরন্ত সময়। তার মানে তোর হাতে আরো বেশি।
এত সময় পেয়ে কার সাথে মিশছিস আর কী অকাণ্ড কুকাণ্ড করে বেড়াচ্ছিস কে জানে। যেদিন ভালোয় ভালোয় স্কুল পাশ করবি সেদিন গুরদুয়ারায় নিজের হাতে সিঁড়ি ধুতে যাব। অন্য কেউ হলে উপরের দুটো সিঁড়ি ধুলেই চলত। তোর জন্য তলা থেকে সাত সাতটা ধোব বলে রেখেছি। (এটা একটা জোক! কিছু মাইণ্ড করলি না তো?)
মনে কর আমার সারা গায়ে রং-বেরঙী ইতিহাসের ফিতে পেঁচানো। যখনই ভালো গল্প লিখবি সেই ফিতের একটা খুলে তোকে দিয়ে দেব। এইভাবে একটা একটা করে খুলিয়ে দেখবি… পড়ে আছে কিছু খড়ের টুকরো! হা-হা-হা!
গরমের ছুটির গোড়ার দিকে এরকম একটা ফিতে খুলে দিয়েছিলাম। সেটা হল আমার চম্পা থেকে গুলাবো হয়ে যাওয়ার গল্প। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দশ। সেদিন এই গল্পের দ্বিতীয় পর্বটা ইচ্ছে করে বলিনি, কারণ একসঙ্গে সব ফিতে খুলতে নেই। ছোটবেলা আমার মাথায় ঢোকানো হয়েছিল, যার সব কিছু খুব সহজে দেখা হয়ে যায়, সে আর দেখার যোগ্য থাকে না। যার আড়াল নেই সে বৃষ্টিতে ধুয়ে বেরিয়ে যায়। মুখে স্বীকার করি না কিন্তু কে বলতে পারে, সাবধান না হলে হয়তো আমিও ভেসে যেতাম।
পাঁউরুটি দিয়ে চা শুষে ফেলার মতো নিজের ভিতরে চিঠির পাতাগুলোকে চুমুক দিয়ে টেনে নেবার সময়ে আমি চাইছিলাম না হুট করে মধ্যম মাতুল ঘরে ঢুকে পড়ে বলুক – ওঃ জয়, তুই আবার বসে পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঠোঙা বানাচ্ছিস? আমাকেও গোটা দশেক দিস নাহয়। কারণ তাহলে রাগের মাথায় আমি সত্যি হোমওয়ার্কের খাতা ছিঁড়ে এক ডজন ঠোঙা দিয়ে আসব।
কাগজগুলো তাই আবার সাবধানে খামের মধ্যে ভরে ফেলব আমি। চায়ে ডোবানো পাঁউরুটি খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব। ক্যান্টনমেন্টের ভিতর এমন নির্জন কোথাও গিয়ে বসব যেখানে চিঠিটা অল্প সময়েই মুখস্থ হতে পারে। পম্পা যদি কোনো ম্যাজিক কালি ব্যবহার করে থাকে যাতে সে আমাকে ছেড়ে গেলে তার লেখাও বাতাসে উড়ে যাবে, তাহলেও তার ছেলেবেলার ইতিহাস যেন কবজা থেকে ছাড়া না পায়।
বাবা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। তখন আমি হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে কেঁদে পড়েছিলাম। “ইস্কুলের লোকগুলো কী করেছে দেখো! বিরাগবাবু বলে একজন আছেন যিনি চম্পাকলি নামটা শুনলে রেগে আগুন হয়ে যান, কারণ ওই নামে তাঁর একটা বউ ছিল যে পালিয়ে গেছে। সেই বিরাগবাবু আমার চম্পা নাম কেটে দিয়ে আমাকে গুলাবো বানিয়ে দিয়েছেন আর বাবা একটুও বাধা দেয়নি।” পরে জেনেছি সব শুনে মায়ের মাথায়ও নাকি বাজ ভেঙে পড়েছিল! তবু মা উপরে সেটা দেখায়নি। আমায় বলেছিল, “চিন্তা করিস না, বাবা ঘুম থেকে উঠুক, দেখি কী করে ওরা তোর নাম কেড়ে নিতে পারে।“
কয়েক ঘন্টা পরে বাবা ঘুম থেকে উঠল। চুপ করে চা খাচ্ছি সবাই। থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে মা। চা খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর মা জিজ্ঞেস করল, “গুলাবো কে?” বাবা অমনি মচকে দ। বলল, “নার্ভাস হয়ে গিয়ে একটা গড়বড় ঘটিয়ে ফেলেছি। এবার কী করা যায়?” মা বলল, “তোমাকে কিছু করতে হবে না। কাল আমি ইস্কুলে যাব। দরকার হলে তনুদিকে সঙ্গে নিয়ে যাব। একটা মেয়ের জীবন নিয়ে টিচাররা যা ইচ্ছে করবে আর আমরা বসে থাকব নাকি?”
সেদিন মায়ের যা রাগ দেখেছিলাম, আমি আর বাবা ধরে নিয়েছিলাম বিরাগবাবুর ভাগ্যে ধোলাই আছে।
পরের দিন ইস্কুলে সদলবলে গিয়ে শুনলাম বিরাগবাবু দশ দিনের ছুটিতে তাঁর দেশের বাড়িতে গিয়েছেন। মা আর আমাদের পাড়ার তনুমাসি গটগট করে প্রিন্সিপালের ঘরে ঢুকে গেল। আমি আর বাবা বাইরে করিডরে দাঁড়িয়ে। বায়োলজি ল্যাবরেটরির ভিতরে বিরাগবাবুর একটা আলাদা অফিস ছিল। প্রাইমারি স্কুলের অ্যাডমিশানের কাগজপত্র সেখানে থাকত। করিডর থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে সেই ঘরের দরজায় তালা মারা। চাপরাসি সুলক্ষণা আমাদের কাছে এসে বলল, “চাবি আমার কাছেই আছে। কিন্তু তালা খুলবে কে? বিরাগবাবু হলেন ঝগড়ার দানব। ছুটিতে বেরোবার সময়ে পাল্লার ভিতরে একটা সই করা কাঁচের শিশি কীভাবে যেন সেঁটে দিয়ে যান। দরজা খুলতে গেলেই সেটা ভাঙবে আর বিরাগবাবু জেনে যাবেন”। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে উপায়?” সুলক্ষণা বলল, “উপায় হল এই যে একটা আনকোরা নতুন প্রিন্সিপাল এসেছে। সিল খোলা হয়নি। কিছু জানে টানে না। তাকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নেওয়া যেতে পারে”।
খানিকক্ষণ পরে প্রিন্সিপালের ঘর থেকে মহেন্দ্রবাবু হন হন করে বেরিয়ে এসে সুলক্ষণাকে নির্দেশ দিলেন, “বিরাগবাবুর অফিসটা খুলে দাও”। তখন মহেন্দ্রবাবুর চুল কাঁচা। একেবারে ছোকরা মনে হত। সুলক্ষণা চাবিটা পালটা মহেন্দ্রবাবুর মুঠোয় গুঁজে দিয়ে বলল, “নিজেই খুলে সব মজা লুটে নিন না?” ফ্যাসাদ দেখে মহেন্দ্রবাবু এদিক ওদিক চাইবার পর আমায় অনুনয় করতে থাকেন। “গুলাবো নামটা খারাপ নয়, রেখে নে! স্কুল পাশ করে যখন বেরোবি তখন দেখবি সার্টিফিকেটে সব বাঙালি মেয়েদের নাম পালটে অন্য কিছু করে দিয়েছে। কাউকে দেবে বিস্কুটের নাম, কেউ হয়ে যাবে শ্যাম্পু। গুলাবো নাম কিন্তু পালটাবে না। ওটা একটা সাবানের নাম তো? এরা লিখতে পারে”। তারপর তনুমাসির দিকে ফিরে বললেন, “তনুদি আপনারা তো দিল্লীর পুরোনো বাসিন্দা। আপনার নাম পালটায়নি?”
আমরা ভেবেছিলাম মহেন্দ্রবাবু বানিয়ে বলছেন। কিন্তু এক এক করে নতুন দেশের রেওয়াজগুলো জানা হতে থাকে। তনুমাসি আমতা আমতা করে বললেন, “সে কালে সোনু ঘী বলে একটা জঘন্য মাল বাজারে বিক্রি হত। ওরা তনুশ্রীর জায়গায় সেটাই লিখে দেয়। ঠিক করাবার সময়ে অফিসের চাপরাসী আমাদের বলেছিল কেউ পঢ়া-লিখা নয়। একটা কোনো তেল বা মশলার টিন হাতে করে না নিয়ে গেলে লিখাইয়ের বাবুজী কী দেখে লিখবেন? যাহোক অনেক কাঠ-খড় পোড়াবার পর ঘী-টাকে কাটিয়েছি। খাতায় কলমে এখন আমি সোনু মজুমদার”। মহেন্দ্রবাবু বেজায় খুশি হয়ে বললেন, “রাজধানীর নিয়মকানুনগুলো তাহলে এঁদের আপনিই বুঝিয়ে দিন”। তনুমাসি তখন আমাদের বললেন, “দেখো, নিজে কিছু বুঝিনি তো তোমাদের কী বোঝাব? এর পরেও বোকার মতো শখ করে মেয়ের নাম দিয়েছিলাম অর্চ্চনা। সেকেণ্ডারি বোর্ড করে দিয়েছে রস্না। একটা যা-তা কোল্ড ড্রিঙ্কের নাম। কিন্তু দিল্লীর মেয়ে তো? এমন পছন্দ যে নাচতে শুরু করে দিল। আর পালটাতে দেয়নি”।
বিশ্বাস কর, গোটা সময় জুড়ে আমি সাধ্যমতো গাঁইগুঁই করে যাচ্ছিলাম। আসলে ভয় ছিল গুলাবো নামকরণের পর যদি কোনো অবাঙালি বাবা-মা’য়ের কাছে পাচার করে দেওয়া হয়? মহেন্দ্রবাবু মাকে উদ্ভট সব আইডিয়া দিতে লাগলেন। সেই বছর আরেকটা নতুন মেয়ে ভর্তি হয়েছিল। তার নাম বিমলা মুন্সী। শুনি মহেন্দ্রবাবু মাকে বলছেন, “বিমলা একটু সেকেলে হলেও খাঁটি বাঙালি নাম। মুন্সীও একটা অল ইণ্ডিয়াতে পপুলার সারনেম। ওদিকে দেখুন আপনাদের মুখার্জি পদবীটা কেমন অদ্ভুত। না ইংরেজি, না বাংলা, একটা বেওয়ারিস মাল, তাতে মায়া বাড়িয়ে কী লাভ? তার চেয়ে এদের দুজনের রোল নাম্বার দুটো পালটাপালটি করে দিই। ওরা দিল্লীর পুরোনো বাসিন্দা, ঘামাবার মতো মাথা নেই। নাম পালটে গেছে বুঝতেই দু-বছর কেটে যাবে। তখন সুবিধেমতো অন্য কারো সাথে এক্সচেঞ্জ করে দেব”।
আমি দেখতে পাচ্ছিলাম মায়ের চোখমুখ বিতৃষ্ণায় কুঁচকে যাচ্ছে। এদিকে বাবা কিচ্ছু পরোয়া না করে, “হ্যাঁ-হ্যাঁ, তাই ভালো” বলে রাজি হয়ে গেল।
এই সব কথাবার্তা চলছিল যখন তখন মা যে ভিতরে ভিতরে অসম্ভব তেতে গিয়েছে সেটা আর কেউ বুঝতে পারেনি। বাবার এই কথাটা শোনার পর মা আর থাকতে না পেরে হঠাৎ দু-পা এগিয়ে মহেন্দ্রবাবুর হাত থেকে চাবিটা ছিনিয়ে নেয়। একটু বোধহয় গায়ের জোর ব্যবহার করা হয়েছিল। মহেন্দ্রবাবুর সমস্ত চুঁ-চুঁ সেই মুহূর্তের জন্য অন্তত বন্ধ। ফিউজ উড়ে যাওয়া রেডিওর মতো তিনি ডেড সাইলেন্ট। মা ততক্ষণে হনহন করে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। ফটাস করে একটা টেস্টটিউব মাটিতে পড়ে ভাঙবার আওয়াজও পেলাম। মা চাবি ফেরত দিয়ে বলল, “যান, এবার বাকিটা করে দিন। আপনি শিক্ষক। কোন কাজটা ঠিক, কোনটা ভুল সেটা আপনাকে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই”।
তারপর যা ঘটে সেটা শুনলে অবাক হয়ে যাবি। মায়ের সাহস থেকে প্রেরণা পেয়ে সুলক্ষণা সবার আগে পাল্লা দুটো খুলে সেই অন্ধকার ঘরে ঢুকেছিল। পরমুহূর্তেই সে আঁৎকে উঠে ছিটকে বেরিয়ে আসে। মহেন্দ্রবাবুর পিছন থেকে উঁকি মেরে আমরা সবাই দেখতে পেলাম বিরাগবাবুর চেয়ারে একটা আস্ত মানুষের কঙ্কাল বসে আছে। তার খুলিটা উপহারের মতো টেবিলে সাজিয়ে রাখা। শুধু তাই নয়, কঙ্কালের ঘাড়ের উপর মাথার বদলে একটা পুরোনো ফুটবল বসানো। বেচারা দুহাত দিয়ে সেটাকে ঘাড় থেকে খোলার চেষ্টা করছিল।
আমাদের চোখ ছানাবড়া। মহেন্দ্রবাবু আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন, “পুরোনো এমপ্লয়ী। আগেকার দিনে কম্পালসারি রিটায়ারমেন্ট ছিল না। তার এই ফল”।
মহেন্দ্রবাবুকে জীবনে প্রথম দেখি সেবার। সবাই তাঁর যে ঢিলেঢালা ভঙ্গীটাতে অভ্যস্ত, সেটা যে একটা ছদ্মবেশ তা সেদিন চিনেছিলাম। আসল রূপ হল যেখানে যেমন সেখানে তেমন। “বিরাগবাবুর ফুটবলে বেজায় অ্যালার্জি”, এই বলে বলটাকে এক ঘুঁষিতে দরজার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের নভিস প্রিন্সিপাল। কিছুই হয়নি এমন ভাবে গল্প করতে করতে কঙ্কালের খুলি তার স্বস্থানে লোহার তার দিয়ে জোড়েন। তারপর একাই পাঁজাকোলা করে কঙ্কালটাকে একটা ধুলো বোঝাই কাঁচের আলমারির ভিতর পুরে তার দরজা বন্ধ করে দেন। কেন তাঁকে এই স্কুলে নিয়োগ করা হয় সেটা আমরা সেদিন একটু একটু বুঝতে পারছিলাম। সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি। তনুমাসি বললেন, “মহেন্দ্রবাবু, এটা কি স্বপ্ন, না সত্যিকারের সার্কাস?”
মহেন্দ্রবাবু কথাটা গায়ে না মেখে বললেন, “প্রায় একশো বছরের পুরোনো ইন্সটিটিউশান। লোকে বলে বাঙালিদের হেরিটেজ স্কুল। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর নাতি এখানে পড়তে চেয়েছিল, ছেলেটা একেবারে গান্ধীজীর মতো অহিংসাবাদী বলে আমাদের রাখতে সাহস হয়নি। এই যাঁকে দেখলেন তিনি আমাদের এক পুরোনো মাস্টার। একদা অ্যালাইভ অ্যাণ্ড ওয়েল ছিলেন। তবে এখনও সেরকম আছেন বলা যায় না। আমরা বলি হ্যাজ বীন। ভদ্রলোকের সেন্স অব হিউমার আর বাস্তবজ্ঞান দুটোই একদম রদ্দি, তাই রিটায়ার করানো যাচ্ছে না। সুযোগ পেলে জীবিত মাস্টারদের চেয়ার দখল করেন। সবাই জানি স্কুলের একটা রেপুটেশানাল হ্যাজার্ড, কিন্তু কী করব বলুন? হেরিটেজের অংশ! ফেলার অনুমতি নেই”।
বাবা, মা, আর আমি হতবাক হয়ে সব দেখছি আর শুনছি। এই ঐতিহ্যের অংশ না হয়ে আর উপায় নেই। এদিকে তনুমাসি লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছেন না। কারণ তিনিই আমাদের বাংলা স্কুলে পাঠিয়েছিলেন।
তখনও বুঝিনি সবে দিনের শুরু। কিছুক্ষণ পর আরো সব আশ্চর্য ব্যাপার দেখা যেতে থাকে! বিরাগবাবুর অ্যাডমিশানের খাতায় আমার নতুন নামটা হোয়াইটনার দিয়ে ঢেকে তার উপর কেউ আগেই লিখে রেখেছে ‘পম্পা মুখার্জি’। এটা কি বিরাগবাবুর কাজ? টেবিলের উপর কিন্তু হোয়াইটনার ফ্লুইডের কোনো বোতল নেই, কাছাকাছি কোনো টাইপ রাইটারও নেই। তাহলে কি কঙ্কালের কীর্তি? না কি বাইরে থেকে কেউ এসেছিল? কিন্তু তারা কারা? স্টুডেন্ট যদি হয় তো বিরাগবাবুর বুবি ট্র্যাপ ভেদ করে ঘরে ঢুকল কী করে আর এক রাতের মধ্যে এত কাণ্ড করল কখন? তাছাড়া আমার নাম পালটে দেবার এত গরজ কীসের? এও বুঝতে পারছি না চম্পা লিখতে গিয়ে কেউ ভুল করে পম্পা লিখেছে, না আনকোরা নতুন একটা নাম দেওয়া হয়েছে আমায়।
সেদিন এসব প্রশ্নের কোনো জবাব মেলেনি। মহেন্দ্রবাবু বায়োলজি ল্যাবরেটরি থেকে একটা স্কেচ পেন নিয়ে এসে বললেন, “গুলাবো ইজ নো মোর। এখন পম্পার জায়গায় চম্পা, টুম্পা, ঝুম্পা, হাম্পি যা চাই করে দিতে পারি। সবচেয়ে ভালো হল ক্যাম্পাকোলা। কোল্ড ড্রিঙ্কের নাম, বোর্ড হ্যাপিলি অ্যাপ্রুভ করে দেবে”। তারপর ষড়যন্ত্র করার ভঙ্গীতে বললেন, “বিরাগবাবু টুঁ-ফাঁ করতে পারবেন না। তিনি নিজের বোনাইয়ের সঙ্গে ষড় করে এই হ্যাজ বীন ভদ্রলোককে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলেন। লোহার চেন আনতে গিয়ে সেই বোনাই ভদ্রলোকের পা অ্যাকসিডেন্টে খোঁড়া হয়ে গেল। তারপর থেকে বিরাগবাবু হ্যাজ বীনকে ঘাঁটান না”।
মহেন্দ্রবাবুর কনফিডেন্স দেখে পরে আমার এও মনে হয়েছে যে কঙ্কালটাকে বিরাগবাবুর চেয়ারে বসানোর পিছনে তাঁর নিজের হাত ছিল না তো? মা’কে দিয়ে দরজা খোলানোও কি আগেই প্ল্যান করা ছিল?
তখন অবশ্য এত ক্যাবলা ছিলাম, কিছু বলতে না পেরে মায়ের দিকে ছাগলের মতো তাকিয়ে আছি। মা তাকাল তনুমাসির দিকে। তনুমাসি বললেন, “পম্পাই তো বেশ ভালো নাম। কিছুদিন থাকুক। নামটা একটু পুরোনো হতে দাও। তারপর যদি স্যুট না করে তাহলে পালটে দেওয়া যাবে। এর মধ্যে আমি তোমাদের প্রত্যেক মাসে একটা আধুনিক মেয়েদের ম্যাগাজিন এনে দেব। তাতে খুব ভালো ভালো নাম থাকে। সেরাগুলো বেছে জমাও। এখানে সবাই তাই করে”।
তারপর সেই ‘ভানুমতী’ নামের ম্যাগাজিন থেকে প্রত্যেক মাসে আমরা যত পারি দেশ-বিদেশের নাম সংগ্রহ করে একটা ডায়েরিতে লিখতাম। লাফিকা, তাকধিনা, ইনফিনিটিনী - বছরখানেকের মধ্যে এরকম সত্তর-আশিটা নাম লেখা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ততদিনে সবাই আমাকে পম্পা বলে চিনে গেছে। এমনকী মা’ও আমাকে অন্য কোনো নামে ডাকছিল না। তারপর তনুমাসিরা নিজের মেয়ের কাছে বিদেশে চলে গেলেন আর বিরাগবাবু অবসর নিয়ে ফিরে গেলেন গাঁয়ে। মহেন্দ্রবাবুর উপর ভরসা ছিল না মায়ের। বলত, “কঙ্কালের চেয়ে হৃদয়হীন। তোর নাম পালটাতে গিয়ে অন্য কোনো মেয়ের নামে গণ্ডগোল করতে ওনার একটুও আটকাবে না”। তাই শেষ পর্যন্ত পম্পা নামটা আর পালটায়নি। সাদা হোয়াইটনার ফ্লুইড দিয়ে কার অদৃশ্য হাত আমার অতীত মুছে ওই নামটা কপালে লিখে গিয়েছিল। সেই কপালের লেখা আর কেউ মুছতে পারেনি।
অতএব বয়ম্যান, আশা করি বুঝতে পেরেছিস কীভাবে এইসব দেখা আর অদেখা চরিত্রগুলোর পাল্লায় পড়ে আমি বাংলা স্কুলে আটকে যাই। তারপর অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছিল। তাও যখনই বায়োলজি ল্যাবরেটরির সামনে দিয়ে যেতাম, চোখ চলে যেত প্রাইমারি স্কুলের কাগজপত্র ভরতি সেই ভিতরের স্যাঁতসেঁতে ঘরটায়। তার পিছন দিকের জানালার কাছে কঙ্কাল সমেত কাঁচের আলমারিটা দেখতে পাওয়া যেত। আমার সব সময় মনে হত সেখান থেকে কেউ আমার দিকে নজর রেখেছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে বলতাম, “এই যে স্যার হ্যাজ বীন, পম্পা নামটা কি একটুও চিন্তা করে দিয়েছিলে, না স্রেফ ছাপার ভুল? দেব, দানব, যক্ষ, রক্ষ, জিন, ভূত যাই হও, যা করেছ তার জন্য ধন্যবাদ। তবে এর পর যদি কিছু করো তো ভেবেচিন্তে কোরো”। এইভাবে কাঁচের আলমারির দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতে হাঁটতাম। ফলে যা হয় তাই হল। এক শরতের সকালে ধড়াম্!
কোথায় আমি? পড়ে আছি করিডরের মেঝেয়। কলারবোনে একটা কালো চুল ভরতি মাথা ঢুকবার চেষ্টা করছে। সেটাকে বার করব, না স্কার্ট সামলাব? মাথাটা নিজের থেকেই সোজা হয়ে দুটো চোখ বেরোল। তারপর একটা মুখ। কার মুখ তা তো বুঝেই গেছিস। বুঝলাম, আস্তাকুঁড়ের ছেলে। স্ট্রীট আরচিন। কী যে হল কে জানে। হঠাৎ মনে মনে বলছি, “নাম তো দিলে, এবার এই ছেলেটাকেও চাই। হে ল্যাবরেটরির ভূত, হে বাংলা ইস্কুলের বাস্তবজ্ঞানরহিত হ্যাজ বীন, এই রাস্তায় পড়ে থাকা খেলনাটা আমায় পাইয়ে দাও”।
ব্যাস, জীবনের এইটুকু গল্প। ভালো থাকিস। আমি যেন দিল্লীতে ফিরে যে মানুষগুলোকে যেখানে ছেড়ে এসেছিলাম সেখানে আবার পেয়ে যাই। সেই প্রার্থনা করে আজ এই সিঁড়ি, কাল ওই সিঁড়ি মুছি।
বাড়িতে যাতে কেউ দেখতে না পায় সে জন্য হাঁটতে হাঁটতে আর্মি ক্যান্টনমেন্টের ভিতর ঢুকে স্যামসন লিম্বুর দেখানো বেঞ্চের উপর বসে বারবার চিঠিটা পড়েছিলাম। শেষ বাক্যগুলো যতবার পড়ছি চোখের পাতা ভিজে আসছে। আড়াই বছর আগের সেই করিডরের কলিশন থেকে পম্পার সঙ্গে আমার আলাপ। সেদিন তার মনে কী ছিল আমি আজকের আগে জানতাম না। জানলে হয়তো বলতাম রাস্তা থেকে কুড়োনো খেলনারা সাধারণত নিরাশই করে।
সেটা কি আমার বান্ধবী এতদিনে একটু বুঝেছে?
দেখতে দেখতে পরীক্ষা এসে গেল। বছরের প্রথম পরীক্ষা সহজ করে দেওয়া হয় তাই কেউ খুব একটা পড়াশোনা করে না। মলয় রক্ষিত ঠিক সময়ে ফিরেছে ক্লাসে। আগে আমি আর প্রবুদ্ধ তাকে চোখে চোখে রাখতাম। এখন দেখি আমাদের গোটা ক্লাসটাই ম্যান টু ম্যান মার্কিং শুরু করে দিয়েছে। শুধু এবার একা মলয় নয়, আমাকেও নজরে রাখা হচ্ছিল। যেন মনীষার হাতে একলা পড়ে গেলে সে ছিঁড়ে ফালা করে দেবে।
একদিন পরীক্ষার পর করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। বায়োলজি ল্যাবরেটরির পাশ দিয়ে যাবার সময় একটু ইতিহাস নিয়ে গবেষণার ইচ্ছে জাগল। জায়গাটা ফাঁকা ছিল। পরীক্ষার পর সবাই তাড়াহুড়ো করে বাড়ি চলে গেছে। আড়াআড়ি ক্রস করে ভিতরের ঘরে ঢুকি, যেখানে এখন আর কারো অফিস টফিস ছিল না। জীববিদ্যার ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম দিয়ে ঘরটা বোঝাই। উল্টোদিকের দেয়ালের গায়ে কয়েকটা ভাঙাচোরা কাঠের চেয়ার আর আলমারি। তাদের মধ্যে কাঁচের সেই বাক্স ছিল যাতে এককালে একটা কঙ্কাল রাখা থাকত। এবার বাক্সটা খুঁজে পেলাম আলমারিগুলোর পিছনে। ভিতরে আগের চেয়েও বেশি ধুলো। কিন্তু বাক্সে যিনি থাকতেন তিনি কোথায়?
বেরিয়ে আসার পথে কারমেনকে দরজার ধারে পাহারায় পেলাম। কারমেন রোডরিগেজ গোয়ানীজ ক্রিশ্চান মেয়ে। তাদের বিরাট পরিবারের সবকটা ভাইবোন প্রাইমারি ক্লাস থেকে বাংলা স্কুলে পড়েছে। কারমেন আমার সহপাঠিনী, কিন্তু আর্ট্স সেকশানে পড়ে। আমি সায়েন্সের ছাত্র হয়েও সংস্কৃত পড়তাম বলে কারমেনের সঙ্গে প্রায় রোজ দেখা হত। কারমেন যেমন রোগা, তেমনই বেঁটে। দেখলে মনে হয় ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। তবে তার মেজাজ মনীষা দত্তের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
- বাড়ি যাসনি? জিজ্ঞেস করি তাকে।
- আমি তো কাছেই থাকি। হেঁটে চলে যাব। তোর টাইম ঠিক যাচ্ছে না, তাও ছুটির পরে এই অন্ধকার ঘরে ঢুকেছিস কেন? প্রবলেমটা কী?
কারমেনের চেহারা ছোটখাটো হলে কী হবে, সে স্পোর্ট্সে ভালো এবং তার মধ্যে একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব আছে। মনে হল আজ ছুটির পর স্কুল বিল্ডিংয়ে আমার নিরাপত্তার ভার সে নিয়েছে।
কারমেনকে বললাম – আওয়ার হ্যাজ বীন ইজ নো মোর।
পরে দুজনে মিলে স্কুলের সবকটা খালি অফিস আর ল্যাবরেটরির কোণ ঝেড়ে জয়কিশোরকে খুঁজে বার করি। সে বলল – আরে ঠিক বলেছিস, হাড়ের ঢাঁচাটা ছিল ওখানে। তবে এদিক ওদিক ঘুরেও বেড়াত। কিছুদিন আগে এক ছুটে মহেন্দ্রবাবুর চলন্ত স্কুটারের পিছনের সীটে উঠে পড়ে আর ড্যাং ড্যাং করে তাঁর সঙ্গে বাড়ি চলে যায়।
এটা স্পষ্টত একজন কথাশিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখা বিবরণ। আমি একা হলে আসল ঘটনাটা আস্তে আস্তে বার করে নিতাম। কিন্তু কারমেন প্রথমেই আক্ষরিক অর্থটা লুফে নিয়েছে। তারপর সেটা হজম না হওয়ায় সে সন্দেহ প্রকাশ করে বলল - চলন্ত স্কুটারের পিছনে ওইভাবে ছুটে তো আমিও উঠতে পারব না, একটা কঙ্কাল পারল কী ভাবে?
জয়কিশোর কারমেনের এই প্রশ্নটার জন্য ওৎ পেতে ছিল। অমনি তার জবাব এসে যায়। - কারণ কঙ্কালদের খোপড়িতে তোর মতো ঘি ভরা থাকে না। আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না তো প্রিন্সিপালের কাছে যাচ্ছিস না কেন? তোদের জন্য সারাদিন তাঁর দরজা খোলা। দুধ কা দুধ, পানী কা পানী করে নে।
এসেছিলাম অলস কৌতূহলের নিবৃত্তি করতে। জয়কিশোর আমার সহপাঠিনীকে অপদস্থ করে তার গোঁ চাগিয়ে দিয়েছে। কারমেনের ছোটখাটো কিন্তু ফাইটার শরীরের পুরো শক্তিটাই আসে সেই গোঁ থেকে। সে কয়েক সেকেণ্ড জয়কিশোরের দিকে শীতল চোখে চেয়ে বলল – তাই হবে।
মহেন্দ্রবাবুর ঘরে ছুটির পরেও নিরন্তর লোকজনের আনাগোনা। আরেকটু অপেক্ষা করতে হয়। টীচারদের কাছে আজকাল আমাদের খাতির বেশি। দুদিন পরে একটা অকাজের সার্টিফিকেট নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যাব। কোথাও যার দর নেই। সেইজন্য মাস্টারদের সবার অপরাধবোধ।
মহেন্দ্রবাবু বললেন – বোস, বোস। কিছু খাবার আনিয়ে দিই? ক্যান্টিনে ডিমের কারি পড়ে আছে অনেকটা। সর্ষের তেলের লেয়ারটা এত পুরু আর সুস্বাদু হয়েছিল যে দুপুরে সবাই শুধু তাই খেয়েছে। ডিমগুলো প্রায় সবই বাঁচিয়ে নিয়েছি। তারপর তিনি একটু থেমে দেখলেন আমরা কেউ হাসছি কিনা। কারমেন গম্ভীর হয়ে রইল। আমি মহেন্দ্রবাবুর প্রিয় ছাত্রদের একজন, এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমার আসে না। লয়াল সোলজারের মতো ঠোঁটদুটো ডাইনে-বাঁয়ে রবারের মতো প্রসারিত করে দিয়েছিলাম। মহেন্দ্রবাবু আমার সমর্থন পেয়ে হিউক্-হিউক্ করে হেঁচকি-হাসি হাসতে শুরু করলেন।
কারমেন হাত তুলে বলল - ধন্যবাদ স্যর, ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে হেঁচকি তুলে তুলে আমি মরতে চাই না।
আমি একা হলে প্রিন্সিপালের সঙ্গে একটু গপ্-শপ্ হত। আমার সহপাঠিনীর বোধহয় বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার তাড়া। মহেন্দ্রবাবুর হাসির শিশিতে ছিপি এঁটে দেবার পর সে হাই-হ্যাল্লো কিছু না, সোজা লক্ষ্যের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল – আমাদের একটা হেরিটেজ কঙ্কাল ছিল। আজ জয় বার করেছে সেটা নিজের জায়গায় নেই। কিছু মনে করবেন না, জিনিসটাকে কি আপনি বাড়ি নিয়ে গেছেন?
কিছুক্ষণের নীরবতা। প্রিন্সিপাল আমার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছিলেন। যেন তাঁকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা হয়েছে আর আমি একটা পালাবার রাস্তা বাতলে দেব। কিন্তু কারমেন অতি ভালো মেয়ে। আমাকে সে একাধিকবার বাঁচিয়েছে। দরকারে আমাকেও তার পাশে থাকতে হবে। সুতরাং ভুরুটা তুলে দিলাম। যেন কারমেনের প্রশ্ন মানে আমারও প্রশ্ন।
- কে বলেছে?
- সবাই দেখেছে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে আপনি নিয়ে যাচ্ছেন।
মহেন্দ্রবাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন – ওঃ বুঝেছি। বাংলার মাস্টার ক্ষীরেন বাবুকে দেখেছে তার মানে। সারাদিনে এক কাপ চা খেতেন যিনি। স্কেলেটাল চেহারা, তার উপরে ডিমের সাদার মতো চোখ। বছরখানেক ধরে অদৃশ্য। নিজেই গায়েব হয়ে গেলেন না আমি চোখে ভালো দেখি না কে জানে।
- স্যর, একজন মানুষের চেহারা নিয়ে এরকম ঠাট্টা মোটেও ফানি নয়। আপনি ওনাকে লিফ্ট দিয়েছিলেন?
- ডাউটফুল। নট অন পারপাস। তবে স্কুটার স্টার্ট করার সময় আমার মাথায় কান ঢাকা হেলমেট থাকে। তোরাই বল, একটা তিরিশ কেজির লোক চুপি চুপি উঠে পড়লে ধরা যায়? কাশ্মীরী গেটের কাছে কোথাও লাফিয়ে নেমে গেলে জানবই বা কী করে? আমাকে কোনোদিন সে জন্য গাড়ি থামাতে হয়নি।
প্রিন্সিপাল কথাটাকে অন্যদিকে চালিয়ে দিয়েছেন। টেবিলের উপর চারটে ফাউন্টেন পেন। মহেন্দ্রবাবু দিনের শেষে কলমগুলোতে নিষ্ঠা সহকারে চার রঙের কালি ভরছিলেন। রয়্যাল ব্লু, ডীপ ব্লু, লাল, আর কালো। প্রথম তিনটে ব্যবহার হত অফিসিয়াল কাজে। শেষটা দিয়ে উনি বেনামে থ্রিলার লিখতেন বলে আমার ধারণা।
কারমেন উসখুস করছে। - আচ্ছা, ক্ষীরেন বাবুকে বাদ দেওয়া যাক। কঙ্কালটা যে নিজের জায়গায় নেই সেটা আপনি দেখেননি?
মহেন্দ্রবাবু খুব চিন্তায় পড়ে গেছেন। একটা পেনের টিউব খারাপ। ভালো করে কালি ভরছে না। ড্রয়ারগুলো ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলেন নতুন টিউব পাওয়ার আশায়। সেটা না মিললেও একটা পুরোনো কলম পাওয়া যায়।
- ক্যানিব্যালাইজ করতে হবে। ব্ল্যাডার ট্রান্সপ্লান্ট। প্রীত হয়ে সীটে ফিরে এসে বললেন মহেন্দ্রবাবু। - একটা সামান্য কঙ্কাল নিয়ে তোদের এত চিন্তা কীসের? গরীবস্য গরীবেরও চামড়ার নিচে নিজস্ব একটা কঙ্কাল আছে। মানছি সেটাকে কাছ-ছাড়া করতে নেই। কিন্তু প্রতিবেশীর কঙ্কালে কে লোভ করে? বিশ্বসুদ্ধু লোক একটা নিয়ে খুশি থাকে।
- এটা যে সে কঙ্কাল নয়। হেরিটেজ। লোকে বলে চলেও বেড়াত। আমরা অনেক ঘটনা শুনেছি। তবে বছর খানেক যাবৎ তার কোনো খবর ছিল না। আমরা দুজনেই ভাবছি যে গেল কোথায়। আপনি ছাড়া কে তাকে সরাতে পারে?
মহেন্দ্রবাবু আমাদের দুজনকে কয়েক সেকেণ্ড মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করার পর বললেন – হেরিটেজ কথাটা আসছে কোত্থেকে? কে তোদের মাথায় এটা ঢোকালো?
এবার মনে হল কারমেন একটু থতমত খেয়ে গেছে। আসলে তাকে আমি পম্পার নামকরণের গল্পটা বলিনি। হঠাৎ তার খেয়াল হয়েছে যে তাড়াহুড়ো করে অন্যের ওকালতি করতে যাওয়া খুব বুদ্ধির কাজ হয়নি। সে আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল – স্যর, জয় বলেছে কঙ্কালটা আমাদেরই এক প্রাক্তন শিক্ষকের। স্বাধীনতার আগে থেকে বিল্ডিংয়ে আছে। প্রায় সবকটা হাড় অন্তত একবার ভেঙে আবার নিপুণভাবে জোড়া হয়েছে। যার থেকে প্রমাণ হয় সে ব্রিটিশ জেলে ছিল।
আমার সহপাঠিনী স্পোর্ট্স্ ইঞ্জুরি খুব সিরিয়াসলি নিত বলে শেষ তথ্যটা আমি তার জন্য স্বহস্তে পাক করেছিলাম। বাকিটা পম্পার চিঠি থেকে পেয়েছি।
মহেন্দ্রবাবু জুল জুল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রিন্সিপালের সঙ্গে আমার একটা মিল হল এই যে দুজনেই বেনামে গল্প ছাপাই। উনি আমার ব্যাপারটা জানেন না, কিন্তু আমি ওনারটা জানি। বেশ কিছু লেখা খুঁটিয়ে পড়েছি বলে ভাবতাম অন্যদের চেয়ে মহেন্দ্রবাবুর সাইকলজি ভালো বুঝি। কোনো সাফাই না গেয়ে বল প্রিন্সিপালের কোর্টে ফেরত পাঠাবার জন্য বললাম – ডু ইউ ডিনাই ইট?
মহেন্দ্রবাবু টেবিলের উপর দুহাত ছড়িয়ে দিলেন। তারপর ভাজা মাছ উলটে খেতে জানেন না এমন মুখ করে বললেন – নাইদার ডিনাই, নর কনফার্ম। দ্যাখ, আমি তো এই ইস্কুলে নতুন। নিউ বয়। তোদের চেয়ে বেশি কী করে জানব?
এই বুলশিট ব্যাখ্যা শোনার পর আমি আর কারমেন নির্বাক হয়ে পরস্পরের দিকে চাইছি। যাঁর হাতে স্কুলের সব চাবি, যিনি প্রতিটি ম্যানেজিং কমিটির মীটিংয়ে থাকেন, যাঁর অনুমোদন ছাড়া স্কুলের একটা জিনিস এ ঘর থেকে ও ঘরে নিয়ে যাওয়া যায় না, এমনকী টিচার্স ক্যান্টিনের মেনু যিনি ঠিক করেন, সেই প্রিন্সিপাল নিজেকে অম্লানবদনে নিউ বয় বলছেন! বাণ মাছের মতো পিছলে এই মানুষটাকে নিয়ে যতই ধস্তাধস্তি করা হোক না কেন, হাতে পড়ে থাকবে ফক্কা।
কারমেনের বাড়ি ফেরার তাড়া। বেচারা স্কুলের পর আমার সন্দেহজনক হাবভাব দেখে পিছু নিতে গিয়েছিল। এখন আটকা পড়ে গেছে। সে আচমকা খুব ব্যগ্র হয়ে গিয়ে বলল – স্যর, ভালোই বোঝা যাচ্ছে যে আপনি কিছু লুকোচ্ছেন। জোর করে লাভ নেই, তবে মনে রাখবেন গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের ক্লাস আপনাকে যেরকম সাপোর্ট করে এসেছে সেরকম কেউ করেনি। যখনই স্কুল কমিটি থেকে আপনার বিরুদ্ধে প্যাঁচ কষা হয়েছে, আমরা বাবা-মা’কে পাঠিয়েছি আপনার সপক্ষে কথা বলার জন্য। আপনি কোনো অপরাধ করলেও আমরা কোনোদিন ধরিয়ে দিতাম না। কোথায় গেলে আমাদের মতো সাপোর্টার পেতেন? একটু ভাববেন সেটা।
ছোটখাটো কারমেনের মুখ দিয়ে এত বড় একটা কথা বেরোতে পারে এটা বোধহয় মহেন্দ্রবাবু ভাবতে পারেননি। যত্নের সঙ্গে ধরা পার্কার কলমটা তাঁর হাত থেকে ধীরে ধীরে খসে গেল। পিছিয়ে গিয়ে চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে তিনি বললেন – আহাহা রাগছিস কেন? তোরা আর তোদের ক্লাস থেকে ফেল করে নিচে নেমে যাওয়া তিন চারজনের ভরসায় তো আছি। সেটা কি মানি না?
- অন্তত আমার আর জয়ের কাছে সত্যি কথাটা বলতে পারতেন। আমরাও সিক্রেট রাখতে জানি। হাউ স্যাড যে নিজের স্বপক্ষের স্টুডেন্টদেরও বিশ্বাস করতে পারলেন না।
- ওঃ। নো, নো, নো… ডোন্ট মিস-আণ্ডারস্ট্যাণ্ড প্লীজ…
- আই ওয়াণ্ডার… আই ওয়াণ্ডার…।
কারমেনের কথার ফাঁসে বাঁধা পড়ে গিয়ে পরে আকাশের দিকে চেয়ে উদাসভাবে বলেছিলেন মহেন্দ্রবাবু। - মাই মাইণ্ড ওয়্যাণ্ডার্স লাইক এ ক্লাউড…। লোকটার বিবেচনাবোধ কি যথেষ্ট ছিল?
- কেয়া মতলব? কারমেন হতবুদ্ধি হয়ে শুধোয়।
- যতই শখ থাকুক, কঙ্কাল তো? কতবার শুনতাম সন্ধ্যেবেলা কাউকে তাড়া করেছে বা রাতে ট্যাক্সি ধরার চেষ্টা করে শহরে আমাদের বদনাম রটিয়েছে। ঝমঝমে বৃষ্টির মধ্যে কাদা মেখে এসে স্কুল ইন্সপেক্টার গুরুমূর্তি সাহেবকে মাড-রেস্লিংয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিল। স্কুল কমিটিতে সবাই তো ঐতিহ্যের চেলা নয়। তাদের মতে এরকম কাউকে স্কুলে রাখা যদি গ্রেট রিস্ক না হয় তো অন্তত একটা মেজর নুইসেন্স। আমরা দু-চারজন শিক্ষক কয়েকটা ইউজলেস ফেমুর আর ফিবুলার জন্য কত লড়ব? ময়েস্চার লেগে সব ক্ষয়েও যাচ্ছিল। এদিকে লোকটা কারো কথা শোনে না। জল থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতাম। সকালবেলা দেখা যেত মাঠের ধারে পাঁচিলে বসে সারারাত বৃষ্টিতে ভিজেছে। পরের দিকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার দিয়ে জুড়ে রাখা সম্ভব হত না। পা-গুলো বডি থেকে আলাদা হতে থাকে। একদিন পা ছাড়াই পেটের উপর ঘষটে ঘষটে কেয়ারটেকারকে তাড়া করে যায়। কেয়ারটেকার পালাবার সময়ে ইঁট ছুঁড়েছিল। সেবার বলতে গেলে একটা ছালায় ভরে মাটি থেকে তুলে আনতে হয়। যতটা পারি জুড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু কাঁহাতক এভাবে চলে? মিউজিয়ামে প্রদর্শনী করাবার মতো অবস্থা আর ছিল না। তো বাক্সটাকে নজরের আড়ালে চালান করে দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।
- আর বাক্স থেকে কঙ্কাল সরাল কে?
- নিজেই অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়ে গেছে কিনা কে বলতে পারে?
মহেন্দ্রবাবু সীট ত্যাগ করে শিষ্টাচারসম্মত ভাবে জানিয়ে দিতে চাইলেন আমাদের জেরা শেষ। কারমেন আমার মতো ছোটলোকদের পাড়ায় বড় হয়নি। জিলিপির মতো প্যাঁচালো, সন্দেহের ঘিয়ে ভাজা, অভদ্র, পাপাত্মা ব্রেন কোথায় পাবে? দুহাতে স্কার্টটা সমান করে সেও উঠে পড়ছিল। কনুইতে টোকা মেরে তাকে উঠতে বারণ করলাম। একটু পরে দেখা গেল মহেন্দ্রবাবু দাঁড়িয়ে পড়েছেন কিন্তু আমরা দুই ছাত্র ছাত্রী গ্যাঁট হয়ে কুর্সীতে বসে আছি।
- আরো কিছু বলার আছে নাকি?
মহেন্দ্রবাবু কাদের সবচেয়ে বেশি ভয় পান সেটা নিয়ে আমার একটা থিওরি ছিল। যাবার আগে একবার সেই চাকটায় ঢিল মারার জন্য জিজ্ঞেস করলাম – স্কুল কমিটি কি কঙ্কালটাকে গায়েব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
প্রিন্সিপালের আতঙ্ক দেখে মনে হল কঙ্কালভরতি কাবার্ডের দরজায় টান পড়ে গেছে। ভুরু টুরু কুঁচকে মহাকাশে উত্তর খুঁজছিলেন। যেন ইতিহাসের শিক্ষককে আমি লোনীর দ্বিতীয় ভাগ থেকে ট্রিগ্নোমেট্রির আইডেন্টিটি প্রমাণ করতে দিয়েছি। বেচারাকে সময় দেওয়ার জন্য উঠে গিয়ে টুলের উপর রাখা লাল মাটির কুঁজো থেকে খানিকটা জল খেয়ে আসি। আমি সীটে ফিরে আসার পর মহেন্দ্রবাবু হঠাৎ জেগে উঠে বললেন – ও হ্যাঁ! মনে পড়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এর পরের বার হারিয়ে গেলে আর খোঁজার চেষ্টা করা হবে না।
এতক্ষণ কারমেন মুগ্ধ বিস্ময়ে প্রিন্সিপালের ধরি মাছ না ছুঁই পানী হাবভাব দেখছিল। এবার তার উত্তেজিত গলার পর্দা চড়চড় করে পাঁচতলায় উঠে যায়। - স্যর, এটা আপনি আগে বলেননি তো! কবে নেওয়া হল এই ডিসিশান? আমরা কেউ জানতে পারলাম না কেন?
মহেন্দ্রবাবুর মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম তিনি কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছেন। অ্যাসাইলামের এক্স-ওয়ার্ডেন আস্তে আস্তে উঠে ঘরের কোণ থেকে একটা বড় সাইজের স্যুটকেস তুলে নিলেন। র্যাকের উপর তাঁর হেলমেটটা ছিল। সেটাও এনে রাখলেন টেবিলের উপর। কী হচ্ছে ধরতে না পেরে কারমেন আমার দিকে তাকাচ্ছে আর আমি ভাবছি এবার বোধহয় ভদ্রলোক আমাদের বসিয়ে রেখেই ঘর থেকে পালিয়ে যাবেন।
- ডিসিশান এই গরমের ছুটির অধিবেশনে হয়েছে। কোনো অভিভাবক আসেনি। নট এ সিঙ্গল্ ওয়ান। হেলমেটটা মাথায় ব্যালান্স করে শেষে জানালেন প্রিন্সিপাল মহেন্দ্র রায়। - বিশ্বাস কর, আমরা কয়েকজন আটকাবার চেষ্টা করেছিলাম। কাজ হয়নি। ম্যানেজিং কমিটিতে সেকেলে কিছু আইটেম ঢুকে গেছে, বুঝলি? তারা দিল্লীতে বসে স্টাফ মেম্বারদের অ্যাপিয়ারেন্স মফস্বলের উপযোগী করতে চায়। আমাদের হর্স ট্রেডিং-এ নামতে হল। কঙ্কালটা স্যাক্রিফাইস করি। কিন্তু হেয়ার-কাট, বুক খোলা শার্ট, সোনার চেন এইসব বাঁচিয়ে নিয়েছি।
গুড গড! তার মানে কমিটির ডিসিশানের পর তিন মাসও হয়নি। আর কয়েকটা দিন আগে কেন পম্পা আমাকে হ্যাজ বীনের গল্পটা বলতে পারল না? প্রস্তাব যখন পাশ হয়ে গেছে তখন বিজনবাবুর মতো কোনো অতি উৎসাহী নাগরিক এসে কঙ্কালটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন নির্ঘাত। সেইজন্য আমি বাক্স ফাঁকা পেয়েছি।
- হোয়াট অ্যাবাউট আমাদের স্কার্ট? কারমেন জানতে চায়।
ভয় অমূলক নয়। মেয়েদের স্কার্টের স্পেসিফিকেশান নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ আগেও কমিটি বসিয়েছে। মহেন্দ্রবাবু আশ্বাস দিয়ে জানালেন আমাদের প্রতিবেশী কনভেন্ট স্কুলগুলো লেংথ না বাড়ালে সেটা আউট অফ স্কোপ।
আমরা অবশেষে সীট ছেড়ে উঠতে বাধ্য হই। কারমেন প্রিন্সিপালের উপর বেশ খুশি হয়েছে বোঝা যায়। মহেন্দ্রবাবু স্যুটকেসটা টেবিলের উপর ফেলে তার থেকে একটা কিছু বার করছিলেন।
ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। স্যুটকেস থেকে দুটো ভাঙাচোরা কাঠির মতো বিচিত্র জিনিস নিয়ে প্রিন্সিপাল সেলোফেন পেপারে জড়াতে লাগলেন। আমাদের বললেন – দাঁড়া, দাঁড়া। এ দুটো তোরা নিয়ে যা।
- এগুলো কী, স্যর? কারমেন জিজ্ঞেস করে।
মহেন্দ্রবাবু ম্লান হেসে বললেন – তোদের হেরিটেজের অংশ। বাকিটা ইজ ইন মাই স্যুটকেস।
আমি আর কারমেন দৌড়ে গিয়ে স্যুটকেসে উঁকি মেরে চোখ চড়কগাছ করে দেবার মতো দৃশ্যটা দেখতে পাই। প্লাস্টিকে জড়ানো খুলি। পলিথিনের পরতে সাজিয়ে রাখা হাড়। গোটা কঙ্কালটাকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফিট করা হয়েছে। মহেন্দ্রবাবু বললেন – কাউকে বলিস না, ম্যানেজিং কমিটি জানে জিনিসটা লোপাট হয়ে গেছে। কিন্তু একটা ঐতিহাসিক পুরুষ তো? কত ঘটনার সাক্ষী। যেখানে সেখানে ফেলতে মন চাইছিল না। ঠিক করেছিলাম দশহরা অবধি চুপচাপ রেখে দেব। দশমীর দিন স্কুল থেকে একটা বলদের গাড়ি প্রতিমা বিসর্জন দিতে যায়। তখন স্যুটকেসের ভিতরে যা আছে তাও যমুনায় যাবে।
কারমেন আর আমি থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মহেন্দ্রবাবু সেলোফেনের বাণ্ডিলদুটো আমাদের মুঠোয় গুঁজতে গুঁজতে সত্যদ্রষ্টা ঋষির মতো বললেন – একলব্য তার প্রিন্সিপালকে একটা বুড়ো আঙুল দান করেছিল। আজ আমি পৃথিবীর সমস্ত প্রিন্সিপালদের তরফ থেকে আমাদের ঐতিহ্যের দুটো থাম্বই দুজন বিশিষ্ট স্টুডেন্টকে প্রেজেন্ট করে দিচ্ছি। তোদের জীবনের সব বাধা বন্ধ দূর হোক। তোরাও সবার স্বার্থে বাকিটা ত্যাগ কর, এবং এ নিয়ে আর শোরগোল করিস না।
কথাগুলো শেষ হবার আগেই কারমেন সেলোফেনে মোড়া জিনিসটা হাতে নিয়ে ফেলেছিল। এক ঝটকায় বাণ্ডিলটা মহেন্দ্রবাবুর বুক পকেটে ফেরত দিয়ে সে তীব্র ঘেন্নায় ককিয়ে ওঠে।
- হাই ক্যান ইউ ডিস্মেম্বার এ পার্সন? স্যর, এটা ভী-ষ-অ-অ-অ-অ-ণ আন-এথিকাল!
প্রিন্সিপাল সাহায্যের জন্য নিরুপায় দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে চাইলেন। আমি কারমেনের পক্ষ নিয়ে বলি – ওগুলো স্যুটকেসে জলদি ফেরত পাঠান, প্লীজ। কঙ্কাল হয়ে গেলেও একটা মানুষকে এভাবে অশ্রদ্ধা করা উচিত না।
মহেন্দ্রবাবু বিস্মিত হবার ভান করে বললেন – জলে ফেলার পর কী হবে বল? কয়েকটা পার্ট ঢুকবে কচ্ছপের পেটে। কুমীর গিলবে কিছু। সতীর গল্প ভুলে গেছিস? কোনো কিছু অখণ্ড থাকে না। অ্যাশেস টু অ্যাশেস যখন হবেই তখন নিজেদের কাছে এক আধটা পার্ট্স্ রেখে দেওয়ায় কী দোষ? পরে লোকজনকে দেখাতে পারবি। আমাদের স্কুল গরীব। বাজেট এত কম যে ফেয়ারওয়েলের সময়ে কমিটির অনুমতি নিয়ে প্রতি বছর গিফ্ট হিসেবে ভাঙা চেয়ার, টুল, সিলিং ফ্যান এইসব ছাত্র-ছাত্রীদের ধরিয়ে দিই। এবছর তোরা তার বদলে এগুলো নিয়ে নে।
- স্যর, এসব হিউম্যান রিমেইন্স্, কোনো ট্রফি না। কারমেন আমাদের প্রিন্সিপালের বেহুঁশ বিবেক জাগ্রত করার চেষ্টা করে। - আমরা চাইলেও আপনার পক্ষে এইভাবে একটা নির্দোষ কঙ্কালকে টুকরো টুকরো করে উপহার দেওয়া শোভা পায় না।
- নিঃসন্দেহে ক্রিমিনাল অ্যাক্ট। আমি আইনী ঝুঁকির ব্যাপারটা মনে করিয়ে দিই।
মহেন্দ্রবাবু ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে বললেন – লাস্ট ইয়ার একটু বেশি ছাত্র বেরিয়েছিল। যথেষ্ট কন্ডেম্ড্ ফার্নিচার পাওয়া যায়নি বলে চারখানা আচ্ছা-ভালা চেয়ার আমায় লুকিয়ে ভাঙতে হয়েছে। তোরা এগুলো অ্যাকসেপ্ট করলে এ বছর দুটো পীস বাঁচাতে পারতাম।
একটু আগে অবধি কারমেনের মনে মহেন্দ্রবাবুর একটা সুন্দর ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছিল। এবার সে বীতশ্রদ্ধ হয়ে, ‘আমার কোনো চেয়ার লাগবে না’, বলে ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
কারমেন মাঠ ভেঙে হন হন করে চলে যাচ্ছে। আমি কী করছি দেখার জন্য পিছনে ফিরে যখন সে তাকাচ্ছে না তখন আমিও মহেন্দ্রবাবুর অফিস থেকে বেরোবার বিশেষ তাড়া অনুভব করছিলাম না। প্রিন্সিপালকে সাহায্য করার জন্য টেবিলে ফিরে গিয়ে স্যুটকেসটা গুছিয়ে দিই।
মহেন্দ্রবাবু বুড়ো আঙুলদুটো স্বস্থানে ফেরাবার চেষ্টা করছিলেন। আমাকে বললেন – হর্ষ, তোকে আগেও বলেছি তোদের ক্লাসটা সবচেয়ে কম মেটিরিয়ালিস্টিক। জানতাম কয়েকটা হাড়ে কারো ইন্টারেস্ট হবে না। তোরা খুঁজছিস মাস্টার্স অফ দা ইউনিভার্স হবার চাবি।
মহেন্দ্রবাবু আমাকে কখনো অশোক, কখনো আকবর বলে ডাকেন। আজ আমি হর্ষ।
দেরাজ ঘেঁটে কাঁচি আর সেলোটেপ বার করেছিলাম। তাই দিয়ে আঙুলদুটোকে যত্ন সহকারে বাকি শরীরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া গেল।
- সুভানাল্লা। বললেন মহেন্দ্রবাবু। - কঙ্কালটার মধ্যে একটুও জীবনীশক্তি অবশিষ্ট থাকলে আজ তোর গলা জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা জানাত। ওর দুর্ভাগ্য, আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যমুনায় ভেসে যাবে।
- স্যর, স্কুলের এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে জলে ভাসাবার কোনো মানে হয় না। এটা আপনি আমার জিম্মায় ছেড়ে দিন।
স্যুটকেস বন্ধ করার পর মহেন্দ্রবাবুর দিকে এগিয়ে দেওয়ার সময়ে অনুরোধটা করেছিলাম। কেন জানি না, আমার মনে হচ্ছিল আজকের ঘটনাগুলো যে ঘটবে তা বহুদিন আগে থেকে ঠিক করা ছিল। কঙ্কালটা আমার সঙ্গে যাবে বলেই আজ আমাকে ল্যাবরেটরিতে টেনে ঢুকিয়েছে।
প্রিন্সিপালের মুখ অল্প হাঁ। তিনি আমার বাড়িয়ে দেওয়া স্যুটকেস হাতে নিতে পারলেন না।
- কী বললি?
- আমিও টুল-চেয়ার চাই না। তার বদলে এই অখণ্ড কঙ্কালটা চাইছি। হাত জোড় করে বললাম।
- একটা মেটিরিয়াল জিনিসে লোভ করছিস তুই? হর্ষ হয়ে? গোটা থানেশ্বর তোকে দিয়ে দিয়েছি!
- স্যর, থানেশ্বর আমার খাটেশ্বরের নিচে ফিট করবে না। এই লাওয়ারিস জিনিসটা আমার হাওয়ালে করে দিতে আপনার কোনো অসুবিধে আছে? কেউ এটাকে চায় না। ম্যানেজিং কমিটিও ভাবে অলরেডি লোপাট। তো আমায় দিতে ক্ষতি কী? আমি আজই এটা স্কুল থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারি।
- নিবি কীসে? রাখবি কোথায়?
- স্যুটকেস লাগবে না। বড়ো প্লাস্টিকের থলেতে করে নিয়ে যাব। মিথ্যে বলিনি, আপাতত রাখব খাটের নিচে। নেক্সট ইয়ার আমরা নতুন ফ্ল্যাটে উঠে যাচ্ছি। তখন আমার নিজস্ব ঘর হবে।
- তোর মা জানতে পারলে?
প্রিন্সিপাল ঠিকই ধরেছেন। মা জানলে তুলকালাম করবে। তবে একটা গল্প বানিয়ে আমি সাধারণত মা’কে সামলে দিতে পারি। দরকারে প্রবুদ্ধও আছে। তার ঘরে অঢেল জায়গা। প্রিন্সিপালকে বলি - এসব আমার ভাবা হয়ে গেছে স্যর।
মহেন্দ্রবাবু আবার নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে আমাকেও বসতে আহ্বান করলেন। - আয় একটু বোস। এত যখন ভেবেছিস তো আরেকটু ভাবা যাক। একটা কঙ্কাল খাটের নিচে থাকবে আর তোর ভয় করবে না? রাতে যদি জ্যান্ত হয়ে বেরিয়ে আসে? এক লাফে বুকে চেপে বসে যদি?
- স্যর, এসব কিছু করার ক্ষমতা নেই বস্তুটার।
- আর ইউ শিয়োর? সন্ধ্যেবেলা বড়ো রাস্তায় গিয়ে গাড়ি থামাবার চেষ্টা করেছে। কেয়ারটেকারকে তাড়া করেছে। পাঁচিল থেকে আমি নিজে পেড়ে এনেছি একদিন।
- কিছু মনে করবেন না, খোলাখুলি বলছি, এসব যাদের কাণ্ড তাদের আপনারা চিনে ফেলেননি ভাবতে আমার অসুবিধে হয়। খুলির পিছনে অবধি ছেলেদের নাম খোদাই করা আছে।
মহেন্দ্রবাবু অধোবদন হয়ে রইলেন একটু। প্রতিবাদ করলেন না। স্বীকারও করলেন না। তারপর বললেন – যা কিছু রটে তার কিছু তো বটে। অ্যাঁ! একেবারে ফাউন্টেন পেনের মতো একটা নির্বিষ জিনিস হতে পারে কি? সর্পে রজ্জুভ্রম ঘটলে কী সর্বনাশ হবে সেটা ভাবতে পারছিস?
আমি এবার একটু অধৈর্য হয়ে উঠেছিলাম। চেয়ারে বসে পড়ে বললাম – স্যর, জিনিসটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট বায়োলজিকাল না। বেশ কিছু পার্ট্স্ ব্যাকেলাইট জাতীয় কিছু দিয়ে তৈরী। ম্যাস্কুলিন স্কেলেটাল মডেল। সব জুড়ে তারপর পুরোটাকে কালার ম্যাচের জন্য রং করেছে। জ-বোনের পিছনে এককালে একটা ম্যানুফ্যাকচারারের নামও ছিল। ঘষে ঘষে উঠে গেছে। আপনি জানতেন না?
মহেন্দ্রবাবু সামনে ঝুঁকে পড়ে বললেন – তাই নাকি? তুই কবে থেকে জানিস?
- অন্তত বছর চারেক। আমি ছাড়াও অনেকে কঙ্কালটা নেড়েচেড়ে দেখেছে।
- কেয়ারটেকারকেও কি তোরাই তাড়া করেছিলি?
- অ্যাবসোলিউটলি না। আমাদের ক্লাসের কেউ এরকম হৃদয়হীন নয়। কারমেন বেচারা তো ভুলেই গেছিল জিনিসটার কথা।
মহেন্দ্রবাবু আরো খানিকক্ষণ আমার চোখে চোখ রেখে কী দেখলেন কে জানে। তারপর বললেন – কেন তুই হাত ধুয়ে এটার পিছনে পড়ে গেছিস বলতো? কারমেনের কোনো দায় নেই। তুইই ওকে টেনে এনেছিলি সঙ্গে। এর মধ্যে একটা কোনো অভিসন্ধী আছে যেটা তুই চেপে যাচ্ছিস। হর্ষ, তোর গেমটা কী?
মহেন্দ্রবাবু আমাকে বিশ্বাস করতেন না। যেমন আমি তাঁকে কোনোদিন পুরোপুরি চিনে উঠতে পারিনি। কিন্তু চোখে চোখ রেখে কথা বলার সময়ে আমরা দুজনেই দৃষ্টিতে একটা খাঁটি সততার স্বচ্ছ আলো ফোটাতে পারতাম। বললাম - কোনো গেম টেম নেই, স্যর। পুরোনো জিনিসের প্রতি আমার চিরকাল একটা শ্রদ্ধা আছে। তাছাড়া এটা আমাদের স্কুলের ইতিহাসের অঙ্গ। কত কী কাণ্ড ঘটিয়েছে এই কঙ্কালটা ভাবুন।
- তুই নিজেই স্বীকার করেছিস সে কাজগুলো আসলে কোনো মানুষের কীর্তি।
কোন কীর্তিগুলো খোদ মহেন্দ্রবাবুর তা আমি জানি না। সেদিন তাঁকে আমি আমার উদ্ভট উদ্দেশ্যের কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারিনি। কিন্তু আমার মুখ দেখে প্রিন্সিপাল বুঝে গিয়েছিলেন একটা ইলেভেনের ছেলে যখন তার স্কুলের কন্ডেম্ড্ কঙ্কালটাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায় তখন তাকে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করা যায় না।
আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে মহেন্দ্রবাবু হঠাৎ মনস্থির করে উঠে পড়েন। - রিটায়ার্ড সুটকেসটাও নিয়ে যা তাহলে। তোদের ইস্কুলেরই সম্পত্তি।
হেলমেট খুলে রাখার পর তিনি কোত্থেকে ব্রাউন পেপার নিয়ে এসেছিলেন। তা দিয়ে কঙ্কালটাকে ভালো করে জড়িয়ে আমরা হাড়গুলো চোখের আড়াল করে দিই। মহেন্দ্রবাবুর পরামর্শ অনুযায়ী তার উপর কয়েকটা স্কুল ম্যাগাজিন আর অ্যানুয়াল ডে’র ব্রোশিওর রাখার পর স্যুটকেসের ডালা লক করা হয়।
- পারবি তো বয়ে নিয়ে যেতে?
- খুবই হালকা, স্যর।
আমরা দুজন একসঙ্গে অফিস থেকে বেরিয়েছি। মহেন্দ্রবাবু আমাকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে বাস স্টপ অবধি পৌঁছে দিলেন। জানি না বিল্ডিং থেকে জয়কিশোর আমাদের দেখেছিল কিনা, এবং দেখে থাকলে বুঝেছিল কিনা মহেন্দ্রবাবুর স্কুটারে চেপে হ্যাজ বীন সত্যিই আজ স্কুলের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
পরে আমাকে বাস স্টপে নামিয়ে দিয়ে মহেন্দ্র রায়ের ল্যাম্ব্রেটা যখন ঘুরে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন আমি তাঁর একটামাত্র প্রশ্নের মিথ্যে উত্তর দেবার জন্য মনে মনে ক্ষমা চেয়েছিলাম।
আসলে গেম আমার একটা ছিল। তবে সেটা বলার মতো না।
দু বছর আগে, স্কুলের করিডর দিয়ে মহেন্দ্রবাবুর এক ছাত্রী যাচ্ছিল। এই ছাত্রীর নামকরণ অভিভাবকদের হাতে না হয়ে হয়তো তার স্কুলের প্রিন্সিপাল বা কোনো বেয়াড়া ছাত্রের হাতে সমাধা হয়। ঠিক সকাল দশটা বেজে সাতাশ মিনিটে মেয়েটি কাউকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে আমার সঙ্গে টক্কর খেয়েছিল। তারপর থেকে আজ অবধি আমাদের দুজনের কেউ এ বিষয়ে তৃতীয় কারো সঙ্গে আলোচনা করেনি।
এই মামুলি দুর্ঘটনা কিন্তু কোনো দুষ্টু ছাত্রের কাজ নয়। মহেন্দ্র রায় নামের খামখেয়ালী গ্রহও এই দুর্লভ লগ্নে নিজের ছায়া ফেলেনি। এর কেন্দ্রে ছিল মিস্টার হ্যাজ বীন নামক আমাদের স্কুলের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। দেব দানব যক্ষ রক্ষ জিন ভূত, সে যাই হয়ে থাকুক না কেন, একটা ষোলো বছরের তরুণী যখন মন-প্রাণ দিয়ে তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছিল তখন চেনা-অচেনার ওপারে দাঁড়িয়ে শ্রী হ্যাজ বীন সেই মেয়েটার একাগ্রতার স্রোত অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলেছিল – যা, ওই রাস্তার খেলনাটাকে কুড়িয়ে নে।
কাহিনীর এই অংশ জানার পর থেকে আমার মনে একটা অলৌকিক বিশ্বাস জন্ম নেয়। একদিন হয়তো সেই মেয়েটাকে চণ্ডীগড় থেকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনতে এই কঙ্কাল পুরুষই আবার সাহায্য করবে।
এই হল আমার ঐতিহ্যপ্রিয়তার কারণ। মহেন্দ্রবাবুর প্রশ্নের উত্তরও ছিল সহজ। রাস্তা থেকে কুড়োনো খেলনারা দ্বিতীয়বার রাস্তায় ফিরে যেতে চায় না। এছাড়া তাদের আর গেম কী?
অনেকদিন আগে পম্পা আর আমি দুটো নির্বোধ বেবি অস্টিন গাড়ির মতো অ্যাস্টেরয়েড বেল্টের হাই স্পীড করিডরে ঢুকে পড়ি। পরস্পরের গায়ে আছড়ে পড়ার পর আমরা যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম তখন ভাগ্যিস কেউ আমাদের ধারে কাছে ছিল না। নইলে আমি তার দিকে নির্লজ্জের মতো চেয়ে থাকতাম না আর সেটা ধরে ফেলার জন্য পম্পা মুখার্জি কিছুতেই ফিরে তাকাত না।
দূরে মিলিয়ে যাওয়া ল্যাম্ব্রেটার এগজস্টের দিকে তাকিয়ে সেদিন আমাদের প্রিন্সিপালকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলাম – আই অ্যাম সরি, স্যর। আমার গেমটা সাধারণ হলেও খুব প্রাইভেট। তাই বলা গেল না।
সৌরমণ্ডলের অকিঞ্চিৎকর দুর্ঘটনাগুলোর সাক্ষী থাকা ঠিক নয়।