



১.
তখন আমি বছর পাঁচেক। পুজোর জামা কেনা হয়ে গেছে। কেনার পরদিন থেকে রোজই একবার করে পরে দেখি আর অগুন্তি বার নতুন জামার গন্ধ শুঁকি। পুজোর আর বেশি দেরি নেই। এরই মাঝে শুরু হল বৃষ্টি। কয়েকদিনের নাছোড় বৃষ্টিতে মাঠ ঘাট পুকুর ডোবা টইটুম্বুর। বড়দের মুখে উদ্বেগ। দিনে দিনে তা বৃষ্টির মতোই বাড়তে থাকল। সবাই বলাবলি করে, বান আসবে নাকি! উৎকন্ঠা নিয়ে রেডিওতে কান পেতে থাকে সবাই। ‘স্থানীয় সংবাদ’ জুড়ে শুধুই জলের কথা। লোকের মুখে মুখে ফেরে কোন্ গ্রাম ডুবল, কোন্ বাঁধ ভাঙল, আরও জল বাড়লে নতুন করে কোন্ গ্রাম জলের তলায় যাবে, এই সব।
আমাদের মাটির বাড়ি। আমাদের দেবীপুর গ্রামে দু -চারটে বাড়ি বাদ দিলে সবারই মাটির বাড়ি। তবে গ্রামের সবার বেশ গর্ব ছিল। সবাই বলত, গ্রাম আমাদের খুব উঁচু। তাই সহজে ডুববে না। মা-বাপী নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, “ঘরের পিছনের গাংদালিটা বর্ষার আগেই বাঁধিয়ে নিলে নিশ্চিন্ত থাকা যেত।” মাটির ঘরের দেওয়ালের পিছনের একদম নিচের দিকের অংশটাকে ‘গাংদালি’ বলে সেদিন জানলাম। সেটা বাঁধানো থাকলে মাটির বাড়ি সহজে পড়ে যায় না। আমার তখনও স্কুলে যাওয়ার পালা শুরু হয়নি। তাই নিয়ম করে পড়াশোনা নেই। ঘুরতে ফিরতে সবার কথা শুনতে থাকি। শুনে বুঝতে পারি একটা ভয়ের কিছু ঘটছে। বান কী জিনিস, কেমন দেখতে, তখনও ঠিক কল্পনা করতে পারছি না। একটু মজা হচ্ছে, বান দেখব। বড়দের মুখ দেখে আবার ভয়ও হচ্ছে। সবার ক্ষেতের সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। বাজার-দোকান যাওয়ারও উপায় নেই। ঘরে যা সঞ্চয় ছিল তাই দিয়েই মা রান্না করছে।
রেডিওর খবর থেকে সদ্য দুটো নতুন শব্দ শিখেছি। “বিপদ সীমা” আর “কিউসেক”। একদিন দুপুরে খবরে বলল ডিভিসি যেন আবার কত লক্ষ কিউসেক জল ছেড়েছে। বাপীর মুখ থমথমে হয়ে গেল। মাকে বাপী বলল, “নাহ্, ভাল বুঝছি না। আজ রাতটা সতর্ক থাকতে হবে।” সেদিন রাতে আমাদের পাড়ার খেলার উঠোনটায় জল উঠল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম সামনের পুকুরটা যেন আমাদের বাড়ির দোরগোড়ায় চলে এসেছে। দেখতে দেখতে জল বাড়ির মধ্যেও ঢুকে এল। বেলা যত বাড়তে লাগল বাড়ির মধ্যে জলের স্রোতও বাড়তে থাকল।
২.
ক’দিন ধরেই আমরা খুব মাছ খাচ্ছিলাম। আমাদের গ্রামের দুলে বাগদি পাড়ার ছেলে বউরা খুব মাছ ধরছিল। ছিপ দিয়ে, ঘুনি বসিয়ে, জাল ফেলে। প্রচুর মাছ। দিনের মধ্যে বেশ কয়েক বার ওরা পাড়ায় মাছ বিক্রি করতে আসত। কিন্তু সেদিন আর কেউ মাছ বিক্রি করতে এল না। বাড়িতে আর কোনও সবজিও নেই। আমাদের উঠোনে একটা লম্বা পেঁপে গাছ ছিল। মা বাঁশের লগা দিয়ে একটা কাঁচা পেঁপে পাড়ল। কিন্তু পেঁপেটা গাছ থেকে পড়ে জলের তোড়ে কোথায় যে চলে গেল মা আর খুঁজে পায় না। আমি দোরে বসে দেখছি মা উঠোনের মধ্যে এক হাঁটু জলে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়ে পেঁপে খুঁজছে আর কাঁদতে কাঁদতে বলছে “হায় হায়! পেঁপেটা পাইয়ে দাও ঠাকুর, কী দিয়ে আজ ছেলেমেয়েদের ভাত দেব!” মাকে দেখে আমার খুব কান্না পাচ্ছে তখন। শেষমেশ পেঁপেটা পেয়েছিল বেশ খানিকটা দূরে। সেদিনকার মতো তরকারি হয়েছিল।
ডিভিসি জল ছাড়লে, দামোদর ফুঁসতে থাকে। সেই সঙ্গে ভাসে তার দুকুলের সব গ্রাম। বাপী ডিভিসিকে বলত ‘ডোবানো ভাসানো কর্পোরেশন’! আমাদের হাওড়া জেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে দামোদর নদ। তার এক শাখা ‘কানা দামোদর’ আমাদের গ্রামের গা ঘেঁষে চলে গেছে। বিকেলের দিকে খবর এল হুগলির গজার মোড়ের কাছে দামোদরের বাঁধ ভেঙেছে। রতন কাকা এসে খবর দিল গ্রামের অনেক কাঁচা বাড়ি পড়ে গেছে। প্রাইমারি স্কুলের ঘরে দুলে বাগদি পাড়ার সবাই এসে উঠেছে। স্কুল বাড়ি থেকে মেয়েদের চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ আসছে মাঝে মাঝে।
মা, বাপী আর রতন কাকা খানিকক্ষণ কীসব আলোচনা করল। সন্ধে হতেই মা জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করল। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত তখন বারোটা সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। মা আমায় ডেকে তুলল। উঠে দেখলাম দাদা দিদিও জেগে আছে। মা আমাদের দুটো তিনটে চারটে করে জামা পরিয়ে দিল। একটার ওপর আর একটা পরিয়েই যাচ্ছে। আলনায় যে কটা জামা কাপড় ছিল সেগুলো সব বড় ব্যাগে ভরে নিয়েছে। সেদিন রাতে পাশের বাড়ির জ্যেঠু এসে মা-বাপীকে বললেন ওঁদের বাড়িতে চলে যেতে। ওঁদের ইটের দেওয়াল দেওয়া বাড়ি। এরই মধ্যে আমার এক খুড়তুতো দাদু খবর পাঠালেন তাঁর বাড়িতে আমাদের তিন ভাইবোনকে পাঠিয়ে দিতে। সেই দাদু আগে আমাদের প্রতি মোটেও সদয় ছিলেন না। তিনি এই বিপদের সময় আমাদের কথা ভেবেছেন দেখে বাপী খুব খুশি হল। তাঁর মান রাখতে বাপী সেই রাতে কোমর-সমান জল পেরিয়ে আমাদের তিন ভাই বোনকে একে একে সেই দাদুর বাড়ি রেখে এল। আমি সবার শেষে গেলাম বাপীর কাঁধে চেপে। আমাদের বাড়ি থেকে তিন-চারশো মিটার দূরে ওই দাদুর বাড়ি। গিয়ে দেখলাম আমাদের আগেই আরও অনেক লোক দাদুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। অন্ধকারে টিমটিম করছে একটা হ্যারিকেনের আলো। কাউকেই চেনা যায় না। কেউ কেউ তাদের পোষা ছাগল গরুকেও এনেছে। একই দোরে গবাদি পশুর সঙ্গে আমরাও আশ্রয় নিয়েছি। আমার বছর দশেক বয়সের দিদিই তখন দুই ভাইবোনের অভিভাবক। দিদিকে আঁকড়ে ধরে ভয়ে কেঁদে চলেছি। দাদা একটু কম, আমি বেশি। দিদি সান্ত্বনা দিচ্ছে, সকাল হলেই জল কমে যাবে, আমরা বাড়ি চলে যাব। বড় হয়ে যখন দেশভাগের পর উদ্বাস্তু শিবিরের কথা পড়েছি, তখন মনে হয়েছে ১৯৭৮ সালের বন্যায় আমিও তো দাদুর বাড়ির উদ্বাস্তু শিবিরে এমনই এক রাত কাটিয়েছি।
আমাদের তিন ভাইবোনকে দাদুর বাড়িতে রেখে আসার পর মার মনে ভয় হয়। যে মানুষ জীবনে কোনোদিন আমাদের মঙ্গল চাননি, কোনোদিন আমাদের ভালবাসা দেননি, তিনি কোনও ক্ষতি করার মতলবে আমাদের পাঠিয়ে দিতে বলেননি তো! মায়ের মন তো! মা তখন নাকি পাগলের মতো কাঁদতে থাকে আর বাপীকে দোষারোপ করে। মা বলে, “যদি কোনও বিপদ আসে, আমাদের চোখের সামনে আমার ছেলেমেয়েরা থাকলে আমরা ওদের বাঁচাতে পারতাম। কিন্তু ওখানে যদি কোনও বিপদ হয় ওদের কে বাঁচাবে! যাও, ওদের ফিরিয়ে আনো।” বাপীর মনেও তখন দোটানা। এত কিছু ভাবার মতো অবস্থা ছিল না তখন। ভোর হতেই বাপী এক গলা জল ভেঙে দাদুর বাড়ি পৌঁছোল। বাপীকে দেখে আমাদের সে কী আনন্দ! বাপী আবার আমাদের একে একে বাড়ি ফিরিয়ে আনল। আমাদের ফিরে পেয়ে মা আমাদের তিন ভাইবোনকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল। না, দাদু সেদিন কোনও বদ মতলবে আমাদের আশ্রয় দেননি। বিপদের দিনে তিনি অভিভাবকের মতোই কাজ করেছিলেন। হয়তো বা বিবেকের তাড়নায়। কিন্তু তাঁকে বিশ্বাস করতে না পারার পিছনে ছিল মা বাপীর কিছু অতীত অভিজ্ঞতা, যার পুরো হদিশ মা বাপী আমাদের কখনও জানতে দেয়নি। বড়ো হয়ে বুঝেছিলাম, সেই রাতে বানের জলও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি মার পুরোনো আতঙ্ককে।
৩.
আমাদের উঠোনের এক পাশে একটা উঁচু ঢিবি ছিল। সেখানে ছিল কলাগাছের বাগান। সারা বছরই প্রায় কলার কাঁদি হত। পাশের বাড়ির জগাইদাদা আর ওর অন্য দু’জন বন্ধু এসে মাকে বলল, “কাকিমা, তোমাদের কয়েকটা কলাগাছ কাটব? ভেলা বানাতে হবে।” মা বলল, “আজকের দিনে এটা তোরা জিজ্ঞেস করছিস! কাট কাট, যে ক'টা ইচ্ছে নিয়ে যা।” ‘আজকের দিনে’ কথাটা সেই প্রথম শুনলাম। সেদিন ভেবেছিলাম বিপদের দিনকে ‘আজকের দিন’ বলে। একটু বড়ো হয়ে দেখেছি, আনন্দের দিনকেও তো ‘আজকের দিন’ বলে! জগাইদাদারা কলাগাছ কেটে দুটো ভেলা বানিয়ে ফেলল। তিন-চারটে কলাগাছের কাণ্ড পাশাপাশি বেঁধে ভেলা হয়। তারপর একটা বাঁশকে হাল বানিয়ে জল ঠেলে ঠেলে নৌকোর মতো বেশ ভেসে চলা যায়। কিছু বয়স্ক লোকজনকে বাড়ি থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছিল ওরা ভেলায় করে। খোঁজ নিচ্ছিল এর-ওর বাড়ি গিয়ে গিয়ে, সবাই ঠিক আছে কিনা।
আমাদের পুকুরঘাটের পাশের বিশাল কাঠচাঁপার গাছটা দুপুরবেলা হঠাৎই হুড়মুড় করে শুয়ে পড়ল। ঠিক কাঠচাঁপা নয়, আমরা বলতাম গোলঞ্চ। যে গোলঞ্চ গাছের ডালগুলোকে এতদিন শুধু আকাশের গায়ে দেখতাম, তাকে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকতে দেখে বড্ড মন খারাপ হল। দু-তিন দিন এমন আরও অনেক অঘটন ঘটতে থাকল। তবে প্রথম দিনের মতো আতঙ্ক আর নেই। হয়তো খানিকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে জল নামতে শুরু করল। আমাদের বাড়ি এবং পাড়ার সবার বাড়িই অক্ষত থাকল। কারুর কারুর গোয়াল ঘর বা নড়বড়ে চালাঘর শুধু ভেঙেছিল। মা ক’দিন ধরে বৃষ্টির জল বালতিতে ধরে রেখেছিল। সেই জলই খেতাম আমরা। টিউবওয়েলগুলো সব জলের তলায়। জল নেমে যেতে শুরু করলে দেখতাম প্রতিদিন একটু একটু করে ঘাসে ঢাকা ঢালু জমিগুলো জেগে উঠছে। কিন্তু ঘাসগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। জলে পচে তারা হলদে হয়ে গেছে। যেদিন আমাদের পাড়ার খেলার উঠোনটা আবার দেখা গেল আমাদের সে কী মজা! কিন্তু তাতে পলির পুরু আস্তরণ! আর পচা গন্ধ।
বান এলে সবাই কেমন সবার বন্ধু হয়ে যায়। গ্রামে এ-বাড়ির সঙ্গে ও-বাড়ির কত অকারণে ঝগড়া হতো। ছোটোদের মধ্যে তাড়াতাড়ি ভাব হয়ে গেলেও বড়োদের ভাব হতে কত দিন লেগে যেত! বান এলে পরে দেখলাম সবার মধ্যে কেমন রাতারাতি ভাব হয়ে গেল! মান-অভিমান মিটে গেল। বান অনেক ক্ষতি করলেও একটা ভালো কাজ করে। বড়োদের মধ্যে ভাব করিয়ে দেয়।
কিছুদিনের মধ্যে আমাদের জীবন আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল। দাদাদিদির পড়াশোনা শুরু হল। আমারও। পরের বছর আমিও স্কুলে ভর্তি হব যে। যাদের ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তাদের হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও অনেক সময় লেগে থাকবে। আমার ছোট্ট গণ্ডিতে তাদের কথা আর খুব একটা শুনতে পেতাম না। বান চলে যাবার পর আমাদের গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা অল্প উঁচু ঢিবির ওপর একটা লোককে দেখেছিলাম। তাকে দেখে খুব ভয় করত। একটা ছেঁড়া চট দিয়ে তাঁবু মতো বানিয়ে তার মধ্যে লোকটা কেমন হামাগুড়ি দিত। তার পরনে কোনও পোশাক নেই। কেউ জানে না কোথা থেকে সে ভেসে এসেছিল।
বানের পর একদিন একটা নাদুসনুদুস কুকুর এসে হাজির হল আমাদের বাড়িতে। মা তাকে আদর করে খেতে দিল। কিন্তু যেমন-তেমন খাবার তার মুখে রোচে না। সে যে বেশ আদব-কায়দা জানা এবং বড়োলোকের আদুরে পোষ্য তা বোঝাই যায়। বাপীর এক ছাত্র তাকে নিয়ে গেল। এদিকে তার আসল প্রভু পোষ্যের সন্ধানে গাড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। লোকমুখে কথা ছড়ায়। তাই দুজনের যোগাযোগ হতে বেশি দেরি হল না। বানভাসি সারমেয় তার প্রভুকে ফিরে পেল। সেবছর দুর্গাপুজো হলো নেহাতই দায়সারাভাবে। আমাদের পাড়ার এক জ্যেঠিমা বলত, “তোমার মনে এই ছিল মা দুগ্গা! তুমি এমন করে ভাসালে আমাদের!” শুনে আমি ভাবতাম, মা দুর্গাই কি তাহলে বান আসার জন্যে দায়ী! পুজোর আগেই নতুন জামা পরে ফেলেছিলাম বলে কি মা দুর্গা রেগে গেলেন!
৪.
এ তো গেল আটাত্তরের গল্প। আরও এক বানভাসি সময়ের সাক্ষী আমি। তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। থাকি হাওড়া শহরে। বাপী তখনও গ্রামেই থাকে। আরো তিন বছর চাকরি আছে বাপীর। তাই গ্রামে থাকা। একাই থাকে। আমরা ছুটি পেলেই গ্রামে যাই। কখনও বা বাপী আসে শহরে। পুজোর সময় আমি আর মা গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। চতুর্থীর দিন। হাওড়া স্টেশনে বাস স্ট্যান্ড-এ এসে দেখলাম আমাদের গ্রামে যাওয়ার কোনও বাস নেই। অগত্যা অন্য এক রুটের বাস ধরলাম। ভেঙে যেতে হবে আর কী। স্ট্যান্ডে আমাদেরই গ্রামের বাচ্চুদাদার সঙ্গে দেখা হল। ওর সঙ্গে ওর দুই খুড়তুতো বোন। ওদের বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়। আমরা পাঁচজন নামলাম সেহাগড়ি বলে এক স্টপেজে, যেখান থেকে আমাদের বাড়ি আরও এগারো-বারো কিলোমিটার। তখন সন্ধে সাড়ে ছ’টা। আমরা বাকি পথটা যাওয়ার জন্যে গাড়ি খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোনও গাড়ি নেই। কেবল মাত্র কয়েকটা সাইকেল ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। তাই সই। কিন্তু তারাও কেউ যেতে চাইছে না। তারই মধ্যে একজন হঠাৎ রাজি হয়ে গেল। আমরা পাঁচজন সেই ভ্যান-এ পা ঝুলিয়ে বসলাম।
অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ভ্যান চলতে লাগল। অল্প কিছুদূর গিয়েই সে বলল, “আমি আর যাব না। আমার টাকা মিটিয়ে দিন। সামনের রাস্তায় অল্প একটু জল উঠেছে। পায়ের পাতা ভিজবে এরকম আর কী! দামোদরের জল বেড়েছে কিনা। ওইটুকু হেঁটে পেরিয়ে যান, তারপর ওদিক থেকে বাস পেয়ে যাবেন।” তাকে জোরাজুরি করেও কোনও লাভ হলো না। সে টাকা বুঝে নিয়ে চলে গেল। আমরা পাঁচজন পিচের রাস্তা ধরে অন্ধকারের মধ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। সন্ধে তখন সাতটা। সেবার মহালয়া থেকেই তুমুল বৃষ্টি। তবে সেদিন বৃষ্টি থেমে গেছে।
মেঘে ঢাকা আকাশ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। পায়ের পাতা ভিজতে শুরু করতেই আমরা সবাই জুতো খুলে ব্যাগ-এ ভরে নিলাম। একটু এগোলেই তো বাস পেয়ে যাব। তখন আবার জুতো পরে নেওয়া যাবে। হাঁটতে হাঁটতে পায়ের পাতা থেকে জল গোড়ালি ছাড়ায়, তার পর হাঁটু। আমাদের ডান দিক থেকে জলের স্রোত ধেয়ে আসছে। ওদিকেই দামোদর। জল ঠেলে হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। হাঁটু জলে ততক্ষণে ঘন্টাখানেক হেঁটে ফেলেছি। পিছনে ফেরার প্রশ্ন নেই। সামনেই এগোতে হবে। তবেই বাস পাব। এই অলীক বাসের টানে আমরা এগোতে থাকি। জল বাড়তে বাড়তে একসময় কোমর সমান হয়ে গেল। পিচের রাস্তায় পা ঘষে ঘষে এগোচ্ছি। যত এগোচ্ছি, জলস্তর বাড়ছে। রাস্তার মাঝখানের অপেক্ষাকৃত উঁচু অংশে পা ফেলে হাঁটছি। দু-ধার তো ঢালু। তাই জলের গভীরতাও সেখানে বেশি। ততক্ষণে আমরা সবাই বুঝে গেছি আমাদের কী ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে ভ্যানওয়ালা। দামোদরের বাঁধ ভেঙে হু-হু করে জল বাড়ছে। রাস্তার দু-ধারের ক্ষেতখামার ঘরবাড়ি সব জলের তলায়। কোথাও কোনও জনমানুষ নেই। নেই এক বিন্দু আলো। কেবল বিদ্যুৎ চমকালে জলের ওপর দিয়ে তা ঝিলিক দিচ্ছে। ভয়ঙ্কর সে রূপ! অথৈ সমুদ্রের মাঝে অন্ধকারের বুক চিরে আমরা পাঁচজন যেন নৈশ অভিযানে চলেছি! পিচের রাস্তার দু-ধারে শুধু গাছের মাথাগুলো জেগে আছে। ওরাই আমাদের কাছে রাস্তার সীমানা। ওদের দেখে বুঝতে পারছি এটাই রাস্তা। যেখানে গাছের সারি নেই, ভয় হচ্ছে, সামনে যেখানে পা ফেলব সেটা রাস্তাই তো! রাস্তা অন্য দিকে বেঁকে যায়নি তো! স্রোতের মধ্যে রাস্তায় পা রাখা এবার খুব মুশকিল হচ্ছে।
৫.
মাঝে মাঝে জলের মধ্যে গায়ে সাপ আর মাছ ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। তারাও হয়তো আমাদেরই মতো বিপন্ন! পিচের রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পাথর, গুগলি এসবে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে পা। হঠাৎ কখনও জলের ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছে। প্রচণ্ড স্রোত। মনে হচ্ছে আর পারব না। এবার ভেসে যাব। বাচ্চুদাদার দুই বোন সাঁতার জানে না। ওদের চেহারাও খুব ছোটো-খাটো। জল যখন আমার কাঁধ ছাড়িয়ে গলা সমান হল ওরা তখন ডুবতে বসেছে। প্রাণভয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। দাদা এতক্ষণ ওদের হাত ধরে রেখেছিল। এবার ওদের পিঠে তুলে নিল। ওরা দুই বোন দাদার গলা জড়িয়ে পিঠের দিকে ভেসে থাকল। দুই বোনকে পিঠে ভাসিয়ে নিয়ে এগোতে থাকল দাদা। দাদার পিছনে হাঁটছি আমি। মা কখনও পিছিয়ে পড়ছে। আমি হেঁকে আওয়াজ দিচ্ছি, মা প্রত্যুত্তর দিচ্ছে। আমরা সবাই সবাইকে ভরসা দিচ্ছি। আমি আর মা দুজনেই সাঁতার জানি। তাই মাকে হেঁকে বললাম, “যদি ভেসে যাই চিন্তা করো না। কোনো না কোনো গাছের ডাল ধরে গাছেই আশ্রয় নেবো। ভেসে গেলে তুমিও তাই কোরো। সকাল হলে দেখা যাবে।” গলা পর্যন্ত কনকনে ঠান্ডা জলে প্রবল স্রোতের মধ্যে দিয়ে সে যেন এক অনন্ত যাত্রা! প্রথম দিকে মৃত্যুভয় ছিল। তারপর কেমন করে যেন সেটা উবে গেল। যন্ত্রের মতো জল ঠেলে এগোতেই থাকি। দশ কিলোমিটার জলপথ পেরিয়ে রাত বারোটার সময় বাড়ি ঢুকলাম। আমাদের গ্রামের কাছাকাছি এসে অবশ্য জল কমতে লাগল। আমাদের গ্রাম বেশ উঁচু। সেখানে জল নেই।
সেটা ১৯৯৬ সাল। মোবাইল কেন, ফোনও নেই আমাদের। ফোন তো দূর অস্ত, গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটিও নেই। যখন বাড়ি ঢুকলাম সারা শরীর অবসন্ন। বাপী সেই রাতে আমাদের দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল! বিকেলেই বাপী খবর পেয়েছিল দামোদরের বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বান এসেছে। তাই ভেবেছিল আমরা হয়তো কোনওভাবে সে খবর পেয়ে ফিরে যাব। কিন্তু না, আমাদের সে খবর কেউ দেয়নি। বরং ভ্যানওয়ালা অল্প কয়েকটা টাকার জন্যে মিথ্যে বলে ওই অন্ধকার রাতে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল আমাদের পাঁচজনকে। সে নিজেও জানত, আমাদের জন্যে কোনও বাস অপেক্ষা করে নেই। দিনের বেলা হলে আমরা তো বানের জল দেখতে পেতাম। পা বাড়াতাম না। রাতের অন্ধকার বলেই তা ঠাহর করতে পারিনি। আঁচ করতে পারিনি কোন্ বানভাসি রাতের বিভীষিকা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।
বাড়িতে ঢুকে কোনোক্রমে ভিজে পোশাক পালটে আমি আর মা বিছানায় এলিয়ে পড়লাম। বাপী এক বাটি তেল গরম করে হাতেপায়ে মালিশ করতে থাকল। যেমনটা আমাদের ছোটবেলায় করত। সকালে ঘুম থেকে উঠেও বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমরা বেঁচে আছি! তারপর কত রাত যে আতঙ্কে আমার ঘুম ভেঙে গেছে! মনে হত, আমি যেন ‘তারিণী মাঝি’ গল্পের সুখী। ময়ূরাক্ষীর জলে আমি তলিয়ে যাচ্ছি। আজ তিন দশক পেরিয়েও সেই বিভীষিকার রাত আমি ভুলতে পারিনি। মা-ও পারেনি। আজও ভরা দিঘি আমায় ভয় ধরায়। স্রোতস্বিনী নদী দেখলে শিউরে উঠি। সমুদ্র আমার হাড় হিম করে দেয়! আমি পাহাড়ের কাছে বার বার ছুটে যাই। জলের থেকে পালাবো বলেই হয়তো! যার শরীরে সারমেয় কামড় বসায় শুধু কি তারই জলাতঙ্ক হয়! না। বানভাসি মানুষেরও জলাতঙ্ক হয়!