



কলকাতায়, আমাদের ছোটবেলার গ্রোভ লেনের বাড়িতে একটা কাঁচের দরজা-ওলা মস্ত বড় বইয়ের আলমারি ছিল। তাতে ঠাসা থাকতো বাংলা আর ইংরেজী বই – বসুমতী সাহিত্য মন্দিরের কালিদাসের সম্পূর্ণ অনুবাদ থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, তারাশঙ্কর প্রমুখ। আর ইংরেজীতে তলস্তয় থেকে ডি-এইচ-লরেন্স, সমারসেট মম প্রমুখের অসংখ্য বই। আর ছিল দশ খণ্ডে আরথার মী সম্পাদিত বুক অফ নলেজ। আমি এসব গোগ্রাসে গিলতাম। ছোট থেকে বড় হওয়া এসব বই আর তাদের জগতের হাত ধরে।
আর এক বইয়ের বিরাট সম্ভার, বিশেষ করে বাংলা উপন্যাসের, ছিল হরিশ মুখার্জী রোডে, আমার মেজ পিসিমার বাড়ি। আমি কাছেই মিত্র স্কুলে পড়তাম, আর সুযোগ পেলেই পিসিমার বাড়ি যেতাম। সেখানে সবায়ের সঙ্গে তড়িঘড়ি দেখা করেই ছুটতাম বারান্দা পেরিয়ে সম্পর্কে এক কাকার ঘরে। তাঁর ঘরে ছিল এক মস্ত লাইব্রেরী, আর, সেখানে ছিল আমার অবাধ যাতায়াতের অধিকার। স্কুলের পর বিকেলবেলা আমি একা একা বসে বইয়ের জগতে ডুবে যেতাম।
আমার যতদূর মনে পড়ছে এখানেই আমার হাতে আসে শঙ্করের প্রথম উপন্যাস কত অজানারে। ইতিমধ্যে পড়ার খাতিরে বাংলা সাহিত্যের অনেক দিকপালদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে। কিন্তু শঙ্কর নাম তো আগে শুনিনি। মনে আছে বেশ কিছুটা কৌতূহল নিয়েই বইটা পড়তে শুরু করেছিলাম। ভাগ্যিস, আমি তখন যা হাতে পেতাম তাই পড়তাম, খবরের কাগজ তো বটেই, এমনকি দোকান থেকে আনা তেলেভাজা- ফুলুরির ঠোঙ্গা পর্যন্ত। তাই শঙ্কর নামের লেখকের নাম আগে শোনা না থাকলেও পড়তে শুরু করেছিলাম – আর ডুবে গিয়েছিলাম এক অজানা-অচেনা জগতে।
এই উপন্যাসের বিষয় ছিল একেবারে অভিনব - না শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো সামাজিক বা আর্থ-সামাজিক বিষয় নয়, নয় তারাশঙ্করের রাঢ় বাংলার গ্রামীণ চিত্র, কিংবা রবীন্দ্রনাথের কাব্যিক ও প্রায়-দুর্ভেদ্য জগতের ইতিকথা। এই উপন্যাসের বিষয় এক্কেবারে শহুরে - কলকাতা হাই কোর্ট – তার জাজ, উকিল, ব্যারিস্টার, মুহু্রি, বাবু – তাদের কথা - যার সম্বন্ধে আগে কেউ কোনদিন কিছু শোনেনি, বলেওনি। এ এক আজব জগৎ।
হাওড়া–সালকিয়ার এক অল্প-বয়স্ক বেকার যুবক শঙ্কর কীভাবে কলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডেরিক বারওয়েলের কাছে চাকরি পেয়ে যায়, ক্লার্ক বা বাবু হিসাবে। জাজ, ব্যারিস্টার, উকীল, মোক্তার ইত্যাদি জগতে ‘বাবু’-র ভুমিকা সিঁড়ির এক্কেবারে নীচে। কিন্তু কোনো এক আশ্চর্য কারণে শঙ্কর বর্ষীয়ান বারওয়েলের খুব কাছাকাছি চলে আসে। তাদের ভিতর মধুর সম্পর্ক ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার নানা ইতিহাস, আর তার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের নানা পরিবর্তনের ভাল-মন্দ ইত্যাদি গল্পে এই উপন্যাস ভরপুর। প্রথম দিনে বইটা শেষ করতে পারিনি। পরের দিন স্কুল শেষ হতেই আমি পড়িমরি করে পিসিমার বাড়ি গিয়ে হাজির, আর তারিয়ে তারিয়ে ভাল খাবারের মতো বইটা শেষ করা। শেষ করার পর একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম - গল্প বলার ভঙ্গিতে, সহজ ভাবে, সহজ কথায় লেখার মুন্সীয়ানায়, চরিত্রায়নের সাবলীলতায়, আর সবার ওপরে বিষয়ের অভিনবত্বে। এক অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি আমার শরীর-মন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
পরে জেনেছিলাম প্রথম উপন্যাসেই শংকর, বা মনিশংকর মুখোপাধ্যায় বাজিমাত করেছেন, বা নিজেকে বাংলা সাহিত্যের একেবারে সামনের সারিতে নিয়ে এসেছেন।
কত অজানারে-র মতোই শংকরের পরের উপন্যাস দুটির বিষয় এক্কেবারে অভিনব। নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি-র বিষয় কীট-পতঙ্গ নিয়ে গবেষণার কাহিনী। অবশ্যই তার সঙ্গে বোনা আছে সেই গবেষক-মানুষদের সুখ-দুঃখের কাহিনী। এনটোমোলজীর কীট-পতঙ্গ আর মানুষ একাকার হয়ে গেছে। একেবারে অভিনব ও অনবদ্য।
আমার ঠিক মনে নেই শংকরের কোন উপন্যাস কার পরে এসেছে নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি-র পরে বোধহয় রূপতাপস - এক ভাস্করের মর্মভেদী কাহিনী, আর তার পরে চৌরঙ্গী।
বিষয়ের অভিনবত্ব ও গল্প বলার দিক দেখে চৌরঙ্গী আমার মতে শংকরের সব লেখার একেবারে ওপরে। প্রথমেই অভিনবত্ব – কলকাতার বুকে ক্ষীয়মাণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতীক ব্রিটিশ মালিকাধীন এই হোটেল যেন নিজেই এক চরিত্র।
বারওয়েলের অবসরপ্রাপ্তির পর শংকরের চাকরি জোটে এই হোটেলে। হাইকোর্টের অভিনব জগৎ থেকে শংকর আবার এক এক্কেবারে নতুন একটা জগতে এসে পড়ে। এক বিশাল প্রাসাদ আর অসংখ্য ঘর নিয়ে হোটেলটা নিজেই অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। সেইসব ঘরে প্রতিদিন ঘটে চলেছে কতো ঘটনা। এই উপন্যাসে বালিশ-বাবু, বা ন্যাটাহারিবাবু এক অদ্ভুত চরিত্র। তাঁর কাজ হোটেলের কয়েকশো ঘরে বালিশ সরবরাহ করা। এই নিয়ে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। একদিন এক বোর্ডার ভীষণ চটে গিয়ে ম্যানেজার স্যাটা বোসকে অভিযোগ করলেন যে কাল রাতে তার ঘরে একটা বালিশ কম পড়েছে। বালিশ-বাবুকে সেই কথা বলতে তিনি মাথা-টাথা চুলকে বললেন আমি এতো বছর এই হোটেলে কাজ করছি, আর, আমি বালিশ ঠিকমতো দিইনি। হতে পারে না। দিনের বেলা ঘর খুঁজে দেখা গেল বালিশটা খাটের তলায়। ন্যাটাহারিবাবু গজগজ করে বলে উঠলেন – মেয়ে নিয়ে আমোদ-প্রমোদ করার সময় মনে থাকে না। আর এখন আমার চাকরি খাওয়ার চেষ্টা। এই বালিশ-বাবু নিদান দেন যে ব্রিটিশ চলে গেলে কেউ আর গ্যাঁট-ম্যাট ইংরেজী বলবে না, ইউরোপীয় জামাকাপড় পরবে না, ইত্যাদি। অবশ্যই তা হয়নি।
হোটেলের গোয়ানীস বেহালাবাদক গোমেজ অসাধারণ বাজিয়ে, রাতে তাকে বাজাতে হয় স্ট্রিপটীসের চটুল ও উত্তেজক বাজনা। দিনের বেলা তিনি ডুবে যান বাখ, বেতোফেন, মোৎসার্টের জগতে। স্ট্রিপটীসের কথায় মনে এসে গেল স্ট্রিপার–নাচিয়ে অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান কনির কথা। এই করে সে সংসার চালায়, কিন্তু তার দুঃখ কে দেখে। এই উপন্যাসে আছে সমাজের উঁচু স্তরের সোস্যালাইট মিসেস পাকরাশি, দিনের বেলায় তিনি সমাজের মধ্যমণি, আর রাত হলেই যিনি কালো চশমা পরে হোটেলের দরজায় পা রাখেন।
চৌরঙ্গীর ম্যানেজার ‘লালমুখো’ সাহেব জিমি, আর অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার স্যাটা বোস। এই উপন্যাসে স্যাটা বোস এক অনবদ্য চরিত্র – যার প্রধান কাজ হোটেলে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা তা দেখা। আর সেই কাজে তাঁর সঙ্গী শংকর। একেবারে আক্ষরিক অর্থে তিনি শংকরকে নিজের ডানার তলায় এনে কাজ শেখান, বলেন - খালি চোখ দিয়ে দেখে যা, কিছু বলবি না। তবেই তুই ভাল হোটেলের কাজ শিখবি।
এই উপন্যাসের শেষটা ভারি হৃদয়বিদারক। হোটেল হাত পাল্টে চলে এল মারোয়াড়ী ব্যাবসাদারের হাতে। মালিকের সঙ্গে মানিয়ে না চলতে পেরে বহুদিনের ম্যানেজার জিমি আইভরি কোষ্টে এক হোটেলের ম্যানেজার হয়ে চলে যাচ্ছে, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে স্যাটা বোসকে। যেন তারা নতুন নিয়ম-কানুন না মানতে পেরে অনেক দুঃখে তাদের প্রেয়সী হোটেলটাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এখানে এসে চোখে জল এসে যায়। শংকরের লেখায়, চরিত্র-চিত্রণের নিপুণতায়, গল্প বলার ভঙ্গিতে চৌরঙ্গী হোটেল মানুষের রূপ নিয়েছে। মনে পড়ে গেল বিখ্যাত শিকারী ও ভারতপ্রেমী জিম করবেট শেষ বয়সে তাঁর প্রেয়সী ভারত, তার বনজঙ্গল, পশুপাখি ছেড়ে কেনিয়ায় চলে যান। ওখানেই তিনি মারা যান। শংকরের আরও অনেক উপন্যাস, যেমন জন অরণ্য, বিবেকানন্দ-রামকৃষ্ণ-সম্পর্কীয় পড়েছি। কিন্তু চৌরঙ্গী আমার চোখে এক মায়া-কাজল এঁকে দিয়েছে।
সম্প্রতি শংকর চিরঘুমে ঢলে পড়েছেন। বিষয়ের অভিনবত্বে, লেখার মুন্সীয়ানায় গল্প-পিপাসু বাঙালির মনে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।