


পুরোটাই ব্যক্তিগত; — রুশতী সেন; প্রকাশক— সেরিবান, দক্ষিণ ২৪ পরগনা; প্রচ্ছদ- সুপর্বা দাস; প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০২৬; ISBN: 978-81-87492-84-8গ্রন্থটির সূচি ‘যেমন দেখেছি’, ‘পুরোটাই ব্যক্তিগত’ ও ‘ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে’ তিনটি পর্যায়ে বিন্যস্ত। ‘যেমন দেখেছি’ শুরু সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে রুশতী সেনের স্মৃতিমূলক রচনায়। তারপর ক্রমান্বয়ে এসেছেন কবিতা সিংহ, প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য, শঙ্খ ঘোষ ও আরও অনেক গুণীজন। ‘পুরোটাই ব্যক্তিগত’ অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু দেবারতি মিত্র মণীন্দ্র গুপ্ত। ‘ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে’ অধ্যায়ে আলোকিত হয়েছেন রুশতী সেনের অত্যন্ত কাছের তিনজন মানুষ।
সত্যজিৎ রায়কে রুশতী প্রথম দেখেন ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রের preview তে। তারপর বিভিন্ন কাজের সূত্রে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত মজবুত হয়েছে। সত্যজিতের ষাট বছরের জন্মদিনে ‘বারোমাস’ পত্রিকার তরফ থেকে ফুল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে। সত্যজিৎ রায়ের কিশোর সাহিত্য নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন, সত্যজিৎ-চলচ্চিত্রের নাবালক চরিত্র নিয়ে লেখার কথা ভেবেছেন, কারণ রুশতীর মনে হয়েছে সত্যজিৎ-এর চলচ্চিত্রের নাবালকরা এমন সব আশ্চর্য মুহূর্ত গড়ে দেয়, যা সাবালককে শিক্ষার পথ বলে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় আলাপ পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে রুশতী একটি বিষয় বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে অল্প বয়সীদের উৎসাহ আর প্রশ্রয় দেওয়া সত্যজিৎ-এর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য ছিল। আর এই সূত্রেই রুশতী আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়ের স্মরণ সভায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই কথন ‘তাঁর ব্যবহার আর বিনিময়ের গুণেই ছোটোরা অত ভালো কাজ করতো তাঁর চলচ্চিত্রে।’
রুশতীর সঙ্গে কবিতা সিংহের পরিচয় আকাশবাণীতে ‘তরুণদের জন্য’ অনুষ্ঠানে, তখন তিনি বাংলা স্পোকেন ওয়ার্ডের প্রযোজিকা। তারপর সে সম্পর্ক গড়িয়েছে বাতাসের সঙ্গে গাছের পাতার সম্পর্কের মতো। নির্ভার ও সহজ। আকাশবাণীর ‘অভিজ্ঞান’ অনুষ্ঠানে সোমনাথ লাহিড়ীর ‘কলিযুগের গল্প’ সম্পর্কে রুশতীকে বলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন কবিতা সিংহ। কবিতা সিংহের কবিসত্তার সরব আড়ালে, তিনি যে একজন সফল গল্পকার ও গদ্যকার সে বিষয়ে রুশতী একজন নিবিষ্ট পাঠক হিসেবেই আমাদের কাছে উল্লেখ করেছেন। কবিতা সিংহের ‘চিত’ যে একটি অসামান্য ছোটোগল্প এবং ‘সরমা’ যে তাঁর একটি ভয়ানক উপন্যাস একথা প্রকাশে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন। রুশতী সেন বলেছেন, ‘চোখ আর মনটা যে তাঁর (কবিতা সিংহ) বড় ঠিক জায়গায় ছিল এটা ছোটোগল্পে খুব অনায়াসে বিছিয়ে যায়।’ কবিতা সিংহের মৃত্যুর বারো বছর পর প্রকাশিত হয় রুশতী সেনের ‘পরাণের আলো ভুবনের আঁধার’ গ্রন্থটি। উৎসর্গ পত্রে ‘কবিতা সিংহ’— দুজনের মধ্যে সম্পর্কের বুনোট বুঝতে পাঠকের অসুবিধা হয় না।
শ্রী প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য বেশী লেখেননি। হাসির গঙ্গা আর বিষাদের যমুনার মিলমিশ প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোত ছিল। রুশতী মনে করিয়েছেন তাঁর মৃত্যুর পর ‘শামিল’ আয়োজিত স্মরণ সভার কথা। সেই স্মরণ সভায় ‘শামিল’ ছাত্রছাত্রীরা বলেছিল তাদের ‘পদুমদাদা’ তাদের কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মোটা মোটা বই ঘাঁটতেন। সত্যিই, সমমর্যাদার আসনে ছোটোদের বসাতে তাঁর জুড়ি ছিল না।
শঙ্খ ঘোষের ‘আদিম লতাগুল্মময়’ কবিতার বইটি যখন রুশতী সেন পড়েন তখন তিনি নবম শ্রেণীর ছাত্রী। শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়া সেই শুরু। তারপর আর থামেনি। শুধু শঙ্খ ঘোষের বই পড়া নয়, একটা সময়ে তাঁর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল একটা আত্মিক সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সূত্র অবশ্যই ‘বারোমাস’ পত্রিকা। কলেজ স্ট্রিটের কলাবাগানে ১/২ শম্ভু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের যে বড়সড় পাঁচতলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে শঙ্খ ঘোষের কাছে এসেছিল ‘যমুনাবতী’ কবিতার মুহূর্ত, সেই বাড়িটাও রুশতী দেখেছেন শঙ্খ ঘোষের সঙ্গেই। এইসব স্মৃতিকথা লেবুপাতার গন্ধের মতো রুশতীর মনে চারিয়ে যায়, আর তিনি আমাদের সামনে মেলে ধরেন। রুশতী সেনের কন্যা সায়তির কাছে শঙ্খ ঘোষ হয়ে উঠলেন শঙ্খদাদু। ‘সুপুরিবনের সারি’ পড়ে তার ‘পাগল পাগল’ অবস্থা। সায়তিকে শঙ্খ ঘোষ উপহার দিয়েছিলেন তাঁর ‘ইচ্ছেপ্রদীপ’ বইটি। এইভাবে স্মৃতির সুতো গড়িয়ে চলে, তার গতি একটা সময় রোধ করতেই হয়।
কলেজ স্ট্রিটের পাতিরাম বুকস্টলে ‘বারোমাস’ পত্রিকা বেরোনোর আগে একটা পোস্টার ঝোলানো থাকতো, সেই পোস্টারটি লিখতেন অমলেন্দু চক্রবর্তী, ‘যাবজ্জীবন’ গ্রন্থের প্রণেতা। ‘বারোমাস’ পত্রিকার সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক। পনেরোটি গল্প লিখেছেন ‘বারোমাস’-এ। দুটি প্রচ্ছদ করেছেন ‘বারোমাস’ এর জন্যে। ভীষণ ভালো গল্প বলতে পারতেন, আর সেই আড্ডা জমতো পরের প্রজন্মের সঙ্গে। ওঁদের সঙ্গেই তাঁর অনাবিল বন্ধুত্ব। খুব সাধারণ জীবনযাত্রার মানুষ। নিজেই বলেছেন, ‘আমার লেখার ঘরটি একাধারে আমার ছেলের পড়ার ঘর, আমার স্ত্রীর অন্তঃপুর, তবু লিখতে পারছি এটাই আমার প্রেরণা।’ আর সেই ঘরে খাটের ওপরে পোস্টার-আঁকা লেখার কাজ চলতো। যদিও একটা সময় হাতিবাগানের এক কামরার বাসস্থান ছেড়ে চলে যেতে পেরেছিলেন বাগুইহাটির বল্মীক আবাসনে নিজস্ব ফ্ল্যাট বাড়িতে। জীবনের শেষ তিন বছর দেশকাল ও পরিপার্শ্ব নিয়ে, আকৈশোর রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে বড় বেদনার্ত আর উত্তেজিত থাকতেন তিনি। অমলেন্দু চক্রবর্তী সম্পর্কে রুশতী সেনের মূল্যায়ন বড় আন্তরিক। তিনি লিখলেন, ‘এরকম মানুষ যতদিন থাকেন, চারপাশের চেনা-পরিচিতরা হাসতে পারেন তাঁর সারল্যে, তাঁর আশাবাদে, এমনকী তাঁর ভেঙে পড়া হতাশায় অথবা দুঃখ পাওয়ার ক্ষমতায়। আর যখন তিনি নেই, তখন বোঝা যায়, কতখানি জায়গা নিয়ে ছিলেন তিনি।’
গত শতকের আটের দশক, ‘শিলাদিত্য’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে তখন সুধীর চক্রবর্তী। ‘ইত্যাদি’ প্রকাশনীর কার্যালয়ে সুধীর চক্রবর্তীর সঙ্গে রুশতী সেনের প্রথম পরিচয়। সুধীর চক্রবর্তীর প্রথম দিনের ব্যবহারে রুশতী বুঝেছিলেন, তিনি বয়েসটাকে বোঝেন, তাঁর সংকট বোঝেন, একধরনের সম্মান আনকোরা নতুনদেরও দিয়ে থাকেন। তিনি বুঝতেন ‘বারোমাস’-এ কোন নতুন লেখকের লেখা ছাপতে পারলে ভালো হয়। এভাবেই অজিত দাস, সুবোধ দাস, জয়ন্ত চক্রবর্তী, শ্যামলী চক্রবর্তী প্রমুখ লেখক ও শিল্পীর নাম পাঠক জানতে পারেন। সুধীর চক্রবর্তী বিভিন্ন গীতিকার-সুরকারদের নিজস্ব পছন্দের কয়েকটি গান আর সে-গানের অনুষঙ্গ সংগ্রহ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন রুশতীর পরের প্রজন্মকে। বোঝা যায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রুশতীকে পাঠিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কাছে। রুশতী বলেছেন, সুধীর চক্রবর্তীর প্রযত্ন ছাড়া এরকম অভিজ্ঞতা তাঁর কখনোই হতো না। সুধীর চক্রবর্তীর অসামান্য লেখা ‘গভীর নির্জন পথে’, এই একটি বই বহু পাঠককে দিল মানবজমিনের এক অচেনা পরতের হদিস, তার শেষেও নিজেকে এবং নিজের পাঠককে এমন অতলান্ত অজানার মুখোমুখি দাঁড় করাতে কোনো দ্বিধা ছিল না এই গবেষকের।
সাধারণ পাঠকের কাছে দেবেশ রায় মূলত পরিচিত তাঁর অসামান্য গ্রন্থ ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ গ্রন্থটির জন্য। প্রশ্রয় আর স্নেহে মোড়া একজন মানুষ। তিনি শুধু লেখক ছিলেন না, লেখক তৈরির কারিগর ছিলেন। অচেনা লেখকের গল্প পড়ে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁদেরকে উজ্জীবিত করতেন। নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। রুশতী সেনের প্রথম বই প্রকাশের ক্ষেত্রে দেবেশ রায়ের আগ্রহ ও উদ্যোগ ছিল খুব বেশি— একথা দ্বিধাহীনভাবে জানিয়েছেন রুশতী।
আদ্যন্ত গদ্যকার ও প্রাবন্ধিক, নারীবাদ চর্চা ও রবীন্দ্রসৃজন পরিচয়ের আড়ালে সুতপা ভট্টাচার্য যে কবিতাও লেখেন এবং চারটি কবিতাগ্রন্থের জননীও যে তিনি, সে কথাও জানিয়ে দেন রুশতী সেন। তাঁর মনে পড়ে সুতপা শেষ কবিতা শুনিয়েছিলেন ২০২৩-এর সরস্বতী পুজোর দিন। আর ২০২৪-এর সরস্বতী পুজোর আগের দিন সুতপা ভট্টাচার্যের প্রয়াণ সংবাদ পান রুশতী সেন। কী আশ্চর্য যোগাযোগ! শরীরে মারণ ব্যাধির প্রকোপ এবং সে কারণে অঙ্গ বাদ পড়ার অভিজ্ঞতাও সুতপার কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে তাঁর কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পায়নি সেজন্য তাঁর অভিমান কম ছিল না। মেয়েদের লেখালিখি প্রসঙ্গে তাঁর কাজ অনেক বেশী পরিচিত। গদ্যকার ও প্রাবন্ধিক পরিচয়েই তিনি পাঠকের হৃদয়ে থাকবেন। রুশতী জানিয়েছেন, সুতপা ভট্টাচার্যের কবিতার গুণগ্রাহী যারা আছেন, তাঁদের ভালো লাগবে ভবিষ্যতে তাঁর কবিতা মান্যতা পেলে।
শাঁওলী মিত্র অধ্যায়ে শুধু তাঁর নাট্য অভিনয় ও নাট্য প্রযোজনার কথাই উঠে আসেনি, তাঁর অভিনীত সবকটি নাটক ও তার নির্দেশকের নাম জানিয়ে দেন রুশতী। আমরা জেনে যাই ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ চলচ্চিত্রে বঙ্গবালার ভূমিকায় শাঁওলীর অভিনয় দক্ষতার কথা। তৃপ্তি মিত্রকে নিয়ে লেখা তাঁর ‘মা-মণি’ বইটি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের শেষ দিকে আকাদেমি আয়োজিত যে-কোনো বক্তৃতার সূচনায় সভানেত্রীর কর্তব্যটুকু সমাধা করে তিনি আর মঞ্চে থাকতেন না, দর্শকাসনে বসে বক্তৃতা শুনতেন। আসলে কোনো পদাধিকার তাঁকে ভোলাতে পারেনি মঞ্চের সম্মান কিংবা দর্শকশ্রোতার ন্যায্য দাবি আর অনুশীলন। এখানেই তাঁর শিল্পীসত্তার বৈশিষ্ট্য।
বাংলা কবিতার পৃথিবীতে দেবারতি মিত্র ও মণীন্দ্র গুপ্ত কিংবদন্তী দুটি নাম— এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁদের সঙ্গে রুশতীর স্নেহার্দ্র সম্পর্ক ‘পুরোটাই ব্যক্তিগত’ অধ্যায়ে যেন একঝলক আলো। পরম মমতায় অধ্যায়টি লিখেছেন রুশতী। যোগিয়া বাড়ির একতলার শ্রীহীন ঘরে বিভিন্ন সময়ে গেছেন রুশতী, মণীন্দ্র গুপ্ত ও দেবারতি মিত্র দুজনকে সামনে থেকে দেখেছেন আর বিস্ময়াভূত হয়েছেন নিজেই, ভেবেছেন ‘ওঁরা দুজন কেমন করে এমন ব্যতিক্রমী হয়ে আছেন দুনিয়ায়?’ তাঁদের এই ব্যতিক্রমী যাপনচিত্রকেই ভালোবেসে ফেলেছিলেন রুশতী, তাই কোনো কোনো রবিবারের বিকেলে বিশুদ্ধ বাতাসের খোঁজে চলে গেছেন যোগিয়া বাড়ির দোতলার ঘরে। মণীন্দ্র গুপ্ত ও দেবারতি মিত্রর সঙ্গে রুশতী সেনের সম্পর্কের সূত্র অনেকটা ‘বারোমাস’ পত্রিকা হলেও, সেই সম্পর্ক গাঢ়তর হওয়ার প্রেক্ষিত পারস্পরিক মনের নিবিড় বন্ধন। এ সম্পর্কের কোনো রসায়ন নেই, সংজ্ঞা নেই, আছে শুধু ভেসে যাওয়া। তাই রুশতী সেন লিখতে পারেন, ‘আমার কেমন মনে হতো, যে-কোনো শুদ্ধতারই সন্ধান পাওয়া যায় ওঁদের ঘরে ঢুকলে। শুদ্ধতা ব্যাপারটার ধারণা করা বেশ দুরূহ, এমনকী বোকা-বোকাও বটে, বিশেষত আজকের পৃথিবীতে। খুব জোর দিয়ে আমিও বলতে পারব না, কেন ওঁদের ঘরে ঢুকলে একটা অন্যরকম প্রাপ্তির বোধ হতো আমার। তবে এ-কথাও ঠিক যে, মণীন্দ্রবাবুর মতো নিবৃত্ত মানুষ জগতে খুব বেশী মিলবে না।’ আবার রুশতীর মায়ের মৃত্যুর পর দেবারতি মিত্র পরম যত্নে লালন করেছেন ওঁর শূন্যতা। সান্ত্বনার ভেজা স্বরে বলেওছিলেন ‘মা চলে যাওয়া বড় কষ্ট।’ প্রিয়জনের চলে যাওয়ার শূন্যতার হাহাকার দুজনেই বোঝেন কারণ রুশতী লক্ষ্য করেছিলেন দেবারতি মিত্রর মেজো বোন দেবাঞ্জলির মৃত্যুর পর ‘পাতার মানবী’ কবিতা সংকলনে দেবারতির সেই হৃদয়বিদারক প্রাককথন আর ১৯৯৬ শারদীয় ‘বারোমাস’এ ‘অশ্রু অনন্ত’ কবিতায় ঝরে পড়া অনন্ত হাহাকার। এই সম্পর্কের স্নিগ্ধ স্বর সেতারের সুরের মতো বেজেই চলে, রুশতীর মনে পড়ে একদিনের কথা যেদিন মণীন্দ্রবাবু, ‘একেবারেই শোয়া, অনেকক্ষণ একটি কথাও বলেননি, খুবই অসুস্থ। … হঠাৎ উঠে বসলেন, নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা একটি বই আনতে বললেন দেবারতিদিকে। The Adventures of Tom Sawyer The Adventures of Huckleberry Finn, Mark Twain. বললেন, ‘কলেজস্ট্রিটে রাস্তা থেকে খুব কম দামে কিনেছিলাম, মূল বই, একটুও সংক্ষেপ করা নয়। তোমার মেয়ের জন্যে রেখেছি। নিয়ে যেও’।
এই গ্রন্থে পাঠক পাবেন আরো তিনজন মানুষ— গোপা বর্মণ, মিস হালদার আর বাবলিকে। সংস্কৃতির অঙ্গনে এঁরা তেমন কোনও উজ্জ্বল মানুষ নন, কিন্তু সুস্থ সমাজের ক্ষেত্রে এইসব মানুষেরা বড় জরুরি। গোপা বর্মণ ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে তাঁর ছাত্র-ছাত্রী। মিস হালদারও ছিলেন সেন্ট জনস ডায়োসেশন গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষিকা। এই স্কুলেই রুশতীর প্রথম পাঠক্রম শুরু। ঐ বয়েসেই বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমার শৈশবের নিশ্চিতি যে শৈশবের প্রহরে কোনো ব্যবস্থা বা অব্যবস্থা হরণ করতে পারেনি, তাঁর অনেক কারণের মধ্যে একটা বড় কারণ আমার প্রথম ক্লাসটিচার মিস হালদার।’ বাবলি ‘বারোমাস’ পত্রিকার কর্মচারী। পোশাকি নাম গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য। ইংরেজিতে ভিতু, সদাহাস্যময় ও রুচিবান একটি ছেলে। মাস মাইনে ২৫০ টাকা। এছাড়া পত্রিকার টুকিটাকি প্রয়োজনে নিয়মিত খরচের জন্যে ৫০ টাকা। বাবলি ভালো গান গাইত। কর্কট রোগ তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল। চেষ্টা হলেও সে বেশিদিন বাঁচত না নিশ্চয়। বাবলি বাঁচেনি। ‘বারোমাস’ আছে বাবলি নেই। রুশতী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন ‘শ্মশান-মর্গ থেকে বিয়েবাড়ি পর্যন্ত, পত্রিকা প্রকাশ থেকে নাটকের আয়োজন পর্যন্ত সর্বত্র একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারা ছেলেটি ‘বারোমাস’ সংলগ্ন সকলকে এতখানিই নিরাশ্রয় করে গেছে।’
এই গ্রন্থের সব লেখাই বিভিন্ন সময়ে নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত। লেখাগুলি দু-মলাটের মধ্যে গ্রন্থগত করে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে প্রকাশক সেরিবান। সেজন্য সেরিবানকে কুর্নিশ। সুপর্বা দাস কর্তৃক গ্রন্থটির প্রচ্ছদ নান্দনিক। শেষে বলি এই বইয়ের আশ্চর্য উৎসর্গ পত্রের কথা। রুশতী এই বই উৎসর্গ করেছেন নিকটতম জন আশিসকে। যার সঙ্গে তাঁর ‘অসহমতে অনেকদিন’। সম্পূর্ণ হল ‘পুরোটাই ব্যক্তিগত’র বৃত্ত।