• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | বইয়ের জানালা
    Share
  • পুত্রবধূর কলমে গৌরী আইয়ুব এবং প্রাসঙ্গিক বই থেকে : চম্পাকলি আইয়ুব

    পুত্রবধূর চোখে গৌরী আইয়ুব এবং প্রাসঙ্গিক; — চম্পাকলি আইয়ুব; প্রকাশক— পরবাস; প্রথম প্রকাশ— বইমেলা ২০২৬; ISBN: 978-1-946582-57-7,

    [বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও সাহিত্যিক গৌরী আইয়ুব (১৯৩১–১৯৯৮) এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। বিখ্যাত রবীন্দ্রসাহিত্য বিশেষজ্ঞ আবু সয়ীদ আইয়ুবের সহধর্মিণী গৌরীর কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। শাশুড়ি-মাকে নিয়ে চম্পাকলির স্মৃতিচারণা ও তাঁদের পরস্পরকে লেখা চিঠিপত্র থেকে গড়ে ওঠে তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে গৌরীর কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের একটি স্পষ্ট চিত্র।

    সৈয়দ মুজতবা আলী, গৌরকিশোর ঘোষ, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, কৃষ্ণ কৃপালনি, রাণী চন্দ ও সুচিত্রা মিত্রের মতো সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের বহু বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন গৌরী আইয়ুবের গুণমুগ্ধ বন্ধু। তাঁদের কয়েক জনের লেখা তেত্রিশটি চিঠিও রয়েছে এই বইটিতে যা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেবে গৌরী আইয়ুবের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।]


    এই বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হল--

    ‘গৌরী আইয়ুব: জীবনী’ অধ্যায় থেকে--

    ১৯৪৭ সালে গৌরী মেয়েদের মধ্যে রাজ্যে প্রথম হয়ে স্কুল ফাইনাল পাশ করেন। তার দু’বছর পর মগধ মহিলা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দর্শনশাস্ত্রে বি. এ. পড়তে শুরু করেন। সেই সময়ে ইংরেজবিরোধী এক ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। দু’দিন পর যখন তিনি মুক্তি পেলেন, তাঁর বাবা আর গৌরীকে পাটনায় রাখা সমীচীন বলে মনে করলেন না। অবিলম্বে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে গৌরীর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে তাঁকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেন। অতএব, ১৯৫০ সালে শান্তিনিকেতনের অভিনব পরিবেশে শুরু হল তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ভাগ। ১৯৫১ সালে প্রথমে গৌরীর মা ও চার বোন শান্তিনিকেতনে এসে বসবাস করতে থাকেন। তার কিছুদিনের মধ্যে অবসর গ্রহণ করে ধীরেন্দ্রমোহন নিজেও সেখানে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন।

    ১৯৫০ সালেই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন আবু সয়ীদ আইয়ুব। পরবর্তীকালে, আইয়ুব রবীন্দ্র-টীকাকার ও প্রাবন্ধিক হিসেবে বিখ্যাত হন। শান্তিনিকেতনে ছাত্রী থাকাকালীন আইয়ুবের সঙ্গে গৌরীর প্রণয়ের সূত্রপাত হয়। সেই খবরটি গৌরীর পিতার কাছে পৌঁছোলে তিনি ক্ষুব্ধ হন ও ওই ব্যাপারে কন্যাকে নানাভাবে নিরস্ত করবার চেষ্টা করতে থাকেন। গৌরীর পরিজনদের মতে আইয়ুব ও গৌরীর সেই সম্পর্ক নিয়ে ধীরেন্দ্রমোহনের মতো বিজ্ঞ দার্শনিকের আপত্তির মূল কারণ হয়তো ধর্ম ছিল না; তাঁরা শিক্ষক ও ছাত্রীর আদর্শ সম্পর্ক থেকে বিচ্যুত হওয়ায় তিনি তাঁদের উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। যাহোক, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই গৌরী ১৯৫২ সালে দর্শনশাস্ত্রে বি. এ. পাশ করেন ও ১৯৫৩ সালে সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘টিচার্স ট্রেনিং’ সম্পূর্ণ করেন। অন্যদিকে, আশৈশব ক্ষীণস্বাস্থ্য আইয়ুব ১৯৫২ সালে অসুস্থতার কারণে বিশ্বভারতীর চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরে যান কিন্তু চিঠিপত্রের আদান-প্রদান ও অনিয়মিতভাবে গৌরীর কলকাতায় আসার মাধ্যমে তাঁদের সম্পর্ক অটুট থাকে।

    ১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতনে চারদিন ব্যাপী এক সাহিত্যমেলা হয়; তার পরিচালনার জন্য ওখানকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে যে কমিটি হয়েছিল তার প্রেসিডেন্ট ছিলেন সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ও দু’জন সেক্রেটারি ছিলেন গৌরী দত্ত ও গৌরীর সহপাঠী নিমাই চট্টোপাধ্যায়। তার ঠিক এক বছর আগে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার জন্য দেশব্যাপী এক আন্দোলন হয়। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ছাত্ররা ও সাধারণ মানুষ ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদসভা ও মিছিলের আয়োজন করে। সেখানে পুলিশের গুলিতে পাঁচ জন ছাত্রের মৃত্যু হয় ও প্রচুর মানুষ আহত হয়। ১৯৯৯ সালে UNESCO ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। শান্তিনিকেতনের সমাবেশটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সেই ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে প্রথম শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং সেখানে দুই বাংলার নামকরা সাহিত্যিকরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য, পাছে মূল উদ্দেশ্য প্রকাশিত হলে পাকিস্তান সরকার ওখানকার সাহিত্যিকদের যোগদানে বাধা দেয় তাই সাহিত্যমেলার আসল কারণ তখন প্রকাশ করা হয়নি। সেই সভায় গৌরীর ভূমিকা নিয়ে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন : ‘. . . এর পরিকল্পনা বা এর আয়োজনের মূলে নিশ্চয় ছিলেন প্রবীণ প্রতিষ্ঠিত মানুষেরাই, কিন্তু এর প্রত্যক্ষ কর্মভার এসে পড়েছিল দু’টি যুবকযুবতীর উপর। ওই তিনদিনে সেই দু’জনকে দেখা যেত সবসময়েই, সভায় আর সভার বাইরে, আমন্ত্রিত অভ্যাগত লেখকদের তত্ত্বাবধানে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা নরেশ গুহদের মতো সেই সময়কার কয়েক জন তরুণকে নিয়ে গোটা শান্তিনিকেতন ঘুরে দেখাবার, কখনও নন্দলাল, কখনও রামকিঙ্করের মুখোমুখি করে দেবার, আশ্রমিক আতিথ্যের একটা দায়িত্বে ছিলেন সেই দু’জন। দু’জনের একজন নিমাই চট্টোপাধায়, আর একজন গৌরী দত্ত, উত্তরকালের গৌরী আইয়ুব।’

    ‘গৌরী আইয়ুব: আমার শাশুড়ি-মা’ অধ্যায় থেকে—

    অনেকসময় মা ও আমি মায়ের কোনও বন্ধু বা আমাদের কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। মনে পড়ছে, একদিন খুব ভোরে জ্যোতির্ময় দত্তের সঙ্গে আমি ও মা গৌরকাকার বাড়িতে গিয়েছিলাম। পরেও কলকাতায় গেলেই পূষন্‌ ও আমি ওই বাড়িতে যেতাম। এখনও, কাকার পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে আমাদের দু’জনের বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। যাহোক, বিয়ের পরে মায়ের সঙ্গে পূষন্‌ ও আমি প্রতিভা বসুর বাড়িতে গিয়েছি, নিমন্ত্রণ খেয়েছি। তার কয়েক বছর পরে এক সন্ধ্যায় প্রতিভা বসুর আয়োজনে ওঁদের বাড়ির ছাদে বুদ্ধদেব বসুর জন্মদিনের উৎসবে গিয়েছিলাম। সেখানে অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষের মধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন। গান-কবিতা-গল্পে সুন্দর সময় কেটেছিল। মা কবি শক্তি চট্টোপাধায় ও তাঁর স্ত্রী মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়কে খুব স্নেহ করতেন। কখনও কখনও মীনাক্ষীদি অফিস-ফেরত মায়ের কাছে এসে খানিকক্ষণ গল্প করে যেতেন। আমাদের বিয়ের পর ওঁদের বাড়িতেও নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম।

    তখন মা সকলকে বলতেন, ‘চম্পা আসায় আমার আরও দু’টি হাত ও দু’টি পা হল।’ পায়ের কষ্টের জন্য মা যেহেতু দোকান-বাজারে যেতে পারতেন না, বিশেষ কিছু কেনাকাটার থাকলে ওঁকে বন্ধুদের অনুরোধ করতে হত। বিয়ের পর আমিই সেইসব কাজগুলো করে দেওয়ায় মা খুব খুশি হতেন।

    আমি পিত্রালয়ে কোনওদিন রান্না করিনি, শ্বশুরালয়ে গিয়েও রান্নাঘরে যেতে হত না। এই বিষয়ে একটি ঘটনা বলি: মীনামাসির বানানো ‘কেকভাজা’ (কেক-এর ব্যাটার তেলে ভেজে রসে ফেলা) পূষন্‌ খুব পছন্দ করত। একদিন মায়ের কোনও মুম্বাই-যাত্রী বন্ধুর হাতে মা পূষনের জন্য কিছু জিনিস পাঠাচ্ছিলেন। ঠিক হল সেই সঙ্গে কেকভাজাও পাঠানো হবে। মা আমাকে শিখিয়ে দিলেন ও আমি বানালাম কিন্তু ব্যাপারটা খুব ভালো হল না; তবুও আমার প্রথম প্রয়াস জানিয়ে পূষন্‌কে তা পাঠানো হল। পরের চিঠিতে পূষন্‌ লিখল, ‘কেকভাজাটা খেয়ে মনে হল ঘর-মোছা ন্যাতাকে চিনির রসে ডোবানো হয়েছে।’ সেকথা পড়ে আমি তো মহা চটে গেলাম, সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছে নালিশ করলাম। মা পূষন্‌কে তখুনি চিঠিতে লিখলেন ‘কখনও কোনও মহিলার রূপ ও রান্না নিয়ে তির্যক মন্তব্য করতে নেই, ইত্যাদি।’

    মায়ের ‘মাল্টি-টাস্কিং’-এর অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে আমি অবাক হয়ে যেতাম। উনি বিছানার পাশের চেয়ারে বসে একদিকে ফোনে মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে ‘খেলাঘর’ বা অন্য কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা, জাস্টিস এস এস এ মাসুদের সঙ্গে সামাজিক সমস্যা নিয়ে কোনও মিটিং-এর ব্যবস্থা করা, কোনও বান্ধবীর মেয়ের কলেজে ভর্তির সমস্যার সমাধান করার ফাঁকে ফাঁকে (মাউথ-পিস চাপা দিয়ে) রান্নার নির্দেশ দেওয়া, বাবার ওষুধ আনানো, ইত্যাদি সংসার পরিচালনার কাজ অনায়াসে করে যেতেন। সেইসময় আমার চেনা কোনও মাতৃস্থানীয়া মহিলাকে (বলা ভালো বোধহয় কোনও মানুষকে) আমি একই সঙ্গে এত কাজ করতে দেখিনি; চাকরি, সংসার, সমাজসেবা, সভাসমিতি, অতিথি-আপ্যায়ন, সাহিত্যচর্চা সবই করছেন অথচ কখনও তা নিয়ে বড়াই করছেন না। অবাক না হয়ে উপায় ছিল না!

    মায়ের বলা একটা বিশেষ কথা মনে পড়ছে: মা মনে করতেন স্ত্রী-স্বাধীনতা আসলে পুরুষের স্বাধীনতা। একটা সময় ছিল যখন নারীরা শুধুই ঘরকন্না করতেন। কিন্তু স্ত্রী-স্বাধীনতার কারণে তাকে যখন বাইরের পেশার জগতটি সামলাতে হয়, অধিকাংশ সময়ে ঘরের কাজের দায়িত্ব কিন্তু একই রকম থেকে যায়। স্পষ্টতই, এই পরিস্থিতিতে পুরুষের দায়িত্ব কমে বলেই মায়ের মনে হত। আরেকটি কথা উনি বলতেন: Even the heaven is not a big enough kitchen for two women.

    ‘মায়ের আমার পরস্পরকে লেখা চিঠি’ অধ্যায় থেকে—

    T.I.F.R. ৩০.৮.৮৪

    মা,

    ***

    ‘বসুধারা’ মানে আমি সত্যিই জানতাম না তাই ব্রাহ্মণ-কন্যার জানা উচিত যখন তখন অভিধান খুললাম। ব্যাপারটাকে চিনতাম কিন্তু তার significance (সেটি অভিধানেও নেই) বা নাম জানতাম না। গত ক’দিন তাই Institute-এর বাঙালিদের (অবশ্যই যাঁদের কাছে এমন প্রসঙ্গ নিয়ে এগোনো যায়) কাছে ‘বসুধারা’-র মানে জানতে চেয়ে এইরকম উত্তর পেয়েছি: প্রণব ঘোষ, সত্য মণ্ডল, সুরজিৎ চক্রবর্তী, শান্তনু ভট্টাচার্য্য (তর্কচঞ্চু পরিবারের ছেলে) কেউ জানে না।। তোমার পুত্রের ও সুবীরদার জানার প্রশ্নই ওঠে না। মজা হল এণাক্ষীকে নিয়ে। প্রবাসী বাঙালি ব’লে ওকে উল্টে প্রশ্নটা করেছিলাম অর্থাৎ ব্যাপারটার বিবরণ দিয়ে নাম জানতে চেয়েছিলাম। উত্তর দিল ‘কিছু একটা ধারা’। ভেবেচিন্তে বলল, ‘কনকধারা’। সঠিক উত্তরটা বলতে বলল ‘আমার কনকধারা আর বসুধারার মধ্যে confusion হচ্ছিল—বসুধারাই।’ ওকে full marks দিতে পারো। আমাদের generation ও তোমাদের generation-এর বন্ধুদের আলাদা করে statistics নিয়ে এই প্রসঙ্গটা কেমন দাঁড়ায় করে দেখতে পারো।

    ***

    চম্পাকলি

    ‘গৌরী আইয়ুবকে লেখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কয়েকটি চিঠি’ অধ্যায় থেকে—

    জাহানারা ইমাম (১৯২৯-১৯৯৪): বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, লেখক-সম্পাদক ও রাজনৈতিক কর্মী। মুক্তিযুদ্ধে জাহানারা ইমাম তাঁর একটি পুত্রকে হারিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি ফৌজকে যারা নরহত্যা ও অত্যাচারে সহায়তা করেছিল সেইসব দোষীদের শাস্তি দেবার ব্যাপারে পরবর্তী কালে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ‘শহীদ জননী’ নামে খ্যাত জাহানারা ইমামের লেখা একাত্তরের দিনগুলি বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের এক মর্মস্পর্শী বিবরণ রয়েছে।

    শ্রদ্ধেয়া জাহানারা ইমামের লেখা চিঠিগুলি প্রকাশের অনুমতি দেওয়ার জন্য সইফ ইমাম জামির কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

    (১)

    ঢাকা

    ১৭.৯.১৯৯০

    প্রিয়, প্রিয়, প্রিয় গৌরীভাবী,

    সনজিদার কাছে জানলাম, নিশির হাতে পাঠানো আমার বইয়ের প্যাকেট তুমি পেয়েছ। নিশ্চিন্ত হ’লাম। আগামীকাল বেবী মওদুদ যাচ্ছে, তার হাতে আরেকটা চিঠি পাঠাবার লোভ সামলাতে পারলাম না।

    ফেব্রুরারি মাসে তোমার আসার দিন গুনছি। কবে নাগাদ রওনা দিতে পারবে, তার একটা আনুমানিক তারিখ যদি এখনই জানিয়ে দিতে পার, তাহলে মনের গুনগুনানিটা আরো সুখকর হয়। আনুমানিক বলছি এই অর্থে, যখন সত্যি সত্যি টিকেট কাটতে পাঠাবে, তখন হয়তো একটা দুটো দিন এদিক-ওদিক হতে পারে। তাই এখন আনুমানিক তারিখ জেনেই আমি সন্তুষ্ট থাকতে চাই। বেবীর কাছ থেকে চিঠিটা সঙ্গে সঙ্গে প’ড়ে তক্ষুনি একটা ছোট জবাব লিখে ওর হাতে দিয়ে দিও।

    তুমি সনজিদাকে বলেছ, ‘আমি জাহানারাকে কথা দিয়েছি তার বাড়িতেই উঠব’—এটা শুনে আমি প্রাণে এত সুখ আর শান্তি পেয়েছি যে তা ভাষায় বর্ণনা করা আমার অসাধ্য। সনজিদারা তোমাকে না পেলেও তোমার সঙ্গে আর যাঁরা আসবেন, তাঁদেরকে নিজের বাড়িতে ভাগাভাগি করে রেখে আপ্যায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

    আমি আগস্ট মাসটা বেশ অসুস্থ ছিলাম। এমাসের প্রথমদিকেও ফ্লু ও অল্প একটু ব্রঙ্কাইটিসের কামড়ে কাহিল ছিলাম। বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ।

    তুমি ভালো থেক। আমার অনেক ভালবাসা নাও। ইতি

    তোমার আদরের

    ননদিনী

    জাহানারা

    নীরদচন্দ্র চৌধুরী (১৮৯৭–১৯৯৯): আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন লেখক যিনি বাংলা ও ইংরিজি দুই ভাষাতেই (যেমন, The Autobiography of an unknown Indian, Thy Hand, Great Anarch, বাঙালী জীবনে রমণী, আমার দেবোত্তর সম্পত্তি, ইত্যাদি) ইতিহাস ও সাহিত্যমূল্যে সমৃদ্ধ একাধিক বই লিখেছিলেন।

    P & O BUILDING

    NICHOLSON ROAD DELHI-6

    16TH Jan 1969

    প্রীতিভাজনেষু,

    গৌরী বেগমসাহিবা—আপনার চিঠি অল্পক্ষণ আগে পাইয়াছি। আপনার আগের চিঠি পাই নাই—নহিলে কবে জবাব পাইতেন। আমার sweetheart-দের চিঠির উত্তর দিতে কখনই দেরী করি না—তবে উঁহারা প্রায় harem গড়িয়া তুলিতেছেন। আমারই ভাগ্য!

    আপনাকে দিয়া আমার সেক্রেটারীর কাজ হইবে না—কারণ আপনি এই পদে প্রতিষ্ঠিত হইলে আমার ঘরে ফুলদানীতে ফুলের মতো থাকিবেন, তরকারীর মত কাজে লাগানো হইবে না।

    আমার উপর রাগ করিবেন, না আমাকে ভালবাসিবেন, এই প্রশ্ন কি এখনও অমীমাংসিত আছে? ভালবাসিয়া আত্মসমর্পণ না করিলে রাগ করিতেন না।

    এদিকে ফিরিয়া আসিয়া কাজ ও সামাজিক কর্তব্য পালনের ভার এত বেশী পড়িয়াছে, প্রেমপত্র লিখিবার অবকাশ খুব কম হইবে। মাঝে মাঝে খবর মাত্র দিব।

    কাগজে লেখা ত আছেই—তাহার উপর ম্যাক্স মূলারের জীবনী নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করিতে হইবে। তাই একটু বিব্রত অবস্থায় আছি। ম্যাক্স মূলার সূত্রে একবার হয়ত কলিকাতা যাইতে হইবে—National Library-তে পড়িবার জন্য। তবে এখনও কিছু ঠিক করি নাই। গেলে সেবারের মত হইবে না—অবশ্যই দেখা করিব।

    আইয়ুব সাহেব ও আপনি আমাদের প্রীতি সম্ভাষণ জানিবেন। শ্যামশ্রী দেবীর সঙ্গে দেখা হইলে বলিবেন, তাঁহার কার্ড ও চিঠি পাইয়াছি। একটু সময় পাইলেই উত্তর দিব। ইতি,

    শ্রী নীরদচন্দ্র চৌধুরী

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments