


বিশ্বের ইতিহাসে হুগলি নদী: ভারত, পর্তুগাল, ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড, ডেনমার্ক; — Robert Ivermee (রবার্ট আইভারমি); অনুবাদ: শুভময় রায়; প্রকাশক— পরবাস; প্রথম প্রকাশ— বইমেলা ২০২৬; ISBN: 978-1-946582-56-0
২৮০ পৃষ্ঠার বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হল:
ভূমিকা থেকে--
হুগলিতীরবর্তী সাতটি স্থানের কথা এই বইতে বলা হয়েছে। আমরা এই জনপদগুলির সামগ্রিক ইতিহাস বর্ণনা করতে চাইনি। বরং চেষ্টা করেছি এই নদী বিশ্ব ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠার পিছনে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলির আরও অনুসন্ধানের জন্য প্রেক্ষিত তৈরি করতে। প্রথমে নদীর উজানে আর পরে ভাটার দিকে বইটি এগিয়েছে, আমরাও সেই সঙ্গে ষোড়শ শতাব্দ থেকে বর্তমানের দিকে অগ্রসর হয়েছি।
প্রথম অধ্যায়ে এসেছে হুগলি শহরের কথা। পর্তুগিজরা এই শহর অধিকার করে প্রথম ইয়োরোপীয় বসতি গড়ে তোলে। সেখান থেকে শুরু করে সেই বসতির ধ্বংস হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ঘটনাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। সেই সময়ের যেসব বিবরণ এখনও পাওয়া যায়, তার সাহায্যে দেখানো হয়েছে পর্তুগিজদের বসতিতে জীবনযাত্রা কেমন ছিল; ১৬৩২-এ মুঘল সম্রাট শাহজাহান কেন চেয়েছিলেন আক্রমণ করে হুগলি শহরকে তছনছ করে দিতে, তাও জানার চেষ্টা করা হয়েছে। স্পষ্টতই পর্তুগিজরা বঙ্গোপসাগরে দাস-দাসী পরিবহণ আর লেনদেনের যে ব্যবস্থা চালু করেছিল তা মুঘল সম্রাটকে অসন্তুষ্ট করেছিল এবং হুগলি আক্রমণ করার পিছনে এই কর্মকাণ্ডের প্ররোচনা ছিল। হুগলির বিশ্ব ইতিহাসে পর্তুগিজদের ভূমিকা কেন অস্বীকার করা যাবে না, তাই নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মুর্শিদকুলি খান যে শহরকে বাংলার রাজধানীর মর্যাদা দিয়েছিলেন, সেই মুর্শিদাবাদের কথা বলা হয়েছে দ্বিতীয় অধ্যায়ে। মুর্শিদকুলি খান ছিলেন মুঘল সম্রাটের অধীনস্থ দেওয়ান। তা সত্ত্বেও তিনি বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যের থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন সুবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত শাসনের পত্তন হয়। তাঁর উত্তরাধিকারীরা সিংহাসনের লড়াইয়ে কীভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন সেই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে ভারতের ইতিহাসে ক্ষমতার লড়াইকে শুধুমাত্র ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংগ্রাম হিসেবেই কেন দেখা উচিত, অনেকে তাকে হিন্দু বনাম মুসলমানের বিবাদ হিসেবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেন, তা কেন ঠিক নয়। মুর্শিদাবাদে আমরা বিভিন্ন জাতি আর ধর্মের মানুষকে একত্রিত হতে দেখেছি। সেখানে ইসলামি সংস্কৃতি আর ধর্মীয় উপাদানের সঙ্গে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্মের সমন্বয় ঘটেছিল। সেই কারণে এমন এক রাজত্বের ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে যা বহুত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত।
তৃতীয় অধ্যায়ের অনুসন্ধানের বিষয় হুগলিতে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান। কোম্পানি পর্তুগিজ আর ওলন্দাজদের দেখানো রাস্তা ধরে অগ্রসর হয়ে বাণিজ্যের অধিকারের দাবি নিয়েই এসেছিল। তারপরে প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শন করে, জুলুম করে একচেটিয়া বাণিজ্যের সুযোগ পেয়েছে। কোম্পানি কীভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে সমর শক্তিতে বলীয়ান, আঞ্চলিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠল তার বর্ণনা এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর পরিণামে যুদ্ধবিগ্রহে আর দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের প্রাণ গিয়েছিল—সেইসব ঘটনাবলিকেও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিয়োগান্তক নাটকের রূপক হিসেবে আমরা পলাশির কথা বলেছি। পলাশিতে বাংলার শাসকের সঙ্গে ইংরেজ সেনার যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে কোম্পানি ক্ষমতা দখল করেছিল। পলাশিতে সেসময় যা ঘটেছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। আজকের দিনে আমরা প্রায়ই দেখে থাকি ক্ষমতাশালী কর্পোরেটরা কেমন করে তাদের ক্ষমতার প্রসার করছে, কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে; জাতি-রাষ্ট্র কখনো তাদের এই কাজে ইন্ধন জোগাচ্ছে, কখনো মৌন সমর্থন দিচ্ছে। আমরা যদি এই প্রবণতার বিশ্লেষণ করতে চাই, তবে পলাশির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারি।
চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে চন্দননগরকে নিয়ে। সেখানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ফরাসি বাণিজ্য কোম্পানির প্রতিষ্ঠার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। হুগলি তীরের ঘটনাবলি কীভাবে ফ্রান্সে বিপ্লব আনতে সাহায্য করেছে, আর সেই বিপ্লব বাংলাকেই বা কীভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের এক আন্তর্জাতিক চেহারা ধরা পড়ে। ফ্রান্সে যখন পুরোনো শাসন ব্যবস্থা বা অঁসিয়্যাঁ রেজ়িম (ancient regime)-এর তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল, যখন উপনিবেশবিরোধী চিন্তাভাবনা ক্রমশই দানা বাঁধছিল বেশি সংখ্যক মানুষের মনে, তখন সুদূর ভারতবর্ষে হুগলির তীরে ফরাসি আর ইংরেজ কোম্পানি কী ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে সেদিকে অনেকেরই নজর ছিল এবং এই নিয়ে শাসককে যথেষ্ট সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছিল। এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন—এই ধারণাগুলি বৈপ্লবিক। ইয়োরোপের মাটিতেই এইসব গুরুত্বপূর্ণ ধ্যানধারণার জন্ম। হুগলিতীরবর্তী এলাকায় ঔপনিবেশিকদের ইয়োরোপীয় রীতিনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এইসব চিন্তাধারা সাহায্য করেছিল ঠিকই, কিন্তু কোথাও আবার বাধা হয়েও দাঁড়িয়েছিল।
পঞ্চম অধ্যায়ে বলা হয়েছে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিদের একটি ছোটো গোষ্ঠীর কথা। শ্রীরামপুর শহরে দিনেমাররা জাঁকিয়ে বসায় কয়েক জন মিশনারি তখন সেখানে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। ভাবতে অবাক লাগে যে সংখ্যায় নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও কতখানি তাৎপর্যপূর্ণ কাজ তাঁরা করে গেছেন—বাংলায় প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ছাপাখানাটি তাঁদের তৈরি। এঁদের মিশন ও প্রেস বিভিন্ন দিকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল, যেমন শিক্ষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার, রাজনীতি ইত্যাদি। এই অধ্যায়ে মিশনারিদের এই অবদানগুলির কথা আলোচনা করা হয়েছে। বাংলায় ইংরেজ সরকারের উপর মিশনারিদের কী প্রভাব পড়েছিল, যাঁরা ঔপনিবেশিক শাসনকে অগ্রাহ্য করেছিলেন অথবা তার বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের উপরেই বা মিশনারিরা কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তাও খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের বিষয় কলকাতা। পৃথিবীর প্রথম সারির একটি মহানগর হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার যোগ্যতা যে কলকাতা শহরের ছিল, সে কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকে কলকাতার উন্নয়নের সঙ্গে হুগলি নদীর উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের নিবিড় যোগ ছিল। মানুষ আর মালপত্রের পরিবহণ, খাদ্য আর জল সরবরাহ, স্বাস্থ্যবিধি আর নিকাশি ব্যবস্থা—এইসব বিভিন্ন কাজে হুগলিকে ব্যবহার করা হত। আমাদের আলোচনার পরিসরে এই বিষয়গুলিকে আমরা নিয়ে এসেছি। সেটি ছিল বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড়ো বড়ো উদ্ভাবনের যুগ—বাষ্পচালিত জাহাজ আর রেল, পাম্পিং স্টেশন আর নতুন জল নিকাশি ব্যবস্থা, এসবই আমরা হুগলির তীরে পেয়েছিলাম। কিন্তু বাংলা ও হুগলি তীরের এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল অশান্ত। তাই সভ্যতার অগ্রগতির বিভিন্ন চিহ্ন এখানে ফুটে উঠলেও ঔপনিবেশিক শাসকরা সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন যে সভ্যতার সামনে প্রকৃতিই হয়তো শেষপর্যন্ত বাধা হয়ে দাঁড়াবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের লড়াইয়ে হুগলি যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল সে কথাও এই অধ্যায়ে বলা হয়েছে।
বিংশ শতাব্দের গোড়া থেকেই ভারতের অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক রাজধানী হিসেবে কলকাতার অবস্থান আর শক্ত ভিতের উপর ছিল না। বিশ্ব পরিসরে হুগলি নদীর গুরুত্বও কমে আসছিল। সাগরদ্বীপ সম্পর্কিত শেষ অধ্যায়ে হুগলির বিশ্ব ইতিহাস নিয়ে চিন্তাভাবনা ব্যক্ত করা হয়েছে; আজকের ভারত আন্তর্জাতিক স্তরে যে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এক রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে, সেই ক্ষেত্রে নদীটির সম্ভাব্য তাৎপর্যকেও বিবেচনা করা হয়েছে। হুগলি নদীর ভবিষ্যৎ যারা নির্ধারণ করবে তাদের অবশ্যই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। না হলে বর্তমান শতক পরিবেশের সংকট, অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার বৈষম্যের মতো যেসব বড়ো মাপের প্রতিকূলতার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে, তার মোকাবিলা করা কঠিনতর হয়ে পড়বে।
•
‘হুগলি’ অধ্যায় থেকে--
মানরিক যখন হুগলিতে পৌঁছোন, শহরটি তখন উন্নতির শীর্ষে। ইতিমধ্যেই সবচেয়ে সফল পর্তুগিজ বণিকদের প্রাসাদগুলি নদীর তীরে বেশ কয়েক মাইল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তুলনায় কম ধনী উঠতি ব্যবসায়ীরা শহরে পাথরের তৈরি বাড়িতে বাস করত। গরিব মানুষদের জন্য ছিল খড়ের চালাঘর, একদম গোড়ায় আসা পর্তুগিজদের বসতবাড়ির মতো। মানরিকের নথি অনুসারে খাদ্য ছিল পর্যাপ্ত এবং সস্তা; চাল ইয়োরোপের তুলনায় অনেক উৎকৃষ্ট, মিষ্টান্ন অতি সুস্বাদু আর ফল, বিশেষত আম, অতুলনীয়।২৭ হুগলির আবহাওয়া ফুরফুরে, জল পরিষ্কার আর স্বাস্থ্যসম্মত। শহরের বাসিন্দাদের সামাজিক আচার-আচরণ মানরিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে পোশাক আর আচার-ব্যবহারে পর্তুগিজরা অনেকটাই ভারতীয় হয়ে গিয়েছিল। পুরুষরা রেশম অথবা সুতির লম্বা ঢিলেঢালা পোশাক পরত, গয়নাগাটি আর চটি ব্যবহার করত। তাদের প্রধান খাদ্য ছিল ভাত, মাংস, মাছ, শাকসবজি আর আচার। রবিবার আর উৎসবের দিনে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় করা হত। আমোদকারীরা নৌকাবিহারে অথবা নদীতীরের ফলের বাগান আর উদ্যানে সময় কাটাত। গির্জায় উপস্থিতির দায়িত্বটা পালিত হত সাড়ম্বরে: ধনীরা যেত পালকি চড়ে, পিছনে দাস-চাকরের দল। সব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যাপনের অংশ ছিল সংগীত। অগাস্টিনিয়ান ধর্মযাজকদের অনেকে সংগীতরচনার ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল।২৮
যে প্রতিষ্ঠানটি হুগলির সমাজকে সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে তা হল জুয়ার ঠেক; সেখানে তাস, পাশা আর বরাতজোরকে পরখ করার অন্যান্য খেলা চলত। এই আখড়াগুলিতে সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী আলাদা আলাদা ঘরে বাজি জেতার জন্য পুরুষরা প্রতিযোগিতায় নামত। মহিলাদের কাজ ছিল শুধুমাত্র গান-বাজনা দিয়ে পুরুষদের মনোরঞ্জন করা। প্রতিযোগিতা তীব্র হলেও যে যার মানসম্মান অনুযায়ী প্রচলিত আদবকায়দা পালনের ফলে সাধারণত ঝগড়াঝাঁটি হিংসাত্মক চেহারা নিত না। জুয়ার আখড়ায় পুরুষদের ঘুম, খাওয়াদাওয়া সবই চলত, তবে সবচেয়ে বেশি চলত মদ্যপান। ধনীদের যথেচ্ছ উপভোগের জন্য পর্তুগাল থেকে মদ আমদানি করা হত বটে, তবে স্থানীয় ধেনো মদের উপর নির্ভরতাই ছিল বেশি। দেশি মদ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল যে তা ‘অত্যন্ত কড়া... যা অতিরিক্ত সেবনে পঞ্চেন্দ্রিয়কে আমাদের বিলিতি মদের মতোই প্রভাবিত করে।’ গুড় থেকে তৈরি গাঢ় আরকেরও কদর ছিল।২৯ কামোদ্দীপক হিসেবে আফিং ও ধূমপানের জন্য গাঁজার প্রচলন ছিল। জায়ফল, জৈত্রী, লবঙ্গ এবং অন্যান্য মসলা সহযোগে পানীয় সেবন করা হত। মানরিক জানাচ্ছেন ভাং ‘সব বর্বর আর অশালীন বিনোদনের উদ্দেশ্য যে যৌনতা, তা চরিতার্থ করতেও কাজে লাগানো হত। আর সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলেও অসুবিধা ছিল না। কারণ ভাঙের নেশায় গভীর ঘুমে চলে গিয়ে অথবা হাসতে হাসতে খোশমেজাজে মানুষ তাদের সমস্ত হতাশাকে ভুলে থাকতে পারত।’৩০
হুগলির অধিবাসীদের কখনো-সখনো অসংযত জীবন যাপনে আশ্চর্যেরই বা কী আছে? অসুস্থতা আর মৃত্যু যাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী, তাদের বিশৃঙ্খল আচরণ হয়তো অপ্রত্যাশিত নয়। সপ্তদশ শতকের বাংলায় মানুষের জীবন প্রায়শই সংক্ষিপ্ত হত। সমুদ্রযাত্রীরা যাত্রাশেষে আমাশা আর স্কার্ভিতে ভুগত। তা ছাড়াও ছিল খাদ্য আর পানীয় জলের অভাব, আর শুকনো ডাঙায় জ্বর, ম্যালেরিয়া, কলেরা আর যৌন রোগের প্রকোপ। হুগলি ও তার শাখানদী দিয়ে উজানে যাত্রা করলে কুমিরের ভয়, বন্দুকের গুলিতেও নাকি তারা মরে না। আর হাঙর, বাঘ, মশা, জোঁক এবং তার সঙ্গে লোভী আবগারি কর্মকর্তা, ক্রুদ্ধ গ্রামবাসী আর শত্রুভাবাপন্ন জলদস্যুদের কথা তো বলাই বাহুল্য।৩১ নদীপথে যাত্রা এতই অনিশ্চিত যে কেউ কেউ বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে স্থলপথে অপেক্ষাকৃত কষ্টকর যাত্রাই বেশি পছন্দ করত। এইসব বিপদের মোকাবিলা করার একটা উপায় হাসি-তামাশা। ফরাসি চিকিৎসক ফ্রঁসোয়া বের্নিয়ের (François Bernier) রসিকতা করে বলেছিলেন যে বাঘ সবসময় নৌকার সবচেয়ে মোটা লোকটাকে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দেয়। প্রাণসংশয়ী বিপদ যদি বা এড়ানো গেল যাহোক করে, তুলনামূলকভাবে তুচ্ছ, যেমন মালপত্র ভিজে যাওয়ার মতো দুশ্চিন্তা এসে জুড়ে বসবে। হুগলি পৌঁছে বের্নিয়ের খুব দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছিলেন: ‘আমার পরনের বেশভূষা কোনোটা শুকনো নেই, হাঁস-মুরগি মৃত, মাছ পচে একশা, এমনকি আমার বিস্কুটগুলো পর্যন্ত সব ভিজে সপসপ করছে।’৩২
•
‘মুর্শিদাবাদ’ অধ্যায় থেকে--
১৬৭০ সালের গোড়ার দিকে মুঘল কর্মকর্তা হাজি শফি ইস্পাহানি যখন দাক্ষিণাত্যের মধ্যভাগে ভ্রমণ করছিলেন, এক নিঃস্ব ব্রাহ্মণ দম্পতি তাঁদের পুত্র সন্তানকে ইস্পাহানির কাছে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেন। মুঘলদের চাকরি ছেড়ে ইস্পাহানি সেই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে পারস্যে ফিরে গিয়ে তার নাম রাখেন মোহম্মদ হাদি। মুসলমান হিসেবেই মোহম্মদ হাদি বড়ো হচ্ছিলেন। একসময় ইস্পাহানির মৃত্যু হলে হাদি বাধ্য হয়ে অন্যত্র জীবিকার সন্ধান করতে থাকেন। বয়স যখন কুড়ির কোঠায়, তখন তিনি ভারতে ফিরে এসে মুঘল অধীনস্থ বেরার রাজ্যে দেওয়ানের (প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা) চাকরি নেন। রাজস্ব অফিসের সহকারী হিসেবে চাকরি করে মোহম্মদ হাদি দক্ষ আর পরিশ্রমী প্রশাসক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এমনকি স্বয়ং সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁর কাজের প্রশংসা করেন। শাহজাহানের পুত্র আওরঙ্গজেব প্রায় এক দশক ধরে দাক্ষিণাত্যের মালভূমিকে মুঘলদের অধীনে আনার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ১৬৮৭-তে গোলকোণ্ডার সুলতানি শাসনের পতনের পরে দক্ষ আর বিশ্বাসী কর্মকর্তার প্রয়োজন ছিল। আওরঙ্গজেব মোহম্মদ হাদিকে সদ্য দখল করা সুবার দেওয়ান নিযুক্ত করলেন। নিঃস্ব ব্রাহ্মণ পিতা-মাতার সন্তানের কাছে সেটা ছিল উল্কার মতো উত্থান। তবে মোহম্মদ হাদির খ্যাতি ও ক্ষমতা সেখানেই থেমে থাকেনি। দাক্ষিণাত্যে ১৫ বছর কাজ করার পর আওরঙ্গজেব তাঁকে বাংলা আর ওড়িশার দেওয়ান নিযুক্ত করলেন। হাদির পোশাকি নাম হল মুর্শিদকুলি খান। বৃদ্ধ আওরঙ্গজেব আর মাত্র কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন। মুঘল বাদশাহের মৃত্যুর পরে মুর্শিদকুলি খান বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্য থেকে আলাদা করে নিজের অধীনে স্বাধীন সুবার প্রতিষ্ঠা করলেন। নিজেরই তৈরি যে শহর থেকে তিনি সেই সুবার পরিচালনা শুরু করলেন তার নাম দিলেন মুর্শিদাবাদ।১
…
মারাঠা আর আলিবর্দির মধ্যে নয় বছরব্যাপী এই যুদ্ধ নির্বিচারে হিন্দু আর মুসলমানের ক্ষতি করেছিল। বাঙালি কবি গঙ্গারাম একটি বিখ্যাত কবিতায় মারাঠা সেনাদের ধেয়ে আসার সংবাদে একটি ছোটো শহরের মানুষদের প্রতিক্রিয়া এইভাবে বর্ণনা করেছেন—
ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পলাএ পুঁথির ভার লইয়া।
সোণারবাইনা পলাএ কত নিত্তি হড়পি লইয়া।
গন্ধবণিক পলাএ দোকান লইয়া জত।
তামাপিতল লইয়া কাঁসারি পলাএ কত।
কামার কুমার পলাএ লইয়া চাক নড়ি।
জাউলামাউছা পলাএ লইয়া জাল দড়ি।
গন্ধবণিক পলাএ করাত লইয়া কত।
চতুর্দিগে লোক পলাএ কি বলিব কত।
কায়স্থ বৈদ্য জত গ্রামে ছিল।
বরগির নাম সুইনা সব পলাইল।
ভাল মানুষের স্ত্রীলোক জত হাটে নাই পথে।
বরগির পলানে পেটারি লইয়া সঙ্গে।
ক্ষেত্রি রাজপুত জত তলয়ারের ধনি।
তলয়ার ফেলাইয়া তারা পলান এমনি।
(মহারাষ্ট্র পুরাণ—কবি গঙ্গারাম)
ভয়ের চোটে পালাতে হল সবাইকে। পণ্ডিতরা বইপত্র সঙ্গে নিয়ে, সোনার বেনে, গন্ধবণিক, কাঁসারি, কামার, কুমার, জেলে—যে যেমন পারল, তাদের কাজের জিনিসপত্র তুলে নিয়ে পালাল। গ্রামের যত কায়স্থ, বৈদ্য, এমনকি উচ্চ বংশের মহিলারা, যারা কখনো বাড়ির বাইরে পা দেয়নি, মাথায় থলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল পথে। ক্ষেত্রী রাজপুত্ররাও পালাল, তারা তাড়াহুড়োতে তলোয়ার সঙ্গে নিতে পারল না, ফেলে চলে গেল।৫৮ মুর্শিদাবাদের নগরবাসীরা প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিল পূর্ব দিকের অন্যান্য শহরে।
এক ফারসি ঐতিহাসিকের করুণ ভাষ্যে এই সংঘর্ষের পরিণতির বর্ণনাটি এইভাবে ধরা আছে: ‘দোকানপাট আর শস্যের গোলা খালি হয়ে গেলে উপবাসে মৃত্যু এড়াতে মানুষ বুনো গাছের মূল আর পশুরা গাছের পাতা খেতে শুরু করে। তারপরে একসময় তাও দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায়—তখন সকাল আর রাতের খাবারের জন্য তাদের ক্ষুধার্ত চোখের সামনে থালার মতো পড়ে ছিল শুধু গোলাকার সূর্য আর চাঁদ।’৫৯
…
‘শ্রীরামপুর’ অধ্যায় থেকে--
শ্রীরামপুরে সে সময় যে-ধরনের দালানকোঠা নির্মাণ শুরু হয়েছিল, তার থেকে সেখানকার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির আন্দাজ পাওয়া যায়। আশপাশের ধান জমিতে জল সরবরাহ করার জন্য একটি নতুন খাল দিনেমার মহল্লা থেকে শহরের পশ্চিমাংশকে আলাদা করেছিল। শহরের এই পশ্চিমভাগে ছিল সমৃদ্ধ বাঙালিদের প্রাসাদোপম অট্টালিকা, তার মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া বাড়িটি ছিল গোস্বামী রাজবাড়ি। হুগলিতীরের এককালের জমিদার ও ব্যবসায়ী রঘুরাম গোস্বামী ছিলেন এই প্রাসাদের মালিক। তাঁর বাবা শহরের আবগারি শুল্ক আদায় করে অঢেল ধনসম্পদের মালিক হয়েছিলেন। খালের পূর্ব দিকে উঁচু সড়কের ধারে ছিল বেশ কিছু নব্য-ধ্রুপদী শৈলীর কুঠিবাড়ি। বাইরের দিকে সাদা রঙের প্লাস্টার করা সেসব বাড়ির বাসিন্দা ছিল ইয়োরোপীয় ব্যবসায়ীরা। ইংরেজ-অধিকৃত চন্দননগর থেকে ফরাসি আশ্রয়প্রার্থীরা প্রথম শ্রীরামপুরে আসতে শুরু করলে ১৭৬১ সালে একটি ক্যাথলিক গির্জা নির্মিত হয়। শতাব্দের সন্ধিক্ষণে এর সঙ্গে যুক্ত হয় সেন্ট ওল্যাভ (St Olav)-এর প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা। এই গির্জার মাঝখানের শক্তপোক্ত অংশে ছিল ঘন্টা লাগানো একটি গম্বুজ। গির্জাসংলগ্ন ‘নিশান’ ঘাটে মান্যগণ্য পর্যটকরা জাহাজ থেকে নামতেন। তাঁদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নদীর পাশেই ছিল সরাইখানা আর হোটেল। দিনেমার মহল্লার কেন্দ্রে ছিল গভর্নরের বাড়ি; ১৭৭৪ থেকে কর্নেল ওলে বিয়ে (Ole Bie)-র তিন দশকব্যাপী প্রশাসনকালে ভবনটির একাধিকবার সম্প্রসারণ আর সংস্কার করা হয়েছিল।৩
আঠেরোশো সনের সূচনার প্রথম কয়েক মাস অবশ্য শ্রীরামপুরের প্রধান আকর্ষণ মোটেই গভর্নরের বাড়ি অথবা গোস্বামী রাজবাড়ি ছিল না। দিনেমার মহল্লার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তুলনামূলকভাবে মামুলি একটি ভবন নিয়েই ছিল যত মাতামাতি। গাড়িবারান্দাওয়ালা এই বাড়ির প্রাঙ্গণে আরেকটি ছোটো বাড়িতে ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ড থেকে আগত ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা সেই যন্ত্র নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকতেন যেটি অদূর ভবিষ্যতে বাংলায় বিপ্লব আনবে—কাঠের পাটাতনের উপর রাখা, হাতে-চালানো, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরানো যায় এমন টাইপ-যুক্ত মুদ্রণযন্ত্র। বাংলায় এই ধরনের যন্ত্র সেটিই প্রথম নয়, সতেরোশো সাতাত্তরেই কলকাতায় আধুনিক গুটেনবার্গ শৈলীর ছাপার যন্ত্র আমদানি করে আনা হয়। তবে শ্রীরামপুরের যন্ত্রটি ভারতীয় ছাপাখানার ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে গণ্য হবে। পরবর্তী চার দশক ধরে প্রচুর নথিপত্র সেখান থেকে ছেপে বেরোবে। সে সময় চল্লিশটিরও বেশি ভাষায় দু-লাখেরও বেশি বই ছাপা হয়েছিল—অনেক ভাষার হরফের সর্বপ্রথম ছাঁদ তৈরি আর টাইপসেটও শ্রীরামপুরেই হবে।8 উৎসাহী মানুষেরা তখন ভিড় করে এসে ছাপাখানার কাজকর্ম দেখত। যন্ত্রচালনার দায়িত্বে থাকা মিশনারিরা সারাদিন এই যন্ত্র নিয়েই পড়ে থাকতেন। তাই স্থানীয় লোকেরা ওই যন্ত্রের নাম দিয়েছিল ‘ফিরিঙ্গি ঠাকুর’।৫