


“Lost in non-translation” শীর্ষক প্রবন্ধটি আসিমভ প্রথম প্রকাশ করেন ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ‘The magazine of fantasy and science fiction’ পত্রিকায়। লেখাটি আমি পড়ি আসিমভের একটা প্রবন্ধের সংকলনে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত এই সংকলনটির নাম “Asimov on Science: A 30 year retrospective”। ২০২০ সালে আমি প্রথম যখন লেখাটা পড়ি তখন ঠিক কী কী রাজনৈতিক আর সামাজিক কারণে লেখাটা আমায় আকর্ষণ করেছিল, তার একটা খতিয়ান দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দিলাম না। আমার মতো করে নিজের-নিজের লিস্টি পাঠক নিজেই বেশ বানিয়ে নিতে পারবে — এটাই বোধহয় লেখাটার সার্থকতা।
বরং একটা আপাত তুচ্ছ বিষয়, যা আমাকে বহুদিন ধরে অবাক করত, তার একটা সমান্তরাল প্রসঙ্গের উত্থান এই লেখায় আমাকে খানিকটা আশ্বস্ত করেছে। বহুদিন যাবৎ আমি অবাক হয়ে ভেবেছি যে মহাভারত অনুযায়ী ভীমের গায়ের রং ধবল, আর অর্জুনের গায়ের রং কালো হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত টিভি-সিরিয়াল-সিনেমা-অলংকরণ ইত্যাদিতে ঠিক এর উল্টোটা দেখানো হয় কেন? এর উত্তরটা খানিকটা blowing in the wind গোছের। কাজেই এই প্রশ্নটার উত্তর জানার জন্য কোনো লেখা পড়বার বোধহয় দরকার নেই। তবে কিনা, আবেগ জড়িয়ে নেই এমন সংস্কৃতির নিরপেক্ষ আলোচনা পড়লে অনেক সময়ে সেই আলোতে নিজের সংস্কৃতির ছোপগুলো দেখতে পাওয়া সহজ হয়। সেটুকু আশা নিয়েই অনুবাদটা করা।
সংখ্যাগরিষ্ঠ (দুঃখজনকভাবে) পাঠকের জন্য আরেকটা জরুরি কথা বলে নেওয়া দরকার। এই প্রবন্ধের লেখক আইজাক আসিমভ শ্বেতাঙ্গ মার্কিন এবং পারিবারিক সূত্রে রুশ ইহুদী।
অনুবাদের কিছু জায়গায় প্রসঙ্গতভাবে কিছু পাদটীকা দেবার কথা দরকারি মনে হয়েছে। টীকাগুলো সমস্তই আমার লেখা।
১৯৭১ সালে শ্রমিক দিবসের১ দিন বস্টনে অনুষ্ঠিত Noreascon-এর (২৯তম বিশ্ব কল্পবিজ্ঞান সম্মেলন) মঞ্চে — কল্পবিজ্ঞানের জগতের বব হোপ২ হবার সুবাদে আমার বাৎসরিক কর্তব্য “হিউগো পুরস্কার” দেবার জন্য আমি বসে ছিলাম। পাশে ছিল আমার মেয়ে রবিন — ষোড়শী, স্বর্ণকেশী,৩ নীলাঞ্জনা, তন্বী, এবং অপরূপা। (নাহ, এই শেষের বিশেষণটা নেহাতই বাপের গৌরবান্বিত পক্ষপাত নয়। যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।)
আমার পুরোনো বন্ধু ক্লিফোর্ড ডি সিমাক ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। সে তার বক্তৃতা শুরুই করল দর্শকাসনে বসে থাকা তার দুই সন্তানের তারিফ দিয়ে। তারিফের কারণটা যথেষ্ট ন্যায়সঙ্গত, অথচ রবিনের চোখেমুখে আতঙ্কের অন্ধকার ঘনিয়ে এল।
“বাবা,” আমার বক্তৃতা দিতে গিয়ে মানুষজনকে বিপাকে ফেলতে পারার ক্ষমতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হবার দরুন তার শশব্যস্ত ফিসফিস শোনা গেল, “তুমিও কি আমার পরিচয় দেবার কথা ভাবছ?”
“তোর কি তাতে অসুবিধে হবে?” আমি রবিনকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ, তা হবে বৈকি।”
“তাহলে বলব না।” তার হাতের ওপর একটা মৃদু চাপড় দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করলাম।
রবিন একটু ভাবল। তারপর বলল, “অবশ্য, বাবা, তোমার যদি একান্তই ইচ্ছে করে, তাহলে হালকা করে তোমার সুন্দরী মেয়ের কথা একটু বলতেও পারো। তাতে আমার আপত্তি নেই।”
পাঠক বোধহয় আন্দাজ করতেই পারছেন যে আমি সেদিন অবশ্যই রবিনের কথা বলেছিলাম। সে সময়ে রবিন সলজ্জ স্মিতহাস্যে অধোবদনে বসে ছিল।
কিন্তু আমার মাথা থেকে কিছুতেই বেরোচ্ছিল না পাশ্চাত্য সাহিত্যে বহুযুগ ধরে চলে আসা স্বর্ণকেশী, নীলাঞ্জনা নর্ডীয় সৌন্দর্যের গতানুগতিক ছাঁচের কথা — যে ছাঁচটি ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছে সেই সময় থেকে, যখন স্বর্ণকেশী, নীলনয়না জার্মান উপজাতিরা রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশ দখল করেছিল — আজ থেকে প্রায় পনেরো শতক আগে, এবং নিজেদের অভিজাতশ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
... আর যেভাবে এই গতানুগতিকতার ব্যবহার করা হয়েছে বাইবেলের অন্যতম স্পষ্ট আর গুরুত্বপূর্ণ একটা শিক্ষাকে বিকৃত করার জন্য, তা আরো চমকপ্রদ। তুচ্ছ হলেও, এই বিকৃতির একটা অবদান রয়ে গেছে আজকের পৃথিবীর গভীরতম সংকটে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ ভাবে প্রকট।
——— o o o ——— o o o ———
এক্কেবারে শুরু থেকে শুরু করতে চাইবার রোগটার জন্য আপাতত আমার সাথে চলে আসুন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। একদল ইহুদী সবেমাত্র ব্যাবিলনের নির্বাসনের শেষে জেরুসালেমে ফিরেছে ‘জেরুসালেম মন্দির’ বানাবে বলে, যা প্রায় সত্তর বছর আগে ধ্বংস করেছিলেন নেবুচাডনেজার।
এই নির্বাসনের সময়ে তাদের নবী এজিকিল (Ezekiel)-এর নেতৃত্বে তাদের জাতীয় পরিচয় তারা ধরে রেখেছিল তাদের প্রাচীন আরাধ্য দেবতা ‘ইয়াওয়েহ’ (Yahweh)-এর উপাসনার নানান উপাচারের পরিমার্জনা ও পরিবর্তনের মাধ্যমে — যা অনেকাংশেই আজকের ইহুদী ধর্মাচারের সরাসরি পূর্বসূরী (এই কারণে এজিকিলকে কখনো-সখনো ‘ইহুদী ধর্মের জনক’ বলা হয়)।
স্বাভাবিকভাবেই, এই নির্বাসিতরা জেরুসালেমে ফিরে এলে তাদেরকে একটা ধর্মীয় সমস্যার মুখে পড়তে হল। এই নির্বাসনের সময় জুড়ে প্রাচীন জুডা নগরীর৪ অধিবাসীরাও বেঁচে ছিল, যারা পুরোনো ধর্মমতে ইয়াওয়েহর পুজো-আচ্চা করত। এই সনাতন ইহুদীরা জেরুসালেম ধ্বংস হয়ে যাবার পরে বাস করত মূলত সামারিয়া অঞ্চলে, যে কারণে নব্য ইহুদীরা এদের নাম দিয়েছিল ‘সামারীয়’ (Samaritan)।
সামারীয়রা এই নতুন ইহুদী ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করল। আবার ফিরে আসা ইহুদীরাও সনাতন ধর্মপ্রাণ সামারীয়দের যথেষ্ট ঘৃণার নজরেই দেখতে থাকল। ফলে এই দু দলের মধ্যে গড়ে উঠল একটা অবিনশ্বর শত্রুতার সম্পর্ক, যা ক্রমশ খারাপ হতেই থাকল যেহেতু এদের অন্তর্বর্তী বিভেদের পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়।
এই দু দল ছাড়া অবশ্য আরো অধিবাসীরাও ছিল যারা অন্যান্য ঈশ্বরের পুজো করত। যেমন আমোনীয় (Ammonite), এডোমীয় (Edomite), ফিলিস্তিনীয়, প্রমুখ।
ফিরে আসা ইহুদীদের ওপরে তেমন কোনো সামরিক চাপ তৈরি হল না, যেহেতু গোটা অঞ্চলটাই পারস্যের রাজার অধীনে ছিল। কিন্তু সামাজিক চাপ একটা তৈরি হল, আর সেটাও নেহাত ফেলে দেবার মতো নয়। একরাশ নতুন ধ্যানধারণায় উৎসাহী মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে প্রাচীন আচার-প্রথা ইত্যাদি ধরে রাখা সবসময়েই কষ্টকর, কারণ পুরোনো আচারের শৃঙ্খল শিথিল করতে চাইবার প্রবণতা প্রায় অপ্রতিরোধ্য। তার ওপরে, ফিরে আসা তরুণের দল সনাতন তরুণীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাদের মধ্যে অসবর্ণ বিয়ের সম্পর্কও তৈরি হয়। বৌয়ের মন ভালো করার জন্য হাসি-মশকরা করতে করতেও অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো আচার-টাচারের শেকলের বাঁধন আলগা হতে থাকে।
কিন্তু তারপর মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব চার শো সালের আশেপাশে — দ্বিতীয় মন্দির তৈরি হবার প্রায় এক শো বছর পরে, জেরুসালেমে ফিরে এলেন এজরা (Ezra)। তিনি ছিলেন মোজেসীয় আইনে পণ্ডিত, যে আইনকানুনের বহুল পরিমার্জনা ঘটে গেছে তাঁর নির্বাসনের সময়ে। এই অধঃপতনের ধারা দেখে সন্ত্রস্ত এজরা একটা নাটকীয় সংশোধনীর প্রচেষ্টা চালালেন। লোকজন জড়ো করে তিনি তাদের দিয়ে প্রাচীন মন্ত্রোচ্চারণ করালেন, সেইসব মন্ত্রের অর্থ বোঝালেন, মানুষের মনে একটা চরম ধর্মভাব জাগরিত করলেন, আর সবাইকে আহ্বান জানালেন এগিয়ে এসে নিজেদের পাপ কবুল করে সনাতন ধর্মবিশ্বাসের নবজাগরণ ঘটানোর জন্য।
এর মধ্যে সবচেয়ে কঠোরভাবে তিনি চাইলেন সমস্ত অ-ইহুদী স্ত্রী এবং সন্তানাদির পরিত্যাগ। তাঁর মতে শুধু এই পথেই বিশুদ্ধ ইহুদীধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বাইবেল উদ্ধৃত করে বললে (এখানে আমি নতুন ইংরেজি বাইবেল থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি):
পুরোহিত এজরা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘তোমরা বিদেশী রমণীদের বিবাহ করে অপরাধ করেছো এবং ইস্রায়েলের পাপের ভার বাড়িয়েছো। পরমপিতার কাছে তোমাদের কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি পেশ করো এবং তাঁর ইচ্ছা অনুসারে চলো। বিদেশী জনজাতি, অর্থাৎ বিদেশী স্ত্রীদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করো।” এ কথা শোনামাত্র সমবেত জনতা সমস্বরে বলে উঠল “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা নিশ্চয়ই আপনার কথা শুনে চলবো...” (Ezra 10:10--12)
সেই সময় থেকেই ইহুদীরা জাতিগতভাবে এক ধরনের স্বাতন্ত্র্যের অনুশীলন করতে শুরু করে। অন্যদের থেকে স্বেচ্ছায় আলাদা হয়ে থাকা — কিছু বিচিত্র লোকাচার বা প্রথার মাধ্যমে, যা তাদের পৃথকত্বকেই আরো জোরালো করে তোলে। আর এই সমস্ত আচার-প্রথাই পরবর্তীকালে তাদের ওপর নেমে আসা বিপদ-আপদ আর দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে, সমস্ত সংকট, নির্বাসন, আর নির্যাতনের মধ্যে তাদের সমষ্টিগত পরিচয় রক্ষায় সহায়ক হয়েছে।
আবার এই স্বাতন্ত্র্যটাই তাদের সামাজিক ভাবে অসহ্য আর প্রবলভাবে দৃশ্যমান করেছে, যা তাদের বিরুদ্ধে ঘটা অত্যাচার ও নিগ্রহের পরিস্থিতি তৈরি করতেও সাহায্য করেছে।
অবশ্য সব ইহুদী এই স্বাতন্ত্র্যের অনুশীলনে বিশ্বাসী ছিলেন — এমনটা নয়। কেউ কেউ মনে করতেন ঈশ্বরের চোখে সকল মানুষ সমান। এবং শুধুমাত্র সমষ্টির পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে গোষ্ঠীচ্যুত করা ঠিক নয়।
আর এইরকম বিশ্বাসে বিশ্বাসী একজন ব্যক্তি (যাঁর নাম আমাদের কাছে চিরকাল অজানাই থেকে যাবে) এই ভাবটাই আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীর একটি নাতিদীর্ঘ রচনার মাধ্যমে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের সেই গল্পের নায়িকা ছিলেন ‘রূথ’ — একজন মোয়াবী মহিলা (কাহিনীটি ‘বিচারকদের যুগে’৫ ঘটেছে বলে লেখা হয়েছে। ফলে প্রথাগত মত বলে এটি খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতকে নবী স্যামুয়েলের দ্বারা রচিত। কিন্তু কোনো আধুনিক বাইবেল বিশারদই এ কথা মনে করেন না)।
প্রশ্ন ওঠে, একজন মোয়াবী মহিলা কেন?
মনে হয় নির্বাসন থেকে ফিরে আসা ইহুদীরা প্রায় এক হাজার বছর পুরোনো একটা সাংস্কৃতিক বোঝার খপ্পরে পড়েছিল — যে সময়ে আবার একদল ইস্রায়েলী প্রথমে মুসা, পরে জোশুয়ার নেতৃত্বে ‘কেনান’ (Canaan) দেশের সীমান্তে এসে পৌঁছেছিল। সেই সময়ে জর্ডন নদীর নিম্ন অববাহিকার পূর্বে আর মৃত সাগরের (Dead sea) ধারে অবস্থিত একটা ছোট্ট দেশ ‘মোয়াব’ তাদের সীমান্তে আচমকা একদল উগ্র মরু যোদ্ধাদের আগমনে সন্ত্রস্ত হয়ে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিরোধ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। মোয়াবের লোকজন, বা মোয়াবীরা, শুধু যে ইস্রায়েলীদের নিজেদের দেশের মধ্যে দিয়ে যেতে বাধা দিয়েছিল তাই নয়, প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী তারা বালাম নামের একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টাকে জোগাড় করে তার অলৌকিক শক্তির সাহায্যে ইস্রায়েলী অনুপ্রবেশকারীদের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা ঘটাবার চেষ্টা করতেও ছাড়েনি।
মোয়াবীদের সব চেষ্টাই বিফল হল। আর বিদায় নেবার সময়ে বালাম মোয়াবী নারীদের দিয়ে মরু যোদ্ধাদের প্রলুব্ধ করে এই অনুপ্রবেশকারীদের সাথে একটা যোগসূত্র তৈরি করার পরামর্শ দিয়ে গেলেন মোয়াবের রাজাকে — যাতে তাদের কঠিন কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠা থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব হয়। বাইবেল অনুযায়ী বর্ণনাটা এই রকম:
শিত্তিমে থাকাকালীন ইস্রায়েলীদের সাথে মোয়াবী নারীদের যৌন সম্পর্ক চালু হয়। মোয়াবী নারীরা তাদের দেবতাদের জন্য উৎসর্গ করা খাবার খেতে ইস্রায়েলীদের আমন্ত্রণ করে; আর ইস্রায়েলীরা সেই বলির খাবার গ্রহণ করে মোয়াবের দেবতাদের সামনে নিজেদের মাথা নত করে। ইস্রায়েলীরা বাল-পিয়োরের (Baal of Peor) উপাসনায় রত হয়, আর এর জন্য পরমপিতা তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হন। (Numbers 25:1--3)
ফলত, “মোয়াবী মহিলা” হয়ে উঠল সেই বিশুদ্ধ বহিরাগত প্রভাবের প্রতিমূর্তি, যাদের যৌন আকর্ষণের পাল্লায় পড়ে ধার্মিক সজ্জন ইহুদীরা পথভ্রষ্ট হয়। সত্যি-সত্যিই মোয়াব আর তার উত্তর দিকের প্রতিবেশী দেশ আমোন (Ammon) — দুটো জায়গাই মোজেসীয় নীতিতে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে:
কোনো আমোনীয় বা মোয়াবী — এমনকি অধস্তন দশম প্রজন্ম পর্যন্ত — প্রভুর সমাবেশে প্রবেশাধিকার পাবে না... কারণ তারা মিশর থেকে ফেরার পথে তোমাদের জল ও খাদ্য দিয়ে সাহায্য করেনি, এবং তারা বালামকে ভাড়া করেছিল... তোমাদের অভিশাপ দেবার জন্য... তোমাদের যাবজ্জীবনে তোমরা কখনোই তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা সমৃদ্ধির কামনা করবে না। (Deuteronomy 23:3--4, 6)
তা সত্ত্বেও পরবর্তী ইতিহাসে এমন সময় এসেছে যখন অন্তত কিছু সংখ্যক মোয়াবী আর ইস্রায়েলীর মধ্যে একটা সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দু দলেরই কোনো সাধারণ শত্রুর দাক্ষিণ্যে তৈরি হয়েছে তাদের বন্ধুতা।
উদাহরণ স্বরূপ, খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালের কিছু আগের কথা ভাবা যাক। ইস্রায়েলের রাজা তখন সল (Saul)। তিনি ফিলিস্তিনীয়দের প্রতিরোধ করেছিলেন, আমালেকীয়দের (Amalekites) প্রতিহত করেছিলেন, এবং তৎকালীন ইস্রায়েলকে তার সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই, সলের এই সম্প্রসারণের নীতিকে মোয়াবের লোকজন ভয় পেয়েছিল, আর সলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা যে কোনো লোকেরই তারা সমর্থন করেছিল। এরকমই একজন বিদ্রোহী ছিলেন বেথলহেমের জুডীয় যোদ্ধা ডেভিড। সলের সাথে যুদ্ধে বিপর্যস্ত ডেভিড যখন একটি দুর্গে গিয়ে আত্মগোপন করেন, তখন তাঁর পরিবারের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে তিনি বেছে নেন মোয়াবকে।
ডেভিড... মোয়াবের রাজাকে বলেন, ‘ঈশ্বর আমার জন্য কী বন্দোবস্ত করেছেন সেটা যতদিন না বুঝতে পারছি, ততদিন আপনি আমার বাবা-মাকে এখানে থাকতে দিন।’ এই বলে মোয়াবের রাজসভায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে রেখে ডেভিড চলে যান। যতদিন ডেভিড কেল্লায় লুকিয়ে ছিলেন ততদিন তার বাবা-মা মোয়াবের রাজবাড়িতেই থেকেছেন। ($1$ Samuel 22:3--4)
ঘটনাচক্রে, ডেভিড শেষমেশ যুদ্ধে জয়ী হন। প্রথমে জুডা, পরে সমগ্র ইস্রায়েলের রাজা হন, এবং এমন এক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন যা ভূমধ্যসাগরের পুরো পূর্ব উপকূল জুড়ে বিস্তৃত ছিল — মিশর থেকে ইউফ্রেটিসের তট পর্যন্ত। ফিনিশীয় নগরীগুলো স্বাধীন থাকলেও তাদের সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী কালে ইহুদীরা ডেভিড আর তার ছেলে সলোমনের সময়কালকে স্বর্ণযুগ হিসেবে গণ্য করেছে, সুতরাং ইহুদী চিন্তাধারায় ডেভিডের গুরুত্ব হয়ে উঠেছে প্রশ্নাতীত। ডেভিড জুডায় চার শতক ব্যাপী এক মহান সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। ইহুদীরা কোনোদিন বিশ্বাস করা ছাড়েনি যে ভবিষ্যতেও কখনো ডেভিডের কোনো বংশধর আবার তাদের শাসন করতে এসে আরেক আদর্শ যুগের সূচনা করবে।
এখন ডেভিডের পরিবারের আশ্রয় হিসেবে মোয়াবের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতেই মহান ডেভিডের বংশে মোয়াবী রক্তের ধারা মিশে থাকার মতো একটা কাহিনী প্রচলিত হয়ে থাকতে পারে। মনে হয় রূথ গ্রন্থের (Book of Ruth) অজ্ঞাত রচয়িতা এই কাহিনীকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন — চরম ঘৃণ্য এক মোয়াবী নারীকে নায়িকার পদমর্যাদায় ভূষিত করে অ-বিচ্ছিন্নতাবাদের একটা সংস্কৃতির ধারা সৃষ্টি করার জন্য।
রূথ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে বেথলহেমের এক জুডীয় পরিবারের কাহিনী — একটি লোক, তার স্ত্রী, আর দুই ছেলে — যারা দুর্ভিক্ষের তাড়নায় মোয়াবে চলে আসে। সেখানে সেই দুই ছেলে দুজন মোয়াবী নারীকে বিয়ে করে। কিন্তু কিছুকালের মধ্যে তিনজন পুরুষ মানুষই মারা যায়। বেঁচে থাকে শুধু তিনজন মহিলা। শাশুড়ি নাওমি আর তার দুই বৌমা — রূথ আর ওর্পা।
এ হল সেই সময়ের কথা যখন নারীরা ছিল খানিকটা সম্পত্তির মতন। আর ভরণপোষণ করার মতো কোনো পুরুষ মানুষ না থাকলে অবিবাহিত মহিলারা কেবল দান-খয়রাতের ওপরেই নির্ভর করে বেঁচে থাকতে পারত (এই কারণেই বাইবেলে বিধবা আর অনাথদের যত্ন নেবার কথা জোর দিয়ে বারবার বলা হয়েছে)।
নাওমি ঠিক করলেন বেথলহেমে ফিরে যাবেন যেখানে তাঁর আত্মীয় পরিজন হয়তো তাঁর দেখভাল করতে পারবে। কিন্তু রূথ আর ওর্পাকে তিনি উপদেশ দিলেন মোয়াবেই থেকে যেতে। এ কথা তিনি মুখ ফুটে বলেননি, কিন্তু আমরা খুব সহজেই অনুমান করতে পারি যে নাওমি হয়তো ভেবেছিলেন মোয়াব-বিদ্বেষী জুডা রাজ্যে দুটো মোয়াবী মেয়ের জীবন খুব সুখের হবে না।
ওর্পা মোয়াবেই রয়ে গেল। কিন্তু রূথ নাওমিকে একা ছেড়ে দিতে অস্বীকার করল। সে নাওমিকে বলল,
আমাকে এখানে থেকে যেতে, বা তোমাকে একা ছেড়ে যেতে অনুরোধ কোরো না... তুমি যেখানে যাবে, আমিও যাবো। তোমার লোকজন হবে আমারও লোকজন। তোমার ঈশ্বর হবেন আমারো ঈশ্বর। তুমি যেখানে মরবে, সেখানে আমিও মরব, আর সেখানেই আমাকে গোর দেওয়া হবে। তোমার ঈশ্বর প্রভুর নামে আমি শপথ নিয়ে বলছি — কেবলমাত্র মৃত্যু ছাড়া কিছুই আমাদের দুজনকে আলাদা করতে পারবে না। (Ruth 1:16--17)
বেথলহেমে পৌঁছে দুজনেই চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হল। রূথ স্বেচ্ছায় উদ্যোগ নিল মাঠের থেকে শস্য কুড়িয়ে এনে নিজের আর শাশুড়ির গ্রাসাচ্ছাদন করার। তখন ছিল ফসল কাটার সময়। আর নিয়ম ছিল — ফসল কাটার সময়ে শস্যের শীষগুলি সমাজের দরিদ্রদের জন্য রেখে দেওয়া হবে। এ ছিল দরিদ্রের জন্য একরকমের কল্যাণব্যবস্থা। তবে কুড়োবার কাজটি ছিল রীতিমতো আয়াসসাধ্য। তাছাড়া একজন যুবতী, বিশেষত একজন মোয়াবী রমণীর জন্য কাজটা ছিল আরো দুরূহ — কারণ এ কাজে আধদামড়া কামাতুর ফসল মালিকদের নজরে পড়বার স্পষ্ট ঝুঁকি পদে পদে বিরাজ করছে। সুতরাং, রূথের এই উদ্যোগ ছিল যথার্থই নায়কোচিত।
ঘটনাক্রমে, রূথ একদিন বোয়াজ নামের এক বড়োলোক জুডীয় কৃষকের জমিতে শীষ কুড়োচ্ছিল। বোয়াজ জমি তদারকি করতে এসে দেখেন রূথের অক্লান্ত পরিশ্রমের নমুনা। আশেপাশে জিজ্ঞাসাবাদ করে বোয়াজ জানতে পারলেন,
এ একটা মোয়াবী মেয়ে... ক’দিন আগে নাওমির সাথে মোয়াব থেকে ফিরে এসেছে। (Ruth 2:6)
বোয়াজ একদিন তার সাথে ভারি সহানুভূতির সাথে খানিক আলাপচারিতা করে। রূথ তাতে ভারি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
আপনি আমার সাথে এতোটা সদয় ব্যবহার করছেন কেন? আপনি তো জানেন আমি বিদেশী। (Ruth 2:10)বোয়াজ উত্তরে জানায় যে সে শুনেছে কীভাবে নাওমির প্রতি সহমর্মিতার কারণে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে রূথ এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে দিন কাটাচ্ছে আর উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে নাওমির যত্ন-আত্তি করার জন্য।
কথায় কথায় বেরোল, বোয়াজ হলেন নাওমির মৃত স্বামীরই এক আত্মীয়। সম্ভবত সেই কারণেই তিনি রূথের বিশ্বস্ততা আর মর্মস্পর্শিতায় আপ্লুত হয়েছিলেন। এই ঘটনা শোনার পর নাওমির মাথায় একটা পরিকল্পনা এল। তখনকার লোকাচার অনুযায়ী সন্তানহীনা কোনো বিধবা তার মৃত স্বামীর ভাইয়ের থেকে পুনর্বিবাহ এবং সুরক্ষার প্রত্যাশা করতে পারত। আর পরোলোকগত স্বামীর ভাই না থাকলে তখন অন্য কোনো আত্মীয় এই কাজ করতে পারত।
নাওমির তখন গর্ভধারণের বয়স পেরিয়ে গেছে। ফলে নাওমি বিয়ের যোগ্য ছিলেন না, কারণ সে যুগে বিয়ে ব্যাপারটা মূলত সন্তানকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু রূথের কী হবে? রূথ একজন মোয়াবী রমণী, যার ফলে কোনো জুডীয় চট করে তাকে বিয়ে করতে চাইবে না। কিন্তু এদিকে বোয়াজ আবার তার সাথে খুবই সহানুভূতিশীল ব্যবহার করছেন। অতয়েব নাওমি রূথকে শেখালেন কীভাবে রাত্তিরবেলা বোয়াজের কাছে যেতে হবে আর কোনো রকম অশালীন আচরণ বা প্রলোভন ছাড়াই তার কাছে সুরক্ষার আর্জি পেশ করতে হবে।
রূথের সংযম আর অসহায়তায় গলে গিয়ে বোয়াজ পত্রপাঠ কর্তব্যরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তবে তার সাথে এ-ও জানালেন যে, বোয়াজের থেকেও ঘনিষ্ঠ আরেক আত্মীয় রয়েছে, এবং নিয়ম অনুসারে প্রথম সুযোগটা তারই প্রাপ্য।
পরের দিনই বোয়াজ সেই অন্য আত্মীয়টির কাছে গিয়ে প্রস্তাব দিলেন সে যেন নাওমির নামে থাকা কিছু জমি কিনে নেয়। আর তার সাথে সাথেই আরেকটি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বও যেন পালন করে। বোয়াজ বললেন,
যেদিন তুমি নাওমির জমির মালিকানা গ্রহণ করবে, সেদিনই তুমি তার মৃত পুত্রের স্ত্রী মোয়াবী রূথকেও বরণ করবে। (Ruth 4:5)
সম্ভবত খুব সচেতনভাবেই বোয়াজ ঐ “মোয়াবী” কথাটার ওপর বিশেষ করে জোর দিয়েছিলেন, কারণ আত্মীয়টি এ কথা শুনেই পিছু হঠে গেল। ফলে বোয়াজ কোনোরকম বাধা ছাড়াই রূথকে বিয়ে করলেন এবং কিছুদিনের মধ্যে রূথ একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিল। খুশিতে ডগোমগো নাওমি নবজাতক শিশুটিকে বুকে তুলে নিলেন। নাওমির বান্ধবীরা তাকে বলল,
এই শিশু তোমায় নতুন জীবন দেবে, আর বার্ধক্যে তোমার ভরণপোষণের ভারও নেবে। কারণ তোমার সেই বৌমা — যে তোমাকে প্রাণাধিক ভালোবাসে, আর যে তোমার কাছে সাত পুত্রের চেয়েও শ্রেয় প্রমাণিত হয়েছে — সেই রূথের গর্ভে জন্মেছে এই ছেলে। (Ruth 4:15)
একদল জুডীয় মহিলার তাদের শত্রুদেশের এক মোয়াবী মহিলা সম্বন্ধে বলা এই কটা কথা — এমন এক সময়ে যখন সমাজে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মূল্য অপরিসীম বেশি — তখন এক মোয়াবী মহিলা সম্পর্কে “সাত পুত্রের চেয়েও শ্রেয়” — এই কথাগুলো লেখকের একরকম নৈতিক ভরকেন্দ্রের একটা সাক্ষ্য বহন করে, যা বিশ্বাস করে — সমাজে ভালো এবং মহত্ত্বের প্রকাশ যে কোনো দলের লোকের মধ্যেই ঘটতে পারে, সুতরাং শুধুমাত্র গোষ্ঠীগত পরিচয়ের নিরিখে কাউকেই সমাজচ্যুত করবার কোনো যুক্তি নেই।
আর তারপর, কোনো ছেঁদো আদর্শেই বিচলিত হন না এমন একজন স্বাজাত্যাভিমানী ইহুদীর জন্য গল্পটা শেষ হয় এইভাবে:
প্রতিবেশীরা শিশুটির নাম রাখল ওবেদ। তিনি ছিলেন জেসির (Jesse) পিতা। আর জেসি ছিলেন ডেভিডের পিতা। (Ruth 4:17)
আচ্ছা, এই সময়ে যদি এজরা থাকতেন আর বোয়াজকে পরামর্শ দিতেন বিদেশী স্ত্রী গ্রহণ না করতে, তাহলে আজ ইস্রায়েল কোথায় থাকত?
এই সমস্তকিছু থেকে আমরা কী পেলাম? এ কথা কেউই অস্বীকার করবে না যে রূথের কাহিনীটি অত্যন্ত মনোরম। একে প্রায়শই একটা “আনন্দময় প্রশান্ত” কাহিনী বা এর কাছাকাছি কিছু একটা বিশেষণে ভূষিত করা হয়। আর এ কথাও তর্কাতীত যে রূথের চরিত্রায়ণ চরম মিষ্টি আর পরম ধার্মিক একজন মহিলার।
বস্তুত এই গল্পটা আর রূথের চরিত্র — দুটোকেই মানুষ এতো ভালোবেসেছে যে আসল কথাটাই হারিয়ে গেছে। আসলে এটা অবজ্ঞাতদের প্রতি সহমর্মিতার গল্প, ঘৃ্ণিতদের বুকে আগলে ভালোবাসার গল্প, ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে যে পুরস্কার পাওয়া যায় তার গল্প। মানবকুলের জিনের সংমিশ্রণের ফলেই, বর্ণসংকর্যের মাধ্যমেই মহাপুরুষদের জন্ম হয়।
ইহুদীরা রূথ গ্রন্থকে তাদের ধর্মগ্রন্থের সংকলনে ঠাঁই দিয়েছিল, কারণ প্রথমত এটা আশ্চর্য সুন্দরভাবে বলা একটা গল্প, আর দ্বিতীয়ত (আমার ধারণা) এটা মহান ডেভিডের একটা বংশ পরিচয় দেয়। বংশ পরিচয় — যা বাইবেলের পূর্ববর্তী সুসংযত ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোয় ডেভিডের পিতা জেসির থেকে বেশি এগোয় না। অথচ সামগ্রিকভাবে ইহুদীরা বিচ্ছিন্নতাবাদীই রয়ে গেছে। রূথ গ্রন্থ যে সার্বজনীনতার পাঠ দেয় তা তারা গ্রহণ করেনি।
এমনকি এই গল্পের আসল শিক্ষাটাও মানুষ হৃদয়ঙ্গম করেনি। আর করবেই বা কেন, যখন সমস্ত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে সেই শিক্ষাকে মুছে ফেলবার। রূথের কাহিনী অসংখ্যবার পুনর্কথিত হয়েছে — শিশুপাঠ্য গল্প থেকে বড়োদের গুরুগম্ভীর উপন্যাস অবধি। শয়ে শয়ে ছবি আঁকা হয়েছে রূথের। আর আমি আজ পর্যন্ত যত ছবি দেখেছি, সবেতেই তাকে আঁকা হয়েছে স্বর্ণকেশী, নীলাঞ্জনা, আর অপরূপা — বিশুদ্ধ সেই নর্ডীয় ছাঁচ, যেটার কথা আমি এই প্রবন্ধের শুরুতেই করেছি।
সত্যিই তো, বোয়াজ কেনই বা রূথের প্রেমে পড়বেন না? তাকে বিয়ে করবার মধ্যেই বা কী এমন বাহাদুরি ছিল? অমন সুন্দরী এক রমণী যদি আপনার পায়ে পড়ে অনুরোধ করত দয়া করে তাকে বিয়ে করে কর্তব্যরক্ষা করতে, সম্ভবত আপনি চোখের নিমেষেই তা করে ফেলতেন।
হ্যাঁ, হয়তো সে একজন মোয়াবী মহিলা, কিন্তু তাতে কী হয়েছে? ‘মোয়াবী’ কথাটা আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে আনে? কথাটা কি আপনার মনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে? আপনার চেনাজানা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কি অনেক মোয়াবী রয়েছে? আপনার ছেলেমেয়েদের কি কয়েকদিন আগে এক দল নোংরা মোয়াবী রাস্তায় তাড়া করেছে? তারা ক্রমশ এসে গিজগিজ করতে করতে কি আপনার পাড়ায় বাড়ির দাম কমিয়ে দিয়েছে? শেষ কবে আপনি এমন কথা কাউকে বলতে শুনেছেন যে, “এই বস্তাপচা মোয়াবীগুলোকে তাড়াতেই হবে। এরা স্রেফ সমাজকল্যাণের ভাতা নিয়ে নিয়ে চারিদিকের হাল খারাপ করে দিচ্ছে?”
বরং দেখতে গেলে রূথকে যেভাবে আঁকা হয়েছে, তাতে মনে হয় মোয়াবীরা খানিকটা ব্রিটিশ অভিজাত শ্রেণীর সাথে তুলনীয়। তারা আসতে শুরু করলে আপনার পাড়ায় ঘরবাড়ির দাম চড়চড় করে বাড়তে শুরু করবে।
মুশকিলটা হল রূথ গ্রন্থের একটা শব্দের অনুবাদ করাই হয়নি, আর ঘটনাচক্রে সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ — “মোয়াবী”। যতক্ষণ না এই শব্দটার অনুবাদ করা হবে, কাহিনীর সারমর্ম হারিয়েই থাকবে, হারিয়ে থাকবে স্রেফ অননুবাদের জন্য।
‘মোয়াবী’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, “একজন ব্যক্তি যে এমন এক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি যাদের থেকে আমরা কিছুই পাই না, আর আমাদের থেকে যাদের প্রাপ্য শুধুই ঘৃণা আর অবজ্ঞা।” এই অর্থটিকে কেবল একটিমাত্র শব্দের মধ্যে কীভাবে ধরা সম্ভব? এখনকার বহু গ্রীকের কাছে উত্তরটা হবে “তুর্কী”; আবার তুর্কীদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, “গ্রীক”; আবার বহু শ্বেতাঙ্গ মার্কিনীর কাছে জবাবটা হবে “কৃষ্ণাঙ্গ”।
রূথ গ্রন্থের আসল স্বাদ পেতে হলে ধরে নিন রূথ কোনো মোয়াবী নারী নন, বরং একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা।
এবারে রূথের গল্পটা আরেকবার পড়ুন, আর যখনই মোয়াবী শব্দটা দেখবেন সেটাকে মনে মনে ‘কালো’ ভেবে নিন। নাওমি (ধরে নিন) মার্কিন মুলুকে ফিরে আসবে ভাবছে তার দুজন কৃষ্ণাঙ্গ পুত্রবধূকে নিয়ে। এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই যে সে তাদের সাথে না আসার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু আশ্চর্য হল এই যে, রূথ তার শাশুড়িকে এতটাই ভালোবাসত যে সে এমন একটা সমাজের সামনে দাঁড়াতে তৈরি হয়েছিল যে সমাজটা তাকে অযৌক্তিকভাবে ঘেন্না করে। এমনকি সে একদল কামার্ত ফসলের মালিকদের সামনে দাঁড়িয়ে শস্য কুড়োনোর কাজ করতেও রাজি হয়ে যায়, যে লোকগুলো হয়তো এটাও মনে করত না যে তাকে সামান্য একটা মানুষের মর্যাদা দেওয়ারও দরকার রয়েছে।
আর বোয়াজ যখন তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করে, তখন রূথের উত্তরটা এভাবে পড়বেন না যে সে একজন ‘মোয়াবী’ মেয়ে। বরং পড়ুন, সে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে। আরো বেশি সম্ভাব্য হল বোয়াজ যখন রূথের ব্যাপারে আশেপাশে জিজ্ঞাসাবাদ করে তখন বাকিরা তাকে জানায় যে রূথ একটা (আমার ভাষার ব্যবহার মার্জনীয়) “নিগার”।
এভাবে পড়লে দেখবেন পুরো ভাবটা পাওয়া যাবে অনুবাদের মধ্যে, এবং কেবল অনুবাদের মধ্যেই। রূথের সদগুণের কারণে (না, একটুও তার নর্ডীয় সৌন্দর্য্যের জন্য নয়) তাকে বিয়ে করতে রাজি হওয়াটা বোয়াজের মহত্ত্বেরই পরিচয় বহন করে। নাওমির প্রতিবেশীরা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল — রূথ নাওমির সাত পুত্রের চেয়েও শ্রেয় — তা এমনই এক অমোঘ সত্য হয়ে দাঁড়ায়, যার উচ্চারণ ভয়ানক সবুদপ্রমাণ ছাড়া করা সম্ভব নয়। আর এই দুই জাতির বর্ণসংকর্যের ফলেই যে জন্ম নিয়েছিলেন মহান ডেভিড — তা সত্যিই রোমহর্ষক।
——— o o o ——— o o o ———
এর অনুরূপ কিছু উদাহরণ আমরা নিউ টেস্টামেন্টেও পাই। একবার এক আইনের ছাত্র যীশুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘অনন্ত জীবন লাভ করতে চাইলে কী করা বাধ্যতামূলক’ এবং তারপর নিজেই তার উত্তর দিয়েছিল এরকম বলে —
পরমপিতাকে ভালোবাসো তোমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে, তোমার প্রাণ দিয়ে, সমস্ত শক্তি দিয়ে, সম্পূর্ন মন দিয়ে; আর তোমার প্রতিবেশীকে ভালোবাসো তোমার নিজের মতো করে। (Luke 10:27)
এই উপদেশগুলো অবশ্য ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকেই নেওয়া। প্রতিবেশী সংক্রান্ত ঐ শেষের কথাটা এসেছে একটা লাইন থেকে, যেখানে বলা হয়েছে,
তোমার আত্মীয়-পরিজনের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হবে না, আক্রোশ পুষে রাখবে না, বরঞ্চ তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতোই একজন ভেবে ভালোবাসবে। (Leviticus 19:18)
(আমার এখানে এই নতুন ইংরেজি অনুবাদটা কিং জেমসের অনুবাদের থেকে বেশি ভালো লাগে। “তুমি তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসবে।” কোথায় রয়েছে সেই মহান ব্যক্তি যিনি অন্যের দুঃখ বা আনন্দ ঠিক নিজের সুখ-দুঃখের মতো করেই অনুভব করতে পারেন? বেশি বাড়াবাড়ি প্রত্যাশা করার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। আমরা যদি শুধু এটুকু মেনে নিতে পারি যে সামনের লোকটা “আমার মতোই” আরেকটা মানুষ, তাহলে অন্তত তার সাথে মানুষের মতন ব্যবহার করাটা আর অসম্ভব হয় না। কিন্তু এটুকু স্বীকৃতিও যখন আমরা দিতে অপারগ হই, সামনের মানুষটাকে আমাদের থেকে নিকৃষ্ট মনে করি, তখন অবজ্ঞা ও নিষ্ঠুর ব্যবহার স্বাভাবিক বলে বোধ হয়, এমনকি কখনো কখনো প্রশংসনীয় অবধি মনে হতে পারে।)
যীশু আইনজ্ঞের কথায় সম্মত হন, আর সঙ্গে সঙ্গেই সেই আইনজীবী পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আর আমার প্রতিবেশী কে?” (Luke 10:29) কারণ লেভিটিকাসের বলা লাইনটা প্রথমেই তো বলে আত্মীয়-পরিজনের থেকে প্রতিশোধ আর ক্রোধের ভাব থেকে বিরত থাকতে। তাহলে এই প্রতিবেশীর ধারণাটা নিজের নিজের আত্মীয়-পরিজনের মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ রাখা যায় না?
এর উত্তরে যীশু সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত নীতিগল্পটি শোনান। এক পথিক রাস্তায় একদল ডাকাতের খপ্পরে পড়ে। ডাকাতেরা তার সর্বস্ব লুট করে, তাকে আধমরা করে রাস্তার ধারে ফেলে রেখে চলে যায়। এক ধর্মযাজক সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, পথিককে দেখে রাস্তার অন্য ধার দিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেন। এরপরে একজন লেভীয় (Levite) সেই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একইভাবে রাস্তার অন্য দিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। এর পরে একজন সামারীয় এল এবং এই পথিকের অবস্থা দেখে তার মন করুণাবিষ্ট হল। সে এগিয়ে এসে তার ক্ষতে ব্যান্ডেজ বেঁধে, সেই ক্ষতে তেল আর সুরার প্রলেপ লাগিয়ে, নিজের পশুটির পিঠে তাকে চাপিয়ে নিয়ে নিকটবর্তী এক শুঁড়িখানায় নিয়ে এসে তার সেবা-যত্ন করল। (Luke 10:31--34)
এরপর যীশু জিজ্ঞেস করলেন, এদের মধ্যে ঐ পথিকের আসল প্রতিবেশী কে? এবং আইনজীবী একরকম বলতে বাধ্যই হল, “যে তার সেবা-যত্ন করল।” (Luke 10:37)
এই গল্পটি “ভালো সামারীয়র গল্প” (Parable of the Good Samaritan) নামে খ্যাত। অথচ গোটা গল্পটার কোত্থাও ঐ ত্রাণকর্তা ভালো সামারীয় নন, শুধুই একজন সামারীয়।
গল্পের গোটা নির্যাসটাই মাঠে মারা যায় ঐ একটা শব্দবন্ধের চক্করে — ‘ভালো সামারীয়’। কারণ এতে সামারীয়দের সম্পর্কে একটা ভুল ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। একটা সহজ পরীক্ষা করা যায়। যে কাউকে বলে দেখুন ‘সামারীয়’, সে প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতো বলে উঠবে ‘ভালো’। শব্দবন্ধটা আমাদের মাথার মধ্যে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে আমাদের মনে হয় সামারীয় মাত্রেই সে নিশ্চয়ই ভালো। এবং অবাক হয়ে আমাদের প্রশ্ন জাগে, যীশু হঠাৎ আলাদা করে ‘ভালো সামারীয়’ কথাটা অমন জোর দিয়ে বলতে গেলেন কেন?
আমরা ভুলে যাই যীশুর সময়ে সামারীয়রা আসলে কারা ছিল।
ইহুদীদের চোখে তারা মোটেও ভালো মানুষ ছিল না। তারা ছিল ঘৃণ্য, অবজ্ঞার পাত্র, নিন্দনীয় বিধর্মী, যাদের সাথে কোনো ভালো ইহুদী কোনো সম্পর্ক রাখত না। আবারও, অননুবাদের মধ্যেই হারিয়ে যায় আসল কথাটা।
বরং, মনে করুন, মিসিসিপিতে এক শ্বেতাঙ্গ পর্যটকের সর্বস্ব লুট করে তাকে আধমরা করে রাস্তায় ফেলে ডাকাতেরা চলে গেছে। আরো ধরুন, একজন যাজক আর একজন পাদ্রী পাশ কাটিয়ে চলে গেছে, ‘ঝামেলায় জড়ায়নি’। শেষটায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভাগচাষী দাঁড়িয়ে গিয়ে ঐ লোকটির দেখভাল করেছে।
এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন: কে সেই প্রতিবেশী যাকে আপনি নিজের মতো আরেকটা মানুষ ভেবে ভালোবাসবেন, যদি আপনার নিজের বাঁচার প্রশ্ন ওঠে এই পরিস্থিতিতে?
ভালো সামারীয়র গল্প খুব পরিষ্কার ভাবেই আমাদের শেখায় যে প্রতিবেশী শব্দটার মধ্যে কোনো প্রাদেশিকতার দ্যোতনা লুকিয়ে নেই। আপনার শালীনতাকে আপনি শুধু নিজের গোষ্ঠী বা নিজের লোকেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন না। মানবজাতির সবাই — এমনকি যাদের আপনি সবচেয়ে বেশি ঘেন্না করেন — তারাও আপনার প্রতিবেশী।
——— o o o ——— o o o ———
অতয়েব দেখা যাচ্ছে বাইবেলে আমাদের জন্য দুটো উদাহরণ রয়েছে — রূথ গ্রন্থে, আর ভালো সামারীয়র গল্পে — এমন শিক্ষার, যা কিনা অননুবাদে হারিয়ে গেছে।
সারা পৃথিবী জুড়ে মানবজাতির নানান দলের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। বর্ণ, জাতি, অর্থনৈতিক দর্শন, ধর্ম, বা ভাষার বিচারে মানুষকে নিরন্তর আলাদা আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে যাতে এক দল আরেক দলের কাছে প্রতিবেশী বলে গণ্য না হয়।
জীববিজ্ঞানের বিচারে একটাই প্রজাতির মধ্যে এই অন্তর্বর্তী আজগুবি পার্থক্যগুলো ভয়ংকর, এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতন দেশে, যেখানে সবচেয়ে ভয়ানক সামাজিক সংঘর্ষ (আলাদা করে বলার কোনো দরকার নেই) হল শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে।
জনস্ফীতির কথা বাদ দিলে, মানবজাতির আর কোনো সমস্যাই এই সংঘর্ষের চেয়ে বেশি ভয়ানক নয়, বিশেষত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
আমার মনে হয় দিন-দিন, বছর-বছর, শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গ দুই পক্ষই আরো বেশি রাগ, হিংসা, দ্বেষ, আর হানাহানিতে লিপ্ত হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান হিংসার গৃহযুদ্ধ ছাড়া আর কোনো যুক্তিযুক্ত পরিণতি হতে পারে বলে তো আমার মনে হয় না।
এই ধরনের গৃহযুদ্ধে শ্বেতাঙ্গরা সংখ্যায় আর সংগঠিত ক্ষমতায় অপেক্ষাকৃত বলীয়ান হবার দরুন, খুব সম্ভবত শেষমেশ “জিতে যাবে।” কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে একটা অপরিসীম জাগতিক এবং অপূরণীয় আধ্যাত্মিক ক্ষতি।
এবং, কেন? সত্যিই কি এটা অনুধাবন করা এতটাই কঠিন যে আসলে আমরা সকলেই আত্মীয়? দু পক্ষের আমরাই — দু দিকের পক্ষই — কি বাইবেলের এই শিক্ষাকে কোনোভাবে গ্রহণ করতে পারে না?
আর বাইবেল-টাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিতে যদি নিতান্তই সংকোচ বোধ হয়, অথবা যীশুর কথা বলতে গেলে যদি ব্যাপারটা খুবই ধর্মপ্রাণ মনে হয়, তাহলে সাদামাটা সরল ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গীতেও বিচার করা যায় এভাবে:
ঘৃণা অনুভব করতে পারার সুযোগসুবিধে কি এতটাই প্রবল যে শুধু তার জন্য একটা শ্বেতাঙ্গ বনাম কৃষ্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক ভার বইতে হবে?
এর উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে হতাশা ছাড়া কিছুই বিশেষ বাকি থাকে না আমাদের জন্য।
পুনশ্চ
আজকার দিনে ‘মানবজাতির সহোদরভাব’ গোছের বিষয় নিয়ে লিখতে যাওয়াটা বেশ অস্বস্তিকর (যদিও ‘সৌভ্রাতৃত্ব’-জাতীয় লিঙ্গবৈষম্যবাদী শব্দের তুলনায় হয়তো এই শব্দটা ভালো)।৬
কারণ ১৯৮০-র দশকে আবিষ্কৃত হয়েছে যে ল-অক্ষর (“লিবারাল,” পাঠক আশা করি অসাংবিধানিক শব্দপ্রয়োগের জন্য বিরক্ত হবেন না) বলে লোকজনদের ঘেন্নাপিত্তি করে ভোটে জেতা সম্ভব। দেখা যাচ্ছে, গরীবের প্রতি, ঘৃণিতের প্রতি, অসহায়ের প্রতি, দুর্বল উৎপীড়িতের প্রতি আপনার মনে যদি অনুকম্পার ভাব জাগরিত হয় তাহলে আপনি সন্দেহভাজন এবং ঘৃণ্য বলে বিবেচিত হবেন।
আমি নিজেকে বদলানোর কথা বহুবার ভেবেছি। ভেবেছি একজন চমৎকার সুনাগরিক হব। ধনী আর লোভীর জন্য আমার দরদ হবে। শহুরে উচ্চাশাকাঙ্ক্ষী আর স্বার্থপরদের তারিফ করব। ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার ব্যবসায়ী আর ওয়াশিংটনের দালালদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলব। সেইসব লোকেদের সাথে ওঠাবসা করব যারা সমাজকল্যাণের টাকা মেরে গলা উঁচিয়ে দেশের মঙ্গলের কথা বলে।
মুশকিলটা হল, আমি তা পেরে উঠি না। আমি জানি না কী করে এটা করতে হয়। আমি ল-অক্ষরই রয়ে যাই। নিক্সন যুগের প্রবল পঙ্কিল সময়ে আমি উপরোক্ত প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশ করি। আর আমি এখন আবার তার পুনর্মুদ্রণ করছি।
২) মার্কিন অভিনেতা। 'অস্কার' বা যার পোশাকি নাম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস, তার উনিশ বার সঞ্চালনা করে রেকর্ড গড়েছেন। এখনও সেই রেকর্ড অক্ষুণ্ণ।
৩) সোনালী চুলওয়ালা মহিলা, অর্থাৎ 'ব্লন্ড' (blonde) সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা।
৪) জুডা (Judah) সেই সময়ের একটা রাজ্য বা ভূখণ্ড যা তৎকালীন ইস্রায়েলের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ছিল। জুডার রাজধানী প্রথমে ছিল হেব্রন। পরে জুডার উত্তর দিকে অবস্থিত জেরুসালেম সমগ্র ইস্রায়েলের রাজধানী হয়।
৫) “Time of the judges” অর্থাৎ সাদা বাংলায় ❛বিচারকদের যুগ❜ বলতে বোঝায় ইস্রায়েলের ইতিহাসের একটা প্রাচীন পর্ব, আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০–১০০০ সালের সময়ে যখন ইস্রায়েলে কোনো রাজা ছিল না। দেশটা ছিল অনেক ছোটো ছোটো গোষ্ঠীর সমষ্টি। কোনো বড়ো বিপদের সময়ে ❛ঈশ্বর-নিযুক্ত❜ (বাইবেল মতে) বিচারকেরা উঠে আসতেন সমস্যার সমাধান করার জন্য। এঁদেরই বলা হতো judges বা ❛বিচারক❜।
৬) বাংলায় সহোদর মানেও ভাই। আসলে আসিমভ মূল লেখায় siblinghood আর brotherhood শব্দদুটো ব্যবহার করেছেন। sibling কথাটার তেমন যুতসই বাংলা প্রতিশব্দ পেলাম না। ❛ভাইবোন❜ হলে চলবে না। ভাই এবং বোন নয়, এমন কথা দরকার যার অর্থ ভাইও হতে পারে, আবার বোনও। মাতৃজঠর ভাগ করেছি যার সাথে — এই কথার মধ্যে তেমন কোনো লিঙ্গের সরাসরি দ্যোতনা নেই। অতয়েব, ❛সহোদরভাব❜ কথাটা ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত মনে হলো।