• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | ছোটদের পরবাস | গল্প
    Share
  • লোভে পড়ে : অনন্যা দাশ

    স্কুলের লাঞ্চের সময় লিমা হঠাৎ দেখতে পেল রিয়া একটা গাছতলায় বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রিয়া লিমাদের প্রত্যাশা অ্যাপার্টমেন্টেই থাকে। একই পুল কারে করে স্কুলে আসে ওরা। রিয়া খুবই মিষ্টি মেয়ে। লিমার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোট রিয়া এখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে।

    লিমা ওর কাছে গিয়ে বলল, “কি রে রিয়া, কী হয়েছে? এখানে একা একা বসে কাঁদছিস কেন?”

    লিমাকে দেখে রিয়া আরো কান্নায় ভেঙে পড়ল। লিমা ওকে বলল, “আরে অত কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে? লেগেছে?”

    রিয়া মাথা নেড়ে না বলল।

    “তাহলে কী হয়েছে না বললে বুঝব কী করে? আর না জানলে তোকে সাহায্যই বা করব কী করে শুনি? সকালে পুল কারেও তো আসিসনি। এবার কান্না থামিয়ে বল কী হয়েছে।”

    চোখের জল মুছে ফোঁপাতে ফোঁপাতে রিয়া বলল, “কাল আমার জন্মদিন। তা কাল তো স্কুলের ছুটি তাই মা-বাবা আজকে আমাকে কয়েক প্যাকেট কেক দিয়ে দিয়েছিলেন টিচারকে দিতে যাতে ক্লাসের সবাইকে দিয়ে দেন। আমি আজ সকালে চার প্যাকেট কেক এনে অনুপমা মিসকে দিয়েছিলাম। প্রতিটা প্যাকেটে আটটা করে টুকরো আছে। আমাদের ক্লাসে তিরিশজন বাচ্চা। বত্রিশটা টুকরো কেক, মানে তিরিশটা বাচ্চাদের আর দুটো মিসের জন্যে। সেই জন্যেই আজকে আমি পুল কারে আসিনি। বাবা পৌঁছে দিয়ে গেলেন। মিসকে চার প্যাকেট কেক দিয়ে সব বলেটলে দিয়ে গেলেন। কেকগুলো একটা ব্যাগের মধ্যে ছিল। মিস আমার আর বাবার সামনে আমাদের ক্লাসের যে আলমারিটা তাতে একটা উঁচুর তাকে ব্যাগটা রেখে দিলেন। একটু আগে মিস আমাকে আলাদা করে ডেকে বললেন, ‘রিয়া, আমি ভেবেছিলাম লাঞ্চের আগে কেকগুলো সবাইকে দিয়ে দেব কিন্তু এখন দেখছি ব্যাগে মোটে তিনটে প্যাকেট রয়েছে। প্রতিটাতে আটটা করে থাকলে তো মোটে ২৪টা হচ্ছে। আর আজকে ২৯ জন এসেছে ক্লাসে। শুধু রুদ্রাক্ষ আসেনি। তাহলে তো কেক দেওয়া যাবে না, কারণ সবাই পাবে না। তুমি ছুটির সময় ওগুলো বাড়ি ফেরত নিয়ে যেও কেমন?’

    “আমি তাই শুনে বললাম, ‘কিন্তু মিস বাবা তো চারটে প্যাকেট দিয়েছিলেন!’

    “মিস বললেন, ‘জানি না। আমি তো তখন আর ব্যাগটা খুলে দেখিনি। উনি হয়তো চারটের বদলে তিনটে দিয়েছেন ভুল করে। তা তুমি মন খারাপ কোরো না। সোমবারদিন চারটে প্যাকেট নিয়ে এসো আমি সেদিন সবাইকে দিয়ে দেবো, কেমন?’ বলে মিস ক্লাসের আলমারিটা লক করে লাঞ্চে চলে গেলেন। কিন্তু আমি জানি বাবা চার প্যাকেট কেক এনেছিলেন!” বলে রিয়া আবার কাঁদতে শুরু করে দিল।

    লিমা বলল, “ধুস বোকা মেয়ে! আবার কাঁদে! সকালে যখন চারটে ছিল তার মানে কেউ একজন এক প্যাকেট কেক সরিয়েছে ব্যাগটা থেকে। তখন তোর মিস আলমারি লক করেননি মনে হয়। সকালে যখন তোরা ক্লাসে কেক রাখতে গিয়েছিলি তখন ক্লাসে আর কে কে ছিল? ঠিক করে ভেবে বল! সব যদি ঠিক ঠিক মনে করে বলতে পারিস তাহলে আমি চোর ধরে দেব!”

    রিয়া কান্নার মধ্যেই একটু ফিক করে হেসে বলল, “আরে আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, তুমি তো গোয়েন্দা। তুমি আর বুবাইদা ওই ফুলের টব কে ভেঙেছে বার করেছিলে! বাহ তাহলে দারুণ হবে। দাঁড়াও ভেবে বলছি। হ্যাঁ, মিস যখন আমাকে আর বাবাকে নিয়ে ক্লাসের আলমারিতে ব্যাগটা রাখতে এলেন তখন ক্লাসে চার জন ছিল। চন্দ্রতনু, রায়না, সৌম্য আর শৌর্য। আর তুমি ঠিক বলেছ, মিস তখন আলমারি লক করেননি। আমি বাবাকে বাই বাই করে যখন ফিরলাম তখন দেখি ওই মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সৌম্য হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছে। ওর পা দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল আমি আর শৌর্য তাই ওকে নিয়ে অফিসে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে নিয়ে এলাম। তারপর আমি হাত ধুতে গিয়েছিলাম, ব্যস। সেই তখন থেকে আমি ক্লাসেই আছি। একবারও কোথাও যাইনি তাই যার নেওয়ার ওই সকালের সময়টাতেই নিয়েছে। বেশি ছেলেমেয়ে চলে আসলে আর কেউ আলমারিতে হাত দেওয়ার সাহস করবে না কারণ ওতে মিসের সব জিনিস থাকে।”

    লিমা শুনে বলল, “তার মানে সৌম্য, শৌর্য, রায়না বা চন্দ্রতনুর মধ্যে কেউ একটা কেকের প্যাকেট সরিয়েছে। কিন্তু অতগুলো কেক তো খেতে পারবে না সবার সামনে। ধরা পড়ে যাবে। তার মানে নির্ঘাত বাড়ি নিয়ে যাবে, বা পরে খাবে বলে কোথাও লুকিয়েছে। আচ্ছা ওরা কোনটা কে দেখাতে পারবি?”

    “হ্যাঁ, চলো আমার সঙ্গে,” বলে রিয়া লিমাকে সঙ্গে নিয়ে গেল।

    ক্লাসে নিয়ে গিয়ে দেখালো আলমারিটা। যে তাকে মিস রেখেছিলেন বলল সেটা বেশ উঁচুতে। চেয়ার না নিয়ে হাত পাওয়া কঠিন ক্লাস থ্রির কারো পক্ষে।

    তখন লাঞ্চের সময় বলে ক্লাসে আর কেউ নেই কেবল সৌম্য আর শৌর্য তখনও ক্লাসেই বসে আছে। সৌম্যর পায়ে ব্যথা করছে তাই সে আরেকটা চেয়ার নিয়ে পাটা সেটার ওপর তুলে বসে রয়েছে। ব্যথার চোটে উঃ আঃ করছে মাঝে মাঝেই। শৌর্য ওকে ছেড়ে খেলতে যায়নি, চিন্তিত মুখে পাশেই বসে আছে। সে বরাবরই তার ভাইয়ের খুব যত্ন নেয় সৌম্য একটু দুর্বল বলে।

    লিমাকে দেখে শৌর্য বলল, “লিমাদি, ভাইয়ের পায়ে খুব লেগেছে গো। বলছে খুব ব্যথা করছে। আমি ভাবছি মিসকে বলব বাবাকে ফোন করতে। যদি হাড্ডি ভেঙে থাকে তাহলে তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে, তাই না? ওরা প্লাস্টার লাগিয়ে দেবে। দুদিন পরে অ্যানুয়াল পরীক্ষা, কী যে হবে!”

    লিমা শুনে বলল, “ও! তবে মনে হয় না অত ভয়ঙ্কর কিছু হয়েছে। বুবাইয়ের যখন পায়ের হাড় ভেঙেছিল তখন পা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল! এর তো তেমন কিছু হয়নি এখনও। তোরা এখানেই থাকিস, কেমন? আমি আর রিয়া একটু আসছি। তারপর তোদের সঙ্গে কথা আছে।”

    বাইরে গিয়ে রিয়া দেখাল, “ওই যে রায়না।”

    রায়না তার বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। আর চন্দ্রতনু কিছুটা দূরে কয়েকটা ছেলের সঙ্গে খেলছিল।

    লিমা দুজনকে দেখে রিয়াকে বলল, “ওদের দুজনকে ক্লাসে ডেকে নিয়ে আয়। আমার মনে হয় আমি চোর ধরে দিতে পারব!” বলে লিমা রিয়াদের ক্লাসে গিয়ে টিচারর চেয়ারের কাছে দাঁড়াল।

    একটু পরেই রিয়া রায়না আর চন্দ্রতনুকে নিয়ে এসে ঢুকল।

    লিমা বলল, “দেখো আজ সকালে যখন তোমাদের টিচার অনুপমা মিস রিয়ার বাবা আর রিয়াকে নিয়ে এখানে এসেছিলেন তখন ক্লাসে তো তোমরা চারজনই ছিলে, তাই না? রিয়ার বাবা মিসকে কী রাখতে দিয়েছেন না জানলেও তোমাদের মধ্যে একজনের কৌতূহল একটু বেশি হয়েছিল তাই সে ব্যাগে কী আছে দেখেছে এবং তার থেকে একটা কিছু সরিয়েছে! আমার মনে হয় সৌম্য বা শৌর্যর সেই সময় ছিল না কারণ সৌম্য পড়ে গিয়ে ব্যথা পায় আর শৌর্য ভাইকে সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। রায়নার ছোটোখাটো চেহারা তাই সে চেয়ার নিয়ে গিয়েও আলমারির ওই উঁচু তাকে হাত পাবে না! তাহলে বাকি রইল চন্দ্রতনু। সে বেশ লম্বা, চেহারাও ভালো। চন্দ্রতনু, তুমি কী জানো অন্যের জিনিস না বলে নিলে সেটাকে কী বলা হয়?”

    চন্দ্রতনু রেগে গিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, “লিমাদি তুমি কি আমাকে চোর বলছ? তুমি মনে করছ আমি কেক সরিয়েছি? আমাদের ক্লাসে তিরিশ জন আছে, যে কেউ তো কাজটা করতে পারে!”

    লিমা মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যাঁ পারে নিশ্চয়ই, যদি তারা জানতে পারে যে ওই ব্যাগের মধ্যে কেক আছে! আমি তো বলিনি ব্যাগে কেক ছিল, তাহলে তুমি জানলে কী করে? টিচার একটা ব্যাগ এনে আলমারিতে রাখলেন, তাতে কী আছে তোমার তো জানার কথা নয় যদি না তুমি ব্যাগটা খুলে একটা প্যাকেট সরিয়ে থাকো!”

    এবারে চন্দ্রতনু ফুটো হয়ে যাওয়া বেলুনের মতন চুপসে গেল।

    লিমা বলল, “আশা করা যাচ্ছে তুমি কেকগুলো এখনও খেয়ে ফেলনি। তাই যেখানেই লুকিয়ে থাকো প্যাকেটটা রিয়াকে ফেরত দিয়ে দাও তাহলে ও আর তোমাদের মিসকে কিছু বলবে না। আর যদি না দাও তাহলে তো আমি এখুনি গিয়ে...”

    চন্দ্রতনু লিমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “না, না, মিসকে বলতে হবে না। আমি কেকের প্যাকেট দিয়ে দিচ্ছি। আসলে প্রথমে আমি দেখতে চাইছিলাম রিয়ার বাবা মিসকে কী রাখতে দিলেন তাই চেয়ার নিয়ে উঠে দেখতে গিয়েছিলাম। রিয়া তখন সৌম্যকে নিয়ে অফিসে ওষুধ লাগাতে গেছে। রায়নাও ছিল না। আমি ক্লাসে একা। সেই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না ভেবেই আমি চেয়ার নিয়ে উঠে দেখতে গেলাম। তারপর কেক দেখে আর লোভ সামলাতে পারিনি। সরি রিয়া!”

    লিমা হেসে বলল, “ঠিক আছে চোর যখন দোষ স্বীকার করে নিয়েছে তখন তাহলে তাকে এই বারটার জন্যে ছেড়ে দেওয়া হল। নাহলে তো তার জন্যে বরাদ্দ টুকরোটা আমিই খেয়ে নেব ভাবছিলাম।“

    পরদিন সকাল দশটা নাগাদ কলিং বেল বাজতে লিমা-ই গিয়ে দরজা খুলল। বুবাই তখন বাজারে গেছে বাবার সঙ্গে। ওমা সামনে রিয়া দাঁড়িয়ে, সঙ্গে ওর বাবা।

    লিমা রিয়াকে দেখে বলল, “ওমা রিয়া তুই! তোর তো আজকে জন্মদিন না? হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!”

    রিয়া ফিক করে হেসে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ লিমাদি!” বলে হাত বাড়িয়ে একটা কেকের প্যাকেট লিমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এটা তোমার জন্যে। তুমি যদি কালকে সাহায্য না করতে তাহলে আমার আর ক্লাসের সবাইকে জন্মদিনের কেক দেওয়াই হত না! আরেকটা কথা। আজ বিকেলে আমার জন্মদিনের পার্টিতে তোমাকে আর বুবাইদাকে কিন্তু আসতেই হবে! মা বিশেষ করে বলে দিয়েছেন। বাবা তুমি বলো না লিমাদিকে।“

    সেদিন বিকেলে রিয়ার জন্মদিনের পার্টিতে লিমা আর বুবাই দুজনেই গেল। খুব আনন্দ হল। অনেক খেলা, গান, গল্প আর দেদার মজা। রিয়ার ক্লাসের যারা কাছেপিঠে থাকে সেই রকম অনেক বন্ধুরাই এসেছিল। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হল চন্দ্রতনুও উপস্থিত ছিল সেই আসরে! সে সব খেলাতে অংশগ্রহণ করল, ভালো গানও গাইল, কেবল লিমার সামনে পড়ে গেলেই লজ্জায় একেবারে মাটিতে মিশে যাচ্ছিল!



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments