• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • অনুভূতিগ্রাহ্য নামহীন কবিতার সংকলন : সুজিত সরকার

    একটা প্রজাপতি একটি ইচ্ছে; — মধুপর্ণা মুখোপাধ্যায়; প্রকাশক— সুন্দরবন প্রকাশন; প্রচ্ছদ- সম্বিত বসু; প্রথম প্রকাশ— ১লা বৈশাখ, ১৪৩২; ISBN: 978-81-986116-3-5

    ‘আমার কাছে, কোনো কবিতার কবিতা হয়ে ওঠার প্রধানতম শর্ত তার অনুভূতিগ্রাহ্যতা। আবেগ, মনন, দক্ষতা, কোনো কিছুকেই আমি অস্বীকার করছি না — কিন্তু কোনো শব্দপুঞ্জ যদি অনুভূতিগ্রাহ্য না হয়, তাকে আমি কবিতা বলতে রাজি নই।’- কবিতা সম্পর্কে কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের এই অভিমত আমি সর্বান্তকরণে সমর্থন করি। এই অনুভূতিগ্রাহ্যতার কারণেই মধুপর্ণা মুখোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ ‘একটা প্রজাপতি একটি ইচ্ছে’ আমার ভালো লেগেছে।

    কাব্যগ্রন্থটির বিশেষত্ব হল, অন্তর্গত কবিতাগুলির আলাদা আলাদা কোনো নাম নেই। এমনকি, কবিতাগুলি সংখ্যাচিহ্নিতও নয় অর্থাৎ যেকোনো পৃষ্ঠা থেকেই গ্রন্থপাঠ শুরু করা যেতে পারে। প্রবেশক কবিতাটিতে যেন তারই পূর্বাভাস লক্ষ্য করা যায়ঃ

    হঠাৎ দেখি নিজেও ভাসছি। কাছি কেটে গেছে।
    দাঁড়, হাল কে যে কোথায় গেল, কোনটা যে খুঁজে
    নেওয়া আগে জরুরি কে জানে!
    অথবা, কবিতাবিষয়ক গদ্যগ্রন্থ ‘চাঁদের ওপিঠে’র লেখক মণীন্দ্র গুপ্তের এই কথাগুলি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য: ‘এখন আর নাটকীয়তা না, চাই নিরভিমানতা। বুঝে নেওয়া দরকার, কোথাও আরম্ভ নেই, কোথাও শেষ নেই। আমরা যেখানে আছি, যেখানে ছিলাম, যেখানে থাকব তার একদিকে অনাদি, অন্যদিকে অশেষ। সব কবিতা, সব গল্প, সব জীবনেরই শুরু যেমন স্রোতের মাঝখান থেকে ধরে নিতে হয় তেমনি তার শেষও ছেড়ে দিয়ে যেতে হয় মাঝখানেই। কথাটা খুব সহজেই বলে ফেললাম বটে কিন্তু অনেক দিন পৃথিবীতে না কাটালে, অনেক জীবন না দেখলে এই দুঃখের সত্য হৃদয়ঙ্গম হয় না।’

    এবার, এই গ্রন্থের তিনটি কবিতা পরপর পড়ে নেওয়া যাক:

    (ক) ছেলেটা কাঁদছে।
    একে কাঁদতে দেখিনি কখনো
    একটু আগে ভাত খাওয়া শেষ করে
    থালায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন বাবা।
    ছেলেটা কাঁদছে।
    আলতো পায়ে একটা প্রজাপতি
    পূর্বজন্ম থেকে কুড়িয়ে আনা পরাগ
    আলপনার মতো এঁকে দিচ্ছে হাওয়ায়।
    ছেলেটা কাঁদছে।

    (খ) বলেছিলে বাবাকে হারিয়ে দুঃখের সঞ্চয় লেখার সিন্দুকে
    রেখে দিতে। বলোনি, সেই শূন্যতা এঁকে দিতে কালি বা শব্দ
    যা একান্ত দরকার তার জন্ম হয়নি আজও। নিরাশ্রয় ব্যথার ঝুলি
    এ-কাঁধ থেকে ও-কাঁধে নিয়ে ফিরি। ডাঙা চাঁদ গোল হবে ক্রমশ।

    (গ) জ্যোৎস্না কুড়োওনি কোনো সন্ধ্যায়
    বাঁশি ডাকেনি পিয়াল বনে
    মুঠো মাত্র ভাতের প্রত্যাশায়
    প্রভুভক্ত কুকুর-জীবন!
    হাঁটুর তলায় মোটা সুতোর শাড়ি
    শিফন সুতোর স্বপ্ন দেখোনি
    কোনো রাতে
    বাদুড় ঝোলা ক্যানিং লোকালে
    তুমি শান্তিমাসি।

    কবিতাগুলি পড়ার পরে বোঝা যায় কেন উৎসর্গ-পৃষ্ঠায় লেখা আছে: ‘আমার সব মা কিংবা সব মেয়েকে’।

    এই গ্রন্থে আমার সবচেয়ে পছন্দের কবিতাটি এবার পাঠকদের পড়িয়ে নিতে চাই:

    কোকিল বসন্তেই ডাকে কেন? কাল রাত তিনটেয় আরও কিছু পাখির
    ডাকাডাকির মধ্যে কোকিলটার গলার জোরেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।
    বুক ফাটিয়ে ডাক শুরু হবে আর কিছুদিনের মধ্যেই। রোদের জোর
    বাড়বে। সবজির মুখ শুকিয়ে যাবে। চারতলায় জলের সংকট তৈরি
    হবে। ঘামতে ঘামতে চাকরি করতে ছুটতে হবে। ট্রেনে ঝগড়া বাড়বে।
    এসির দাপটে হাওয়ার মুখ কালো হবে। কোকিলটা তখনও ডেকে যাবে।
    সারা বছরের ডাক এই একটা ঋতুতেই কেন যে ও ডেকে নেয়!

    প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কথা দিয়ে শুরু হয়েছিল এই আলোচনা, তাঁর কথা দিয়েই শেষ করছি: ‘কবিতা লেখক হিসেবে আমি মনে করি যে, আমার কবিতা যদি মুষ্টিমেয় কয়েকজন পাঠকেরও চেতনার উন্মীলন বা উদ্বোধন ঘটাতে সক্ষম হয়, তাহলেই আমার ‘সামাজিক কাজ’ বা সামাজিক দায়িত্ব বহুলাংশে সম্পূর্ণ হল।’ আমার বিশ্বাস, মধুপর্ণা মুখোপাধ্যায়ের এই কাব্যগ্রন্থ কিছু পাঠকের ‘চেতনার উম্মীলন বা উদ্বোধন’ ঘটাতে সক্ষম হবে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments