• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গল্প
    Share
  • ঘুরপাক : অংশুমান গুহ


    লগ্নার বয়স আঠেরো। লম্বা কালো চুল আঁট করে বিনুনিতে বাঁধা। পরনে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। মেয়েটা ছুটছে একটা এত অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে যে মনে হচ্ছে যেন ওর শরীর থেকে আভা বেরোচ্ছে। সুস্থ স্বাস্থ্যের আভা। লগ্নাকে এত সুন্দর দেখতে, যে ওকে দেখেই ঋজুর পেটের মধ‍্যে একটা ব‍্যথা হয়।

    লেক‍-এর চারপাশে ছুটছে লগ্না।

    ঋজুর বয়সও আঠেরো। ও ভাবল পেছন পেছন ছুটে গিয়ে লগ্নাকে ধরে ফেলবে। কিন্তু পারল না। দম ফুরিয়ে গিয়ে, একটা বট গাছের তলায় বসে পড়ল ধপ করে। লগ্না এই গাছটার কাছ দিয়ে ছুটে গেছে কয়েক মুহূর্ত আগে। বটের ছায়ায় বসে হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেটা তাকিয়ে দেখল, মেয়েটার ছুটন্ত শরীর আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ‍্যেই লগ্না লেকের উলটো পাশে চলে যাবে।

    ও লগ্নাকে ধরতে পারবে না। ঋজু তা বুঝল।

    নিজের সম্বন্ধে বুঝল যে ও দুর্বল।

    বুঝল যে ও কিছুই নয়, কিচ্ছু না। ও রিক্ত।

    আর সব ছাড়িয়ে ঋজু একটা বিরাট কামনা অনুভব করল। একটা প্রবল আকাঙ্ক্ষা যাতে ওর সর্বস্ব ডুবে গেছে। অভিভূত করা একটা চাহিদা। মাছের যেমন জল দরকার হয়।

    মাটিতে বসে ঋজু লগ্নাকে দেখতে থাকল। মেয়েটা এক ভাবে ছুটে যাচ্ছে। ধ্রুব একটা গতিতে। যেন ঋজুর অস্তিত্ব সম্বন্ধেই ও ওয়াকিবহাল নয়। ঋজু জলের দিকে তাকাল। অন‍্য পাশের গাছের ছায়া পড়েছে লেক-এর জলে। মনে হচ্ছে যেন ছবি-ওয়ালা কোনো বিদেশী পোস্টকার্ড। ভোরে বা গোধূলিতে কখনো কখনো এ রকম এক-একটা জাদুকরী মুহূর্ত আসে। তখন বিভ্রান্ত ইন্দ্রিয় নিয়ে মন ঠিক ঠাহর করতে পারে না ঘড়িতে কটা বাজে। সব ভাবনা থেমে যায়। শরীরের সীমা পেরিয়ে মনটা চলে যায় ঘাসের ওপর, জীবন্ত ও ঝরে-পড়া পাতার ওপর, জলের বুকে ছোট ছোট লহরীর ওপর। শব্দ, গন্ধ আর দৃষ্টি মিলে মিশে এক হয়ে যায়। সময় স্তব্ধ হয়ে যায়।

    ঋজু আর হাঁপাচ্ছে না। লগ্নার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা এখন লেক-এর উলটো দিকে।

    যদিও লগ্না লেক-এর চারপাশ ধরে ছুটছে, ঋজু জানে যে লগ্না কখনোই ওর কাছে পৌঁছবে না। একমাত্র যদি লগ্না পেছন-ঘুরে ফিরে আসে, তাহলেই ও ঋজুর কাছে আসতে পারবে। কিন্তু যতক্ষণ মেয়েটা ছুটতে থাকবে, ওদের মধ‍্যে দূরত্ব বাড়তেই থাকবে। লেকের চারপাশের পথটা গোল হয়ে ফিরে আসুক বা না আসুক, ওদের দূরত্বে জ‍্যামিতির কোনো বিধিই খাটবে না। এই কথাটা নিজের দ্রুত হৃদস্পন্দনের মধ‍্যে পরিষ্কার বুঝতে পারল ছেলেটা। অসহায় ভাবে লগ্নার ক্রমাগত দূরবর্তী হওয়া শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া ওর আর কোনো উপায় নেই। সাথে পেটের মধ‍্যে সেই একটা ব‍্যথা। ছেলেটা লক্ষ‍্য করল যে ওর নিজের অস্থিসার গাল বেয়ে চোখের জল নেমে আসছে।

    ঋজুর মনে হল শুরু হবার আগেই যেন ওর জীবনটা শেষ হয়ে গেছে। প্রাচীন সমস্ত ইতিহাস ওর নিশ্বাস চেপে ধরল। ওর অবশ‍্যম্ভাবী পরাজয় সম্বন্ধে অশরীরী সব চরিত্ররা কথা বলতে লাগল। নারী আত্মারা ছায়ার আড়ালে প্রকাশ করল তাদের অসম্মতি, সূক্ষ্মভাবে ফিরিয়ে নিল তাদের সব অনুমোদন। তেজময়ী সেই সব নারী – কুন্তী, সীতা, গান্ধারী। আর তাঁরা তেজময় সব পুরুষের স্ত্রী, কন‍্যা, মা ও বোন। ছেলেটা আরো একজনের উপস্থিতি অনুভব করল। তার নাম সিসিফাস। সিসিফাসের ভার যেন ঋজুরও ভার। ও জানে না সেই ভার নিয়ে ও কী করবে। কী করতে পারে। শুধু জানে এই বর্তমান অনুভব থেকে বেরোনোর শক্তি ওর নেই। ঋজু মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকাল, যেখানে পৃথিবীর বুক ভেদ করে বটের শিকড়ের জাল বেরিয়ে এসেছে।

    ওদিকে লগ্না ছুটছিল।

    নিজেকে জীবন্ত মনে হচ্ছিল মেয়েটার। একটুও ক্লান্ত লাগছিল না। নিশ্বাস নিচ্ছিল জোরে জোরে ঠিকই, কিন্তু তার মধ‍্যে আনন্দ ছিল। লগ্না কল্পনা করছিল যে ওর সারা শরীরের শিরায় শিরায় রক্তের জোয়ার লেগেছে।

    এক মুহূর্তের জন‍্য গতি কমিয়ে লগ্না লেক-এর অন‍্য পারে তাকাল। দেখল ঋজু কুঁজো হয়ে মাটিতে বসে আছে। মনে হচ্ছে ছেলেটা মাটির দিকেই তাকিয়ে আছে। বিষণ্ণ একটা মূর্তি। পুরোনো দুশ্চিন্তাটা ফিরিয়ে আনতে চাইল না লগ্না। ও চাইল এই মুহূর্তটাকে উপভোগ করতে। চাইল ওর শ্বাস-টানা তাজা হাওয়াটাকে আস্বাদ করতে। আকাশ থেকে নেমে আসা যে আলো ওর আত্ম-পরিচয়কে ছেয়ে রেখেছে, লগ্না চাইল সেই আলোর উৎসব উদযাপন করতে। দিনটা এত সুন্দর! সেই পুরোনো বিরক্তিকর চিন্তাগুলো এই সুন্দর দিনটাকে যেন নষ্ট না করে দেয়। সেই পুরোনো অর্থহীন কথার পিঠে কথা। লগ্না চায় ঋজু যেন ভালো থাকে। ও বুঝতে পারে না ঋজু কেন ভালো নেই।

    প্রত‍্যেকটা পদক্ষেপে লগ্না অনুভব করছিল পৃথিবীর বুকে ওর নিজের পায়ের নরম ছোঁয়া। একটা শান্তির ছন্দে ওর শরীরটা নেচে চলছিল। আশ্চর্য এই মানুষের শরীর। অভিরাম তার রহস‍্য। বেঁচে থাকা বড় সুন্দর। এই ছুটে চলার মধ‍্যে একটা স্বাধীনতা খুঁজে পায় লগ্না। ও বুঝিয়ে বলতে পারবে না কেন এ রকম মনে হয়। ছুটতে ছুটতে ওর ইন্দিয়গুলো যেন আরো সজাগ হয়ে ওঠে। হয়তো নিছকই শরীরের দৌড়নোর জন‍্য রক্ত চলাচলের গতি বাড়ে। সেইজন‍্যই লগ্নার চোখ আরো পরিষ্কার করে সব কিছু দেখতে পায়, ওর কান সব কিছু শুনতে পায়। লেক‍-এর জল আলোয় ঝলমল করছে। গাছগুলো সজীব সবুজ। জলের ওপর গাছের ছায়া আনন্দে কাঁপছে। আনন্দের উপাদান ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। শুধু চোখ খুলে তাকালেই হল! লগ্না দীর্ঘ প্রশ্বাস নিতে নিতে ওপরে আকাশের দিকে তাকাল। মোলায়েম নীল রঙটাতে চোখ জুড়িয়ে গেল। লগ্নার মুখে একটা হাসি ফুটল। ভালোবাসার একটা শান্ত জোয়ার ওর বুক থেকে বেরিয়ে সব কিছুর প্রতি, সবার প্রতি ছড়িয়ে গেল।

    কয়েক মুহূর্তের জন‍্য আবার গতি কমিয়ে লগ্না পেছন ফিরে ঋজুর দিকে তাকাল। ঋজু এখনো স্থির হয়ে বসে আছে।

    ঋজুকে ও ভালোবাসে।

    লগ্নার মাথার ভেতর একটা ক্ষণিক বিরক্তি দেখা দিল। কিন্তু আনন্দটা এতই জোরালো, যে বিরক্তিটা টিঁকল না। ঋজুর প্রতি লগ্নার একটা সহানুভূতি হল। ইচ্ছে করল ঋজুকে ধরে বুকের কাছে টেনে আনতে।

    লগ্না বুঝতে পারে না কেন আজকাল ঋজু এমন করে। লগ্না ফিরে পেতে চায় সেই ছেলেটাকে, ঋজু আগে যা ছিল। লগ্নার প্রিয়তম বন্ধু। হাসিমুখ, দৃঢ় চরিত্র, আত্মবিশ্বাসী। লগ্না জানে ঋজুর এখনকার মানসিক অবস্থাটা সাময়িক। এখন ঋজু যে ভাবে কথা বলে, যে ভাবে তাকায় - সব কিছুর মধ‍্যে আছে একটা ভয়-পাওয়া ভাব, একটা নিরাপত্তাবোধের অভাব। যারা বা যা কিছু লগ্নার কাছে থাকে, সবই ঋজু সন্দেহ করে। পুরোনো ঋজুকে পেতে চায় লগ্না। সেই উজ্জ্বল চোখদুটো, সেই না-বলা স্বপ্নগুলো। এই ভেঙে-পড়া, অসুখে-ভোগা বাচ্চার মত ছেলেটাকে নয়। সব সময় বিষণ্ণ এই ঋজু, বিনা কারণে। লগ্না বুঝতে পারে না। লগ্না চায় ঋজুকে সান্ত্বনা দিতে, ওর কষ্ট মুছে দিতে। লগ্না জানে ঋজু অসহায় বোধ করে। ও নিজেও অসহায় বোধ করে ঋজুকে সাহায‍্য করার ইচ্ছায়।

    লেক-এর চার ভাগের তিন ভাগ পার হয়ে গেছে লগ্না। ছুটে যা‍বার একটানা ছন্দ আর হৃৎপিণ্ডের একসুরে স্পন্দন ওর মনের মধ‍্যে রাগ-রাগিণী বাজাচ্ছে। নিজেকে শক্তিশালী মনে হচ্ছে ওর। কোনো সমস‍্যাই আয়ত্তের বাইরে নয়। লগ্না যে কোনো জটিলতার মোকাবিলা করতে পারে।

    একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আজকের ছোটার স্পীডটা লগ্না হিসেব করে নিল। স্পীড ঠিকই আছে। খানিকক্ষণের মধ‍্যেই লগ্না ওই গাছটার কাছে পৌঁছে যাবে, যার নিচে ঋজু বসে আছে। বাকি পথটুকু লগ্না উপভোগ করে নিচ্ছে। চারপাশের সবুজ গাছপালা থেকে চোখ দিয়ে শান্তি নিঙড়ে নিচ্ছে ও। জলের ওপরেও অসীম শান্তি। আজকের ছোটা নিয়ে লগ্না খুশি। খুব ভালো ছোটা হয়েছে। মন ও শরীর তাজা লাগছে। একটা আধ‍্যাত্মিক আরোহণ হয়েছে মনে হচ্ছে।

    ঋজুর নিশ্চল শরীরের কাছাকাছি এসে লগ্না আস্তে হয়ে গেল। শেষ কয়েকটা পদক্ষেপ নিয়ে থেমে গেল ঋজুর দু’ফুট দূরে। ঋজু মাথা উঁচু করে তাকাল। লগ্না জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছিল।

    কয়েক মুহূর্ত পরে লগ্না বলল, “হ‍্যালো।”

    ঋজু বলল, “হ‍্যালো।”

    লগ্নার সুন্দর মুখের তাকিয়ে ছিল ঋজু। একটা কোমলতা খুঁজছিল। যেমন করে পাখি তার নীড় খোঁজে।

    লগ্নার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফরসা গালদুটো লাল হয়ে গেছে। চোখদুটো উজ্জ্বল। ঋজুর ইচ্ছে করল উঠে দাঁড়িয়ে লগ্নার ঘাম মুছে দিতে।

    ঋজু বসেই রইল।

    লগ্না জিগ‍্যেস করল, “কেমন আছো?”

    “দি‍ব‍্যি! তোমার ছোটা কেমন হল?”

    "দারুণ! এখন খুব ভালো লাগছে।"

    এক মিনিটের নীরবতা।

    লগ্না বলল, "কি হয়েছে?"

    অনেক ভেবেও ঋজুর মাথায় একটাও অর্থবহ কথা এলো না, যা উচ্চারণের যোগ‍্য। ঋজু উঠে দাঁড়িয়ে লগ্নাকে জড়িয়ে ধরল। লগ্নার মাথার এক পাশে কালো চুলের মধ‍্যে মুখ গুঁজে দিল ঋজু। লগ্নার নিজস্ব অনন‍্য গন্ধ নাক ভরে টেনে নিল। ঘামের সাথে মিশে গন্ধটা এখন আরো মাদকীয়। লগ্নার পেছনে দু’হাত রেখে ঋজু ওকে নিজের দিকে টানল, চেপে ধরল নিজের শরীরে। যেন একটা অনন্ত আত্ম-গ্লানির পর ওর শরীরের অণু-পরমাণুগুলো লগ্নাকে ছুঁয়ে খুশিতে ডগমগ করল। ঋজু চাইল এই আলিঙ্গনটা যতক্ষণ সম্ভব ধরে রাখতে।

    লগ্নার গরম লাগছিল, অস্বস্তি হচ্ছিল। ওই অবস্থায় ওর নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আস্তে আস্তে ও নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। চট করে ঋজুর গালে একটা চুমু খেয়ে লগ্না সরে এল। তারপর মাটি থেকে বেরোনো বটের শিকড়ের জালের ওপর বসল। নিশ্বাস-প্রশ্বাস আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।

    লগ্না বলল, “একটু পরে আমি শান্তনুর বাড়ি যাচ্ছি। তুমি এসো না আমার সঙ্গে? আরো কিছু জন আসবে।”

    ঋজু অবাক হয়ে গেল। বলল, “আমি তো ভেবেছিলাম আমরা খানিকক্ষণ একসঙ্গে কাটাব। তুমি কি আমাকে শান্তনুর বাড়ির যাবার প্ল‍্যান সম্বন্ধে আগে বলেছিলে?”

    “না। প্ল‍্যানটা খানিকক্ষণ আগেই তৈরি হয়েছে। এসো না আমার সঙ্গে?”

    “আমি শুধু তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে চাই। অন‍্য কারুর সঙ্গে নয়। তুমি সেটা জানো না?”

    “নিশ্চয়ই। সে তো বটেই। কিন্তু বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতেও তো ভালো লাগে। তুমি আসতে চাও না কেন?”

    ঋজু কিছু বলল না।

    লগ্না গলাটা আরো নরম করে বলল, “আমি তো থাকব। তোমার সঙ্গে। তোমার পাশে।”

    “আমার ইচ্ছে করছে না।”

    ঋজুর গলায় পরিষ্কার হতাশা।

    কারা কারা আসবে বা আসতে পারে তাদের লিস্ট বিবরণ করল লগ্না। তাদের মধ‍্যে একটা নাম - রাজা। রাজার নাম শুনে ঋজুর পেটের ব‍্যথাটা যেন আরো প্রবল হল। একটা ছুরির ফলার মত। এত কষ্ট হল যে ঋজুর মনে হল ও কেঁদে ফেলতে পারে।

    এই তো, মাস দুই আগে, বন্ধুদের কোনো এক জমায়েতে লগ্না নাকি রাজাকে ঘাড়ে মালিশ করে দিয়েছিল। ঋজু সেই জমায়েতে ছিল না। কিন্ত পরে লগ্না বলেছিল সেখানে তার দারুণ সময় কেটেছিল। লগ্নার কোনো ধারণাই ছিল না ঋজুর কতটা কষ্ট হয়েছিল মালিশের কথা শুনে। কী করে লগ্না সেটা করতে পারল? ঋজু ভেঙে পড়েছিল, কেঁদে ফেলেছিল। লগ্না বিরক্ত হয়েছিল। লগ্না ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে রাজাকে বা অন‍্য কাউকে হিংসে করার কোনো কারণ ঋজুর নেই।

    এখন আবার রাজার নাম শুনে আগের ব‍্যথাটা ফিরে এল। এবং আগের মতই লগ্নার কোনো ধারণাই নেই। ঋজু কঁকিয়ে উঠল, “তোমার রাজাকে ভালো লাগে। তাই না? সত‍্যি করে বলো!”

    লগ্না “হায় ভগবান” বলে চেঁচিয়ে উঠল। এই ছেলেটাকে নিয়ে কী করবে বুঝতে পারল না।

    ঋজুকে ধরে নিজের দিকে টানল লগ্না। ঋজু মখ গুঁজে দিল লগ্নার বুকের মধ‍্যে। লগ্নাকে শক্ত করে ধরে থাকল। এইখানেই থাকতে চায় ঋজু, এই ভাবেই, চিরকাল, সারাক্ষণ। এইখানেই ঋজুর আনন্দ। এইখানেই ঋজুর নিরাপত্তা।

    ঋজুর মাথাটা টেনে সরিয়ে লগ্না ওকে একটা চুমু খেল।

    লগ্না বলল, “তোমাকে এই পাগলামিটা বন্ধ করতে হবে। এই তো আমি। আই লাভ ইউ।”

    ঋজু কিছু বলল না।

    লগ্না বলল, “তুমি চলো আমার সঙ্গে শান্তনুর বাড়িতে। আড্ডার পর আমরা সবাই টিভিতে খেলা দেখব।”

    ঋজুর খেলাধূলা একদম পছন্দ নয়। টিভিতে খেলা দেখা আরো নয়। ঋজু জানে যে লগ্না তার এই অপছন্দের কথা জানে। তাই ঋজুর দুঃখটা আরো গাঢ় হয়ে উঠল, দৃষ্টি রোধ করা একটা ঘন কুয়াশার মত। ওর নিজেকে একটা নাবিকহীন বেওয়ারিস জাহাজের মত মনে হল। বড় একা। বড় একা সে।

    কয়েক মিনিট পরেও ঋজুর থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে, লগ্না আবার জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে?”

    অনেক চেষ্টা করে ঋজু শুধু একটা কথাই উচ্চারণ করতে পারল - “না।” তারপর নিজের সাথে আরো খানিকটা যুদ্ধ করে বলল, “আমি একটু হাঁটতে যাব। অনেকক্ষণ ধরে হাঁটব আজ।”

    ঋজুর আর কিছু বলার ছিল না।

    লগ্নার আর কিছু বলার ছিল না।

    লগ্নার ক্লান্ত লাগছিল। ও ঠিক করল যে আরেকটু ছুটবে।

    লগ্না বলল, “আমি আবার ছুটতে যা‍চ্ছি।”

    বলে ও আবার লেক-এর ধার ধরে ছুটতে শুরু করল।

    ঋজু দেখল লগ্না আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে ওদের মধ‍্যে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে।

    নিজের শরীরটাকে ছেড়ে দিল ঋজু। জড় পদার্থের মত মাটিতে পড়ে রইল ও। জানে না আর কী করবে। শুধু জানে লগ্নাকে ভালোবাসে। বট গাছের তলায় ঋজু অপেক্ষা করে রইল লগ্নার ফেরত আসার জন‍্য। নিজের সম্বন্ধে বুঝল যে ও দুর্বল। বুঝল যে ও কিছুই নয়, কিচ্ছু না। ও রিক্ত।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments