


কোর্টরুমের বাইরে বিশাল ঘর। সেখানে অপেক্ষা করছে অনিরুদ্ধ। পুরো ঘরটাতে আর কেউ নেই। ও একা। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে এসে গেছে। এটাই ওর স্বভাব। দেরি করে পৌঁছনোর বদলে, আগে আগে পৌঁছে যাওয়া। তারপর অপেক্ষা করা। অনিরুদ্ধর এত টেনশন হচ্ছে যে বার বার গা গুলিয়ে উঠে বমি পাচ্ছে। এটাও ওর স্বভাব। যে কোনো পীড়াদায়ক উত্তেজনায় বমি পায়। এই আশংকাতেই সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে কিছু খায়নি। মাঝে মাঝে যখন প্রবল ওক্ উঠছে। বাথরুমে গিয়ে ওর মুখ থেকে বেরোচ্ছে শুধু জল। অনিরুদ্ধ মনে মনে বলল – “এই বিরক্তিকর ‘আমি’ নিয়েই পঞ্চাশ বছর কেটে গেল!”
তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করল – “অথচ এই টেনশনের কারণ কী?” অনিরুদ্ধ তো অপরাধী বা সন্দেহভাজন নয়! ও সাক্ষী। ক্যালিফোর্নিয়াতে ওকল্যান্ডের মহামান্য আদালত ওকে ডেকে পাঠিয়েছে সাক্ষ্য দিতে। মামলা এখনো শুরু হয়নি। এটা অ্যারেনমেন্ট হিয়ারিং। অর্থাৎ একজন বিশেষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথেষ্ট সন্দেহজনক সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে কিনা তার নির্ধারণ হবে। যদি থাকে, তাহলে মামলা শুরু হবে এবং অভিযুক্ত বেচারা নিজের দোষ স্বীকার বা অস্বীকার করবে। অনিরুদ্ধর তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। হ্যাঁ, হতে পারে, যে ওর সাক্ষ্য ছাড়া মামলাটা দাঁড়াবে না। তাতে কী হয়েছে? অনিরুদ্ধর কোন ক্ষতির সম্ভাবনা আছে কি?
ওই যে! সর্বসমক্ষে দাঁড়িয়ে উঠে বয়ান দিতে হবে! তাতেই ওর প্রাণ ওষ্ঠাগত। সারা জীবন ধরে একটা তোতলা ভূত অনিরুদ্ধর ঘাড়ে চেপে আছে। সেই ভূতটা আবার টেনশন হলে খেপে গিয়ে রণমূর্তি ধারণ করে। হয়তো সেইজন্যই অনিরুদ্ধ ফাঁকা ওয়েটিং রুমে বসে বসে, খালি পেটে ঢোক গিলছে আর বোকার মত ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে মিনিটে পঁচিশবার। মনে মনে নিজেকে বলছে – “যাচ্ছেতাই।”
কোর্টরুমের দরজা খুলল। একজন মহিলা মুখ বার করে অনিরুদ্ধর নাম ডাকলেন। সাধারণত বেশিরভাগ মার্কিন কন্ঠস্বরে যে রকম ওর নামটার উচ্চারণ জবাই হয়, তার ব্যতিক্রম হল না। কিন্তু ঘরে যেহেতু আর কেউ নেই, তকাই বলে ডাকলেও অনিরুদ্ধ সাড়া দিত।
অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে গেল। তারপর মহিলাকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। পেছনে দরজাটা আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গেল।
কোর্টরুমটা বিশাল। বাইরের ওয়েটিং রুমটা এতক্ষণ বড় মনে হচ্ছিল। কোর্টরুমটা তার দুগুণ। চারগুণও হতে পারে। কিন্তু মানুষজন খুব কম। জজ বসে আছেন উঁচু চেয়ারে। জজের পেছনে দেয়ালে বিরাট বড় একটা গোল ঘড়ি। তাতে ঘন্টা আর মিনিটের কাঁটা থেমে আছে। সেকেণ্ডের কাঁটা ঘুরে চলেছে থপ থপ করে। যে মহিলা অনিরুদ্ধকে ডেকে আনলেন, তিনি হাত বাড়িয়ে অনিরুদ্ধকে সাক্ষীর বসার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। তারপর তিনি গিয়ে জজ-এর সামনে, নীচুতে, একটা চেয়ার বসলেন। তাঁর পরনে স্কার্ট আর লম্বা ব্লাউজ, যে রকমে অফিসে মহিলারা পরেন। তাঁর সামনে টেবিল। তাতে কম্পিউটার খোলা রয়েছে। চেয়ারে বসেই তিনি কী সব টাইপ করতে শুরু করলেন।
স্টেনোগ্রাফার। অনিরুদ্ধ অনুমান করল ভদ্রমহিলা আদালতের স্টেনোগ্রাফার। আজকের যুগে এই পদটা ঠিক কী নামে ডাকা হয় তা অবশ্য জানা নেই। অনিরুদ্ধ তার নির্ধারিত জায়গায় বসল, ঘরের ডান অর্ধেকে, সামনের দিকে।
জজও মহিলা। কালো জোব্বা পরা।
জজ-এর সামনে মেঝেতে দুপাশে দুজন উকিল হাতে কাগজের তাড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরাও মহিলা, পরনে কালো স্কার্ট ও সাদা ব্লাউজ। বাঁ-দিকের জন প্রসিকিউটার। তাঁর চেম্বারে সপ্তাহ খানেক আগে অনিরুদ্ধ গিয়েছিল। ডান দিকের জন ডিফেন্স, অভিযুক্তর পক্ষে সরকারি উকিল।
অনিরুদ্ধর পেছন দিকে, ঘরের বাঁ অর্ধেকে, অভিযুক্তর বসার জায়গা। লোকটা কপালে হাত রেখে, মাটির দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন একজন সশস্ত্র মহিলা পুলিশ। অভিযুক্তর পেছনে, ঘরের একদম পেছন দিকে, একটা বেঞ্চিতে বসে আছেন তিন মহিলা – অভিযুক্তর মা, বোন ও প্রেমিকা।
মোদ্দা কথা হল ঘরে মোট দশ জন লোক। তার মধ্যে আটজন নারী আর দুজন পুরুষ। পাঁচজন সাদা-চামড়া, চারজন কালো, আর অনিরুদ্ধ হল যাকে মার্কিন ভাষায় বলে খয়েরি। অভিযুক্ত কালো পুরুষ। অভিযোগের সাক্ষী খয়েরি পুরুষ। দরদী তিনজন কালো নারী। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরু দায়িত্ব পাঁচজন সাদা নারীর। অনিরুদ্ধ এইসব সাত-পাঁচ হিসেব করে মনে মনে মজা পেল। কল্পনার দরকার নেই। জীবন এমনিতেই বিচিত্র, সেলুকাস!
অনিরুদ্ধকে জজ ধন্যবাদ জানালেন তার ব্যস্ত জীবন থেকে সময় বার করে আদালতে আসার জন্য। তার নাগরিক কর্তব্য পালন করার জন্য। তারপর অনিরুদ্ধ ডান হাত হাওয়ায় তুলে প্রতিজ্ঞা করল যে সে সত্য বলিবে, সম্পূর্ণ সত্য বলিবে এবং সত্য বই কিছু বলিবে না।
এই আদালতে অনিরুদ্ধ নামহীন। জজ ও উকিলরা ওর নাম জানে। কিন্তু ওর সুরক্ষার জন্য সেই নাম প্রকাশ হবে না। ও এখন জন্ স্মিথ।
যার জন্য আজ জন্ ওরফে অনিরুদ্ধ এই আদালতে হাজির, সেই ঘটনাটা কী?
মাস খানেক আগে এক বুধবার দুপুর বেলা অনিরুদ্ধ অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল। ট্রেন থেকে নেমে পাহাড়ি রাস্তা ধরে চড়াইতে আধঘন্টা হাঁটলে অনিরুদ্ধর বাড়ি। পিঠে ব্যাকপ্যাক, তার মধ্যে ল্যাপটপ। পরনে টি-শার্ট ও হাফ্ প্যান্ট আর পায়ে স্নীকার্স। অনিরুদ্ধ হাঁটছিল অফিসের কাজ নিয়ে চিন্তা করতে করতে। আর কোনো দিকে হুঁশ ছিল না। ভর দুপুরে রাস্তায় দু’একটা গাড়ি চলাচল করছিল। তাছাড়া মানুষজন ছিল না।
অনুরুদ্ধর মনে হল কেউ একটা ওর পিঠে টোকা মারল। তারপর যেন ব্যাকপ্যাক ধরে পেছন দিকে টানছে। অবাক হয়ে পেছন ফিরে দেখল একটা কৃষ্ণকায় লোক ওর ব্যাকপ্যাকের স্ট্র্যাপ ধরে আছে। লোকটার পরনে কালো টি-শার্ট আর মাথায় কালো বেস্বল টুপি। বয়স বেশি হবে না, কুড়ি থেকে পঁয়তিরিশের মধ্যে। লোকটা বলল, “গিভ্ ইট আপ, বিচেস্!” তার আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ হবে, “দিয়ে দে, কুত্তীগণ!” অনিরুদ্ধর কাঁধ থেকে ব্যাকপ্যাকটা একটুও নড়েনি, লোকটা টানছে।
অনিরুদ্ধর প্রথম প্রতিক্রিয়া হল বিভ্রান্তি। ও জানে আধুনিক আমেরিকায় বিচ্ কথাটা লিঙ্গ নির্বিশেষে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বহুবচন কেন? অনিরুদ্ধ তো একা!
অনিরুদ্ধও পালটা টান দিল। ব্যাকপ্যাকটা দেবে না। আর তখন লক্ষ্য করল লোকটার অন্য হাতে রয়েছে একটা কালো হাত-বন্দুক। সেটা অনিরুদ্ধর দিকে তাক করা।
লোকটা মেয়ে-কুকুরদের উদ্দেশ্যে বলা সেই অবোধ্য কথাটা আরো দু’বার বলল অবোধের মত। লিঙ্গের মা-বাপ নেই। বচনের প্রকট ভুল প্রয়োগ।
এক নিমেষে অনিরুদ্ধর রাগ হয়ে গেল। ল্যাপটপ-ওয়ালা ব্যাগ ও কোনো মতেই দেবে না। বলল, “না! দেব না!”
এইবার চোরটার বিভ্রান্ত হবার পালা। মনে হয় লোকটা ঠিক করে পুরো পরিকল্পনাটা করেনি। আর করলেও হয়তো অনুমান করতে পারত না যে এ রকম একটা উন্মাদ মধ্যবয়স্ক ভারতীয়র সাথে মোকাবিলা করতে হতে পারে। লোকটা একটু পিছু হটল, কিন্তু বন্দুকটা অনিরুদ্ধর দিকেই তাক করা থাকল।
লোকটা পেছনের দিকে দু’একটা পদক্ষেপ করেছে, ফুটপাত থেকে রাস্তার দিকে। অনুরুদ্ধ তার সাথে সরে সরে গেছে, ব্যাকপ্যাক ছাড়েনি। একটা সবুজ রঙের গাড়ি নিঃশব্দে রাস্তা দিয়ে এসে থামল। এক মুহূর্তে চোরটা ব্যাকপ্যাকের স্ট্র্যাপ ছেড়ে দিয়ে, গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করল। হুশ করে গাড়িটা বেরিয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে অনিরুদ্ধ বুঝতে পারল যে ওর হৃদ্পিণ্ড অত্যধিক জোরে ধুকপুক করছে আর শরীরের ভেতরে একটা প্রচণ্ড রাগ বোমার মত ফাটতে চাইছে। এবং সেই একই মুহূর্তে অনিরুদ্ধ চট করে দেখে নিল পালিয়ে যাওয়া গাড়িটার নম্বর। পকেট থেকে ফোন বার করে সেই নম্বরটা লিখে নিজেকে একটা ই-মেল পাঠাল। তারপর নাইন-ওয়ান-ওয়ান-এ ফোন করল, যেখানে সঙ্কটের সময়ে সাহায্য পাওয়া যায়।
যে মহিলা ফোন ধরলেন তাঁকে অনিরুদ্ধ সব কথা বলল, যতটা শান্ত ভাবে বলা যায়। মহিলাকে গাড়ির নম্বরটা বলল। অনিরুদ্ধর সঠিক অবস্থান জেনে নিয়ে এবং কেউ অবিলম্বে বিপদগ্রস্ত নয় সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে, তিনি অনিরুদ্ধকে অপেক্ষা করতে বললেন। ফোন কেটে দিলেন।
এখনো অনিরুদ্ধর শিরায় শিরায় উত্তেজনা। ঘটনার মধ্যে নিজের প্রতিক্রিয়ায় ও নিজেই তাজ্জব বনে গেছে। লোকটা যদি বন্দুকটা চালাত? বাবা রে! নিজের মানসিক সুস্থতা নিয়ে এবার অনিরুদ্ধর সন্দেহ হল। ফুটপাতে বসে পড়ল ও। প্রথম থেকে ঘটনার পরম্পরাটা মাথার মধ্যে সিনেমার মত বারবার চালাল। বাপ রে, কী প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেছে!
আধ ঘন্টা অপেক্ষা করার পর অনিরুদ্ধ বুঝতে পারল গলা শুকিয়ে এসেছে, জল দরকার। ক্লান্ত লাগছে। আবার নাইন-ওয়ান-ওয়ান-এ ফোন করল। আগের বার কথা হয়েছিল অন্য কারো সাথে। এখন সেটার পুনরাবৃত্তি করল।
“আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমি বাড়ি যাচ্ছি।”
“ঠিক আছে, স্যার। আমরা এক ঘন্টার মধ্যে আপনার বাড়িতে লোক পাঠাচ্ছি। সে রিপোর্ট লিখে নেবে।”
“যে আসবে তাকে আসার আগে ফোন করতে বলবেন প্লিজ।”
ঘন্টা দুই পরে ফোন এল। অনিরুদ্ধ তখন বাড়িতে। ও পুরো ব্যাপারটা স্ত্রীর কাছ থেকে লুকোতে চাইল। স্ত্রী ভয় পেয়ে যাবে। হয়তো অনিরুদ্ধর দৈনন্দিন পাড়ায় হাঁটতে যাওয়া বন্ধ করতে চাইবে। একটা অপদার্থ ছোটলোক ওর ওপর দিনদুপুরে ডাকাতি করার চেষ্টা করেছিল বলে ও পাড়ায় হাঁটতে যাওয়া থামাতে চায় না। ট্রেন থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরা বন্ধ করতেও নারাজ। তাই রিপোর্ট নিতে আসা পুলিশ অফিসারের সাথে ও রাস্তায় দেখা করল, বাড়ি থেকে কিঞ্চিৎ দূরে।
অফিসার ধৈর্য ধরে অনিরুদ্ধর সব কথা শুনলেন। অনেক প্রশ্ন করলেন। একটা স্কুলের রুলটানা খাতায় অনেক কিছু লিখলেন। শেষে, সেই খাতার দু’পাতা ধরে একটা রিপোর্ট লিখে, পাতা ছিঁড়ে অনিরুদ্ধকে পড়তে বললেন। অনিরুদ্ধ পড়ে দেখল সব ঠিক আছে। সই করে দিল। অফিসার রিপোর্ট নিয়ে চলে গেলেন।
সেদিন ওখানেই গল্প শেষ।
পরদিন অনিরুদ্ধ সকালে অফিস গেছে। পুলিশ থেকে ফোন এল।
“আপনি কি একবার আসতে পারবেন? আপনাকে তুলে নিতে গাড়ি পাঠাব। সম্ভাব্য কুকর্মকারীকে যদি আপনি শনাক্ত করতে পারেন…”
উফ্! কী উত্তেজনা!
পুলিশের গাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ গাড়ির মত। কিন্তু পেছনের সীটে বসে অনিরুদ্ধ বুঝতে পারল যে এটা স্পেশাল গাড়ি, অভিযুক্ত অপরাধীদের নিয়ে যাবার জন্য। কোনো গদি-টদির বালাই নেই। শক্ত লোহার সীট। পা রাখার জায়গা খুব কম। এমনকি অনিরুদ্ধর মত বেঁটে ভারতীয়দের পক্ষেও খাটো। সীটের সামনে লোহার গরাদ। গাড়ির সামনের দিকটা পেছন থেকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
কাজেই কুড়ি মিনিটের যাত্রাটা খুব সুখকর হল না। যে পুলিশটা গাড়ি চালাচ্ছিল, অনিরুদ্ধ তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু নতুন কিছুই জানা গেল না। বোঝা গেল – যা বলার দরকার নেই, সে রকম কোনো কথাই পুলিশ বলবে না।
অনিরুদ্ধ যে পাড়ায় থাকে, তারই কাছে একটা অন্য পাড়ায় গাড়িটা পৌঁছল। যেখানে ডাকাতির আক্রমণটা হয়েছিল, তার খুব দূরে নয়। পুলিশ ড্রাইভার বলল যে অনিরুদ্ধকে গাড়ির ভেতরেই বসে থাকতে হবে। কয়েকজন লোককে গাড়ির সামনে দিয়ে, রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা যতটা দূরে থাকবে সেখান থেকে গাড়ির মধ্যে গরাদের পেছনে অন্ধকারে বসা অনিরুদ্ধকে তারা দেখতে বা চিনতে পারবে না। কিন্তু অনিরুদ্ধ তাদের সূর্যের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পাবে। অনিরুদ্ধ এও জানতে পারল যে পুলিশ ইতিমধ্যেই কয়েক জনকে অ্যারেস্ট করবে বলে এই পাড়ার একটা বাড়িতে ঢুকেছে। পুলিশের গাড়িটা আরো কয়েকবার বাঁক নিয়ে আস্তে হয়ে গেল। একটা গাছের ছায়ায় এসে থেমে গেল। ড্রাইভার ইঞ্জিন বন্ধ করল না।
রাস্তায় পার্ক করা একটা গাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে পুলিশ ড্রাইভার অনিরুদ্ধকে জিগ্যেস করল, “এই গাড়িটাই কি গতকাল আপনি দেখেছিলেন?”
অনিরুদ্ধ মোবাইলে ই-মেল চেক করে দেখল যে গাড়ির নম্বরটা মিলছে।
বলল, “হ্যাঁ।”
কয়েক মিনিট পর, একজন পুলিশ একটা হাতকড়া-পরানো কৃষ্ণকায় লোককে রাস্তার ডান দিকের একটা বাড়ি থেকে বার করে আনল। তারপর হাঁটিয়ে রাস্তার বাঁ-দিকে পার্ক করা একটা পুলিশের ভ্যানে নিয়ে গেল। যেতে যেতে একবার লোকটা অনিরুদ্ধর গাড়ির দিকে তাকালো। সম্ভবত তাকে তাকাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
“চিনতে পারছেন?”
অনিরুদ্ধ তৎক্ষণাৎ বলল, “না।”
লোকটা ভ্যানে ঢুকে যাবার পর, অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল, “এ রকম কজন হয়তো-অপরাধী আছে?”
“তিন জন।”
দ্বিতীয় একজন লোক বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল এবার। তারও হাতে হাতকড়া, সে-ও কালো। সে-ও হেঁটে রাস্তা পার হল। সে-ও একবার অনিরুদ্ধর দিকে দৃষ্টি ফেরাল।
“এই লোকটা হতে পারে কি?”
দু’এক মুহূর্ত দ্বিধা করে অনিরুদ্ধ বলল, “না।”
কয়েদী সেই একই ভ্যানে ঢুকে পড়ল। দু’মিনিট পরে তৃতীয় লোকটা বেরিয়ে রাস্তা পার হল।
“এই লোকটা?”
“হ্যাঁ! এই সেই।”
পুলিশ ড্রাইভার রেডিওতে কাউকে জানাল যে অনিরুদ্ধর শনাক্তকরণ হয়ে গেছে। তারপর গাড়িটা ঘুরিয়ে নিল। অনিরুদ্ধ বলল ও আর অফিসে ফিরে যেতে চায় না, ওকে যেন বাড়িতে নামিয়ে দেওয়া হয়। ফেরার পথে ও আবার পুলিশ ড্রাইভারকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করল। লোকটা বলল যে ওর কোনো রকম খবর ফাঁস করা বারণ। তারপর দ্বিধা নিয়েই বেসরকারি ভাবে জানাল যে গতকাল বেশ কয়েকটা ডাকাতির সাথে এই লোকগুলোর যোগ থাকতে পারে। যেখানে অনিরুদ্ধর ওপর হামলা হয়েছিল সেই অঞ্চলেই ডাকাতিগুলো হয়েছিল। কিন্তু আর কেউ অনিরুদ্ধর মত অভিযোগ এনেছে কিনা সেই কথাটা লোকটা কিছুতেই বলল না।
পুলিশের গাড়িতে বসে বসে অনিরুদ্ধ ভাবছিল প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য কত ভুল হয়। এই নিয়ে অনেক পরীক্ষা, গবেষণা হয়েছে। অনিরুদ্ধ ভারতবর্ষ থেকে আমেরিকায় এসেছে অনেক বছর হল। কিন্তু কালো লোকেদের সিনেমা টেলিভিশন ছাড়া বিশেষ দেখেনি। যখন ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র ছিল, কোনো কালো সহপাঠী ছিল না। চাকরির জগতে কোনো কালো সহকর্মী ছিল না। পাড়ায় কোনো কালো পড়শী নেই। ও কি ঠিক লোককে শনাক্ত করল? অনিরুদ্ধর মনে হল আরেকটু আত্মবিশ্বাস দরকার। মনে মনে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই লোকটাই আমাকে লুঠতে চেষ্টা করেছিল।”
এই ঘটনার দু’ সপ্তাহ পরে অনিরুদ্ধর কাছে ডাক এল জেলা অ্যাটর্নির ঘরে যাবার জন্য।
অফিস যাবার পথে একদিন সকালে অনিরুদ্ধ গেল সেইখানে। একটা সাত-তলা পুরোনো বাড়ি, লাল ইঁট দিয়ে বানানো। গেট দিয়ে ঢুকলে কয়েকজন সশস্ত্র দারোয়ান। সিকিয়োরিটি চেক। এক্সরে মেশিন দিয়ে হেঁটে প্রবেশ। বাকি অভিজ্ঞতাটা সাধারণ সরকারি অফিসের মত – ঔদাসীন্য-মাখা অনাসক্ত অনিচ্ছুক কর্মব্যবস্থা।
রিসেপশনে নিজের আসার কারণ জানানোর পর, অনিরুদ্ধ লিফ্ট নিয়ে পাঁচতলা উঠে গেল। সেখানে আরেকটা কাউন্টারে আরেক বার নিজের আগমনের কারণ পুনরাবৃ্ত্তি করার পর, খাতায় সই করল। তারপর দালানে বসে বসে জীবনের এইসব নতুন অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে করতে অপেক্ষা করতে থাকল।
অ্যাপয়েন্টমেন্টের নির্ধারিত সময়ের অনেক অনেক পরে, একজন অ্যাসিস্টেন্ট জেলা অ্যাটর্নি এলেন অনিরুদ্ধকে ডাকতে। ভদ্রলোকের নাম উয়ং (Wong)। ওরা উয়ং-এর অফিসে হেঁটে গেল। যেতে যেতে পার হল অসংখ্য আমলাদের অফিস, টেবিল, দালান। পার হল অজস্র ধুলোমাখা কাগজ আর ফাইলের স্তূপ আর তাক। পার হল প্রাচীন কম্পিউটারের সামনে কর্মরত ও আড্ডারত অনেক কর্মচারী।
উয়ং মশাই জিগ্যেস করলেন, “কফি চলবে?” ভদ্রলোকের হাসিটা মিশুকে।
অনিরুদ্ধ হেসে ‘না’ বলল।
উয়ং-এর অফিসে বিরাট একটা কাঠের ডেস্ক। তার ওপরে আধ-গোছানো অনেক কাগজ ও ফাইল। সমস্ত দেয়াল জুড়ে আইনের বইয়ের শেল্ফ। উয়ং সাহেব ডেস্কের ওপর ল্যান্ডলাইন ফোনের পাশে মোবাইলটা রাখলেন। ঘূর্ণি-চেয়ারে বসলেন। টেবিলের অন্য দিকে দুটো চেয়ার ছিল। তার একটাতে অনিরুদ্ধ বসল।
“আজ এখানে আসার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। তাছাড়া ক্রাইম রিপোর্ট করার জন্য এবং শনাক্ত করে লোকটাকে ধরতে আমাদের সাহায্য করার জন্যও অনেক ধন্যবাদ।”
অ্যাসিস্টেন্ট জেলা অ্যাটর্নি উয়ং সাহেব অনিরুদ্ধকে অনেক প্রশংসা করলেন ওর সাহস এবং নাগরিক দায়িত্ব পালন করার জন্য। অনিরুদ্ধ আবার ডাকাতির গল্প পুরোটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলল। উয়ং সাহেব মাঝে মাঝে প্রশ্ন করলেন, মাঝে মাঝে সহানুভূতি-সম্পন্ন মাথা নাড়লেন। গাড়িটা চলে যাবার পর অনিরুদ্ধ নিজেকে যে ই-মেলটা পাঠিয়েছিল, তার কপি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে নিয়ে নিলেন।
“একটা প্রাথমিক শুনানি হবে। যদি আপনি অংশগ্রহণ করতে রাজি থাকেন।”
“মানে, আদালতে?”
“হ্যাঁ। প্রাথমিক শুনানি কাকে বলে আপনি জানেন?”
“না।”
“আসামীকে জজের সামনে আনা হবে। তার পক্ষের ও বিপক্ষের উকিল জজের সামনে সমস্ত প্রমাণ সাক্ষ্য উপস্থাপন করবে। মামলা হবে কি হবে না সেইটা জজ তখন নির্ধারণ করবেন।”
“আর সেখানে আমার ভূমিকা?”
“আপনি সাক্ষী! দু’ তরফের উকিলই আপনাকে প্রশ্নাবাদ করবে। আসামীও থাকবে সেখানে।”
অনিরুদ্ধ আস্তে আস্তে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিল। বলল, “বুঝলাম।”
“আপনি সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন। আপনি আপনার সাক্ষ্য উপস্থাপন করবেন। আর আসামীকে আবার শনাক্ত করবেন, এইবার জজ-সমক্ষে।”
এই কথোপকথনের পর প্রায় মাস দুই কেটে গেছে। আসামীকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে অপরাধ মেনে নিয়ে অল্প মেয়াদের কারাদণ্ড স্বীকার করতে। কিন্তু সে তা করেনি। জেলা অ্যাটর্নির অফিস অনিরুদ্ধকে ফোন আর ই-মেল মারফত মামলার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল রেখেছে। ওকে আর জেলা অ্যাটর্নির অফিসে যেতে হয়নি। শুধু সপ্তাহ খানেক আগে একবার প্রসিকিউটারের অফিসে গিয়েছিল। অবশেষে আজ শুনানি।
জজ মহোদয়া অনিরুদ্ধকে অনুরোধ করলেন ঘটনাটা বলতে। আবার। এই নিয়ে কতবার হল?
অনিরুদ্ধ আবার পুরো গল্পটা বলল। বিফল ডাকাতির গল্প। পরদিন শনাক্ত করার গল্প। বলতে বলতে অনিরুদ্ধর উদ্বেগটা কমে এল। মনোযোগ দিয়ে সব খুঁটিনাটি ভেবে সবিস্তারে গল্পটা বলল। আদালতের সবাই শুনল। স্টেনোগ্রাফার টাইপ করলেন।
গল্পটা শেষ হলে জজ অনিরুদ্ধকে ধন্যবাদ জানালেন। ওর ভোগান্তির জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করলেন।
তারপর প্রসিকিউটার উকিল মহোদয়া কয়েকটা প্রশ্ন করলেন।
“সেদিন আপনার কোনো রকম চোট লাগেনি তো?”
আর
“কোনো মানসিক অশান্তি হয়েছে কি?”
আর
“গাড়িটা চলে যাবার সময় আপনি নিজেকে ই-মেল পাঠিয়ে ছিলেন। ছবি তোলেননি কেন?
নাকি ফোন বার করতে করতে গাড়ি চলে গেছে, ছবি তোলার পর্যাপ্ত সময় ছিল না?”
ইত্যাদি ইত্যাদি।
এর পর বিপক্ষের পালা – তিনিও সরকারি উকিল। তাঁর প্রশ্নগুলোতে সহানুভূতি কম।
“একটা অচেনা লম্বা লোক আপনাকে বন্দুক দেখাল।
আপনি তাকে ব্যাগ দিয়ে দিতে অস্বীকার করলেন কীসের ভরসায়?”
আর
“যতক্ষণে ফোন বার করলেন ততক্ষণে গাড়িটা চলে গেছে, তাই ছবি তুলতে পারলেন না।
তার মানে যখন গাড়ির নম্বরটা ই-মেল-এ লিখছেন, তখন সামনে গাড়ি নেই।
তাই ভুল নম্বরও লিখে থাকতে পারেন, তাই না?”
আর
“গাড়িটা এক ঝলক দেখেও আপনি পরদিন ঠিক মত চিনলেন কী করে?”
ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনিরুদ্ধ শান্ত স্বরে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিল। তারপর এলো শেষ প্রশ্ন। জজের থেকে।
“ওই যে পেছনে লোকটা বসে আছে – ওই কি সেই লোক যে আপনাকে বন্দুক দেখিয়ে আপনার ব্যাগ নিয়ে নেবার চেষ্টা করেছিল?”
অনিরুদ্ধ আস্তে আস্তে পেছন ফিরে তাকাল।
আসামী বসে আছে শান্ত ভাবে। মেঝের দিকে তাকিয়ে। পাশে সশস্ত্র প্রহরী। তাদের আরো একটু পেছনে বসে আছে তিন রমণী – মা, বোন ও প্রিয়া।
অনিরুদ্ধ আসামীর দিকে সোজা তাকাল। লোকটা কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না।
অনিরুদ্ধ জজের দিকে ফিরে বলল, “ও মুখের ওপর হাত দিয়ে মুখটা অর্ধেক ঢেকে রেখেছে।”
জজ আসামীকে হাত সরানোর আদেশ দিলেন।
অনিরুদ্ধ আবার লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা হাত নামিয়ে নিল। মুখটা এবার পুরো দেখা যাচ্ছে।
লোকটার ভাবলেশহীন মুখের দিকে ভালো করে তাকাল অনিরুদ্ধ। তারপর অন্যদিকে ফিরে জজের পেছনের দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল ১, ২ থেকে শুরু করে ১২ অবধি কোনো সংখ্যাই আর নেই। তার বদলে আছে বারোটা প্রশ্নচিহ্ন। কোনোটা সোজা, কোনোটা উলটো, কোনোটা বাঁকা। সেই সব উলটো পালটা প্রশ্নচিহ্নর মধ্যে অনড় পড়ে আছে ঘন্টার কাঁটা আর মিনিটের কাঁটা। সেকেণ্ডের কাঁটাটাও থেমে গেল। ঘড়ির গোল সাদা পশ্চাদপটটা সোজা অবস্থা থেকে হেলে গিয়ে এখন শুয়ে পড়েছে। মাটির সমান্তরাল সেই গোল সাদা মেঝেতে অনিরুদ্ধ কয়েকটা পা হেঁটে গেল। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ল অবাক হয়ে। চারপাশে এদিক ওদিক প্রশ্নচিহ্নরা পড়ে আছে। তিনটে নিশ্চল সময়ের কাঁটা এলিয়ে পড়ে আছে। আর বৃত্তাকার মেঝের বাইরে আদালতের সবাই স্ট্যাচুর মত স্তব্ধ হয়ে আছে – জজ আর উকিলরা, আসামী আর তার পরিবার।
সবাই অনিরুদ্ধর উত্তরের অপেক্ষায় নিঃশব্দ। সিনেমায় যেমন দেখায়।
অনিরুদ্ধ ভাবল, “মনে তো হয় এই সেই লোক। একেই আমি আগে শনাক্ত করেছি। একেই পাওয়া গেছে ওই গাড়ির সাথে যার নম্বর আমি ই-মেল-এ লিখেছিলাম। কোনো সন্দেহ আছে কি?”
কিন্তু সিনেমা টেলিভিশনের বাইরে অনিরুদ্ধ কটা কালো লোককে দেখেছে জীবনে? ওদের সবাইকে তো একই রকম দেখতে লাগে! কয়েকটা বিখ্যাত কালো লোককে চিনতে ওর অসুবিধা হয় না, তাদের অনেকবার দেখেছে। কিন্তু এই লোকটা? ওর দিকে কি অনিরুদ্ধ নির্দ্বিধায় আঙুল তুলতে পারে?
অনিরুদ্ধ ভাবল, “আমি কে? আমি বাঙালি। আমি অ্যামেরিকান। আমি ভারতীয়। আমি মধ্যবিত্ত। আমি হিন্দু। আমি মানুষ। আমি পুরুষ। তার মধ্যে অ্যামেরিকান ছাড়া কোনোটাই স্বেচ্ছাকৃত নয়। আমি প্রবাসী ইমিগ্রেন্ট সংখ্যালঘু।”
আর ওই লোকটা? ও কালো। ও অ্যামেরিকান। ও গরীব। ও খ্রীষ্টান। ও মানুষ। ও পুরুষ। কোনোটাই স্বেচ্ছাকৃত নয়। ও ক্রীতদাসের বংশধর সংখ্যালঘু।
অনিরুদ্ধ ভাবল, “এই যে আমি ওকে শনাক্ত করছি, কে কাকে শনাক্ত করছে? একটা খয়েরি একটা কালোকে? একটা মধ্যবিত্ত একটা গরীবকে? একটা সমাজ আরেকটা সমাজকে? এক সংখ্যালঘু আরেক সংখ্যালঘুকে? এক নিরপরাধ এক অপরাধীকে? এই মুহূর্তে আমি কে? কোন্ মূল্যবোধ, কোন্ গোপন ভয়, কোন্ সংস্কার আর পক্ষপাতে আমি এখন আক্রান্ত?”
অনিরুদ্ধর কি আত্মা আছে, যা অবিনশ্বর? তাহলে ওই লোকটারও আত্মা আছে। তাহলে কি একটা আত্মা আরেকটা আত্মাকে শনাক্ত করছে? আজকের দিনে বস্তুবাদের দ্বিপ্রহরে হয়তো আত্মাটাই অপ্রাসঙ্গিক।
অনিরুদ্ধ ভাবল, “এই যে আমি সারা জীবন ধরে নিজেকে খুঁজছি বলে মনে করি, এই আমিটা তো ক্রমাগত পালটে যায়, পালটে যাচ্ছে। আমি তো আসলে খুঁজছি না। আমি বানাচ্ছি। নিজেকে সৃষ্টি করছি রোজ, ছোট থেকে বড় নানা রকম নির্বাচন করে আর সিদ্ধান্ত নিয়ে। বা হয়তো নিজেরই অজান্তে খুঁজছি অন্য একটা আমি, আমার মধ্যে যে চিরকাল লুকিয়ে আছে, আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন।”
অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত মুখোমুখি। কেউ কাউকে চেনে না। যন্ত্রবৎ দৈনন্দিন পথে চলেছে দু’জনেই, অভ্যেস আর প্রচলিত রীতি মেনে। মনস্তত্ব-বিদ্যায় আজকাল বলে যে আমাদের চেতনা যেমন আছে, তেমনই আছে একটা অটোম্যাটিক। জীবনে যা কিছু ঘটে, তাতে আমাদের যা প্রতিক্রিয়া হয় সেটা বেশিরভাগ সময়েই আগে হয় সেই অটোম্যাটিক থেকে। হয়তো সেটাই মনের অচেতন (unconscious) বা হয়তো সেটা অন্য কিছু। কিন্তু যা কিছু ঘটে, তার প্রতিক্রিয়ায় চেতনা জেগে ওঠে অটোম্যাটিক জাগার একটু পরে।
অনিরুদ্ধ ভাবল, “চেতনাই কি শুধু আমি? নাকি অচেতনও? অটোম্যাটিকও? আমি কে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনিরুদ্ধ। সেকেন্ডের কাঁটাটা হঠাৎ চলতে শুরু করল। শব্দ করল ঠিক ঠিক ঠিক। ঘড়ি থেকে বেরিয়ে এল অনিরুদ্ধ। আদালতে দাঁড়াল।
তারপর জজের দিকে ফিরে বলল, “হ্যাঁ হুজুর। এই সেই লোক।”