• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গল্প
    Share
  • বিনা টিকিটের যাত্রী : দেবাশিস দাস

    শালের জঙ্গলে সরু পায়েচলা পথে নেমে আসছে অন্ধকার। অনেকটা দূরে উঁচু গাছগুলোর মাথায় একফালি সিঁদুরে আলোমাখা আকাশ জানান দিচ্ছে সূর্য এখনো ডোবেনি। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূরে চলে এসেছে তমোনাশ। ডুয়ারসের এই জঙ্গলে এখন ঘরে ফেরা পাখপাখালির কণ্ঠস্বর আর নিজের পায়ের শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। ফিরবে কিনা ভাবছে, এমন সময় শুকনো পাতার ওপর খস খস আওয়াজে সচকিত হয়ে উঠল সে।

    পিছন দিকে তাকাতেই দেখল কিছুটা দূরে এক বয়স্ক ভদ্রলোক ওর দিকে এগিয়ে আসছেন। একটু খুঁড়িয়ে চলছেন মনে হলো। এই ঝরাপাতা বিছানো পথে পা টেনে টেনে হাঁটার শব্দটা একটা অলীক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করছিল। দাঁড়িয়ে পড়ল তমোনাশ। ভদ্রলোক কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করলেন ‘আজই এসেছেন এখানে? আমিও কয়েকদিন হলো এসেছি। এদিকে বিকেলে রোজ হাঁটাহাঁটি করি। খুব ভালো লাগে এই জঙ্গলের পথ।’

    ‘হ্যাঁ, খুবই সুন্দর লাগছে এখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য। এক ইউটিউবারের ব্লগ দেখে এই জায়গা এবং রিসর্টের কথা জানতে পেরেছিলাম।’ তমোনাশ বলল।

    ‘আমি গত তিন-চার বছর ধরে প্রতিবারই এই সময়ে এখানে আসি। এবছর রিসর্টে শুনলাম ব্লগ-টগ দেখে কিছু কিছু মানুষজন বেড়াতে আসা শুরু করেছে এখানে। আগে তো বিশেষ কেউ জানতোই না জায়গাটার কথা।’

    ‘ডুয়ারসে আগে গরমের সময়ই এসেছি। শীতের শুরুতে এবারই প্রথম এলাম।’ তমোনাশ মাফলারটা গলায় ভালো করে জড়িয়ে নিল।

    ‘আমি রিসর্টের একেবারে পেছন দিকের ঘরটাতেই বরাবর থাকি। ঘরটা বেশ নিরিবিলি আর জঙ্গলটাও পরিষ্কার দেখা যায় জানলা দিয়ে। রাতের বেলা জীবজন্তুর পায়ের আওয়াজও পাই। আপনি তো ফিরবেন বোধহয়, আমি আরও কিছুক্ষণ অন্ধকারটা উপভোগ করে ফিরব। সন্ধ্যেবেলা আসুন না আমার ঘরে ভালোভাবে আলাপ করা যাবে।’

    ‘একটা শর্তে যেতে পারি, আমাকে আপনি বলা চলবে না।’

    ‘অসুবিধা নেই। আপনি আমার থেকে বয়সে অনেকটাই ছোট।’ মুচকি হেসে ভদ্রলোক বললেন।

    এই নির্জন জায়গায় প্রতিবছর ওনার আসার ব্যাপারটা একটু অবাক করা হলেও এই আলাপি বয়স্ক মানুষটিকে বেশ ভালোই লাগলো তমোনাশের। ও বলল ‘ঠিক আছে, সন্ধ্যাবেলা গল্প করা যাবে।’

    শীতের এই সময়টা বৃষ্টি বড় একটা হয় না এখানে। তবে সন্ধ্যায় বেশ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল। তমোনাশ এসেছে দুপুরে। আলো ছিল, তাই জঙ্গলে হাঁটতে গিয়েছিল। হেঁটে ফেরার পর বৃষ্টি নামল। সম্পাদকের তাগাদায় একটা রহস্য-উপন্যাসের শেষটা লেখার জন্য এখানে আগমন। নিরিবিলিতে লেখাটা জমিয়ে শেষ করা যাবে। খুনিকে ধরার ব্যাপারটাই ঠিকমতো কায়দা করে লিখতে হবে যাতে কাহিনীর শেষপর্যন্ত টান টান উত্তেজনা বজায় থাকে। চাকরি-বাকরি ছেড়ে লেখায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে চায় সে, কিন্তু বছর দশেক ধরে লিখলেও তমোনাশ কিন্তু এখনও সেভাবে পাঠকদের মধ্যে ছাপ ফেলতে পারেনি। আশায় আছে এই লেখাটা হয়তো তাকে কিছুটা বাড়তি পরিচিতি দেবে।

    বিদ্যুৎ চলে গেছে সন্ধ্যের পরেই। সে বসে আছে আলাপি মানুষটির ঘরে। ঘরটা সত্যিই জঙ্গলের মধ্যে বলেই মনে হচ্ছে। জানলা দিয়ে একটা ছোট জলাশয় দেখা যাচ্ছে। তার ওপাশে ঘন জঙ্গল। জীবজন্তুরা নিশ্চয়ই এই জলাশয়ে জল খেতে আসে। গরম কফির সাথে একথা-সেকথা চলতে চলতে জানা গেল ভদ্রলোক কর্মসূত্রে নানা দেশে-বিদেশে ঘুরে অবশেষে কোলকাতার কাছাকাছি কোথাও বাড়ি করে থিতু হয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে এই সময়টাতেই এই রিসর্টে চলে আসেন। এখানকার জঙ্গলের আদিম নির্জনতা ওনার ভালো লাগে।

    ঘরে ঢুকেই তমোনাশ দেখল বিছানার উপরে একটা কবিতার বই ‘হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য।’

    এটা তমোনাশেরও খুব প্রিয় বই। বইটার দিকে সে তাকিয়ে আছে দেখে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন ‘প্রেমের সঙ্গে নৈঃশব্দ্যের বিশেষ সম্পর্ক আছে বলে তোমার মনে হয়? আমার কিন্তু বিশেষভাবে মনে হয় ওই শব্দহীনতায় পৌঁছনোই প্রেম। তাই এই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বারবার ফিরে আসি।’

    ব্যাপারটাকে আর একটু জারিত করার জন্য তমোনাশ বলল—‘প্রেমের সাথে শব্দের সম্পর্ক নাও থাকতে পারে, কিন্তু কথা বা শব্দ ছাড়া প্রেম হয় কি?’

    ‘কেন? বিচ্ছেদটাও তো প্রেম, বহুদিন দেখা বা কথা হল না অথচ প্রেমটা রয়ে গেল। তাছাড়া প্রেমের সঙ্গে প্রতারণাও জড়িয়ে থাকে। এর সাথেই আসে ব্যথা, মৃত্যুর মত নৈঃশব্দ্য।’ ভদ্রলোক নিজের আলোয়ানটা গায়ে জড়িয়ে জানলার কাছের চেয়ারটায় বসলেন। অকালবৃষ্টির হাল্কা ছাট আসছে। তার সাথে আসছে ঠান্ডা হওয়া। বেশ শীত শীত করছে।

    ‘কিন্তু প্রেমের সাথে মৃত্যুর স্তব্ধতা ...?’ তমোনাশ সংশয় প্রকাশ করল।

    ‘তোমরা আজকালকার মানুষ, আমাদের সময় ভালোবাসার ব্যাপারটা এতটা হয়ত উচ্চকিত ছিল না। কিন্তু গভীরতা ছিল। এক-একটা ছোট্ট ঘটনা জীবনটাই বদলে দিতে পারত তখন।’ শেষটা বললেন প্রায় মনে মনে।

    ‘কিন্তু এর সাথে মৃত্যু, নৈঃশব্দ্যের অনুষঙ্গ? যদি ব্যাপারটা একটু খোলসা করেন—।’

    ‘আপত্তি নেই। আমার জীবনেরই একটা দিনের ট্রেনযাত্রার সাধারণ ঘটনা বলা যেতে পারে। যেটা না ঘটলে হয়ত অনেকগুলো জীবন অন্যরকম হত। তাছাড়া তুমি তো লেখক মানুষ। হয়ত কিছু রসদও পেতে পার। তবে একটা শর্ত আছে। গল্পটা আমি তোমাকে ধরিয়ে দিতে পারি। শেষটা লেখক হিসেবে তোমাকেই করতে হবে।’

    ‘নিশ্চয়ই। শুরু হোক তাহলে।’ গুছিয়ে বসল তমোনাশ।

    ‘তখন আমার কলেজের সেকেন্ড ইয়ার। প্রায় বছর চল্লিশ আগের একদিনের কথা। সেইদিন বিকেলে কলেজে ক্লাস শেষ হতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। স্টেশনের প্লাটফর্মে পৌঁছে দেখলাম আমার ট্রেন চলতে শুরু করে দিয়েছে। পরের ট্রেন প্রায় আধা ঘন্টা পরে। তাই দৌড়ে চলন্ত সেই ট্রেনের হাতল ধরে ঝুলে পড়লাম। বেশ ভিড় গেটের কাছটায়। ভাগ্যিস কোনরকমে ট্রেনটা ধরে ফেলেছি, ঠেলে ঠেলে ভেতরে যেতেই হঠাৎ মনে পড়ল আমার কাছে তো টিকিট নেই। বাবা সকালেই মান্থলি টিকিটের টাকা দিয়েছিলেন। কলেজে আসার সময়ই মান্থলি করার কথা ছিল। কিন্তু তখন ব্যাপারটা মনে পড়েনি আর টিটিই বা চেকারও ধরেনি। ফেরার সময়ও তাড়াহুড়োতে মান্থলি করা হল না। দেরিতে স্টেশনে এসে ট্রেনটা দেখতে পেয়েই সব গোলমাল হয়ে গেছে। চেকার ধরলে ফাইন দিয়ে ছাড়া পাব অত টাকাও পকেটে নেই। বিনা টিকিটে ধরা পড়লে থানায় চালান ছাড়া গতি নেই। ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে, এখন ট্রেন থেকে নেমে যাওয়াও অসম্ভব। কল্পনা করলাম বিনা টিকিটে ধরা পড়ে হাজতে বসে আছি। ট্রেনের ভেতরটা কিছুটা ফাঁকা। একটা ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়েও কুল কুল করে ঘামতে লাগলাম। মনে মনে নানা পজিটিভ থিংকিং করার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম স্টেশনের গেটে চেকার তো নাও থাকতে পারে। আবার যদি ধরেও বলব ভুলে গেছি। যা টাকা আছে ফাইন হিসেবে নিয়ে নিন। স্টুডেন্ট বলে ছেড়েও দিতে পারে। আবার বেশি ভিড়ের মধ্যে চেকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়েও যেতে পারি। অনেক রকম সম্ভাবনা আছে বেরোবার। কিন্তু আমার যা কপাল তাতে ধরা পড়া নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে গেটের ভিড়ে অনেক চেনা লোকও থাকতে পারে যারা আমাকে দেখে ফেলবে। সবাই জানতে পারবে আমি অমুক স্যারের ছেলে, বিনা টিকিটে ধরা পড়েছি। বিনা টিকিটের নানা ধরনের যাত্রীদের সাথে আমাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে বসিয়ে রাখবে প্ল্যাটফর্মে। কোমরে দড়ি বাঁধে কি? সে যে কী অপমান? ভাবতেই শরীর কেঁপে উঠছে। তবে ভগবানের কৃপায় যদি কোন চেনা লোক না দেখে তাহলেও কিছুটা হয়ত সম্মান বাঁচবে। ঠাকুরকে ডাকতে লাগলাম যাতে কোন চেনা লোক আশপাশে না থাকে। মুখের চেহারা গরুচোরের মত না করে একটু স্মার্ট ভাব আনার চেষ্টা করলাম। আমার নার্ভাসনেস বোধহয় ঠেকাতে পারছি না। আমি ছাড়া ট্রেনে যত যাত্রী চড়েছে সকলেরই কি টিকিট আছে? নিশ্চয়ই না। তবে কাউকে দেখে তো মনে হচ্ছে না যে কাছে টিকিট নেই, তবে আমি এত ঘামছি কেন? কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। গরুচোর গরুচোর ভাবটা প্রাণপণে তাড়াবার চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি মেয়ের রিনরিনে গলা শুনতে পেলাম, “আরে রাহুলদা আপনি এই ট্রেনেই ফেরেন নাকি?”

    ‘কোন রকমে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম আমাদের পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটি পেছন থেকে আমার দিকে হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। গরুচোর হাসলে কেমন দেখায় আমি জানি না, তবে আমিও হাসার চেষ্টা করলাম। মেয়েটা আমার দিকে হাল্কা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল।

    ‘“আমিও তো কলেজ থেকে এই সময়েই ফিরি।” মিষ্টি হাসিতে আরো একটু চিনি ছড়িয়ে বলল মেয়েটি।’

    এই পর্যন্ত বলে থামলেন ভদ্রলোক। বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার নেমেছে।

    ‘তারপর কী হল? মেয়েটি কে?’ থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করল তমোনাশ।

    ‘ও রাকা। প্রাণবন্ত এবং সুন্দরী। আমার দারুণ লাগত ওকে। পাড়া বে-পাড়ার ছেলেদের লম্বা লাইন ছিল ওর পেছনে, আমি জানতাম। আমার তখন ইঞ্জিনিয়ারিং সেকেন্ড ইয়ার আর ওর ১২ ক্লাস। রাস্তায় কখনও চোখাচোখি হলে ও আমাকে মাঝে মাঝে কিছুটা প্রশ্রয়মিশ্রিত হাসি দিত। আমার বাবা ওকে একটা সময় পড়াতেন। ওর বাবা অনুরোধ করেছিলেন, “মাস্টারমশাই, মাঝে মাঝে টুটুলকে অংকটা একটু দেখিয়ে দেবেন দয়া করে।” ওর মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে ওকে কয়েক মাস বাবা গাইড করে দিয়েছিলেন। বোর্ডে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছিল রাকা। আমাদের বাড়িতে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ওর বাবা-মা দুজনেই এসেছিলেন। তারপর ও আর্টস নিয়ে বারো ক্লাসে ভর্তি হওয়াতে অংকের কবল থেকে ছাড়া পেয়েছিল। আমি তখন ভাবতাম যে ওকে বান্ধবী হিসেবে পেলে ভালোই লাগবে। তারপর যদি প্রেমিকা হয়ে যায় সেটা হবে সোনায় সোহাগা।

    ভালো ছেলে হিসেবে পাড়ায় বেশ সুনাম ছিল আমার। বেশিরভাগই “অমুক স্যারের ছেলে খুব ভালো” হিসেবে। তবে আমার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রাকার সাথে আর বেশি এগোয়নি ব্যাপারটা। কিন্তু এরকম একটা বিপদের মধ্যে ওর সাথে দেখা হবে একেবারেই চাইনি আমি। কিন্তু আমার বেলায় সাধারণত সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটাই হয়। মেয়েটি নিজের কাঁধের ব্যাগটা সামলে আমার পাশে চলে এলো। ভিড়ের ধাক্কায় ওর কাঁধ আমার বাহু ছুঁয়ে যাচ্ছিল। এত কাছ থেকে ওকে দেখিনি কখনো। লক্ষ্য করছিলাম বেশ দীঘল চেহারা মেয়েটির। চোখ দুটো দূর থেকে যা দেখেছিলাম তার থেকেও সুন্দর। শরীর থেকে একটা চাপা ফুলের গন্ধ আসছিল।

    ‘“আমি লেডিস কম্পার্টমেন্টেই উঠি। আজ ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছিল বলে সামনে পেয়ে এই কামরায় উঠে পড়লাম। তবে না উঠলেই বোধহয় ভালো হত। এত ভিড়, বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। ভাগ্যিস আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল।“

    ‘দেখলাম আশপাশের অনেকেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে আর ওর পাশের কয়েকটি ছেলে হয়তো ওকে ধাক্কাধাক্কি করছিল ভিড়ের সুযোগ নিয়ে। আমাকে পেয়ে ও কি ঝামেলা থেকে বেঁচে গেল? নিজেকে হিন্দি সিনেমার হিরো বলে মনে হচ্ছিল। তবে সেটা মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই আবার গরুচোর ভাবটা ফিরে আসছিল। প্রাণপণে নিজেকে স্মার্ট রাখার চেষ্টা করলাম, অন্তত যতক্ষণ না ধরা পড়ি। এখন আর পালাবার উপায় নেই। এই মেয়েটার সাথেই আমাকে পাড়া পর্যন্ত যেতে হবে। এদিকে ট্রেন আস্তে আস্তে গতি কমিয়ে আমাদের গন্তব্যের স্টেশনে ঢুকছে। নামতে হবে, তারপরে আসল নাটক শুরু। দুরু দুরু বুকে দরজার দিকে এগোলাম।

    ‘ঠিক সেই সসময়েই দেখলাম পরেশ এগিয়ে আসছে ট্রেনের দরজার দিকে স্টেশনে নামবার জন্য। এসময়ে আবার পরেশ কেন? আমার অস্বস্তি বাড়াবার জন্য?’

    আবার থেমে গেলেন ভদ্রলোক। জল খেলেন।

    ‘পরেশ কে? আপনার বন্ধু?’

    ‘ও আমাদের পাড়ার ছেলে। বন্ধু ঠিক নয়, আমার থেকে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত। পড়াশুনোয় মোটামুটি ভালো, কলেজ পড়ুয়া। কিন্তু খেলাধুলোয় দুর্দান্ত। সেবছর ফার্স্ট ডিভিশনের একটা ফুটবল টীমে সুযোগ পেয়েছিল। ও রাকার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। কী আশ্চর্য, রাকা ওকে আরও মিষ্টি একটা হাসি ফেরত দিল।’

    ‘রাকার নিশ্চয়ই আলাপ ছিল ওর সাথে?’ তমোনাশ আবার ঢুকল গল্পের মাঝে।

    ‘সেটা আমি জানতাম না। তবে আমি জানতাম পরেশেরও দুর্বলতা ছিল রাকার প্রতি। ও নাকি রাকাকে চিঠি দিয়ে প্রপোজও করেছিল। রাকা উত্তর দেয়নি। যাই হোক, ট্রেন থামল। এই কম্পার্টমেন্টটা স্টেশন থেকে বেরোবার গেটের সামনেই পড়ল। যাত্রীদের ভিড় সাথে করে এগোচ্ছি আমরা দুজন। রাকা সামনে আর আমি ওর পেছনে। অনেক সময় গেটে চেকার থাকে না। আজ যদি সেরকমই একটা দিন হয় তবে বুক ফুলিয়ে বের হতে পারব। কিন্তু ধন্য আশা কুহকিনী। গেটের কাছে পৌঁছতেই বুঝলাম যে যা আশা করেছিলাম সেরকম দিন আজকে মোটেই নয়। গেটে চেকার তো আছেই, সাথে আছে বেশ কয়েকজন ভলেন্টিয়ার। যারা টিকিট চেক করতে সাহায্য করছে তাকে। এরকম চেকিং ড্রাইভ রেল মাঝে মাঝে নেয়। হয়তো মাসে দু একদিন। আমার এমনই কপাল যে আজকেই সেরকম একটা দিন। দুজন বন্দুকধারী আরপিএফও আছে দেখলাম। বেশ কিছু যাত্রীকে তারা আটক করে বসিয়ে রেখেছে একটা দড়ি দিয়ে ঘেরা জায়গায়। লোকজন বিনা টিকিটের যাত্রীদের দেখছে। একটু পরে আমারও স্থান হবে ওদের মধ্যে আর রাকা অসম্ভব অবাক হয়ে এবং হয়ত আমার প্রতি একরাশ ঘৃণা নিয়ে বাড়ি চলে যাবে।

    ‘আমার মাথায় এখন প্রায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। আমার সাথে আছে এক সুন্দরী, যে আমার প্রেমিকা হতে পারে। কিন্তু আজকের পরে সমস্ত সম্ভাবনা হয়ত ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। মেয়েটি বাড়ি যাবে আর আমি যাব হাজতে। মনে মনে ঠিক করলাম সময় শেষ হওয়া পুরনো মান্থলি টিকিটটাই দেখাবো চেকারকে। ভিড়ের মধ্যে ডেট না দেখে তাড়াহুড়োতে আমাকে ছেড়েও দিতে পারে। দেখাই যাক না। এত তাড়াতাড়ি হার মানছি না।

    ‘রাকা গেটে নিজের মান্থলি টিকিট দেখিয়ে বেরিয়ে সামনে চলে গেল। আমাদের পাশ দিয়ে টিকিট না দেখিয়ে একজন যাত্রী ভিড়ের সুযোগ নিয়ে পিছলে এগিয়ে যাচ্ছিল। গেট পার হয়ে একজন ভলেন্টিয়ার প্রায় গোলকিপারের কায়দায় তাকে পাকড়াও করল। টিটিই-র হাত এবার আমার দিকে এগিয়ে এলো। গেট থেকে বেরিয়ে সামনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রাকা আমার দিকে তাকিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ দেখলাম আমাকে পাশ কাটিয়ে টিকিট দেখিয়ে বেরিয়ে অপেক্ষারত রাকার পাশে গিয়ে দাঁড়াল পরেশ। হেসে কথা বলছে দুজন। পরেশ একবার আমার দিকে তাকাল। বোধ হয় রাকা ওকে আমার কথা বলেছে। পরেশ যেন একটু বিরক্ত হয়েই আমাকে দেখল, তারপর একটু এগিয়ে গিয়ে সামনের সিগারেটের দোকানে দাঁড়াল। আমি জানি ও আমাদের লক্ষ করছে এখন। আজ কি আমার হেরে যাবার দিন? না হলে পরেশ এখানে কেন এই মুহূর্তে? আমি পকেটে হাত ঢোকালাম। মানিব্যাগ বের করলাম। খুঁজলাম, দেখলাম পুরনো মান্থলিটাও সেখানে নেই। তাড়াহুড়োতেই কি খুঁজে পাচ্ছি না? কিছুটা সময় পার হল খুঁজতে। পেছনে একটা ভিড় জমে গেছে। যাদের তাড়াহুড়ো আছে তারা তাড়াতাড়ি করতে বলছে। টিটিই আমাকে বলল ‘সাইডে দাঁড়ান, টিকিট বের করুন।’ দুজন পুলিশ শিকারি চোখে আমাকে দেখছিল। এখন সামনেও দুজন ভলেন্টিয়ার এসে যাওয়াতে ওদিকে দাঁড়ানো রাকা একটু আড়াল হয়েছে। আড়চোখে দেখলাম সেই পিছলে যাওয়া যাত্রীকে পাকড়াও করে ঘেরা জায়গায় বসান হয়েছে। আমার বোধহয় শেষ রক্ষা আর হলো না।

    ‘এমন সময় একটা পরিচিত গলার আওয়াজ পেলাম, “কি রে রাহুল এত দেরি করলি? আজকেই দেরি করতে হলো?” দেখলাম, হাতে ভলেন্টিয়ারের ব্যাজ লাগানো, আমাদের পাড়ার মদন আমার দিকে এগিয়ে আসছে।’

    আবার থামলেন ভদ্রলোক। তমোনাশ এতক্ষণে বুঝে গেছে যে এটাই ওনার বলার কায়দা। কাহিনীতে নতুন চরিত্র এলেই উনি একটু থেমে শ্রোতার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন।

    তবে এবারে তমোনাশ কিছু না বলে চুপ করে রইল। একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলেন ভদ্রলোক।

    ‘মদন আমারই সমবয়সী। তবে পাড়ায় ওর মোটেই সুনাম ছিল না বরং গুন্ডা টাইপের ছেলে হিসেবে ছিল বেশ দুর্নাম। পাড়ার লোকজন ওকে এড়িয়ে চলত। মদনের বিধবা মা, মদন এবং ওর ছোট বোন পাড়ার এক কোণে একটা ভাঙ্গাচোরা বাড়িতে ভাড়া থাকত। ভাড়া বাকি পড়াতে বাড়িওয়ালা ওদেরকে উৎখাত করার চেষ্টা করছিল। ওর মা-ই টুকটাক সেলাই ও অন্যান্য কাজ করে সংসার চালাত। মদন এদিক-ওদিক থেকে কিছু রোজগারপাতি করত। পড়াশোনাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল। ছোট বোনটি প্রাইমারি স্কুলে পড়ত। ওর বাবা ছিল পুরো অ্যান্টিসোশ্যাল। চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি নাকি করত সে। বছর খানেক আগে শহরের কোন এক নর্দমার থেকে নাকি তার লাশ উদ্ধার হয়। মদন আমার সাথে স্কুলে পড়ত একসময়। আমাদের বাড়িতেও আসত তখন আমার সাথে খেলতে। তারপর আর কোন যোগাযোগ নেই। আমিও এড়িয়ে চলি ওকে। ওর বাবা খুন হওয়ার কিছুদিন পরেই মদনকে বাবার কোন পুরনো কেসে ফাঁসিয়ে পুলিশ জেলে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন ওর মা এসে কেঁদে পড়েছিল আমার বাবার কাছে, “মাস্টারমশাই আমার ছেলেটাকে বাঁচান। ও জেলে গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমি ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে পথে বসব। ওকে তো আপনারা চেনেন। ওর কোন দোষ নেই।”

    ‘সেই সময় বাবা পাড়ার দুয়েকজন মাতব্বর গোছের লোকজন সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়ে তদ্বির করে মদনকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। স্থানীয় কাউন্সিলরকে বলে টুকটাক কিছু কাজের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন ওর। নানা ঠিকাদারদের সাথে কাজ করত মদন। ওর মা সেবার এসে আমাদের বাড়িতে বলেছিল, “মাস্টারমশাই আপনার জন্যই মদন আজ ছাড়া পেল, নতুন জীবন পেল। না হলে ওর জীবনটাও ওর বাবার মতোই নষ্ট হত। আশীর্বাদ করুন ও যেন একটা সুস্থ জীবন পায়।” মদন এরপর নিজের কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকত। পড়াশুনো কোনওরকমে মাধ্যমিক পাশ করেই ছেড়ে দিয়েছিল।

    ‘মদন এসে টিটিইকে বলল “আরে ব্রতীনদা রাহুলের তো মান্থলি টিকিট আছে। ওকে তাড়াতাড়ি যেতে দিন প্লিজ। ওর বাড়িতে ইমারজেন্সি, ওর মা ভীষণ অসুস্থ। ও আমাদের মাস্টারমশাই-এর ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ওষুধ আনতে গিয়েছিল। ওর জন্য বাড়িতে সবাই অপেক্ষা করছে। এক্ষুনি যেতে হবে। ওর কি এখন মাথার ঠিক আছে?”

    ‘ততক্ষণে আরো খানিকটা ভিড় জমেছে আশেপাশে। পুরনো মান্থলিটাও ততক্ষণে ব্যাগ থেকে বের করে ফেলেছিলাম আমি। টিটিই হাত বাড়িয়ে মান্থলি নেবার চেষ্টা করল। আমি দেব কি দেব না ভাবছি। এমন সময় মদন আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ভিড় থেকে স্টেশনের গেটের বাইরে বার করে দিল। বলল ‘তাড়াতাড়ি বাড়ি যা দেরি করিস না। খুব দরকার ওষুধটা।’ আমি বেরিয়ে গেলে চেঁচিয়ে বলল, “একটা রিকশা ধরে নিস। কোন দরকার হলে খবর পাঠাস। আমি যাব।” আর সঙ্গে সঙ্গে পরের যাত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার টিকিটটা?” আমি ঘটনার আকস্মিকতায় প্রাথমিকভাবে একটু বিহ্বল হলেও বেরিয়েই একটা বড় নিশ্বাস ফেললাম আর গরুচোর ভাবটা ছেড়ে একটা স্মার্ট চেহারা মুখের মধ্যে এনে ফেললাম। ও নিশ্চয়ই রাকাকে আর আমাকে একসাথে দেখে সবকিছু আন্দাজ করে নিয়েছিল। রাকা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, ভিড়ের জন্য কথাবার্তা বিশেষ শুনতে পায়নি। পরেশকে দেখলাম প্রবল বিরক্তির সাথে সদ্য ধরানো একটা সিগারেট রাস্তায় ফেলে জুতোর নিচে পিষছে। রাকা চলতে চলতে আমাকে মদনের কথা জিজ্ঞেস করল, “আপনি চেনেন নাকি ওই ছেলেটাকে? ভীষণ বাজে ছেলে। পাড়ায় যে কেন থাকে এরা? নুইসেন্স একেবারে। ও কী বলছিল আপনাকে?”

    ‘আমি বললাম, “হ্যাঁ চিনি। মানে একসময় ও স্কুলে আমার সাথেই পড়ত। এখন পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। দেখা হলে টুকটাক কথা হয় এই পর্যন্ত। আমি নিজের থেকে বিশেষ কথাবার্তা বলি না।”’

    ‘“এসব ছেলেদের এড়িয়ে চলাই উচিত। বাবা বলে ভদ্রলোকের পাড়াতে এসব ছেলেদের থাকাই উচিত না।”

    ‘কথা বলতে বলতে রাকা বার-দুয়েক পেছনে তাকিয়েছিল। পরেশকে খুঁজছিল কি ভিড়ের মধ্যে?

    ‘মদনের ব্যাপারে রাকার কথায় মৌন থেকে আমি হয়তো ওর সাথে একমত হয়েছিলাম। কিন্তু মনে মনে অশেষ ধন্যবাদ দিলাম মদনকে। আমি তো জানি যে কত বড় উপকারটা ও আমার করল। বাবা ওকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নতুন জীবন দিয়েছিল। প্রতিদানেই কি ও আমাকে উদ্ধার করল আর দিল সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা? ফেরার পথে রাকার সমর্পণের হাসি আমাকে শক্তি জুগিয়েছিল আর আমি শুরু করেছিলাম একটা ভালবাসার সম্পর্ক।’

    ভদ্রলোক একেবারে চুপ করে গেলেন এবারে। বেশ কিছুক্ষণ পরে তমোনাশ নিস্তব্ধতা ভাঙল, ‘বিনা টিকিটের যাত্রীরাই হয়ত সবচেয়ে বেশিদূর পর্যন্ত যেতে পারে।’

    ‘অত সোজা নয় জীবনের যাত্রাটা। কার কাছে কতদূর যাবার টিকিট থাকে সেটাই কেউ জানে না।’ ভদ্রলোক কি যেন ভাবছেন মনে হল।

    ‘কিন্তু এর সাথে মৃত্যুর নৈঃশব্দ্য কোথায়?’

    ‘মৃত্যু ও জীবন তো পাশাপাশি চলতে থাকে।’

    ‘কাহিনীর শেষটা কী হল? অনেক প্রশ্ন থাকল যে।’ তমোনাশ প্রায় অধৈর্য হয়ে উঠল।

    ‘জীবনে প্রশ্ন তো থেকেই যায়, তাই না? তাছাড়া এ কাহিনীর শুরু আছে, রূপরেখা আছে, চরিত্র বিন্যাস আছে। লেখক হিসেবে গল্পের শেষটুকু লেখার জন্যই তো এখানে এসেছ তুমি।’ ভদ্রলোক যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন।

    ‘কিন্তু প্রেমের পরিণতি?’

    ‘চরিত্ররা জীবন থেকে নেওয়া হলে সঠিক পরিণতি নিজেরাই বেছে নেয়। অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ আর নয়। বাইরে জলাশয়ে জীবজন্তুরা জল খেতে আসবে এবার। আলো নিবিয়ে আমি দেখতে থাকবো শ্বাপদদের চলাফেরা।’ ওনার গলার আওয়াজ এখন একেবারে মৃত্যুর মত শীতল। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর এবং ব্যবহারের পরিবর্তনে কিছুটা অবাক হয়েই তমোনাশ বেরিয়ে এল ঘর থেকে। পেছনের জঙ্গলে তখন আদিম অন্ধকার নেমেছে।

    পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলেই খোঁজ নিয়ে তমোনাশ জানল ভদ্রলোক চলে গেছেন রিসর্ট ছেড়ে। বড় অদ্ভুত মানুষ। কাহিনীটা মাঝপথে ছেড়ে চলে গেলেন। আরও দিন তিনেক থেকে নিজের লেখা শেষ করল তমোনাশ। তার গল্পের শেষটা নিয়ে একটা খুঁতখুঁতুনি থেকেই গেল যদিও।

    চলে যাবার দিন রিসেপশনে বিল মেটাবার সময় হঠাৎ তমোনাশের চোখে পড়লো পেছনের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে মালা দেওয়া বাঁধানো একটা বড় আবক্ষ ফটো। এই কদিন তো লক্ষ্য করেনি সে। হয়ত অন্য কোথাও ছিল, আজই এখানে লাগান হয়েছে। ছবিটি এক অতি সুদর্শন বয়স্ক ভদ্রলোকের। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। রিসেপশনের লোকটিকে জিজ্ঞেস করে জানল ইনি হচ্ছেন এই রিসর্টের মালিক। বছর তিনেক আগে এই জঙ্গলে কোথাও উধাও হয়ে গিয়েছিলেন একদিন। বিস্তর খোঁজাখুঁজি করে কদিন পরে ওনার লাশ পাওয়া গিয়েছিল ঘন জঙ্গলের মধ্যে। অনেক তদন্ত করেও মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। পোস্টমরটেম রিপোর্টে হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার ব্যাপারটা লেখা ছিল। পুলিশ থেকে বলা হয়েছিল জঙ্গলে ভয়ে হার্ট এটাক হয়েছিল ওনার। এই প্রত্যন্ত জায়গায় মৃত্যু নিয়ে জল ঘোলাও হয়নি। যদিও অনেকে বলে খুন হয়েছিলেন তিনি। তারপর থেকে ওনার ছেলেই এই রিসর্টটি চালান। কোলকাতা থেকেই প্রতি মাসে যাতায়াত করেন। এই ভদ্রলোকের স্ত্রী আগে সিনেমা/সিরিয়ালে নিজের অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এখানে আসতে পারতেন না। এখন অবশ্য অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন। কোলকাতায় ছেলের সাথেই থাকেন। প্রতি বছর একবার স্বামীর মৃত্যুদিনে এখানে আসেন। এই তো কদিন আগেই উনি এসেছিলেন।

    ছবিটার কাছে গিয়ে তমোনাশ দেখল নিচে লেখা আছে ‘পরেশ কুমার সেনগুপ্ত’, ব্রাকেটে লেখা আছে তার জীবৎকাল।

    নামটা পড়ে কেন কে জানে বুদবুদের মত কিছু তথ্য ভেসে উঠল তমোনাশের মনে। অনেক বছর আগে এই নামেরই একজন স্ট্রাইকার ইস্টবেঙ্গলে খেলতেন। ফুটবলে ইন্টারেস্ট আছে বলেই হয়তো ওর মনে পড়ল নামটি। একবার হাফ ভলিতে মোহনবাগানকে একটা গোল করে খুব বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন উনি।

    তমোনাশ নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগল—‘চরিত্ররা জীবন থেকে নেওয়া হলে নিজেরাই সঠিক পরিণতি বেছে নেয়। পরেশবাবুর কাছে হয়ত যাত্রার সঠিক টিকিট ছিল না তাই তাকে নেমে যেতে হল মাঝপথে নৈঃশব্দ্যের মধ্যে।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments