


বটতলার দিকটা আজ ভিড়ে ভিড়। সাইকেল স্ট্যান্ডে সাইকেল এত জমা হয়েছে, যেন মেলা। কিছু আছে আজ। মিছিং মিটিং। শ্রীমতী আড়চোখে দেখে পাতলা সুতির চাদর গায়ের ওপর টেনে হন হন করে হাঁটা দিল।
হঠাৎ সাইকেল স্ট্যান্ডের ভেতর থেকে একজোড়া চোখে তার চোখ আটকে গেল। হরি!!! ও মাইরি। হরি ফিরে এয়েচে। হরি তাকে দেখল। মিটিমিটি হাসল। বটতলার অন্ধকারের ভেতর গা মিলিয়ে তারপর হরি কোথায় একটা যেন চলে গেল। যাহ কলা। হরি আজ আর ধরা দেবে না। দেবে না তো কী! ওরে জানেজান। তোর প্রাণভোমরা তো আমার কাছেই আছে।
শ্রীমতী কাজের বাড়ির দিকে দৌড় দিল, কিন্তু এখন তার পা আর মাটিতে পড়ছে না। বাতাসে ভর দিয়ে সে ছুটে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে যেন দশটা পালোয়ান লাফাচ্ছে। হরিকে তো দেখা নয়, শ্রীমতী যেন একটা খালি পাঁচ লিটার জেরিক্যান দেখল! কী ভীষণ লাফ দিল গলার কাছে আনন্দের দলা। আনন্দটা এখন টিউকলে পাম্প দেবার মত করে তার রক্ত পাম্প দিচ্ছে। শ্রীমতীর কান অব্দি গরম হয়ে ওঠে। উত্তুরে হাওয়াটা আর গায়েই লাগে না।
একটা খালি পাঁচ লিটারের জেরিক্যান ঘর ঝাঁট দেবার সময়ে দেখতে পেলে যেরকম শ্রীমতীর প্রাণ হাঁকপাকায় তেমন আর কিছুতে না। বৌদি আবার সরষের তেল শেষ করে জেরিকেন গ্যাস সিলিন্ডারের পাশে নামিয়ে রেখেছে। উফফফফ। এই গতবার, তাও মাসকয়েক হল, চেয়েচিন্তে বৌদির কাছ থেকে এমনই এক খানা আদায় করেছিল শ্রীমতী।
এবারও বলবে? বৌদি যদি কিছু মনে করে? শ্রীমতী মনে মনে অংক কষে। ভেবেচিন্তে হিসেব করে চলা দরকার। রান্নার মেয়ে মালতীই তো তেলের জেরিক্যান খালি করছে৷ কিন্তু সেও তো শ্রীমতীরই মতন বস্তিতেই থাকে৷ আগের থেকে হয়ত বৌদির কাছে খালি হওয়া জেরিক্যান চেয়ে রেখেছে? কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে তো সে নিয়েই চলে যেত৷ সিলিন্ডারের পাশে সাজিয়ে রেখে যাবে?
অন্য কোন মতলব কিনা, কে জানে? মোটের ওপর, বৌদির কাছে পর পর দুবার ডিব্বা চাইতে একটু কিন্তু করল শ্রীমতী৷ প্রথমটা হাসি-খুশিতে দিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় জেরিক্যানটা নিতে চেয়ে শ্রীমতীরই মুখ ছোট হয়ে যায় যদি?
সবাই বলে গরিবের ঘরে জন্মানোর পক্ষে শ্রীমতির একটু বেশি আঁত৷ সহজেই আঁতে ঘা লাগে। আজকের দিনে চামড়া পুরু না হলে চলে না৷
এস আই আর, এস আই আর করে এমনিই পাগল পাগল লাগছে। মোড়ের মাথায় তিনোমুল ভোটরক্ষা শিবির খুলেছে। লোকে বলে পাড়ায় পাড়ায় ক্যাম্প হবে। কারুর নাম বাদ যাবে না। কিন্তু শ্রীমতীর মুশকিল হল, ওর দাদারা, দিদি, ও নিজে, ছ-সাতজনের দুদিকেই ভোট ছিল। দেশেও আবার কলকাতাতেও। এখন ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ওদিকের ভোট রাখতেই হবে। জমি জিরেত আছে। পোধানমন্তী আবাসনের টাকাও নাকি ঢুকবে শিগগির। এদিকে আছে রেশন, আছে ইলেকটিকের বিল। এটা ওটা। দাদারা পড়েছে ফাঁপরে। একটা দিক ছাড়তে হয় যদি, লোসকান পোচুর।
২
ঠান্ডা আলমারির মধ্যে খাবারটা আঢাকা রেখেছে কে রে!
বৌদি হঠাৎ যেন মাথায় আগুনজ্বলা পাখির বাসা নিয়ে গ্যাটম্যাট করে অন্য ঘরে এল। খাবার ঘরের দোরে দাঁড়িয়ে শ্রীমতী ঝাড়ু নিয়ে দরজার কোণ ঝাড়ছিল। বৌদি রান্নাকরা মেয়ে মালতীকে আজ বাগে পেয়েছে।
শম্পার আজ আপসেট লাগছিল। ফ্রিজ খুলল একটা অন্য কাজ করতে। দেখল সারি সারি বাটিতে খাবার বসে আছে। বসে নেই শুধু, জুলজুল করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চাকরি করা মহিলার জীবনের সর্বময় সংকট এসে উপস্থিত হয়েছে। তার সামনে এত অর্ধভুক্ত খাবার কেন?
সে নিজে রাঁধে না। পাখির মত ঠুকরে খায়। রান্নার লোকের মাইনে উশুল করতে রান্নার ওপরে রান্না হয়। আগের দিনে, তার মা বা শাশুড়ির কমবয়সে, বাড়িতে হাজারটা লোক ছিল। খাবার পাতে পড়তে পেত না। খাবার রান্না হয়ে উড়ে যেত সব। আবার ভাত চাপাতে হত শেষ বেলায়, মরা আঁচে নতুন করে কাঠকয়লা গোঁজার দরকার পড়ত বাড়িতে অতিথ-বিতিথ এলে।
এখন রান্না হয়, ফ্রিজে ঢোকে। ফ্রিজ থেকে বেরোয় না, সাত দিন পর বাসি মড়ার মত মড়মড়ে আটার রুটি, ছাতা ধরা স্যান্ডূইচ বের হয়। কেন হবে এমন?
জীবনের ছোট রূপ যেন ওই ফ্রিজ। শম্পার মাথা জ্বলে যায়। ঢাকা না দেওয়া ফুলকপির তরকারি দেখে মনে হয়, ফুলকপির আত্মা উড়ে গেছে। পড়ে আছে জিরে হলুদ আদা মাখা একটা শবদেহ। সেই ভয়ানক দৃশ্য মনে পড়ে, সবাই ছুটছে, আর পাশে পড়ে আছে একটা মাছি ভনভন মৃতদেহ।
শম্পার প্রথম জীবনের চাকরি। হুগলির ধনেখালিতে বি ডি ও ছিল সে। একটা সরকারি জিপগাড়িতে চাপার অনুভূতিই আলাদা। নতুন চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা। হুগলি ডিস্ট্রিক্টের ডি এম আপিস চুঁচুড়া। সেইখানে সেই বিশাল বড় তাঁবু, ডেকরেটর্স ডেকে। বিয়েবাড়ির মরশুমে যেন প্যান্ডেল পড়েছে। ভাত ডাল লাবড়া চাটনি সঙ্গে এক টুকরো বড় মাছ। কেটারার ডি এম অফিসের স্টাফেদের দুবেলা খাওয়াচ্ছে। বিধানসভা ভোট আসছে। সামনের বছর ভোট। কিন্তু ছ মাস আগে থেকে চারিদিকে তো শুধু ওটারই কথা।
ততদিনে, সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত কাঁচা, হাঁ-করা মতন শম্পার কাছে ছবিটা পরিষ্কার হয়েছে অনেক। নিচের দিক থেকে উপরের দিকে তাকিয়ে ছবিটা দেখতে পারছে সে। ওপর থেকে নিচের দিকে দেখা নয়।
সে দেখছিল, তার চারিদিকের মানুষ উৎসাহে থরথর করে কাঁপছে। উত্তেজনা আর চূড়ান্ত অপেক্ষা, অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা। টানটান সব স্নায়ু। গলা ফাটানো চিৎকার। তখনো এতগুলো চ্যানেল এত রমরমা করে আসেনি। তবু, ২০১১ সালে, চ্যানেলে চ্যানেলে চাপান-উতোর, তরজা। বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে আছে সারা বাংলা, সারা ভারতও কৌতূহলে লক্ষ্য করছে, আসাম তামিলনাড়ু কেরলের চেয়েও, পশ্চিমবঙ্গে এবার কী হয় কী হয়।
আর গ্রামবাংলায় ঝরছে রক্ত। জেলায় জেলায়, কোণে কোণে শিবির বদলের তাড়া, এ শিবির থেকে ও শিবিরে ছুটে যাওয়া বুলেট, আক্রমণ। একের পর এক ঘটনা মিডিয়ার কাচের ভেতরে আসছে, ফেটে পড়ছে যেন। অশান্ত পশ্চিমবাংলা।
শম্পা কোথা থেকে কোথায় এসে গেছে। বুঝেছে, শম্পা আসলে মানুষ নয়, মেশিনারি। উল্টোদিকে মানুষ, শম্পারা তাদের সার্ভিস দিতে এসে নিজেদেরও খুশি করতে পারেনি। এত এত টাকা গড়িয়ে নামছে নানা রূপে। স্কিমের টাকা। স্কিম কী? একটা ম্যাজিক। একটা অধনের ধন? একটা পায়রা যা কালো জাদুকরের পকেট থেকে বের হয়ে, আবার পকেটে ঢুকে যাচ্ছে একদল মানুষের। কিন্তু তারাও তো গরিব মানুষ। যাদের এখন একটাই পরিচয়, 'আমাদের লোক'। এই যে, পার্টিতন্ত্র। শম্পা চিনতে পারছে।
তুমি কি আমাদের লোক? না তুমি ওদের? উঁহু, উঁহু, খুব খারাপ! ক্রমশ একই সমাজে, গরিবদের সমাজে, দুটো ক্লাস তৈরি হয়ে গেছে। একদল স্কিমের টাকা পায়, একদল পায় না। যারা রুলিংপার্টির সঙ্গে ছিল, তারা পেয়েছে। যারা অভাগা, রুলিংপার্টিকে খুশি করতে পারেনি, তারা পায়নি। আর কিছু লোক, বেমালুম মরেছে। জমি বেহাত হয়ে গেছে। রুজি চলে গেছে। ঠেলতে ঠেলতে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে সমাজের সীমানায়, আর রুখে দাঁড়ালে পরপারে।
এসব দেখতে দেখতে আবার কনফিউশন বেড়ে গেল। অফিসের ড্রাইভার বাদল, ও কাদের লোক? ও তো রোজ বলে, ম্যাডাম, পরিবর্তন কিন্তু চাই। গ্রুপ ডি, আনোয়ার। ও বলে, আমার হাতের জল খাচ্ছেন ব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে, দেশ বদলেছে কিনা আপনিই ভাবুন দিদি। বদল ভাল। আমরা বীরভূমের বিখ্যাত নামাজি পরিবারের ছেলে, আরবি ফারসি জানত বাপ ঠাকুদ্দা। আমার গ্রামের ইস্কুল হাই মাদ্রাসা হয়ে গেছে এখন, আর আমার ছেলে এখন ইংরিজি পড়ে। কলকাতা নিয়ে গেলাম সেদিন দিদি। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, চিতপুরের বড় মসজিদ সব দেখিয়েছি। দিদি, এসব শোর করে বদল হচ্ছে বটে, আসল বদল এই এখানে। বুকের পাঁজরায় হাত রাখে আনোয়ার। আমি চুপ থাকি। (??) ওর আনা লুচি তরকারি, কাটা শশা খাই।
হাতবদল, পরিবর্তন, হলেই কি সব সমস্যার অবসান হয়ে যাবে? তা কি সম্ভব? না কি কেবল পাশাটা উলটে যাবে? কেবল একদল মার খাবে আর অন্যদল এবার সবকিছু পেতে শুরু করবে? কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে তো সব মানুষ চেষ্টা করবে দলবদল করার। যারা এতদিন ও দলের পাল্লা ভারী করেছিল কিছু পাবার আশায়, তারা ও দলে যোগ দেবে। সেই লোকগুলোকে তো আর মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দেবে না কেউ। তারাই এবার পালটি খেয়ে আবার রস চুষবে।
সবকিছু ধূসর লাগে। কখনো ভাবেনি এটা নিয়ে, এসব নিয়ে। আগে, কম বয়সে, শম্পা টানটান একটাই পথ সামনে দেখত। পলিটিকাল সায়েন্সের ক্লাসে। সায়েন্স, পলিটিকাল কা। আচ্ছা রাষ্ট্রবিজ্ঞান কেন বলে? বিজ্ঞানটা কোনখানে? এবার সে বুঝতে পারছে যখন পশ্চিমবঙ্গের আঙিনায় এসে পথগুলো ঘেঁটে যাচ্ছে, গুলিয়ে যাচ্ছে। এই যে পার্টির সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গের শিরায় শিরায় বইছে। একবার যে গল্প শুরু হয়েছে বহুদিন আগে, তার শেষ কি সহজে হবে?
যখন ওর প্রোবেশন পিরিওড শেষ, বিডিও ধনেখালি হয়ে জিপে ঘুরছে আর ১৪৪ ধারা দেবার রেলা নিচ্ছে, ধনেখালির শাড়ি কেনাতে আড়তে নিয়ে যাচ্ছে কলেজের বন্ধুদের, প্রেম অল্প পাকছে, আবার টেঁশে যাচ্ছে, প্রেমের বা অপ্রেমের বিয়েটিয়ে হব হব করছে, সেই সময়ে সেই বিখ্যাত ভোট। মধ্যে মিউনিসিপাল ইলেকশন হয়ে গেছে, পরিবর্তনের হাওয়া সেখানেও ছিল।
এখন কিছুদিন শম্পাকে ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টারে থাকতে হবে। জেলার সার্কিট হাউজে থাকছিল। সকালে উঠে গঙ্গার ধারে ঘুরত, বাকি দিন টই টই, মাঝে মাঝে বাড়ি আসা।
প্রি রিভিশন শেষ হয়েছে ইলেকটোরাল রোলের। এবার সামারি রিভিশন শুরু হয়েছে। স্পেশাল সামারি রিভিশন অফ ফোটো ইলেকটোরাল রোল। শম্পাকে এসডিও সদর সুশোভন সরকারের সঙ্গে ট্যাগ করা হয়েছে। কয়েকটা ব্লক ভিজিট করতে হবে। ফিল্ড ভিজিট রিপোর্ট দিতে হবে। চুঁচুড়া, সপ্তগ্রাম, পাণ্ডুয়া, বলাগড়, ধনেখালির বিডিও অফিসের কাজ ওদের আওতায়। আপাতত বিডিও ধনেখালি ডি এম অফিসের সঙ্গে ট্যাগ করা।
বিশাল কর্মকাণ্ড। তালিকার প্রতিটি নামের খতিয়ান নেওয়া হবে। মানুষের জমা পড়া ক্লেম এবং অবজেকশনের ওপর হিয়ারিং ডেট দেওয়া হয়েছে। হিয়ারিং-গুলো বিডিও অফিসে হয় না। প্রথমত, ব্লকের অফিসে জায়গা নেই, তাছাড়া, সব গ্রাম থেকে মানুষ তো আর ব্লকে আসতে পারবে না হিয়ারিং করতে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে হিয়ারিং নিতে হবে, মানুষের আবাসস্থলের কাছাকাছি। ব্লকের মোটামুটি সব স্টাফ, এছাড়া পঞ্চায়েতের স্টাফ, হেলথ-এর স্টাফ। ল্যান্ড অ্যান্ড ল্যান্ড রিফর্ম অফিসের স্টাফ। লিটারেসির স্টাফ। ডেভেলপমেন্ট অফিসের স্টাফ। সবাইকে কাজ করতে হচ্ছে। যেতে হচ্ছে ভাগ ভাগ হয়ে, স্কুলগুলোতে, গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে। তাছাড়া বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন ইস্কুল শিক্ষকরা।
একটার পর একটা নির্বাচন হয়। কাগজে মিডিয়ায় ছয়লাপ হয়ে থাকে রাজনীতির কথা। আর এই জাল, ঠাশবুনোট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এই শম্পাদের শ্রম, যারা কাজ করে সারা বছর ধরে, শুধু সুষ্ঠুভাবে একটা নির্বাচন যাতে হতে পারে, তাদের কথা? এই নেটওয়ার্কের তুলনা নেই। তুলনা নেই কিছু কিছু মানুষের ডেডিকেশনের। কতজন জানে, বোঝে, কীভাবে বুনে তোলা হচ্ছে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে, ইলেকশন কমিশনের হাজার বায়নাক্কা সামলে, এই সুবিশাল ইলেকটোরাল রোল?
শম্পাই কি জানত? উল্টোন হাতের মত, বা নেবে যাওয়া শিকড়ের মত এত এত ডালপালা ছড়ানো কাণ্ডটার ওপর ওপর থেকে দেখেছিল আজন্ম। শম্পার ভেতরে এখন এই ভাংচুরের ছাপ। যত চেষ্টা করুক, দেখাগুলো না-দেখা করার উপায় নেই আর। এখন তো সমাজমাধ্যমে শুধু ভাল সালোয়ার কামিজ কেনার বিজ্ঞাপন আর শাশুড়ি বউমার রিল দেখে সময় কাটে।
অথচ চোখের সামনে শ্রীমতী মালতীরা আছে। একটা বালতির ওপর আরেকটা বালতি, একটা ফেভিকলের ডাব্বার ওপর আর একটা, এইভাবে বস্তির ঘরের বাইরে জল ধরে রেখে, লাইনের কলে জল ভরে ভরে যাদের সমস্ত জীবন কেটে গেছে। একটা পাঁচলিটারি জেরিক্যানের জন্য যাদের আত্মা ছটফট করে। এই বিপুল পরিমাণ মানুষ বাথরুমে ঢুকে জল ছিটিয়ে খেলা করতে পায় না। শম্পা জানে না, তার বাথরুমে তার ছেলেটার পটিতে বসে জেট স্প্রে দিয়ে খেলা করে দেওয়ালে দা ভিঞ্চি পেন্টিং করার আদৌ অধিকার আছে কিনা, আর শ্রীমতীর কাজ করতে করতে বাথরুম পেলে নিচে দারোয়ানদের বারোয়ারি বাথরুমে তাকে পাঠিয়ে দেওয়াটা কতখানি মানবিক।
শম্পা আজীবন এই বিশাল দেশের শরীরের ছোট ছোট শিরা উপশিরাগুলোকে যত দেখেছে, তত বিস্ময় লেগেছে। সত্যি, এ কোন পৃথিবী।
২০২৫ সালে আবার এস আই আর হচ্ছে। তবে অফিসে সিনিয়র হয়ে যাওয়া শম্পা এখন আর এ কাজে নেই। স্বাস্থ্য দপ্তরের ফাইলপত্রের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে সে। সেখানে আরেক রকম ঝামেলা। ঘাড় গুঁজে শুধু রিটায়ারমেন্টের জন্য অপেক্ষাই সেখানে সবটুকু এখন।
তবু, শ্রীমতীর হাঁকপাকানি দেখলে তার দুশ্চিন্তা বাড়ে। শুধু এস আই আরের ফর্ম ভরতেই, দেশে যাবে বলে ছ দিন ছুটি নিল বলে নয়। প্রতিবার ট্রেনে চেপে দেশে যাওয়ার পরও যাকে পঞ্চাশ টাকার টোটো ভাড়া করতে হয় নিজের বাড়িতে পৌঁছতে, অথচ সেটাকেই সে বাড়ি বলে মানে, সেই দুনৌকায় পা, শ্রীমতীর অসহায়তা দেখলে বুঝতে পারে সারাজীবনের কাজ শুধু পেনশন পাবার উপায়মাত্র হয়েই থাকল।
ওরে ও শ্রীমতী? দেশে বাড়ি বানিয়ে তোদের কোন কম্মোটা হবে রে?
কেন বৌদি? তখন আর কাজ করবুনি। শুধু পায়ের ওপর পা তুলে নিজের বাড়িতে থাকব।
দেশে গিয়ে থাকবি? কলকাতায় তো ঘরে তবু ক্যাশটুকু ঢোকে। ওখানে তো সেটা থাকবে না।
নিজের বাগানের ফসল খাব। গাধার খাটুনি খেটে তো জন্ম গেল। দাদারা বিয়েও দিতে পারল না। দাদাদের রান্না করে, আর বস্তিতে জল তুলেই জীবন অন্ত গো।
কিন্তু ওখানেও তো তাই-ই করবি! নাকি কলে জল আসবে ওখানে?
পুকুর আচে না? আর, দাদা বাড়ি বানাবে বটে, কিন্তু আমাকেই নিকে দেবে বলেচে।
বি ডি ও অফিসে কাকে যেন টাকা খাইয়েছিল শ্রীমতী। আবাস যোজনার টাকা পাবে বলে। বি ডি ও-দের টিকি ধরে নেড়েও কোন হদিশ করতে পারেনি শম্পা। বেয়ালা অফিস কী, সেটা বুঝতে জান কয়লা। পরে বুঝল শ্রীমতীর দাদার বেয়ালা অফিস থেকে জমির নথি বের করার রহস্য। ব্লক লেভেল ল্যান্ড অ্যান্ড ল্যান্ড রেকর্ডস অফিস, বি এল এল আর ও সংক্ষেপে। সেইটাতেই গিয়ে লটকে গেল শ্রীমতীদের আবাসের কেস।
যার জমির হদিশ নেই সে বাড়ির টাকা পাবে কীভাবে?
৩
ওই যে বাজারের এক প্রান্তে বসেছে শচিন। ওই যে পুরনো খবর কাগজ দিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। ল্যাম্প পোস্টে হ্যালান দিয়ে। ও নিয়ে বসেছে পচা দাগি সবজি। গোটা ছ-সাত জলে ডোবা ছোট ফুলকপি, কালো হয়ে যাওয়া। কিলো দুই ঝিঙে, মধ্যে মধ্যে সাদা ফ্যাকশা মেরে যাওয়া। ভেতরে পচ ধরেছে।
শচিনকে এখানে সবাই চেনে। গায়ে-গতরে খেটে খেটে মা-টা তার বুড়িয়ে গেল। সেই মায়ের কাছে জোর করে টাকা ছিনিয়ে লাটের বাট ছেলে, হৈ হৈ করে পাড়ায় কালীপুজোর প্যান্ডেল বেঁধে ফেলেছিল। এক রাতে একটা গোটা পুজোর ব্যবস্থা করে ফেলেছিল সে নিজের নামে সে বছর। পরে পুজোটা ছিনতাই হয়ে গেল পার্টির দাদাদের কেলাবের চক্করে সে আলাদা কথা। শচিন নেশাখোর, পাজি, দাগি ছেলে। খালি হুজ্জুত আর বাওয়ালি করবে। অথচ শচিনই, নেশা করে বলে, নেশা ছাড়াতে একবার মা তাকে গোপন ওষুধ দিয়েছিল বলে, এক্কেবারে মরো মরো হয়েছিল একবার।
সেই থেকে মা তাকে যা খুশি করতে দেয়। এখন শচিন ভাল হবে বলে সবচেয়ে দূরে গিয়ে সবচেয়ে পচা ভুসিমাল এনে বসে পড়েছে বাজারের এক কোণে। মাছি ভনভন করছে ওর সব্জিতে, আর শচিনের মুখের চারপাশেও। শুকনো নেশা করা শচিনের ভুরুক্ষেপ নেই কোন।
হে হে তোর তো ঝিঙেগুলোর জান উড়ে গেছে বাপ। চিচিংগেগুলোর পরানপাখি ভোকাট্টা। এখন পড়ে আছে ঝিঙেচিচিঙ্গের মড়া গলা লাশগুলো।
বৌদির সকালে বলা কথাটা শ্রীমতীর মাথায় গেঁথে আছে আসলে। বেশ মনে ধরেছে কথাটা। কিন্তু এখন তো তার নিজেরই প্রাণপাখি উড়ুউড়ু। তার যে একজনকে চাই! কোথায় সে। সকালে এক ঝলক দেখেই তো...
শ্রীমতীর চোখ এখন বটতলার ভিড়ে হরিকে খুঁজছে। কী ভেবেছিলেন? হরি তার প্রেমিক?
দু জায়গায় দুটো নির্বাচকতালিকায় নাম আছে শ্রীমতী আর তার দাদাদের। সেই সমস্যার সমাধান তো হরিই করে দিতে পারে।
সেবার আবার যোজনার টাকা পাইয়ে দেবে বলে হরি শ্রীমতীকে কতদূরে নিয়ে গিয়েছিল। মনে নেই? সেই যে, যমুনা নদীর পাড়ে, তমালতলে, শ্রীমতী দাঁড়িয়েছিল?
বি ডি ও অফিসে এঁকড়িবেঁকড়ি শুঁড় আছে হরির। কী যেন সব যোগাযোগ। ও বলে পহুঁচ। পাকড়। কী আশ্চর্য, কলকাতায় থাকে, এই বাজারেই আড্ডা দেয়, আবার শ্রীমতীদের বিষ্ণুপুরের বিডিও অফিসেও তার ধরাকরা! এমন বিস্ময়েই সেবার শ্রীমতী হরির খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল যে!
হরি সেবার পনেরো হাজার টাকা নিয়ে শ্রীমতীর দাদার নামে কাগজ করিয়ে দিয়েছিল। সোয়া লাখ টাকা পেলে আরো নিত হরি। কিন্তু এখন ও বলে বি ডি ও আপিসের জাঁতাকলে সেই কাগজ আটকে আছে। পুরো নিরাশ করেনি। তবে মধ্যিখানে নিজেই ভোঁ-ভাঁ হয়ে গেল যে। কোথায় গেসল যেন। তেলেঙ্গানার লঙ্কার খেতে লেবারের কাজে।
হরিকে চোখ দিয়ে খুঁজতে খুঁজতে শ্রীমতী টের পেল, তার বুকের মধ্যের উথালপাথাল আসলে না বিয়ে হওয়া, শুকিয়ে আসা তার কাজ করে করে হেজে যাওয়া শরীরকে শবদেহ থেকে অল্প অল্প করে প্রাণ দিচ্ছে। বেঁচে থাকার উপকরণ...