



৮
ষষ্ঠী কোনো কথাই শুনল না। সে একটি ঘর অপ্সরার জন্য খুলে দিল। ঘরে ঢুকে অপ্সরা দেখলে, আলো-বাতাস ভালোই আছে। ঘরটাও বড়। তবে যেহেতু কেউ বাস করে না, তাই একটু স্যাঁতস্যাঁতে। কদিন বসবাস করলে এই গন্ধটা চলে যাবে। সে শাড়ি বদলে নিল। একটা লাল পাড়ের শাড়ি। মধ্যে লাল-নীল ফুল। একটু চন্দন পাওয়া যায় না? গায়ে মেখে নিলে বেশ হত। তাহলে শাড়ির পুরাতন ড্যাম্প গন্ধটা চলে যেত আবার মনের মধ্যে ভক্তিভাব জাগত। আচ্ছা, সে কি পারবে? সত্যি কি ঈশ্বর তার কাছে আসবেন? সে কি একদিন হয়ে উঠবে কৃষ্ণ-অনুগতপ্রাণা?
তারপরে মাসি বেরিয়ে গেলে দোর দিল অপ্সরা। মুহূর্তে বাড়িটা নীরব হয়ে গেল। অপ্সরা দুয়ারে চুপ করে বসে রইল। দিন ঘনিয়ে আসছে, আলো চলে গিয়ে নেমে আসছে অন্ধকার। মাথার উপর দিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘ ভেসে চলেছে। উঠোনের গাছে কিছু পাখি ঝুপ মেরে বসে আছে, আলো মাপছে; হয়ত বা জীবন। অথবা হিসেব রাখছে পাপ-পুণ্যের। ধেনু নিয়ে ঘরে ফিরে চলেছে গোঠের রাখাল।
সে গেল ঠাকুরঘরে। সেখানে সিংহাসনের উপরে দণ্ডায়মান তিনি। কী অপরূপ লাগছে মূর্তিটি! সামনে একটা প্রদীপ জ্বলছে। মাটির পিদিমে অনেকটা করে তেল দেওয়া আছে। আচ্ছা, এটা কি সারাক্ষণই জ্বলে?
ঘরের মধ্যে, মাটিতে সে বসে পড়ল। ঠাকুরের পিছন দিকে একটা জানালা ছিল। সেটা এখনও আছে। তবে আজকে আর খোলা হয় না। জানালার পাল্লা দেখেই মালুম হল তার।
জোড়হাতে সে মনে মনে বলল, আমার পাপ কি খণ্ডন হবে ঠাকুর?
বলল বটে, তবে সে যা করেছে তা যে পাপ, এটা সে মানতে পারল না। মন সায় দিচ্ছে না। কেন? কিন্তু কোথাও একটা বাঁধছে তার। দেহকে সরিয়ে রেখে ধর্ম হয়? যেমন হয় না পেটকে সরিয়ে রেখে। আগে পেট, পরে ধর্ম। তেমনি পেটের পরেই আসে দেহ। দেহসুখ মিটলে তবেই মনে পড়ে ঈশ্বরকে। তার এতদিনের আচরণে কোথাও গিয়ে ঠেকছে। এখন পাপ শব্দটি ছাড়া তার কাছে আর কোনো শব্দ নেই যে মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।
পাপ।
সত্যি কি সে পাপী? এমন হলে, এই পৃথিবীতে পাপীর সংখ্যা কত? সকল পাপীরাই কি ভগবানের ভজনা করে? পাপ খণ্ডন করতে হলে এই ছাড়া আর কি কোনো পথ নেই? মনে-মনে খণ্ডন করা যায় না তা?
আবার মনে পড়ল সোহাগির সেই কথা। তোর হবে। তোর মধ্যে পদার্থ আছে। তোর মন আছে। দেহের রঙ আছে। শরীর আছে। কৃষ্ণ রূপের পূজারী। তুই পাবি। সেই ছেলেবেলা বা কিশোরী বয়সের প্রথম দিকের কথাগুলো কি এমনি ছিল? সত্যি যদি তার কিছু হবার থাকত তাহলে এতদিন পরে, জীবনের প্রায় সত্তরভাগ কাটিয়ে দেবার পরে সে কেন ঈশ্বর ভজনায় নামবে? কী হবার জন্যে? কী পাবার নিমিত্তে?
এই ঘরে ওই ঘরে একসময় কত ছুটোছুটি করে খেলেছে সে, তখন মামাবাড়িতে কত খেলার সাথী ছিল। এই বাড়িতেও ছিল। ধীরে ধীরে মামি একা হয়ে যাচ্ছিল, তবুও কিছু ছিল। আনন্দ, হুল্লোড়। তাছাড়া এপাড়া-ওপাড়া থেকেও অনেকে খেলতে আসত। তারা এইভাবে দলবেঁধে খেলতে খেলতে চলে আসত এখানে, এই বাড়িতে। সকলে চলে গেলেও মাঝে মাঝে রয়ে যেত অপ্সরা। সোহাগির পাশে বসে গায়ের চন্দন-গন্ধ নিত। সোহাগি একগাল হেসে বলত, তোর হবে।
কী হবে মাসি?
নে, নাড়ু খা।
আবার কোনোদিন তিলের খাজা। কোনোদিন দানাদার, গুজিয়া, সন্দেশ।
কী হবে আমার, বললে না যে?
হবে হবে, এখন খা।
বেশ। বলে হাসে অপ্সরা। সে হাসলে তার গালে টোল পড়ে। দেহে হিল্লোল খেলে সেই কবে থেকে। এটা জানে অপ্সরা। আরও জানে, এই হিল্লোলে এই হাসিতে পুরুষেরা মুগ্ধ হয়। কম পুরুষ তার দেহের সৌষ্ঠবে কাত হয়নি। এখনও হয়ে চলেছে। সে একবার তাকালে এখনও দশজন পুরুষ তার দুয়ারে এসে লাইন দেবে। কিন্তু আর সে ওপথে চলতে চায় না। তার মেয়ে তাকে দেখে ফিরে গেছে। অপ্সরা বোঝে মেয়ে তাকে ঘেন্না করে। মেয়ে চায় তার মৃত্যু হোক। অপ্সরা মাঝে মাঝে ভাবে, তার মেয়ে কি কিছুই জানত না? কিছুই বুঝতে পারেনি তাকে কীভাবে মানুষ করল? একজন ছাপোষা বিধবা অপ্সরা, স্বামী মারা যাবার সময় কিছুই রেখে যেতে পারেনি, যাওয়া সম্ভবও ছিল না; কিছু জমিজমা আর সাধারণ একটা কাজ করত তার স্বামী রতনলাল। মানুষ হিসেবে ভালো ছিল বটে, কিন্তু তার আর কিছুই ছিল না। না ছিল বিদ্যে না ছিল বুদ্ধি। কেবল হা-হা করে হাসত আর যা যা কাজ পেত করত। নিজস্বতা কিছু ছিল না। ফলে অপ্সরা যখন তাকে বলল, ‘চলো আমরা পালাই, নইলে বাড়ি থেকে আমাদের বিয়ে দেবে না’ তখন সে একবারও পাল্টা কিছু বলেনি বা প্রশ্ন করেনি। বিনাবাক্যব্যয়ে সে অপ্সরার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিল, বিয়ে করেছিল মন্দিরে। অপ্সরা তাকে পরে বলেছে, আমি বললুম আর তুমিও অমনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলে? এমন করলে কেন? রতনলাল বলেছিল, পাছে তোমাকে হারিয়ে ফেলি, সেইজন্যে।
বাজারে অপ্সরার নামে বদনাম ছিল সেই তখন থেকেই। তার যখন তেরো বছর বয়স তখন পনেরো বছরের একটি ছেলের সঙ্গে সে সম্পর্কে জড়ায়। এক বছর পরে সেই সম্পর্ক কেটে গেলে আবার একজনের সঙ্গে। এইভাবে তিনটি ঘাট পেরিয়ে, একটি ঘাটের জল খেয়ে সে হাতে পায় রতনলালকে। কুমোরদের ছেলে রতনলাল। আর তারা জাতে নিচু। ফলে বাড়ি থেকে বিয়ে হবার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই হয়। রতনলালকে হাতে পেয়ে অপ্সরা বুঝেছিল, একেই বিয়েটা করতে হবে। কারণ বাজারে তার নামে যা বদনাম ছড়িয়েছে, দেখাশোনা করে বিয়ে হবার সম্ভাবনা কম। বিয়েতে ভাংচি দেবার লোকের অভাব নেই। পাড়ার লোক আছে, কুরূপা মেয়ে-বউরা আছে, যারা তাকে, তার রূপ ও চালচলনকে হিংসে করে; সর্বোপরি আছে ক্লাবের ছেলেরা। সেখানে এমন কোনো ছেলে নেই যে তাকে কামনা করেনি। সুতরাং, সব দিক দিয়ে রতনলালই ঠিকঠাক। ঝামেলাহীন। তার কথায় উঠবে-বসবে। তাই সবদিক দিয়ে হিসেব করে সে প্যাঁচ কষে রতনলালকে নিয়ে পালাবার। ফলে মাধ্যমিক আর দেওয়া হয়নি তার।
ওদিকে রতনলাল ক্লাস সেভেনের পরে আর পড়েনি। জাতে কুমোর হলেও ওদের পরিবারে কুমোরের কাজ কিছু হয় না, আজকাল আর কজনই বা তাদের জাত-ব্যবসা ধরে রেখেছে। রতনদের মুদিখানার দোকান। রতনের দোকান ভালো লাগে না, সে ব্যবসার কাজ করে। সাইকেলে মাল টেনে টেনে দোকানে দোকানে সাপ্লাই দেয়।
বিয়ের পরে অপ্সরাও বসে ছিল না। ওদিকে টিপের কাজ হয়। সে অর্ডার নিয়ে কাজ করত, মাল দিতে-নিতে যেত। এই করতে করতে এক টিপ-মালিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। ততদিনে তার মেয়ে জন্মে গেছে, মেয়ের বয়স তখন ছিল তিন বছর।
তারপরে সাংসারিক বিবাদের কারণে রতনলালকে নিয়ে সে আলাদা হয়ে যায়। রতনলালরা তিন ভাই। রতনলাল, যতনলাল আর মণিলাল। বাকি ভাইরা যেমন করিৎকর্মা তেমনি চালাকচতুর। তারা নানাভাবে রতনলালকে ফাঁকি দিচ্ছিল। মেয়ে হবার পরে অপ্সরা দেখল এভাবে চলতে পারে না। একটা কিছু ব্যবস্থা না করলে তার মেয়ে বিপদে পড়ে যাবে। তখন না পারবে মেয়ের বিয়ে দিতে না পারবে তাকে মানুষ করতে। সেইসব হিসেব করে শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তির তিনভাগের একভাগ সে বুঝে নিয়ে ভিটের দাবি ছেড়ে দেয়। জনাই থেকে সে চলে আসে চণ্ডীতলায়। এখানেই একটা ঘর গড়ে বাস করতে থাকে।
জনাইয়ে সবার মাঝে যে অসুবিধেটুকু ছিল, এখানে এসে তা দূর হয়ে যায়। দু একজনের সঙ্গে তার স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রতনলাল রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেলে এরাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল টাকা-পয়সা দিয়ে। বদলে তাকে শরীর দিতে হত। সেটা কিছুই নয় অপ্সরার কাছে। শরীরের জ্বালা তার বেশি। অন্যদের চেয়ে অনেকটাই বেশি। শরীর সে বিয়ের আগে থেকেই দিয়ে আসছে। আগে দিত আনন্দ পাবে বলে। বিয়ের পরে সে যতজনকে দিয়েছে তা কেবল আনন্দের জন্য নয়, টাকা ইনকামের জন্যেও। একই সঙ্গে দুই কাজ। ফলে রতনলাল মারা গেলেও অপ্সরার কোনো অসুবিধে হল না। সে জানে তার রূপ, যৌবন, শরীর যতদিন থাকবে ততদিন তাকে না খেয়ে মরতে হবে না। লোকের চোখের সামনে একটা হাতের কাজের ‘খুড়োর কল’ সে ঝুলিয়ে রাখল। কখনও টিপ তৈরি, কখনও লকেট বানানো আবার কোনো সময় সেলাই মেসিনে বালিসের ওয়াড় তৈরির কাজ।
এমনি করেই দিন চলছিল তার। রসেবশেই ছিল সে। তাল কাটল মেয়ের বিয়ের পরে। একদিন মেয়ে কোনো খবর না দিয়ে জামাইকে নিয়ে এসে বাড়িতে হাজির। অপ্সরা তার পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে ঘরের মধ্যে আপত্তিজনক অবস্থায় ধরা পড়ে। সেই থেকে মেয়ে তার মায়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। অপ্সরা তাকে অনেকবার বুঝিয়েছে, যা তুই দেখেছিস ওসব তোর মনের ভুল। অমন কিছুই হয়নি। আর যার সঙ্গে তুই আমাকে দেখেছিস, সে তোর মানবকাকা, ছোট থেকেই তাকে তুই চিনিস। আমাদের বিপদে কত রকমভাবে যে পাশে দাঁড়িয়েছে তার ঠিক নেই। তোর বিয়েতেও দশ-বিশ হাজার টাকা দিয়েছে। শুনে মেয়ে বলেছে, ওই জন্যেই তো সন্দেহ হয়। কেন দিয়েছিল টাকা? তুমি কেন নিয়েছিলে? যদি নিয়েছিলে তুমি কি শোধ দিয়েছিলে? দাওনি। তাহলে? তুমি কি বেশ্যার কাজ করে আমাকে বড় করেছ মা?
সেদিন মেয়ের সঙ্গে আর কোনো কথা বলতে পারেনি অপ্সরা।
৯
অপ্সরা উঠে পড়ল। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। সে ঘুরে ঘুরে ঠাকুরের ঘরখানা দেখতে লাগল। ওদিকে একটা কুলুঙ্গি ছিল না? সেখানে ধর্মীয় বইসব রাখা থাকত। কাছে গিয়ে সে দেখে, হ্যাঁ, তেমনি রাখা আছে অনেকগুলি বই। অনেকদিন সেখানটা ঝাড়পোঁছ হয়নি বলে ঝুল, ধুলো, কালি ও অবহেলায় মাখামাখি হয়ে আছে। বইয়ের পাশে রাখা আছে সেই কবেকার কয়েকটি না-ব্যবহৃত হওয়া কলমও। সেখান থেকে একটা বই টেনে নিল সে। দেখল ভগবতগীতা। পাতা মলিন, বইয়ের মলাট ছিন্ন। বইও জীর্ণ। যাইহোক, যে কয়টি দিন সে এখানে থাকবে এই ধর্মীয় বই তাকে সঙ্গ দেবে।
তারপরে পরপর এ দেখে গেল। (??) মোটা গীতা ছাড়াও একটি পাতলা গীতা রয়েছে। আছে একটি ভাগবত। ছন্দে লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারত। আর সবশেষে রয়েছে একটি চটি খাতা, ধুলো মাখা ও ছেঁড়া। পাতা উল্টে একটি কবিতার মুখোমুখি হল সে। কবিতাটা হল-
একলি যাইতে যমুনার ঘাটে।
পদচিহ্ন মোর দেখিয়া বাটে।।
প্রতি পদচিহ্ন চুম্বয়ে কান।
তা দেখি আকুল বিকল প্রাণ।।
লোকে দেখিলে কি বলিবে মোরে।
নাসা পরশিয়া রহিনু দূরে।।
হাসি হাসি পিয়া মিলল (??মিলিল?) পাশ।
তা দেখি কাঁপয়ে গোবিন্দদাস।।
সোহাগির এই বাড়িখানা সেসময়ে কী প্রকাণ্ডই না লাগত। একতলা বাড়ি, পর পর তিনখানা ঘর, খানিকটা ইস্কুলবাড়ির মতন। আগের দিনের বাড়ি, গ্রামের দিকে সব এরকম। একধারে মাটির ঘরও আছে একটা। মাথায় টিন চাপানো। বাড়িতে তখন একটা মরাই ছিল, মনে পড়ছে তার। এখন অবশ্য সেসব নেই। ফলে উঠোনের পরিসর বেড়েছে। উঠোনের একদিকে আছে একটি তুলসী মণ্ডপ। তখন কি রমরমা ছিল এই বাড়ি।
সোহাগির তিন ছেলে দুই মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে একজনের বিয়ে তখনও হয়নি, যতদূর মনে পড়ে অপ্সরার। মেয়েরা ও বাকি ছেলেরা ছিল বিবাহিত। দু একটি বাচ্চাও ছিল। তখন থেকেই সোহাগিকে বিধবা দেখছে অপ্সরা। বাড়ি সব সময় গমগম করলেও কোথাও একটা শূন্যতা ছিল তখন, যা এখনও আছে। শূন্যতা দুটি কারণে হয়। মৃত্যুর অপেক্ষায় কেউ থাকলে বা ভগবান কারও জন্যে অপেক্ষা করলে। সোহাগির সেই সময়ের জীবনটা ছিল ঠাকুরঘরের মধ্যে থাকা রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তিকে ঘিরে। আর এই মূর্তি সোহাগিদের বাড়িতে কী করে এল, সেটার একটা ইতিহাস আছে। সেই হিসেবে অনেকেই বলে থাকে, তখন বলত আর কি, যে ঈশ্বর নিজের ইচ্ছেতেই সোহাগিদের বাড়িতে এসেছে। সত্যিকারের সেই কাহিনিটি ছিল এইরকম—
আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগের কথা। এখন যেমন প্রায় সবার পাকাবাড়ি তখন চারিদিকে যেমন মাটির বা খড়ের, বাখারির ঘর-দুয়ার, এই বাড়িটিও তেমনি ছিল। একদিন বিকেলে রাধাকৃষ্ণের এই মূর্তিটি বাড়ির চৌকাঠে নামিয়ে গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে কে একজন হাঁক দেয়, কেউ আছো? বাড়ির ভেতর থেকে লোক বেরিয়ে এলে সে জল খেতে চায়। দেখে এক অসাধারণ মূর্তি নিয়ে একটি বেঁটে লোক, মালকোঁচা মারা ধুতি পরনে, খালি গা। ঘর্মাক্ত; গামছা দিয়ে গা মুছছে। বাড়ির লোক তার জন্যে জল-বাতাসা আনতে গেল আর সে মূর্তি ছুঁয়ে বাইরে বসে রইল। যখন জল নিয়ে বাড়ির লোক ফেরে দেখে ঠাকুর আছে কিন্তু সেই লোকটি নেই। কোথায় গেল কোথায় গেল, খোঁজ খোঁজ—কিন্তু তার দেখা মিলল না। এদিকে সন্ধে গড়িয়ে গেল। ঠাকুরের সামনে একজন প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে গেল। তারপরে রাত হল। গ্রামের সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে রেখে গেছে ঠাকুরের মূর্তি সে আর আসবে না। এলে এতক্ষণে এসে যেত। তা যখন আসেনি ধরে নাও ঠাকুরের ইচ্ছে তোমাদের ভিটেতেই তিনি অবস্থান করবেন, পুজো নেবেন।
তবুও প্রশ্ন উঠল, যদি রাত পোহালে ফিরে আসে?
জবাব হল, এইভাবে একস্থান থেকে মূর্তি অন্যস্থানে ফেলে রেখে রাত পোহানোর পরে আর তুলে নিয়ে যাওয়া যায় না। ঠাকুর যেখানে অবস্থান করবেন সেখানেই পূজা পাবেন। যদি কেউ নিয়ে আসে তখন দেখা যাবে।
না। মূর্তির দাবি তুলে কেউ আসেনি। ফলে সেটি রয়ে যায় এই রায় বাড়িতেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পূজা পেতে থাকে।
বাড়িখানা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ কথা বলছে না, কেবল বয়ে চলেছে সময়। যে সময় বহিয়া যায় তা আর ফিরে আসে না। সে জীবন চলে যায় তা গেলই, তার খোঁজ আর কেউ পায় না। জীবনের মতন ঈশ্বরও হয়ত চলমান। তিনি চলেছেন ভক্তের সঙ্গে সঙ্গে।
অনেক কিছু মনে পড়ছিল অপ্সরার। মামাবাড়ির সেইসব দিনের কথা, এখানে কাটানো সময়ের কথা। এই বাড়ি আজও তেমনি আছে, কেবল মানুষগুলো নেই। সোহাগি, তার ছেলেপুলে, বাড়ির অন্যান্য লোকজন, কাজের লোক, সব নিয়ে সারাবাড়ি যেন গমগম করত। এখন সব ফাঁকা, শূন্য। একা শ্রীকৃষ্ণ গোটা এই গৃহ আগলে বসে আছেন। কোথাও কি বাঁশি বেজে উঠল?
সে উঠে দাঁড়াল। না। মনের ভুল। অমনি হয়। একাকী একটা নিঝুম, পুরানো দিনের বাড়িতে হঠাৎ এসে পড়লে এই হয়। ও কিছু নয়। সে ঠাকুরঘরে ঢুকল। অতি সুন্দর, রাধাকৃষ্ণের সেই যুগলমূর্তি স্থাপিত কবেকার সেই পাথরের সিংহাসনের উপর। দিনের অল্প আলোয় সেদিকে তাকিয়ে তার মনে হল শ্রীকৃষ্ণ তার দিকে অবাক নয়নে তাকিয়ে রয়েছেন। সে-যে এখানে আসবে, অবশেষে এসেই পড়বে, তা যেন ভগবান এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। অপ্সরা গলবস্ত্র হয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। মলিন হয়েছে লাল রঙের মেঝে। তবুও ভগবানের কারণে কোথাও কোথাও উজ্জ্বলতা হ্রাস পায়নি। অপ্সরা নিজেরই অজান্তে জোড়হাতে মনে মনে বলতে থাকল—হে ভগবান, আমি যে কীভাবে এই পাপসমুদ্রে পতিত হয়েছি তা নিজেও জানি না। এখান থেকে উদ্ধারের কারণও আমার কাছে অজানা। তুমি আমাকে রক্ষা করো, হে প্রভু।
কতক্ষণ সেখানে বসেছিল খেয়াল নেই। তারপরে একসময় বাইরে এল। গোটা বাড়িটা এই অবসরে পূর্ণ চোখ মেলে দেখল সে। বাড়িটাকে সেদিনের সেই সোহাগির মতই একাকী বলে মনে হল তার। তবুও এই বাড়ি ঈশ্বরময়।
ষষ্ঠী আর একা এই বয়সে কত পরিষ্কার করবে, তাই স্থানে স্থানে মলিনতা লেগে আছে। যখন ছেলেবেলায় আসত সোহাগি মামির মধ্যে একটা উদাসীনতা দেখা দিত। একটা স্নিগ্ধতা ছিল মাসির কথাবার্তায়, চাহনিতে। সবই যেন এখন এই বাড়িটিকে ঘিরে ধরেছে। খুব নিঃশব্দ এক পরিবেশ, বাইরে কেউ হয়ত কিছু কথা বলছে, কিন্তু চাইলে তুমি তা এড়িয়ে যেতে পারো। তুমি ডুবে যেতে পারো এই নিঃসীম একাকীত্বে। অথবা সেটি এক অনির্দেশ্য আলো। তখন মামির সঙ্গে যা-যা কথা হত, এতদিন পরে সেসব হুবহু যেন মনে পড়ে যেতে থাকল তার। সে চুপ করে, মায়াবী এই পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে সেদিনের সেই দৃশ্য যেন আবার নিজের চোখের সামনে রচিত হতে দেখল। কোথাও যেন একঝাঁক ময়ূর ডেকে উঠল। তার মনে পড়ছিল সোহাগির কথা। সোহাগির সঙ্গে তাঁর সেই কথোপকথন, যা স্রোত হয়ে বয়ে চলেছে এই বাড়ির দ্বারপ্রান্ত দিয়ে।
১০
কৃষ্ণ ঠাকুর তো ধেনু নিয়ে পথে পথেই ঘোরে, তাই না মামি? রাখাল তো অমনিই হয়।
সোহাগি বলেন, ঠিক। তুই জানলি কী করে?
তোমাদের গ্রামেই আমি এমনি অনেক বালক দেখেছি। গরু চরাতে যায়।
তা বটে!
তবে তাদের হাতে বাঁশি থাকে না।
হ্যাঁ।
কৃষ্ণের হাতে থাকে।
ঠিক।
কৃষ্ণ ভগবান কিনা, তাই। তুমি মন্দিরে যাও না?
মন্দিরে-মন্দিরে? হ্যাঁ। যাই।
মন্দিরে ঠাকুরের দেখা পাও, না পথেই পাও?
পথেই তাঁকে দেখা যায়।
মন্দিরে তাঁকে দেখা যায় না কেন?
বসে থাকতে থাকতেই সন্ধেটা যেন খুব দ্রুত নেমে এল। একটা সাধারণ পোশাক পরেছে অপ্সরা। কিন্তু এই অস্তগামী আলোয়, নেমে আসা অন্ধকারেও তাকে যে কী অপূর্ব লাগছে তা যে না দেখেছে তাকে বলে বোঝানো যাবে না। মনে হবে, কৃষ্ণ মথুরায় চলে যাবার পরে যেন শ্রীরাধিকা একাকী, উদাসী, আনমনা হয়ে বসে আছে। হাতে দু’-একটি চুড়ির গুচ্ছ, কানে সামান্য দুল। গলায় সরু একটি হার। এগুলি সবই সোনার আর কোনটাই তার নিজের কেনা বা বানানো নয়। উপহার পেয়েছে সে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেমিকেরা তাকে উপহার দিয়েছে। তার প্রেমিকের সংখ্যা কম ছিল না। কি বিয়ের আগে কি বিয়ের পরে। গ্রামের নিন্দুকেরা বলে, তার এই প্রেমিকামনের চক্করে পড়েই তার ভালোমানুষ স্বামী বেঘোরে মারা গেল রোড এক্সিডেন্টে। এর জন্য সে যে কীভাবে দায়ী তা আজও বুঝে উঠতে পারে না সে। তবে এটা ঠিক, তার স্বামী খুব সাদামাটা আর ভোলেভালা লোক ছিল। দেখতেও ছিল অতি সাধারণ।
আজ মনে মনে সে বলছে, সোহাগিমামি ছেলেবেলায় ধুলোর কথা অনেকবার তোমার মুখে শুনেছি! তখন ভাবতাম এমনি ধুলোর কথা বলছ, রাস্তার ধুলো। এখন বুঝি, ব্যাপারটা আসলে তা নয়। এ ধুলো সে ধুলো নয়। এ ধুলোর মানে অন্য। তুমি তখন ধুলো বলতে কী বলতে চাইতে একটু বুঝিয়ে বলবে?
তিনি আনন্দম্।
আর ধূলি?
সে তো মধুর! আহা।
মধুর কেন?
ধূলি উড়িয়ে ধেনু ফেরে আপন গোঠে।
তার পরে?
তার পর আর কী? আমার জীবনের রাখাল আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে গোষ্ঠে।
ষষ্ঠী বলে গেছিল, সন্ধে হলে আসব আমি, রোজকার মতন। শ্রীকৃষ্ণকে প্রদীপ দেখিয়ে যাব। অপ্সরা বলেছিল, এসো, একসঙ্গে চা খাব।
সময়মত ষষ্ঠী এসে গেল। বা বলা ভালো, সময়ের চেয়ে আগেই এসে গেল সে। হয়ত চায়ের টানে। চায়ের টানকে কোন বাঙালি আর অস্বীকার করতে পেরেছে। আর তার সঙ্গে এল একজন। ঘরে ঢুকেই একগাল হাসি নিয়ে অপ্সরার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, কিরে অপু, চিনতে পারিস?
আলো-আঁধারিতে চিনতে সময় লাগল অপ্সরার। মাথার মধ্যে থেকে নির্জনতাকে বের করে দিয়ে অপ্সরা বলল, আনন্দী?
হ্যাঁ। মনে রেখেছিস তাহলে। বলে সে খুশি হল। হাসল। বলল, অনেকদিন পরে তোকে দেখলাম। খুব ভালো লাগছে। ষষ্ঠীপিসির কাছে খবরটা পেয়েই দেখা করব বলে ছুটে এসেছি।
ভালো করেছিস। এখন দুই বন্ধু মিলে চা খাব আর গল্প করব।
ষষ্ঠী চা করতে চলে গেল। অপ্সরা মুড়ি মাখল চানাচুর দিয়ে। ষষ্ঠী চা বানিয়ে নিয়ে এলে তার দিকে এক বাটি বাড়িয়ে দিল। দেখল, ষষ্ঠী মাসির মুখ চকচক করছে আনন্দে। বললে, মাসি খাও।
খাব?
হ্যাঁ। সব তোমার। খেতে খেতে আমরা অনেক গল্প করব।
আমি তো গল্প কিছু জানি নে অপু।
ভগবানের কথা বলবে। তুমি বলবে আমি শুনব। এটাই তো গল্প মাসি। কিরে নিরু?
নিরু বলল, তা বটে। ভগবান যেমন সত্য তিনি আবার গল্পও।
ঠিকই।
চা খাওয়া শেষ হলে ষষ্ঠী বলল, তুই কোনও চিন্তা করিস না অপ্সরা, তুই এখানেই থাকবি, দাদাবাবুর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে।
কথা হয়ে গেছে মানে! তুমি ফোন চালাতে পারো?
পারি তো। আজকালকার দিনে ওসব না চালাতে জানলে হবে? বলে সে আঁচলের খুঁটে বেঁধে রাখা ফোনখানা দেখাল। ছোট্ট এতটুকু ফোন। বোতাম টেপা। আগের দিনের ফোন এমনি ছিল। ষষ্ঠী বলল, আমি ফোন এলে ধরতে পারি, কিন্তুক বোতাম টিপে করতে পারি না। কাউকে বললে সে নাম্বার লাগ্গে দেয়। তেমনি করেই দাদাবাবুর সঙ্গে কথা বলি। তোমার কথা বলি। তুমি এসেছে শুনে খুব খুশি হয়েছে। বলেছে যতদিন ইচ্ছে যেন থাকে। এটা তোমারও একটি মামারবাড়ি। পরে দাদাবাবু একদিন কথা বলবে তোমার সঙ্গে।
অপ্সরা বলে, বেশ তো। এখানে আসবে বলল?
না। তেমনধারা কথা হয়নে আমার সাথে।
আচ্ছা। ফোন যখন করব তখন বলব। কতদিন দেখি না সবাইকে।
আনন্দী ছিল তার এখানের বন্ধু। যেহেতু দীর্ঘদিন সে এখানে থেকেছে একসময়, গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, বড়দিনের অবসরে—তখন অনেকের মাঝে ছিল আনন্দী। আনন্দী তার সমবয়সী। অনেকের সঙ্গে খেললেও আনন্দীর সঙ্গে তার ভাব ছিল চিরস্থায়ী।
আনন্দী মণ্ডল খুব নরম স্বভাবের মেয়ে। গায়ের রঙ কালো। কিন্তু মুখখানা মিষ্টি। ঢলঢল। আনন্দী উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিল। দেখাশোনা করে বিয়ে হয় এক সরকারি চাকুরে ছেলের সঙ্গে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম সে খুব সুখেই ছিল। অন্তত বছর তিনেক তাদের মধ্যে অশান্তি ছিল না। তারপরে জানা গেল, ওর স্বামী অচিন্ত্যর এক পাতানো দিদির কথা। তার সঙ্গে যে অচিন্ত্যর সম্পর্ক থাকতে পারে তা ভাবনাতেই আনেনি আনন্দী। সেই দিদির দুই ছেলে, বয়সেও আনন্দীর স্বামীর চেয়ে বছর দশেকের বড়। তারপরে যখন সব জানাজানি হল, ওর স্বামী বলল, আমি তোমাকে ছাড়তে পারব কিন্তু দিদিকে ছাড়তে পারব না।
এর পরেও আনন্দী ছিল মাস ছয়েক। একদিন তার স্বামী আনন্দীকে মারার চেষ্টা করে। তারপরে আনন্দী একদিন ফাঁক বুঝে পালিয়ে আসে। আর ওমুখো হয়নি।
ডিভোর্স পেতে দু বছর লেগেছিল। ভেবেছিল আর বিয়ে করবে না। কিন্তু বাড়িতে দাদারা বোঝালো, যখন ছেলেপুলে হয়নি, বিয়েতে অসুবিধা কী? ছেলে হলে তার অধিকার নিয়ে নাহয় ঝামেলা হত। আবার ছেলের অধিকার আনন্দী পেলেও তাকে নিয়ে সে বাঁচতে পারত। কিন্তু হয়নি যখন দ্বিতীয়বার বিয়ে করাই যেতে পারে।
ডির্ভোসের তিন বছর পর আনন্দীর বিয়ে হল আবার। এবার আর দেখাশোনাটা ওভাবে হল না। হল ম্যাট্রিমনি সাইড দেখে। ডিভোর্সিদের জন্য সে সাইট। বিয়ের পরে সেখানেও গোলমাল শুরু হল। সে আর এক কাহিনি।
ছেলে ভালো হলে কী হবে, সে হল ধব্জভঙ্গ পুরুষ, আয়ান ঘোষের মতন। আনন্দী ফিরে এল তারপরে। না, তারপরে সে আর বিয়ের চক্করে পড়েনি।
আনন্দী বলল, আমাদের গ্রামে বা আশপাশের এলাকায় এখন বৈষ্ণব হবার চল খুব বেড়েছে, জানিস? সকলেই কন্ঠে তুলসীমালা ধারণ করছে, কপালে চন্দন। কিন্তু অনেক নিয়ম মানতে হয়, সেদিকে আর কজন যায়। আমাদের ওদিকে যাদের মালা গলায় থাকে তারা সব খায়। মাছ, মাংস—সব। তারা বলে, আমাদের গুরু খেতে বলেছে। বলেছে আস্তে আস্তে ছাড়তে—এমনি ব্যাপার! আবার কোনো গুরু বলে, নিরামিষ ভোজ্যই বেস্ট। গুরুতে গুরুতে এত প্রভেদ! এখন তুই কী করবি?
আমি বিধবা হবার পরেও আমিষ খেয়েছি। এখন আর খাই না।
আর দীক্ষা?
ভগবানকে পেতে হলে দীক্ষার দরকার নেই।
অনেকেই বলে, অক্ষর চিনতে হলে যেমন মাস্টার দরকার তেমনি ঈশ্বরকে জানতে হলে গুরুর দরকার।
একলব্য কীভাবে যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিল মনে নেই?
তার মানে অনেকটা এগিয়ে গেছিস তুই।
তুই দীক্ষা নিয়েছিস?
নিয়েছি।
কৃষ্ণমন্ত্র?
হ্যাঁ।
কী করতে হয়?
সকালে মালা জপি, নামগান করি—এইটুকুই, আর কিছু নয়।
খাওয়া-দাওয়া?
সব খাই। কৃষ্ণ নামের লোকজন খুবই বাড়ছে বটে, তবে ঐ—আর কিছু নয়। গীতা বা ভাগবত—কেউ পড়ে না।
তা আমি জানি না। তবে আমি ঠিক করেছি এখানের বাস উঠলে আমি বৃন্দাবনে যাব। সেখানেই বাস করব কোনো-না-কোনো মন্দিরে। আমি রাসলীলা প্রত্যক্ষ করতে চাই।
তুই খুব কঠিন পথে চলে যাচ্ছিস। কৃষ্ণ তোকে টানছে। তুই কি পুরো বৈরাগিনী হয়ে যাবি?
আমি তোকে সঙ্গে চাই। চল না, দুই সখী মিলে, ছেলেবেলার খেলনা-বাটি খেলার মতন কৃষ্ণকে নিয়ে খেলি। সংসার আর আমার ভালো লাগে না।
যেতে আমার খুবই ইচ্ছে করছে, কিন্তু… মনের জোর নেই।
ভগবানের স্মরণ নে। নিলে দেখবি মনের ভেতর ঝর্না নামছে। রক্তে আনন্দের স্রোত বইছে। এই জীবনে আনন্দই তো সব। আনন্দ ছাড়া আর আছে কী? আর কী হবে?
মনের মধ্যে লক্ষ প্রজাপতি ডানা মেলে উড়বে। যদি খুব করে কৃষ্ণকে চাস, দেখবি তুই যেন বৃন্দাবনে বসে আছিস। চারিদিকে ময়ূরের দল খেলা করছে। রাখাল বালকের দল ধেনু চরিয়ে ফিরছে। দেখবি ওদের মধ্যেই কৃষ্ণ লুকিয়ে আছে।
আহা!
তুই চাইবি। কী চাইবি কৃষ্ণের কাছে?
আমি চাইব—বলতে বলতে আনন্দী উঠে পড়ে। দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে ঘুরতে থাকে। পাক দেয় সমগ্র উঠোন। আর বলে, আমি আমি চাইব, আমি চাইব—একমুঠো ভালোবাসা। তুই কী চাইবি?
আমি চাইব, আমি চাইব…
বাঁশির সুর?
না। আমি চাইব আমি চাইব…
কী?
শ্রীকৃষ্ণের পায়ের ধুলো।
আহা! নিয়ে?
সিঁথিতে পরব। অঙ্গে মাখব। বক্ষে ধারণ করব। একটা গান শুনবি? কৃষ্ণের গান।
কার লেখা?
আমার।
তুই গানও লিখিস।
জানি পারি না, হয়ত কিছুই হয় না, তবু লিখি। কাউকেই শোনাই না। শুধু কৃষ্ণকে শোনাই, আর আজকে তুই শুনবি?
বেশ তো, শোনা-না। আমার ভালোই লাগবে।
অপ্সরা বলে, আমি মীরার ভজন গাই। সেটা শুনতে শুনতেই মনে হয়, নিজেই লিখি না কেন। তাই—এই বলে সে গাইতে থাকে—
শ্রীকৃষ্ণ রাধা-মুরতি
শ্যাম বিনা রাধা
সংসার সব রাই-কৃষ্ণ
মিছে ভুলি সংসার মায়ায়।
গান শেষ হলে আনন্দী বলে, খুব সুন্দর। তুই লিখতে থাক।
অপ্সরা লজ্জা পায়। বলে, কথাগুলো জমল না, না? কেমন যেন ছাড়াছাড়া, খাপছাড়া—। আমি একটি ডায়েরি পেয়েছি জানিস। এই বাড়িতেই রাখা ছিল। তাতে কিছু পদ লেখা ছিল। গান। সেগুলি গাই আর সেগুলি ফলো করে লিখি।
ভগবানের জন্য গান লিখবি, তার আর জমা, না জমা কী? বেশ হয়েছে। আমি রোজ আসব, রোজই একটি করে গান লিখে আমাকে শোনাবি। যদি এলোমেলো গান হয়, তাই শুনব। আমি তো এটুকুও লিখতে পারি না, তুই পারিস।
আসলে আমি ভাবতাম না যে কখনও লিখব। আমি একটি ডায়েরিতে বিখ্যাত পদকর্তাদের লেখা। (??) সেটা পড়েই মনে হল, যদি আমি লিখি, কী ভুল তাতে? তাই লিখলাম। আমি তো বিখ্যাত পদকর্তা নই, ছন্দের জ্ঞান নেই, পয়ার জানি না, তবুও মনের ভাব প্রকাশ করতে হলে কবিতাই সেরা মাধ্যম।
আনন্দী একগাল হেসে দুহাতে জড়িয়ে ধরে অপ্সরাকে।
১১
ষষ্ঠী বলে, সোহাগি দিদি এখানেই আছে। দিদির আত্মা এখানেই রয়ে গেছে।
ভগবানের কাছে যায়নি কেন?
সে আমি জানি না। তবে দিদির সঙ্গে আমি কথা বলি। দিদিও বলে।
কিছু বলো না, শুনি।
সেসব বলার মতন নয়।
তবু…
দিদি তোমাকে নিজেই বলবেন। সবুর করো।
তবে তোমার কথা বলো।
আমার আবার কী কথা?
জীবনের কথা।
আমার কোনো নিজের জীবন নেই রে। আমি যেভাবে বাঁচি তা ভগবানে বাঁচে। ভগবানের দয়ায় বাঁচি। তিনি রাখলে থাকি, খাওয়ালে খাই।
ভারি সুন্দর কথা।
আমার এক ছেলে, এক মেয়ে তারা থেকেও নেই। নইলে ঘরে রাধাগোবিন্দ আমারও ছিল।
ষষ্ঠীর বিয়ে হয়েছিল অনেক দূরে, রিষড়া শহরে। সেখানে দুটি ছোট ছোট ঘর ছিল তার। দুটি ছেলে-মেয়ে হল। স্বামী কারখানায় কাজ করত। সেই কারখানা বন্ধ হল। তাতেও চলে যেত। স্বামী কখনও বসে থাকেনি। কারখানা থেকে জবাব দিলে হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই কাজ করেছে, সংসার চালিয়েছে।
এইভাবে ছেলেমেয়ে বড় হল। তাদের বিয়ে দিল ষষ্ঠী। স্বামী মারা গেল। এরপরেই দেখা দিল বিপদ। স্বামী যেহেতু ছেলের নামে বাড়িটা লিখে দিয়েছিল, সে তার মাকে ঘর থেকে উৎখাত করে দিল। বলল ভাড়া দেব, তুই চলে যা। বলে সে মাকে বের করে দিল। একটা বিহারি মেয়েকে বিয়ে করল। নিজে কিছু কাজ করত না। বউটা সেলাই কলে কাজ করত আর ঘর ভাড়ার টাকায় চলে যেত তার।
মেয়ে এইসময়ে বাপের ভিটেতে এল। বাপের সম্পত্তির কিছু তো তারও চাই। কিন্তু কী নেবে সে? কিছুই যে নেবার নেই। কিন্তু সে শুনবে না। সে শুনতে আসেনি, নিতে এসেছে। তাই আর কিছু না পেয়ে সে ঠাকুরঘর থেকে কৃষ্ণের কষ্টিপাথরের মূর্তিটা তুলে নিয়ে চলে গেল। এতদিন দুয়ারে (??) থাকছিল ষষ্ঠী। এবারে সে হাহাকার করে উঠল। মেয়ে ফিরেও তাকাল না। জীবন থেকে মুখ ফিরিয়েই নিয়েছিল ষষ্ঠী। তারপরে তার ভাই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সে বাপের ভিটেতে ফিরেছে সাত-আট বছর হল। তার চারটি ছাগল আছে। সেগুলি পালে আর এই বাড়ি দেখাশুনো করে; সঙ্গে আছে ফ্রি রেশন ও বিধবা ভাতার টাকা। সব মিলিয়ে তার চলে যায়।
অপ্সরা তাকে কিছু টাকা দিল। বলল, এগুলো নাও মাসি। কদিন থাকলেও খেতে হবে। তুমি কেন খরচা করবে। আর এই কদিন তুই আমার কাছেই খেয়ো।
শুনে ষষ্ঠী আর না বলে না।
অপ্সরা বলে, খাবে তো চাট্টি ভাত। আর একটা তরকারি করলেই আমাদের মাসি-বোনঝির হয়ে যাবে।
কথাটায় খুশি হয় ষষ্ঠী। বলে, সঙ্গে আমি বেগুন আনব। এখন বাজারে বেগুনের অনেক দাম। ষাট টাকা কিলো। সেই কবে থেকে বেগুন ষাট টাকা করে দাম চলছে কমার আর নাম নেই।
বেগুন পাবে কোথা?
সে আমি আনব। আমার চাষের।
মানে! তুমি জমি চাষও করো।
দূর ক্ষেপি! আমি জমি কোথা পাব? ঘরের পেছুতে খানিকটা জমি পড়ে আছে, তাই কুপ্পে আমি লাগাই। বেগুন ঢেঁড়শ আর লঙ্কা গাছ।
বা, বেশ ভালো তো!
চারটি করে গাছ লাগানো আছে। মাঠ থেকে গোবর কুইড়ে এনে গাছের গোড়ায় দিই, আর মাঝে পুকুর থেকে জল তুলে দিই। বেশ ফলন হয়। আমি খাই, বেশি হলে বেচি।
ভালো ভালো।
১২
শুনে ভালো লাগল অপ্সরা। তুই যে ধর্মের পথে ফিরেছিস, এটাই অনেক। মনে আনন্দ দিল। অথচ তোর নামে একসময় কত কথা এখানের বাতাসে ভেসে বেড়াত।
অপ্সরা চুপ করে রইল। বিধবা হবার পরে নানা ধরনের কাজ করে একা হাতে মেয়েকে সে বড় করে তুলেছে। পড়িয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করিয়েছে। বিয়ে দিয়েছে। এইসব করতে গিয়ে তাকে নানান মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়েছে। তাদের কাছাকাছি যেতে হয়েছে। পুরুষেরা তাকে দেখে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করেছে। না, সবাইকে যে কাছে আসার সুযোগ দিয়েছে সে, তা নয়। তবে যারা তার কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়নি, বদনাম তারাই ছড়িয়েছে। তবে সে বদনামের ঢেউ যে এতদূরেও এসে পৌঁছেছে, সেটা জেনে সে অবাক হয়ে গেল।
ষষ্ঠী বলল, আমি জানি তোর নামে বদনাম সেসব মিথ্যে কথা। অল্পবয়সে বিধবা হলে লোকে অমন কত অকথা-কুকথা বলে; আমাকেও বলেছে। ওসব গায়ে মাখিস না। ঈশ্বরে মন হয়েছে, মন পেতে থাক।
অপ্সরা চুপ করে রইল। কেবল মনে হল, সেই কথাটা—তোর হবে। কী হবে? এখন আর তা জিজ্ঞাসা করা যায় না।
এমনি এমনি, এতদিন পরে ঠাকুর তোকে ডাক দেননি, নিশ্চয় এর কোনো কার্য-কারণ আছে; নইলে এমন টান হবে কেন তোর?
অপ্সরা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
যখন তুই সবকিছু ছেড়ে দিবি, সব হারিয়ে ফেলবি, যখন নিজের বলে আর কেউ থাকবে না তোর, তুইও কারো হবি না, কেউ তোকে ডাকবে না, তুইও কারো বাড়ি যাবি না—তখনই তাঁর সঙ্গে তোর সাক্ষাৎ হবে।
কীভাবে হবে?
সেটা এককথায় বলা যাবে না। তিনি আনন্দের প্রতিমূর্তি হয়ে তোর কাছে আসবেন। তিনি ধূলি হতে পারেন। তিনি ঝড় হতে পারেন। তিনি কোনো গাছ, পাখি, ফুল ফল লতা হতে পারেন। যে কোনো ভাবে, যে কোনো রূপেই তিনি তোর কাছে আসতে পারেন। সব হারালে তবেই তো তুই তাঁকে ডাকবি। সব হারালে তবেই তুই তাঁর কদর করবি। তখন তিনি তোর কাছে আসবেন। বেঁচে থাকা মানে আর কিছু নয়। সময়ের বিন্দু (??sindhu?) থেকে একবিন্দু জল তুই তুলে নিলি। জীবন মানে এক বহতা সময়, যেখানে তুই সময়ের সঙ্গে ভেসে থাকার চেষ্টা করে যাবি কেবল, আসলে ভেসে থাকতে কেউই পারে না—সকলেই ডুবে যায়—জগতের এই নিয়ম। আর এই ডুবে যাওয়ার পরিস্থিতি যখন আসবে তখন তুই তাঁর দর্শন পাবি। তিনি ঈশ্বর। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি যে সবসময় একই বেশে দেখা দেবেন, তা নয়। তিনি তুই হয়েও আসতে পারেন।
আমি হয়ে! মানে?
তোর মধ্যে তিনি বাস করলেন। তোর মধ্যে তিনি বেঁচে রইলেন অনন্তকাল। তিনি তোর মধ্যেই প্রকাশ হলেন।
কৃষ্ণের অর্ধেক তো রাধা। তাঁকে ডাক। তাঁর ধ্যান কর। তিনি ছাড়া মানুষের আর কেউ নেই। মানুষ মানুষের আপন হয় না। এমনকি সন্তানও নয়।
ডাকলেই তিনি আসবেন?
তাঁকে ছুঁতে হবে। অন্তর দিয়ে ছুঁতে হবে। তখন তিনি আসবেন তোর মধ্যে বাস করতে। তুই যদি তা বুঝতে পারিস, অনুভবে তাঁকে ধরতে পারিস, তাঁকে জানতে পারিস তিনি আছেন তোর অন্তরেই—তবেই তুই তাঁকে পেলি।
আর যারা পেল না?
পায় সবাই। কিন্তু সকলে তা বুঝতে পারে না। তাঁকে নিয়ে পাঠ, জপ, ধ্যান কোনো কিছুই বাদ রাখল না। কিন্তু অনুভব করতে পারল না, কখন তিনি হৃদয়মন্দিরে এসে বসেছেন। তারা এক সাধারণ গৃহীভক্ত হয়েই রয়ে গেল।
এইসব নানা কথার পরে সন্ধে দিয়ে ষষ্ঠী নিজের বাড়িতে চলে গেল। চারিদিকে আঁধার নেমে এল। শিয়ালের ডাক শোনা গেল। জোনাকি উড়ল। প্যাঁচা ডাকল। বোঝা গেল, রাত এবার পুরোপুরি নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে।
অপ্সরা যেন মোহগ্রস্ত হয়ে ঘরে প্রবেশ করল। ঘর তো নয়, যেন এক মায়ার জগৎ। তার চারপাশ থেকে, দেহ থেকে, মাথার মধ্যে থেকে বাস্তব হারিয়ে যাচ্ছিল। বদলে স্থান নিচ্ছিল এক অনির্বচনীয় বোধ। মনে হল, যেন কেউ তাকে নির্দেশ দিচ্ছে কী করতে হবে না হবে। বাতাসের মধ্য থেকে যেন কেউ তাকে বলল, দরজা বন্ধ কর। সে নির্দেশ পালন করল। অলক্ষ্য থেকে কেউ নির্দেশ দিল, পুজোর আসন পাত। অপ্সরা তাই করল। আসনে বোস।
সে বসল। প্রশ্ন করল, এবার?
ঘরে কেউ নেই, প্রশ্নটা যেন সে নিজেকেই করল। তবুও উত্তর এল, দীপ জ্বাল।
সে প্রদীপ জ্বালল। মাটির পিদিম। সে চন্দনপিঁড়ি নিয়ে চন্দন বাটতে থাকল। বেটে সে নিজঅঙ্গ চন্দনচর্চিত করল আগে, তারপরে ঠাকুরের শ্রীঅঙ্গে মাখাল। আগে রাধা পরে কৃষ্ণ—। সারাঘর ভরে গেল এক মোহময় আবেশে। এক অসাধারণ সুগন্ধ উদ্ভাসিত হতে লাগল ঠাকুরের দেহ হতে। চন্দন এমন! এমন মাতোয়ারা সুগন্ধ তার! চন্দনের সুবাস এমন মধুর হয়, তা কোনদিন জানত না অপ্সরা।
এবারে সে ধূপ জ্বালল। একসঙ্গে পাঁচটি ধূপ। ঠাকুরের মূর্তিতে মালা দিল। দেখল, ভগবান হাসছেন। অপ্সরা একটু থমকে গেল। কই, যখন সে প্রথম এই ঘরে ঢোকে, এমন হাসিমাখা মুখ চোখে পড়েনি তো! নাকি ঠাকুরের মুখ এমনই, যা তার চোখ এড়িয়ে গেছিল?
অপ্সরা অগুরু ছড়াল। তারপরে চোখ বুজে ধ্যানস্থ হল। তখন কেউ যেন তার কানে কানে বলল, একদম চোখ খুলবি না। ঠাকুরের কথা ভাব। শ্রীকৃষ্ণের কথা মনে আন। ভগবানের নানা লীলা স্মরণ কর। একবারও ভাববি না তুই কে, তুই কোথা থেকে এসেছিস, তোর কে আছে, কে নেই। ভাব, এই জগৎ আনন্দময়, ঈশ্বর সেই আনন্দের প্রতিমূর্তি। ভাব। মনের মধ্যে যাই আসুক, তাকে ঠেলে সরিয়ে দে। মনকে কৃষ্ণময় করে তোল। পাপকে ফেলে রেখে এ মনকে একমুখী কর। একটা তিরের মত। নদীর স্রোতের মত বেগ আন মনে। সেই বেগ, যা ঈশ্বরের দিকে ধাবিত হয়।
১৩
প্রতিদিন এমনিই চলতে লাগল। দিনের বেলা, বিকেলে নিয়ম করে ষষ্ঠী যথারীতি আসে ও ঈশ্বরের নানাকথা, ভাব, বকবক করে চলে যায়। আনন্দীও আসে। সে ঈশ্বরের চেয়ে নিজের চলে যাওয়া জীবনের দুঃখের কথা বলে বেশি। সে এখনও আনন্দের সাগরে ভাসতে পারেনি, মনের মধ্যে আনন্দের ঝর্না নামাতে পারেনি; সেখানে কেবল দুঃখই প্রবহমান। চলে যাওয়া জীবনের হতাশা তাকে এমন গ্রাস করেছে সেই ঘোর থেকে সে বেরুতে পারেনি। সে সেই দুঃখের মধ্যেই ঘুরে যাচ্ছে। সন্ধের পরে অপ্সরা ঠাকুরঘরে আসন পেতে বসে, নিত্য।
একদিন এমনি সন্ধেবেলায় সে বাড়ির বাইরেটায় বসে আছে, আনন্দী আসবে বলে গেছে। আনন্দী এলে কিছু গল্পগাছা হবে, দুঃখ-সুখের কথা হবে; একটু চা-পান হবে, ষষ্ঠী মাসি আসবে, আলোচনা হবে। ধর্মালোচনা। ষষ্ঠী মাসির মুখে এইসব আলোচনা শুনতে তার খুব ভালো লাগে। আনন্দীও শুনে খুশি হয়।
কিন্তু আনন্দী সেদিন এল না। এল মুশকো মতন একটি লোক। লোকটি এসে এক গ্লাস জল চাইল অপ্সরার কাছে।
এই লোকটি এ গ্রামের নয়। দেখলেই বোঝা যায়। বাইরের মানুষের ছাপ তার সারা দেহে স্পষ্ট। অপ্সরা তার শহুরে কালচারে একটু ভয় পেল। তারপরে ভাবল, কে জানে, ঈশ্বর কোন রূপে কার কাছে আসেন। সে ভেতরে গিয়ে জল-বাতাস এনে দিল। দেখল, লোকটা বসে আছে তার জায়গায়। অপ্সরা আর বসল না, সে দাঁড়িয়ে রইল।
জল পান করে লোকটা বলল, এ বাড়ির জল খুব মিষ্ট।
আগেও এসেছ নাকি এই গ্রামে?
হ্যাঁ। লোকটা ঘাড় কাত করে।
লোকটাকে আর ভয় পাচ্ছিল না সে। কেমন যেন শিশুর মত। অপ্সরা বলল, এদিকে কোথায় এসেছিলে?
ঠাকুর নিয়ে এসেছিলাম। নামিয়ে দিয়ে ফিরছি।
কোন ঠাকুর?
এই গ্রামের সকলেই তো কৃষ্ণের দাস।
দাসানুদাস।
তা বটে।
তা সেই মূর্তিকে নামালে কোথায়? কার বাড়ি?
এদিকেই।
নামিয়ে ফিরছ।
হ্যাঁ।
বাড়ি কোথায় তোমার?
গোলোকের ওদিকেই।
অপ্সরা কী বুঝল কে জানে, ঘাড় নাড়িয়ে বলল, আচ্ছা।
এবার লোকটা বলল, এটা কি তোমার বাড়ি নাকি?
না। আমার নয়। আমি আছি কদিন।
তাই তোমাকে অচেনা-অচেনা লাগছিল।
সে তো লাগবেই।
এরা কেউ হয় নাকি তোমার?
হ্যাঁ। গ্রাম সম্পর্কে মামাবাড়ি। আমার আসল মামাবাড়ি আরও খানিকটা তফাতে।
বুঝলাম। এখানে তুমি থাকো কৃষ্ণের আরাধনা করো?
দারুণ আশ্চর্য হয়ে অপ্সরা বলল, তুমি জানলে কী করে?
সারাবাড়ি থেকে কৃষ্ণের গায়ের গন্ধ ভেসে আসছে।
সে কেমন!
হয় হয়। যারা সর্বক্ষণ তাঁকে ঘিরে থাকে, সেই বাড়ি থেকে, সেই মানুষগুলোর গা থেকে ঈশ্বরের গন্ধ বেরোয়। কষ্টিপাথরের মূর্তি তখন জাগ্রত হয়ে ওঠেন।
এ বাড়িতে অমন মূর্তি আছে তা তুমি জানলে কী করে?
আমি সব জানি। কম দিন তো এ গাঁয়ে আসছি না।
এ গাঁয়ে রামকানাইয়ের মন্দির আছে। ভারি সুন্দর মন্দির।
সব জানি। ওদিক পানে খানিকক্ষণ ছিলুম আজ। রামকানাইয়ের সঙ্গে খানিক খেলা করে এলুম।
খেলা!
ঈশ্বরকে মন থেকে ভালোবাসলে তুমি যা বলবে তিনি তাই করবেন। তিনি তোমার খেলার সঙ্গী হবেন; দুঃখ-সুখে পাশে থাকবেন; এমনকি তোমার সঙ্গে যমুনাতে জলও আনতে যাবেন, তোমার ভার বহন করবেন, কলসী মাথায় তুলে দেবেন; তখন তিনি হলেন মুটে-মজুর। ঈশ্বরকে ভালোবাসলে তাঁকে দিয়ে সব কাজ করানো যায়। আর করানো যায় বা বলছি কেন, তিনি নিজেই তোমার সকল ভারকে বহন করার জন্যে এগিয়ে আসেন।
অপ্সরার মন থেকে যেন ভার নেবে গেল। লোকটার পাশে বলল। অমনি লোকটা ছিটকে উঠে পড়ল। দারুণ অবাক হয়ে অপ্সরা বলল, কী হল?
তোমার পাশে আমি বসতে পারি নে।
কেন?
তুমি হলে ঈশ্বরের সঙ্গী।
মানে!
তিনি তোমার কাছাকাছি আছেন। তিনি তোমায় আগলে রেখেছেন। তোমার পাশে বসার অধিকার একমাত্র তাঁর; আমি সাধারণ মানুষ। তাঁর মূর্তি বহনকারী। আমার সে যোগ্যতা নেই তোমার পাশে বসার।
অপ্সরা বলল, আমি তো ভাবলাম, তুমি তাঁর কাছের মানুষ। তিনি তোমার সঙ্গে বিরজমান। তিনি তোমাতেই করুণা করেন। তাই সর্বদা তাঁর মূর্তি তুমি বহন করে চলো। মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দাও।
না-না-না। তুমি আলাদা। খুব শীঘ্রি তোমার ঈশ্বরপ্রাপ্তি হবে, দেখে নিয়ো।
কবে হবে?
সে জানি না। তবে হবে।
কীভাবে হবে?
সেও আমার অজানা। তবে আমি তাঁর ভক্ত। সর্বদা তাঁকে মাথায় নিয়ে ঘুরি। সর্বদা তাঁকে ঘিরেই আমার দিনাতিপাত হয়। তাই আমি বুঝতে পারি কে সঠিক পথে চলেছে আর কে নয়।
তুমি কিছু খাবে? সারাদিন ঘুরছ, খিদে পেয়েছে নিশ্চয়। বোসো, তোমার জন্যে কিছু খাবার আনি।
এই বলে অপ্সরা বাড়ির ভিতরে গেল। ঘরে খাবার তো আর সাজানো থাকে না। কিছু শুকনো মুড়ি ছিল, তাই, একখানা আলুসেদ্ধ, মুড়ির উপর একটু সর্ষের তেল আর একমুঠো চানাচুর ছড়িয়ে নিয়ে সে যখন বাড়ির বাইরে এল, দেখল লোকটা নেই; সে চলে গেছে। একটু অবাক হল অপ্সরা। লোকটা চলে গেল কেন? অপ্সরার তো খুব বেশি দেরি হয়নি! কে ছিল লোকটা!
ভাবতেই মনের মধ্যে যেন বিদ্যুৎ চমক দিল। এই বাড়ির একশো বছরের পুরানো মূর্তিটা কি এই লোকটাই রেখে গেছিল? যারা ঈশ্বরে মন-প্রাণ সঁপে আছে তারা কি এইভাবেই মূর্তি পেয়ে থাকে আর যুগের পর যুগ এইভাবেই মূর্তি জোগান দিয়ে আসছে লোকটা? এ কী সব ঘটে যাচ্ছে তার জীবনে!
১৪
আবার ধ্যানমগ্ন হল অপ্সরা। রোজই হয়। দিন দিন তার সময় বৃদ্ধি পায়।
এইভাবে কতক্ষণ, কতদিন সময় কেটে গেল অপ্সরার খেয়াল নেই। তারপরে একদিন আস্তে আস্তে সে অনুভব করল তার দেহটা মহাশূন্যে ভাসছে! আশপাশে লক্ষকোটি গ্রহ-নক্ষত্র ভেসে চলেছে। ক্রমে ক্রমে সেসব সরিয়ে সে যখন আরো উপরে উঠতে থাকল, দেখল প্রবল ঝড় উঠছে। সে বেসামাল হয়ে পড়ল। ভাবল উড়ে যাবে, পড়ে যাবে, হারিয়ে কোথায় না কোথায় চলে যাবে। সে ভয়ে চোখ খুলে ফেলল! সঙ্গে সঙ্গে কেউ যেন তাকে ধমকে উঠল, চোখ খুললি কেন!
ভয় পাচ্ছিলাম।
ঠাকুরের কাছে ভয় কী? আজ আর হবে না, আবার কাল বসিস। যা। এখন একটু ঘুমিয়ে নে। মনে রাখিস, হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে কদাচিত দু-একজন ঈশ্বরের পাদপদ্মে পৌঁছতে পারে। তাঁর পদরেণু হতে পারে। তুই চেষ্টা কর। তোর হবে। আর কী করতে হবে? নির্দেশ আসে, যতক্ষণ না পর্যন্ত হৃদয়ের মলিনতা দূর না হয় ততক্ষণ শুদ্ধ ভক্ত হওয়া যায় না।
সমস্ত ঘর অন্ধকার। কখন দীপ নিভে গেছে, ধূপের সুবাস হয়েছে লীন। দরজা, জানালা সব বন্ধ। তবুও ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত সুগন্ধ ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন গন্ধের আস্বাদ কোনদিন পায়নি সে। সে প্রাণভরে শ্বাস টানে। আর দেখে এই অন্ধকারের মধ্যে কেবল জ্বলজ্বল করছে ঠাকুরের চোখ দুটি!
আর কতদিন? চলবে। কয়েকমাস পরে, কতদিন? চলবে চলবে…
তাই পরের দিন। তার পরের দিন, আবার। পরের দিন… তারপরেও… কদিন বা কয়মাস এভাবে কাটল সে জানে না। এইভাবে বছর ঘুরে গেল।
সেদিন বেশিক্ষণ আর বসতে হল না, শুরু হয়ে গেল পৃথিবীর ঘূর্ণন, উড়তে শুরু করল কোটি কোটি ধুলো! অজস্র ধুলোর কণার মধ্যে সে ঘুরছে! পৃথিবীতে, পৃথিবীর বাইরে এত ধুলো ছিল, এত ধুলো কোথা থাকে? সে বিস্মিত, চমৎকার হয়ে গেল। কয়েক পলকের মধ্যেই যেন তার চোখ বুজে এল ধুলোর প্রকোপে। তারপরে মনে হল, ঈশ্বরকে পেতে এসেছে সে; আর সামান্য ধুলোকে ভয় পাচ্ছে? সে চোখ খুলল। আস্তে আস্তে চোখ মেলে সে যা দেখল তাতে বিস্ময়ের অন্ত রইল না। প্রতিটি ধুলোকণা রূপ পাচ্ছে আলোর কণায়! একটি একটি করে ধুলোর বিন্দু, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণারা ফুটে উঠছে আলো হয়ে। তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। এত আলো! পৃথিবীতে এমন আলো ছিল কোথায়! পরে মনে হল, না। এ আলো পৃথিবীর নয়, তার বাইরের। আলো ছিল অন্তরে, বাহিরে—মাখামাখি হয়ে। আলো ছিল মাটিতে, আলোতে, বাতাসে, অন্তরীক্ষে। আলোই প্রভু। আলোই সব। অপ্সরার মন হয়ে উঠল আলোকময়।
কিন্তু ঈশ্বর? তিনি কোথায়? এই আলোর ওপারে? নাকি আলোর মধ্যে? নাকি তিনিই এই আলো? তাহলে কি তিনি ধুলো হয়ে ছিলেন। ধুলোর এই জগতে তিনি মিশে ছিলেন মাটিতে, গাছে, পাতায়, বাতাসে—ধুলোকণা হয়ে?
কেউ যেন বলল, কী দেখছিস?
অপ্সরা বলল, আলো। ছিল ধুলো হয়ে গেল আলো। অবাক বিস্ময়!
আর কী দেখছিস?
উত্তর একই দিল সে। আলো।
আলোর বাইরে কী আছে?
আলোই।
আলো কি রঙ পালটায়?
আলোর কোনো রঙ নেই।
এখন কেমন বোধ হচ্ছে তোর?
একদম ভারহীন লাগছে নিজেকে।
দেহ?
না, মন।
কেমন ভারহীন?
নির্ভার।
আর দেহ?
সেটা আছে কি নেই, বুঝতে পারছি না।
আর পাপ? তার উত্তরে তোর মন কী বলে?
সে বলে, কোথায় তারা? কেউ তো নেই। এই আলোর মালায়, আলোর জগতে, আলোর পৃথিবীতে কেউই নেই, কিছু নেই।
তখন ধেয়ে এল পরের প্রশ্ন। আর পুণ্য? তারই বা খবর কী?
অপ্সরা উত্তর দিল, কীসের পাপ, কীসের পুণ্য? চরাচর জুড়ে এদের কারও কোনো অস্তিত্বই নেই। আলোই সত্য এখানে। মিথ্যাও তাই—আলো। না আছে পাপ, না আছে পুণ্য না আছে জীবন—এখানে কিছুই নেই!
তবে আর কী আছে? কী দেখছিস তুই? কী বুঝছিস? অনুভব করছিস?
সে উত্তর দিল, মন নির্ভার, তাই দেহ হয়েছে পালকের মতন নরম। দেহ ভাসছে আলোয়।
উত্তর এল এবার, যা তোর হয়ে গেছে।
ঈশ্বকে পেয়ে গেলাম আমি!
না। এই প্রাপ্তি ঈশ্বরপ্রাপ্তি নয়।
তবে!
ঐশ্বরিক ভাবকে তুই আত্মস্থ করলি, ঈশ্বরপ্রাপ্তি অনেক দূরের পথ।
এই আলো তিনি নন?
এর বাইরেও আরো আছে, অনেক কিছু আছে।
এখন তবে আমাকে কী করতে হবে?
এবার পথে পথে ঘোর। এখন থেকে পথই তোর ঈশ্বর। পথের ধুলো মাখ। পথে যেতে যেতে নাম কর। নৃত্য কর। পথের ধারে যা ফুল পাবি, তুলে নিয়ে মাথায় গেঁথে পর। গান গা। ভগবানের গান। পাখির গান। ফল-ফুলের, মাটির গান গা। মানুষের গান কর।
তারপরে? তাঁকে কখন পাব।
সে উত্তর আমার কাছে নেই।
তবে?
তিনিই দেবেন তোর প্রশ্নের উত্তর। আমি এইটুকুই জানি। এই আলোটুকু, ধুলোটুকু। আমি এইটুকুই পৌঁছতে পেরেছিলাম। তারপরে আমার সময় পেরিয়ে গেল। আমাকে দেহ ছেড়ে দিতে হল। তাই আমার আত্মা এখানেই আছে। তবে তুই পারবি। অনেক বয়স আছে তোর। আমি সারাজীবনে যা করেছিলাম, কয়েক মাসের মধ্যে তুই সেখানে পৌঁছে গেলি। বাকিটা ভগবান হাত ধরে তোকে পৌঁছে দেবেন। তুই এখন একজন সাধিকা। আর তুই ঘরে থাকতে পারবি না, এবার তোকে পথে বেরুতে হবে। এখন তুলসির মালা আর লালপাড় শাড়ি পরে নে। সব রাখা আছে আমার ঘরে। খাটের নিচে পোর্টমানের নিচে।
সে খুঁজে বের করে বাক্সটা। শাড়ি বের করে।
তাকে আর কিছু বলতে হয় না। সে আবার চন্দন মাখে। কপালে লাগায়। লালপাড় শাড়িতে মাখায়। নিজেকে সাজায় শুকিয়ে যাওয়া একটি মালায়। এবার একটু তুলসীমালা না হলে আর চলছে না। কোথায় পাব সে সেই মালা?
অপ্সরা খুঁজতে শুরু করে। সবই যখন আছে নিশ্চয় পাবে সে। একটা মালা কোথাও না কোথাও পড়ে আছে, রাখা আছে তার জন্যে। তার স্থির বিশ্বাস, ঈশ্বর তার জন্যে কিছু না কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছেন তার জন্যে।
ঘরের এদিক-ওদিক, সর্বত্র খুঁজে খুঁজে সে যখন হয়রান তখন দেখল, কুলুঙ্গিতে একটা কাপড়ের ব্যাগে কিছু রাখা। সে সাবধানে, ঝুল আর ধুলো সরিয়ে সেটিকে বের করে আনে। হ্যাঁ, মিলেছে। এক তুলসীর মালা। নাও, এবারে সেটিকে পরে নাও।
এবার?
মাথায় গুঁজে নে কেতকী ফুল।
গুঁজলাম। এখন?
ঘোর। কোথাও দেখবি ভগবান ননীচুরি করছেন। তাঁর চুরিও সুন্দর। কোথাও দেখবি তিনি হাসছেন, গাছের গায়ে ফুটে উঠেছে তাঁর মুখ। তুই কোনো কথা বলবি না, ভগবানকে বিরক্ত করবি না, কেবল তাঁকে দেখবি। একটা সময় পরে দেখবি, ভগবান তোর পিছু পিছু চলছেন। তোর সঙ্গ লাভের জন্য, তোর সঙ্গে দুটি কথা বলার জন্যে, ভগবান তোর পিছু পিছু চলেছেন। এখন তুই তাঁকে কীভাবে ডাকবি, কখন ডাকবি, কখন দুটি গল্প করবি যমুনার তীরে বসে—সেটা তুই ঠিক করবি, ভগবান নন। দেখবি ভগবান তোর অধরের কথা শোনার জন্যে ব্যাকুল!
নিজেকে সাজিয়ে অপ্সরা গুনগুন করতে লাগল একটি গান। এই গানও সে নিজেই রচনা করেছে। গানটি ছিল এই রকম—
রাই বিনা উঠতি সূর্য
কৃষ্ণ বিনা সংসার জীবন
রাই-কৃষ্ণ কৃষ্ণ-রাই।
জগত সংসার নাগপাশ
গাই সবে মিলে রাধাকৃষ্ণ।
১৫
অপ্সরা নেমে এল পথে। পিছনে ষষ্ঠী। ষষ্ঠী বললে, এত তাড়াতাড়ি তুই তাঁকে পেয়ে গেলি, আর আমি পারলুম না! ধন্য তুই! এমন হল কেন? আমি কেন পারলুম না!
তুমি তো পেয়েই আছ মাসি, তোমার ভাবনা কি!
কই বলো দিকি? আমি যে কিছুই বুঝি না!
কারও মুক্তি পথে, কারো ঘরে, কারো সেবায়। শ্রীকৃষ্ণকে সেবার, গান শোনাবার সে সুযোগ তুমি পেয়েছ, তা কজনে পায়, কজনে পারে? তোমার গলায় মধুর কীর্তন শুনেই তিনি খুব প্রীত হন তা শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি দেখলেই বোঝা যায়। তাঁর মুখের হাসিতেই সেই সন্তোষ লুকিয়ে আছে। তোমার মুক্তি কবেই হয়ে গেছে; তিনি সেই কবেই তোমাকে টেনেছেন; তিনি কবেই তোমাকে বুঝেছেন, কেবল তুমিই সেটা বুঝতে পারোনি। তুমি আছ আলোয়। আর আজ থেকে আমি ধুলোয় নামলাম। সবই আনন্দ মাসি। দুঃখ নয়, আনন্দ, আনন্দম্।
আনন্দী এসে বলল, তুই চললি সই?
চললুম।
যাবি কোথায়?
ধুলোয়।
কোন ধুলো?
ভাঙা পথের রাঙা ধুলো।
আর ধুলোর পরে?
তিনি, তিনি আছেন।
তার পরে?
আলো।
ধুলোর পরে আলো!
হ্যাঁ। সেই আলোও তিনি। ধুলোও তিনি। তিনিই সব। ধুলোকেই আলো হতে দেখলাম। তিনি কেবল আলোক। এই নশ্বর ধরায় যা কিছু আছে সব যেমন তিনি, তিনিই আনন্দঘন মূর্তি; ধুলোকেই তিনি আলোক করে তোলেন, সেই আলোর ওপারেই তিনি আছেন, এখন তাঁকে খোঁজার পালা।
কোথায় মেলে সেই আলো?
পৃথিবীর সবখানে। তবে আমি এখন যাব বৃন্দাবনে।
কী করবি সই সেখানে গিয়ে?
তাঁর নাম করব। পথে পথে ঘুরব। তাঁকে লাভ করব। যুগে যুগে যেসব মানুষ তাঁর পায়ের ধুলো হয়েছে, যারা আলো হয়ে গেছে, যাদের আত্মা ছড়িয়ে পড়েছে তাঁকে ঘিরে; আমি তাদের মধ্যে মিশে যেতে চাই। ধুলো হয়ে, আলো হয়ে, নিঃসীম শূন্যতা হয়ে আমি তাঁর সঙ্গে থাকতে চাই।
আর যতদিন না তুই তাঁকে পাচ্ছিস ততদিন আহার? জীবনধারণ?
পেলে ভালো, না পেলে আরও ভালো। নাম করার সময় বেশি পাব।
আর তোর সংসার?
সে তো কবেই ভাসিয়ে দিয়েছি যমুনার জলে।
আমার নিবি না সঙ্গে?
যাবি তুই? চল। তুই গেলে আমারও ভালো লাগবে। আমই গাইব তুই নাচবি। কোনোদিন তুই গাইবি আমি নৃত্য করব। দুই সখীতে মিলে থাকব আর তাঁকে খুঁজব।
তবে দেরি করিস কেন সই, চল।
কিন্তু চলতে গিয়ে তার পা আটকায়। আনন্দী বসে পড়ে মাটিতে। মুখ দিয়ে শব্দ করে আঃ!
কী হল সই? পায়ে বিঁধল কি?
পথের কাঁটা। বৃন্দাবন আমার জন্যে নয়। তিনিও নন। সকলকে তিনি ডাকেন না, তোকে ডেকেছেন, তুই যা। পথ তোর। আমার পথে বাধা। তুই যা।
কাঁটা বের করে দে। চল। ধুলোয় পায়ের ক্ষত সেরে যাবে।
তোর যাবে, আমার নয়। আমি যে ব্যথার শব্দ করে ফেলেছি। তাঁর পথে চলতে হলে ব্যথা পেলেও তাতে আনন্দ পেতে হবে। আমি সেটা পারিনি, তুই পেরেছিস। তোর পায়েও কাঁটা বিঁধেছে, পা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, কিন্তু তোর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। এ পথ তোর, তুই যাবি, আমি অপেক্ষা করব তাঁর ডাকের। যা, তুই। যা।
একা যাব?
হ্যাঁ। এখন তোর একার পথ। এ পথে কোনো সখী চলবে না। রাধিকার সখীরা সবসময় কি ছিল পাশে? ছিল না। রাসলীলার কথা মনে এনে দেখ। তিনি চাইছেন না আমার যাওয়া। তাই আটকে দিলেন। তিনি চান, তুই একা যা। একারই চল। একাই পথে বেরিয়ে পর। তাঁর লীলা কে বোঝে! ভগবানের চরণকমল হচ্ছে এক অবিনশ্বর নৌকা—যার আশ্রয়ে ভক্ত ভবসমুদ্র পার হতে পারে।
অপ্সরা পথে পা দিল।