• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৪ | এপ্রিল ২০২৪ | গল্প
    Share
  • মুম্বইয়া : অনিরুদ্ধ সেন

    (১)

    কত বছর হয়ে গেল, তবু অমরেশের বরাবরই মুম্বইকে কেমন অদ্ভুত মনে হয়। বিশেষত চলার পথে দেখা হয়ে যাওয়া কিছু বিচিত্র উপকারী বন্ধুদের জন্য।

    প্রায় বছর তিরিশ আগে যখন প্রথম মুম্বই এসেছিল, বড় রাস্তায় গাড়ির স্রোত দেখে সে কিছুক্ষণ হকচকিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। কলকাতার চেয়ে মুম্বইয়ে গাড়ি ছোটে অনেক তাড়াতাড়ি আর এই স্রোত তো থামছেও না। রাস্তা পেরোয় কীভাবে?

    কিছুক্ষণ ধন্দে থেকে শেষে রাস্তায় বেপরোয়া পা বাড়িয়েছে, হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো এক মাঝবয়সী মাছি-গোঁফ পষ্টো বাংলায় “ওভাবে নয় বন্ধু, ওভাবে নয়” বলে এক ঝটকায় তাকে পেছনে টেনে আনল। তক্ষুণি অমরেশের গা ঘেঁষে একটা গাড়ি হুশ করে বেরিয়ে গেল।

    “প্রথম প্রথম অনেকেই অমন তড়বড়িয়ে চাপাটাপা পড়ে। তারপর –”

    “তারপর?” অমরেশের রুদ্ধশ্বাস জিজ্ঞাসা।

    “তারপর?” লোকটা উদাস স্বরে বলল, “শিখে যায়।”

    “মানেটা কী?” ঘাড় ঘুরিয়ে অমরেশ দেখল, পাশে কেউ নেই। কিন্তু তখনই জনতা এক সেকেন্ডের সূক্ষ্ম ফাঁক পেয়ে সম্মিলিতভাবে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ফলে এবার গাড়ির স্রোত রুদ্ধ, চালু হয়েছে জনস্রোত। অতএব অমরেশও সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে পথযুদ্ধে সামিল হল। হঠাৎ পথের ওপাশে তাকিয়ে মনে হল, মাছিগোঁফ ঢ্যাঙা ঢ্যাঙা পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে। দিনেদুপুরে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল।

    তারপর অমরেশ রাস্তাঘাটে সেই উপকারী মাছিগোঁফকে কত খুঁজেছে, পায়নি। কিন্তু সে মনের মুম্বই ডায়েরিতে তেনার এন্ট্রি করে রেখেছে ‘চাপাচুপি দাদা’ বলে।

    (২)

    অমরেশের অফিস দক্ষিণ মুম্বইয়ে। মুম্বইয়ে থাকার জায়গা পাওয়া তখনও দুঃসাধ্য। অনেক কষ্টে আন্ধেরির কাছে ‘এভারেস্ট লজ'এ সাধ্য অনুযায়ী ভাড়ায় সিট মিলল। নামে ‘এভারেস্ট’, আদতে তা একটা একতলা আধপাকা বাড়ি বা ‘চাল’। তাতে সারি সারি টু-বেডের ঘর। বাড়তি ফেসিলিটি, রাতে গায়ের ওপর দিয়ে ইঁদুরের ছুটোছুটি।

    খাওয়া এক বেলা অফিসে, এক বেলা হোটেলে। একদিন এক উডুপি রেস্তোরাঁয় বসে গপাগপ ‘রাইস প্লেট’ গিলছে, পাশের থেকে হাতে টোকা পড়ল। দেখল, পাশের চেয়ারে বসা এক মিচুড়ে বুড়ো তাকে ইশারায় ডাকছে।

    “সাব, এক বাত বলু? খানে কা চিজ পিও অওর পিনে কা চিজ খাও।”

    বুড়োর বাণীতে প্রথমে অমরেশের পিত্তি জ্বলে গেল। কিন্তু পরে ভেবে দেখল, কথাটা মন্দ নয়। সে গোগ্রাসেই খায়। বুড়ো বলছে খাদ্যকে চিবিয়ে তরল করে তবে গিলতে আর পানীয়কে এক এক ঢোঁকে খাবারের গ্রাসের মতো খেতে। সংক্ষেপে, ধীরেসুস্থে খানাপিনা সারতে। “থ্যাঙ্ক ইউ, কাকা” বলে সে আবার থালিতে ফিরল।

    পরদিন অমরেশ আবার ঐ রেস্তোরাঁয় গিয়ে মসালা দোসা নিয়ে বসেছে। কিন্তু প্রথম কামড় দিয়েই তার ঐ জ্ঞানদা বুড়োর কথাটা মনে পড়ল। “দেখিই না একদিন চেষ্টা করে”, সে ধীরে ধীরে প্রতি কামড় খাদ্য চিবিয়ে খেতে লাগল। হঠাৎ তার দাঁতে শক্ত কী একটা ঠেকল। হাতে ধরে বাইরে এনে দেখল, একটা কাঁচের টুকরো!

    কাউন্টারে সেদিন মালিক নিজে ছিলেন। অমরেশ তাঁকে একপাশে ডেকে এনে টুকরোটা দেখাল। ফ্যাকাশে মুখে মালিক বললেন, “আমরা অনেক বছর সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছি, এমন ভুল কখনো হয়নি। প্লীজ, কাস্টমারদের বলবেন না। আপনাকে আমি একমাস ফ্রি ডিনার দেব।”

    “তার দরকার নেই। কিন্তু আপনি দোসার সমস্ত তরকারি এক্ষুনি ফেলে দিন আর কুকদের বলুন কীসের থেকে এই অঘটন ঘটল যেন এক্ষুনি খুঁজে বের করে।”

    “তাই হবে। অনেক ধন্যবাদ।”

    লজে ফিরতে ফিরতে অমরেশ ভাবছিল, ভাগ্যিস বুড়ো কাল ঐ জ্ঞানটা দিয়েছিল আর ভাগ্যিস সে সেটা ‘খেয়েছিল’। নইলে পেটে কাঁচ গিয়ে কী বিপত্তিটাই না হত! এই উপকারী বুড়োকেও সে তারপর কতদিন ঐ হোটেলে খুঁজেছে, পায়নি। শুধু তার মনের ডায়েরিতে নামটা লেখা রইল ‘খাওপিও কাকা’ হিসেবে।

    (৩)

    অমরেশের মামার বন্ধু শিবু মামা সেবার কিছুদিন মুম্বই ঘুরে গেলেন। মুম্বইয়ের মানুষের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, “ওখানকার মানুষ খুব হেল্পফুল। পথেঘাটে কাউকে কিছু জিগ্যেস করলে সব সময় বলে দেয়।”

    শুনে অমরেশ বলেছিল, “ঠিক। কিন্তু তারা এতই হেল্পফুল যে না জানলেও বলে দেয়।” তার নিজের কয়েকবার অমন অভিজ্ঞতা হয়েছে।

    কিন্তু মুম্বইয়ের অধিবাসী বা মুম্বইকরদের সাহায্যের ইচ্ছে শুধু পথনির্দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মুম্বইয়ে বর্ষা স্বভাবত প্রবল। সেবার এক মহাবৃষ্টিতে মুম্বই সাবার্বন রেলের অনেকগুলি ‘রেক’ অকেজো হয়ে গেল। সারাতে সময় লাগবে। তদ্দিন রেলওয়ে বাধ্য হয়ে সার্ভিস কাটছাঁট করেই চালাতে লাগল। ফলে বিশেষত অফিস টাইমে দমচাপা ভিড়, নিত্যযাত্রীদের ছিদ্দোত।

    অমরেশ অফিস ফেরত বরাবর চার্চগেট থেকে আন্ধেরি লোকাল ধরত। কিন্তু সেদিন পর পর অনেকগুলি আন্ধেরি লোকাল ক্যানসেল দেখে অধৈর্য হয়ে সে একটা অপেক্ষাকৃত দূরপাল্লার বোরিভলি লোকালে উঠে পড়ল। স্বাভাবিক সময়ে অসুবিধে হত না। কিন্তু অনেক ট্রেন বাতিল হওয়ায় কয়েক স্টেশন পরেই ট্রেনে অসম্ভব ভিড় হতে শুরু করল। ট্রেন বান্দ্রা ছাড়াতেই অমরেশ দরজার দিকে এগোবার চেষ্টা করে বুঝল, অসম্ভব। সামনের প্রায় সবাই আন্ধেরির পরে নামবে। সেই জমাট ভিড় ঠেলে এক পা এগোনো অসম্ভব।

    অমরেশকে উশখুশ করতে দেখে পাশে দাঁড়ানো এক বলিষ্ঠ মাঝবয়সি পুরুষ বললেন, “নামবেন কোথায়?”

    হাল ছেড়ে দেওয়া অমরেশ বলল, “আন্ধেরি। কিন্তু যা অবস্থা দেখছি, ট্রেন যদ্দুর যাবে আমিও তদ্দুর গিয়ে ব্যাক করব।”

    “ও বাত ছোড়ো।” ভদ্রলোক দৃপ্ত ভঙ্গীতে বললেন, “আরে ভাউ, কওশিশ (চেষ্টা) তো করো।” তারপর অমরেশকে মারলেন এক রামধাক্কা। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে সম্মিলিত আওয়াজ উঠল, “হাঁ ভাউ, কওশিশ তো করো, কওশিশ তো করো।” শেষে আন্ধেরি আসার যথেষ্ট আগেই অমরেশ দেখল, অজস্র বাহুর সম্মিলিত ধাক্কায় ‘কওশিশ ব্রিগেড’ তাকে গেটের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে।

    কয়েক দিন পর। সকালে বেরোতে অমরেশের একটু দেরি হয়ে গেছে। আন্ধেরিতে ওভারব্রিজ থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মে পা দিতে না দিতেই দেখল, ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। কোনোমতে ভিড়ে ঠাসা শেষ কামরার পাদানিতে আদ্ধেক পা দিয়ে সে হ্যান্ডলটা ধরে ঝুলে পড়ল। অচিরেই বুঝতে পারল কামরা জ্যাম প্যাকড, ঠেললেও কেউ এক ইঞ্চি নড়তে পারছে না। ইতিমধ্যে গাড়ি প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে গেছে। আর অমরেশ আবিষ্কার করল, সে পাদানিতে আঙুলগুলি ঠেকিয়ে কার্যত হাতের ওপর শরীরের ভার নিয়ে ঝুলছে।

    ইতিমধ্যে সহযাত্রীরাও বিপদ বুঝে শোরগোল জুড়েছে। কিন্তু নড়েচড়ে জায়গা করে দেওয়া অসম্ভব, এদিকে ঠেললে ও দরজায় লোক পড়ে যাবে। দু'জন হাত দিয়ে অমরেশকে বেড় দিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, যাতে সে দুলতে দুলতে পোস্টে ধাক্কা না খায়। কিন্তু হাত যদি হ্যান্ডল থেকে ফস্কে যায় তবে কারো সাধ্যি নেই তাকে বাঁচায়। “মত ছোড়ো ভাউ, পকড়কে রাখো”, সহযাত্রীরা চ্যাঁচাতে লাগল।

    কিন্তু ধরে রাখা কি সোজা? অমরেশের হাত ক্রমে অবশ হয়ে আসছে, আর পারছে না। একটু দূরে চোখের সামনে দ্রুত ধাবমান মাটি, গাড়ির চাকা আর রেল লাইন সাক্ষাৎ মৃত্যু হয়ে নাচছে।

    হঠাৎ তার কানে বেজে উঠল এক ভরসার কণ্ঠস্বর, “লেকিন কওশিশ তো করো।” “চেষ্টা করে যাও অমরেশ, হাল ছেড়ো না”, সে নিজেকে বলে চলল, “চার মিনিট পরেই স্টেশন, ততক্ষণ তোমাকে ঝুলে থাকতেই হবে।” দাঁতে দাঁত চেপে সে লড়তে লাগল। একসময়ে দূরে দেখতে পেল ভিলে পার্লের আউটার সিগন্যাল। তারপর – আঃ, পায়ের তলায় মাটি! ততক্ষণে সহযাত্রীরা তাকে জড়িয়ে ধরেছে আর অমরেশের চোখ জলে ভরে উঠেছে।

    সেই বলিষ্ঠ ‘কওশিশ তো করো’ প্রৌঢ়ের সঙ্গেও অমরেশের আর দেখা হয়নি। তার মন ডায়েরির পরবর্তী এন্ট্রি, ‘এনথু মাস্টার’।

    (৪)

    অফিসের এক কলিগের সূত্রে অমরেশ অবশেষে অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বে, পরলে একটা থাকার জায়গা পেল। একটি বাঙালি ছেলে দীপক একটা কোনোমতে ফ্ল্যাটে রুমমেট খুঁজছিল, অমরেশকে পেয়ে তার সুবিধেই হল। তদ্দিনে অমরেশেরও মাইনে কিছু বেড়েছে, বাড়তি ভাড়া সাধ্যে কুলিয়ে গেল।

    দীপক দিলখোলা, ‘বিন্দাস’ ছেলে, একটা ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে। প্রায়ই তার নাইট শিফট। পরে অবশ্য অমরেশ বুঝল, সেটা হয়তো ও ইচ্ছে করেই নেয়। কারণ, দীপক একটি বৌদিবাজ ছেলে। তার নাইট হওয়ায় অমরেশের সঙ্গে সেই বৌদিদের মোলাকাত কমই হয়। হলেও অবশ্য ফ্ল্যাটে দুই ঘরের প্রাইভেসি আছে।

    একটু অস্বস্তি হলেও অমরেশ মানিয়ে নিয়েছিল। একদিন শুধু দীপককে জিগ্যেস করেছিল, “এই যে এতজন বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে তুমি ইয়ে করো, তোমার কিছু মনে হয় না?”

    আলতো চোখ মেরে দীপক বলেছিল, “এ ব্যাপারে গোল্ডেন রুল কী, জানো? জবরদস্তি করবে না, কিন্তু কেউ দিতে চাইলে ফেরাবে না।”

    শুধু বছর পঁচিশের একটি মেয়ে আসত, যার কেসটা ছিল একটু আলাদা। দীপক তাকে ‘নীলম ভাবি’ বলত। তার সঙ্গে আড্ডা দিত, ইয়ার্কি মারত, কিন্তু একটা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখত।

    “কী ব্যাপার? নীলম ভাবির সঙ্গে তোমার ‘গোল্ডেন রুল’ খাটে না?” অমরেশ জিগ্যেস করেছিল।

    জিভ কেটে দীপক বলেছিল, “ছি ছি, ও আমার খুব বন্ধু মহেশ ভাইয়ের ইয়ে, মানে –”

    “কীপ?”

    “অ্যাঁ, হ্যাঁ।”

    “তো?”

    একটু গলা নামিয়ে দীপক বলেছিল, “মহেশ পাশের ঝোপড়পট্টির দাদা। এ অব্দি পাঁচটা মার্ডার করেছে।”

    বোঝা গেল! নীলম অবশ্য খুব দিলখোলা। অমরেশ বাড়ি থাকলে তাকেও আড্ডায় ডাকে। অস্বস্তি হলেও অমরেশ বসতে বাধ্য হয়।

    একদিন অমরেশ কোনো কারণে একটু আগে ফিরেছে। বসে একটা ম্যাগাজিন দেখছে, দরজাটা খুট করে খুলে গেল। দীপক? না, নীলম এসেছে। দীপক তাকেও চাবি দিয়ে রেখেছে!

    “দীপক নেই, একটু বসুন।” অমরেশ আড়ষ্টভাবে বলল।

    “কেন, আমি কি আপনার কাছে আসতে পারি না?”

    “অ্যাঁ, অবশ্যই।” অমরেশ ম্যাগাজিনটা রেখে ঘুরে বসল।

    “বৌকে আনবেন না?”

    “বিয়ে করিনি।”

    “যাকে করবেন, সে খুব ভাগ্যবতী।” নীলম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

    “কেন?”

    “সে আপনার বাচ্চা পেটে ধরবে। আপনি খুব ভালোমানুষ, বাবুমশাই।”

    নীলম গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। অমরেশ কী বলবে ভাবছে, দীপক এসে তাকে বাঁচিয়ে দিল।

    ক'দিন পরে দীপক মুচকি হেসে বলল, “জানো, নীলম ভাবি বলছিল, আই লাভ ইয়োর ফ্রেন্ড।”

    “বোধহয় আমার রূপ দেখে?” অমরেশ হেসে ফেলল।

    “সিরিয়াসলি অমরদা, আজকাল মিঠুন গুরু নাম্বার ওয়ান হওয়ার পর থেকে মেয়েরা থোবড়া না দেখেই অমন টল, স্লিম, ডার্ক ছেলেদের পছন্দ করছে।”

    অমরেশ আর কথা বাড়াল না।

    আরো ক'দিন পর। সন্ধ্যায় অমরেশ বাড়ি ফিরেছে। দীপক এক বৌদিকে নিয়ে চড়তে বেরিয়েছে, তারপর সোজা চলে যাবে ডিউটিতে। এমন সময় নীলম এল।

    “মহেশ আজ রাতে থাকবে না।”

    “তো?”

    “ঝোপড়পট্টিটা খতরনাক জায়গা, একা কখনো থাকিনি। আমি আজ রাতে এখানে শোব।”

    অমরেশ আঁতকে উঠে বলল, “কিন্তু দীপক যে নেই।”

    “আপনি তো আছেন।” নীলম গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, “আমি দশটার মধ্যেই চলে আসব।”

    কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থাকার পর অমরেশ হঠাৎ চনমনিয়ে উঠল। কিছু একটা করতে হবে আর এক্ষুনি। হঠাৎ মনে পড়ল, তার বন্ধু তীর্থ কিছু দূরে কিংস সার্কলে থাকে।

    অমরেশকে দেখে তীর্থ হৈ-হৈ করে উঠল, “আরে আয়, আয়। অ্যাদ্দিনে মনে পড়ল?”

    “একটা রাত তোর এখানে থাকব।” অমরেশ তারপর বন্ধুকে ব্যাপারটা খুলে বলল।

    “মোস্ট ওয়েলকাম।” তীর্থ হেসে বলল, “কিন্তু বাডি, তুমি বড্ড ডরপোক। অ্যায়সা মওকা ফির কভি না মিলেগা।”

    “দূর, শেষে ঐ গুণ্ডা-পাণ্ডাদের চক্করে পড়ে –”

    একটু সকাল সকাল উঠে বেরিয়ে পড়বে ভেবেছিল অমরেশ। কিন্তু তার আগেই ধরণী মাতা তাকে তুলে দিল। রাত চারটে নাগাদ মনে হল খাটটা কে জোরে নাড়াচ্ছে। পাশের ঘরে তীর্থও উঠে পড়েছে। একটু পরে চারদিকে মহা শোরগোল। হৈচৈ, ঘণ্টা, কাঁসর। ভূমিকম্প হচ্ছে!

    আলো ফুটতেই তীর্থকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল অমরেশ। ততক্ষণে জেনেছে, কয়েকশো কিলোমিটার দূরে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছে, এ তার প্রভাব। মুম্বইয়েও পুরোনো ঘরবাড়ির কিছু ক্ষতি হয়েছে।

    বাড়ি ফিরে অমরেশ দেখল, টেবিলের কিছু জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়ানো। আর তার ঘরের জরাজীর্ণ ফ্যানটা হুক থেকে খুলে বিছানায় পড়ে রয়েছে।

    ভাগ্যিস সে নীলমের ভয়ে পালিয়েছিল! নইলে যে কী সর্বনাশ হত!

    তবে তার জন্য নীলমকে ধন্যবাদ জানানো আর হয়ে ওঠেনি। নীলম সে রাতে কী করেছিল কে জানে, কিন্তু তারপর আর আসেনি। ক'দিন পর দীপক বলল মহেশের পেছনে পুলিশ লেগেছে, তাই সে নীলমকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে ভেগেছে।

    নীলমের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। শুধু অমরেশের মন ডায়েরিতে যোগ হয়েছে ‘ভূকম্প ভাবি।’

    (৫)

    তারপর বেশ ক’বছর কেটে গেছে। অমরেশ বিয়ে করেছে। বোরিভলির কাছে দহিসরে লোনে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে। স্ত্রী মালবিকা আর ছেলে কুণালকে নিয়ে তার ছোট সংসার।

    সেদিন বিকেলে অমরেশ ভিরার লোকাল ধরবে বলে দাঁড়িয়ে। সে এখন ফার্স্ট ক্লাসে যাতায়াত করে, তাতে অল্পসল্প সুবিধে হয়। তবু উল্টোদিকের গাড়ি আসামাত্রই লাফিয়ে উঠতে হয়, নইলে বসার জায়গা জোটে না।

    গাড়ি ঢুকেছে, যাত্রীরা নামছে। অমরেশ এগিয়ে উঠতে যাবে, এক দশাসই চেহারার বয়স্ক যাত্রী নামতে নামতে টাল সামলাতে না পেরে তাকে এক ধাক্কা মারল। কোনোমতে সামলে নিলেও অ্যাটাচিটা গেল হাত থেকে পড়ে। তুলতে তুলতে অমরেশ দেখল অপেক্ষমান যাত্রীরা উঠে সব সিট দখল করে নিচ্ছে।

    “সরি, আপনার লাগল?”

    “দেখেশুনে চলবেন তো?” রাগতভাবে বলল অমরেশ।

    “আসলে কী জানেন, আপনাকে দেখে দেশে আমার লেড়কার কথা মনে পড়ে গেল। একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম, তাই –”

    ভদ্রলোকের স্বরে বিষণ্ণতার ছোঁয়া। অমরেশ একটু নরম হয়ে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু বসার জায়গা তো সব ভরে গেল।”

    “টেরেন একটা গেলে আরেকটা পাবেন, বরং পরেরটাতেই যান। আপনার ফেমিলি?”

    “বৌ আর এক ছেলে।”

    “সাবধানে যান। সবাই ভালো থাকুন।”

    লোকটা লম্বা লম্বা পা ফেলে ভিড়ে মিশে গেল। আর পরের ভিরার লোকালের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অমরেশের মনে হল, বয়স্ক দেখালেও লোকটার গায়ে খুব জোর।

    অমরেশের অবশ্য সেদিন ফিরতে অনেক দেরি হয়েছিল। তাদের ট্রেন কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। একটু পরেই জানতে পারল, ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের সাতটি ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কামরায় বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। অবিলম্বে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। অনেক কষ্টে এ বাস সে বাস ধরে সে রাত বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরল।

    যে ট্রেনটায় সে উঠতে যাচ্ছিল সেটাতেও বিস্ফোরণ হয়েছে, সম্ভবত যে কামরায় সে উঠতে যাচ্ছিল সেটাতে। অর্থাৎ ঘটনাচক্রে তার ঐ অপরিচিত ব্যক্তিটির সঙ্গে ধাক্কা না লাগলে দ্বিশতাধিক মৃতের তালিকায় হয়তো তার ক্ষুদ্র নামটিও যোগ হত।

    হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা তার মাথায় খেলে গেল – ‘বয়স্ক’ লোকটা তাকে জেনেশুনেই ধাক্কা দেয়নি তো? হয়তো সে ঐ কামরায় বিস্ফোরক রেখে নেমে আসছিল আর হঠাৎ অমরেশকে দেখে তার 'দূরদেশের’ ছেলের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় তাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল? তার জীবনদাতা হলেও লোকটা হয়তো ছদ্মবেশী সন্ত্রাসবাদী?

    সংশয়ে পড়ে পরদিন সকালেই সে স্থানীয় থানায় গিয়ে ঘটনাটা রিপোর্ট করল। অফিসার হাই তুলে বললেন, “খবর শুনে তো কত লোক এমন লম্বাচওড়া টেররিস্টদের কহানি নিয়ে আসছে। আমরা এখন খুব ব্যস্ত, কত লিড সামলাব? আপনি রিপোর্ট লিখে দিয়ে যান, দেখছি।”

    অর্থাৎ রিপোর্টটা বাজে কাগজের ঝুড়িতে যাবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এল অমরেশ। স্বভাবতই, সেই লোকটার সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। শুধু মুম্বই ডায়েরির শেষ এন্ট্রিটা রয়ে গেছে, ‘ধাক্কাবুক্কা বাবা’।

    (৬)

    আরো এক দশকের ওপর কেটে গেছে। অমরেশ রিটায়ার করেছে। তার বৌ তখনো এক টেলিকম অফিসে চাকরি করছে আর ছেলে পড়তে গেছে বিদেশে। এমন সময় দেশে তথা বিশ্বে এল কোভিড অতিমারী।

    সবকিছু বন্ধ। তবু মালবিকার কাজ অত্যাবশ্যক বলে তাকে বেরোতে হয়। যথেষ্ট সাবধানতা সত্ত্বেও সেই পথেই শেষে শনি ঢুকল। প্রথমে মালবিকা, তারপর অমরেশ কোভিডে আক্রান্ত হল। মালবিকা চট করে সামলে উঠলেও অমরেশের অবস্থা খারাপের দিকে গেল। শেষে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হল।

    অক্সিজেন আর ড্রিপ নিয়ে পড়ে আছে অমরেশ, অধিকাংশ সময় আচ্ছন্ন অবস্থায়। ভিজিটিং আওয়ার্স আসে যায়, কিন্তু কোভিড ওয়ার্ডে ভিজিটর অ্যালাউড নয়। মালবিকা শুধু নির্দিষ্ট কিছু সময়ে ফোনে স্বামীকে দেখতে পায়। কিন্তু অমরেশ বিশেষ কথা বলতে পারে না। সে বুঝতে পারছে না আর সেরে উঠবে কিনা। না উঠলে প্রিয়জনেরা শেষবার তাকে দেখতেও পাবে না। বস্তাবন্দি হয়ে সোজা চলে যাবে ইলেকট্রিক চুল্লিতে।

    এমন এক বিকেলে সে শুয়ে আছে। হঠাৎ কে যেন ডাকল, “হে বস, কেমন আছ?” তাকিয়ে দেখল, চাপাচুপি দাদা!

    “ভালো নেই, দাদা। কিন্তু তুমি এলে কীভাবে?” অবাক হয়ে বলল অমরেশ।

    “সিকিউরিটিকে ফাঁকি দিয়ে।” মুচকি হেসে বলল চাপাচুপি দাদা, “দাঁড়াও, অন্যদেরও ডাকি।” তারপর অমরেশের বিস্মিত চোখের সামনে একের পর এক দেখা দিতে লাগল খাওপিও কাকা, এনথু মাস্টার, ভূকম্প ভাবি আর সবশেষে, ধাক্কাবুক্কা বাবা!

    “সাবধানে পা ফেলো, তোমায় এখনো অনেক পথ চলতে হবে।” বলল চাপাচুপি দাদা।

    “ধীরেসুস্থে খাওপিও, তোমার এখনো অনেক খানাপিনা বাকি।” বলল খাওপিও কাকা।

    “আরে ভাউ, হাল ছেড়ো না। কওশিশ তো করো।” দৃপ্তমুখে বলল এনথু মাস্টার।

    “একটা রাতে পালিয়েই ভেবেছ বাঁচবে? তোমার এখনো অনেক রাত বাকি।” পষ্টো চোখ মারল ভূকম্প ভাবি।

    সবশেষে ধাক্কাবুক্কা বাবা এগিয়ে এসে বলল, “ডরো মত, বেটা। একটা টেরেন গেছে তো কী, লাস্ট টেরেনের এখনো অনেক দেরি।”

    “আমি ভালো হব তো, বন্ধুরা?” জিগ্যেস করল ব্যাকুল অমরেশ।

    “অবশ্যই। জরুর। শিওর।” সমবেত ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল ওয়ার্ড। তারপর অমরেশকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তারা একে একে বেরিয়ে গেল।

    পরদিন সকালে নার্স অমরেশকে চেক করে বলল, “বাঃ, বেশ ভালো আছেন দেখছি।” নভোচর পোশাকে নার্সের মুখ ঢাকা, কিন্তু কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট খুশির আভাস।

    “কবে ছাড়া পাব?” ক্লান্তস্বরে জিগ্যেস করল অমরেশ।

    “হুঁ, অক্সিজেন কমিয়ে দিয়েছি, কাল হয়তো তুলে নেব। জ্বর কমেছে। বোধহয় দু'দিন পরে ডাক্তারবাবু ছুটি দেবেন। আর ফোনটা কাছে রাখুন, আপনার স্ত্রী কল করবেন।”

    একটু পরেই ভেসে এল মালবিকার উদ্বিগ্ন মুখচ্ছবি, “কেমন আছ?”

    “খুব ভালো। জানো, কাল ভিজিটিং আওয়ার্সে ওরা এসেছিল।”

    “কোভিড ওয়ার্ডে?” মালবিকার ভ্রু কুঞ্চিত হল।

    “হ্যাঁ। মানে চাপাচুপি দাদা, খাওপিও কাকা, এনথু মাস্টার, ভূকম্প ভাবি আর ধাক্কাবুক্কা বাবা।”

    মালবিকার মুখ কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল, “এ মা, কীসব ভুলভাল বকছ! তবে যে সিস্টার বলল তুমি অনেকটা ভালো?”

    “ভালোই তো। চিন্তা কোরো না, বন্ধুরা বলে গেছে আমি ভালো হয়ে যাব। দু'দিন পর ফিরছি, বাই।”



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)