• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | কবিতা
    Share
  • সেসার ভায়েখোর পাঁচটি কবিতা : সেসার আব্রাহাম ভায়েখো মেন্‌দোজা
    translated from Spanish to Bengali by স্বপন ভট্টাচার্য



    পেরুর কবি সেসার আব্রাহাম ভায়েখো মেন্‌দোজা (César Abraham Vallejo Mendoza ১৮৯২-১৯৩৮) জীবদ্দশায় তাঁর মাত্র তিনখানি কবিতার বই প্রকাশিত হতে দেখে গিয়েছেন। কিন্তু যে কোন দেশেই কবিতাচর্চায় নিয়োজিত যাঁরা, তাঁরা মেনে নেন বিংশশতাব্দীর কাব্যভাষা ও কাব্যনির্মানে যে ক’জন মোড় ফেরানো কাজ করে গিয়েছেন ভায়েখো অবশ্যই তাঁদের মধ্যে থাকবেন। সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন ভায়েখো এবং তিনটি বইয়ের কোনটাতেই ফর্ম বা ভাষার কোন পুনরাবৃত্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। অনুবাদে আদৃত হয়েছেন সারা বিশ্বে। টমাস মার্টন তাঁকে বলেছেন দান্তের পরে সবচেয়ে বড়ো ইউনিভার্সাল পোয়েট। আর এক ব্রিটিশ ক্রিটিক মার্টিন সেইমুর-স্মিথ তাঁকে যে কোন ভাষায় বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি বলে মেনেছেন। যে পাঁচটি কবিতার অনুবাদ এখানে সংকলিত হল- প্রতিটিই বিখ্যাত কবিতা এবং বহুবার, বহু ভাষায় অনূদিত। শব্দকে তিনি যেন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে তুলতে চেয়েছেন। অনুবাদে সেই অনুভব পৌঁছে দেবার কাজে বাধা অতএব ভায়েখো নিজেই, কেন না ভায়েখোর শব্দকে অনুবাদে ধারণ করার যদিও বা চেষ্টা করা যেতে পারে, তাঁর ব্যাথাকে অনুবাদের ভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই অনুবাদ, কেন না অনুবাদই অনুরণিত হবার এই অনুভব ভাগ করে নেওয়ার সেরা উপায়।

    কৃষ্ণবর্ণ দূত

    জীবনে এত কঠিন আঘাত থেকে গেছে......আমি জানতাম না!
    আঘাত যেন ঐশ্বরিক ঘৃণা। যেন মুখোমুখি,
    চোরা স্রোত সেই ভার বহনের যা
    ঢেউ তুলেছে আত্মায়। আমি জানতাম না!

    বিরল বটে, তবে তারা আছে। তারা খুলে দেয় আঁধারের গলি
    সবচেয়ে ভয়ংকর মুখ এবং সবচেয়ে দৃঢ় স্কন্ধে।
    হতে পারে তারা বর্বর অ্যাটিলাদের ময়লা কেশর ওড়া অশ্বশাবক
    অথবা কৃষ্ণবর্ণ দূত মৃত্যুর বার্তাবাহক যারা।

    হয়ত তারা আত্মার স্খলিত জিশু গভীর পতনে
    যেন পতন প্রত্যাশিত বিশ্বাসের যার নিয়তি অভিশপ্ত।
    এই নৃশংস আঘাতগুলো রুটির ফেঁপে উঠে ফেটে যাবার শব্দ
    আমাদের যা চুল্লির ঢাকনার বাইরে পোড়ায়।

    এবং মানুষ: বেচারি বেচারি মানুষ! তার চোখ পাক খায়
    যেন কাঁধের ওপর মৃদু চাপড় মেরে কেউ ডেকেছে হঠাৎ।
    তার উত্তেজিত চোখ ঘোরে, এবং যা কিছু সইতে হল সবটাই
    এক অপরাধী গোষ্পদের মত উথলে ওঠে তার দৃষ্টিপাতে।
    জীবনে এমন কিছু কঠিন আঘাত থেকে গেছে......আমি জানতাম না।

    Los heraldos negros

    “টেনিস প্লেয়ার সেই মুহূর্তটায়”

    টেনিস প্লেয়ার সেই মুহূর্তটায়
    যখন সে দক্ষতার সঙ্গে বলটা সার্ভ করে
    তখন তাকে সম্পূর্ণতঃ গিলে নেয় এক পাশবিক সারল্য,
    দার্শনিক যে মুহূর্তে নতুন সত্যের মুখোমুখি
    এক বিশুদ্ধ জানোয়ার।
    আনাতোল ফ্রাঁস মনে করতেন
    যে ধার্মিক অনুভূতি আসলে উপজাত পদার্থ
    মানব শরীরের কোন বিশেষ প্রত্যঙ্গের,
    আজ পর্যন্ত অপরিজ্ঞাত, এবং সেই কারণেই
    এমনও বলা যেতে পারে
    সেই বিশেষ মুহুর্তে যখন প্রত্যঙ্গটিকে
    পুরোদস্তুর কাজে লাগানো হবে
    এতটাই বিবিমিষাহীন হয়ে পড়বেন একজন ঈশ্বরবিশ্বাসী
    কেউ তাকে প্রায় একটা সবজি ভেবে বসতে পারে।
    ওহ্‌ আত্মা! ওহ্‌ দর্শন! ওহ্‌ মার্ক্স! ওহ্‌ ফয়েরব্যাখ!

    En el momento en que el tenista lanza

    যে ক্রোধ একজন মানুষকে কিছু শিশুতে ভেঙে দেয়

    যে ক্রোধ একজন মানুষকে কিছু শিশুতে ভেঙে দেয়,
    এক একটি শিশুকে ভেঙে দেয় অনুরূপ পাখির দলে
    এবং তারপর প্রতিটি পাখিকে ছোট ছোট ডিমে-
    গরিবের ক্রোধে
    কিছুটা তেল রয়েছে দুটো ভিনিগারের মুখোমুখি।

    যে ক্রোধ একটা গাছকে পাতায় ভেঙে দেয়
    পাতাকে পরস্পর অসমান মুকুলে
    এবং একটা মুকুলকে দূরবীক্ষণিক ভাঁজে-
    গরিবের ক্রোধে
    মাত্র দু’খানা নদী অজস্র সাগরের মুখোমুখি।

    যে ক্রোধ ভালোকে ভেঙে দেয় অনেক সংশয়ে,
    সংশয়কে অনুরূপ তিনখানা ধনুকখিলানে
    এবং তারপর প্রতিটি খিলানকে এক একটা অপ্রত্যাশিত কবরে-
    গরিবের ক্রোধে
    রয়েছে ইস্পাত দুটো ভোজালির মুখোমুখি।

    ক্রোধ যা আত্মাকে শরীরে ভাঙে,
    শরীরকে অসমান কিছু অঙ্গে
    এবং একটা শরীরকে কিছু আট ভাঁজের চিন্তায়-
    গরিবের রাগে
    রয়েছে একটা জ্বলন্ত কেন্দ্রবিন্দু দুখানা কূপের বিরুদ্ধে।

    La cólera que quiebra al hombre en niños

    এবং এত কথার পরেও যদি

    এবং এত কথার পরেও যদি
    কথা বাঁচতে না পারে!
    যদি উড়ানের পরে,
    দাঁড়িয়ে থাকা পাখি বাঁচতে না পারে!
    ভালো হবে, সৎভাবে বললে,
    সব যদি ভোগ করে নেওয়া এবং চুকিয়ে ফেলা!

    জন্মানো মৃত্যুকে বাঁচা দিয়ে যাপনের উদ্দেশ্যে!
    নিজেকে উন্মার্গগামী করে তোলা নিজেদের সর্বনাশগুলো দিয়ে
    আকাশ থেকে পৃথিবীর অভিমুখে,
    খুঁজতে থাকা সঠিক মুহুর্ত বজ্র হয়ে ঝলসে দেওয়ার
    আমাদের অন্ধকার আমাদের ছায়াগুলো দিয়ে!
    ভালো হবে, সত্যি বলতে কি,
    সবকিছু ভোগ করে নেওয়া এবং চুলোয় যাক সব!

    এবং এত ইতিহাস রচিত হবার পরেও যদি, আমরা আত্মসমর্পন
    না করি অনন্তের কাছে
    বরং সেই সব সাদামাটা জিনিসের কাছে,
    যেমন বাড়িতে বসে আয়েস অথবা চিন্তায় নিমগ্ন হতে শুরু করা!
    এবং যদি আমরা তখন আবিষ্কার করে বসি
    আচম্বিতে যে আমরা বেঁচে আছি- বিচার করতে
    তারাদের উচ্চতার মাপে- একটা চিরুনির
    এবং রুমালে লেগে থাকা দাগগুলোর ভরসায়!
    ভালো হবে, সৎভাবে বলতে গেলে,
    সব কিছুই ভোগ করা, নিশ্চিতভাবেই।

    ওরা বলে থাকে যে আমাদের
    এক চোখে অনেক বিষাদ
    আর অন্য চোখেও, ও’রকম, অনেক বিষাদ
    এবং উভয়ের মধ্যেই, যেদিকেই দেখুক তারা, বিপুল বিষাদ......
    সুতরাং.........ইহা পরিস্কার! সুতরাং.........কথা নয় আর !

    ¡Y si después de tántas palabras,

    আমি আশার কথাই বলব

    আমি এই কষ্টটা পাচ্ছি সেসার ভায়েখো হিসেবে নয়। এই কষ্টটা আমি একজন শিল্পী হিসেবেও সহ্য করছি না,
    একজন মানুষ হিসেবে, অথবা সাধারণ এক জীবিত অস্তিত্ব হিসেবেও নয়। এই কষ্টটা আমি সহ্য করছি
    একজন ক্যাথলিক হিসেবে নয়, একজন মুসলমান হিসেবে অথবা একজন নাস্তিক হিসেবেও নয়। আজ আমি
    কেবল কষ্ট সহ্য করছি। যদি আমার নাম সেসার ভায়েখো না হত, আমি তবুও এই একই কষ্ট সহ্য করতাম।
    যদি আমি একজন মানুষ না হতাম অথবা জীবিত কেউ, তবুও আমাকে তা সইতে হত। যদি আমি একজন
    ক্যাথলিক না হতাম, একজন নাস্তিক, অথবা একজন মুসলমান, তথাপি আমাকে সইতে হত। আজ আমি
    সহ্য করছি আরও অনেক গভীর থেকে। আজ আমি কষ্ট পাচ্ছি।

    আমি এখন কষ্ট সহ্য করছি কোন ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে। এত গভীর কষ্ট আমার যে এর কোন কারণ ছিল না
    কখনও- ছিল না কোন কারণের অভাবও। কী কারণই বা থেকে থাকতে পারে? প্রাসঙ্গিক এমন কিছুই বা
    কোথায় যা কারণ হয়ে উঠতে ব্যর্থ হবে? কোন কারণ নেই- এবং কোন কিছুই কারণ হবার পথে বাধা হয়ে
    উঠতে পারে নি। কী ভাবে এই কষ্টটা স্বতঃই জন্মালো? আমার কষ্ট উত্তরের বাতাস থেকে এবং দক্ষিণের
    বাতাস থেকে, যেমন যৌনতাবিবর্জিত সেইসব বিরল পাখিদের পেড়ে যাওয়া ডিম বাতাস নিষিক্ত করে যায়।
    যদি কোন প্রেমিক মরে যায়, আমার কষ্টটা একই থাকবে। যদি আমার গলা ওরা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়,
    আমার কষ্ট একই থাকবে। যদি জীবন- অতি সংক্ষেপিত-অথবা অন্য কিছু, আমার কষ্ট একই থাকবে। আজ
    আমি সহন করছি আরও অনেক উপর থেকে। আজ আমি কেবল কষ্ট পাচ্ছি।

    আমি ক্ষুধার্তের কষ্ট দেখি এবং দেখি যে তাদের ক্ষুধার যন্ত্রণা আমার কষ্ট থেকে এতটাই দূরে যে আমি
    আমরণ অনশনেও থেকে যেতে পারি অথবা নিদেনপক্ষে ঘাসের একটা শিষ যে কোন সময় আমার সমাধির
    উপর জন্মাতে পারবে। একই কথা প্রেমিক-প্রেমিকাদের সম্পর্কে। তাদের রক্ত কতটা বেশি উদ্বেলিত আমার রক্তের
    চেয়ে, যার নেই কোন উৎস, নেই ব্যবহার!

    এতাবৎ ভেবেই এসেছি যে ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুই হয় জনিতা নয়তো জাতক। কিন্তু দ্যাখো, আমার কষ্টটা
    পিতামাতাও নয়, সন্তানও নয়। এর কোন কাঁধ নেই যা কালো হয়ে যাবে, এর রয়েছে অত্যাধিক চওড়া বুক
    যাতে কোন সূর্যোদয় হবে না, এবং যখন তারা একে আঁধার ঘরে নিয়ে যাবে তখন কোন আলো উৎসারিত
    হবে না, যখন আলো ভরা ঘরে নিয়ে যাবে তখন কোন ছায়া সঞ্চারিত হবে না। যা’ই ঘটে থাকুক না কেন
    আজ আমি কষ্ট সহ্য করছি। শুধু সহ্য করে চলেছি আমি।

    Voy a hablar de la esperanza

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)