• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | প্রবন্ধ
    Share
  • পরমজননী সত্তা -- তার বিকাশ ও বিবর্তন : শিবানী ভট্টাচার্য দে


    দুর্গা (আধুনিক প্রতিমা)

    বিশ্বজুড়ে মানবসভ্যতার আদিযুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় অবধারিতভাবে সব সংস্কৃতির মননে এক পরমজননী সত্তার অস্ত্বিত্বের চিন্তার উন্মেষ ঘটেছিল। মানুষ জন্মমাত্র মাতৃনির্ভর। মাকে সে দেখেছিল পালন, আশ্রয়, স্নেহ, পুষ্টি, ও সৃষ্টির মূর্তিরূপে। তার মনে হয়েছিল এই মায়েরই এক বৃহত্তর মৃত্যুহীন মহাজননীর সত্তা আছে, যা পৃথিবীরূপে উর্বর, যা শস্য দেয়, জীবকে জন্ম ও আশ্রয় দেয়, আবার আকাশরূপে জ্যোতিষ্কদের জন্ম দিয়ে আলো দেয়, মেঘ থেকে জল দেয়, নদীরূপে জলধারণ করে জীবনধারণের মূল উপাদান যোগায়। এই সত্তা ধ্বংসের পরও নূতন জন্ম দিতে পারে। তাই এই সত্তা তার কাছে পরমজননী এবং শক্তিময়ী ঈশ্বরীরূপে প্রতিভাত হয়েছিল। যেসব প্রাকৃতিক রহস্য সে বুঝত না, যেসব বিপদকে আধিদৈবিক বা আধিভৌতিক বলে ভাবত, মহাজননী তাকে সেইসব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং সেইসব অনধিগম্য রহস্যের উদ্‌ঘাটন করে দেবেন বলে আশা করত, সেই মহাজননীর আরাধনা করত একান্ত নিজস্ব অনুভবের দ্বারা।

    প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য এবং এখন পর্যন্ত পাওয়া কিছু কিছু প্রাচীন প্যাপিরাসের ছবিলেখন, বিভিন্ন দেশের পৌরাণিক গল্প ইত্যাদির ইঙ্গিত থেকে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন, সেই সুদূর অতীতের সমাজ ছিল মাতৃকেন্দ্রিক। সন্তান মায়ের নামে পরিচিতি পেত। বৃদ্ধা জননী (matriarch) ছিলেন পরিবারের কর্ত্রী, বংশের পরিচায়িকা। সন্তানকে জন্ম দেবার পর সন্তান মায়ের কাছেই থাকত, ক্রমে ক্রমে পরিবার বড় হত, প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাছাকাছি থাকাতে গোষ্ঠী গড়ে উঠত অনিবার্যভাবে। পুরুষের ভূমিকা ছিল গর্ভাধানের, কিন্তু মাতৃকেন্দ্রিক পরিবারগুলোতে তার ভূমিকা ছিল অনেকটা মৌমাছি বা পিঁপড়েদের পুরুষপতঙ্গের মত, সন্তান উৎপাদনেই শুধু কাজে লাগে।

    সেই আদিযুগে মানুষ গুহাবাসী, কয়েক লক্ষ বছর ধরে চলা মানুষের অভ্যুদয় থেকে আদি প্রস্তরযুগ হয়ে নব্যপ্রস্তর যুগের কাল। প্রথমদিকে মানুষ ঘর বাঁধতে শেখেনি, নিয়মিত কৃষিকাজ আয়ত্ত হয়নি, বড়জোর ফল বা বীজ যে খাওয়া যায় সেটা জানত, শিকার করে জন্তুর কাঁচা মাংস খেত। প্রত্নতত্ববিদেরা অনুমান করেন, সন্তানধারণের পর নারীকে যেহেতু এক জায়গায় অনেকদিন থাকতে হত, সে-ই প্রথম প্রকৃতির নিয়মগুলো লক্ষ করেছিল।

    গুহার মধ্যে আদিম জননী তার সন্তানকে জন্ম দিত, সুরক্ষিত রাখত। একের পর এক সন্তানের জন্ম হত, পরিবার বৃদ্ধি হত। আধুনিক যুগের নিয়মে যৌনতার গম্য-অগম্য ভাগ বা বোধ ছিল না, এক নারীর বহু যৌনসঙ্গী হবার কোনো বাধা ছিল না। বন্য পশুসমাজে যেমন দেখি, তেমনি যে পুরুষ বেশি বলশালী, সে অন্য পুরুষকে পরাস্ত করে নারীতে উপগত হবার অধিকার পেত, কারণ বলশালী পুরুষের সন্তানের বলশালী হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর সবার জন্য গুহাতে স্থান সঙ্কুলান হচ্ছিল না, কিছু নারী তার পরিবার নিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে কুটির বানাল, নদীর পলিমাটিতে আপনা থেকে গজানো শস্যবীজ যা পশুপাখিরা খেত, তারাও খেয়ে দেখল সেসব বেশ খাদ্য। তা-ই সংগ্রহ করে খাদ্যের জোগাড় করতে লাগল, পরে নিজেরাই বীজ বপনের মর্মকথা বুঝে নিজেরাই বীজ মাটিতে বপন করে ফসল তুলতে লাগল, এবং কৃষির গোড়াপত্তন হল। তখনও নারীই ছিল শস্যের অধিষ্ঠাত্রী। আমাদের দেশের সাঁওতাল লোককথায়ও প্রথম যুগের কৃষিতে নারীর অবদানের কথা স্বীকার করা হয়, বলা হয়, আদি সাঁওতাল রমণী পিলচু বুড়ি লাঙ্গল তৈরি করেছিলেন।

    নারীর সন্তান প্রসবের এবং পৃথিবীর উদ্ভিদ ফলানোর, জীবজন্তুকে জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা আদিম মানুষের চোখে একই প্রকারের ঐশী শক্তি মনে হত। এই ঐশী শক্তিকে তারা মাতৃকামূর্তির প্রতীকে পুজো বা আরাধনা করত। তাই দেখা যায়, প্রাচীন পৃথিবীর বেশিরভাগ শস্যদেবতা এবং জলদেবতা স্ত্রী। যেমন মিশরের শস্যদেবী আইসিস, ভারতে প্রাথমিক পর্যায়ের জল ও শস্যের দেবী সরস্বতী এবং পরবর্তী যুগের শস্যদেবী লক্ষ্মী।


    প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য

    মাটির নিচে খোঁড়াখুড়ি করে বহু দেশেই প্রস্তরযুগীয় মাতৃকামূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারত, ইরান থেকে মেসোপটেমিয়ার সুমের সভ্যতা হয়ে পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার উপকূলবর্তী দেশগুলোতেও মাটির নিচে থেকে প্রাচীন এবং অতি প্রাচীন মাতৃকামূর্তি পাওয়া গিয়েছে। ইউরোপ মহাদেশের অস্ট্রিয়ার উইলেনডর্ফ (willendorf)-এ আনুমানিক ২০০০০-২৫০০০ বছর পুরোনো মাতৃকা পাওয়া গিয়েছে, যা উইলেনডর্ফ-এর ভেনাস নামে পরিচিত, এবং গ্রিক সভ্যতার সমনামা লাস্যময়ী যুবতী দেবীমূর্তির থেকে একেবারেই আলাদা, কারণ এটি অতি পৃথুলা এক গর্ভিণী নারীর মূর্তি। মূর্তিটি সিঁদুররঞ্জিত, এর সঙ্গী দুটো সিংহী, এবং একে পাওয়া গিয়েছে বহুযুগ পুরোনো শস্যভাণ্ডার থেকে, অর্থাৎ বলা যায় যে শস্য-সুরক্ষার আশীর্বাদ কামনায় মূর্তিটি স্থাপিত হয়েছিল। তুর্কির আনাতোলিয়া অঞ্চলের গ্রাম কাতালহোয়ুক (katalhoyuk)-এর নারীমূর্তি ছ’হাজার বছর পুরোনো বলে অনুমান করা হয়। এটি দুটি সিংহের মাঝখানে বসে থাকা পৃথুলা গর্ভিণী মাতৃকামূর্তি। সিংহবাহিনী মাতৃকামূর্তি আরো আছে, যেমন তুর্কির ফ্রিজিয়া প্রদেশের সিবিলি, আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে এঁকে kubileya matar অর্থাৎ ‘গিরিবাসিনী মাতা’ বলা হত, আমাদের দেশের পার্বতীর মত! সিবিলি পরে গ্রিস হয়ে ইতালি পর্যন্ত মহামাতা (Magna Matar) হিসেবে আরাধিত হতেন। ভারতীয় উপমহাদেশের মহেঞ্জো-দাড়ো, হরপ্পার পুরাবস্তুর সঙ্গে পাওয়া মাতৃকা মূর্তি --- এই সবই প্রমাণ করে যে তৎকালীন পৃথিবীতে মাতৃকার আরাধনা ধর্মের আকার নিয়েছিল। পশ্চিম আফ্রিকায় মূর্তি পাওয়া না গেলেও লোককথায় মাতৃধর্মের ঐতিহ্য ছিল, য়োরুবা (yoruba) জাতির জগজ্জননী ইয়েমায়া (yemaya, mother of all)-এর অস্ত্বিত্ব য়োরুবাদের খ্রিস্টান হবার পর মাতা মেরির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল।


    হরপ্পা সভ্যতার মাতৃকা


    কাতালহোয়ুক (katalhoyuk) এর সিংহবাহিনী


    উইলেনডর্ফের ভেনাস

    প্রত্নতাত্বিকেরা অনুমান করেন যে মাতৃকামূর্তিগুলো পুজো করা হত, বা রক্ষাকবচের মত বিশেষ বিশেষ স্থানে রাখা হত, যেমন মন্দিরে, শস্যাগারে বা শস্যক্ষেত্রে। মাতৃকামূর্তির বিশেষত্ব হল এগুলোর স্তন শরীরের তুলনায় বিশাল, এবং কোনো কোনো মূর্তির স্তন দুয়ের বেশি, পশ্চিম তুর্কির ইজমির অঞ্চলে প্রাপ্ত মহামাতৃকা আর্টিমিসের স্তন তো আঠেরোটি। স্তন বড় বা সংখ্যায় বেশি হলে সন্তানের পুষ্টির অভাব হবে না--- হয়তো এমন ধারণা ছিল। স্ফীত উদর ও উরু দেখে বোঝা যায় তাতে গর্ভবতীর ধারণাকে প্রধান রাখা হয়েছে, বেশিরভাগ মূর্তির যোনিদেশও স্ফীত ও অনাবৃত--- যাতে স্পষ্ট, জন্মের প্রক্রিয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা বলেই তখন ধরা হত। গর্ভবতী নয় তেমন নারীমূর্তির কোলে শিশু, হাত দিয়ে ধরে রাখা আরো শিশু, অর্থাৎ বহুপ্রসবিনী জননীই আকাঙ্ক্ষিত, যা তৎকালীন সময়ের অল্প জনসংখ্যার নিরিখে স্বাভাবিক। এমন কি এই মূর্তিগুলোর মধ্যে রজস্বলা নারীর আভাস ও বিরল নয়। নারীর রজস্বলা হওয়া, গর্ভধারণ, সন্তানপ্রসব, সন্তানকে নিজের স্তনে উৎপাদিত দুধ খাইয়ে পোষণ, এই সবই ছিল তখনকার মানুষের চোখে নারীর বিশেষ বা অতিপ্রাকৃত শক্তির লক্ষণ, যা সম্ভ্রমের ও সম্মাননার যোগ্য। গর্ভধারিণী, সন্তানবতী নারী পৃথিবীর মত উর্বরা, প্রসবিনী, ধাত্রী ও দাত্রী।


    বহুস্তনী আর্টিমিস, প্রাচীন ইফেসাস, আধুনিক ইজমিরএর নিকট প্রাপ্ত, তুর্কি

    দেশভেদে পরমজননী

    প্রাচীন সমাজের এই পরমা মাতৃদেবতাদের কিছুটা আভাস পাওয়া যায় নানা দেশের রূপকথা, পুরাণ, পুরাতত্ত্বের সাক্ষ্য, ইত্যাদি থেকে। প্রাচীন মিশরীয় পুরাণের দেবমাতা ‘নুত’(Nut) রাতের আকাশের দেবী। তিনি জ্যোতিষ্কদের জন্ম দেন। তাঁর সর্বাঙ্গে তারা শোভিত। তিনি সন্ধ্যায় ‘রা’ অর্থাৎ সূর্যকে গিলে ফেলেন, প্রত্যূষে সূর্যকে পুনরায় জন্ম দিয়ে আকাশে স্থাপন করেন। তিনি গাভীর রূপে, কখনো বা শূকরীর রূপে পৃথিবী আবৃত করেন, পৃথিবীর উপরে থাকেন। হয়তো গাভীর দুধ থেকে তার বাছুর সহ অনেক মানবশিশুর পোষণ, শূকরীর বহু শাবককে একই সঙ্গে স্তন্যপানে পোষণের ক্ষমতা তাদের আদর্শ মাতৃদেবতার পর্যায়ে উন্নীত করেছিল। এই নুত ‘সু’ (বাতাস) ও ‘টেফনুতে’র (আর্দ্রতা) কন্যা। তাঁর স্বামী তাঁরই ভাই ‘যেব’, যে পৃথিবীর দেবতা হিসেবে তাঁর নিচে থাকেন। তাদের পাঁচটি দেবসন্তান, যাদের মধ্যে ওসাইরিস ও আইসিস আবার স্বামী-স্ত্রী হিসেবেও বিখ্যাত। পরবর্তীকালে শস্য ও প্রাণের দেবী এই আইসিসও পরমমাতার পদ পান। ওসাইরিসকে তাঁর ঈর্ষান্বিত ভাই হত্যা করে দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল, তারপর আইসিসের চেষ্টায় টুকরোগুলো জোড়া লেগে যায়, তিনি পাতালে চলে গিয়ে পুনরুজ্জীবনের দেবতাতে পরিণত হন। পরবর্তী যুগের মিশরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেবী সূর্যদেবতা রা-এর কন্যা মাত, যিনি ন্যায়নীতি, সত্য ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী। মিশরের সে সময়কার রাজারা এই মাত-এর নামে শপথ নিতেন।

    ইউরোপ খণ্ডের গ্রিক পুরাণের মতে সারা বিশ্ব জুড়ে প্রথম ছিল বিশৃঙ্খলা (Chaos)। বিশৃঙ্খলা থেকেই সৃষ্টির ধাপে আসেন দেবতারা। দেবদেবীর মধ্যে প্রথম আছেন গাইয়া (Gaia), যিনি পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গাইয়া স্বয়ম্ভূ, আদিমাতা। তিনি পুরুষ ছাড়াই কয়েকজন দেবতার জন্ম দেন, যাদের অন্যতম ইউরেনাস (আকাশদেবতা)। এই ইউরেনাস পরবর্তীকালে গাইয়ার অন্য সন্তানদের জনক হন। গাইয়া ও ইউরেনাসের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন রিয়া (Rhea) ও ক্রোনস (Cronos)। পরবর্তী সময়ের দেবরাজ জিউস (Zeus), দেবরানি হেরা (Hera), কৃষি ও শস্যের দেবী ডিমিটার (Demeter), পাতালের ও মৃত্যুর অধিপতি প্লুটো (Pluto) — এঁরা হলেন রিয়া ও ক্রোনস-এর সন্তান। এখনকার মতে এইসব যৌন সম্পর্ক অবৈধ, কিন্তু আধুনিক চশমা দিয়ে এইসব গল্প পড়লে চলবে না। সেই কালে মানুষ আদিম পর্যায় থেকে বেশিদূর উঠতে পারেনি, তাই দেবতার যৌন আচরণও পশুর চাইতে ভিন্ন ছিল না। তাই সকল সংস্কৃতিতেই আজকালকার মতে যা অবৈধ, সেরকম যৌন সম্পর্কের গল্প আছে। সেই সময়কার স্মৃতিকথা এদিক ওদিক জুড়ে কল্পনার সাহায্যে পুরাণ রচিত হয়েছে। মাতৃকাদেবী রিয়া সিংহবাহিনী, ইনিও পৃথিবীর প্রতীক এবং পরবর্তীকালে সিংহবাহিনী দেবী কিবিলি (Kybele) বা সিবিলি (Cybele), যাঁর কথা একটু আগে বলা হয়েছে, তাঁর সঙ্গে এক হয়ে যান। জিউস দেবরাজ বলে প্রতিষ্ঠিত হলে গ্রিক পুরাণের স্বর্গে পুরুষদেবতার আধিপত্যও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। জিউস স্বেচ্ছাচারী, কামুক, প্রচণ্ড বলশালী, তাঁর প্রতাপে সমস্ত দেবদেবী কোণঠাসা হয়ে যান। জিউসের কন্যা আথেনা (Athena) ও যুদ্ধ ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী শক্তিময়ী দেবী, কিন্তু তাঁর স্থান জিউসের নিচে।

    গ্রিসের পূর্বদিকে এশিয়া মহাদেশের প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সুমের সভ্যতায় সর্বোচ্চ দেবী স্বর্গের রানি ইনান্না (Inanna); ইনি সিংহবাহিনী, আবার এঁর সঙ্গে প্যাঁচাও থাকে। এঁর হাতে ধনুক এবং পিঠে তূণীর, এঁর পাখির মত ডানা ও আছে এবং কোথাও কোথাও এঁর পা দুটোও পাখির পায়ের মত। ইনি প্রেম, যৌনতা, উর্বরতা এবং যুদ্ধের দেবী। পরবর্তীকালে ইনি ইস্থার (Isthar) নামে শস্য ও জলের দেবতা হিসেবেও পরিচিত হন। বলা হত যে ইনান্নাই পর্বত থেকে মানুষকে শস্যবীজ এনে দিয়েছিলেন এবং কৃষিকাজ শিখিয়েছিলেন। ইস্থার-এর স্বামী হলেন কৃষক ও পশুপালকদের দেবতা ডুমুজিদ (Dumuzid)। মেসোপটেমিয়ার পুরাণ অনুসারে এই ডুমুজিদ বছরের বেশিরভাগ সময় মৃত অবস্থায় পাতালে থাকতেন, তবে প্রতি বছর বসন্তে বেঁচে উঠতেন, সেই সময় ইস্থারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ও মিলন হত। বসন্তের মাসগুলো ছিল ফসল তোলার মাস, প্রকৃতির নবজীবনের সময়, পশুদের ও মিলনের কাল, তাই মানুষও এই উপলক্ষে আনন্দোৎসব করত। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে যখন ধরিত্রী ছটফট করে, ঘাস পর্যন্ত মরে যায়, তখন কৃষক এবং পশুপালকদের দেবতাও বেঁচে থাকতে পারেন না, তাই শুষ্ক গ্রীষ্মে ডুমুজিদ মারা যেতেন যতদিন না ইস্থার তাঁকে বাঁচিয়ে তুলতেন।

    ইসলামপূর্ব আরবদেশেও মাতৃদেবতা ছিলেন। পাথুরে সাক্ষ্যে আল লাত, আল উজ্জা, মান্নাত, তিন প্রধান দেবীকে একসঙ্গে দেখা যায়। বলা হত এঁরা সর্বোচ্চ দেবতা আল্লার কন্যা। এঁদের মধ্যে আবার আল লাত ছিলেন প্রধানতম। ইনি সিংহবাহিনী দেবী, এঁর একক মূর্তির হাতে ধরা শস্যগুচ্ছ দেখা যায়। তাই অনুমান করা যায় যে ইনিও ছিলেন শস্যদেবী। এঁর মন্দির ছিল অনেক, পূজোও হত। এঁর প্রতীক ছিল ঘন-আকৃতি পাথরের টুকরো। পরবর্তীকালে পশ্চিম এশিয়ায় রোমান বিজয়ের পর আল লাত গ্রীক দেবী আথেনার


    আল লাত, আল ঊজ্জা ও মানাত

    সমগুণসম্পন্ন যুদ্ধ ও জ্ঞানের দেবী হয়ে ওঠেন। ইসলামধর্মের অভ্যুদয়ে এই দেবীদের উপাসনা বন্ধ হয়ে যায়, এবং আল্লা একেশ্বরে পরিণত হন।

    আরো পুবদিকে এগোই তো দেখব প্রাচীন ইরানে ছিলেন জনপ্রিয় দেবীমাতা অনহিতা। ইনিও সিংহবাহিনী, আবার জলদেবী এবং শস্যদেবীও। এঁর আরেক নাম আরদ্বি অথবা আরদ্বি সু্রা অনহিতা। এঁর পারসিক নাম আরদ্বি আরো প্রাচীন পারসিক শব্দ ‘হরহ্‌বতি’ থেকে উদ্ভূত, বৈদিক ভাষায় যা সরস্বতী। প্রাচীন পারস্যের ভাষা বৈদিক ভাষার বোন বলা যায়। তাই হরহ্‌বতি এবং সরস্বতী একই শব্দের রকমফের : সরঃ = জল, জলাশয়, বতী = যিনি ধারণ করেন। পারসিক ভাষায় ‘স’কে ‘হ’ উচ্চারণ করা হত। সরস্বতীর মতই পদ্মফুল অনহিতারও প্রিয়, এবং তাঁর প্রতীকও। পারসিকরা প্রথমদিকে বহু দেবতার পুজা করত, পরে জরাথুস্ট্রের প্রচারিত ধর্মে আহুরমাজদা একেশ্বর হিসেবে মান্য হন। এই একেশ্বরবাদের সময়েও দেবী অনহিতা পূজিত হতেন। এঁর সিংহবাহন প্রতিমাও আছে। প্রাচীন পারস্যের একটি এইরকম সিংহবাহন অনহিতা দেবীর মূর্তির পেছনে মণ্ডলাকৃতিতে সাজানো অনেকগুলি কীলকের মত শিখা আছে, বেশ কিছু গবেষকের মতে এখানে ইনি সম্ভবত সূর্যের প্রতীক। এখানে উল্লেখযোগ্য যে প্রাচীন পারস্যের লিপিও কীলকাকৃতি, অর্থাৎ কতকগুলো গোঁজকাঠি সাজিয়ে লিখলে যেমন হয়, তেমন ধরনের ছিল। জল এবং শস্য জীবন এবং পুষ্টির জন্য একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সুর্যের আলো আবার জীবনের উৎস। আলো জ্ঞানেরও প্রতীক। সেই তাই বোধ হয় এই সব কিছুর অধিষ্ঠাত্রী একজন দেবতাই ছিলেন। ভারতীয় বৈদিক দেবী ঊষার সঙ্গে এদিক দিয়ে অনহিতার সামঞ্জস্য আছে।


    কীলক লিপি (Cuneiform script) সুমের সভ্যতা
    থেকে প্রাচীন পারসিক সভ্যতা পর্যন্ত এই লিপিতে লেখা হত

    প্রতিমার পেছনের এই আলোকরশ্মির মণ্ডল ভারতীয় উপমহাদেশের হরপ্পা সভ্যতার কোনো কোনো প্রতিমাতেও দেখতে পাওয়া যায়। হরপ্পা সভ্যতায় যে ব্যাঘ্রবাহিনী মাতৃকার মাথার পেছনে যে শলাকার আভাস দেখা যায়, অনুমান করা হয় সেগুলি কিরণ এই অনহিতার মত, ইনি দেবী ঊষার আদি রূপও হতে পারেন। বিখ্যাত গবেষক ডি ডি কৌসাম্বি বলেন, বৈদিকযুগে আরাধিত হবার পূর্বে হরপ্পা সভ্যতায়ও উপাস্য ছিলেন দেবী ঊষা, এমন ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে। ঊষাকে দশভুজা বলা হয়েছে বৈদিক সাহিত্যে, হয়তো ঊষায় উদিত সূর্যরশ্মিকেই দশ হাত বলে কল্পনা করা হয়েছে। আমরা জানি হাতের প্রতিশব্দ ‘কর’, আবার ‘কর’ মানে ‘কিরণ’ও। প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ সুকুমার সেনের মতে ঊষার শারদীয়া বোধন হত। বৈদিক যুগের পরে ঊষার পুজো আর হত না, কিন্তু তাঁর রূপের অনুকরণে দশভুজা দেবী দুর্গার রূপের কল্পনা করা হয়েছিল, এবং দুর্গার পুজোয় বোধন হয়।


    সিংহশাসনকারিণী অনহিতা


    সিংহবাহিনী অনহিতা, দেবী দুর্গার সঙ্গে মিল লক্ষণীয়। পেছনে কীলক অথবা আলোকমণ্ডল

    পঞ্চম শতকের সিংহবাহিনী দেবী নানা আফগানিস্তান অঞ্চলে পূজিত ছিলেন। শক্তিপীঠ হিংলাজ তীর্থে পূজিতবিবি নানী এই নানা মাতৃকার স্মৃতিবাহী।


    আফগানিস্তানের দেবী নানা

    সম্ভবত পাল আমলেই (খ্রিস্টীয় দশম শতক) মূলত বাঙালি বণিকদের উদ্যোগে দেবী চুন্দা বা চণ্ডীর উপাসনা মালয় উপদ্বীপপুঞ্জের সুমাত্রা বালি, জাভা, বোর্নিও প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচলিত হয়, দীনেশ সেনের বৃহৎ বঙ্গ গ্রন্থে এরকম একটি পর্যবেক্ষণ আছে। চণ্ডী মূলত মুণ্ডাদের দেবী। আর্য ও অনার্যদের বহুকাল ধরে পাশাপাশি বসবাসের ফলে যে স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিনিময় হয়, তাতে তৎকালীন শাস্ত্রকারেরা অনার্য দেবী চণ্ডীকে দুর্গার সঙ্গে মিলিয়ে দেন। দেবীর আদি মহিষমর্দিনী রূপটি সেই সময়েই কল্পিত হয়েছিল, হয়তো বুনো মহিষ দমন করে কৃষিজমির রক্ষণের প্রয়োজনে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জাভা অঞ্চল পর্যন্ত দেবীর পুজো চালু হয়েছিল, পদতলে বধ্য মহিষটি এই অঞ্চলের সমস্ত দুর্গামূর্তির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

    তবে ভারতের আদি বৈদিক সভ্যতায় দেবমাতা ছিলেন অদিতি। অদিতি শব্দের অর্থ যা অচ্ছেদ্য, যথা - আকাশ, বা পৃথিবী। দেব শব্দের অর্থ হল দীপ্তিমান। অদিতির সন্তানেরা হলেন আদিত্য, এরা ছাড়াও বসু, রুদ্র ইত্যাদি বৈদিক দেবতা। এদের মধ্যে আদিত্যরা হল সূর্যের দিনের এবং বৎসরের সময়ভেদে বিভিন্ন রূপ, প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক বৈশিষ্ট্যরা হল রুদ্র, এবং বসুরা হল আলো ও আগুনের গুণাত্মক দেবতা। আকাশরূপিণী দেবী দেবতাদের জন্ম দেন এটা আদি মিশরীয় সভ্যতাতেও দেখা গিয়েছে, আগেই আলোচনা করেছি। অদিতির পরের মুখ্য দেবী হলেন ঊষা, যিনি আলোকরূপ দশহাত বিস্তার করে দেখা দেন, অন্ধকার বিনাশ করেন। ঊষার বিপরীতে রাত্রিও বৈদিক দেবী, কৃষ্ণবর্ণা রহস্যময়ী, বেদে এঁকে ঊষার বোন বলা হয়েছে। ইনি পৃথিবীর জীব জড় সব কিছুর উপর প্রভাব বিস্তার করেন, নিদ্রা দিয়ে শান্তি ও বিশ্রাম দেন, আবার মোহরূপ নিদ্রা থেকে মুক্তিও দেন। এই দেবী রাত্রিই পরবর্তীযুগে দেবী কালীতে পরিণত হয়েছিলেন, এবং আলোর দেবী ঊষা পরবর্তীকালের দেবী দুর্গার কল্পনাতে সাহায্য করেছিলেন --- কালী এবং দুর্গা দুজনকেই কালরাত্রি বলা হয়, দুজনে অভেদ কল্পনা করা হয়।

    বৈদিক যুগের আরেক মুখ্য দেবী সরস্বতী প্রথমে ছিলেন জলের অধিষ্ঠাত্রী। সমনামা একটি নদী বইত সেকালে, যার কুলে বৈদিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। জল না হলে কৃষি হয় না, জীবন ও সভ্যতার বিকাশ হয় না, তাই নদীর মধ্যে দেবত্বের আরোপ করা হয়েছিল। জল, শস্য ও বিদ্যা একই দেবীর অধিষ্ঠাতৃত্বে চলে আসে, সরস্বতীকে শ্রী অর্থাৎ সৌন্দর্যের দেবীও বলা হতে থাকে। পরবর্তীকালে ‘শ্রী’র সমার্থক ‘লক্ষ্মী’কে আলাদা করে শস্যের দেবতা করে দেওয়া হয়, সরস্বতী কলা ও বিদ্যার দেবী রয়ে যান। এদিকে সরস্বতী নদীও শুকিয়ে যায়, স্বাদু জলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে গঙ্গা উঠে আসেন। শস্য ও সম্পদের দেবী হিসেবে লক্ষ্মীর পরিচিতি হল, শ্রী তাঁরও নাম হল। লক্ষ্মী পৌরাণিক যুগের প্রথমদিকের দেবী, খাদ্য দিয়ে প্রাণের রক্ষা করেন বলে তাঁকে জগন্মাতার আসন দেওয়া হয়েছে। আরো পরবর্তীযুগে, অর্থাৎ বৈদিক যুগের পর মহাকাব্যের যুগ (আনুমানিক খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি) থেকে দুর্গা সর্বপ্রধান দেবীর স্থান অধিকার করেন। হিন্দুধর্মের একটি বৈশিষ্ট্য হল, যে দেবতাকেই পুজো করা হয়, তাঁকেই সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞানী এবং সর্বশক্তিমান ব্রহ্মের স্বরূপ বলে কল্পনা করা হয়।


    মধ্যযুগের মাতৃদেবতা (ভারতের মধ্যপ্রদেশ)

    দেবীমহিমার চরম মহিমান্বিত উচ্চারণ আমরা পাই ঋগবেদের আম্ভৃণী বাক্‌-এর রচিত দেবীসূক্তে, দেবী এখানে পরম ঈশ্বরী, সমস্ত পার্থিব ধন ও অপার্থিব জ্ঞানের আধার,--- তিনিই জগতের আদিকারণ এবং সঞ্চালক, শক্তির চরমতম কথা, জ্ঞানের শেষ লক্ষ্য ----

    “অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি অহমাদিত্যৈরুত বিশ্বদেবৈঃ।

    অহং মিত্রাবরুণাবুভৌ বিভর্মি অহমিন্দ্রাগ্নি অহমশ্বিনাবুভৌ।।

    আমি রুদ্র, বসুদের রূপে, আদিত্য ও বিশ্বদেবগণের রূপে সঞ্চরণ করি। আমি মিত্র এবং বরুণকে পোষণ করি, ইন্দ্র, অগ্নি ও অশ্বিনীকুমারদ্বয় আমারই রূপ।

    * * *

    অহং রাষ্ট্রী সঙ্গমনী বসূনাং চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম।

    তাং মা দেবা ব্যধধুঃ পুরুত্রা ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যা বেশয়ন্তীম।

    আমিই জগতের ঈশ্বরী, সমস্ত ধন আমাতেই পুঞ্জীভুত, এবং আমিই ধনপ্রদায়িনী। ব্রহ্মকে জ্ঞাতা দেবগণ যাদের জন্য যজ্ঞ করা হয়, আমিই তাদের মধ্যে প্রথমা। দেবতারা বহুরূপে সর্বভূতে প্রবিষ্ট আমাকে সর্বদেশে সর্বদিকে স্থাপন করে আরাধনা করে থাকে। ,

    * * *

    অহং সুবে পিতরমস্যমূর্ধন্‌ মম যোনিরপ্স্ব ঽন্তঃসমুদ্রে।

    ততোবিতিষ্ঠে ভুবনানু বিশ্বো তামূ দ্যাম্‌ বর্ষ্মণোপস্পৃশামি।।

    এই বিশ্বের পিতা যে দ্যুলোক, তাকে আমিই প্রসব করেছি । যেখানে সমস্ত প্রাণীর উদয় ও বিলোপ হয়, সেই চৈতন্যরূপ সমুদ্র আমার নিবাসস্থল। সর্বলোকে আমি বিস্তারিত হয়ে প্রবিষ্ট হই, আমি দ্যুলোককে স্পর্শ করে আছি।”

    কিন্তু কালক্রমে সমাজে সম্পদ যত বাড়তে থাকে, তা রক্ষা করতে পুরুষের দৈহিক বলের প্রয়োজন হয়। বলশালী পুরুষের প্রভাব যত প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, দেবীরা পেছনে চলে যান, তাঁরা তৎকালীন মনুষ্যসমাজের ধারা অনুসারে তাঁদের স্বামীর পরিচয়ে পরিচিত হতে থাকেন। সম্ভবত এই দেবীর স্বামীরা মূলত ছিলেন সমাজের নেতা বা দেবীর পুজোর পুরোহিত, যারা সাধারণ্যে দেবীমাহাত্ম্য প্রচার করতেন। মহেন-জো-দারোর মহিষের শিং-এর মুকুট মাথায় যে মূর্তিটিকে এতদিন পশুপতি শিবের আদি রূপ বলে ভাবা হয়েছিল, সেই মূর্তিটিকে এখন অনেক ঐতিহাসিকই মাতৃকার পুরোহিত বা প্রচারক বলে মনে করেন। একথা মনে হবার কারণ, দেবীদের কিছু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা শক্তির অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু তাঁদের স্বামীরা ঋষি অথবা যোদ্ধা দেবতা -- যেমন অদিতির স্বামী ঋষি কশ্যপ, পার্বতী এবং লক্ষ্মীর স্বামী যথাক্রমে শিব এবং বিষ্ণু। পৌরাণিক তিন প্রধান দেবতার একজন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, যিনি পৌরাণিককালে প্রাথমিকভাবে বৈদিক সরস্বতীর জনক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু পরে তাঁকে সরস্বতীর স্বামীও বলা হয়। জগতের পরিচালক হিসেবে কল্পিত আদি শক্তিকে চিরন্তন সময় বা মহাকালের বিপরীতে মহাকালী নামে আখ্যায়িত করা হয়, তিনি বৈদিক দেবী রাত্রির সঙ্গে একীভূত হয়ে যান। তিনিই কৃষ্ণবর্ণা পার্বতীর পরিচয়ে ত্রিদেবের শেষ দেবতা শিবের পত্নী হন। পত্নী হয়ে যাবার পর স্বামীদের ছায়ায় তাঁদের গুরুত্ব যথারীতি খর্ব হয়ে যায়, বলা হয় তাঁরা আসলে তাঁদের স্বামী বলে কল্পিত দেবতার কার্যকারিণী শক্তি। তাঁদের নামেও স্বামীর পরিচয় চলে আসে, বিষ্ণু বা নারায়ণের পত্নী হিসেবে লক্ষ্মীর অন্যতম নাম নারায়ণী, সরস্বতী হন ব্রহ্মাণী, পার্বতী হন ভবানী বা মহেশ্বরী, --- ভব, মহেশ্বর ইত্যাদি শিবেরই নাম। উলটো ব্যাপারটা হয় না, স্ত্রীদেবতা প্রাচীনতর হলেও তাঁর পরিচয়ে স্বামীর পরিচয় হয় না। আপাতত মনে হবে, শক্তি ছাড়া দেবতা মূল্যহীন, তাই স্ত্রীদেবতা পুরুষ দেবতা থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় শক্তির নিয়ন্ত্রক ও নিয়ামক শিব, অর্থাৎ পুরুষ দেবতা, যিনি স্ত্রীকে ছাড় দেন বা দমিয়ে রাখেন।

    তবে পুরুষ দেবতারা প্রাধান্য পেলেও ভারতের কোণে কোণে পুরুষদেবতা-নিরপেক্ষ মাতৃদেবতার পূজার ধারা চলছিল। সেই ধারা যে শাস্ত্র অনুসারে চলত, তার নাম তন্ত্র। ঐতিহাসিক যুগের প্রথম দিকে, প্রথম সহস্রাব্দ জুড়ে একদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং অন্যদিকে নিজেদের অন্তঃকলহে রাজ্যগুলো মাঝে মাঝেই বিপর্যস্ত হত। মৌর্য সাম্রাজ্য বা গুপ্ত সাম্রাজ্যের মত এক একটা বড় সাম্রাজ্য ও যে গড়ে ওঠেনি, তা নয়, কিন্তু দু-এক শতাব্দী পরে সেগুলো ভেঙ্গে যেত। একদিকে যেমন আঞ্চলিক রাজারা নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত হতেন, তেমনি অঞ্চলে অঞ্চলে একাধিক দেবতা, যেমন শিব, বিষ্ণু, কার্তিকেয় ইত্যাদি পূজ্য হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেইসব দেবতার ভক্তদের মধ্যে বিবাদ বিভেদ এক এক সময় ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত, মানুষ একত্রিত হবার বদলে পরস্পর লড়াই চলত। সেইরকম বিবাদিত সময়ে সেই তন্ত্রের ধারাকে পুরাণ গ্রন্থে অনেকটা আত্মস্থ নিয়ে করে প্রধান দেবতাদের মিলিত শক্তিকে দশভুজা প্রচণ্ড তেজস্বিনী দুর্গা রূপে কল্পনা করা হল, আপামর সমাজের সকলের কাছে গ্রহণীয়তা আনতে অনার্যদের চণ্ডীদেবীকেও দুর্গার সঙ্গে একাত্ম করা হল। তখন দেবী দুর্গা সর্বপ্রধান দেবীরূপে পরিচিত হলেন। সেই দেবীর মাতৃরূপেই সন্তুষ্ট থাকেনি, তাঁকে সিংহপৃষ্ঠে বসিয়ে তাঁর হাতে অস্ত্র দিয়ে তাঁকে রণমত্ত যোদ্ধা রমণীরূপে কল্পনা করে, যাঁকে দেবতারাও করজোড়ে প্রণাম করেন। এটা বেশ আশ্চর্য করে যে বেশিরভাগ মহামাতৃকার বাহন সিংহ, যেমন এশিয়া মাইনর ও গ্রিসের দেবী রিয়া বা পরবর্তীকালের সিবিলি, সুমেরীয়দের ইনান্না, প্রাক্‌ইসলাম আরবদেশীয়দের আল লাত, ইরানের অনহিতা এবং ভারতবর্ষের দুর্গা। ভক্তদের কাছে এই দেবীরা একদিকে যেমন মায়ের মত স্নেহশীল, অন্যদিকে প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন, অস্ত্রধারিণী, রণরঙ্গিণী এবং সেই কারণেই বোধ হয় তাঁদের বাহন হিসেবে পশুরাজ কল্পিত হয়েছিল। পৌরাণিক গল্পগুলোতে দেখা যায় যে দেবীদেরও পুরুষের লালসার শিকার হতে হয়েছে। সেজন্য হয়তো দেবীরা সিংহকে পোষ্য এবং সঙ্গী করেছিলেন। এবং আরেকটা কথা, তখন সিংহ এশিয়া ইউরোপ এবং আফ্রিকার বেশিরভাগ জায়গায় বিচরণ করত।

    হিন্দুধর্মে এখন পর্যন্ত দেবী দুর্গাই নানা জায়গায় নানারূপে সবচাইতে বেশি আরাধিত, তিনি প্রকৃতিস্বরূপা, প্রাকৃতিক সকল গুণের আধার, আবার তিনি জননী এবং ধাত্রী। তাঁর স্তোত্রে বলা হয় তিনি “মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’, ‘শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’, বলা হয় ‘ত্বং দেবী জননী পরা’। কিন্তু তাঁকে আবার শিবপত্নী পার্বতীর সঙ্গে অভেদ করে দেখানোও হয়। পিতৃতন্ত্রের যুগে যোদ্ধা দেবীও স্বতন্ত্র নন, সাধারণ নারীর মতই কারো না কারো পত্নী।


    পালযুগের মহিষাসুরমর্দিনী

    শক্তিময়ী দেবীর আরাধনার ধারা আফ্রিকাতেও আছে। মিশর ছাড়া মূল আফ্রিকার কঙ্গোর প্রাচীন ধর্মে আকাশমাতা ন্‌যাম্বিচি ছিলেন, আকাশপিতা এবং সূর্যদেবতা ন্‌যাম্বি ম্‌পুঙ্গু। প্রথমদিকে এঁরা ছিলেন ভারতীয় ধারার অর্ধনারীশ্বরের মত, পরস্পর সংযুক্ত। মধ্য আফ্রিকায় খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তনের পর ন্‌যাম্বি স্রষ্টা ঈশ্বরের পদে উন্নীত হন এবং ন্‌যাম্বিচি তাঁর পত্নীর পদে নেমে যান। স্রষ্টা ঈশ্বর হন সর্বোচ্চ দেবতা, তাঁর পত্নী পৃথিবীর রানি, সব জীবের মাতা ও পৃথিবীর সমস্ত রহস্যের অধিষ্ঠাত্রী ।

    পশ্চিম আফ্রিকার নাইজেরিয়ার ইবো সমাজেও সর্বোচ্চ মহামাতা ‘ন্‌নেকা’ আছেন, যেমন দেখি চিনুয়া আচিবির লেখায়--

    ‘ন্‌নেকা’, তারা বলেছিল, মাতাই সর্বোচ্চ। তাঁকে আমরা রেখে দেব সেই সর্বশেষ সময়ের জন্য যখন মহাসংকট আসবে, আমাদের কোমর ভেঙ্গে আগুনের উপর ঝুলিয়ে রাখা হবে, এবং পামগাছের ফুল আসবে পাতার প্রান্তে। যখন এই বিশ্ব মানুষের শ্রবণের গোচরে ভাঙতে শুরু করবে, তখন নারী তার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ধরাতলে নামবে এবং সমস্ত আবর্জনা একসঙ্গে ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করে দেবে।

    --অ্যান্টহিল্‌স অব দ্য সাভানা

    আধুনিক পৃথিবীতে মাতৃদেবতার স্থান

    মাতৃদেবতার পুরোনো পৃথিবী জুড়ে এই বিচরণ থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে পৃথিবীতে একসময় মাতৃদেবতা পরম ঈশ্বরীরূপে মানুষের কল্পনায় বিরাজমান ছিলেন। পৃথিবীতে যা কিছু প্রাণের সহায়ক, তার সবকিছুর অধিষ্ঠাত্রী ছিলেন মাতৃদেবতারা। কিন্তু সভ্যতা যত এগোতে লাগল, মানুষের দৈহিক বলের প্রয়োজন বাড়তে থাকল। পুরুষে পুরুষে ভূমি ও যোনির অধিকার নিয়ে সংঘর্ষ বাঁধতে লাগল আকছার। এই সংঘর্ষে নারী ছিল পরোক্ষ। জয়ী বলশালীকে সে বরণ করত বলশালী সন্তানপ্রাপ্তির আশায়। কিন্তু জয়ী পুরুষ তার শত্রুকেই শুধু নয়, পরাজিতের ভূমি ও তার নারীকেও জয় করেছে ভাবতে থাকল। এবং তবুও বহুদিন পর্যন্ত নারীর যৌনসঙ্গী নির্বাচনে স্বাধীনতা ছিল। সে অবস্থা পালটাল যখন কৃষির ফসল উদবৃত্ত হল, খাদ্যের জোগানের জন্য পশুপালক পুরুষের গুরুত্ব বাড়ল, খাদ্যের নিশ্চিন্তিতে জীবন সহজতর হল। পুরুষ ও নারী যৌনতার সম্বন্ধে একসঙ্গে থাকতে লাগল, নারীর যৌনসঙ্গী পুরুষটিই তার উপর যৌনতার অধিকার খাটাতে থাকল, সেই হল তার স্বামী, অর্থাৎ প্রভু। ধীরে ধীরে মহতী পৃথিবীমাতাও তাঁর সমুদায় সম্পদ নিয়ে বলশালী পুরুষের অধীন ও ভোগ্য হলেন। জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম—এই প্রকৃতির নিয়মের রহস্যময়তায় আশ্চর্য হবার বা শ্রদ্ধার মানসিকতা হ্রাস পেল, কারণ কালক্রমে অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনেক রহস্যের ব্যাখ্যা বা সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল। এদিকে প্রকৃতির অপার সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার যত বৃদ্ধি পেল, ততই মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকল। নিয়ন্ত্রক পুরুষ পৃথিবীর উপরে দৃশ্যমান নির্গুণ আকাশকে পিতৃদেবতা হিসেবে গ্রহণ করে অধিকতর ক্ষমতাশালী বজ্রধারী ঈশ্বর (জিউস, ইন্দ্র) খুঁজে পেল।

    তবুও মাতৃউপাসক হিসেবে থেকে গেল মেয়েরা, গোপনে। কারণ বলশালী পুরুষ তার নিজস্ব পুরুষ দেবতা খুঁজে পেয়েছে, তাই নারী দেবতার কাছে মাথা নোয়ানো তার কাছে অপমানজনক। তাই দেশে দেশে নারীদেবতার পুজো রহিত হল, তাঁদের মন্দির ভগ্নস্তূপে পরিণত হল। মধ্যযুগের বাংলায় মঙ্গলকাব্যের নায়কেরা নারীপূজিত দেবতাকে অবহেলা করেন, কেউ আবার স্ত্রীর পূজিত স্ত্রীদেবতার ঘট লাথি মেরে ফেলে দেন। তবে মঙ্গলকাব্যের যুগ বিদেশি আক্রমণের যুগ, অবক্ষয়ের যুগ, তাই চারদিকে নাজেহাল হয়ে শেষপর্যন্ত পুরুষ তার স্ত্রীর পূজিত দেবীর কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়।

    সেমিটিক ধর্মগুলোতে এই চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাই কায়েম হয়েছিল। সেখানে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে অবধারিতভাবে পুংলিঙ্গে বোঝানো হয়। সেখানে আদি নারী আদি পুরুষের পাঁজর থেকে জন্ম নেয়, তবুও জন্মের পর সে শয়তানের আওতায় তাড়াতাড়ি আসে, পুরুষকে ভুলপথে চালিত করে, নারীর দোষে পুরুষের স্বর্গ থেকে পতন হয়। পিউরিটান খ্রিষ্টধর্মে প্রকৃতিও রহস্যময়, মানুষের অনিষ্ট করতে উন্মুখ, কারণ বনে ডাইনিরা থাকে, অশুভ শক্তির পূজা করে। যেসব নারীরা সমাজ থেকে দূরে থাকত নিজেদের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে, বহুকাল লব্ধ জ্ঞান নিয়ে, তারাই ডাইনী বলে পরিগণিত হয়েছিল। সারা মধ্যযুগ ধরে ডাইনি অপবাদে কত মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। খ্রিষ্টধর্ম যিশুর মা মেরিকে ‘ঈশ্বরের মা’ বলে (ঈশ্বর এখানে ঈশ্বরপুত্র যিশু) পূর্বতন নারীদেবতাদের মত কিছুটা উচ্চ স্থান দিয়েছিল, তবে ওইটুকুই। মেরির গুরুত্ব তাঁর পুত্র থেকে অনেক কম, সন্ত হলেও তিনি ঈশ্বরী নন। ইহুদি ও ইসলামে নারীর এইটুকু দেবত্বও নেই। সেমিটিক দেশগুলোতে প্রাচীন দেবীদের উপাসনা শয়তানের উপাসনার সঙ্গে তুলনীয় হল। কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মেই নারী যাজক হিসেবে কাজ করতে পারত না, রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে তো প্রায় না বললেই চলে। ইসলামে নারীকে একেবারেই পর্দানসীন করে ফেলা হল, কারণ তাকে দেখলে পুরুষের মন চঞ্চল হয়। আধুনিকযুগে নারী শাসক হিসেবে, এবং খ্রিস্টধর্মে নারীযাজকের অধিকার কিছুটা স্বীকৃতি পেয়েছে।

    ভারতে মাতৃদেবতার পূজা অবশ্য এখনো চলছে, প্রত্যেক শারদীয়া পুজোয় দেবীই সবচাইতে গুরুত্ব পান। বৈদিক যুগে স্ত্রীদেবতার সংখ্যা পুরুষদেবতার চাইতে অনেক কম ছিল। তবে যাঁদের পুজো হত তাঁরা মহামাতৃকার, সর্বোচ্চ ঐশ্বরিক শক্তির সম্মান পেয়েছেন। তখনকার মানুষীরা শাস্ত্রশিক্ষা করেছেন, বেদমন্ত্র রচনা করেছেন, এবং বিতর্কসভায় পুরুষের সমানে তর্ক করছেন, নারী সেখানে অবরোধবাসিনী ছিল না। পৌরাণিকযুগে দেবীদের সম্মান হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে নারীর অধিকার ক্রমাগত কমতে শুরু করে। যেসব ছোটখাটো ব্রতউপবাস ছোটখাটো উপচার দিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়, এতে তথাকথিত দেবভাষায় মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয় না, চলিত ভাষায় লেখা গান ও পাঁচালিতেই কাজ চলে, সেসব ধর্মকৃত্য মেয়েরা করতে পারত। কিন্তু দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী ইত্যাদি সর্বমান্যা মহাদেবীদের বড় পুজো ব্রাহ্মণের রচিত শাস্ত্র অনুসারে করতে হয়, সংস্কৃত মন্ত্র পড়তে হয়, তথাকথিত প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর মেয়েদের প্রতিমা ছোঁবারও অধিকার নেই, কারণ মেয়েরা রজস্বলা হয়, তাদের উপবীত হয় না, তাদের শাস্ত্রাধিকার নেই। মেয়েরা ছোঁয় শেষে, পুজোর বিধিনিয়ম সম্পূর্ণ শেষ করে মন্ত্রে বিসর্জনের পর। একসময় নারীর রজস্বলা হওয়াকে সমাজ সম্ভ্রম ও সম্মানের চোখে দেখত। এখন রজস্বলা নারীকে অপবিত্র গণ্য করা হতে লাগল, তাকে চোখের আড়ালে রাখা হল।

    কিছু কিছু সমাজে লিঙ্গনির্বিশেষে সন্তানের পরিচয় অবশ্য মায়ের নামে কিছুদিন আগে অবধি হত, যেমন মেঘালয়ের খাসি ও গারো সমাজ, কেরালার মানুষ মাতৃপরিচয়েই পরিচয় দিত, যদিও ধীরে ধীরে পিতৃতান্ত্রিকতার দিকে এইসব মাতৃকেন্দ্রিক সমাজও মোড় নিয়েছে।

    মাতৃদেবতার অবনমনের যুগে নারীর শক্তি, তার মেধাকে অস্বীকৃতি দিয়ে তাকে সম্পূর্ণ পরাধীন বানাতে নারীবিরোধী কথাবার্তা সব সমাজেই ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে --- ‘নারী নরকের দ্বার’ বলে অভিহিত হয়। নারীর বুদ্ধি সর্বনাশ ডেকে আনে--- ‘স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ংকরী’— নারী ও সরকারি লোককে বিশ্বাস করতে নেই--- ‘বিশ্বাসো নৈব কর্তব্যো স্ত্রীষু রাজকুলেষু চ’, ‘পথি নারী বিবর্জিতা’ রাস্তায়ঘাটে মেয়েদের নিয়ে চলতে নেই। লোকভাষায় তো প্রচুর নারীবিরোধী প্রবচন আছে। হিন্দুসমাজে নারীবিদ্বেষ এমনি চরমে পৌছেছিল যে উনিশ শতক পর্যন্ত সতীদাহ হত, বিশ শতক অবধি বাল্যবিবাহ হত এবং এখনো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি, বালিকা বিধবা হলেও তার পুনর্বিবাহ সমাজের অনুমোদিত ছিল না, মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো হত না, ছিল পণপ্রথার দাপট। এই ব্যবস্থা বিশ শতক পেরিয়ে এই একুশ শতকেও বহাল আছে। বিশ শতকে মেয়েদের জীবনে নতুন সঙ্কট এল। অর্থনৈতিক কারণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পরিবার ছোট করবার প্রয়োজনে কোপ পড়ল মেয়েদের উপর, কন্যাভ্রূণ হত্যা একটা সামাজিক অভ্যাসে দাঁড়াল। যতদিন না পঞ্জাব হরিয়ানায় মেয়েদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় শতকরা আশির কমে আসে নি, সরকার ও সমাজের টনক নড়েনি। নারীর বিপদ রাস্তায়ঘাটে, এমন কী বাড়িতে ও। এই মাতৃপূজার দেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং হত্যা, শারীরিক নিপীড়ন, বাক্যে নিপীড়ন, অকারণে অপমান নারীর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এই সময়েও কিন্তু শৌখিন মাতৃপূজোর জাঁকজমক বছরবছর বাড়ছে।

    আধুনিক ভোগবাদী সমাজ নারীর প্রাধান্য তো দূর, সমান অধিকারটুকুও স্বেচ্ছায় মানতে রাজি নয়। প্রাচীনকালে নারী ছিল জীবনদায়িনী এবং জীবনের রক্ষয়িত্রী, সে জন্য সে প্রকৃতির কাছাকাছি ছিল। প্রকৃতির নিয়ম মেনে সে প্রয়োজনীয়টুকু নিত। তার যা কিছু অর্জন তার ও তার সন্তানদের জীবনের জন্যই ছিল, সেজন্য তার প্রাধান্য ছিল। পুরুষ যত প্রভুত্বের দিকে এগিয়েছে, দরকারের চাইতে বেশি নিয়েছে, তাই উদ্‌বৃত্ত সম্পদ বেড়েছে। ফলত জীবনের রক্ষণে প্রকৃতির বদলে দায়িত্ব নিয়েছে কৃত্রিমতা এবং স্বাভাবিক জীবনের জায়গা নিয়েছে ভোগবাদ। এই ভোগসর্বস্ব যুগে নারী নিজেই অন্যতম পণ্য হয়ে পড়েছে। তাই পরমজননীর ধারণা শুধুমাত্র পাঁজির নিয়মে পুজো ও আড়ম্বরে পর্যবসিত হয়ে ক্রমেই মূল্যহীন হয়ে পড়ছে।

    ঋণস্বীকার~

    ঋগবেদীয় রাত্রিসূক্তম, দেবীসূক্তম্‌ -- শ্রীশ্রী চণ্ডী

    সাতসমুদ্র তেরো নদীঃ বাঙালির মাতৃধর্মের আদি আন্তর্জাতিক চলাচল—ডঃ তমাল দাশগুপ্ত

    (মাৎস্যন্যায় আন্তর্জাল পত্রিকা)

    বৃহৎ বঙ্গ দীনেশ চন্দ্র সেন

    Encyclopedia Britannica

    Anahita, the Mother of God— Iran the cradle of the early gods By Mohammad Sadeq Nazami Afshar (From internet)

    Anthills Of the Savanna -- Chinua Achebe

    Various other sources from Internet

    Pictures from Internet

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)