• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • আশমান জমিন : তারা ফোটানো উঠোনের মাটি : স্বাতী গুহ

    আসমান জমিন — সেলিম মল্লিক; প্রকাশক-- লিরিক্যাল বুক্‌স, কলকাতা ৭০০ ০২৫; প্রচ্ছদ ও অলংকরণ-- শুভঙ্কর চক্রবর্তী; প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০২০, ISBN: 978-93-87577-11-4

    ‘‘ছোটোবেলায় বনফুল আর আমি মানিকজোড় হয়ে গাছপালা কি আদাড়ের জলা বাদাড়ের জংলায় ঘুরে বেড়াতাম। আমারই বয়সি বনফুলের সঙ্গে আমার তবু ছিল একটা বড় তফাত। আমি ইস্কুলে যেতাম, বনফুলের ছিল মুক্তির পাঠশালা প্রকৃতিতে।” [বনফুলের সঙ্গে : পৃষ্ঠা-১৬]

    সেলিম মল্লিকের ‘আশমান জমিন’ বইটি পাঠককে নিয়ে এভাবে প্রবেশ করে পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার রেলরাস্তা কিংবা পাকা সড়কের ব্যস্ত হাইওয়ে থেকে কিছুটা ভিতরে কোনো একটি গ্রামে। যদিও বইয়ের শুরুতে ‘প্রাসঙ্গিক' অংশে সেলিম প্রায় ইস্তাহারের মতো ঘোষণা করেছেন এ ঠিক স্মৃতিকথা নয়, স্মৃতির অনুষঙ্গে জন্মস্থান ও তার আশপাশ এবং প্রতিবেশীদের নিয়ে কথার টুকরো।’

    ‘পুরোনো আয়না’-য় সেলিম বনফুলকে যখন ফিরে দেখেন ফেলে আসা কুড়ি-পঁচিশ বছরের ব্যবধানে, তখন যেন সেই আয়নায় কিছুটা অব্যবহারের ধুলো জমেছিল, কিংবা আয়নার পিছনের পারদের পরত কিছুটা চটে উঠেছে । তাই এক-একটি স্মৃতিকে তিরিশ বছর বয়সী যুবক দেখছেন তার জীবনের নতুন অভিজ্ঞতায় জারিয়ে নিয়ে । ইস্কুল যাওয়া ছোটো বালকের গরিমার থেকে বনফুলের আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াবার স্বাধীনতাকে অনেক বেশি মূল্যবান মনে হচ্ছে তার। স্মৃতিকথা বলে দাগিয়ে না দিলে, পাঠক হয়তো বনফুলকে তাঁর দ্বিতীয় সত্ত্বা বলেও ধরে নিতে পারত। অথচ এ রচনা একলা মানুষের অনুভবের পরতে ভেদ করে উঠে আসতে আসতেই জড়িয়ে ধরল আরও কত মানুষকে। তারচেয়েও বড় এক আশ্চর্য জনপদকে। যেখানে মানুষের প্রতিদিনের জীবনে ক্রোমোজোমের প্যাটার্নের মতো জড়িয়ে থাকে প্রকৃতি। কিন্তু সেই প্রকৃতি প্রেক্ষাপট মাত্র নয়। সেও চরিত্র। তার রং, রূপ, রস, গন্ধ, আলো, বাতাস - সমস্তটাই জীবন্ত। সেও বাঁচে, মরেও।

    ‘আম পাতা জাম পাতা জড়াজড়ি হয়ে ছিল আমার দাদুর তিন ছেলে। সামান্য হাওয়ায় একদিন যৌথের সেই ঘর ভেঙে গেল।' (মাটির বাড়ি) যেন প্রখর গ্রীষ্মে পাতা ঝরাই স্বাভাবিক। আবার নতুন পাতার জন্ম সেই গাছের ন্যাড়া ডাল থেকেই শুরু - ‘আব্বা পাড়ার এক মুনিষকে সঙ্গে করে কাদামাটির তাল বসিয়ে পাট বানিয়ে তুলছিল আমাদের পৃথক বাড়ি । আমার চোখে সে পৃথিবীতে প্রথম গৃহ নির্মাণ হচ্ছে।'

    একটি বালকও যেন ক্রমে খসে পড়ছে শৈশবের ডাল থেকে । কলতলা থেকে মাটির কলসি কাঁখে জল নিয়ে ফেরা মায়ের ছবিটিকে সেই বালক যুবক বয়সে এসে ফিরে দেখে পটুয়ার আঁকা শিল্পের আদলে। পানের বরজ তৈরি করার খুঁটিনাটি পাঠককে নিয়ে যাবে আশ্চর্য এক পেশাজীবীর জগতে। প্রতিটি পেশার সংস্কৃতির যে বিশেষত্ব তাকে মানুষ আলাদা করে চিনতে ভুলে যান। কোনো পেশা যখন তা মাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তার চলনটিও যেন তেমন। সেলিম সেই পারিবারিক পেশার কাজটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন। দেখেছেন তার কবিতায় স্নাত চোখ ভরে ..এইভাবে নারকোল দড়ি বাঁধা বাঁশের কাঠামোর ওপরে খড়ি গাছের ছাউনি ছেয়ে চার আশে খড়ের ঘেরা দিয়ে একদিন তৈরি হল প্রকাণ্ড দেশলাই বাক্সের মতো দেখতে মিঠা পানের ঘর।’ একটি ছোটো ছেলের কাছে আয়তক্ষেত্রের নমুনা শলাই বাক্স ছাড়া আর কী হতে পারে। সে তো তখনও শহরের ইমারতের আকারের সঙ্গে পরিচিত নয়। দেশলাই বাক্স তার আশ্চর্য আগুনের সম্ভাবনা নিয়ে শৈশবের দিনগুলিতে চিকমিক করত আমাদের অনেকেরই। তার রঙের টান আটকে রাখত আমাদের। সে সব ছিল আগলে রাখার মতো সম্পদ! গ্রামে-শহরে-নগরে শৈশবের সেই সাধারণ গল্পকে যেন উসকে দিতে পারে এমন উপমা।

    কিন্তু ঠিক তার পর পান বপনের যে উৎসবের বর্ণনা করেন লেখক, তা বাংলার কৃষি-সংস্কৃতির ডকুমেন্টেশন যেন--‘এল রোয়ার দিন, বাড়িতে উৎসব তো। আমি-বোন নতুন পোশাক পরেছি, মা ভালমন্দ রান্নাবাটি করছে, কর্তবাবু মানে আব্বা পাট-ভাঙা লাল গামছা পরেছে। গুয়াকাকা নিয়ে এসেছে তাদের আবাদ উপড়ে রাজজাতের লতা । এবারে লতা বসানোর পালা, যেন পালা গান হবে, ধূপ জ্বলল, আব্বার বাল্যবন্ধু গোকিলকাকা কালীমন্দির থেকে চরণামৃত এনেছে পেতলের ঘটিতে কলাপাতা বেঁধে - তার ছড়া পড়ল কয়েক ফোঁটা ঈশান কোণে, যেখানে সর্বপ্রথম লতা বসবে, গোকুলকাকার বোন কবিতাপিসি আবার শাঁখ বাজাল। রীতি মেনে আব্বা বসাল প্রথম লতা, পরের লতাটি আমি । এরপর হাতে - হাতে মুনিষে উনিষে গাছে গাছে সাজিয়ে দিল পানবাড়ির অন্দর । শেষ লতা লাগানো হলে আব্বা বরজের দরজার বাইরে এসে মাটিতে সালাম রাখল...(পৃষ্ঠা ৩১)

    Meister Daniel R (2018), তাঁর বই 'The biographical turn and the case for historical biography'-তে বলছেন - "Biography studies is emerging as an independent discipline, especially in the Netherlands. This Dutch School of biography is moving biography studies away from the less scholarly life writing tradition and towards history by encouraging its practitioners to utilize an approach adapted from microhistory."

    ২০১০-১১-য় যখন সেলিম ‘আসমান জমিনে'র লেখাগুলি লিখছেন, তখন কি আসলে তিনি রচনা করছেন একটি স্থানিক ইতিহাস? যে সব জায়গায় চাঁদের রশি বেয়ে নেমে আসত জিন, দাদি অর্থাৎ ঠাকুমার ঝুলি উপচে পড়ত কবরখানার ফুটফুটে জ্যোৎস্নায়। দাদির বয়ানে -‘মানুষের ওপর ওদের আসক্তি, তাই পৃথিবীতে মানুষের কাছে কাছে থাকতে চায়।...’ সমস্ত প্রকৃতি আর মানুষ একে অপরের আত্মার সঙ্গ সন্ধানে রত হয় যেন চিরকালীন সত্যে। তখন সেই গ্রামের সীমা এসে ছুঁয়ে ফেলে প্রসারিত জীবনবৃত্তকে। যেমন করে লেখক বেপাড়ায় এসে পড়েন একদিন পাঁচ ক্লাসের ছাত্র হয়ে। মা-কে ছেড়ে দূরে এসে পড়া যেন শুধু মায়ের আঁচলের বাইরে বেরোনোর সংকেতমাত্র নয়, যেন কোনো দূরের স্বপ্ন পেয়ে বসে তাকে, প্রসারিত জীবনের ডাক এসে পৌঁছোয় সেই বালকের কানে। শিমুলিয়া গ্রামটাই যেন মাতৃ-জঠরের মেটাফর তখন। যেন এ এক চিরন্তন স্থানের কথা। যেখানে বই-খাতা জামার মধ্যে ঢুকিয়ে বৃষ্টির জল থেকে নিজেকে বাঁচানো যায় মানকচু পাতার ছাউনিতে। মনে পড়ে অক্ষয় মালবেরি-র ভাষ্য। এভাবেই কি আমাদের মধ্যে চারিয়ে যায় প্রকৃতির গাঢ় সবুজ বিষ। লাল-সবুজ-নীল-হলুদ রঙের মায়াবী ব্যাঙ! যার গায়ে বিষ আঠা। সেলিমের ইন্দ্রনাথ বনফুল ওস্তাদজি পিঁপড়ের ডিম নিয়ে টাকাকড়ি করার স্বপ্ন দেখে। অথচ একদিন সেই হারিয়ে যায় এই প্রাচীন পৃথিবীর সোঁদা গন্ধের আড়াল-আবডাল ছেদ করে। ‘কাঠবিল্লি’-র আরণ্যক জীবন ছেড়ে একদিন বনফুল চলে যায় দূরের শহরে রোজগারের কাজে। যেন প্রতিটি পরিযায়ী মানুষের নিটোল একটি গল্প এভাবেই বলতে চান লেখক। সময়ের ইতিহাস তো শুধু বড় বড় কাজ আর বড় বড় মানুষের অবদানের গাথামাত্র নয়। যে মানুষকে নিয়ে পৃথিবীর কোনাকাঞ্চির কাজ, সেই ইতিহাস লেখার কাজটিও কি করে চলে এইসব আত্মকথার বয়ান!

    মিলারের মতে ‘The Central aim of biographical research is to produce rich descriptions of persons or “conceptualise structural types of actions', which means to "understand the action logics or how persons and structures interlinked". This method can be used to understand an individual's life within social context or understand the cultural phenomena.”

    এইচ্ স্পেনসার হগ-র বই ‘The Autobiography of a Common Man` প্রকাশিত হয় ২০০৩-এ। এখানে একজন সাধারণ মানুষের জীবনে কত অসাধারণ আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে পারে, সেসব কথা বলেছেন। এইসব ঘটনা আসলে সামগ্রিক মানুষের জীবনের ইতিহাসের এক খণ্ড। পৃথিবীর তাবৎ সময়ে তার নানা বাঁক কিংবা বদল, সংস্কৃতির ভিতর-বাহির সবটাই পেয়ে যাওয়া সম্ভব আপাত সাধারণ মানুষের জীবন-বয়ানে। আর সেলিম যেহেতু কবিতাকাতর, তাই তার সমস্ত দর্শন, স্পর্শকাতরতা, ভাবনা, কথন কবিতা-আক্রান্ত। কিন্তু তার ভিত প্রোথিত সেই মাটিতে, জলে, আকাশে, আদাড়ে, বাদাড়ে যেখানে মানুষের শ্রম আর ভালবাসা একে অপরের দিকে নুয়ে থাকে। যেমন থাকে মুসলমান পাড়ার গা ঘেঁষে হিন্দুদের জীবনযাত্রা। বিয়ের সঙ্গে জোড়কলমে উচ্চারিত হয় শাদী শব্দ।

    ফলনের মন্দাদিনেও কৃষকের জমির ওপর মায়া কাটে না যে পৃথিবীতে। যেখানে সে দেখেনি মোচ কামানো দাড়ি কিংবা টিকিধারণের আস্ফালন! ‘যারা নেহাত চাষি নয় এমন আনসারিদের দলিজকোনাতে হাঁস-মুরগির বাসা..... হাঁস-মুরগির ফুটফুটে বাচ্চাকে ঘিরে ওদের ঘরে আনন্দের হাট বসে। .....এজমালি পুকুরের ঘাটের পইঠাতে দেখি, বুড়োরা ছিপ পেতে এক ঠায় বসে আছে পড়ন্ত বিকেলে, ফাতনা নড়লে তাদের গায়ের ওপর অলৌকিক রঙে দুলে ওঠে শেষ রোদ।' - যেন বাস্তব আর পরাবাস্তব এক বিন্দুতে এসে মেলে। কবি সেলিম মল্লিকের চোখে ধরা পড়ে পৃথিবীর সেই সব রঙ, যা আদিকাল থেকে বর্তমানে সঞ্চারিত হয়ে চলে এসেছে। থেকেও যাবে তা মানুষের ভাবী পৃথিবীতে। ‘গঞ্জের বাজার যেন সুখহাটা -...খুব হইচইয়ের মধ্যেও কান খাড়া করলে কলকাতা-ক সেন্টারে শুনি স্থানীয় সংবাদ।' রেডিও-র সঙ্গে ‘যন্ত্র-মানুষে এমন সম্পর্ক, ঠিক আপন ভাইবেরাদার, সুযোগ পেলেই দুটো মনের খবর চালাচালি করে... গণমাধ্যম হিসেবে রেডিও সারা পৃথিবী জুড়ে সাড়া ফেলেছিল মানুষের প্রতিদিনের জীবনে। তারপর একটা সময় দৃশ্যমাধ্যম এসে পড়ায় মনে হয়েছিল এই শ্রবণী মাধ্যম বুঝি আর তত গুরুত্বপূর্ণ রইল না। কিন্তু হাজার হাজার শিমুলিয়া গ্রামে রেডিও নব্বই-এর দশকেও মানুষে বেঁধে রাখছিল রেডিও নামব গণমাধ্যম। কারণ রেডিওকে সঙ্গী করে মানুষ তার কাজের জায়গায় নিয়ে যেতে পারে সহজে। পরবর্তী সময়ে এফ.এম চ্যানেলগুলি যেমন আকর্ষণ করেছে শ্রোতাকে তা সংস্কৃতির একটি বিপ্লব ঘটিয়েছেও বলা চলে। আর তৈরি হয়েছে মানুষের স্থানিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা দিয়ে কমিউনিটি রেডিও-র কার্যকলাপ। উৎসবে, দুর্যোগে তাই গ্রামবাসীকে জুড়ে রাখতে রেডিও-র কোনো বিকল্প আজও নেই।

    কৈশোরের ক্ষণস্থায়ী প্রেম, পাঁড়ের মা, চান্দা-সূরজ দুটি ভাই - সমস্ত লেখাতেই পরতে পরতে উন্মোচিত হয় মানুষ-প্রকৃতি-প্রাণীর সম্পর্কের মায়াময়তা। বিশ্বাস- অবিশ্বাসের বাইরে আজও পির-মুসাফিরের আশ্চর্য উপস্থিতির কথা টের পাই আমরা। যেভাবে সইদুল ইসলামের মতো প্রবৃদ্ধ মানুষের সান্নিধ্যে কবিতার সঙ্গে পরিচয় হয় লেখকের, তা যেন যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের ভিতরের আলোকে উসকে দেওয়ার গল্প শোনায় পাঠককে। দাদির মৃত্যুর পর কবরে তাকে শুইয়ে দেওয়া পর্যন্ত যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ, তা যেন আসলে ওই মৃতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমস্ত আনাচ-কানাচকেই একবার ফিরে দেখার বয়ান -- “...তাঁরা দাদিকে নামিয়ে রাখলেন মাটির গহন বিছানায়, খুলে দিলেন কাফনের সকল বাঁধন, প্রথম মুঠো মাটি দেওয়ার সময় বলেছি “মিনহা খালাকনা কুম’-- এই মাটি থেকেই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। দ্বিতীয় মুঠো মাটি দেওয়ার বেলায় বললাম ‘ওয়াফিয়া নইদোকুম’ -- মাটির মধ্যেই তোমার প্রত্যাবর্তন ঘটবে। তৃতীয় মুঠো দিতে গিয়ে উচ্চারণ করলাম ‘ওয়ামিহা নোখরেজো কুম তারাতান ওখরা’- আবার তোমাকে বের করা হবে এই মাটির ভেতর দিয়ে।...'' (পৃষ্ঠা - ৫৬)

    মৃত্যুর সৎকার মন্ত্র হল “মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ / মাধীনঃ। / মধু নক্তম্ উতোষসো মধুমফ পার্থিরং রজঃ। মধুমান্নো বনস্পতিমধুমাং অস্তু সূর্যঃ ।।” অর্থাৎ বায়ু মধুবহন করছে, নদীসিন্ধুসকল মধু ক্ষরণ করছে। ওষধি বনস্পতিসকল মধুময় হোক, রাত্রি মধুময় হোক, ঊষা মধুময় হোক, পৃথিবীর ধূলি মধুময় হোক, সূর্য মধুমান হোক।

    যখন আসক্তির বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে তখন জল স্থল আকাশ, যড় জন্তু মনুষ্য, সমস্তুই অমৃতে পরিপূর্ণ - তখন আনন্দের অবধি নেই। (বৈরাগ্য : ১৫ ফাল্গুন ১৩১৫) ভারতীয় ঐতিহ্য তো এই। মৃত্যু এভাবেই আনন্দে মিশে যায়। কারণ সেখানেই থাকে জীবনের ইশারা। এক পূর্ণ জীবন যাপন শেষ করে প্রকৃতিতে একত্বপ্রাপ্ত লেখকের দাদি সেই আনন্দকেই যেন বিস্তৃত করে দিলেন।

    ‘সব জানে পাখি’ আসলেই সেই প্রগাঢ় পিতামহী। কীভাবে লোককথা উজাড় হয়ে যাচ্ছে প্রাচীন লোকালয় থেকেও, তা লক্ষ করেন কবি সেলিম মল্লিক। তাই তার দায়বদ্ধতা প্রসারিত হয়। বেহেস্তের পাখির কল্পনায় থেকে নিজেকে বিষমুক্ত করতে চান তিনি। বিশ্বাসে ভর করে থাকতে চান - আম ডাকে বান। বান না হোক, বেশি আম ফললে ভাল বৃষ্টি হয়েছে গ্রীষ্মে - এ তার নিজের অভিজ্ঞতা। আকাশের পানি পেলে কেমন হালি মকমক করে চারপাশ ... কৃষকের এই অনুভূতি কোনো একক মানুষের নয়, জাতিসত্তার অনুভূতি, একটি সংস্কৃতির অন্দর কথা। ‘স্বর্গের আগের ইসটেশন লাস টপেজ’ - ভিনদেশি ফেরিওয়ালার আবির্ভাবে উৎসবের আবেশ । ততদিনে বিবিধ ভারতী বা বাংলাদেশ রেডিও দূরকে কাছে এনে দেয়। লেখকও এসে পৌঁছোন ভিনদেশে - কলকাতায়। ঘিঞ্জি গলির সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। আকাশের রোশনির মতো এসে পড়ে আট ক্লাসের ছাত্রী গুড়িয়া। প্রকৃতি কিছুটা কম পড়েছে বলেই বোধহয়, মানুষ বড় বেশি জরুরি হয়ে ওঠে জীবনে । গ্রাম আর শহরও যেন মিলতে থাকে, মিশতে থাকে।

    বিলকিস-মতিউরের কিস্সা, চাঁদ আর তারা, আঞ্জিরতলের কথা, একটু-আধটু কবিতা লিখতে লিখতে এই আখ্যানের লেখক খুঁজে পান তাঁর কাব্যভাষা। অভিজ্ঞতা তাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘আশমান জমিনের কথা'। পাঠক সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে পেয়েও যেতে পারেন এক পুরোনো হারানো চাবি। যা দিয়ে লিখে ফেলা সম্ভব তার নিজেরও ফেলে আসা দিনের কথকতা। গ্রাম, শহর, নগর, রাজ্য, দেশ, মহাদেশ যতই পৃথক হোক না কেন, সংবেদনশীল মানুষ তার গড়ে ওঠার দিনগুলিকে নতুন করে ফিরে পেতে পারেন, রচনা করতে পারেন সেই লুকোনো পৃথিবীর এক নতুন অবয়ব। ব্যক্তির কথকতায় গেঁথে তুলতে পারেন সমগ্রের এক মুখচ্ছবি।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)