• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • স্থায়ী ঠিকানার অন্তহীন খোঁজ : মেঘমালা দে মহন্ত

    পঞ্চাশটি গল্প — রণবীর পুরকায়স্থ; প্রকাশক- একুশ শতক, কলকাতা ৭০০ ০৭৩; প্রচ্ছদ- মনীষ দেব; প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০২৩, ISBN: 978-93-93903-70-9

    "ভাষা-জননীর শৃঙ্লখমুক্তির বার্তা গান্ধীবাগের কয়েক হাজার শ্রোতা বয়ে নিয়ে গেছে গোটা জনপদে", "কলকাতা ঢাকা তাদের নিজস্ব ভুবন নিয়ে মাতোয়ারা। তৃতীয়ভুবনের নাম জানে না কেউ।" নাম -না-জানা এই তৃতীয়ভুবনের রূপকথার সার্থক কথাকার রণবীর পুরকায়স্থ।

    তাঁর সুদীর্ঘ গল্পপথ জুড়ে নক্সা কাটে বরাকের আলো হাওয়া রোদ্দুরের আসমান জমিন কথা। কয়েক যুগ আগে বরাক উপত্যকা ছেড়ে কলকাতা নিবাসী হলেও পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় জুড়ে বুঁদ হয়ে থাকা রণবীরের গল্পযাপনের স্থায়ী ঠিকানা আসাম, উত্তরপূর্ব। এঁর গল্পে বরাক পারের বাতাসে ভেসে বেড়ানো হেড়ম্বপুরের প্রীতিকথারা যে ভাষা পায় সেই ভাষা কখনই উচ্চকিত নয়। গল্পের ভাঁজে ভাঁজে এক অলৌকিক মৃদু মন্ত্রধ্বনির মতো ভেসে থাকা সেই উচ্চারণ আবিষ্কার করতে হয় পাঠককে। চা, বাঁশ, আর গাঢ় সবুজ পাহাড়ী বনানীর গায়ে লেপ্টে থাকা ভাঙাচোরা পাথরপ্রতিমাগুলো রণবীরের গল্পে অনায়াস দক্ষতায় হয়ে ওঠে বাস্তব আর স্বপ্নের মিশেলে রচিত সব আশ্চর্য মানুষ। যাদের রোজকার প্রেম কাম সংগ্রাম মথিত শ্যাওলা-জীবনে বার বার উঁকি দেয় সেই আজন্মের হারিয়ে যাওয়া ঠিকানার হাহাকার, যার স্বপ্নস্বত্ব বাঁধা পড়ে আছে পোকায় কাটা ভূগোলের মানচিত্রে। সম্প্রতি একুশ শতক থেকে প্রকাশিত তাঁর "পঁচিশটি গল্প" গ্রন্থের গল্পগুলিও তার ব্যতিক্রম নয়।

    আসাম এন আর সি। ভিত্তিবর্ষ উনিশশো একাত্তর এর চব্বিশ মার্চ মধ্যরাত্রি পর্যন্ত। মধ্যরাত্রি পেরিয়ে গেলে? বিদেশী। শনাক্তকরণ হয়ে গেলে বিতাড়ন। বিতাড়নের দু'রকম উপায় আছে। এক, ডিপোর্টেশন, দু'দেশের মধ্যে কথাবার্তা বলে। দুই, ঘাড়ধাক্কা। সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ঠেলে দেওয়া। পোষাকি নাম পুশব্যাক...
    আসামের বাঙালি জীবনে এই পুশব্যাকের আতঙ্ক তাড়া করে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। এখানের বাঙালিদের জীবনে জোটে না একটা দেশের স্বতন্ত্র নাগরিক হিসেবে পায়ের নীচে শক্ত একটুকরো মাটি আর মাথার ওপর খোলা আকাশের নিজস্ব একটা স্থায়ী ঠিকানা। ডি মানুষ অর্থাৎ ডাউটফুল মানুষের তকমা সরিয়ে নিজের অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণে প্রথমে তাকে কাগুজে মানুষ হতে হয়। রণবীর পুরকায়স্থের স্থায়ী ঠিকানা গল্পের নায়ক স্বদেশ বিশ্বাসের গোটা জীবন কেটে যায় শুধু এক স্থায়ী ঠিকানার সন্ধানে। দেশভাগের দু'বছর পর এদেশে জন্মেও স্বদেশ বিশ্বাস তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজের সম্পর্কে নিজেকে ব্যক্ত করেন 'জন্ম বেদুইন' বলে। আসাম চুক্তির ঐতিহাসিক ঘটনা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি তাই কর্মক্ষেত্রে স্বেচ্ছাবদলি নিয়ে চলে যান কলকাতা। কিন্তু সেই যাওয়া ছিল শুধু স্রোতে ভাসার যাওয়া। আজন্মের মাটির টানে ফিরতে যে তাঁকে হবেই নিশ্চিত ছিলেন স্বদেশ বিশ্বাস। আর তাই বরাকপারে জমি কেনেন বন্ধুর সাহায্যে। ইন্টারনেট ঘেঁটে এগারো সংখ্যার লিগ্যাসি কোড বের করে লিখে রাখেন পরম মমতায়। কিন্তু লিগ্যাসি কোডের সঙ্গে জমা দেওয়া জমির কাগজ বাতিল হয়ে যায় এন আর সি অফিস থেকে। কারণ সে জমি বহু আগেই তলিয়ে গেছে আগ্রাসী বরাকের বুকে। তখন বাতিল হয়ে যায় যাওয়া সেই নথিতে শুধুমাত্র স্বদেশ বিশ্বাস নয় তার কন্যার ভাগ্যেও জোটে অবৈধ নাগরিকের সিলমোহর। কিন্তু তারপরও কলকাতার ফ্ল্যাট বিক্রি করে স্বদেশ আবার থিতু হতে চান সেই বরাকপারেই। বিচিত্র এই প্রহসনের শিকার আসামের লক্ষ লক্ষ বাঙালির মতো স্থায়ী ঠিকানা গল্পের নায়কও আসলে নিজের অজান্তেই ক্রমাগত নিজের অস্তিত্ব, নিজের স্বদেশ খোঁজার অন্তহীন প্রক্রিয়ায় সামিল হয়ে যান। এক অসম লড়াইয়ে নিজেই নিজেকে প্রত্যাহবান জানান। বাদ যায় না আগ্রাসী বরাকও। শুধু এন আর সি প্রসঙ্গ এলে কেমন যেন চুপ করে যান। কিন্তু এই নৈঃশব্দই যে শেষ কথা নয় তার আভাস দিতে রাখেন গল্পকার। প্রবল ঝঞ্ঝাতেও জ্বালিয়ে রাখেন আশার আলো,
    দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগেই মানুষ জাগবে। একষট্টির উনিশে মে-তে জেগেছিল। এই এন আর সি-র প্রহসন নিয়েও জাগবে।
    রাষ্ট্রহীন এই ভূখণ্ডের মানুষের কাছে দেশ মানে শুধুই প্রত্নকথার পাহাড়। স্বপ্ন-স্বত্ব গল্পে ঠাকুরদার মুখে শোনা গল্পের মধ্য দিয়ে কথক তৈরি করেন তাঁর পূর্বপুরুষের বুকের গভীরে গোপন ক্ষতের মতো পুষে রাখা দেশ বাড়ির ছবি। ভিটের টানের উত্তরাধিকারেই ছুটে যান কাঁটাতারের সীমানার ওপারে। ঠিকানা রাউলি, পরগনা ছাতক, জিলা সিলেট আর মায়ের জন্মভূমি দরিয়াপাড়া। একবার বাস্তবে মিলিয়ে দেখে, ছুঁয়ে আসতে চান স্বপ্নের মাতৃ-পিতৃপুরুষের আদি বাসভূমি। কিন্তু কাঁটাতারের ওপারে পা দিয়েই ধীরে ধীরে বদলে যাতে থাকে মায়ের মুখে শোনা এতদিনের স্বপ্নকল্প। দেশ বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সবকিছুই। দরিয়াপাড়ার বর্তমান ছবি কথককে এই উপলব্ধিতে পোঁছে দেয়, "আমার কুনো মাতৃভূমি নাই।" রণবীর পুরকায়স্থ তাঁর ছোটগল্পে গল্পের অংশটিকে প্রাণভোমরার মতো লুকিয়ে রাখেন পরতের ওপর পরত সাজিয়ে। দুরন্ত কথাশৈলির একেকটা পরত সরিয়ে অন্তিম মোচড় পেরিয়ে পাঠক পৌঁছান আখ্যানের স্বতঃস্ফূর্ত ঝর্ণাচ্ছ্বাসে। পিতৃপুরুষের ভিটেতে যাবার সিদ্ধান্ত পালটে মনে মনে রাউলির বাড়ির স্বপ্নস্বত্ব মালেকুলকে আর দীনকে দিয়ে দেন দরিয়াপাড়ার মায়ের গর্বের দামবাড়ি। অদ্ভুত এক প্রশান্তি নিয়ে ফিরে আসেন দেশে।

    ছোটোগল্পের কোনো দায় নেই পাঠক ফ্রেন্ডলি হওয়ার, এমনটাই বলেন গল্পকার রণবীর পুরকায়স্থ। এমনটা বলেন গল্পকার রণবীর পুরকায়স্থ কিন্তু তাঁর গল্প অন্য কথা বলে। তাঁর গল্পের পাঠপ্রক্রিয়ায় সমান্তরাল ভূমিকায় পাশাপাশি চলতে থাকা পাঠ এবং পাঠকের এক হয়ে যাওয়ার মিহি সীমারেখাটি কখন যে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায় পাঠক টেরটি পান না। এই কাজটি গল্পকার খুব সচেতনভাবে পরম দক্ষতায় তাঁর গল্পের সাজ হিসেবেই করেন।

    "আমি কোথায় থাকি জানো? দেশের নাম মণিপুর, জনপদ থানলেন..."
    জন্মসূত্রে কলকাতার ছেলে যখন তাঁর প্রেমিকাকে চিঠি লেখে মণিপুর থেকে তখন সেই চিঠিতে উঠে আসে মণিপুর নামের সেই জনপদের কথা যেখানে মেঘ সরমার মতো চরে। সরমা মানে কুকুর। যেখানে মণিপুরীদের পাশাপাশি থাকে পাইতে, মার, নাগা, মিজো কত জনগোষ্ঠীর মানুষ। যেখানে শহুরে প্রেমিকার 'যৌবনের রবীন্দ্রনাথ' ডাকা প্রেমিক তন্ময় হয়ে যায় লালপা। যিশুকে ওদের ভাষায় ওরা লালপা বলে। যেখানে ভাষা না জেনেই সবাই তন্ময়ের সঙ্গে কোরাসে সুর মেলায় "চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে..." এই সুরে সুরে একাত্ম হয়ে যাওয়ার মায়াময় ছবি রণবীর আঁকেন তাঁর হেড়ম্বপুরের প্রীতিকথা গল্পে আসলে অন্য এক আশঙ্কার সিঁদূরে মেঘের ছড়িয়ে দিতে। এই রক্তিম আভার আলোয় সম্পূর্ণ অন্য এক প্রেক্ষাপটে দেখা যায় বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করে ডিমাসা মধুমঙ্গল। উত্তর-পূর্বের বৈচিত্র্যময় জীবনের মূলে রয়েছে যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষা, কৃষ্টি সংস্কৃতির পাশাপাশি সহাবস্থান, সেই সহাবস্থাজনিত একাত্মতাই কখনো কখনো কোনো এক জনসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তোলে এবং সেই বিপন্নতা সবথেকে বেশি আসে ভাষার পথ ধরে।

    'ইশারা' গল্পে ভাষার বিপন্নতা ধরা পড়ে এক অন্য প্রেক্ষিতে। বকুলচন্দ্র জন্মেছিলেন সিলেটে। শৈশব কৈশোর যৌবনের উচ্ছ্বল দিন কেটেছে বরাক উপত্যকায়। তারপর জীবিকার টানে ঢেউয়ের মাথায় ভেসে বেড়িয়ে কেটেছে জীবিন। জীবনসায়াহ্নে শিলচর গুয়াহাটির স্মৃতিমেদুরতায় মোড়া বকুলচন্দ্রের কলকাতার পরবাস। সেখানে জীবন অন্যরকম। নতুন প্রজন্ম অন্য ধাতুতে গড়া। নিজেকে মেলাতে পারেন না। এই প্রজন্ম দেশভাগ দেখেনি, ভাষা আন্দোলন জানে না তাই হয়ত তারা ভাষাকে দেখে অন্য চোখে। "মেয়ে এখন অন্য এক ভাষায় কথা বলে, যা বাংলা নয়, অসমীয়া নয়, ইংলিশ হিন্দিও নয়, কন্নড় তেলেগু নয়। মেয়ে জেনেছে ভাষা লড়াই করার মাধ্যম নয়, মনের কথা বলার যোগাযোগের সোনার কাঠি। তাই এখন লড়াই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।"

    সত্যিই কি তাই? ভাবেন বকুলচন্দ্র। এই কি ছিল উনিশে মে-র ভাষা শহিদদের আত্মবলিদানের ভবিতব্য? প্রশ্ন রেখে যান গল্পের ভাঁজে ভাঁজে।

    রণবীর পুরকায়স্থের প্রতিটি গল্পেই উত্তর-পূর্বের নানা সমস্যা যন্ত্রণা বঞ্চনার পাশাপাশি অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে নানা মিথ, কিংবদন্তি, প্রবাদ, প্রবচন, ছড়া, রান্না, খেলাধূলার প্রসঙ্গ। বাঙালি জীবনের সমান্তরালে দেখা মেলে মণিপুরি, অসমিয়া, খাসি, ডিমাছা মানুষের জীবনের জলছবি। 'ইচ্ছাকলি' গল্পে ইছাশেখ-ফুলকলির লোককথার পাশাপাশি বরাকপারের সিদ্ধেশ্বর কপিলাশ্রমের বারুণিমেলার বর্ণনায় উঠে আসে এই অঞ্চলের গ্রামজীবনে পরব পার্বণকে ঘিরে উৎসবের বাস্তব ছবি।

    গল্পের নির্মাণ প্রক্রিয়ার নানা অনুষঙ্গে নিশি পাওয়া মানুষের মতোই রণবীর বরাক ব্রহ্মপুত্রপারের জীবনকেই মন্থন করেছেন বার বার তাঁর এই পঁচিশটি গল্পের সংকলনে। তিনি বিশ্বাস করেন লেখক তাঁর অভিজ্ঞতার বাইরে যেতে পারেন না। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক চিহ্ন দিয়ে দাগিয়ে দেওয়া যায় না কোনো সাহিত্যকর্ম। তাই বরাকের গল্প ব্রহ্মপুত্রের গঙ্গার গল্প পদ্মার গল্প, সুরমার গল্প হয় না আলাদা কিছু। গল্পকে ধারণ করে থাকা ভাষার কথাভুবনের আবেদন চিরকালই বিশ্বজনীন। পঁচিশটি গল্পের এই সংকলনেও তার ব্যত্যয় হয়নি।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)