• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • নারী-রচিত বাংলা কবিতা: একালের প্রধান সাহিত্যসমালোচকের দৃষ্টিতে : সুজিত সরকার

    বাঙালি মেয়ের কবিতা, সেকাল থেকে একাল — সুমিতা চক্রবর্তী; প্রকাশক- তুলসী পাবলিশিং হাউস; আগরতলা, ত্রিপুরা; প্রচ্ছদ- সৌজন্য চক্রবর্তী; প্রথম প্রকাশ- মার্চ ২০২৩, ISBN: 978-81-956046-6-1

    শেকসপিয়রের যদি কোনো বোন থাকতো এবং যদি তার শেকসপিয়রের মতোই প্রতিভা থাকতো, তাহ’লেও কি সে শেকসপিয়র হ’তে পারতো? — এরকম একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন বিখ্যাত লেখিকা ভার্জিনিয়া উল্‌ফ্‌ একটি কলেজে ভাষণ দেবার সময় এবং নিজেই প্রশ্নটির উত্তরও দিয়েছিলেন — না, মেয়েটির পক্ষে কোনোভাবেই শেকসপিয়র হয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না, কারণ মেয়েটিকে লেখাপড়াই শিখতে দেওয়া হতো না, বরং তাকে ঘরকন্নার কাজ শেখার ব্যাপারে নিরন্তর উৎসাহ দেওয়া হতো এবং অচিরেই নিকটবর্তী এলাকার কোনো বিত্তবান যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হতো। ফাইনাল পরীক্ষা দেবার মতো জায়গায় পৌঁছতে না পারলেও শেকসপিয়র কিন্তু একটি গ্রামার স্কুলে কিছুকাল পড়াশোনা করেছিলেন, কিছুটা ল্যাটিনও শিখেছিলেন। মেয়েটিকে এই অবধি পৌঁছতেই দেওয়া হতো না।

    অন্য একটি ঘটনার কথা বলি। এক আফগান মহিলা কবি কবিতা লেখার অপরাধে স্বামীর প্রহারে মারা গিয়েছিল মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে। মেয়েটি তখন ছ’মাসের সন্তানের জননী। মেধাবী ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও ক্লাস টেনে পড়ার সময় তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেলাই স্কুলে সেলাই শিখতে যাওয়ার নাম করে গোপনে সে পড়াশোনা চালিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত হেরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়।

    দেখা যাচ্ছে, শুধু ভারতবর্ষেই নয়, সারা পৃথিবীতে কবিতারচনার ক্ষেত্রে, মেয়েদের প্রবল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হ’তে হয়েছে। অবশ্য, একথাও সত্য, বিশ শতকে ও একুশ শতকে এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মেয়েরা ক্রমশ বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। লাতিন আমেরিকার কবি গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, পোল্যান্ডের কবি সিম্বোর্স্কা, কিছুদিন আগে আমেরিকার কবি লুইজ গ্লিক কবি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এতৎসত্ত্বেও, এই সাম্প্রতিক কালেও, আত্মগর্বী কিছু পুরুষ কবিকে মেয়েদের কবিতার প্রতি তাচ্ছিল্যের মনোভাব প্রকাশ করতে দেখেছি। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সুমিতা চক্রবর্তীর ‘বাঙালি মেয়ের কবিতা — সেকাল থেকে একাল’ গ্রন্থটির গুরুত্ব এখানেই যে বাঙালি মেয়েদের কবিতারচনার একটি ধারাবাহিক ইতিহাস বিষয়ে সাহিত্যপাঠকদের তিনি অবগত করতে চেয়েছেন। বলাবাহুল্য, অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও তথ্যনিষ্ঠ এই কাজটি সম্পর্কে কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।

    বাংলায় নারীকবিদের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা উনিশ শতক অর্থাৎ স্বর্ণকুমারী দেবীদের কবিতার মাধ্যমে। স্বর্ণকুমারী দেবী ছাড়াও উনিশ শতকের প্রসন্নময়ী দেবী, কুসুমকুমারী দাস, প্রিয়ম্বদা দেবীকে নিয়ে আলাদা আলাদা আলোচনা স্থান পেয়েছে এই গ্রন্থে। বিশ শতকের মহিলা কবিদের মধ্যে রাধারানী দেবী - বাণী রায় - রাজলক্ষ্মী দেবী - কবিতা সিংহ - নবনীতা দেব সেন - দেবারতি মিত্র - কৃষ্ণা বসু - নমিতা চৌধুরী - মল্লিকা সেনগুপ্ত - অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় আলাদা আলাদা ভাবে আলোচিত হয়েছেন। সুমিতা চক্রবর্তী স্বীকার করেছেন বাঙালি মেয়েদের কবিতার ইতিহাস রচনায় মধ্যযুগ থেকে শুরু করে একুশ শতকের সূত্রপাত পর্যন্ত ধারাবাহিকতায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসম্পূর্ণতা আছে যেহেতু বিজয়া মুখোপাধ্যায় - কেতকী কুশারী ডাইসন - গীতা চট্টোপাধ্যায় - চৈতালী চট্টোপাধ্যায় - যশোধরা রায়চৌধুরী ও আরো কয়েকজন উল্লেখযোগ্য কবিদের নিয়ে আলোচনা এই গ্রন্থে নেই। এই না-থাকার কারণ লেখকের দিক থেকে কোনো অনিচ্ছা নয়, বরং তাঁদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কোনো চাহিদা কোথাও থেকে তাঁর কাছে এসে পৌঁছয়নি।

    এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে বাংলার অতিপরিচিত বেশ কিছু ছড়া মেয়েরাই রচনা করেছিলেন, যদিও তাদের নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। শিশুদের ঘুম পাড়াতে - দুধ খাওয়াতে - কান্না ভোলাতে নিরক্ষর মা-ঠাকুমা-দিদিমারা মুখে মুখে যেসব ছড়া রচনা করেছিলেন, পরবর্তীকালে লোকসাহিত্যের গবেষকরা সেই ছড়াগুলির নির্বাচিত সংকলন প্রকাশ করলেও রচয়িত্রীদের নাম খুঁজে পাননি।

    অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত অল্প যে কয়েকজন মহিলা কবিদের কথা জানা যায় তাঁদের কেউ কেউ নিরক্ষর ছিলেন, আবার কেউ কেউ উচ্চবর্গীয় সম্পন্ন পরিবারের কন্যা ও বধূ ছিলেন যাঁরা কবিতারচনায় পিতা অথবা স্বামীর সাহায্য পেয়েছিলেন। উনিশ শতকে যেসব মহিলারা কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন, তাঁরা সকলেই সুশিক্ষিত, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

    এই গ্রন্থের অন্তর্গত সুমিতা চক্রবর্তী’র বিভিন্ন কবির কবিতার আলোচনা থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি, যাতে পাঠক গ্রন্থটি সম্পর্কে এবং কবিদের সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা পেতে পারেন:

    (ক) ‘উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম পাদে নারী-রচিত বাংলা কবিতায় আমরা রমণী-চিত্তের প্রেম, ভক্তি, কারুণ্য, কোমলতার স্পর্শ পেয়েছি। সংঘর্ষের কবিতা ছিল অঙ্গুলিমেয়। মেয়েরা, সেখানে যা বলেছেন তা ভারতীয় সমাজে বহু যুগ ধরে গৃহীত হওয়া নারীর আদর্শেরই প্রতিধ্বনি। তার মধ্যেই যদি পড়ি প্রিয়ম্বদা দেবীর কোনও কোনও কবিতায় স্বামীহীনা প্রিয়ম্বদার তীব্র প্রেমার্তি — তা এখনও একটু নাড়ায়। সে প্রেমবাসনার অবলম্বন ঈশ্বর বা স্বর্গত স্বামী — কেউই নন — এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয় না।

    তবু রাজলক্ষ্মী দেবী, কবিতা সিংহ, নবনীতা দেব সেনের কলম ধরেই বাংলা কবিতা নিজের শরীরে এঁকে নিল মহিলা-কবির স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের চিহ্ন। তাঁদের রমণীত্ব ব্যক্তিত্বরূপেই প্রতিষ্ঠিত হল। কখনও তার প্রকাশ মৃদু — যেমন রাজলক্ষ্মী দেবীর লেখায়। কখনও তীক্ষ্ণ — যেমন কবিতা সিংহের রচনায়, আর কখনও গাঢ় সংসক্ত — যেমন নবনীতার কবিতায়।

    মনে পড়ে গিরীন্দ্রমোহন, কামিনী রায়, কুসুমকুমারী, প্রিয়ম্বদা আর রাজলক্ষ্মী, কবিতা, নবনীতার মধ্যবর্তী স্তরে অন্তত একজন কবি ছিলেন যিনি সুডৌল আত্মবিশ্বাসের তেজ ও কোমলতা মিলিয়ে আপন নারীত্বের দ্যুতিকে স্নিগ্ধ অথচ অ-নত এক স্বাতন্ত্র্যময় প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন কবিতায়। সেই কবি নবনীতারই জননী ‘অপরাজিতা’ রাধারাণী।’

    (খ) ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলা কবিরা যখন নারীর যে-কোনও উপলব্ধি সম্পর্কে কবিতা লেখেন তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থানগত অনিশ্চয়তা তথা অসমতা তাঁদের লেখায় কোনও-না-কোনওভাবে ছায়া ফেলে যায়। কিন্তু দেবারতি মিত্রের কবিতা আশ্চর্যভাবে এই আত্মকরুণা, এমনকী প্রতিবাদী ভাবনা থেকেও মুক্ত। প্রেম ও যৌনতাবোধের ক্ষেত্রে তাঁর উপলব্ধি লিঙ্গবৈষম্যবিহীন এক সম-তলে উন্মেষিত ও বিকশিত হয়। নারী বা পুরুষ — কোনও কবির মধ্যেই এই অনুভব-শক্তি খুব সুলভ নয়।’

    (গ) ’কৃষ্ণা বসুর কবিতাকে নারীবাদী বলে জ্ঞাপিত করবার একটা অভ্যাস পাঠকদের আছে। কবি নিজেও পাঠকদের এই ধারণাকে কিছু প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। কিন্তু ‘নারীবাদী’ এই শব্দটির মধ্যে নারী-সমাজের যে প্রতিবাদ ও দাবির ব্যঞ্জনা প্রধান হয়ে ওঠে — সেই ধরণের একমুখীনতা কৃষ্ণা বসুর নারী-বিষয়ক কবিতাগুলিতে নেই। তাঁর নারী-ভাবনা একাধিক ধারায় প্রবাহিত হয়; সেই ধারা-স্রোতে প্রতিবাদ ও দাবির চেয়ে হৃদয়ের সজল সংবেদনাই হয়ে ওঠে প্রধান।’

    (ঘ) ‘নমিতা চৌধুরীর কবিতায় প্রকৃতির মতোই এক স্বচ্ছতা আছে। তাঁর কবিতা নিসর্গ-মুগ্ধ একথা বলতে চাইছি না। শেষ পর্যন্ত তাঁর কবিতায় মুগ্ধতার আবেশ নয়, সচেতন মনের সংবেদনাই অনুভূত হয়। নির্যাতিত শ্রেণির প্রতি সহমর্মিতাই তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি।’

    (ঙ) ‘গিরীন্দ্রমোহিনী, কামিনী রায় বা প্রিয়ম্বদা দেবীর কবিতায় মহিলাদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, আশা, প্রেম, ঔচিত্যবোধের পরিচয়টুকুই পাই। কিন্তু মল্লিকার কবিতার নারী একক ও ব্যক্তিগত কোনও নারী নয়। আবহমান নারী ও তার অস্তিত্বের সংকট প্রতীকিত হয় মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতার প্রোটাগনিস্ট নারীর মধ্যে।’

    (চ) ‘অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় সাম্প্রতিক বিশ্ব-সংবাদ বৈশ্বিক সংকটের অভিজ্ঞানরূপে দেখা দেয়।’

    (ছ) ‘এই সময়ের মেয়েদের কবিতা অনেক সময় লিঙ্গবৈষম্যবিহীন মানুষের কবিতা হয়ে উঠেছে। আবার নারীর অবস্থানে দাঁড়িয়েও সু-ব্যক্তিত্বকে অটুট রেখেছে সেই কবিতার একাংশ।’

    আশা করি আমার এই আলোচনাটির মাধ্যমে পাঠক এই গ্রন্থের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সমর্থ হবেন। একদা রবীন্দ্রোত্তর যুগের অন্যতম প্রধান কবি অমিয় চক্রবর্তীর কবিতার অসাধারণ আলোচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট সমালোচকরূপে সুমিতা চক্রবর্তীর আবির্ভাব ও প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল। তারপর দীর্ঘ সময় ধ’রে বাংলা সাহিত্যের গল্প-উপন্যাস-কবিতার আলোচনায় তিনি ক্লান্তিহীনভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তাঁর বিভিন্ন মূল্যবান আলোচনা-গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যকে নিরন্তর সমৃদ্ধ ক’রে চলেছেন। তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)