• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | ছোটদের পরবাস | গল্প
    Share
  • বনি : শৈলী চক্রবর্তী



    ‘দাদা!’ মিষ্টি ডাকটা শুনে পিছন ফিরে তাকাল অভিমন্যু। ঠিক দশ বছর আগে, স্কুলের ব্যাগে বইখাতা ঢোকাচ্ছিল অভি। ‘দাদা-দাদা-দাদা’--কখন যেন বনি গুটিগুটি পায়ে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। একঝলক সেদিকে তাকিয়ে ছুটে বেরিয়ে যেতে যেতে সে শুনতে পাচ্ছিল, মা বলছে, ‘অভি দেখ, বনি তোকে ডাকছে!‘ শোনার কোনো ইচ্ছা বা সময় ওর তখন ছিল না।

    আর কত শুনবে? যেদিন লালা চাদর জড়ানো ‘সফট টয়’টিকে সঙ্গে করে নার্সিংহোম থেকে বাবা-মা এসেছিল, সেদিন থেকে তো কেবল শুনেই চলেছে। ‘দেখ, বনি খেলা করছে!’ কেন অভি কি খেলতে পারে না? ‘দেখ বনি কেমন হাত-পা ছুড়ছে!’

    আর অন্যদিকে দেখো, পড়ার ফাঁকে অভি একটু হাত-পায়ের কসরত করলেই হয়েছে আর কি!

    বাবার টেবিলের ক্যালেন্ডারে পোলার ভালুকের মস্ত পাতার শেষ তারিখটা অবশেষে চলে গেল। এখন তার জায়াগায় একটা ঝকঝকে সূর্য উঁকি দিচ্ছে।

    আগের বছর অভি একটি প্রতিকৃতি এঁকেছিল। প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পায়নি। তবে, হাল সে ছাড়েনি। তাই এবার ‘আজাদ হিন্দ ফৌজের মাঝে নেতাজি’--নিজেই বিষয়টা ভেবে নিয়েছে। দেখা যাক, কী হয়?

    গভীরভাবে অভি হয়তো ‘সন্ন্যাসী কাঁকড়া আর সাঁতার-কুসুম’ একে অপরকে কীভাবে সাহায্য করে ভাবছে, ঠিক তখনই ‘দাদা-দাদা-দাদা’--অভির কি এখন শুনতে ভালো লাগে? নিজেকে প্রশ্নটা করে সেদিন অভি হেসে ফেলেছিল।

    পাশের চেয়ারটাতে বনিকে খুব যত্ন করে বসিয়ে দিল অভি।

    ‘সফট টয়’টার মাথা অভি যতবার সোজা করে দিতে চাইছে, ধুত! সে ততবার নিচু করে দিচ্ছে কেন!

    ওদিকে জানুয়ারির তেইশ তারিখ যে এগিয়ে আসছে।

    ঠিক তেইশ তারিখই আবার সকলের মনখারাপ হয়ে গেল। অভি কিন্তু সেকেন্ড হয়েছিল। ব্যাগের মধ্যে প্রাইজের বই ভরে, শুধু চকোলেটটা হাতে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকে দেখেছিল ছোটমামা মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে মা, বাবা, ঠামি। সকলের মুখ অত থমথমে কেন? কিছু কি হয়েছে? কান খাড়া করে শুনেছিল অভি। ওদের কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, বনি নাকি স্বাভাবিক শিশু নয়। কারণ ভারি অদ্ভুত। একই কথা বারবার বলা, মাথা তুলে বেশিক্ষণ না তাকিয়ে থাকতে পারা--এসব নাকি বেশ চিন্তার বিষয়। মনের মধ্যে সেদিন থেকেই একটা বিষাদময় শব্দ প্রতিধ্বনি তুলে রয়ে গেল--‘অটিজম’।

    হাতের চকোলেটটা গলে গেছিল, চোখের ঝাপসা হয়ে যাওয়া বনির মুখে সেটা আর ভরা হল না। তাকে কোলে তুলে নিয়েছিল অভি। সকলে মিলে ঠিক করল, ছোটদের ডাক্তার কল্যাণমামার কাছে নিয়ে যেতে হবে বনিকে।

    বনিকে নিয়ে মা-বাবা প্রতিসপ্তাহে আসাযাওয়া শুরু করল। যতদিন যেতে লাগল, অভির কাছে বিশ্রীরকম প্রকট হয়ে একের পর এক সত্য দেখা দিতে লাগল। এষার বোন বা রাজদীপের ভাইয়ের মতো বনি কেন সবকিছু সহজে বুঝে উঠতে পারে না?

    ছোট ছোট খুশির ঢেউয়ে ভরসা করে, মনখারাপের সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে কেটে যেতে লাগল অভির দিনগুলি। কিন্তু কে জানত, এরপর আর কী অপেক্ষা করে আছে?

    সেদিন বনিকে কল্যাণমামার কাছে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে, বাবার গাড়িটা কেন রাস্তার মাঝে ডিভাইডারের তোয়াক্কা না করে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল? এই প্রশ্নটা অভিকে বারবার ঘিরে দাঁড়াচ্ছিল। দাদু আর ঠামির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দাদুভাইটি যখন চোখের জল মুছতে মুছতে দেখেছিল, বনিকে তিনি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছেন, তখন তার মনে হয়েছিল--এই বুঝি সারা বিশ্বে তার একান্ত নিজের যা কিছু! কল্যাণমামা দাদুকে অনেক করে বুঝিয়ে বলে গেছিলেন, অভির মাথায় হাত রেখে কেবল বলেছিলেন, ‘বনির দাদা আছে তো। মেসোমশাই চিন্তা করবেন না।’

    আলমারি থেকে বড় বড় ‘পাজল’-এর সেটটা বের করে বনির সামনে সাজিয়ে বসেছিল অভি। যেদিন বনি সবকটা ব্লক সাজিয়ে একটা ট্রেন তৈরি করে ফেলবে, সেদিন কল্যাণমামাকে ফোন করে জানাবে--মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে রেখেছিল অভি।

    অবশ্য ছুটির দিনটা মনে রাখতে ‘সফট টয়’-টার কোনো ভুল হত না। ওইদিন যে দাদার হাতে খাওয়ার দিন।

    না, তার দাদা কোনো ত্রুটি হতে দেবে না বনির লালনপালনে।

    দেখতে দেখতে পুজো এসে পড়ল। ঢাকের বোল শুনে যে আনন্দটা হত এতদিন, এবার আর হল না। কিন্তু সেই শব্দ ছাড়িয়ে আজ সকালে পড়ার ঘরের পাশের ঘর থেকে এ কোন নতুন শব্দ ভেসে এল? ‘কু ঝিকঝিক… ঝিকঝিক… ঝিকঝিক…’ অভি যেন ক্ষণিকের জন্য বনির হাতে গড়া ট্রেনের গার্ড হয়ে গেছিল। দাদার হাতে সবুজ পতাকা দেখিয়ে বনিকে বলতে চাইছিল অভি, ‘তুমি স্বাধীন! তুমি মুক্ত হতে পেরেছ আজ! আর তোমার কোনো ভয় নেই। এভাবেই এগিয়ে যাও!’

    কল্যাণমামা ফোনে জানিয়েছিলেন, অনেকগুলি সিঁড়ি ভেঙে আজ উঠে এসেছে বনি ও তার দাদা। কিন্তু অভি আরো উপরে উঠতে চায়। এত উঁচুতে, তার বাবা-মা মাথা নিচু করলেই ওদের দেখতে পাবে।

    এরপরের সিঁড়ির ধাপগুলো অভির কাছে তেমন কঠিন, তেমন দুরূহ আর মনে হয়নি। পুজোর সময়, প্রতিমার চোখে শিল্পীর তুলির টানের মতো বনির চোখে যেদিন নতুন এক প্রাণের আভাস পেয়েছিল অভি, সেদিনই তাকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়েছিল মাঠে ঠাকুর দেখাতে।

    বনির নতুন স্কুলটা যেন তার কাছে একটা খুসির ফোয়ারা। বনির আঁকার খাতায় ‘সবুজ গ্রাম’, ‘আকাশে ঘুড়ির মেলা’, ‘পুকুরে হাঁসের আড্ডা’-র মতো এতরকমের ছবি দেখতে দেখতে কখন যেন অভি স্মৃতির সাগরে হারিয়ে যেত। তার নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যেত। আর তখনই সে সতর্ক হয়ে পড়ত, বনিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে! তাকেও যে স্বাভাবিক শৈশবের অংশীদার হতে হবে!

    তারপর, কত মাস কেটে গেছে। স্কুলের গানের মাস্টারমশাই নিজে আজকাল বাড়িতে এসে বনিকে তালিম দেওয়া শুরু করেছেন। গ্রামছাড়া রাঙা মাটির পথে অভি শুধু একাই হাঁটছিল এতদিন। এখন বনি তার সঙ্গী হল।

    গ্রীষ্মের রোদে ঝলমল সেই দিনটা ছিল পঁচিশে বৈশাখ। কবির সম্পর্কে নানান কথা বোঝানোর চেষ্টা করছিল অভি তার খুদে বোনকে। আজ যে তার জলসায় গান গাওয়ার কথা!

    সারা প্রেক্ষাগৃহ অধীর আগ্রহে কান খাড়া করে শুনে গেছিল তার শ্রুতিমধুর কন্ঠে ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে… নূতন জন্ম দাও হে…।’

    ছোটদের বিভাগে দ্বিতীয় স্থানাধিকারি অভীপ্সা ব্যানার্জি যখন পুরস্কার হাতে স্টেজ থেকে গুটি-গুটি পায়ে নেমে আসছিল, তখন অভির সেদিনকার মতো ঝাপসা চোখের আড়ালে দাঁড়িয়ে তার মা-বাবা যেন অভয় দিচ্ছিলেন, আর বলছিলেন, ‘সিঁড়ির শেষ ধাপে আসতে পেরেছ অভিমন্যু!’ অভীপ্সা ব্যানার্জির হাত থেকে ‘সেরা দাদা’-র পুরস্কারটা যে তাকে এবার গ্রহণ করতে হবে।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)