• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গল্প
    Share
  • উত্তমে অধম : লুনা রাহনুমা



    বার্কশায়ার যাওয়ার পথে রাস্তাটি ভারী সুন্দর। দুই দিকে এত জীবন্ত সবুজ যে মধ্যখানের পিচ ঢালা মহাসড়কের পোড়া বুকটিকে মনে হয় নদীর জলহীন ধারা আর তার উপরে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে একেকটি ইঞ্জিন চালিত স্পিডবোট। মোটরওয়েতে আগেপিছে করে উইল্টশায়ার থেকে মোকাম্মেল হকের বাড়ি পৌঁছাতে দেড় ঘন্টা সময় লাগে। তাও যদি রাস্তায় ট্রাফিক ওয়ার্কে স্পিড লিমিট সত্তর থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ চল্লিশে নামানো না থাকে।

    সবার আগে এসে পৌঁছেছিল ফেরদৌসীরা। গতমাসে ফেরদৌসীর শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন ঢাকা থেকে। তাঁরাও এসেছেন বেড়াতে। আর ফেরদৌসীর দস্যি দুই যমজ ছেলে এসেছে একই পোশাক পরে। কোনটি যে কোন জন, সবার মধ্যে সেই পরীক্ষার খেলা হবে আরো পরে। ফেরদৌসীকে দেখে দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন মোকাম্মেল হকের স্ত্রী নিলুফার। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমেই কথা বলেন বয়স্ক মানুষ দু’জনের সঙ্গে। বলেন, 'খালাম্মা খালু, আপনারা যে কষ্ট করে এসেছেন, তার জন্য খুব খুশি হয়েছি আমরা। আপনাদের কোনও কষ্ট হয়নি তো পথে!'

    গাড়ি থেকে নেমে দুই পা আর দুই হাত কিছুক্ষণ টান করে মেলে ধরেছেন তারা বুড়ো-বুড়ি দু’জন। নিলুফারের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বুড়ো মানুষটি বলেন, 'কষ্ট কীসের মা, তোমাদেরকে দেখার জন্যেই তো আমরা এই বয়সে এত দূর আসি। তোমরা আছ বলে আমার মেয়েটা এই বিদেশে থেকেও নিজের দেশের মতোই আনন্দে আছে।'

    ফেরদৌসীর আগমনের পর একে একে বাকি নিমন্ত্রিত অতিথিদের সবাই এসে উপস্থিত হতে থাকে। বিশেষ কোনও উপলক্ষ্য নেই আজ। জাস্ট গেট টুগেদার পার্টি। দুপুরে সবাই একসঙ্গে লাঞ্চ করে আড্ডাবাজি আর গল্পগুজব করে সময় কাটানো। আমরা পৌঁছেছি সবার শেষে। আমার একদম ইচ্ছে ছিল না দাওয়াত খেতে এতদূর আসার। কিন্তু ফয়সাল আর আমার দুই মেয়ের কারণে আসতে হয়েছে। আমরা বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই ছুটে এল নিলুফার ভাবীর ছোট মেয়ে অতসী। কোনও অজানা কারণে মেয়েটি আমার খুব ফ্যান। ছুটে এসে আমার পা জড়িয়ে ধরে বলল, 'কখন থেকে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য খালামনি, আর তুমি এত দেরি করে আসলে?' চার বছরের অতসীকে কোলে তুলে নিয়ে ফোলাফোলা আর নরম দুই গালে দুটো চুমু দিয়ে বললাম, 'সরি ময়না পাখি, খুব দেরি করেছি বুঝি!' দুই হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে অতসী বলল, 'ইটস ওকে!'

    অতসীকে কোলে নিয়ে ঢুকে গেলাম বসার ঘরে। মোটমাট পাঁচটি অতিথি ফ্যামিলি আর হোস্ট ফ্যামিলি সহ ছয়টি পরিবার চেপেচুপে বসেছে মাঝারি সাইজের বসার ঘরে। কেউ সোফায়, কেউ ফোল্ডিং চেয়ারে, কেউ পুফেতে, আবার কেউ বসেছে সোফার হাতলে। আমাদেরকে ঢুকতে দেখে অপরিচিত একজন ভদ্রলোক কোনার ওয়ানসিটার সোফা থেকে উঠে পাশে সরে গেলেন। ভদ্রলোককে আমি চিনতে পারলাম না। আগে কখনও দেখিনি। মনে মনে ভাবলাম, হয়তো এই এলাকায় নতুন এসেছেন। আমার দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নেন তিনি। আমার স্বামীকে বললেন, 'বসুন না এখানে। এই সোফাতে বসুন।'

    ফয়সাল সঙ্গে সঙ্গে নিষেধ করে বলল, 'আরে না না, আপনি উঠছেন কেন। আমি একটা জায়গা খুঁজে নেব এখন। আপনি বসুন।'

    কিন্তু অত্যন্ত মার্জিত ভদ্রলোক ততক্ষণে পাশের আরেকটি টুলে বসে পড়েছেন। ভদ্রলোকের গায়ে একটি ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবি। ফর্সা আর ক্লিন সেইভড চকচকে গালের উপরে ঝিলিক ছড়াচ্ছে পাঞ্জাবির ঘিয়ে রঙের আভা। জেল মাখানো মাথার চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা। একটি চুলও ছুটে আসেনি কপালের উপরে। এমন ব্যক্তিত্ববান বাঙালি পুরুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। না চাইলেও বারবার আমার চোখ চলে যাচ্ছিল লোকটির দিকে। ভাবছিলাম, কার মতো লাগে! কার চেহারার সঙ্গে যেন খুব মিল আছে এই মুখের! মনে করতে পারলাম না। ফয়সাল সোফায় বসে আমাকে ইঙ্গিত করে ওর সোফার হাতলে বসতে। অতসীকে বললাম, 'এখন একটু যাবে মাম্মির কাছে? খালামনি সবার সঙ্গে কথা বলি। তারপর তোমার সঙ্গে অনেক গল্প করব, কেমন?' আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে কোল থেকে নেমে অন্য ঘরে দৌড় দিল অতসী।

    রাশনা ভাবিও এসেছেন দেখলাম। যদিও মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব ভালো। নাম ধরে ডাকি আমরা, আর তুমি করে বলি। রাশনা বলল, 'তোমার এই শাড়িটা গতবছর এনেছিলে না ঢাকা থেকে? সেই যে দশটি শাড়ির মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর বলেছিলাম যেটাকে আমি!'

    ঘষা পীত-রঙা তিন ইঞ্চি পাড়ের এই কাঞ্জিভরম শাড়িটা সত্যি খুব সুন্দর। বেগুনি আর বটলগ্রিন সুতোর সঙ্গে জরির চমৎকার বুনন। শাড়িটা আমারও খুব প্রিয়। বললাম, 'হুম। মনে হলো আজকে আবহাওয়া সুন্দর। এমন ঝকঝকে রোদ। শাড়িটা পরি।' দেখলাম ঘরের অন্য কোণ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আরো কয়েকজোড়া চোখ। সবার চোখের প্রশংসাসূচক দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আড় চোখে আমি দেখতে থাকি ফয়সালের পাশে বসে থাকা নতুন লোকটিকে। ভদ্রলোকের নাম জানা হয়নি এখনও।

    আমার চিন্তা পড়তে পেরেছে কিনা কে জানে, বলল, 'আমি আলতাফ মাহমুদ। আপনি?'

    ফয়সালকে বলেছে কথাটা। ফয়সাল ভদ্রলোকের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে করতেই কথাটি আমার মনে পড়ে গেল। চিনেছি। মানে, বুঝতে পেরেছি এতক্ষণে, কেন ভদ্রলোকের মুখটি আমার চেনাচেনা লাগছিল। আহা, আ হা আমার স্বপ্নের নায়ক উত্তম! অবিকল উত্তমকুমারের মুখটি যে! ফয়সালের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, 'দেখো, লোকটি দেখতে একেবারে উত্তমকুমারের মতো। ঠিক না!'

    ফয়সাল আমার কথায় মৃদু হেসে ডান পাশে বসে থাকা নায়কের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমার ভেতরে উত্তেজনা বাড়তেই থাকে। লোকটির হাসি কী সাংঘাতিক! ঠিক নায়কের হাসি যেমন হওয়া উচিত। আর মুখের ত্বক! উফফ, আলো ছিটকে যাওয়া মসৃণ। একটাও দাগ নেই চামড়ায়। আচ্ছা ছেলেরাও কী বেড়াতে গেলে মুখে ফাউন্ডেশন মাখে? 'ধুর!' নিজেকে আমি সামান্য ধমক দিলাম মনে মনে।

    আমার স্বামীর সঙ্গে নায়কের আলাপ জমে উঠল সহসা। যদিও আমি চাচ্ছিলাম ফয়সাল নায়কের সঙ্গে বেশি কথা না বলুক। এমনিতেও ফয়সাল শুদ্ধ করে দু’ লাইন কথা বলতে পারে না, তার উপর এমন কেতাদুরস্ত একজন মানুষের সামনে বেফাঁস কী না কী সব গেঁয়ো শব্দ উচ্চারণ করে বসবে। কিন্তু আমার ইতস্তত ভাব আমার স্বামীটি কোনওদিন বুঝলে তো কাজই হতো! অগত্যা আমি সামনের কাচের টি-টেবিলের উপর থেকে কয়েকটি মসলা কোটেড বাদাম হাতে নিয়ে গালে পু্রতে থাকলাম আর দুজনের কথা শুনছি।

    "আপনি কোথায় আছেন? মানে আপনার প্রফেশন কী?" উত্তমকুমার জিজ্ঞেস করেছেন আমার বরকে। ফয়সাল উত্তর দেবার আগে আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, "তুমি যে ক্যাবিং করো এটা বলার দরকার নেই ওনাকে।" কিন্তু ফয়সাল দেখি দন্ত বিকশিত করে হেসে হেসে কথা বলছে নায়কের সঙ্গে। আমার কথা কানে শুনেছে ঠিক, কিন্তু একটুও পাত্তা দিল না। এই মুহূর্তে আমার চোখে নায়কের পাশে ফয়সালকে ঠিক একটা ম্যাড়ম্যাড়ে ভিলেনের মতো দেখাচ্ছে। স্বামীদুর্ভাগ্যে আবারও লজ্জিত হলাম আমি অন্তরে অন্তরে। ফয়সাল বলল, "আমি ভাই একটা বাংলা গ্রোসারি শপে কাজ করি। সপ্তাহে পাঁচদিনই কাজ থাকে। উইকেন্ডে আর রাতে ট্যাক্সি চালাই।"

    ফয়সালের কথায় আলতাফ মাহমুদের মুখের রেখা একটুও বদলালো না। স্মিত হেসে বললেন, "পুরুষের কাজ কর্ম করে যাওয়া, পুরুষেরা কর্মেই বীর।"

    আমাদের হোস্ট মোকাম্মেল ভাই চায়ের ট্রে হাতে এগিয়ে আসছেন সবার সামনে। ট্রে থেকে সবাই একটি করে গরম চায়ের মগ তুলে নিচ্ছেন। পুরো ঘরে দুজন দুজন করে আলাপ আড্ডা চলছে। মাঝে মাঝে হা-হা হাসির শব্দ ফেটে পড়ছে ঘরে। ফয়সাল প্রশ্ন করে, "আপনি কী কাজ করেন? আপনার জব?"

    ফয়সালের প্রশ্নের উত্তর দিল মোকাম্মেল ভাই, "আলতাফ ভাই তো ভোডাফোনের চিফ ইঞ্জিনিয়র। নিউবারিতে ভোডাফোনের হেডকোয়ার্টারে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছেন কয়েক মাস আগে। দারুণ ব্রিলিয়ান্ট মানুষ। আমাদের দেশের গর্ব বলতে পারেন।"

    মোকাম্মেল ভাইয়ের কথায় আমার মনে পড়ে গেল "অগ্নিপরীক্ষা" মুভিতেই তো উত্তমকুমার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। মুহূর্তে আমার চোখে ভাসতে থাকে সেই টেলিফোনালাপের দৃশ্য। সাদাকালো ফিতেয় টেলিফোন কানে নিয়ে উত্তমকুমার বলছেন, "নিঃসঙ্গতার চেয়ে বড় বেদনা বোধ হয় আর কিছুই নেই।" আহা! অপর পাশে সুচিত্রা সেন টেলিফোন কানে লাগিয়ে মুখ বাঁকা করে বলছেন, "আপনি নিঃসঙ্গ হবেন কেন? ইচ্ছে করলে তো সবকিছুই পেতে পারেন।" ইস। সবকিছুই যে পেতে পারে, সেও কি সবকিছু পাবার ইচ্ছে পোষণ করে সবসময়! আমার মনে হচ্ছে আমার সামনে বসে থাকা আলতাফ হোসেন লোকটি যেন সেই উত্তমকুমারের মতোই বলল, "পয়সা দিয়ে যা পাওয়া যায়, তা পেতে পারি নিশ্চয়।"

    আমার ইচ্ছে করছিল ফয়সালকে বলি নায়কের কাছ থেকে সরে গিয়ে আর কারো সঙ্গে গল্প করতে। কারণ আমার স্বামীর বাস্তব জ্ঞানের খুব অভাব। সমাজে দশটি মানুষের সঙ্গে একপাতে বসতে গেলে যে নিজেকে কিছুটা সাজিয়েগুছিয়ে উপস্থাপন করতে জানতে হয়, সেই বিদ্যা ওর নেই।

    "আপনার ঘড়িটি চমৎকার।" ফয়সাল বলল উত্তমকুমারকে। উত্তরে তিনি একগাল হেসে বলেন, "হুম, এটা রোলেক্স সাবমেরিনার। অফিসের কাজে আমাকে প্রায় বোস্টনে যেতে হয়। বোস্টনের কাছাকাছি ম্যাসাচুসেটস-এর একটা বড় শোরুম থেকে কিনেছিলাম ঘড়িটা। কয়েক বছর আগে।"

    যা ভেবেছিলাম তাই। ফয়সাল আবার দামটাও জানতে চাইল! এই লোকটাকে নিয়ে কোথাও গেলে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়। কিন্তু মুখের কথা আর তীরন্দাজের তির, একবার ধনুক থেকে ছুটে গেলে আর কি ফেরানো যায়! যায় না। নাও। হলো তো! ফল ভোগ করো এবার। জবাব দিয়েছেন তিনি, "তেত্রিশ হাজার পাউন্ড!"

    ফয়সাল ওর শার্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে নায়কের নাম্বার সেভ করে নিল। সেই সঙ্গে নিজের নাম্বারটিও দিয়ে দিল। কথায় কথায় জানালেন তিনি বাগান করতে ভালোবাসেন। তবে শুধুই ফুলের গাছ। যদিও ইংল্যান্ডে সামার বলতে আসলে বছরে বড়জোর আড়াই কি তিন মাস, তাই বাইরে বাগান করা হয় না তেমন। ঘরের ভেতরে তার নানারকম গাছ আছে। মোবাইলের ফটো গ্যালারি থেকে বেশ কিছু ছবি বের করে দেখালেন ফয়সালকে আর আমাকে। ছোট-বড় চমৎকার টবে দারুণ সব অর্কিড, পাতাবাহার, ও সিজনাল ফুলের গাছ। বিস্ময়ে প্রশংসা করতে থাকে ফয়সাল। মনে মনে ফয়সালের মুখে হাত দেই আমি, বিড়বিড় করে বললাম, "একটু থামো তো! জানো তো খালি গাঁইয়া ভাষায় বাহ্ বাহ্ করতে। এসব শখের ছিটেফোঁটাও যদি থাকত তোমার মধ্যে!"

    নিজের মোবাইল থেকে আমাদের বাগানের গতবছরের শাকসবজির কিছু ছবি দেখালো ফয়সাল। সে সবই আমার নিজের করা। আলতাফ হোসেন পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে লাগালেন। ছবিগুলো ভালো করে দেখবেন। আমার বুকের ভেতরে কেমন দ্রিম দ্রিম ড্রাম বেজে উঠল তাঁর দিকে চেয়ে। যা ভাবা যেত এমন সময়ে, ঠিক তাই। কালো রঙের মোটা ফ্রেমের চশমাটি গোলগাল মুখে কী দারুণই না মানিয়েছে। আমার প্রাণ ছলকে ওঠে তৎক্ষণাৎ। মন বলে, "ওহে সুদর্শন, আরেকটু চাও আমার দিকে!"

    দীর্ঘদেহী আলতাফ হোসেন ফর্সা হাত বাড়িয়ে ফয়সালের মোবাইলটি নিজের হাতে নিলেন। আমার ফলানো লাউ, কুমড়া, টমেটো আর পালং শাকের প্রশংসা করেন। কিন্তু তাদের আলাপ বেশিক্ষণ বাগান আর ফুল অথবা ফলে আবদ্ধ থাকল না। আরও দু’জন ভাই-সহ তারা খেলার খবরে মেতে উঠল। মহিলা টেনিসে কে চ্যাম্পিয়ন হলো। পরের বার ফুটবলে কে বিশ্বকাপ জিততে পারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও কেন আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দল নিজেদেরকে সেই পর্যায়ে নিতে পারছে না। এমন আরও সব আলাপ আরম্ভ করেছে, যা আমাকে ঠিক আগ্রহী করছে না। কিছুক্ষণ পর আমরা মেয়েরাও নিজেদের মনোমতো আলাপের সুবিধার্থে কনসারভেটরিতে গিয়ে বসলাম। সোফায় পা উঁচু করে বসে খুব হাসি আড্ডা জমে উঠেছে আমাদের। রান্নাঘর থেকে খাবার গরম করার সুগন্ধ ভেসে আসছে। "নতুন এই লোকটি দেখতে উত্তমকুমারের মতো না?" সারা ভাবির কথায় চমকে উঠলাম আমি। বললাম, "আমার কাছেও তাই লাগছে।"

    "তিনি নিজেও হয়তো জানেন ব্যাপারটা। তাই চশমাটিও নিয়েছেন উত্তমকুমারের ফ্রেমের ডিজাইনে।"

    "যাহ, আমার কাছে তা মনে হচ্ছে না। উত্তমকুমার এত লম্বা ছিল না। ভদ্রলোক প্রায় ছয় ফুট হবেন। আর উত্তমকুমার তো একটু গাঁট্টাগোঁট্টা ছিল। ইনি কেমন স্লিম দেখেন।"

    রাশভারী মহিলা হিসেবে পরিচিত আমাদের বার্মিংহামের সুলতানা ভাবিও দেখলাম সিনেমা জগৎ সম্পর্কে বেশ আগ্রহী। বললেন, "আমার কাছে কিন্তু উত্তমকুমারের চেয়ে সৌমিত্রকেই বেশি ভালো লাগে বরাবর।"

    "ভেট, কোথায় উত্তম আর কোথায় সৌমিত্র!" তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলাম আমরা বাকিরা। বললাম, "চাঁদের সঙ্গে তুলনা হয় না আর কোনো নক্ষত্রের, সকলই ম্লান, আলোহীন। রুপালি বিন্দু মাত্র!"

    "চাঁদকে নক্ষত্র বলা যায় না। চাঁদ একটি উপগ্রহ। তবে এই ভদ্রলোক সত্যি কিলার। এক দেখায় মার ডালা।"

    খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়তে চাইছে কনসারভেটরির কাচের ঘরটি। তুমুল আড্ডার এমন সময়ে আমার চোখ গেল বাগানে। কনসারভেটরির সাদা কাচের বাইরে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ওদের। বাগানের যেখানটায় পাকা করা আছে, সেখানে ছেলেরা কয়েকজন বাইরে। দু’জন দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। ফয়সাল আর নায়ক পাশাপাশি স্টিলের চেয়ারে বসে কথা বলছেন। নায়কের মুখে সিগারেট। মার্লবোরো হোয়াইট সিগারেট হবে। উত্তমকুমারের ঠোঁটে লম্বা সিগারেট দেখে আমার মনে পড়ে গেল "নায়ক" মুভির কথা। সেই যে, শর্মিলা ঠাকুরের বাড়িয়ে দেয়া কাগজে সই দেবার সময় সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সংলাপ আওড়াচ্ছিলেন উত্তমকুমার, "তাই বলুন, আপনাকে দেখে ঠিক সই-নেয়া টাইপ বলে মনে হয় না।"

    সিগারেটের গন্ধ আর ধোঁয়া আমার দুই চোখের বিষ। কিন্তু নিঃসন্দেহে আজ থেকে সিগারেট আমার প্রিয় জিনিসের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। নায়কের হাতে সিগারেট যেন তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে বাগানের বাদামি ইটের ব্যাকগ্রাউন্ডে। আমার খুব ভালো লাগছে যে ফয়সাল নায়কের সঙ্গে বেশ খাতির করে ফেলেছে। এরপর নিশ্চয় ভদ্রলোক আমাদের বাড়িতে আসবেন। আমরাও যাব তাদের বাড়িতে। ভাবলাম, নায়কের ফ্যামিলি আসেনি আজ? নতুন কোনো ভাবিকে দেখছি না তো এখানে। অবশ্য উপরতলায় বেডরুমেও থাকতে পারে। ছোট বাচ্চা থাকলে তাকে খাওয়ানো, ন্যাপি বদলানো এসব করতে হতে পারে।

    এমন সময় বাড়ির মালকিন নিলুফার ভাবি এসে বসেছেন আমাদের সঙ্গে। আমাদের মধ্যে সিনেমার নায়ক নিয়ে আলাপ হচ্ছে শুনে তিনি বললেন তাঁর পছন্দ আমির খান। তবে আজ আমরা কেউই আমির খান সম্পর্কে আগ্রহী নই। বরং আমরা আমাদের আলোচ্য নায়ক উত্তমকুমার ওরফে আলতাফ হোসেন সম্পর্কে জানতেই বেশি আগ্রহী।

    "আমাদের এই নায়কের ওয়াইফ আসেনি আজ?"

    "ভদ্রলোক কি বিপত্নীক?"

    "তিনি কি চিরকুমার?"

    "সুদর্শন এই নায়ক কি বিয়ের পাত্রী খুঁজছেন?"

    আমাদের এতসব প্রশ্নের উত্তরে নিলুফার ভাবির জবাব শুনে আমাদের সবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। একে অন্যের মুখের দিকে চেয়ে বললাম,

    "কী বলেন ভাবি, সত্যি নাকি?"

    "কী ভয়ংকর! এ যে গল্পকেও হার মানায়।"

    "দেখে তো খুব ভালো মানুষ মনে হচ্ছে। অথচ এমন খারাপ লোক? ছিঃ!"

    "একদম বিশ্বাস হচ্ছে না ভাবি, এই লোকের পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব!"

    আসলে, ব্যাপারটি হচ্ছে যে, আলতাফ হোসেনের একজন স্ত্রী আর একটি পুত্র সন্তান, ছিল। কয়েক বছর আগে স্ত্রী আর পুত্র দুজনেই মোটরওয়েতে একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। কিন্তু পুলিশের ধারণা এই দুর্ঘটনাটি আসলে আলতাফ হোসেনের পরিকল্পনা করা। কারণ এক্সিডেন্টের কিছু ব্যাপারে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ আলতাফ হোসেনের বাড়ি চেক করে এবং তাঁর স্ত্রীর কিছু ডায়েরি পায় যেখানে তাদের অসুখী দাম্পত্য আর আলতাফ হোসেনের বিকৃত মানসিকতার লিখিত বিবরণী পাওয়া গেছে। স্ত্রী হত্যার কেসটির এখনও সুরাহা হয়নি।

    পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যাওয়া টের পাই আমি। কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছে উত্তমকুমার নিজের স্ত্রীকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করতে পারে। যদি করেও থাকে, তাহলে তাঁর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? জানি না। আমার মনে পড়ছে "জীবন জিজ্ঞাসা" মুভির শেষ দিকের দৃশ্যের কথা। যেখানে প্রতিষ্ঠিত উকিল উত্তমকুমার আদালতে সবার সমানে নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করে বলেন, "একটা কথা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না মাই লর্ড যে, অন্যায় আমার দোষ আমার কিন্তু শাস্তি পেল আমার স্ত্রী আমার সন্তান। নাম ছিল তাঁর রাধা। আর আজ সে শেফালী রানী। মাই লর্ড আমার বিচার কোথায় হবে আমি জানি না। কিন্তু মনের আদালতে আমি দোষী।"

    হঠাৎ করে খুব বমি পেতে থাকে আমার। দৌড়ে টয়লেটে গিয়ে সিংকের কাছে দাঁড়িয়ে বমি করার চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ। লাভ হলো না। সবার সঙ্গে বসে নিজেকে ভোলানোর চেষ্টা করলাম আরও কয়েক মিনিট। কিন্তু মনের অস্থিরতা কিছুতেই কমছে না। বাইরে বাগানে বসে এখনও ফয়সাল কলেজ বন্ধুর মতো অন্তরঙ্গভাবে গল্প করে যাচ্ছে লোকটির সঙ্গে। বাকিরা সবাই ঘরে চলে এসেছে। আমার ইচ্ছে করছে ফয়সালকে ডেকে নিয়ে আসি। এত ফালতু একটা লোকের সঙ্গে এত কথা বলার কী আছে। তাছাড়া এখানে আরও তো কতজন আছে, তাদের সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হবে না ওকে?

    মোকাম্মেল ভাইয়ের বাড়ি থেকে ফিরতে আমাদের বেশ রাত হলো। ডিনার শেষ করে সবাই মিলে লুডো আর ক্যারাম খেলা হয়েছে। বেশ সরগরম পার্টি চলেছে রাত দশটা পর্যন্ত। গাড়িতে উঠে ফয়সালকে ফুরফুরে লাগে। বাচ্চা দু’টি পেছনের সিটে দশ মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার মনের বিষণ্ণতা কিছুতেই যাচ্ছে না। "কী ব্যাপার কথা বলছ না যে?" ফয়সাল জিজ্ঞেস করল।

    দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "কিছু না। এমনি।"

    "নায়কের জন্য বুকটা খালি খালি লাগছে নাকি?" ঠাট্টা করতে ছাড়ে না আমার স্বামী।

    বললাম, "আরে না। দেখতে নায়ক হলে কী হবে, সে তো আসলে একটা ভিলেন।"

    ফয়সাল বলল, "মানে? ঘটনা কী?"

    ফয়সালকে সবকিছু বললাম। নিলুফার ভাবির বক্তব্য। আর এখনও যে আলতাফ সাহেবকে নিয়মিত কোর্টে হাজিরা দিতে হয়, সেটিও জানালাম। কিন্তু মুদ্রার যেমন দুইটি পিঠ থাকে, তেমনি প্রতিটি গল্পেরও দুই বা তারও বেশি দিক থাকে। ফয়সালের কাছে জানলাম, নায়কের স্ত্রীর সিজোফ্রেনিয়া ছিল। বাংলাদেশে সে ডাক্তারের কাছে গেলেও ইউকে-তে আসার পর মেন্টাল হেলথ টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি তখনও। সুদর্শন স্বামীকে নিয়ে মেয়েদের অত্যাধিক আগ্রহের কারণে ভদ্রমহিলা সবসময় স্বামীকে সন্দেহ করতেন। নিজের মনেই কল্পনা করে নিতেন নানারকম আজেবাজে কাহিনী, ঘটনা। এই নিয়ে খুব ঝগড়াঝাঁটিও হতো তাদের মধ্যে। মানসিক অস্থিরতার এক পর্যায়ে মহিলা নিজেই ছেলেকে নিয়ে ড্রাইভ করার সময় মোটরওয়েতে একটা বড় ভ্যানের সঙ্গে ইচ্ছে করে গাড়ি লাগিয়ে দেয়। নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করা প্রবাদের মতো এটি হচ্ছে নিজে মরে গিয়ে স্বামীকে ফাঁসিয়ে যাওয়া।

    "তুমি বিশ্বাস করেছ লোকটির এসব বাকোয়াজ গল্প?"

    ফয়সাল হাসে, "কেন বিশ্বাস করব না। বাগানে বসে ভদ্রলোক নিজেই তো আমাকে ঘটনাটি বলছিলেন আজ।"

    "এত অল্প পরিচয়ে সে তোমাকে এত ব্যক্তিগত কথা বলল কেন?" সন্দেহ লাগছে আমার। সেটি আমি প্রকাশও করলাম।

    ফয়সাল আবারও হাসল। স্টিয়ারিং হুইল থেকে বাম হাত সরিয়ে আমার হাতের উপরে রাখল। মৃদু একটা চাপ দিল আমার হাতে। বলল, "মাঝে মাঝে মানুষ নিজেকে হালকা করার জন্য অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত মানুষের কাছে একান্ত ব্যক্তিগত কথা বলে। এটা একটা ইফেকটিভ কাউন্সিলিং থেরাপির মতো পজিটিভ রেজাল্ট দেয়।"

    আমি অবাক হলাম ফয়সালের কথা শুনে। শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে না জানা, গেঁয়ো আর অড জব করা আমার স্বামীকে আজ যেন অন্য কেউ বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। কয়েক ঘন্টা আগেও ওর প্রতি আমার যে মনোভাব ছিল, তার জন্য এখন নিজের কাছে লজ্জা লাগছে। রাতে গাড়ি কম থাকায় ফয়সাল টেনে চালিয়ে সোয়া একঘন্টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে দিল আমাদের। বাচ্চাদের যার যার খাটে শুইয়ে দিয়ে নিজেও ফ্রেশ হয়ে নিয়েছি। ফয়সাল টিভিতে নিউজ দেখল কিছুক্ষণ। আমি হাতে মুখে ক্রিম ঘষে কিছুক্ষণ বই পড়লাম। আমাদের শুতে শুতে রাত বারোটা পার হয়ে গেল। খাটে শুয়েও আমি আমার মাথা থেকে নায়কের চিন্তা সরাতে পারছিলাম না। কয়েক বার এপাশ ওপাশ করতেই ফয়সাল বলল, "অস্থির হয়ে আছ কেন তুমি? পেটে বাতাস ঢুকেছে নাকি?"

    সত্যি কথাটাই বললাম ওকে, বললাম, "বাইরে থেকে দেখতে এত সুন্দর একটা মানুষের মনটাও কেন সুন্দর হয় না?"

    "আলতাফ ভাইয়ের কথা বলছ?"

    "হুম।"

    "কিন্তু তাঁর স্ত্রী তো সিজোফ্রেনিক ছিল। ব্যাপারটা তোমাকে বুঝতে হবে স্নেহা।"

    ফয়সালের কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না আমার। নিঃশব্দে দেয়ালের দিকে পাশ ফিরে শুলাম। দুই পায়ের মধ্যে কোল বালিশ চেপে আমাকে গুড নাইট বলে ঘুমানোর চেষ্টা করছে ফয়সাল। আমিও চোখ বন্ধ করে আছি। ঘুম আসুক। শান্তির ঘুম নেমে আসুক আমার চোখের পাতায়। হালকা তন্দ্রার মতো আচ্ছন্ন হয়েছি যখন, তখন আবার ঘুরে শুলাম ফয়সালের দিকে। ওর টিশার্টের ভেতরে একটি হাত ঢুকিয়ে অন্যমনস্কভাবে বুকের লোমে আঙ্গুল নাড়তে থাকি। ঘুমঘুম চোখে ফয়সাল বলল, "ঘুম আসছে না তোমার?"

    বললাম, "আসছে, কিন্তু একটা কথা।"

    "কী?"

    "আমার মনে হয় নায়কের স্ত্রী নায়কের কারণেই মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছিল। নিলুফার ভাবি যা যা বলেছেন, তার সব মিথ্যে নয়।"

    ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ফয়সাল উল্টো দিকে পাশ ফিরে শোয়। পাশ ফিরতে ফিরতে বলল, "যা রটে তার কিছু তো বটে! আচ্ছা, এসব চিন্তা বাদ দাও তো। অনেক রাত হয়েছে। নায়ক নায়িকার চিন্তা বাদ দিয়ে এবার একটু ঘুমাও তুমি।"

    “হুম।”

    কিন্তু চিন্তা বাদ দাও বললেই কি আর চিন্তা সরানো যায় মাথা থেকে! দেয়ালের দিকে মুখ করে বন্ধ চোখেও আমার কল্পনায় ভাসতে থাকে নায়ক উত্তমকুমার আর নায়কের অবয়বে আবির্ভূত হওয়া আলতাফ হোসেনের উজ্জ্বল দুটি চোখ, দীপ্ত আভার রোমান্টিক মুখচ্ছবি, বুকে ঘা দাবানো হাসির ছোরা আর সেই ল্যান্ডমার্ক কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। আমার চোখে ভাসছে "জীবন তৃষ্ণা" সিনেমায় উত্তমকুমার বলছেন, "ভাস্করবাবুকে আমি জানতাম। আর আপনাকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনতাম।" জবাবে গ্রীবা উঁচিয়ে অহংকারী সুচিত্রা সেন বলছেন, "আপনি আমাকে আগেও চেনেনি, এখনও ভুল চিনেছেন।"



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)