• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গল্প
    Share
  • কাঠের বাক্স : গান্ধর্বিকা ভট্টাচার্য



    “ধ্যাত্তেরিকি!”

    পরম বিরক্তি সহকারে সুকন্যা একটা বিগ শপারে লাথি মেরে খাটের ওপর বসে পড়ল। বাক্সটা এই ঘরেরই কোথাও থাকার কথা। অথচ তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেটা পাওয়া যাচ্ছে না – এ কেমন কথা? সুকন্যা ঘরটার দিকে কটমট করে তাকিয়ে রইল – যেন একটু ভালো করে চাপ দিলেই সত্যিটা বেরিয়ে আসবে। ঘরটাও তেমনি টেটিয়া। ভেতরের কথা ভেতরে চেপে বসে রইল। মুখ খুলল না মোটেই। দু'জনের ইচ্ছাশক্তির যুদ্ধে হেরে সুকন্যাকেই চোখ বন্ধ করে নিতে হল।

    তবে কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। কিছুক্ষণ বিস্ময়ে মাথা চুলকানোর পর সুকন্যাও পথ পেয়ে গেল। অব কোর্স! এটা আগে তার মাথায় আসেনি কেন? এ বাড়িতে কিছু খুঁজে পেতে হলে অগতির শেষ গতি মায়ের শরণাপন্ন হতে হবে! এটা সে কি করে ভুলে গেল?

    আপন মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সুকন্যা সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল।

    প্রথম এবং শেষ যেদিন ঠাম্মুকে বাক্সটা খুলতে দেখেছিল, সুকন্যার বয়স তখন সাত বছর।

    “ঠাম্মুকে নীচে আসতে বল, ভাত বাড়ছি,” মা সুকন্যাকে দূতী করে তিনতলার ঘরে পাঠিয়েছিল।

    ছোট সুকন্যা ঘরে ঢোকার আগেই বুঝে গেছিল সে ভুল সময়ে এসে পড়েছে। ঘরের হাওয়ায় রহস্যের গন্ধ। খাটের ওপর ঠাম্মু পা ছড়িয়ে বসে আছে, সামনে কি একটা যেন রয়েছে। ওকে দেখেই ঠাম্মু ঠক করে সেটা বন্ধ করে দিল। সুকন্যা দেখতে পেল মাঝারি মাপের একটা কাঠের বাক্স। পুরনো বাক্স বলে মনে হয়। রং চটে গেছে, কিন্তু ওপরের ফুলফুল প্যাটার্নটা এখনো বোঝা যাচ্ছে।

    চাবি ঘুরিয়ে ঠাম্মু বাক্সের তালাটা বন্ধ করে দিল। সুকন্যা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে - ঠাম্মুর মুখেচোখে একটা অচেনা খুশির আভা, কিসের যেন দ্যুতি ঠিকরে বেরচ্ছে।

    “ওই বাক্সটার মধ্যে কি আছে ঠাম্মু?”

    ঠাম্মু আলতো হেসে সুকন্যার চিবুক ধরে নেড়ে দিয়েছিল।

    “খুব দামি জিনিস আছে, দিদিভাই। দেশের ভিটে ছেড়ে আসার সময়ে আমার কাছে যত দামি জিনিস ছিল, সব এই বাক্সে ভরে এনেছি।”

    দামি জিনিস? কি জিনিস? সোনা-রুপো? হিরে জহরত? সুকন্যা শুনেছিল ঠাম্মুর বাবা নাকি ধনী মানুষ ছিল। তাহলে ঠাম্মু কি বরিশাল ছেড়ে আসার সময়ে ওই বাক্স করে নিজের গয়নাগাঁটি নিয়ে এসেছিল?

    “আমাকে দেখাবে?” সুকন্যা ঠাম্মুর খাট ঘেঁষে দাঁড়াল।

    “দেখবে একদিন। তোমার যেদিন বিয়ে হবে, গোটা বাক্সটা তোমাকে দিয়ে দেব,” ঠাম্মু হেসেছিল। “তোমার মা, কাকিমাও জানে না এই বাক্সর ভেতর কি আছে। তর বাপেরেও কই নাই।”

    ঠাম্মুকে সুকন্যা সেই প্রথম আর শেষ বাঙাল ভাষায় কথা বলতে শুনেছিল।

    দশ বছর বয়সে বরিশাল ছেড়ে আসা ঠাম্মু কোলকাতার ভাষা, আদবকায়দা নিখুঁতভাবে রপ্ত করে নিয়েছিল। তবু বলত, “কথায় এখনো বাঙাল টান আছে।”

    “কই আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না!” সুকন্যা প্রতিবাদ করত।

    ঠাম্মু একটুক্ষণ চুপ করে থাকত। তারপর বলত, “তুই বুঝবি না, এ-দেশিরা শুনলে বুঝতে পারে।”

    এ-দেশিরা...

    কথাটার মধ্যেই কেমন যেন একটা ব্যবধান লুকিয়ে আছে। যেন ঠাম্মু এখানে থেকেও ঠিক এখানকার নয়। দশ বছরেরও বেশি সময় সান হোসেতে কাটানোর পরে সুকন্যাও আজকাল এই ব্যবধানের মানেটা একটু একটু বুঝতে শিখেছে।

    তা সে যাই হোক, এরকম রহস্যময়ী ঠাম্মুর পক্ষে বাক্সের ভেতর সোনাদানা লুকিয়ে রাখাটা সাত বছরের সুকন্যার কাছে খুব একটা আশ্চর্যের ব্যাপার মোটেই ছিল না।

    পরে যখন সুকন্যা মাকে বাক্সের কথাটা বলেছিল মা খুব হেসেছিল।

    “হুঁ:, ওই বাক্সে সোনাদানা আছে না হাতির মাথা আছে! আমি আর তোর কাকিমা তো এক জোড়া বালার থেকে একটা করে পেয়েছি। তোর ঠাম্মুর মা গয়নাগাঁটি যা সঙ্গে করে এনেছিল সেসব ভাঙিয়েই তোদের এই বাড়িটা তৈরি হয়েছিল। আরো গয়না কোত্থেকে আসবে?”

    ঠাম্মু বাবার একমাত্র সন্তান ছিল। তাই বিয়ের পরে ঠাম্মুর বাবা বাড়িটা জামাইয়ের নামে লিখে দিয়েছিল। সুকন্যার বাবা-কাকা এই বাড়িতেই মানুষ হয়েছে।

    মায়ের তাচ্ছিল্য শুনেও সুকন্যার বিশ্বাস ভাঙতে চায় না। সে তো দেখেছে ওই বাক্সটা দেখে ঠাম্মুর মুখ কেমন জ্বলজ্বল করছিল। সোনাদানা, হিরে-জহরত ছাড়া কারুর মুখে এত আনন্দ দেখা যায় নাকি? সেদিন থেকে সুকন্যা নিশ্চিত, ঠাম্মু মিথ্যে বলেনি। ওই বাক্সের ভেতর অমূল্য কিছু একটা আছেই।

    তারপর কত রাত সুকন্যা স্বপ্ন দেখেছে – ঠাম্মুর সেই কাঠের বাক্সটা কিভাবে যেন তার হাতে চলে এসেছে। সে চাবি ঘুরিয়ে ছোট্ট রুপোর তালাটা খুলছে। বাক্সের ভেতর কত গয়না – কোহিনূরের চেয়েও বড় এক একটা হিরে; মুরগির ডিমের সাইজের এক একটা পান্না...মণিমাণিক্যের ছটায় তার মুখও ঠাম্মুর মতোই ঝলমল করছে...

    ঘুম থেকে উঠে সব রাগটা গিয়ে মায়ের ওপর পড়ত।

    উফ, কবে যে মা বিয়েটা দেবে!

    কিন্তু বেচারা মা-ই বা কি করবে? সুকন্যার তো সবে ন'বছর বয়স।

    ম্যান প্রোপোজেস ইত্যাদি। এক এক করে বছর ঘুরতে লাগল, কিন্তু সুকন্যার সেই প্রতিশ্রুত বিয়ের দিনটা আর কোনদিন এল না, আর সে বাক্সও হাতে পাওয়া হল না। তিরিশ বছর বয়সে অফিস থেকে অন সাইট নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল সে। তারপর দশটা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল। দাদুভাই চলে গেল।

    খুড়তুতো ভাই পাপানের বিয়ে হল। ছেলে হল। সেই ছেলের অন্নপ্রাশনও হয়ে গেল। পাঁচ বছর আগে শেষ যখন সুকন্যা কোলকাতায় এসেছিল ঠাম্মু তখন মৃত্যুশয্যায়। কিছু বলার অবস্থায় নেই। সুকন্যার মাথায়ও তখন বাক্সের কথা ছিল না। কাঠের বাক্সটা তার সব রহস্য নিয়ে ঘরের কোন এক কোনায় চিরতরে হারিয়ে গেল।

    তার পরের পাঁচ বছর হয় সুকন্যার মা-বাবা যুক্তরাষ্ট্রে গেছে, নয় সবাই মিলে কোন নতুন দেশ দেখা হয়েছে। মায়ের খুব ঘোরার শখ, কিন্তু ঠাম্মুর অসুখের জন্য অনেক বছর বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে পারেনি।

    “ঠাম্মুর ঘরে একটা কাঠের বাক্স দেখেছ মা?” সুকন্যা এ-ঘর ও-ঘর খুঁজে অবশেষে বারান্দায় এসে মায়ের খোঁজ পেল।

    মা তুলসী গাছে জল দিচ্ছিল। একটু অবাক হয়ে বলল, “কিসের বাক্স?”

    সুকন্যা হাত দুটো খানিকটা ফাঁক করল। “এরকম সাইজের। ওপরে ফুল ফুল ডিজাইন করা, পুরনো দিনের একটা বাক্স...”

    বলতে বলতে সুকন্যার নিজের ওপরেই সন্দেহ হয়। সে কি তাহলে ভুল করছে? সেদিনের পরে আর বাক্সটাকে সে চোখে দেখেনি। ঠাম্মু সেটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে তার সন্ধানও সে পায়নি। তাহলে পুরো ঘটনাটা কি শুধুই তার দেখা স্বপ্ন ছিল? আজকাল এটা খুব হচ্ছে। কোনটা সত্যি আর কোনটা স্বপ্ন সেটা বারবার গুলিয়ে যাচ্ছে। বাবা অবশ্য বলছে, জেটল্যাগ।

    “ঠাম্মুর আলমারির ওপরের তাকের কোনায় রাখা আছে।” মা সুকন্যার দিকে না তাকিয়েই গড়গড় করে বলে দিল।

    সুকন্যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, তাহলে স্বপ্ন নয়। সব বাস্তব।

    ওরে আছে, আছে, সব আছে!

    “হঠাৎ ওই বাক্সের খোঁজ পড়ল কেন?”

    সেও এক অদ্ভুত ঘটনা। আজ সকালেই ঠাম্মুর জিনিসপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ সুকন্যার হাতে ছোট্ট একটা চকচকে চাবি এসে পড়ল। দেখে মনে হল রুপোর। পুজোর গন্ধ-মাখা রোদে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে চাবিটা কেমন চেনা চেনা লাগল। যেন সুকন্যা আগেও একবার সেই চাবিটাকে দেখেছে।

    কোথায় দেখেছে?

    ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পঁয়ত্রিশ বছর আগের এক পোকায় খাওয়া স্মৃতি উস্কে উঠল। আর সেই থেকে শুরু হল বাক্স-অন্বেষণ।

    “থ্যাংক ইউ মা!”

    প্রায় ছুটতে ছুটতে সুকন্যা সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।

    আলমারি খুলে লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরের তাকটা হাতড়াতে থাকল সুকন্যা। কিন্তু যতদূর হাত যায় কিছুই তো ঠেকছে না! সুকন্যার মনে আশংকার মেঘ ঘিরে এল। তাহলে কি মা ভুল করল? অন্য কোন বাক্সের কথা বলল?

    না, অসম্ভব। বাড়ির জিনিস কোথায় কোনটা আছে মায়ের কোনদিন ভুল হবে না। সুকন্যারই কিছু ভুল হচ্ছে।

    অগতির ভরসা যেমন মা, বেঁটেদের ভরসা তেমন টুল। খাটের তলা থেকে টুলটা বের করে সুকন্যা তার ওপর দাঁড়িয়ে হাত দুটো যতদূর যায় প্রসারিত করে দিল। এধার-ওধার খুঁচিয়ে অবশেষে শক্ত কি যেন হাতের নাগালে ঠেকল। সুকন্যার মনে উত্তেজনার আভাস লাগল। পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে প্রাণপণ টান মেরে সুকন্যা জিনিসটা নিজের দিকে নিয়ে এল। আকারটা তো বাক্সের মতোই। আরো একটু টেনে আনতেই বাক্সটা ধপ করে সুকন্যার হাতে এসে পড়ল।

    সুকন্যার নিঃশ্বাস যেন ওর গলাতেই আটকে গেল।

    এই তো সেই বাক্স!

    হলুদের ওপর লাল গোলাপের ছাপ দেওয়া চৌকোনা বাক্স।

    সুকন্যা টুল থেকে নেমে এল।

    সত্যি কি আজ এত বছর বাদে এই বাক্সের রহস্য ভেদ হবে?

    সোনাদানার গল্পটা এই বয়সে আর বাস্তব বলে মনে হয় না, কিন্তু সেদিন দেখা ঠাম্মুর মুখের আভা মিথ্যে ছিল না। সুকন্যা বিশ্বাস করে তার ঠাম্মু তাকে ঠকায়নি। ওই বাক্সের মধ্যে দামি কিছু একটা আছে নিশ্চয়ই!

    বাইরের ঘরে ইজি চেয়ারে বসে বাবা খবরের কাগজ পড়ছে। সুকন্যা বাক্সটা নিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে, বুকে একটা অদ্ভুত কম্পন। কি না জানি সাত রাজার ধন তার জন্য অপেক্ষা করে আছে! প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে ঠেলে সরিয়ে সাত বছরের বিস্ময় মাখা দুটো চোখ আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে।

    চাবিটা ধরে সুকন্যা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে 'জয় মা' বলে তালায় ঘুরিয়ে দিল। বাক্সটা একটু ওজর আপত্তি করে শেষটায় মড়মড় করে খুলে গেল।

    নাঃ, গয়নাগাঁটি তো চোখে পড়ছে না।

    সবার ওপরে যেটা রাখা আছে, সুকন্যা সেটার নামের সঙ্গে খুব পরিচিত, যদিও দর্শনের সৌভাগ্য এই প্রথম ঘটল।

    মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ।

    “মায়ের মনে খুব ভয় ছিল, এ দেশে আসার পরে যদি দাদুর স্কুলে ভর্তি করার আর্থিক সঙ্গতি না থাকে,” বাবা কখন যেন আড়চোখে বাক্সটার দিকে তাকিয়ে নিয়েছে। “মুগ্ধবোধটা তাই মা সঙ্গে করে এনেছিল, যাতে সেরকম হলে নিজেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। অবশ্য মায়ের চিন্তার কোন কারণ ছিল না। এ দেশে দাদুর তখন দিব্যি পসার ছিল।”

    বইটা এখনো বেশ ভালো অবস্থাতেই আছে। সুকন্যা খুলে দেখল কালো কালি দিয়ে লেখা 'সুকুমারী চক্রবর্তী'। ছোট, নিখুঁত লেখা।

    ঠাম্মুর হাতের লেখা...

    সুকন্যার মনে খটকা জাগে। শেষবারের মতো ভিটেমাটি ছেড়ে আসার সময়ে শুধুমাত্র আর্থিক সঙ্গতির ভয়েই কি ঠাম্মু এই বইটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল? নাকি নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন স্কুলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ভয়ে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নিশ্চিত অতীতের একটা টুকরো খামচে ধরেছিল, সঙ্গে করে এনেছিল কবচ-মাদুলি বানিয়ে? আস্তে আস্তে মুগ্ধবোধটা নামিয়ে রাখল সুকন্যা। সসম্ভ্রমে।

    বাক্সের একধারে একটা গোল কালোমতো কি রাখা আছে। সুকন্যা হাতে নিয়ে দেখল সেটা একটা আয়না। মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের মতো এই আয়নাটাও নিশ্চয়ই ঠাম্মুর কাছে স্পেশাল ছিল।

    “ঠাম্মু এই আয়নাটায় মুখ দেখত?” বাবাকে জিজ্ঞেস করল সুকন্যা।

    বাবা মাথা নাড়ল।

    “কখনো দেখিনি। এটা বোধহয় ওই বাক্সেই রাখা থাকত।”

    সুকন্যা ভুরু কুঁচকে ভাবতে থাকে। হয়তো কোলকাতায় এসে প্রথম প্রথম ঠাম্মু এই আয়নাটা ব্যবহার করত। তারপর কি হল? নিজের মুখ দেখতে গেলেই কি অন্য অনেকগুলো মুখ ভিড় করে আসত? অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে যারা পেছনে পড়ে রইল, অনুযোগে ভরা তাদের মুখগুলো কি ঠাম্মুর নিজের মুখটাকে বাঁকিয়ে চু্রিয়ে অচেনা বানিয়ে দিত?

    ১৯৪৬ সাল। ঠাম্মুর মেজো জ্যাঠাকে ফালা ফালা করে কেটে দরজার সামনে কারা ফেলে রেখে গেছিল। কারা ফেলেছিল তাদের নাম কোনদিন জানা যায়নি। রাতারাতি কলমী শাক আর আম গাছ দিয়ে ছাওয়া সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। শ্মশান থেকে ফিরে আগুন আর লোহাটুকু ছুঁয়েই বাক্স-প্যাঁটরা বাঁধার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। পরের দিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রায়-অজ্ঞান মা আর শোকে-পাথর বউদিকে গরুর গাড়িতে তুলে ঠাম্মুর মা-বাবা কোলকাতার দিকে রওনা হয়েছিল...

    সুকন্যা আয়নাটাকে আবার বাক্সের ভেতর চালান করে দিল। বড় বেশি ছায়া পড়ছে ওর মধ্যে। আয়নার পাশে একটা কাঠের চিরুনি রাখা আছে। তার অধিকাংশ দাঁড়ই খসে পড়ে গেছে। এত পুরনো যে দেখে মনে হয় ঠাম্মুরও ঠাম্মুর চিরুনি ছিল। সত্যিটা আজ আর জানার উপায় নেই। চিরুনি তো আর তার ইতিহাস বলতে পারে না।

    বাক্সের মধ্যিখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা হলদে ন্যাকড়া। সুকন্যা সেটা খুলে মেলে ধরল।

    “এটা কি বাবা? কাঁথা?”

    “এ ধরনের কাঁথাকে নক্‌শিকাঁথা বলে,” বাবা কাপড়টার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে জানাল। অবশ্য না জানালেও সুকন্যার বুঝতে অসুবিধা হত না। “মা যখন জন্মেছিল তখন মায়ের দিদা বুনে দিয়েছিল। পরে বোধহয় মায়ের ভাইকেও ওই কাঁথায় শোয়ানো হয়েছিল।”

    সুকন্যা কাঁথাটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল। ঠাস বোনা সূক্ষ্ম কাজ। লাল, সবুজ, হলুদ সুতো দিয়ে কতরকমের ফুল, পাখি, গাছের নক্সা তোলা। আজকাল অ্যান্টিক পিস হিসেবে এর খুব কদর। বাঁধিয়ে রাখলে একটা দেখার মতো জিনিস হবে। এটাই কি ঠাম্মুর প্রতিশ্রুত সেই 'দামি জিনিস'? হলেও সুকন্যার কোন আপত্তি নেই। বিদেশে এর কদর করার লোকের অভাব হবে না।

    একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে সুকন্যা আবার ধনরত্নের আশায় বাক্সের ভেতর ডুব দিল। এবার একদম তলানিতে।

    বাক্সের নীচে একটা সাদা কাপড়ে কি যেন মোড়া আছে। সুকন্যা আলতো করে খুলে ফেলল। কতগুলো সাদা কালো ছবি বেরিয়ে এসে মেঝেতে ছড়িয়ে গেল। ওমা, এই ছবিগুলো সুকন্যা আগে কোনদিন দেখেনি তো!

    প্রথম ছবিতে চোখে পড়ল অচেনা একটা বাড়ি। একতলা। এক অচেনা ভদ্রমহিলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে। নীচে (মনে হয় উঠোনে) ধোপদুরস্ত ধুতি পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক বছর পাঁচেকের একটি মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে। সুকন্যা কাউকেই চিনতে পারল না। উলটে দেখল ছবির পেছনে কি যেন লেখা আছে। কাঁপা কাঁপা হাতের লেখা, তবু ঠাম্মুর লেখা বলে বোঝা যায়। 'মা, বাবা আর আমি, ১৯৪২'। সুকন্যা ছবিটা চোখের কাছে নিয়ে এল। পুরনো ছবি – ঝাপসা, হলদেটে হয়ে গেছে। তবু বোঝা যায় ঠাম্মুর মা বেশ ডাকসাইটে সুন্দরী ছিল। ঠাম্মুর মুখেই শোনা, ঠাম্মুর বাবা নাকি ডাক্তার ছিল। প্রতি সপ্তাহে দু'দিনের জন্য নৌকো করে খুলনা এসে এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে কোলকাতায় আসত। ঠনঠনিয়াতে সেজদাদার বাড়িতে থাকত। দেশ ভাগের পর ঠাম্মুর পরিবার প্রথমে ওখানে গিয়েই উঠেছিল। ঠাম্মুর ফ্রকটা দেখে মনে হচ্ছে কোলকাতার কোন বিলিতি দোকান থেকে বেশ দাম দিয়ে কেনা। কি সুন্দর পরিবারের ছবি!

    সুকন্যা আরেকটা ছবি তুলে নিল। আবার একটা অচেনা বাড়ি। অচিন গাছপালা। নাম-না-জানা মেয়ের দল। সুকন্যা উল্টে দেখল ঠাম্মু লিখেছে 'স্কুল বাড়ি'। তার মানে ঠাম্মু এই স্কুলে পড়ত। মেয়েদের ভিড়ে সুকন্যা একটা চেনা মুখ খুঁজতে থাকল। একজনের সঙ্গে আগের ছবির মেয়েটার মুখের আদল পেল, কিন্তু পুরোপুরি সন্দেহ গেল না। মধ্যে কিছু বছর কেটে গেছে মনে হয়। তৃতীয় ছবিতে শুধু দু'জন মেয়ে, শাড়ি পরা, বছর দশেক বয়স বলে মনে হয়। পেছনে লেখা 'ননী আর আমি, ১৯৪৬'।

    ননী কে? ঠাম্মুর স্কুলের বন্ধু? বেস্ট ফ্রেন্ড? সুকন্যা বাবার দিকে ছবিটা বাড়িয়ে দিল।

    “ননী কে, বাবা?”

    বাবা ভুরু কুঁচকে খবরের কাগজটা নামিয়ে রাখল। ছবিটা নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

    “ননী? কই, এই নামের কারুর কথা তো কোনদিন শুনিনি। ননী আবার কে?”

    কিছুক্ষণ উলটে পালটে ছবিটা ফেরত দিয়ে বাবা আবার কাগজে মন দিল। সুকন্যা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ঠাম্মুর সঙ্গে এই ননীর যোগাযোগ থাকলে আর কেউ না হোক বাবা নিশ্চয়ই জানত। অথচ এই ঠাম্মু সেই যুগে এই মেয়েটার সঙ্গে ছবি তুলেছে শুধু তাই না, এত বছর ধরে ছবিটা সামলে রেখেও দিয়েছিল। তার মানে এক সময়ে দু'জনের মধ্যে নিশ্চয়ই বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল। তাহলে কি দেশ ভাগ হওয়ার সময়েই দু'জনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিল? ননী কি নিরাপদে ভারতের সীমান্ত পার করতে পারেনি? ঠাম্মুর মুখে কখনো এই ননীর গল্প শোনা যায়নি কেন?

    শোনা যাবে কি করে?

    সুকন্যা কবে ঠাম্মুর কাছে সেসব দিনের কথা জানতে চেয়েছে? একবারের জন্যও জিজ্ঞেস করেছে, এক রাতের মধ্যে এত বছরের পুরনো সংসার গুছিয়ে গরুর গাড়ি চড়ে যখন চলে যাচ্ছিলে তখন কি শেষবারের জন্যে তোমার বাড়ির দিকে, চেনা মাঠঘাট, শিবমন্দির, বনবাদাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলে? নাকি অভিমানে সব পেছনে ফেলে রেখে শুধু সামনের দিকে তাকিয়েছিলে – গরুর গাড়ি থেকে স্টীমার, স্টীমার থেকে রেল, পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারত? ননীর গল্প তো সেই পূর্ব পাকিস্তানের গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে আছে, আজ যার কোন অস্তিত্বই আর বাকি নেই।

    সুকন্যা ছবিগুলো আবার যত্ন করে কাপড়ে জড়িয়ে রাখল। কাঁথার থেকেও বড় সম্পদ তারা। তবে, বাক্সের সম্পদ সেখানেই শেষ নয়। সবার নীচে একটা হলদে হয়ে যাওয়া খাম পাওয়া গেল। তার মধ্যে চার চৌকো করে ভাঁজ করা একটা কাগজ।

    চিঠি?

    সুকন্যা ইতস্তত করল। যদি দাদুভাইয়ের লেখা প্রেমপত্র হয়? হলেই বা কি? দাদুভাই চলে গেছে প্রায় দশ বছর হল। ঠাম্মুরও পাঁচ বছর হল ইহলোকের মায়া কেটে গেছে। এখন আর এসব চিঠি কে পড়ল তা দিয়ে কি আসে যায়? তা ছাড়া ঠাম্মু তো বহুবার বলেছে, এ বাক্সের ওপর ঠাম্মুর পরে সুকন্যারই অধিকার আছে।

    কাগজটা খুলে প্রথমেই তারিখের দিকে সুকন্যার চোখ পড়ল। ২৪/৫/৪৫। মানে ঠাম্মুর তখন আট বছর বয়স। যাক, তাহলে প্রেমপত্র নয়। কিন্তু এ কাকে লেখা চিঠি? রেণু, ধীরেন – কারা এরা? ঠাম্মুর নাম তো সুকুমারী, ডাক নাম খুকু। আবার সেই বাবারই শরণাপন্ন হতে হল। এবার অবশ্য সুরাহা হল। চিঠিতে চোখ বুলিয়ে বাবা স্মিত হাসল।

    “দাদুর লেখা চিঠি। দাদুর নাম জানিস তো?”

    “ধীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী...” স্মৃতির তল হাতড়ে নামটা বার করতে হল সুকন্যার।

    “আর তোমার দিদার নাম ছিল রেণুকাবালা।”

    বাবা মাথা নাড়ল।

    “তোমার দিদা লেখাপড়া জানত?”

    “স্কুল পাশ করেছিল কি না জানি না,” বাবা গাল চুলকে বলল, “আদৌ স্কুলে পড়েছিল কি না তাও জানি না। তবে অক্ষরজ্ঞান ছিল। সংসারের হিসেব দেখত বলে শুনেছি।”

    “বাব্বা!”

    চিঠিটা খুলে সুকন্যা পড়তে শুরু করল।

    “স্নেহের রেণু,” স্নেহের? বউকে আবার 'স্নেহের' বলে কে উল্লেখ করে?

    “এবার অনেক দিনের জন্য আটকে গেলাম। কোলকাতার মতো বড় শহরে চেম্বার করা সহজ নয়। সেজদার সাহায্যে একটা ঘর ভাড়া করেছি বটে, তবে রুগী আসতে এখনো দেরী আছে। সেজদা অবশ্য বলছে একবার পসার জমে গেলে সপ্তাহে দু-তিন দিন করে এলেই হবে। কিন্তু আপাততর মতো রোজ নিয়মমাফিক বসাটা জরুরী। কাজেই ফিরতে অন্তত আরো মাসখানেক ধরে রাখ। খোকার জ্বর কমেছে--”

    সুকন্যা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

    “ঠাম্মুর ভাই তো ঠাম্মুর তিন বছর বয়সেই মারা গেছিল। তাহলে ৪৫ সালে খোকা এল কোত্থেকে?”

    বাবা আর খবরের কাগজ থেকে চোখ সরাল না।

    “চিঠিটা বাংলা ১৩৪৫ সালে লেখা, মানে নাইনটিন থার্টি এইটে। তখন লোকে বাংলা তারিখ দিয়ে চিঠি লিখত।”

    “ও তাই নাকি?”

    সুকন্যা আবার চিঠির দিকে মন দিল।

    “খোকার জ্বর কমেছে? না কমলে একবার প্রমোদ ডাক্তারকে খবর দিও। ওষুধ লাগলে ইউসুফ ভাইকে বোল, সদর হাসপাতাল থেকে এনে দেবে। খুকুমণি কেমন আছে? আবার খাল পেরিয়ে বুঁচিদের বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেনি তো? ওকে মাঝেমধ্যে বনমালীর দোকানের ক্ষীরমোহন কিনে দিও। তাহলে আর তোমাকে জ্বালাবে না। আর শর্বরী গান শোনাতে এলে দুটো পয়সা দিয়ে দিও। টাকা কম পড়লে মেজদার থেকে ধার নিয়ে নিও, আমি গিয়ে শোধ করে দেব। আশা করি পুজোর আগেই ফিরতে পারব। লক্ষ্মী পুজোর দিন তোমার হাতের পায়েস খাব। মা আর বউদিদিকে প্রণাম জানিও। ইতি, তোমার ধীরেন।”

    সুকন্যা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। ননীর মতো এই চিঠিটাও যেন আগাগোড়া রহস্যে মোড়া। ঠাম্মু এ চিঠি কি করে পেল? ঠাম্মুর মা কি যত্ন করে এরকমই একটা বাক্সে রেখে দিয়েছিল? নাকি নিতান্ত অনাদরে বাড়ির এক কোণে পড়ে ছিল? আর সারা জীবনের মতো ভিটেমাটি ছেড়ে আসার আগের মুহূর্তে ঠাম্মু এই সাধারণ, আটপৌরে একটা চিঠি কেনই বা সঙ্গে নিয়েছিল? স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে? না, তা হতে পারে না। ঠাম্মুর মা বাবা দু'জনেই অনেক বছর অবধি বেঁচে ছিল। পরে হয়তো আরো অনেক চিঠি লেখা হয়েছিল। তবে?

    তবে কি এটা কোন সাধারণ চিঠি নয়? এরই মধ্যে বিশেষ কোন ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে? ব্যোমকেশের গল্পের মতো মোমের আলোর ওপর ধরলে অন্য কোন গোপন সংকেত বেরিয়ে আসবে?

    কৌতূহলের বশে সুকন্যা চিঠিটা খুলে আবার পড়তে লাগল। এবার অন্য আলোয়। নিঃশ্বাস বন্ধ করে। আর যতই পড়তে লাগল, ধীরে ধীরে তার চোখের আড়ালে অন্য ছবি ফুটে উঠতে থাকল। কালি কাগজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যেন এক অন্য জগৎ...

    এরকম জগৎ সুকন্যা আগেও একবার দেখেছে – ষোল বছর বয়সে কোনার্কের মন্দিরে গিয়ে।

    সুকন্যার মনে আছে, বাবা কোনার্কের ইতিহাস বলে চলেছে, আর সুকন্যার চোখের সামনে একের পর এক ছবি ফুটে উঠছে। মন্দিরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরুণ স্তম্ভ, যা এখন পুরীর মন্দিরের সামনে রাখা আছে। সূর্যদেবের সারথি অরুণ বিশাল উচ্চতা থেকে নিজের উপাস্যকে প্রণাম জানাচ্ছেন। তারপর তোরণ পেরিয়ে নাটমন্দির, সেখানে দেবদাসীরা নাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নাটমন্দিরের ওপারে জগমোহন, সূর্যের সপ্তাশ্ব রথের আদলে তৈরি। হাজার হাজার নাম-না-জানা মানুষ সেখানে ফুল মালা হাতে মন্দির খোলার অপেক্ষা করছে। জগমোহন পেরিয়ে উঁচু বিমান, তার মধ্যে গর্ভগৃহ। পুরীর মন্দিরের থেকেও উঁচু সেই বিমান, আর তার মাথায় এক বিশাল চুম্বক, যা ওলন্দাজদের জাহাজকে বিপথে টেনে আনত। কারণ সমুদ্র তখন চন্দ্রভাগায় থেমে নেই, ঢেউ খেলছে মন্দিরের কিনারায়। সমুদ্রের ওপার থেকে সূর্যদেব উঁকি মারলেন, আর শংখনাদের সঙ্গে মন্দিরের দরজা খুলে গেল। প্রথম সূর্যের কিরণ ঢুকে এল পুবের দরজা দিয়ে, বিগ্রহের মুকুটে বসানো বিশাল হিরের দ্যুতিতে চারিদিক ঝলমল করে উঠল...

    এই চিঠিটাও যেন সুকন্যাকে এক ফেলে আসা অতীতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কোনদিন না-দেখা বরিশালের এক গ্রামের দৃশ্য – ওই তো, একটু আগেই সাদা কালো ছবিতে দেখা ঠাম্মুর বাড়ি। তিন বিঘা ধানী জমি আর দুটো পোষা গরু নিয়ে সচ্ছল সংসার। ওরকমই একটা বাড়িতে নিশ্চয়ই প্রমোদ ডাক্তারের ডিসপেনসারি ছিল। দু'ধারে নারকেল গাছ দিয়ে ছাওয়া মেঠো পথ ধরে যেতে যেতে চোখে পড়ত ঠাম্মুদের স্কুল বাড়ি। তারও পরে, যেখানে রাস্তাটা বাঁক নিচ্ছে, সেখানে আজও বনমালী মিষ্টির পসরা সাজিয়ে বসে আছে – ক্ষীরমোহন, তালশাঁস, জিলাপি, আরো কত কি! ওই যে, বুঁচির মা সাঁকো পেরিয়ে এল গুড় চাইতে। বাড়িতে গুড় নেই, বুঁচিটা বড্ড বায়না করছে। ঠাম্মুর মা হাসি মুখে গুড় আনতে রান্নাঘরে গেল। আবার এই বুঁচির মা-ই বৈশাখ মাসে সাঁকো পেরিয়ে চলে আসত। ঝড়ের পর বাগান থেকে আম কুড়িয়ে আঁচলে বেঁধে এনে ঠাম্মুদের দাওয়ায় ছড়িয়ে দিত। ইউসুফ ভাই ওই দাওয়াতেই কল্কে নিয়ে বসে চালের দর নিয়ে আক্ষেপ করত। দুপুর বেলা ঠাম্মুর মা আর জ্যাঠাইমা পুকুরের ধারে বাসন মাজছে, আর সংসারের কথা, নিজেদের ছোট ছোট সুখদুঃখের কথা বলছে...

    রাতারাতি হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া একটা জগৎ...

    উদ্বাস্তু হয়ে কোলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ানো ঠাম্মুর কাছে তাই কি এই চিঠিটা এত অমূল্য ছিল? নিরালম্ব অস্তিত্ব যখন গ্যাস বেলুনের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে, তখন এই বাক্সটাই কি ঠাম্মুর গায়ে মাটির প্রলেপ লাগিয়ে দিত? এই পৃথিবীতে নিজের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দিত? স্বপ্নের মতো মিলিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, বন্ধুবান্ধব, জীবনযাত্রা যে আসলে বাস্তব ছিল, ধরাছোঁয়ার মধ্যে ছিল, সেই আশ্বাস দিয়ে অশরীরীকে রক্তমাংসের মানুষ করে দিত?

    ধীরে ধীরে সুকন্যার বুক থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। হিরে জহরতের চেয়েও মূল্যবান যে কিছু হতে পারে সাত বছরের সুকন্যাকে তা কিছুতেই বোঝানো যেত না।

    কিন্তু আজ সময় পালটে গেছে। ঠাম্মু, দাদুভাই, বড়দিদা, কুট্টিদাদু – বিস্মৃত অতীতের খালের ওপর দিয়ে যারা সাঁকো হয়ে নিজেদের বিছিয়ে দিয়েছিল, সুকন্যাকে তার চোখে না-দেখা শিকড়ের সঙ্গে জুড়ে রাখত, তারা সবাই এক এক করে ঝরে গেছে। ওই ফোকলা চিরুনিটার দাঁড়গুলোর মতোই। তাই জন্যেই বোধহয় ঠাম্মু সুকন্যার জন্য এই বাক্সটা রেখে গেছিল। ঠাম্মু হয়ত জানত, গত দশ বছরের প্রবাসী সুকন্যাও একদিন নিজের শিকড়ের খোঁজে ফিরে আসবে। মুখোমুখি হতে চাইবে নিজের সঙ্গেই।

    চিঠিটা আবার খামের ভেতরে ভরে সুকন্যা বাক্সটায় তালা দিয়ে রাখল। রাখা থাক, সযত্নে রাখা থাক ঠাম্মুর, বাবার, এমনকি সুকন্যার নিজেরও অতীতের টুকরোগুলো। চিরপরিবর্তনশীল পৃথিবীর বুকে তাদের শিকড়ের সন্ধান দিতে থাক।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)