• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯১ | জুলাই ২০২৩ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • সুমিতা চক্রবর্তীর ‘ছবি ও লেখা: মিল-অমিলের দ্বন্দ্ব’ : হিমাদ্রিশেখর দত্ত

    ছবি ও লেখা: মিল-অমিলের দ্বন্দ্ব—সুমিতা চক্রবর্তী; প্রচ্ছদ-- দেবব্রত ঘোষ; প্রথম প্রকাশ-- জুন ২০১৬; কারিগর; কলকাতা- ৭০০০০৪; ISBN: 978-93-81640-79-1
    বাংলায় ‘শিল্প’ শব্দের অভিঘাত বিপুল। ইংরাজী ‘আর্ট’ (Art) এবং ‘ইন্ডাষ্ট্রি’ (industry)--দুটি আপাত বিপরীতধর্মী বিষয়ই বাংলা ‘শিল্প’-এর ছত্রচ্ছায়ায় দন্ডায়মান। যদি ইংরেজি ‘আর্ট’ অর্থবোধক শিল্পকে ধরে এগোন যায়, তবে দেখা যাবে শিল্পপদ্ধতি এবং পদ্ধতিগত মাধ্যমে যা সৃষ্ট--দুটিকেই আমরা ‘শিল্প’ শব্দের ‘প্রকোষ্ঠে’ আবদ্ধ রেখেছি। এই ‘শিল্প’ শব্দের পরিধির মধ্যে কি নেই? সাহিত্য, সঙ্গীত (কন্ঠ ও যন্ত্র উভয় অর্থে), নৃত্য, নাটক, চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র ইত্যাদি সকলরকম মানবিক প্রয়াসই তার অন্তর্গত। আর একথা কে না জানে, সকল মানবিক প্রয়াসই ‘শিল্প’ হয়ে উঠতে পারে না; যেকোন মাধ্যমেই সৃজনেচ্ছাকে ‘শিল্প’ হয়ে উঠতে তাকে পূরণ করতে হয় আবশ্যিক কিছু পূর্বশর্ত। পূর্বশর্তপূরণের সাধনা বা চর্চার সঙ্গে প্রতিভা বা মেধার মেলবন্ধনে সর্জন সমকালকে ছাপিয়ে চিরকালীন বা ক্লাসিক (Classic) হয়ে ওঠে সাহিত্যের মধ্যে গল্প-উপন্যাসের যেমন আছে ক্লাসিক হওয়ার সম্ভাবনা, কবিতারও আছে সেই ক্ষমতা। বিভিন্ন ইওরোপীয় ভাষায়, শিল্পের নানান শাখার অন্তর্গত সন্দর্ভ যেমন সুলভ, একটির সঙ্গে অন্যটির তুলনা/ প্রতিতুলনার আলোচনা বা পুস্তকও তেমনি দুর্লভ নয়। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি বিবিধ বিষয়ে ধনী হলেও এইটিতে নয়। অজস্র গুণী শিল্পীও সাহিত্যিক বঙ্গভূমে আবির্ভূত হয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কৃতিত্ব প্রদর্শনে অমরত্বের দাবিদার হলেও, তাঁদের লিখিত নিবন্ধের সংখ্যা অতীব নগণ্য।

    যদিও নিজ নিজ বিষয়ে কিছু শিল্পী-সাহিত্যিক কলম ধরেছেন, তুলনা/ প্রতিতুলনা প্রায় অনুপস্থিত, এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ের যাঁরা ‘অধিকারী’ বা তাত্ত্বিক, তাঁরাও নিজ নিজ বিষয়ের গণ্ডীর বাইরে বেরোতেন কদাচিৎ।

    তাহলে শিল্প-অনুসন্ধিৎসু পাঠকমহল কি একেবারেই বঞ্চিত এই ধরণের লেখালেখি থেকে? বাংলা ভাষা-সাহিত্যের অঙ্গনে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’-কে শিল্পসংক্রান্ত আলোচনার আকর গ্রন্থের মর্যাদা দেওয়া হয়। অশোক মিত্রের মত কৃতবিদ্য অথবা সত্যজিৎ রায় বা পূর্ণেন্দু পত্রীর মত বহুবিষয়ের অধিকারীদের থেকেও আমরা পেয়েছি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অনেকানেক নিবন্ধ। বরাবরই অবহেলিত প্রবন্ধ-সাহিত্যের সেই অভাব অনেকটাই দূরীভূত হল সম্প্রতি: হাতে এলো যখন সুমিতা চক্রবর্তী প্রণীত ‘ছবি ও লেখা: মিল-অমিলের দ্বন্দ্ব’।

    গ্রন্থটি মোটামুটিভাবে চারটি অংশে বিভক্ত--প্রথম অংশটি চারটি নিবন্ধের সমাহার, যার প্রথমটির নামেই গ্রন্থনাম। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রবন্ধে ‘তুলি-কলমের সমবায়’ মূল শিরোনামের অন্তঃস্থ উপ-শিরোনাম ‘কবিতায় চিত্র- প্রতিভাস’--আলোচিত তিনজন অগ্রগণ্য প্রয়াত কবি যাঁদের মূলত তিরিশের দশকের বলেই চিহ্নিত করা হয়--জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী ও বিষ্ণু দে। চতুর্থ প্রবন্ধটির নাম ‘ছবি—কবিতা: ভাষার অতীত ভাষ্য’। দ্বিতীয়াংশে আলোচনার সূত্রে এই গ্রন্থে উল্লিখিত বিদেশী ও ভারতীয় ব্যক্তিবর্গের ‘ব্যক্তি-পরিচিতি’। তৃতীয় অংশটি গুরুত্বপূর্ণ ‘পৃষ্ঠাংক-নির্দেশ’। বইটির শেষাংশে প্রতীচ্যের কয়েকটি উল্লেখনীয় চিত্র ও ভাস্কর্যের প্রতিলিপি সমন্বিত ‘চিত্রসূচী’।

    বইটি শুরু হচ্ছে খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীস দেশের অম্লান চিন্তক আরিস্টটলের যুগান্তকারী ক্ষুদ্র অথচ অমোঘ গ্রন্থ ‘কাব্যতত্ত্ব’ বা ‘পোয়েটিক্‌স (Poetics)-ভিত্তিক আলোচনা দিয়ে। চিত্রকলা এবং সাহিত্যের সাদৃশ্য- বৈসাদৃশ্য আলোচনার সূত্রে প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে নাটক, অভিনয় ও নৃত্য। হোমার, সোফোক্লিস বা হোরেসও উল্লিখিত হয়েছেন শিল্পতত্ত্বের প্রথম যুগের ভাষ্যকার হিসেবে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি চিত্রকর, ভাস্কর ও বিজ্ঞানী হিসেবে অমরত্ব লাভ করলেও, শিল্পশাস্ত্র সম্বন্ধে যাঁরা অল্পবিস্তর উৎসুক ও আগ্রহী তাঁরা লিওনার্দোর লেখা সেই বই যা তাঁর মৃত্যুর ১৩২ বছর পরে প্রকাশিত, সেই সম্বন্ধে সম্যকভাবে ওয়াকিবহাল। লেখক লিওনার্দোর এই স্বল্পপরিচিত অথচ সমধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথোচিত গুরুত্বসহকারে আলোচনা করেছেন। কয়েকবছর পূর্বে দা-ভিঞ্চির অমর গ্রন্থটি ইতালীয় ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় পুস্তকাকারে অনুবাদিত হলেও এডমন্ড বার্ক, উইংকেলমান ও লেঝিং বিষয়ে উল্লেখ এবং পাশ্চাত্য শিল্পশাস্ত্রের পঠন-পাঠনে তাঁদের অবদান নিয়ে বিশদে প্রাসঙ্গিক আলোচনা সম্ভবত বাংলাভাষায় এই প্রথম। উইংকেলমান সম্পর্কে আলোচনায় ‘লাওকুন’ (Laocoon) অবশ্যস্মর্তব্য। এই বিষয়ে আলোচনাও, বাংলায়, আগে চোখে পড়েনি। শুধুমাত্র যে প্রতীচ্য শিল্পের নন্দনতত্ত্ব এবং যারা পুরোধা ব্যক্তিত্ব তাদের কথাই আলোচিত হয়েছে তা নয়, প্রাচ্য তথা ভারতশিল্পের নন্দনতত্ত্ব যথোচিত গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত। ‘ষড়ঙ্গ’ সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা অশোক মিত্র যেসকল প্রণিধানযোগ্য বক্তব্য রেখেছেন, তারও আছে উজ্জ্বল উদ্ধার। আর অবশ্যই আছেন-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’-এর অন্তর্গত আলোচনার সাপেক্ষে বিশিষ্ট ইংরেজ কবির ম্যাথু আর্নল্ড-এর ‘এপিলোগ্‌ টু লেসিং-স লাওকুন’ (Epilogue to Lessing’s Laocoon) নামক ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত কবিতাটিকে ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথের অভিমত উদ্ধৃত করলেই স্পষ্ট হয় লেখকের দৃক্‌পাত এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের ঋজুতা--“রবীন্দ্রনাথ বাকশিল্প, সুরশিল্প আর চিত্রশিল্পের মধ্যে ভালোমন্দের তর-তম ভেদ করবার কথা ভাবেননি কখনও। প্রতিটি শিল্পের বৈশিষ্ট্য আলাদা, তাই তাদের রূপকর্ম পৃথক হবে, মনোধর্মও পৃথক হবে কিছুটা--কিন্তু প্রতিটি শিল্পই স্বক্ষেত্রে স্বরাট এবং কলারসিকদের মনকে প্রত্যেকেই আপ্লুত করে দিতে পারে নিজের মতো করে। শিল্পমননের এই অপক্ষপাতের শক্তিতে রবীন্দ্রনাথ যথার্থই এসে দাঁড়াতে পারেন লেসিং-এর পাশেই।” দুর্লভ, জরুরি এবং সঠিক এই পর্যবেক্ষণ নবীন শিল্পোৎসাহী কিম্বা পাঠককে আগামীতে অগ্রবর্তী হওয়ার সাহস যোগাবে।

    ‘তুলি কলমের সমবায়’ শীর্ষক আলোচনার প্রারম্ভে আবার উল্লিখিত আরিস্টটল আর তাঁর ‘কাব্যতত্ত্ব’। আলোচ্য উড়ালপরিধির মধ্যে এসেছে রূপ, রং ও রূপের আন্ত:সম্পর্ক, চিত্রকলায় স্পেস (space)-এর ব্যবহার। বিমূর্ততা; জয়েস, কাফকা, উলফ্‌ বা জীবনানন্দ। প্রেমেন্দ্র মিত্রের সৃজনে নৈ:শব্দের সার্থক ব্যবহারের কথা। বিকাশ ভট্টাচার্যের সর্জনে রবীন্দ্রনাথ সত্যজিৎ রায় ও নিখিলেশ চরিত্রাভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জি ‘ঘরে বাইরে’-কে কেন্দ্র করে কিভাবে একীভূত হয়ে যান, রয়েছে তারও এক সপ্রাণ উল্লেখ। অজন্তা চিত্রকলা বিষয়ে বক্তব্যের পরে পরেই মিকেলেঞ্জেলো এবং সিস্টিন চ্যাপেলের ‘সিলিং’ (Ceiling)-এ তাঁর কৃত ফ্রেসকোর প্রসঙ্গ। মিকেলেঞ্জেলোর কবিতা নিয়ে আলোচনার সূত্রে আসেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর বিরচিত ‘খ্রিস্ট’-গ্রন্থ এবং সেই গ্রন্থের প্রচ্ছদচিত্রে নন্দলাল বসুর অপূর্ব রেখাঙ্কনে ক্রুশবাহী যিশুর নির্যাতন ও বেদনার প্রতিচ্ছবি। আধুনিক ভারতশিল্পের পরম্পরায় আসেন রবি বর্মা, অসিত কুমার হালদার, মকবুল ফিদা হুসেন বা গণেশ পাইন। ধর্মীয় বিশ্বাসের অবলম্বনে কিভাবে দেশে দেশে কালে কালে বিবর্তিত হয়েছে সাহিত্য ও চিত্রকলা, তার আলোচনায় পর্যায়ক্রমে এসেছেন দান্তে ও তাঁর ‘ডিভাইন কমেডি’, মিলটন ও তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’, মাইকেল ও তাঁর ‘মেঘনাথবধ কাব্য’, শেক্‌সপীয়ার ও তাঁর নাট্যমালা, নন্দলাল অঙ্কিত হরিপুর কংগ্রেস অধিবেশন উপলক্ষ্যে আঁকা পোস্টার ও রবীন্দ্রনাথের ‘নটীর পূজা’- ভিত্তিক ফ্রেসকো। আলোচনার পারম্পর্যে আসেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও তাঁর ‘মোনালিসা’, পিকাসো ও তাঁর ‘গ্যেরনিকা’, চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিন ও সোমনাথ হোড় এবং তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময় তাঁদের সমাজ-সচেতন অবলোকন। মন্বন্তরের বছরে আঁকা অবনীন্দ্রনাথের ‘অন্নপূর্ণা ও রুদ্র’ কিভাবে চিরকালীনের আধারে সমকালকে চিত্রায়িত করেছিল, আছে তার বিস্তারিত বিবরণ। নীরদ মজুমদারের তন্ত্রভিত্তিক ছবি, রামকিঙ্করের ‘কচ-দেবযানী’ বা ‘কৃষ্ণগোপিনী’র কথা যেমন আলোচিত সহজ সাবলীলতায়, সমান স্বতঃস্ফূর্ততায় উল্লিখিত এদুয়ার মানে, এমিল জোলা বা মালার্মের কথা। বাংলার চিত্রকর ও ভাস্করেরা তাঁদের সমসাময়িক সাহিত্যিকদের প্রতিকৃতি বা সাহিত্যনির্ভর অঙ্কনে মা মূর্তি-সৃজনে ততটা আগ্রহ না দেখালেও, সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর বা বিভূতিভূষণের সাহিত্যকৃতির চলচ্চিত্রায়ণে চলমান ছবির যে অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেছেন, তার সশ্রদ্ধ ও সপ্রশংস উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকেন না লেখক। প্রতীচ্যে যেভাবে বত্তিচেল্লি, ব্লেক্‌, রদ্যাঁ বা মানে সমকালীন বা পূর্বজ কবিদের কবিতার চমৎকার অলংকরণ করেছিলেন-- প্রাচ্যে, বিশেষত বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা অপ্রতুল। শক্তির কবিতার সঙ্গে নীরদ মজুমদারের ছবি বা সম্প্রতি অঙ্কিত জীবনানন্দের কবিতা-আধারিত শুভাপ্রসন্ন-কৃত পোস্টার সেই অর্থে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের প্রতিবেশে কবি বিষ্ণু দে ও শিল্পী যামিনী রায়ের সখ্যই কেবল ইতিহাস স্বীকৃত, একথা অবগত করাতে বিস্মৃত হন না লেখক।

    ‘কবিতায় চিত্র-প্রতিভাস’ শীর্ষকে আলোচিত প্রথম কবি--জীবনানন্দ। প্রারম্ভে লেখক অনালোচিত, নির্ভার কিন্তু প্রয়োজনীয় সত্যোচ্চারণ করেন অক্লেশে--“বাস্তবে দেখা যায় চিত্রশিল্পীরা যদি বা সাহিত্যের স্বাদগ্রহণে বেশ কিছুটা অভ্যস্ত থাকেন, সাহিত্যিক ছবি সম্পর্কে আগ্রহ বোধ করেন তার চেয়ে অনেক কম। ছবির ভাষায় নিজেকে শিক্ষিত করেছেন--এমন কবির সংখ্যাও খুব বেশী নয়। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে বাংলায় তেমন সাহিত্যিকের নাম খুব বেশী পাওয়া যাবে না।” অত্যন্ত সঠিক পর্যবেক্ষণ, তবে বিশ শতকের ত্রিশ দশককে বাদ দিয়ে। ত্রিশ দশকের অগ্রগণ্য কবিদের মধ্যে অধিকাংশই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, পরবর্তীতে অধ্যাপক; অতএব দেশ পরাধীন হলেও প্রতীচ্যের সাহিত্য-সংস্কৃতির সাম্প্রতিক হাল-হদিশও ছিল তাঁদের নখদর্পণে। জীবনানন্দের গদ্যসাহিত্যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং অন্যান্য চিত্রকরদের উল্লেখ তো বটেই, কবিতার মধ্যেও মাতিস্‌, ঝেজান্‌ বা পিকাসোর নাম খোদিত হয়ে আছে; সেই তথ্যও পাঠককে জানাতে ভোলেন না লেখক। পল গগ্যাঁর নাম যে একটিমাত্র কবিতায় উল্লিখিত, চোখ এড়িয়ে যায়নি জিজ্ঞাসু লেখকের।

    দ্বিতীয় আলোচিত কবি অমিয় চক্রবর্তী। তাঁর কবিতায় চিত্রগুণের আলোচনার শুরুতে সাহিত্যের ভাষা আর চিত্রভাষার সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য বোঝাতে রবীন্দ্রনাথ বা সুকুমার সাহিত্যের কথাও যেমন উদ্ধৃত হয়েছে, তেমনি এসেছে সত্যজিৎ রায়-কৃত ‘বনলতা সেন’-গ্রন্থের প্রচ্ছদচিত্র কেন অনন্যত্বের দাবিদার। অমিয় চক্রবর্তীর নানান্‌জনকে লেখা চিঠি এবং স্বয়ং লেখকের নেওয়া কবির সাক্ষাৎকারের উপর ভিত্তি করে তাঁর কাব্যভাষার চিত্রময়তা সন্ধানে লেখক ব্রতী হয়েছেন। রবীন্দ্র-সহচর, বিদগ্ধ মননশীল কবির কাব্যপ্রকৃতির মানসগঠনে শান্তিনিকেতনের উদার প্রতিবেশ বা বিদেশের অপরূপ প্রকৃতির যে বিশিষ্ট ভূমিকা আছে, সেকথাও উল্লিখিত হয়েছে। পরবর্তীতে তালিবান্‌ আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি তাঁর কবিতায় অমরত্ব লাভ করেছে--রয়েছে তার সপ্রশংস উল্লেখ। কাংড়া চিত্রশৈলীর সূক্ষ্ম তুলির টান আর উজ্জ্বল বর্ণলেপনের মত অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায়ও যে ঐ দুটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, লেখক তাও নির্দেশ করেন। অমিয় চক্রবর্তীর কাব্যসম্ভার ও গদ্যসাহিত্য থেকে প্রচুর উদাহরণযোগে লেখক দেখান, শুধু চিত্রশিল্পের গুণাগুণই নয়, চলচ্চিত্রসুলভ গতিশীলতাও তাঁর সৃজনসম্ভারে উপস্থিত।

    ত্রিশের কবিকুলের মধ্যে চিত্রকলা ও ভাস্কর্য সম্পর্কে অভিনিবেশ ও জ্ঞানেই নয়, দেশীয় শিল্প ও শিল্পীদের সঙ্গে যথেষ্ট নৈকট্য ছিল কবি বিষ্ণু দের। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতায় সর্বাধিক শিল্প ও শিল্পীর নামোল্লেখ পাঠক পাবে তাঁর কবিতায়। এছাড়াও তাঁর কিছু কিছু কবিতায় আছে তৎকালীন বিভিন্ন শিল্প-আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যের নির্যাস। সাঁওতাল পরগণার অবাধ মুক্ত প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে তাঁর নিসর্গভিত্তিক চিত্রকল্পগুলির নম্র বিশ্লেষণে তাই লেখক বলেন, ‘ছবির এই উচ্ছ্বসিত বর্ণময় ধরণটিকে কবিতায় বেশী স্থান দিয়েছেন বলেই তাঁর লেখায় পিসারো ও সেজানের নাম পাওয়া যায়।’ এঁরা দুজন ছাড়া বারম্বার যাঁর উল্লেখ বিষ্ণুদের কবিতায় আসে, তিনি পাবলো পিকাসো। প্রতিবাদী চেতনা ছিল পিকাসোর; স্বীয় চিন্তাধারার সাযুজ্যে বিষ্ণুদের পিকাসোর প্রতি পক্ষপাতিত্ব যথার্থই উল্লিখিত হয়েছে। শুধু পিকাসো বা তাঁর চিরন্তন সৃজন ‘গ্যেরনিকা’-র উল্লেখ নয়; স্বদেশী চিত্রকলাতেও ছিল তাঁর সমান আগ্রহ ও ব্যুৎপত্তি। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবির একটি প্রদর্শনীর আলোচনা দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক-জীবনের সূচনা। পরে শিল্পী যামিনী রায়ের শিল্পকলা নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ, গ্রন্থ-ভূমিকা এমনকি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থও লিখেছিলেন বিষ্ণু দে। যামিনী রায়ের নামে কিম্বা উল্লেখ আছে, এমন বহু কবিতা লিখেছিলেন বিষ্ণু দে। ‘বেঙ্গল স্কুল’ আর ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’ নামক ভারত শিল্পের ইতিহাসে দুই বিশিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে যে তিনি সংযোজকের ভূমিকা পালন করেছিলেন রয়েছে তারও উল্লেখ। বিদেশী চিত্রশিল্পীদের মধ্যে উল্লিখিত দুই ফরাসী--মোরিস উত্রিল্লো আর আদ্রেঁ দের‍্যাঁ; তাঁদের উল্লেখও চোখ এড়ায়নি লেখকের।

    এই অংশের চতুর্থ তথা শেষ প্রবন্ধ ‘ছবি-কবিতা: ভাষার অতীত ভাষ্য’। লেখক শুরুতেই বলেন, ‘ …সেই অর্থে এই লেখাটিকে পাঠ্য প্রবন্ধ না বলে দৃশ্য প্রবন্ধ বলা যেতে পারে’, গ্রীক্‌ ও রোমান সভ্যতার ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য হয়ে বাংলা সাহিত্যে অলংকরণ ও ছবি কিভাবে শিশুসাহিত্যে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়ে উঠল, এখানে রয়েছে তার পূর্বাপর ইতিহাস।

    বিখ্যাত ও অখ্যাত, দেশী-বিদেশী কয়েকটি নামের উল্লেখে আশা করি মনোযোগী পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারবেন স্বীয় বক্তব্য প্রতিষ্ঠায় লেখকের নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং বিষয়ের উপর গভীর অধিকার--জন্‌ লক, জেমস জেনওয়ে, জন নিউবেরি, হ্যান্‌স অ্যান্ডারসন, লিউইস ক্যারল, কালো কলোদি, রাডইয়ার্ড কিপলিং, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এডওয়ার্ড লিওয়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার ও সুকুমার রায়। নিজেদের চিত্রাঙ্কন-প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত সাহিত্যকে স্বাবলম্বী ও কালোত্তীর্ণ করে তুলেছিলেন এইসকল প্রবুদ্ধজন, তারই এক তথ্যনিষ্ঠ সুখপাঠ্য উদাহরণ এই লেখাটি।

    এই গ্রন্থের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ও অনন্য অংশ ‘ব্যক্তি-পরিচিতি’। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসু জনের তৃপ্তিদায়ক এই অংশে সাহিত্য ও চিত্রশিল্পে বইটিতে উল্লিখিত অখ্যাত, অল্পখ্যাত এবং বিখ্যাত দেশী ও বিদেশীজনেদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বইটির দীর্ঘকালীন মননমূল্য বৃদ্ধি করবে, একথা নিশ্চয় করে বলা যায়। এই বিভাগের শুরুতে বলা, ‘সংকলিত প্রবন্ধগুলি পাঠের সঙ্গে সন্নিবিষ্ট হয়ে আছে অনেক সাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পীর নাম। মনে হল তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি না থাকলে লেখাগুলি ঠিকমতো পড়া হবে না।’--যথার্থ উচ্চারণ বলে প্রতিভাত হয়। চিত্রসূচী ব্যতীত, ২৮৬ পৃষ্ঠার মধ্যে ১১৮ পৃষ্ঠা ব্যাপ্ত ‘ব্যক্তি-পরিচিতি’ পুস্তকটির অন্যতম সম্পদ।

    সংক্ষিপ্ত চিত্রসূচীতে প্রাচীন গ্রীক ভাস্কর্য লাওকুন; সিস্টিন চ্যাপেলের অভ্যন্তরে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, রাফায়েল, পল গগ্যাঁ, পিকাসো, দালি, উত্রিল্লো। পিকাসো এবং মাঋঝ- অঙ্কিত চিত্রগুলির প্রতিলিপি উৎসাহীজনের আগ্রহবৃদ্ধিতে যে বিশেষ ভূমিকা নেবে, একথা হলপ করে বলা যায়।

    বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য কমবেশী উপেক্ষিত হলেও অনতি অতীতে কৃতবিদ্যেরা উপহার দিয়েছেন খুব স্মরণীয় নিবন্ধ। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে মুষ্টিমেয় যে কয়েকজনের প্রবন্ধগ্রন্থ পণ্ডিতমহলের বাইরে সাধারণ পাঠকবর্গকে নিবন্ধপাঠে আগ্রহী করে তোলে গ্রন্থলেখক তার মধ্যে অন্যতম। সুধী পাঠকের নিশ্চয় স্মরণে আছে জীবনানন্দ, নজরুল ও অমিয় চক্রবর্তী-বিষয়ক তাঁর গ্রন্থনিচয় তিন কবির উপর নতুন করে আলোকপাত করেছিল। বক্তব্যের স্বচ্ছতায়, যুক্তিপ্রয়োগের সারবত্তায় এবং প্রাঞ্জল ভাষাপ্রয়োগে এই বইটিও যে মননশীল পাঠকমহলে গ্রহণযোগ্য হবে, এই প্রত্যয় রাখা যায়।

    পরিশেষে, দু’একটি পর্যবেক্ষণ। সূচীপত্রে এবং অধ্যায়-বিভাজনের কিছু অসঙ্গতিতে পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ের ‘তুলি-কলমের সমবায়’-এর অন্তর্গত হয়ে গেছে ‘কবিতায় চিত্র প্রতিভাস: জীবনানন্দ’ এবং অমিয় চক্রবর্তী, যখন একই শিরোনামে বিষ্ণু দে তৃতীয় অধ্যায়ে পৃথকভাবে আলোচিত হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন। মনে হয়, তিন কবিকে ‘কবিতায় চিত্র-প্রতিভাস’-এর অন্তর্গত করলে সমসম্মান প্রদর্শিত হবে। ব্যক্তি-পরিচিতির অন্তর্গত, ১৮৩ পৃষ্ঠায় দ্যেরো, আঁন্দ্রে প্রসঙ্গে ‘বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের বাইরে তাঁর দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করে’-- সংশোধনযোগ্য। ২১৫ পৃষ্ঠায় রেনোয়া প্রসঙ্গে… ‘ফ্রান্স চলে যান’- বোধহয়, হবে প্যারিস। ২১৮ পৃষ্ঠায় র‍্যাবেল প্রসঙ্গে ‘কিছুকাল পরে… অর্জন করেন’ দু’বার ছাপা হয়েছে। ২৪০ পৃষ্ঠায় গণেশ পাইন প্রসঙ্গে অনুমান হয়। প্রকাশনা ছাপা ও বাঁধাই বিষয়ে যত্নশীল, এখানেও ব্যাত্যয় হয়নি, আশা করি, আগামী সংস্করণে বইটি বিচ্যুতি মুক্ত হয়ে সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠবে। বইটির যথোচিত প্রচার-প্রসার কামনা করি; তাহলেই লেখকের প্রভূত পরিশ্রম যথার্থভাবে পুরস্কৃত হবে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)