• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯১ | জুলাই ২০২৩ | প্রবন্ধ
    Share
  • বাংলাদেশের স্বাধীনতার কবিতা ও ভিয়েতনাম : লুৎফর রহমান খান



    বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমিতে বেশ কয়েকটি অজর, অমর কবিতা লেখা হয়েছে। সেগুলির মধ্যে রয়েছে আসাদ চৌধুরী রচিত 'বারবারা বিডলারকে' কবিতাটি। এই কবিতার গভীরে রয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে উৎসারিত প্রেরণা, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পাথেয় ছিল। কবিতাটি নিয়ে পরে আলোচনা করব, তবে প্রথমে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কিছু প্রারম্ভিক তথ্য, আর অন্যান্য কয়েকটি বাংলা কবিতায় ভিয়েতনামের প্রভাবের কিছুটা পরিচয় দিতে চাই। আলোচ্য প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই ফুটে উঠেছে সাধারণ জনগণের ওপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিপীড়নের দৃশ্য, আর সেই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংকল্প।

    বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব পূর্ণ দশক জুড়ে বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করেছিল ভিয়েতনামে। আমেরিকা ১৯৬৪ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে, যদিও কম্যুনিস্টদের বিস্তার রোধ করার জন্য অনেক বৎসর আগে থেকেই তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামকে রাজনৈতিক ও সামরিক সাহায্য দিয়ে আসছিল। অবশেষে ১৯৭৫ সালে মার্কিনিরা ভিয়েতনাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, এবং উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম একত্রীভূত হয়ে বর্তমান ভিয়েতনাম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই একত্রীকরণের পূর্বে উত্তর ভিয়েতনাম ছিল কম্যুনিস্ট শাসনে, আর দক্ষিণ ভিয়েতনাম মার্কিন সাহায্যপুষ্ট পুঁজিবাদী রাষ্ট্র – বর্তমানে পুরো দেশটিই কম্যুনিস্ট ভাবাদর্শের। ইতিহাসের বিবর্তনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভিয়েতনামের সম্পর্ক এখন বেশ বন্ধুসুলভ।

    পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৬০-এর দশকের রাজনীতিতে, বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতিতে, বাম ধারার মতবাদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ছাত্র ইউনিয়নের মেনন ও মতিয়া গ্রুপ তখন শহরগুলিতে তো বটেই, গ্রামেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বাঙালি যুব সম্প্রদায় সেই সময় আন্দোলনের মূল প্রেরণাশক্তি হিসাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কর্মসূচীকে প্রাধান্য দিতে থাকে। তখনকার দিনে কার্ল মার্ক্স, লেনিন, মাও সে তুং, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা -- এঁদের নাম বাঙালি ছাত্রজনতার মুখে মুখে ফিরত। উল্লেখ করা যেতে পারে যে গেরিলা যোদ্ধাদের চিরস্মরণীয় বীর চে গুয়েভারা-র শেষ লেখা প্রবন্ধটির নাম ছিল ‘Create Two, Three, Many Vietnams’ যা তাঁর মৃত্যুর বৎসর, ১৯৬৭ সালে, প্রকাশিত হয়েছিল।

    ১৯৬৯ সালের ২০শে জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ-এর কাছে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বামপন্থী ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান। তাঁর মৃত্যুপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দেশজুড়ে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তুমুলভাবে গতিশীল করেছিল। আসাদের গ্রামের বাড়ির কাছে হাতিরদিয়াতে একটি বড় হাট বসে। তাঁর মৃত্যুর একমাস আগে হাতিরদিয়াতে ডাকা এক হরতালের প্রধান আয়োজক ছিলেন আসাদ, সেই হরতালে পুলিশ কেড়ে নেয় তিনজনের প্রাণ, আহত হয়েছিলেন আসাদ নিজেও। মাত্র একমাস পরেই ঢাকার মিছিলে আসাদের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণে স্লোগান ওঠে, ‘ইতিহাসের দুটি নাম, হাতিরদিয়া ভিয়েতনাম।’ আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে মিছিলে অসংখ্য ছাত্রজনতার ঢল নেমেছিল ঢাকার রাজপথে। কবি শামসুর রাহমান সেই সময়ের শোকতপ্ত অথচ দুর্বিনীত অনুভূতিকে ধরে রেখেছেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতায়।

    ষাটের দশকে ভারতের পশ্চিম বাংলায় ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রচুর সাহিত্য রচনা হয়েছে, যার মধ্যে আছে কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও সঙ্গীত। তার একটা কারণ হতে পারে সেখানকার তদানীন্তন সরকারের আনুকূল্য। সেসব সাহিত্যকর্ম থেকে উদাহরণ হিসাবে দু’একটি কবিতার চরণ তুলে ধরছি। প্রথমেই বলা যায় কবি কৃষ্ণ ধর-এর লেখা কয়েকটি লাইনঃ ‘নিজের বুকের রক্তে নক্ষত্রের উজ্জ্বল অক্ষরে/ লিখে রেখো নাম/কালের রাখাল তুমি/ তুমি ভিয়েতনাম।’ নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘ভিয়েতনামের ওপর কবিতা’ নামের কবিতাটি করুণ বাস্তবতার ছবিঃ ‘আমি অনেক ভেবে দেখেছি।/ আজকে—এই সভায়/ ভিয়েতনাম নিয়ে একটা কবিতা/ আমার পক্ষে পড়া সম্ভব নয়/ কারণ ব্যাপারটা অসম্ভব কঠিন/ কীরকম দেখতে সেই কবিতা/ তার হাতে কী থাকবে/ সে অন্ধকারে দেখতে পায় কিনা/ কতদিন তাকে জেলে থাকতে হয়েছে/ আমি তার কিছুই/ হদিশ করতে পারছি না/ শব্দগুলো ভীষণ রক্তাক্ত, অসম্ভব বেপরোয়া/ তার ওপরে অনেক শব্দ ঝলসে গেছে নাপামে ...’ (এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, ১৯৮৩)। ষাটের দশকে কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে একটা স্লোগান দেখা যেত, ‘তোমার নাম, আমার নাম, ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম’, যা সে সময়ের বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিচয় বহন করে।

    কবি শামসুর রাহমানকে আখ্যায়িত করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার কবি হিসাবে; এই কবির রচনায় ভিয়েতনাম বহুবার এসেছে। কবির একটি বড় অবদান ভিয়েতনামের অবিসংবাদিত নেতা হো চি মিন-এর (Ho Chi Minh) একগুচ্ছ কবিতার বাংলা অনুবাদ।

    শামসুর রাহমান-এর একটি প্রেমের কবিতার শেষ কয়েকটি চরণঃ ‘আমরা যখন ঘড়ির দুটো কাঁটার মতো / মিলি রাতের গভীর যামে, / তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা, / পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে।’ এই ছোট কবিতাটিতে আঁকা যুদ্ধ ও প্রেমের বিপরীতার্থক উপমাটি মানবীয়, বাস্তবানুগ। একই ধরনের দ্বৈধ চিন্তার পরিচয় আছে তাঁর ‘নিরুপমার কাছে প্রস্তাব’ কবিতায়ঃ
    ‘না, ওভাবে ফিরিয়ে নিও না মুখ,
    ভেবো না আমার নেই কালজ্ঞান। বস্তুত আমিও
    অনেক উত্তাল দীপ্র মিছিলে শামিল হ’য়ে যাই,
    যখন ভিয়েতনামে পড়ে বোমা, আমায় হৃদয়
    হয় দগ্ধ গ্রাম মেঘে মেঘে খুনখারাবির চিহ্ন
    খুঁজে পাই; উপরন্তু বসন্তের পিঠে ছুরি মেরে
    হত্যাকারী সেজে বসে আছি।’ কেন এ প্রহরে
    তোমাকে হঠাৎ দূরে বকুলতলায় যেতে বলি?

    (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি, ১৯৭৪)।


    ওই কাব্যেরই ‘অপরাধী’ কবিতায় শামসুর রাহমান ব্যবহার করেছেন এই পংক্তিগুলিঃ
    ‘একটি নিটোল স্বপ্ন তাকে কম্পোজ করতে দিয়ে দেখি,
    স্বপ্নের জায়গায় দিব্যি দুঃস্বপ্ন দিয়েছে বসিয়ে সে,
    সুস্থতার জায়গায় অসুখ আর উন্মত্ততা। তার
    হাতের অস্থির স্পর্শে সুবিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর
    কারাগার হয়ে যায়, শিশুর চিৎকারধন্য মৃদু আলোময়
    একটি আঁতুড়ঘর গোরস্থান। পরিপাটি গ্রাম,
    মুখর শহর তাকে কম্পোজ করতে দিলেই সে
    টাইপে সাজাতো দগ্ধ, বিধ্বস্ত ভিয়েতনাম ...’

    শিশুকিশোরদের জন্য লেখা শামসুর রাহমান-এর ‘ভিয়েতনাম’ কবিতাটি ছড়ার ছন্দে ফোটানো এক দারুণ চিত্রকল্প।
    ভিয়েতনাম
    দিন-দুপুরে ওমা!
    ফেললে কারা বোমা?
    মেকং নদীর দেশে
    হুট করে ভাই এসে
    গোল বাধাল কারা?
    বর্গি নাকি তারা?

    ফসল হল ধুলো,
    পুড়ছে শহরগুলো-
    কী যে তাদের নাম?
    কোথায় ওদের ধাম?
    পুড়ছে ভিয়েতনাম।
    বাজপাখিদের মতো
    উড়ছে বিমান শত
    শহর এবং গ্রামে,
    উড়ছে ভিয়েতনামে।

    বাজপাখিরা জেনো
    পণ করেছে যেন
    ঝাপটা মেরে জোরে
    তেড়ে এসে ওরে
    ডানে কিংবা বাঁয়ে
    তীক্ষ্ম নখের ঘায়ে
    উপড়ে নেবে গ্রাম,
    পুড়ছে ভিয়েতনাম।

    বর্গি বটে তারা।
    দিন-দুপুরে যারা
    করছে রাহাজানি,
    তাদের কাছে জানি
    নেই মানুষের দাম।
    পুড়ছে ভিয়েতনাম।

    জ্বলছে অবিরত
    বারুদ জ্বলার মতো,
    জ্বলছে ভিয়েতনাম।

    (লাল ফুলকির ছড়া, ১৯৯৫)


    কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর অনেক রচনায় বামধারার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন, খেটে খাওয়া আর নির্যাতিত মানবতার কথা বলেছেন। তাঁর বহুলপঠিত ভ্রমণকাহিনি ‘ভিয়েতনাম ও কাম্পুচিয়ার স্মৃতি’, ১৯৮০-এর দশকে প্রকাশিত হয়েছিল। ভিয়েতনাম ভ্রমণের সময় তিনি ভাল করে পরিচিত হন ভিয়েতনামের কবিতার সঙ্গে। সেখানকার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও কবি থো হু-এর (Nguyen Tho Huu) লেখা একটি কবিতার বই তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন, অনুদিত বইটি ১৯৮২ সালে ঢাকায় প্রকাশিত হয় ‘রক্ত ও ফুলগুলি’ নামে।

    একাত্তরের শেষদিকে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন সমাপ্তিলগ্নে, পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, তখন পাকিস্তানের শক্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে আগ্রাসী ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে দেখা গিয়েছিল পুরো ষাটের দশক জুড়ে, সপ্তম নৌবহরের আগমন ছিল তারই সম্প্রসারণ। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর উপলব্ধি থেকে লিখলেন একটি অসাধারণ কবিতা -- ‘নিক্সনের জাহাজ’। কবিতাটির একটি নান্দনিক চরণ ছিল ‘ট্রিসিয়া, তোমার জাহাজগুলোকে রেশমের চুলে বাঁধো’। ট্রিসিয়া অর্থাৎ প্যাট্রিসিয়া নামটি নিক্সনের ছোট মেয়ের, যার চুল ছিল সোনালি।

    ভিয়েতনাম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মলেন্দু গুণ বেশ কিছু কবিতা লেখেন, একটির শিরোনাম ‘ভিয়েতনাম ১৯৮২'। কবিতাটির প্রথম আট লাইনঃ
    অনাদি সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে
    তুমি ছিলে নীল আকাশের মতো ধ্রুব।
    ভিয়েতনাম, তুমি আছ গ্রীষ্মের সূর্যের মতো সত্য।
    তুমি থাকবে আসন্ন ভোর রাত্রিশেষে যেমন নিশ্চিত।

    পররাজ্যগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের অক্টোপাস-ব্যূহ
    চূর্ণ করে তোমার উত্থান চিহ্নিত করেছো তুমি
    পৃথিবীর বুকে; রক্তঝরা সূর্যের অক্ষরে
    তুমি লিখেছো তোমার নামঃ ভি-য়ে-ত-না-ম।

    সব্যসাচী কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর সুপরিচিত কবিতা ‘গেরিলা’ শুরু করেছেন ভিয়েতনামের নাম দিয়েঃ অবিরাম/ দক্ষিণ ভিয়েৎনাম/ কম্বোডিয়া/ বাংলাদেশ/ অ্যাংগোলায়/ মোজাম্বিকে তুমি/ নিসর্গের ভেতর দিয়ে/ সতর্ক নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাও সারাদিন সারারাত …। আবার তাঁর দীর্ঘ কবিতা 'হে অমর আগুনপাখি'-তে লিখেছেন: 'এরা কি দেখেছে যুদ্ধ? জেনেছে কি আগ্রাসন সাম্রাজ্যবাদের?/ লিখেছে কি রক্ত দিয়ে মুক্তির যুদ্ধের কথা যেমন বাংলায়,/ ভিয়েতনামে, কোরিয়ায়, এশিয়ায়?’ আরো একটি কবিতায় সৈয়দ হক লিখেছেন 'দক্ষিণ ভিয়েতনামে/ আমেরিকা এখন কয়েকটি দালানের সঙ্গে আলিঙ্গনে আবদ্ধ।' বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ভিয়েতনামের সংগ্রামের তুলনা তাঁর রচনায় স্পষ্ট।

    ফজল শাহাবুদ্দিনের একাধিক কবিতায় এসেছে ভিয়েতনাম প্রসঙ্গ; তাঁর 'বাংলাদেশ একাত্তরে' কবিতার দুটি বিখ্যাত চরণ – ‘বাংলাদেশ আগুন লাগা শহর আর লক্ষ গ্রাম / বাংলাদেশ দুর্গময় ক্রূদ্ধ এক ভিয়েতনাম।’

    বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ (Allen Ginsberg) ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদী লেখা লিখেছেন। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের শরণার্থী সমস্যা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল গিন্সবার্গ-এর বিশেষভাবে সাড়া জাগানো ‘যশোর রোড’ (September on Jessore Road) কবিতাটি; এই কবিতায় তিনি বলেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর প্রাসঙ্গিক বিপর্যয়ের কথা, অবধারিতভাবে এসেছে ভিয়েতনাম প্রসঙ্গ। কবিতাটির কয়েকটি লাইনঃ
    Where are the helicopters of US Aid?
    Smuggling dope in Bangkok's green shade
    Where is America's Air Force of Light?
    Bombing North Laos all day all night

    Where are the President's Armies of Gold
    Billionaire Navies merciful Bold?
    Bringing us medicine food and relief?
    Napalming North Vietnam and causing more grief?

    ভিয়েতনামে মার্কিন ভূমিকার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন বিশ্বের অনেক কবি, সাহিত্যিক ও প্রবন্ধকার। গিন্সবার্গ-এর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। প্রতিবাদী লেখকদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় একজনের নাম ‘বারবারা বিডলার’। মার্কিনিরা ভিয়েতনামের জনবসতিতে বিধ্বংসী নাপাম বোমা ফেলছিল, প্রতিবাদ জানিয়ে ফ্লোরিডা রাজ্যের বারো বছরের স্কুলছাত্রী বারবারা একটি কবিতা লেখে ১৯৬৭ সালে, কবিতাটি সম্পূর্ণ তুলে ধরছি।
    Afterthoughts on a Napalm-Drop on Jungle Villages near Haiphong
    Barbara Beidler

    All was still.
    The sun rose through silver pine boughs,
    Over sleeping green-straw huts,
    Over cool rice ponds,
    Through the emerald jungles,
    Into the sky.

    The men rose and went out to the fields and ponds.
    The women set pots on the fire, boiling rice and jungle berries,
                    and some with baskets went for fish.
    The children played in the streams and danced through the weeds.

    Then there was the flash -- silver and gold,
    Silver and gold,
    Silver birds flying,
    Golden water raining,
    The rice ponds blazed with the new water.
    The jungles burst into gold and sent up little birds of fire.
    Little animals with fur of flame.

    Then the children flamed,
    Running -- their clothes flying like fiery kites,
    Screaming -- their screams dying as their faces seared,
    The women’s baskets burned on their heads.
    The men’s boats blazed on the rice waters,
    Then the rains came.

    A rag, fire-black, fluttered.
    A curl of smoke rose from a lone rice stem.
    The forest lay singed, seared.
    A hut crumbled.

    And all was still.

    Listen, Americans,
    Listen, clear and long.
    The children are screaming
    In the jungles of Haiphong.

    কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ভেঞ্চার (Venture) নামের এক পত্রিকায়, যা ছিল ফ্লোরিডার এক স্থানীয় গির্জার সাপ্তাহিক পত্রিকা। কবিতার বক্তব্যে মার্কিন সরকার এতটাই অসন্তুষ্ট হয় যে দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগ ওই পত্রিকাটিকে কালো তালিকাভুক্ত করে। ফল বিপরীত হয়, মানুষ বেশি করে পড়তে থাকে কবিতাটি।
    বারবারা-র কবিতাটি পড়ে তার উত্তরে ভিয়েতনামের বিখ্যাত কবি হুই কান (Cu Huy Can) যে কবিতা লিখেছিলেন ভিয়েতনামী ভাষায়, তার একটি ইংরেজি অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো।
    Truth Blazes Even in Little Children’s Hearts
    Huy Can

    Little Barbara,
    Separated from us by the ocean
    And by the color of your skin
    You have heard and understood.

    You have heard the screams
    Of the children near Haiphong
    Whose clothing turns to flame
    From American napalm.

    You are twelve years old
    And your heart speaks
    For the conscience of mankind
    Tormented by each rain of bombs.

    America, America!
    Don't you hear the screams
    Of those thousands of children
    Consumed by the golden fire?

    Golden fire of napalm
    Golden fire of dollars
    Which eats the flesh
    Like a cancer.

    A filthy cancer
    Devouring the bones
    The blood and the soul
    Of the United States.

    America, don't you feel
    The fire burning your flesh
    And your conscience
    Killed by your bombs?

    Little Barbara,
    The fire of your poetry
    Scorches the demons
    And drives them wild.

    They can ban poetry
    But how can they ban
    The truth that blazes
    Even in little children's hearts!


    সারা বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছিল কবিতাদুটি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সমাবেশে বা আলোচনায় এই কবিতাদুটি বহুবার পড়া হতো। বাংলাদেশের কবি আসাদ চৌধুরী বারবারা বিডলার-এর ওই বিখ্যাত কবিতার কথা জানতে পারেন কবিতাটির বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে, যা খুব সম্ভব প্রকাশিত হয়েছিল কুমিল্লা থেকে বের হওয়া ‘লেখা’ নামের একটি পত্রিকায়। এই কবিতা পড়ে আসাদ চৌধুরী রচনা করেন একটি কালজয়ী কবিতা, শিরোনাম ‘বারবারা বিডলারকে’।

    এই কবিতায় কবি স্মরণ করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অগণিত শহীদের আত্মত্যাগের কথা, নির্বাসিত শরণার্থীদের দুর্বিষহ জীবনের কথা, ধর্ষিতা নারীদের নির্মম অভিজ্ঞতার কথা। স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্মস্পর্শী ইতিহাস, আর সুন্দর সম্ভাবনার প্রত্যয়, প্রাঞ্জলভাবে চিত্রিত হয়েছে আসাদ চৌধুরীর এই কবিতায়, যার শেষ অংশে কবি প্রতীকী আহ্বান করলেন বারবারা বিডলারকে, বিশ্বকে অত্যাচারমুক্ত করার সংগ্রামে শামিল হতে।

    বারবারা বিডলারকে
    আসাদ চৌধুরী


    বারবারা
    ভিয়েতনামের উপর তোমার অনুভূতির তরজমা আমি পড়েছি --
    তোমার হৃদয়ের সুবাতাস
    আমার গিলে-করা পাঞ্জাবিকে মিছিলে নামিয়েছিল
    প্রাচ্যের নির্যাতিত মানুষগুলোর জন্যে অসীম দরদ ছিল সে লেখায়
    আমি তোমার ওই একটি লেখাই পড়েছি
    আশীর্বাদ করেছিলাম, তোমার সোনার দোয়াত কলম হোক।

    আমার বড়ো জানতে ইচ্ছে করে বারবারা, তুমি এখন কেমন আছ?
    নিশ্চয়ই তুমি ডেট করতে শিখে গেছ।
    গাউনের রঙ আর হ্যাট নিয়ে কি চায়ের টেবিলে মার সঙ্গে ঝগড়া হয়?
    অনভ্যস্ত ব্রেসিয়ারের নিচে তোমার হৃদয়কে কি চিরদিন ঢেকে দিলে?
    আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে বারবারা।

    তোমাদের কাগজে নিশ্চয়ই ইয়াহিয়া খাঁর ছবি ছাপা হয় --
    বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখো
    ওটা একটা জল্লাদের ছবি
    পনেরো লক্ষ নিরস্ত্র লোককে ঠাণ্ডা মাথায় সে হত্যা করেছে
    মানুষের কষ্টার্জিত সভ্যতাকে সে গলা টিপে হত্যা করেছে
    অদ্ভুত জাদুকরকে দেখ
    বিংশ শতাব্দীকে সে কৌশলে টেনে হিঁচড়ে মধ্যযুগে নিয়ে যায়।

    দেশলাইয়ের বাক্সর মতো সহজে ভাঙে
    গ্রন্থাগার, উপাসনালয়, ছাত্রাবাস,
    মানুষের সাধ্যমত ঘরবাড়ি
    সাত কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ফুলকে সে বুট জুতোয় থেঁতলে দেয়।



    টু উইমেন ছবিটা দেখেছ বারবারা?
    গির্জায় ধর্ষিতা সোফিয়া লোরেনকে দেখে নিশ্চয়ই কেঁদেছিলে
    আমি কাঁদিনি, বুকটা শুধু খাঁ খাঁ করেছিল--
    সোফিয়া লোরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো বাংলাদেশে
    তিরিশ হাজার রমণীর নির্মম অভিজ্ঞতা শুনে
    তিনি শিউরে উঠবেন।

    অভিধান থেকে নয়
    আশি লক্ষ শরণার্থীর কাছে জেনে নাও, নির্বাসনের অর্থ কী?
    জর্জ ওয়াশিংটনের ছবিঅলা ডাকটিকেটে খোঁজ থাকবে না স্বাধীনতার
    আমাদের মুক্তিযোদ্ধার কাছে এসো --
    সাধু অ্যাবের মর্মর মূর্তিকে গণতন্ত্র আর মানবতার জন্য
    মালির ঘামে ভেজা ফুলের তোড়া দিয়ো না-
    নিহত লোকটি লজ্জায় ঘৃণায় আবার আত্মহত্যা করবে।

    বারবারা, এসো,
    রবিশঙ্করের সুরে সুরে মুমূর্ষু মানবতাকে গাই
    বিবেকের জংধরা দরোজায় প্রবল করাঘাত করি
    অন্যায়ের বিপুল হিমালয় দেখে এসো ক্রূদ্ধ হই, সংগঠিত হই
    জল্লাদের শাণিত অস্ত্র
    সভ্যতার নির্মল পুষ্পকে আহত করার পূর্বে,
    দর্শন ও সাহিত্যকে হত্যা করার পূর্বে
    এসো বারবারা বজ্র হয়ে বিদ্ধ করি তাকে।




    প্রবন্ধকারের টীকাঃ এই প্রবন্ধের অধিকাংশ তথ্য ও কবিতা সংগৃহীত হয়েছে বিভিন্ন বই এবং ইন্টারনেট থেকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের উপর লেখা অনেক কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, আমি দুটির সূত্র উল্লেখ করছিঃ (১) W D Ehrhart (edited), Carrying the Drakness: The Poetry of the Vietnam War’, 1989; (২) https://www.poetryfoundation.org/collections/144186/the-poetry-of-the-vietnam-war । বারবারা বিডলার (Barbara Beidler) এবং হুই কান (Huy Can) -এর কবিতাদুটি নেওয়া হয়েছে Gettleman M E, Franklin J, Young M B and Franklin B (eds), ‘Vietnam and America’, Grover Press, New York, 1995 বইটি থেকে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বারবারা-র কবিতাটির রচনাকাল ১৯৬৫ বলে বইটিতে লেখা আছে, তবে অন্যান্য স্থানে ১৯৬৭ সালের উল্লেখ দেখে আমার মনে হয়েছে ১৯৬৭ সালই সঠিক। ব্যক্তিগতভাবে আমি বারবারা বিডলার-এর খোঁজ করেছি, পাইনি; কবি আসাদ চৌধুরীর সাথেও কথা বলেছি। উৎসাহী পাঠকরা এই ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য পাবেনঃ https://www.newspapers.com/clip/10952689/the-san-bernardino-county-sun-15-feb/ ।


    অলংকরণ (Artwork) : The San Bernardino County Sun 15 Feb 1967
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)