• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ২৭ | আগস্ট ২০০২ | Rabindranath Tagore | প্রবন্ধ
    Share
  • সঙ্গীতপ্রাণ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ : অলকা দত্ত



    ॥ প্রাক্কথন ॥

    রবীন্দ্রনাথেরই একটি গান, "অসীম আকাশে অগণ্য কিরণ, কত গ্রহ উপগ্রহ, কত চন্দ্র তপন ফিরিছে বিচিত্র আলোক জ্বালায়ে," যেন চিনিয়ে দেয় তাঁদেরই পরিবারকে -- অসংখ্য তারকাখচিত যে সমৃদ্ধ পরিবারটি উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণে বাংলা দেশকে উজ্জ্বল করেছিল । সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা -- সৃষ্টির প্রায় সর্বক্ষেত্রেই এই ঠাকুর পরিবারের অবদান আজ আর আমাদের কারোর অজানা নেই ।

    জোড়াসাঁকোর এই বিদগ্ধ ও অভিজাত ঠাকুর পরিবারের অন্যতম সন্তান মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঞ্চমপুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫) ছিলেন এক অনন্য প্রতিভাবান পুরুষ । জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি নানান সৃষ্টিকার্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু সঙ্গীতই ছিল তাঁর জীবনব্যাপী সাধনা । তাঁকে আমরা স্মরণ করি প্রধানত রবীন্দ্র প্রসঙ্গে । রবীন্দ্র-প্রতিভার বিকাশে বন্ধুপ্রতিম এই জ্যোতিদাদার অনুপ্রেরণা ও অবদানের কথা আমরা জানতে পারি "জীবনস্মৃতি" ও তাঁর অন্যান্য লেখা থেকে । রবীন্দ্রপ্রতিভার স্ফূরণে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ভূমিকা স্বীকার করে নিয়েও বলা যায় এর বাইরেও সাহিত্য, চিত্রকলা এবং বিশেষ করে সঙ্গীতে তাঁর প্রত্যক্ষ অবদানের গুরুত্বও অপরিসীম ।


    ॥ পারিবারিক উত্তরাধিকার ও শিক্ষা ॥

    বাংলা সঙ্গীতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মৌলিক চিন্তা ও সৃষ্টির পরিচয় আজ বিস্মৃতপ্রায়, এবং সেইজন্যেই তা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য । তিনি ছিলেন ঠাকুর পরিবারের অন্যতম গীতিকার ও সুরকার । পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর প্রথম সঙ্গীতশিক্ষা শুরু । এই ঠাকুর পরিবারের প্রায় প্রতিটি মানুষ বংশানুক্রমিকভাবে অন্যান্য বহুপ্রকার সৃষ্টিশীল কর্মের পাশাপাশি সঙ্গীতকে কিভাবে জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত করে নিয়েছিলেন তার কথা আমরা বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি । দ্বারকানাথের সময় থেকেই এই পারিবারিক ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় । এঁদের সঙ্গীতচর্চার ধরন একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায় যে এদেশের ধ্রুপদী সঙ্গীতের পাশাপাশি বিদেশী সঙ্গীতকেও এঁরা সমান আগ্রহে ও উত্সাহে গ্রহণ ও অনুশীলন করেছিলেন । দ্বারকানাথের এই সঙ্গীতপ্রীতির উত্তরাধিকারী ছিলেন তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর । ঠাকুর পরিবারে তিনিই প্রথম সঙ্গীত রচনা শুরু করেন এবং তাঁর পুত্রকন্যা ও ভ্রাতুষ্পুত্রদের ব্রহ্মসঙ্গীত রচনায় উত্সাহ দেন । এমন পরিবেশে শৈশবকাল থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ স্বাভাবিকভাবেই সঙ্গীতের উত্তরাধিকার লাভ করেন । আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত বাংলার সামাজিক জীবনে যে একটা অস্থির অবস্থা চলছিল তার থেকে সঙ্গীতও বাদ যায়নি । জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জন্ম এই সময় । "বাংলার নবজাগরণ" অধ্যায়ে ব্রাহ্মসমাজের আবির্ভাব একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা । সমাজের উপাসনায় একটি বিশেষ অঙ্গ ছিল সঙ্গীত । এই ব্রহ্মসঙ্গীতগুলিতে ধ্রুপদগানের গভীর প্রভাব ছিল । রাজা রামমোহন রায় রাগাশ্রয়ী ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করে বাংলা ধর্মসঙ্গীতের ক্ষেত্রে এক নতুন ধারার সন্ধান দিলেন । তারপরের পর্যায়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনায় ধর্মসঙ্গীতকে বিশেষ একটি স্থান দেন । অসাধারণ প্রতিভাবান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পিয়ানো ও হারমোনিয়াম বাজানোয় দক্ষতা অর্জন করেন নিজের চেষ্টায় । তাঁর বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের পিয়ানো বাজিয়ে তিনি প্রথম পিয়ানো শিক্ষা শুরু করেন । বেহালা বাজানোতেও তাঁর বিশেষ ক্ষমতা ছিল । এই প্রসঙ্গে তাঁর বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের একটি কৌতুক-কবিতার কিছু অংশ উল্লেখ করা যায় --"বেয়ালা কি মিঠে, অমৃতের ছিটে, ঐ হাতটিতে শুনায় / পিয়ানো ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং, সেতার গুনগুনায় ।" সে-যুগের বিখ্যাত গায়ক বিষ্ণু চক্রবর্তীর [১] কাছে তিনি ও তাঁর অগ্রজেরা নিয়মিত সঙ্গীত শিক্ষা নিয়েছেন । এই বিষ্ণু চক্রবর্তী ও বোম্বাইয়ের বিখ্যাত গায়ক মৌলাবক্সের সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ হারমোনিয়াম বাজাতেন । মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের কাছে আহমেদাবাদে থাকাকালীন তিনি সেতার শিক্ষা করে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় রাখেন । এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে সঙ্গীতের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তাঁর অনায়াস আনাগোনা ছিল । সঙ্গীতের রসে গভীর ভাবে নিষিক্ত ছিল তাঁর প্রাণ । উনবিংশ শতাব্দীতে পিয়ানো ও অর্গ্যান বাজিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সত্যই এক বিস্ময়ের স্বাক্ষর রাখেন । অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় আমরা পাই -- "শুনেছি অক্ষয়বাবু বলতেন আমাদের জ্যোতিকামশায়ের অর্গ্যান শুনতে লোকের ভিড় জমে যেত ।"

    ॥ পারিবারিক পরিবেশ ॥

    জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ তখন এতটাই অনুকূল ছিল যে সাহিত্যসৃষ্টি চারুকলা, নাট্যাভিনয়, গীতচর্চা সবদিকেই তখন সমৃদ্ধির অঙ্কুর বিকশিত হয়ে উঠছিল । রবীন্দ্রনাথের কথায়, "কিন্তু সমস্ত ছাড়িয়ে উঠেছিল সঙ্গীত । বাঙ্গালীর স্বাভাবিক গীতমুগ্ধতা ও গীতমুখরতা কোনো বাধা না পেয়ে আমাদের কাছে যেন উত্সবের মত উত্সারিত হয়েছিল ।"

    দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর
    জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনা ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ । এর মধ্যে আমরা পাই ব্রহ্মসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, প্রেমসঙ্গীত, নাট্যসঙ্গীত এবং হাসির গান । তাঁর সঙ্গীত রচনার প্রথম সূচনা হয় ব্রহ্মসঙ্গীতের মাধ্যমে । বিচিত্র সুরে সমৃদ্ধ এই সঙ্গীতগুলিতে তাঁর স্বকীয়তার স্বাক্ষর স্পষ্ট । তখন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বড় বড় গায়কদের আশ্রয় দেওয়া হত । তাঁদের মধ্যে রমাপতি বন্দোপাধ্যায়, যদুভট্ট [২] ইত্যাদির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । প্রাথমিক পর্যায়ে এঁদের গান ভেঙে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও তাঁর অগ্রজরা ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা শুরু করেন । ওস্তাদি গান ভেঙে সুরপ্রয়োগ শুরু হওয়ার কারণে ব্রহ্মসঙ্গীতে নানা রকম ওস্তাদি সুর প্রবেশ লাভ করেছে । জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলেছেন, "ইঁহাদের গান ভাঙিয়া তখন আমি ও বড়দাদা (দ্বিজেন্দ্রনাথ) অনেক ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করিয়াছিলাম । কি শৌখিন কি পেশাদার কোনও গায়কের কোনও গান ভাল লাগিলেই অমনি সেটি টুকিয়া লইয়া আমরা ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করিতে বসিতাম । এইরূপে ব্রহ্মসঙ্গীতে অনেক বড় বড় ওস্তাদি সুর ও তাল প্রবেশ করিয়াছে ।" তাঁর ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা কেবল ধ্রুপদাঙ্গেরই ছিল না -- খেয়াল, তেলেনা ইত্যাদি গান ভেঙেও গান রচনা করেছেন ।

    এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও তাঁর অগ্রজ অনুজেরা কিছু একই হিন্দি গানের সুরে গান রচনা করেছিলেন । যেমন যদুনাথ ভট্টাচার্যের "রুমঝুম বরখে"র সুরে দ্বিজেন্দ্রনাথ রচনা করলেন, "দীনহীন ভকতে", জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রচনা করলেন "তুমি হে ভরসা মম অকুল পাথারে", রবীন্দ্রনাথ করলেন, "শূন্য হাতে ফিরি হে"। সকলের মধ্যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথই ছন্দ পরিবর্তন করলেন এই গানে । হিন্দি তেলেনা গান - "দারাদিম্‌ দারাদিম্‌ " ভেঙে লিখলেন "কতদিন গতিহীন", রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, "সুখহীন নিশিদিন" । তাঁর রচিত ব্রহ্মসঙ্গীতের সংখ্যা প্রায় একশো । এর মধ্যে ষাটটি গান পাওয়া যায় স্বরলিপি সহ । জ্যোতিরিন্দ্রনাথের রচিত কয়েকটি ব্রহ্মসঙ্গীত উল্লেখযোগ্য, "আজ আনন্দে প্রেম চন্দ্রে নেহারো" (মিশ্র বেহাগ, ঝাঁপতাল), "আদিনাথ প্রণবরূপ সম্পূরণ" (ইমনকল্যাণ , সুরফাঁক্তা), "জানি তুমি মঙ্গলময়" (কাফি, কাওয়ালি), "প্রণমামি অনাদি অনন্ত সনাতন" (মাদ্রাজি ভজন, ফেরতা), "বিমল প্রভাতে মিলি একসাথে" (ভৈরবী কাওয়ালি), ধন্য তুমি ধন্য, ভবজলধিতারণ (দেওনট, ফেরতা) ইত্যাদি ।


    ॥ রচনাবৈচিত্র্য ও রবীন্দ্রনাথের উপর প্রভাব ॥

    জ্যোতিরিন্দ্রনাথ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর রচিত গানের সুরবৈচিত্র্য ও রাগবৈচিত্রে । তাঁর গীতসৃষ্টিতে এদেশীয় ধ্রুপদী সুরের পাশাপাশি বিদেশী গানের সুরের সমন্বয়ে এক নতুন সুরের রূপের প্রকাশ আমরা দেখতে পাই । সেসব সুর রচনা করে তার কথা রচনার জন্য তিনি অক্ষয় চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথকে উত্সাহিত করেছেন -- এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "জ্যোতিদাদা তখন প্রায় প্রত্যহই ওস্তাদি গানগুলোকে পিয়ানো যন্ত্রের মধ্যে ফেলিয়া তাহাদিগকে যথেচ্ছ মন্থন করিতে প্রবৃত্ত ছিলেন । তাহাতে রাগিনীগুলির এক একটি অপূর্ব মূর্তি ও ভাবব্যঞ্জনা প্রকাশ পাইত । যে সকল সুর বাঁধানিয়মের মধ্যে মন্দগতিতে দস্তুর রাখিয়া চলে তাহাদিগকে প্রথাবিরুদ্ধ বিপর্যস্তভাবে দৌড় করাইবা মাত্র সেই বিপ্লবে তাহাদের প্রকৃতিতে নূতন নূতন অভাবনীয় শক্তি দেখা দিত এবং তাহাতে আমাদের চিত্তকে সর্বদা বিচলিত করিয়া তুলিত । সুরগুলো যেন নানা প্রকার কথা কহিতেছে এইরূপ আমরা স্পষ্ট শুনিতে পাইতাম ।" বস্তুত বাংলা ধর্মসঙ্গীতের ক্ষেত্রে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অবদান অপরিসীম । এর পরের যুগে এই ধারাটি বহন করে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মসঙ্গীতকে পূর্ণতায় পৌঁছে দিয়েছেন । তাঁর অভিভাবকত্বে ও প্রেরণায় রবীন্দ্রনাথের সাঙ্গীতিক প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে ।

    রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গানে সুররচনা করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ । যেমন, "প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন, গেল গো ফিরিল না, সেই তো বসন্ত ফিরে এল" । তাঁর প্রথম জীবনের গানে এই প্রভাব বিশেষ ভাবে লক্ষ করা যায় । জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পিয়ানো যন্ত্রে সুররচনার কারণেই বহু গানে পাশ্চাত্যসঙ্গীতের প্রভাব স্পষ্ট । রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকিপ্রতিভার প্রথম সংস্করণের গানগুলির সুর তাঁরই দেওয়া । এর আগে ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ "মানময়ী" গীতিনাট্য রচনা করেন । অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, "মানময়ীর গানের সুর জ্যোতিকাকার দেওয়া ইংরাজি রকমের" ।

    দেশাত্মবোধক গান রচনাতেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কৃতিত্ব স্বকীয় । শঙ্করা রাগে রচিত তার কালজয়ী স্বদেশী গান "চলরে চল সবে ভারত সন্তান" রচিত হয়েছিল পুণায় বাসকালে । গানটি সুরের ওঠানামায় অত্যন্ত আকর্ষক এবং উদ্দীপনার ভাবপ্রকাশে বিশেষভাবে সফল । ফরাসি জাতীয় সঙ্গীত "লা মার্সেইজের" এর বাংলা অনুবাদ করে তিনি লেখেন, "আয় রে আয় দেশের সন্তান" । সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত রচনা "মিলে সবে ভারতসন্তান" গানটির মহারাষ্ট্রীয় ভাষায় অনুবাদের প্রত্যানুবাদ করে রচনা করেন, "মিলিয়ে সকলে গাও ভারত শুভ্র সুযশ গান" । স্বর্ণকুমারী দেবীর কিছু দেশাত্মবোধক গানেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সুরারোপ করেন ।

    সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
    প্রেমসঙ্গীতের ক্ষেত্রেও বিচিত্র সুর রচনা করেছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ । এইসব গানের সুর ও কথা প্রথম বাংলা আধুনিক গানের সূচক হিসাবে অনায়াসে ধরা যেতে পারে । তাঁর কিছু প্রেমের গান - "প্রেমের কথা আর বোলোনা, আহা ! কী চাঁদনী রাত, সে যে এসেছে লো " । এ সব গানের সুরে ও ছন্দবৈচিত্রে এক নতুন রূপসৃষ্টি হয়েছে । এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ভাঙা গানের উল্লেখ করা যেতে পারে । হিন্দী খেয়াল, "পায়েলিয়া মোরে বাজে"র সুরে বেঁধেছেন "পায়ে পায়ে মোরে বাজে রে" । এ গানের সুরে রবীন্দ্রনাথের গান, "এখনো তারে চোখে দেখিনি" । "ক্যা করু সজনি"র সুরে বেঁধেছেন "কি করি সজনি" । জ্যোতিরিন্দ্রনাথের একটি জনপ্রিয় হাসির গান -- "সে প্রেম কোথা রে এখন" । আর একটি হাসির গান, "তোমরা যা হোক ভ্যালা" । এখানে রবীন্দ্রনাথের "শেষরক্ষা" নাটিকার "ওগো তোমরাংআ সবাই ভালো" গানটির কথা স্বভাবতই মনে পড়ে যায় । তাঁর রচিত নাট্যসঙ্গীতের বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয় কারণ অধিকাংশ গানগুলি সুর সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে ।


    ॥ সুররক্ষণ প্রচেষ্টা ও স্বরলিপি প্রবর্তন ॥

    জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গীত নিষ্ঠা ও সঙ্গীতপ্রিয়তার পরিচয় সে-সময় শুধু সঙ্গীতের কথা ও সুর রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না । ব্রহ্মসঙ্গীতের স্থায়িত্ব ও উন্নতির জন্য তিনি গভীর ভাবে সচেষ্ট হন । ১৮৭৫ সালের ৮ জুন আদিব্রাহ্মসমাজ সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । ছাত্রদের এখানে বিনা বেতনে কন্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীত শিক্ষা দেওয়া হত । শিক্ষক ছিলেন যদুভট্ট । তরুণ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই সঙ্গীত বিদ্যালয়ের সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন । এক কথায় সঙ্গীতে সম্পূর্ণভাবে উত্সর্গ করেছিলেন নিজেকে । নিজে গান গেয়ে একজন বড় গায়ক হয়ে উঠবেন এই আশা তাঁর ছিল না । সকলের মধ্যে সঙ্গীতচর্চার প্রচার ও প্রসারের জন্য তাঁকে সর্বদাই ব্যাপৃত থাকতে দেখি ।

    দ্বিজেন্দ্রনাথের স্বরলিপি


    তিনি গানের সুর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য সরল আকারে স্বরলিপি পদ্ধতির উদ্ভাবনা করতে সচেষ্ট হন । তাঁর আগে "বালক" পত্রিকায় প্রকাশিত দ্বিজেন্দ্রনাথ কৃত স্বরলিপি অনুসরণ করা হত । জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই পদ্ধতির সংস্কার করে প্রথম সংখ্যামাত্রিক স্বরলিপি ও পরে তা আরও সহজ করে আকারমাত্রিক পদ্ধতির প্রচলন করেন । কেবলমাত্র ছাপাখানার সাধারণ টাইপ ব্যবহার করে স্বরলিপি ছাপানোর এই সহজ ও সরল পদ্ধতির উদ্ভাবক জ্যোতিরিন্দ্রনাথ । এতকাল পরেও আজ পর্য্যন্ত এই আকারমাত্রিক পদ্ধতিই সঙ্গীতজগতে প্রচলিত রয়েছে । পদ্ধতিটির ব্যবহারিক গ্রহণযোগ্যতা ও সার্থকতা সন্দেহাতীত ।

    ১৮৯৭ সালে তিনি "স্বরলিপি-গীতিমালা" নামক অত্যন্ত মূল্যবান একটি স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশ করেন । এতে বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, স্বর্ণকুমারী দেবী, অক্ষয় চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নিজের ১৬৮টি গানের স্বরলিপি আকারমাত্রিক পদ্ধতিতে মুদ্রিত আছে । এই গ্রন্থ প্রকাশের পর "বীণাবাদিনী" নামক একটি সঙ্গীত বিষয়ক মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করেন । সকল মানুষের মধ্যে সঙ্গীতের রস ও চর্চার প্রসার ঘটানোর চিন্তায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সতত নিবেদিতপ্রাণ থেকেছেন । পুণায় বাসকালে সেখানকার "গায়ন সমাজ" দেখে তিনি কলকাতায় সঙ্গীতচর্চার জন্য "ভারতীয় গায়ন সমাজ" স্থাপন করেন এবং তাঁর অনেক নাটকই এই সমাজে অভিনীত হয়েছিল । এই প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা ও পরিশ্রম করে গিয়েছিলেন । বাংলা দেশে সঙ্গীত শিক্ষা, সঙ্গীত অধ্যাপনা ও সঙ্গীতানুরাগীরা যাতে সপ্তাহে অন্তত একদিন মিলিত হয়ে আলাপ আলোচনা করতে পারেন, এই উদ্দেশ্যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই সঙ্গীত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন । এই সমাজের মুখপত্র রূপে "সঙ্গীত-প্রকাশিকা" নামে একটি মাসিক পত্রিকাও তিনি প্রকাশ করেন । ভাবতে অবাক লাগে যে সে যুগে কেবলমাত্র সঙ্গীত বিষয়ক একটি পত্রিকা নিয়মিত ভাবে এগারো বছর চলেছিল ।


    ॥ উপসংহার ॥

    একজন আজীবন সঙ্গীত ভাবুক যিনি নিজে সর্বদা প্রচারবিমুখ থেকে সঙ্গীতকে নূতন রূপে সমৃদ্ধ করেছেন সবরকম ভাবে, দেশী বিদেশী সুর সংগ্রহ, সংরক্ষণের চিন্তা, আকারমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতির প্রবর্তন ও প্রচার এবং লয় নির্দেশের নূতন পদ্ধতির প্রবর্তন ইত্যাদি বিভিন্ন দিক নির্দেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, এবং সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথকে রচনা করে গেছেন সেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যেই বলি, "মুক্ত অঙ্গন সপ্ত সুর তব করুক বিশ্ববিহার, সূর্যশিশনক্ষত্রলোকে করুক হর্ষ প্রচার / তানে তানে প্রাণে প্রাণে গাঁথ নন্দনহার / পূর্ণ কর রে গগন অঙ্গন তাঁর বন্দন গানে । "




    জ্যোতিরিন্দ্রনাথ
    (১৮৪৯-১৯২৫)





    [১] বিষ্ণু চক্রবর্তী- বিষ্ণু চক্রবর্তী ছিলেন সে আমলের অত্যন্ত জনপ্রিয় গায়ক, গীতিকার ও সুরকার । রামমোহন রায়ের সময় থেকেই কৃষ্ণ ও বিষ্ণু দুই ভাই ব্রাহ্মসমাজে গান গেয়েছেন । বিষ্ণু চক্রবতী ঠাকুর পরিবারের বেতনভুক গায়কও ছিলেন । অনুমান করা যায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ রচিত কিছু গানে তিনিই সুর দেন । তাঁর জনপ্রিয়তার কারণ ছিল তিনি দীর্ঘ তান সহযোগে গানকে ভারাক্রান্ত করে তুলতেন না, সঙ্গীতের বাণীর মর্ম তাঁর গানে পূর্ণভাবে প্রকাশ পেত ।

    [২] যদুভট্ট - খ্যাতনামা ধ্রুপদ গায়ক ও সঙ্গীতরচয়িতা যদুনাথ ভট্টাচার্য যদুভট্ট নামেই পরিচিত । মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ঠাকুরবাড়ির সঙ্গীত শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন । তিনি পাখোয়াজ বাদনেও অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন । পরবর্তীকালে আদিব্রাহ্ম সমাজে নিয়মিত গান করতেন এবং সমাজ মন্দিরের সঙ্গীত বিদ্যালয়ে সঙ্গীতশিক্ষক হিসেবেও যোগদান করেন । তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য ব্রহ্মসঙ্গীত, "বিপদভয়বারণ কে করে ওরে মন" । রবীন্দ্রনাথ যদুভট্টের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন । তাঁর উদ্দেশ্যে বলেছেন, "ওস্তাদ ছাঁচে ঢেলে তৈরি হতে পারে, যদুভট্ট বিধাতার স্বহস্তে রচিত ।"
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)